by Jahid | Apr 14, 2022 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন, লাইফ স্টাইল
লিডারশীপের একটি বড় অংশ হচ্ছে আপনার অধীনস্থদের দায়িত্ব দিয়ে সঠিক পথে পরিচালনা করা । এটি আপনি দুইভাবে করতে পারেন । সারাক্ষণ ধাক্কা দিয়ে দিয়ে করতে পারেন অথবা সামনে থেকে মোটিভেট করেও করতে পারেন। কার্যোদ্ধার নিয়া কথা । কীভাবে কাজটা হল ,সেটা আপনার বস বা কোম্পনি হয়তো আপনাকে জিজ্ঞেস করবে না। কিন্তু, কাজে ব্যর্থ হলে, তদন্ত শুরু হয়ে যাবে।
আমি কেন জানিনা , পিছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার চেয়ে সামনে থেকে লিড করায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
এবং আমার উচ্চপদস্থ কেউ আমাকে যখন পিছন থেকে অনাবশ্যক ঠেলা বা ধাক্কা ; আমি ব্যাপারটা নিতে পারি না। কেনরে ভাই, তুমি তো দেখিয়েই দিলেই পারো কীভাবে কাজটা করা যায়। যেহেতু আমি একজন শিক্ষিত লোক , না বোঝার তো কিছু নেই।
উদাহরণ দিই।
বিভিন্ন লোক বিভিন্ন সময়ে তাঁদের গাড়ীতে আমাকে লিফট দিয়েছেন। সিংহভাগ ক্ষেত্রে দেখেছি, ড্রাইভার বেচারা নিজের মতো গাড়ী চালাতে পারে না। সারাক্ষণ ত্রস্ত থাকে পিছন থেকে মালিক কখন কী বলে।
আমি নিজে যখন ড্রাইভ করি, আমি আশা করি আমার সহযাত্রী এবং আমার পিছনে বসে থাকা কেউ আমাকে গাড়ি চালানোর সময় শুধুশুধু যেন ডিরেকশন না দেয়। এই একই জিনিষ আমি আমার ড্রাইভারের সাথেও করি। আমি যেহেতু, বিশ্বাস করে স্টিয়ারিং এ তোমাকে বসানো হয়েছে, কারণ নিশ্চয়ই তোমার গাড়ী চালানোর ট্রেনিং আছে। আর ড্রাইভিং সীটে বসার আগেই তোমাকেতো আমি বলে দিয়েছি, গাড়ি কোন রাস্তায় আর কিধরণের গতিতে চালাবে।
এখন যদি, প্যাসেঞ্জার সিটে বসে বসে আমি সারাক্ষণ ড্রাইভারকে ডিরেকশন দিই , আস্তে আস্তে আস্তে, জোরে জোরে , ডানে না বাঁয়ে—তাইলে তো ড্রাইভার বেচারার মুশকিল !
স্টিয়ারিং এ বসার পর গাড়ী এবং রাস্তাই আপনাকে ঠিক করে দিবে আপনি কী গতিতে চালাবেন।
ওয়েল, একজনের ড্রাইভিং এর সাথে আরেকজনের ড্রাইভিং মিলবে না কোনোদিনও ! এটা মেনে নিয়েই তো তাঁকে আপনি স্টিয়ারিং দিছেন। তার ড্রাইভিং পছন্দ না হলে , তাকে বাদ দেন। আরেকজন রাখেন বা নিজেই চালান।
জীবনের সবক্ষেত্রেই আমার এই মানসিকতা। আমি জানিনা এই মানসিকতা কীভাবে আমি পেয়েছি। কিন্তু, এটি আমার মজ্জাগত হয়ে গেছে।
প্রথম প্রকাশঃ১৪ই এপ্রিল ২০১৩
by Jahid | Apr 6, 2022 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
কোন এক গুণী, কোন এক সময় বলেছিলেন, বাঙালি হচ্ছে পশ্চাদ্দেশের মতন, সর্বদাই দ্বিখণ্ডিত। যথারীতি কোভিড নিয়েও বাঙালি দুইভাগে বিভক্ত। কেউ কোভিডকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চরমে আর কেউ অতিমাত্রায় আতঙ্কিত হতে হতে শুচিবায়ুগ্রস্ত রোগী। দুটোর কোনটাই স্বাস্থ্যকর নয়।
কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে সবার মন বিক্ষিপ্ত ।
বছর তিরিশ আগে মামার কাছে শোনা পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক কথোপকথন মনে পড়ল।
হয়েছে কি , গ্রামের এক আদম হাটে যাচ্ছে গরু কিনতে। পথে মুরব্বীর সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করলেন,
: ভাইস্তে কই যাতিছো?
: হাটে যাচ্ছি কাকা, গরু কিনতি।
: বাপু হে , একটা শুভ কামে যাইচ্ছ, ‘ইনশাল্লাহ্’ বলো। বলো ‘গরু কিনতি হাটে যাচ্ছি ইনশাল্লাহ্।’
ভাতিজা কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
: হাটে গরু রয়ছে, আর আমার পকেটে টাকা ! এর মাঝখানে ‘ইনশাল্লাহ্’ আসে কুথা থেকে !
যাই হোক সন্ধ্যারাতে সেই আদম বিধ্বস্ত, শূন্য হাতে গ্রামে ঢুকছে।
মুরব্বী জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপার কি ভাইস্তে , গরু কোনে ?’
আদম ভীষণ বিষণ্ণ কণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘চাচা হাটের পথে রওয়ানা দিলাম ইনশাল্লাহ্। হাটে পৌঁছালাম ইনশাল্লাহ্। খানিকক্ষণ হাটে ঘোরাঘুরি করলাম ইনশাল্লাহ্। কয়েকটা গরুও দেখলাম ইনশাল্লাহ্। এট্টা পছন্দ করলাম ইনশাল্লাহ্। দামদর কইরে কিনেও ফেললাম ইনশাল্লাহ্। কিন্তু আসার পথে ডাকাত ধইরল ইনশাল্লাহ্। আমাক মাইরে-টাইরে গরু কাইড়ে নিল ইনশাল্লাহ্। কাছে টাকাপয়সা যে কয়ডা বাঁচিছিল কাইড়ে নিল ইনশাল্লাহ্। এখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছি ইনশাল্লাহ্।’
প্রিয়জন অথবা নিজে আক্রান্ত হওয়ার পরে শুচিবায়ুগ্রস্ত না হয়ে এখন থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
প্রথম প্রকাশঃ ৬ই এপ্রিল ২০২১
by Jahid | Apr 2, 2022 | লাইফ স্টাইল, সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
সত্তুরের দশকে শিল্পীর স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিবৃতিগুলো চীন-ভারত সীমান্ত জট প্রসঙ্গে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল। কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসুকে সেই লেখকমণ্ডলীর মধ্যে দেখা গেল না। নিস্পৃহ থেকে তিনি নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘লেখার স্বাধীনতা যদি থাকে, না-লেখার স্বাধীনতাও আছে।’
সমরেশ বসুর এই বোধ আমি নিজেও ধারণ করি। আমিও ‘ না-লেখার স্বাধীনতায়’ বিশ্বাস করি। হতে পারে, আমার নিস্পৃহতা , হতে পারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ব্যাপারে আমার চিরআলস্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চলতি হাওয়ার তথাকথিত দায়বদ্ধতায় দায়বদ্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক লেখা আমার পক্ষে কখনই হয়ে ওঠেনি। আমি হয় আগে বলে ফেলি অথবা পরে বলি। এতোদিনে আমার স্বল্প পরিচিতরাও জেনে গেছেন যে, আমি সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে পারিনা, আর এই বয়সে এসে এই দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা নাই বা করলাম।
তো যাই হোক, প্রতিবছর বিসিএস-এর ফলপ্রকাশের সময় ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রাশিরাশি সাফল্যের গল্প প্রকাশ করে। মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়া দিনমজুরের ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে; দারোয়ানের ছেলে কাস্টমস অফিসার হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব সাফল্যকীর্তি আমাদের আশাবাদী করে। মনে হয়, বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ, মানুষের সম্ভাবনাও অপরিসীম। মনে হয়, পুঁজিবাদীদের ঠাকুর আধুনিক আমেরিকার মতোই বাংলাদেশও সবসময় ‘ল্যান্ড অব অপরচুনিটি’ ! এখানে সমাজের সকল শ্রেণির, স্বতন্ত্র ব্যক্তির একই রকম সম্ভাবনা আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশীদার হওয়ার। ‘আজ যে ফকির কাল সে রাজা।’ এইসব বিচ্ছিন্ন মিথ নিয়ে আমরা আশাবাদে বুঁদ হয়ে থাকি।
প্রসঙ্গত আব্রাহাম মাসলো তাঁর সুবিখ্যাত Maslow’s hierarchy of needs (মাসলো’র চাহিদার সোপান তত্ত্ব ) যে কথাগুলো বলেছেন, সেখান থেকে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ এবং নির্দিষ্ট করে বাঙাল সমাজ বের হতে পারেনি। মৌলিক জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তা, পারিবারিক ভালোবাসার পর্যায়গুলো পেরিয়ে যেতে পারলেই সে আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্ত করে।
বাঙালের চাহিদা তার ধারাবাহিক প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে। মোটা দাগে আমার মতো মুর্খ লোকেও বলতে পারে যে, পিরামিডের উপরের দিকে এসেই বাঙাল ক্ষমতাবান হতে চায়, জনপ্রিয় হতে চায়। যেনতেন প্রকারে বিত্ত তো চলে আসেই। কিন্তু ক্ষমতা ও সম্মানের দুইটিই একসঙ্গে একজীবনে পাওয়ার একটিমাত্র উপায় আছে, সেটি সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া। ইম্পেরিয়াল সিভিল সার্ভিস থেকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস হয়ে অধুনা বিসিএস অফিসার হওয়ার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিতশ্রেণির ও শিক্ষানুরাগী জনগণের বহুবছরে আরাধ্য। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়ে শুরু করে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস অবধি এই ইম্পেরিয়াল ওরফে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসকেই জীবনের মোক্ষ করেছিলেন। ( উল্লেখ্য, দেশমাতৃকার টানে নেতাজী কয়েকবছর পরে সিভিল সার্ভিস থেকে স্বেচ্ছায় সরে পড়েন।)
এই যে একের ভিতর তিন– অর্থবিত্ত, ক্ষমতা ও সম্মানপ্রাপ্তির সুতীব্র আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা আমরা দেখছি, সেটির কিঞ্চিৎ ভাটা পড়েছিল সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক পর্যন্ত। সামরিক শাসনের যথেচ্ছ চাপে প্রশাসনের আমলাদের চেয়ে নব্যদালাল, রাজনৈতিক চামচা, সামরিকবাহিনীর দাপট ছিল বেশি। সরকারি বেতন বোনাসও তেমন বলার মতো ছিল না। সরকারি চাকরি মানে সরকারি চাকরিই, নিরপত্তা আজীবন—এটুকুই ছিল সান্ত্বনা। আমরা যখন নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে কর্মজীবনে আসলাম, ততদিনে বাংলাদেশে টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি, নানাধরনের রপ্তানিমুখি শিল্পকারখানা, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি, বেসরকারি ব্যাংক, মোবাইল কোম্পানি ইত্যাদির কৈশোর কাল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এমবিএ, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রকোপ বেড়ে গেল। সবকিছু মিলিয়ে, আমাদের প্রজন্ম যারা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি আমাদের গ্রাজুয়েশন করেছিলাম, তাদের পছন্দ ছিল প্রাইভেট সেক্টর। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরির নিরাপত্তা ও ক্ষমতার দাপট ছাড়া সবকিছুই পাওয়া যেত। ভালো বেতন, আধুনিক অফিস, ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম, বিদেশ সফর ইত্যাদি আমাদের সিংহভাগকে আকৃষ্ট করেছিল বেসরকারি সেক্টরে যোগদান করতে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারি, আমি নিতান্তই ঠেকায় পড়ে কয়েকবার কয়েকটি সরকারি কার্যালয়ে গেছিলাম সেই ৯০ দশকের শুরুতে। মাথার উপরে ব্রিটিশ আমলের ফ্যান ঘুরছে, ধুলাবালির মাঝে ফাইলের স্তূপ, পুরনো টেবিল চেয়ার, নোংরা শৌচাগার আর গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের দাপট ও অনাধুনিক কর্ম-পরিবেশ দেখে আমি যারপরনাই হতাশ ছিলাম। বিসিএস-কে জীবনের মোক্ষ করিনি বলে আমার বড়মামা বছর খানেক আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আসলে, তারা দেখেছেন যে, মফঃস্বল শহরে একজন সরকারি কর্মকর্তা মানে ছোটখাটো দেবতা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল তো আর আমি চাক্ষুষ করিনি ; তবে, আশির দশকে দেখেছি– উপজেলা , থানা পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা, টিএনও, ম্যাজিস্ট্রেট যদি দেবতার মতো হয়, তাহলে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার ছিলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বরের সমতুল্য। বিশাল বাংলো, সামনে ফুলের বাগান, পিছনে পুকুরের সঙ্গে ছিল গুচ্ছের আর্দালি, কুক, দারোয়ান ইত্যাদি। আমি আমার পরিবারে তথাকথিত মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিত ছিলাম। সুতরাং আমার বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে হলেও, আমার সিংহভাগ আত্মীয়-স্বজনদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস দিয়ে পুলিশ, প্রশাসন বা কাস্টমস কর্মকর্তা হওয়া। সেই গুড়ে বালি দিয়ে আমি টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টরে প্রায় তুচ্ছ, ক্ষমতাহীন ও অপাঙতেয় জীবন যাপন করে চলছি।
এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, যে আমাদের সময়ে ক্লাসের প্রথম-সারির ছেলেমেয়েরাই বিজ্ঞান বিভাগে পড়তো, আর তাঁদের গন্তব্য ছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, মেডিক্যাল কলেজ এবং কিয়দংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দামী কয়েকটি সাবজেক্ট পর্যন্ত। বাকীরা নিতান্তই আসনসংখ্যার অপ্রতুলতার কারণে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতেন। আমার প্রকৌশলী বন্ধুদের ভিতরে হাতে গোনা কয়েকজন বিসিএস দিয়েছে কি দেয় নাই।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন যখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে একটা প্রশাসননির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করল, তখন সমাজের বাকী মেধাবী অংশগুলো হয়ে পড়ল অবহেলিত। এই বছরের শুরুতে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ সব দেশ প্রশাসকে ভরে গেছে। কোনো বিজ্ঞানী নেই। গবেষক নেই। দার্শনিক নেই। যেদিকে তাকাবেন, শুধুই প্রশাসন দেখতে পাবেন। ……. প্রশাসকনির্ভর জাতি হলে কী হবে ভবিষ্যতে, তার ইঙ্গিত তো দেখতে পাচ্ছি। কোনো চিন্তাবিদ আপনি দেখতে পাবেন ? নেই। গবেষক নেই। এমন একটি জাতির ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার। প্রশাসকরা প্রশাসকই তৈরি করেন। তারা শিক্ষার মর্ম কী বুঝবেন ! তারা পরামর্শ দেবেন ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করার। ’
সারাদেশ যখন প্রশাসনের , যাঁদের ঘরে লক্ষ্ণী-সরস্বতী একসঙ্গে বসে চা খায়, তখন একজন মেধাবী প্রকৌশলী ও চিকিৎসক কেন বিসিএস দিয়ে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কাস্টমস, ট্যাক্সে যেতে চাইবে না?
আরো দুটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
আশির দশকে আমার এক মামা বিসিএস দিয়ে কোন এক ক্যাডারে (যতদূর মনে পড়ে খাদ্য ক্যাডারে) যোগদান করলেন। জানি না তিনি বাড়িয়ে বলেছিলেন কীনা । তবে এটাও সত্য, শুধু শুধু মিথ্যা কথা বলার লোক উনি নন। যোগদানের পরে তাঁর যে আসন এতোদিন ফাঁকা ছিল, সেটার বরাবরে চলমান দুর্নীতির ভাগের যে টাকা জমেছিল সেটা তাঁকে প্রথম দিনেই প্যাকেট করে দেওয়া হয়েছিল। ঐ কারণেই হোক , বা অন্য কারণে তিনি আর সরকারী চাকরি করেননি, শিক্ষকতায় চলে আসেন।
বছর দুয়েক আগে, আমাদের কয়েকজন টেক্সটাইল প্রকৌশলী বন্ধুরা মিলে এক বন্ধুর মামা, যিনি সরকারি দলের প্রাক্তন সংসদ সদস্য, তার রিসোর্টে গেলাম। একটা প্রাক-বনভোজনের জায়গা পছন্দের নিমিত্তে। আমরা যেয়ে দেখি, মামা ভীষণ ব্যস্ত জনৈক থানা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে। এই, ডাব আন রে, পানি আন রে , মিষ্টি আন রে , দুপুরের খাবারে বড় মাছ জোগাড় কর রে, সে এক হুলুস্থুল। এদিকে আমরা কয়েকজন যে গেছি, তার মধ্যে একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, দুইজন বৃহদায়তন শিল্পকারখানার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও জেনারেল ম্যানেজার। সেই প্রশাসনিক দেবতার তোষণে মামা এতোই ব্যস্ত রইলেন যে, আমাদের দিকে নজর দেওয়ার ফুরসৎ পাচ্ছিলেন না। আমরা নিজেদের মতো ব্যস্ত রইলাম। দুপুরের খাবারের সময় পরিচয় পর্বে সেই সরকারি কর্মকর্তা বুঝতে পারলেন, আমাদেরকে তিনি যতোখানি তুচ্ছ জনগণ ভাবছিলেন, আমরা ঠিক ততোখানি তুচ্ছ নই।
বহুবছর আগে কবি নির্মলেন্দু গুণকে মাঝরাতে টহল পুলিশ ধরলে তিনি নিজেকে কবি হিসাবে পরিচয় দেন। তাতে কী আর হয়! রসিক পুলিশ বলেন,আপনি যে কবি তার প্রমাণ কি , একটা কবিতা বলেন। গুণ নাকি মুখে মুখে বলেছিলেন, ‘ মাছের রাজা ইলিশ, আর মানুষের রাজা পুলিশ !’ টহলপুলিশ কবিতা শুনে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিল।
এখন , আমার যদি আবার বয়স ২১/২২ হতো, আমি যদি আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেতাম, আমিও কী মানুষের রাজা হতে চাইতাম না ! সেই চাওয়ার মধ্যে গলদ যদি কিছু থেকেই থাকে, সেটা দূর না করে প্রকৌশলীরা কেন বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যাচ্ছে ; কেন স্পেশালাইজড শিক্ষিতরা ( পড়ুন ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়াররা ) ক্যাডার সার্ভিসে গিয়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের ভাগ্য বিনষ্ট করছে –এইসব আহাজারি বন্ধ করুন।
প্রথম প্রকাশঃ ২রা এপ্রিল ২০২২
by Jahid | Mar 23, 2022 | লাইফ স্টাইল
যেখানে সেখানে , যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ার অদ্ভুতুড়ে অভ্যাস বা ক্ষমতা ছিল আমার ! আমি ছিলাম অনেকের ঈর্ষার ! আমি এখন অন্যদের ঈর্ষা করি !
২০০৫ সালের ডিসেম্বরে অফিস পিকনিকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে বাস উল্টে কেলেঙ্কারি। কোমরের ফিমার ছুটে গেল পেলভিক থেকে। ছয় সপ্তাহ বিছানায়, ধীরে ধীরে ক্র্যাচ নিয়ে আবার হাঁটা শেখা। বড়কন্যা জেবা তখনও পৃথিবীর মুখ দেখেনি। আমার স্ত্রী ৭ মাসের সন্তানসম্ভবা। পুরো পরিবারের উপর দুর্যোগ।
দুর্ঘটনা যখন হয় , আমি তখন ১০৫ জ্বর নিয়ে বাসের জানালার পাশে তন্দ্রাচ্ছন্ন। মুহূর্তেই সব উলটপালট। যে আমি, ঢাকা কলেজে টেম্পোতে যাওয়ার সময় পাশের জনের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমাতাম ; বাসে সিট না পেলে হ্যান্ডেল ধরে ঘুমাতাম ; দুই ঘণ্টার বিমানযাত্রায়ও ঘাড় কাত করে ঘুমাতাম—ওই অ্যাকসিডেন্টের পরে কীরকম একটা আতঙ্ক গ্রাস করল আমাকে। যে কোন যানবাহনে আমি এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা অস্ফুট আতঙ্ক নিয়ে জেগে থাকি। দুই এক মিনিটের তন্দ্রা কেটে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই।
আমার হয়তো কোন সাইক্রিয়াটিস্ট সেশন দরকার ছিল– ওই আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার জন্য। নানা কারণে ভেবেছিলাম , এমনিতেই একদিন সেরে যাবে। আমি আবার বেঘোরে ঘুমাতে পারব। না ! হচ্ছে না ! কিছুতেই হচ্ছে না! যে কোন যানবাহনে, হোক সে প্রাইভেট কার, বাস, বিমান—আমি আর ঘুমাতে পারি না। একটা দুর্ঘটনা আমার জীবনের নিষ্পাপ, নিশ্চিন্ত ঘুম কেড়ে নিয়ে গেছে আজ এই ১৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও।
আমার টুনি আর দুই টুনটুনি আমার সেই বিখ্যাত অভ্যাস ধরে রেখেছে। যেখানে কাত, সেখানেই বেঘোরে ঘুম।
প্রকাশকালঃ ৭ই জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Mar 23, 2022 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
প্রসঙ্গ: চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে জুন ও জুলাই মাসে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
সারাজীবনে ঈশপ সাহেবের কিছু গল্প বহুচর্চিত হতে হতে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে। কচ্ছপ ও খরগোশ ; রাখালবালক ও নেকড়েবাঘ, চালাক শেয়ালের গল্প ইত্যাদি।
সব গল্পের আদি ও অরিজিনাল একটা মোরাল থাকে।
যুগে যুগে সেই মোরাল আবার দার্শনিকেরা বদলে ফেলে। হাতির যেমন দুইটা দাঁত, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার। তেমনি , একটা মোরাল সবাই দেখতে পায়, আরেকটা বুজুর্গ লোকে বোঝে।
রাখাল ও নেকড়েবাঘের গল্পে পাহাড়ের পাদদেশে গভীর জঙ্গলের পাশে রাখালবালক ভেড়ার পাল চরাত। একাকীত্বের বোরিং জীবনে থ্রিল আনার জন্য সে একদিন চিৎকার করে ‘নেকড়ে বাঘ ! নেকড়েবাঘ !’
আশেপাশে ক্ষেতে খামারের কর্মরত গ্রামবাসীরা যে যার কাছে যা আছে নিয়ে ছুটে আসে। এসে দেখে রাখালবালক হাসছে। কিছুদিন পরে আবার চিৎকার ‘নেকড়েবাঘ, নেকড়েবাঘ !’ আবারো গ্রামবাসী ছুটে এলো সাহায্য করতে; সেই একই কাহিনী ।
শেষের বার কী হয় সবাই জানে।
সত্যি সত্যি বাঘ আসে, কিন্তু এইবার চিৎকার করেও লাভ হয় না ; কেউ রাখালবালককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনা। ভেড়ার পাল সমেত রাখালবালক বাঘের পেটে যায়।
ভাবলাম আমাদের দেশে বিদেশের নবীন দার্শনিকরা এই গল্পের নতুন কী কী মোরাল বের করেছে দেখি।
অরিজিনালের পাশাপাশি নবীন দার্শনিকদের মোরাল দেওয়া হল।
আপনার কোনটি যৌক্তিক মনে হয় জানান।
শুধু ইমো না দিয়ে কমেন্ট করলে নতুন কোন মোরাল আবিষ্কৃত হতে পারে !
অরিজিনাল মোরালঃ
সদা সত্য কথা বলিবে । মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না, এমন কি সে যখন সত্যি কথা বলে তখনও !
নতুন মোরাল ১: ধনী ও প্রভাবশালীদেরই ভেড়ার পাল থাকে। তারা একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুকে এরকম বিপদসংকুল কাজে পাঠিয়ে অন্যায় করেছেন। সে হয়তো ভয় কাটানোর জন্য, সঙ্গ পাওয়ার জন্য সবাইকে ডেকেছে। তার এই মজা করে মিথ্যা বলাটা দুর্বল শোষিতের আর্তনাদ , অন্যায়কারীদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপ।
নতুন মোরাল ২: রাখালবালক যে সমাজে বাস করে সেইটাই আমাদের সমাজ। নিপীড়িত জনগণ অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ও নেতারদের ক্রমাগত আশ্বাস ও সম্ভাব্য বিপদের কথা শুনতে শুনতে তাদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। যখন সত্যি বিপদ আসে, তখন সে বুঝতে পারে না কোনটা আসল বিপদ আর কোনটা নকল বিপদ ।
নতুন মোরাল ৩: অনভিজ্ঞ লোকের কাছে বিপজ্জনক দায়িত্ব দিয়ে বসে না থেকে সারাক্ষণ সেটা মনিটর করতে হয়। কারণ সত্যিকার কোন দুর্ঘটনা ঘটলে রাখালবালকের জীবনতো যাবেই ; কিন্তু প্রভাবশালীদের ভেড়ার পালও বাঘের পেটে যাবে।
নতুন মোরাল ৪: সত্য কথা বললে বাঘের পেটে যেতে হয়। রাখালবালক যতো বার মিথ্যা কথা বলেছিল, ততবার মানুষ তার ডাকে সাড়া দিয়েছে। সে মাত্র একদিন সত্য কথা বলেছিল। সেদিন কেউ তার বিপদে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কাজেই সত্য কথা বলতে হয় না। কৌশলী হতে হয়। মিথ্যা বলতে হয়।
প্রকাশকালঃ ৩০শে মে ২০২০
by Jahid | Jan 13, 2022 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন, লাইফ স্টাইল
কিছুদিন আগে প্রথম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে অক্ষর পরিচয়ে ‘ও’ অক্ষরের জন্য ‘ওড়না চাই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। বছরের শুরুতে প্রাচীন ও প্রগতিশীলদের মধ্যে শুরু হয়েছে বাদানুবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে কোন ইস্যু নিয়ে হৈচৈ দুই-একদিনের বেশী থাকে না। এখন যেহেতু ব্যাপারটা সবাই ভুলে যেতে বসেছে , আমি আমার কর্পোরেট অবজার্ভেশনে ওড়না ও নারীদের কর্ম পরিবেশ নিয়ে দুয়েক কথা বলতেই পারি।
পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই কন্যা-শিশুদেরকে ওড়না ও ওড়না দিয়ে বুক ঢেকে রাখার ব্যাপারটা শেখানো হয়। পুরো ব্যাপারটি নারীর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্ব, তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, ধর্মীয় অনুশাসন ও মা-খালাদের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে হয়ে থাকে। আমাদের অবদমনের পুরুষ শাসিত সমাজে একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ একটা অদ্ভুতুড়ে উপায়ে তৈরি হয় । প্রথমত: যৌনতা ও তার যে কোন আলোচনা আমাদের সমাজে নিষিদ্ধ ও ট্যাবু। আগেও ছিল , এখনো এই মুক্ত অন্তর্জালের সময়েও আছে। দ্বিতীয়ত: নারী-শিশুটি যে নিজের পরিবারের পিতা ও ভাই ছাড়া পৃথিবীর অন্য সকল পুরুষের কাছে অনিরাপদ সেটা মা, খালারা গ্রামের একটি শিশুকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে একদম দেরী করেন না।
একই সঙ্গে গ্রামের একটি ছেলে কীভাবে যেন জেনে ফেলে– অকর্মণ্য , অপদার্থ পুরুষ হলেও, শুধুমাত্র পুরুষ হওয়াও একটা বিশাল সৌভাগ্য ও গুণ। এবং মেয়েটির ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। পুত্রসন্তান প্রসবকারী জননীদের দাম বেশী। ৩/৪ টি কন্যা সন্তানের পর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম অথবা আরেকজন তরুণীকে সম্ভোগ করে পুত্রলাভের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। গ্রামে বিয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের বিচার-মূল্যে সবচেয়ে নির্বোধ, উন্মাদ যাই হোক না কেন, একজন যুবকের জন্য পাত্রী ঠিকই জুটে যায়। অথচ, সচ্ছল পরিবারের মাঝারি চেহারার বা শ্যামলা মেয়েদের পাত্রস্থ করতেও হিমসিম খেতে হয় পুরো পরিবারকে।
কয়েকটি শিক্ষিত সংস্কৃতমনা জেলা ছাড়া বেশিরভাগ জেলা শহরগুলোর সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার জায়গাটা ভীষণভাবেই দুর্বল। না আছে ভালো কোন ক্লাব, না আছে লাইব্রেরি না আছে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা। বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ছেলেরা কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহপাঠী ছিল। এঁদের সঙ্গে চলে বুঝতে পারি ওঁদের কৈশোর আর আমাদের ঢাকা শহরের বেড়ে ওঠা কৈশোরে বড় কোন পার্থক্য নেই। তবে কিছু জেলা শহরে ধর্মের প্রকোপ বেশী, পর্দাপ্রথা বেশী। সেখানে অনেককে শৈশব কৈশোরে বড় একটা অংশে বেড়ে উঠতে হয়ে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্কে একমুখী অজ্ঞানতা নিয়ে। মফঃস্বলে বেড়ে ওঠা আমার এক দুঃসম্পর্কের মামার কথা মনে পড়ছে। তিনি সারাজীবন বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ করে প্রায় নারী বিবর্জিত জীবন যাপন করেছিলেন। বিয়ের পরে নতুন মামীর প্রতিটা চালচলন ও কর্মকাণ্ড তাঁর কাছে বিস্ময়কর মনে হত। একজন অধরা আকাঙ্ক্ষিত নারীও যে খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি আর সবার মতো মল-মূত্র ত্যাগ করে, বায়ু ত্যাগ করে সেটা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল ! নতুন মামীকে নিয়ে তাঁর আদিখ্যেতা ছিল দেখার মতো। প্রায়শ: আমাদের শুনতে হোতো, জানিস আজ তোর মামী এইটা করেছে ! জানিস, আজ তোর মামী সেইটা করেছে। আমরা কিশোর বয়সেই বিরক্ত বোধ করতাম।
আমাদের শহুরে ছেলেদের কৈশোরের দুঃসহতা ছিল। তবুও সংখ্যা গরিষ্ঠরা একটা মানসিক স্থিতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি। মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা, মহল্লার মুরব্বীরা, কো-এডুকেশন অথবা কোচিং লেভেলেই মেয়েদের সংগে চলাফেরা একটা স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। অল্পবিস্তর বিকৃতি যে ছিল না , তাও বলব না।
কিছুদিন আগে আমি, আমার স্ত্রী, আর দশ বছরের কন্যা বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার স্ত্রী হঠাৎ করে মেয়েকে আরো কাছে টেনে নিয়ে ওর পরিধেয় কাপড় ঠিক করে দিল আর আমাকে নিয়ে একটু দুরে গিয়ে দাঁড়াল। আমি একটু অবাক চোখে তাকালে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর পাওয়া গেল না। ফেরার পথে জানালো, আমার ঠিক পিছন থেকে এক মাঝবয়সী বিকৃত পুরুষ নাকি জুলজুল করে কন্যার দিকে তাকিয়ে ছিল! কেউ তাকালে কী করবেন ? আমার সহপাঠিনীরা সেই সময়ে পাবলিক বাসে করে মিরপুর থেকে ইডেন , হোম ইকোনমিকস্ , সিটি কলেজে যাওয়ার সময় তাঁদেরকে কি পরিমাণে বিব্রত হতে হত জানি। বাসে কন্ডাকটর থেকে শুরু করে প্রৌঢ় , যুবক, কিশোর সবার চেষ্টা থাকত তাঁদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর। অনেক সহপাঠিনীই ব্যাগ ও বই দুই হাতে বুকের সামনে চেপে ধরে রাখত। কিন্তু শরীরের অন্য স্পর্শকাতর অংশগুলোতে কারো না কারো অবাঞ্ছিত ,অনিচ্ছাকৃত(!) শারীরিক চাপ পড়তই। আবার এটাও ঠিক , সেই সময়েও অনেক সচেতন পুরুষ এই ব্যাপারটাকে বুঝে আমাদের সহপাঠিনীদেরকে নিরাপদ জায়গায় , মানে ড্রাইভারের বাঁ পাশের সিটে বসার ব্যবস্থা করতেন।
এখন তো অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। উন্মুক্ত-স্থানে বা পাবলিক বাসে একজন স্বাভাবিক পোশাকের তরুণীকেও জুলজুল করে, অশ্লীল বাঁকা চোখে পুরো বাসের পুরুষগুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কয়জনকে বলবেন দৃষ্টি বদলাতে ? ধার্মিকরা ধরেই নিয়েছেন , এর সমাধান বেশী করে বোরখা ও হিজাব পড়া। সেটি করেও যে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না সে উদাহরণ ভুরিভুরি।
আমাদের বাঙালী পুরুষের সামগ্রিক আচরণ কতখানি সভ্য ও শ্লীল হওয়া উচিৎ সেটা পরিবার থেকে, বিদ্যালয় থেকে তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয় নি। ইঁচড়েপাকা বন্ধু, কাজের ছেলে আর পাড়ার ডেঁপো ছেলে কাছ থেকে তার কুশিক্ষা শুরু হয়। এক পর্যায়ে নারীকে যোনি ও স্তনের সমন্বিত একটি ভোগ্যপণ্যের বাইরে কিছুই সে ভাবতে পারে না ! প্রতিটি নারী , সে যে বয়সেরই হোক না কেন তাদের কাছে ভোগ্য ও রমনযোগ্য মনে হয়।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমার দশ বছরে কন্যা শিশুকে বোঝাতে হচ্ছে সে এই সমাজে কোথাও নিরাপদ নয়। তাঁর চারদিকে বসবাস করছে কুৎসিত, বিকৃত ও মুখোশ-ধারী পুরুষ পশু ; এর চেয়ে আফসোসের আর কি হতে পারে।
এবার দেখি আমাদের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে নারীদের সামাজিক অবস্থা কিরকম । একযুগ আগেও ক্যারিয়ার সচেতন মেয়েটিকে স্কুল, কলেজ , ব্যাংক ছাড়া অন্য কোথাও চাকরি করতে দিতে পারিবারিক বাঁধা আসত। এখন কর্পোরেট পরিবেশ অনেক নারীবান্ধব হয়েছে। নানা ধরণের প্রযুক্তির( মোবাইল ফোন ) উৎকর্ষতায় তাঁদের জীবন নিরাপদ। কিন্তু ঠিক উল্টো অবস্থা হয়েছে বাইরের রাস্তায় । অফিসে একটা শৃঙ্খলিত নিয়মনীতির ভিতরে একজন নারী যতোখানি নিরাপদ ; রাস্তা-ঘাটে সে ততোখানি অনিরাপদ।
আমার যে কাজের ক্ষেত্র–মার্কেটিং মার্চেন্ডাইজিং , সেখানে আমরা বহুবার নারী সহকর্মীদের উৎসাহিত করেছি দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার পরিকল্পনার কথা ভাবতে । কিন্তু এখানেও সেই পুরুষ আধিপত্যের প্রচ্ছন্ন বাঁধা।
প্রথমত: পুরুষ কর্মকর্তারা নারীদেরকে তাঁদের নিজেদের বিভাগে নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে নিতে চান না। যুক্তি হিসাবে তারা নারী কর্মচারীদের অফিস টাইমের শেষেই তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার প্রবণতাকে তুলে ধরেন। নারী কর্মচারী হয়তো কাজের চাপে ইচ্ছে করলেই আরো ঘন্টাখানেক থেকে যেতে পারেন অফিসে, কিন্তু বাইরের রাস্তার পরিবেশ ও স্বামী-সন্তানের চাপ , তাঁকে বাড়তি সময়দানে নিরুৎসাহিত করে।
দ্বিতীয়ত: পশ্চিমা দেশের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকসময় সন্ধ্যার পরও অফিসে থাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অথবা ক্রেতা আসলে তাঁদের সঙ্গে রাতের খাবারে উপস্থিত থাকার সৌজন্যতা থাকে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য সব গার্মেন্টস উৎপাদনকারী দেশে সামাজিক অবস্থান ভেদে মার্চেন্ডাইজিং এর পুরো দখল নিয়ে রেখেছেন নারীরা।ব্যতিক্রম আমাদের দেশে। পুরুষ-শাসিত বলেই তাদের প্রাধান্য বেশী। যদিও গার্মেন্টস কারখানায় নারী শ্রমিকের জয়জয়কার।
তৃতীয়ত: একজন পুরুষ সহকর্মীকে দিনের যে কোন সময়ে যে কোন কারখানায় প্রোডাকশন ফলো আপের জন্য পাঠানো যায়। নারী সহকর্মীর জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহন ছাড়া ও দিনের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কারখানায় যাতায়াতের প্রশ্নই ওঠে না।
এছাড়া আরেকটি ভয়ংকর অমানবিক দিক আছে, যেটা আমাদের কর্পোরেট কর্মকর্তারা মুখে উচ্চারণ করেন না। কিন্তু ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ঠিকই বের হয়ে আসে। সেটা হচ্ছে, নারী কর্মচারীদের অন্তঃসত্ত্বা কালীন কর্মবিরতির সময়টি। এটা কেউ বিবেচনা করতে রাজী নয় যে মাতৃত্বের মতো একটা মহৎ বিশাল কর্মযজ্ঞে নারী তাঁর শরীর ক্ষয় করে বংশরক্ষার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। পশ্চিমা দেশে প্রায় বছর খানেকের বেতনসহ মাতৃত্ব কালীন ছুটি ছাড়াও ইচ্ছেমতো বেতন-বিহীন ছুটি প্রযোজ্য। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও ছুটির বিরতির পরে নারী কর্মচারীকে তাঁর আগের অবস্থানে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে কর্পোরেট নারীদের অবস্থান ঠিক তার বিপরীতে। একজন দক্ষ নারী কর্মচারীর বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই, তাঁর নতুন অভিভাবক স্বামী –শ্বশুরকুলের নিত্যনতুন সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। আর তারপরে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় ধরণের ধাক্কা আসে মাতৃত্ব কালীন সময়টিতে। মাতৃত্ব কালীন ছুটিতে যাওয়া মানেই ধরে নেওয়া যায় তাঁর ক্যারিয়ারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেল। একটা বিরতি দিয়ে ফিরে এসে, নারী কর্মচারী তাঁর আগের অবস্থান ফিরে পান না । তাঁকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। তা ছাড়া পারিপার্শ্বিক চাপে তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান হয়ে পড়ে নতুন শিশুটি। এইসব বহুমুখী সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে কর্পোরেট উচ্চপদস্থরা যতোই নারীবান্ধব কথাবার্তা বলেন না কেন ; নিয়োগদানের ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য থাকে পুরুষ কর্মচারীর দিকে।
কর্পোরেট পরিবেশ নিয়ে আমার মতামতের সঙ্গে অনেকের মিলবে না ; কারণ আমার দেখা পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশ যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আছে ; ঠিক তেমনি অনেক খারাপ পরিবেশও আছে। মোটা-দাগে, একটা সময় ছিল কর্পোরেট জগতের মেয়েদেরকে তাঁদের ঊর্ধ্বতনরা ও সহকর্মীরা সহজলভ্য ভাবতেন। মেধাবী ছাত্রীরা শিক্ষকতা করবে ; নিরাপদ পেশা। আর মোটামুটি সুন্দরী মেয়েরা সুপাত্রের গলায় ঝুলে পড়বে। নিজের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে অনেক মেধাবী মেয়েরা বেসরকারি অফিসে কাজ করা শুরু করেছেন গত তিন দশকে। কিন্তু, এখনো নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে নিজের স্বামীর পায়ে দাঁড়ানোকে পরিবার থেকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে থাকে।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা ছেলেদের একটা সুবিধা ছিল, নারী সহকর্মী হেসে কথা বললে আমাদের হাসিমাখা প্রত্যুত্তর ছিল। কিন্তু মফস্বল থেকে আসা অনেকে হাসি মুখে কথা বলাকে প্রেমের প্রাথমিক প্রশ্রয় বলে ধরে নিতেন। এই সমস্যার পাশাপাশি ছিল, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নারী কর্মচারীদেরকে সহজলভ্য ধরে নিতেন। অনেক লোভী ঊর্ধ্বতনকে নারী কর্মচারীকে দৈহিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে অপদস্থ করতে দেখেছি। আমার এক নারী সহকর্মী একবার এক কর্মকর্তার রুম থেকে বের হয়ে যা বললেন, তার সাদা বাংলা দাঁড়ায় –কথা বলার চেয়েও সেই পুরুষ কর্মকর্তার চোখ সারাক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁর বুকের দিকে নয়তো অন্য কোন বাঁকে।
আমাদের সচেতন সাবধানী কর্মকর্তাদের নারী সহকর্মীর সঙ্গে যে কোন আলাপ আলোচনায় সচেতনভাবে তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়। মুশকিল হচ্ছে, সব পুরুষকেই নারী এক চোখে দেখা শুরু করে বলে যে কোন সাক্ষাতেই তাঁর প্রথম কাজটি হয় ওড়না ঠিক করা।
প্রাথমিকভাবে ওড়না মাথায় দেওয়ার ব্যাপারটি হচ্ছে, মুরব্বী শ্রেণির কাউকে দেখে সম্মান দেখানো। এটি কর্পোরেট জগতে নেই। দ্বিতীয়টি আছে। গলায় ওড়না থাকাটা ক্যাজুয়াল মুডের ব্যাপার। কিন্তু সামনে কোন পুরুষ পড়লেই অবচেতন মনেই তাঁর হাত বুকের অংশের ওড়নাটুকু ঠিকঠাক করে নেয়। নারীরা পুরুষ দেখলেই বার বার ওড়না ঠিক কেন করে তা এক কথায় বলা উচিৎ হবে না। এবং সব পুরুষের সামনেই সবাই এমনটা করে , তাও না। চরিত্র ভেদে পুরুষটির আচরণ ও চোখের আবর্তন দেখে নারীটি বুঝে নেয় তাঁকে কি করতে হবে। এটা মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। পাঁচ মিনিটের কথোপকথনে কেউ যদি পনের কুড়িবার ওড়না ঠিক করে ; তাঁর দু’রকম অর্থ হতে পারে। হয়, নারীটি অবচেতনে পুরনো দীর্ঘ অভ্যাসের কারণে অস্বস্তি বোধ করছে পুরুষটির সামনে। অথবা , আসলে সে কি করবে বুঝতে না পেরে বা অস্থিরতা ঢাকতে ওড়না ঠিক করে চলেছে। পাশ্চাত্য তো অবশ্যই ; এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেকগুলো দেশেও ওড়না বাহুল্যপ্রায়। আমাদের জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ওড়না বিলুপ্তির কোন সম্ভাবনা দেখছি না। আরো কয়েক জেনারেশন ওড়না ব্যাপক ও বহুলভাবেই থাকবে।
প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১৭
সাম্প্রতিক মন্তব্য