দুটি দুই দশকের আলাদা গল্প।
শৈশব-কৈশোরের কাহিনী আরেক দশকে এসে কীভাবে মনে প্রশ্ন তোলে, সেটা পড়ার পরেই জানা যাবে।
আশির দশকে মহল্লার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বড়ভাইদের প্রবাসে উপার্জনের জনপ্রিয় একটা গন্তব্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান।
পকেটভর্তি টাকা নিয়ে ফিরে এসে মহল্লার সুন্দরীদের বিয়ে-টিয়ে করে থিতু হতেন।
‘জাপান এই , জাপান সেই’ বলে মুখে ফেনা তুলতেন তারা। জাপানি লোকের সময় সচেতনতা, নিয়মানুবর্তিতা আর মহানুভবতার একই গল্প বারবার শুনতে হতো।
একবার এক বড়ভাই বলেছিলেন, যে এলাকায় তিনি থাকতেন, সেখানকার বেকারির বৃদ্ধা মহিলা মালিকটি সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বেকারিগুলো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফেলে দিতো। বেকারি জাতীয় খাবারের মেয়াদ থাকে ৩/৪ দিন। কিন্তু শীতের সময় ৫/৬ দিনেও তেমন কিছু হয় না। তো সেই বড়ভাইয়ের সঙ্গে বেকারির মহিলার খাতির ছিল, সেগুলো রাতে ফেলে দেওয়ার আগেই তিনি তাকে কিছু নিয়ে নিতে দিতেন।
দুই দশক পরে উত্তরাতে।
সম্ভবত: ২০০৪ সালের দিকেই সুবিখ্যাত একটা মিষ্টির দোকানের শাখা খোলা হলো। আমার তৎকালীন বস রাকিব ভাই, সচরাচর একা চলতে পছন্দ করতেন না। সারাক্ষণ কলিগ ও বন্ধু পরিবেষ্টিত থেকে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে। তো অফিসে নিচে কিছু একটা কিনতে যাচ্ছেন বা আশে পাশে কোথাও যাচ্ছেন। ডেস্কের পাশে এসে বলতেন, ‘ওই মিঞা! চলেন তো একটু নিচে।’ আমার কাজের চাপ কেমন, ব্যস্ত আছি কীনা , সেসবের ধার ধারতেন না।
তো সেই রকম এক বিকেলে তার সঙ্গে নিচে গেছি। আমাদের বিল্ডিং এর পাশের সেই সুবিখ্যাত মিষ্টির দোকান। রাকিব ভাই কারো বাসায় যাবেন সেই উপলক্ষেই।
জীবনে প্রথম ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ টাইপ দোকানের বাইরে করপোরেট একটা দোকানে আমার পদার্পণ।
সুসজ্জিত দোকান, নিয়ন আলোর নিচে প্রাইস ট্যাগে দাম লিখে রাখা মিষ্টি। বসার জন্যে সোফা, হালকা খাবারের জন্যে টেবিল, স্মার্ট সেলসম্যান দেখে আমি তব্দা মেরে গেলাম।
আরো তব্দা খেলাম, যখন মিষ্টির দাম দেখলাম। সব পরিচিত মিষ্টিই। কিন্তু দাম আকাশচুম্বী।
ঐ সময়, মিরপুর ও উত্তরার ভালো মিষ্টির দোকানের দামী মিষ্টির দামও ২০০ টাকা কেজি পার হতো না। মেহমান বুঝে আমরা ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ১৮০ বা ২০০ টাকা কেজির মিষ্টি নিতাম।
সেই চেইনশপে মিষ্টির দামই শুরু হয়েছে ৪০০ টাকা থেকে আর শেষ হয়েছে ৮০০+ টাকায়।
স্মৃতি থেকে লিখছি, দুধের লিটার ১৬ টাকা থেকে ২০ টাকা। চিনির দামও তাই।
মার্চেন্ডাইজার মন আমার মনে-মনে ‘কস্ট প্রাইস’ আর ‘রিটেইল প্রাইসের’ তুলনা করছি।
এক কেজি মিষ্টির দাম কীভাবে ৮০০ টাকা হয় ! আমি মেলাতেই পারছিলাম না।
পাশের সেলস ম্যানেজারকে বললাম, ‘ভাই আপনাদের দোকানের মিষ্টির বিশেষত্ব কি?
উনি একাধারে ব্র্যান্ডিং করা শুরু করলেন,এই অভিজাত মিষ্টির দোকানের হেড অফিস কানাডায়, শাখা আছে সেখানেও। সবচেয়ে ভালো পরীক্ষিত দুধ, উন্নত চিনি ব্যবহার করা হয়, কর্ম-পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট, ইত্যাদি ইত্যাদি।’
আমি মিনমিন করে বললাম, ‘তারপরেও ভাই এতো দাম কেমন করে হয়?’
উনি আমাকে শেষ তথ্যটি দিয়ে কুপোকাত করে দিলেন। বললেন, ‘আমাদের মিষ্টির এক্সপায়ার ডেট আছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হলে আমার সেই মিষ্টি ফেলে দিই।’
আমি তার এই তথ্যে কুপোকাত না হয়ে উল্টো প্রশ্ন করলাম, ‘ভাই, মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি কোথায় ফেলেন?’
পাশ থেকে রাকিব ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরেহ মিঞা, আপনি সারাজীবন বাঁইক্যাই থাইকা গেলেন!’
প্রথম প্রকাশঃ ২০শে ফেব্রুয়ারি ,২০২৬