বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ। সুবোধ সরকার ॥

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও গ্রামীণ অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা। আপনারা আমাকে বলেন, যে একটা ছেলে, আজকেও যদি মাধ‍্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পেরোয় , কিংবা মফস্বলের অর্থহীন কোন বিশ্ববিদ‍্যালয় কলেজ থেকে ততোধিক অর্থহীন কোন বিষয়ে স্নাতক করে—জেলা শহরে বা পরিত্যক্ত ঢাকা নামের শহরে আসা ছাড়া তার কর্মসংস্থান কোথায়?
সামাজিক ট‍্যাবু ইশকুলে পড়াশোনা করলে আরো তীব্র হয়। একটা টেবিল-চেয়ারের অশ্লীল চাকরির জন‍্যে তাকে হন‍্যে হতে হয়!
এতো এতো উন্নয়নের ঢাকঢোল আর ইতিহাস, সংবিধানের সংস্কার কী কাজেই বা লাগে, যদি ন‍্যূনতম কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র করতে না পারে !
চলুন বরং প্রাসঙ্গিক একটা কবিতা পড়ি।

“বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ।
সুবোধ সরকার ॥ “
রূপমকে একটা চাকরি দিন– এম-এ পাস, বাবা নেই
আছে প্রেমিকা সে আর দু-এক মাস দেখবে, তারপর
নদীর এপার থেকে ওপারে গিয়ে বলবে , রূপম,
আজ চলি
তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন।
রূপমকে একটা চাকরি দিন, যেন কোন কাজ
পিওনের কাজ হলেও চলবে।
তমাল বাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে
যারা কথা বলেন
তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় ।
তমালবাবু মামাকে বললেন , রূপমের একটা চাকরি দরকার।
মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে ,
জ্যাঠা বললেন
বাতাসকে ।
মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে
প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে , সে বলল দক্ষিণের অরণ্যকে
অরণ্য বলল আগুনকে , আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে
আলিমুদ্দিন ছুটলো নদীকে বলার জন্য,
নদী এসে আছড়ে পড়ল
উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল ;
রূপমকে একটা চাকরি দাও , এম-এ পাস করে বসে আছে
ছেলেটা
কয়েকমাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়ি ফিরছিলাম সন্ধেবেলায়
গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম
জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি
সারাগায়ে ঘাস, খড়কুটো, হাতের মুঠোয়
ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন ।
পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম?
ভারত সরকারের এক টাকার কয়েনের দিকে আমার চোখ
সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর
এম-এ পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয়
সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে।
একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম-এ পড়ান , কোন আহ্লাদে
আটখানা
বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন ? তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের
ফোন বেজে উঠল,ফোন বেজে চলল,
ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে , আরো কুড়ি বছর
বাজবে।
বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে
নদী উপকূল থেকে উপকূলে আছড়ে পড়ে বলল:
রূপমকে একটা চাকরি দিন।
কে রূপম ?
রূপম আচার্য , বয়স ২৬, এম-এ পাস
বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে।

২রা আগস্ট, ২০২৫

ট্রেডের মুরব্বীদের প্রেডিকশন মেনে নেবেন কীনা

কয়েকদিন আগে ক্লাস নিতে গিয়ে একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম।
ট্রেডের সিনিয়র হিসাবে অনুজ একজন শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা, ‘স্যার আমাদের অর্থনীতি আর গার্মেন্টস টেক্সটাইলের ব্যাপারে আপনার প্রেডিকশন কি?’

আমি বললাম, আমার প্রেডিকশনের কোন মূল্য আছে কী?

আমাদের রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী মন্ত্রী, নেতা, থেকে শুরু করে আমাদের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা ঝাল-টক শোর বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা নানা ধরণের প্রেডিকশন করছেন এবং তাঁরা সম্ভবত: সেটা দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা অথবা পরের মুখে ঝাল খেয়েই করছেন। অনেকসময় নিজেদের নিকট অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করে করছেন।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, কীভাবে যেন আমি টের পেয়ে গেছি—পৃথিবী আসলে চালাচ্ছে গুটি কয়েক অসম্ভব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজির মালিকেরা।

তাদেরকে বললাম, ধরেন ফেব্রুয়ারির এক সকালে কফি খেতে খেতে ভ্লাদিমির পুতিন সাহেবের মনে হল, নাহ্ ইউক্রেন আর ন্যাটোর বাড়াবাড়ি আর তো সহ্য হচ্ছে না। এর একটা বিহিত করা দরকার। সে আক্রমণ করে বসল ইউক্রেন।

একজন লোকের একটা সিদ্ধান্ত।
কিন্তু গোটা পৃথিবীর বাকী ৮০০ কোটি লোকের নাভিশ্বাস !

আবার একইভাবে ধরেন, চায়নার RMB (রিনমিনবি) কারেন্সি ইউএস ডলারের বিপরীতে ৬ থেকে ৬.৭৫ এর মধ্যে আছে বহুদিন ধরে। এটা পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে একটা সাম্য রেখে চলছে। চীনের মুদ্রানীতি ও সাপ্লাই চেনের উপর সারাবিশ্ব নির্ভরশীল হয়ে আছে।

কোন এক সকালে চীনের সকল ক্ষমতার অধিকারী জনাব প্রেসিডেন্ট শি জিন-পিং সাহেবের কফি খেতে খেতে মনে হতে পারে, চীনের মুদ্রা রফতানির স্বার্থে অবমূল্যায়ন করলে ভালো হয়। তিনি আদেশ দিয়ে বসলেন, কাল থেকে রিনমিনবি ৮ বা ৯ অথবা আরো বেশি হবে ইউএস ডলারের বিপরীতে।

দেখেন, একজন লোকের একক সিদ্ধান্তে পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে কী যে একটা হুলুস্থুল লেগে যেতে পারে। কেউ চিন্তাও করতে পারবে না কী দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে তৃতীয় বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ , যদি চীন তাঁর মুদ্রা হুট করে অবমূল্যায়ন করে।

আমাদের আপাত চেনা অথচ অচেনা পৃথিবী একটা জটিল দুর্বোধ্য নিয়মে চলে। কখন কোন্ রাষ্ট্রের কোন্ সিদ্ধান্তে আমাদের মতো ‘গরীবের বউ সবার ভাবীর’ কী যে দুর্যোগ নেমে আসবে তা কে জানে !

সুতরাং বড় বড় হরিদাস পালেরাও অনেক কথাই বলবে , সেটা শুনবেন , প্রচুর পড়াশোনা করবেন , কিন্তু যে কোন একজনের প্রেডিকশন নিজের ভিতরে নেবেন না। জানেন তো, Economist is someone who can explain why the things they predicted yesterday didn’t happen today ! অথবা An Economist is an expert who will know tomorrow why the things he predicted yesterday didn’t happen today!

অনুজ ছাত্ররা আমার অজ্ঞতা ঠিকই ধরতে পারলো বোধ করি।
কিন্তু মুরব্বী বলে আমাকে আর বিব্রত করলো না।

প্রথম প্রকাশ: ৩০শে জুলাই,২০২২

ফেসবুক মানে মোড়ের আড্ডা

ইদানীং ফেসবুক আমার কাছে মোড়ের আড্ডা, আবার ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তিগত দিনলিপির মতো মনে হচ্ছে ! অন্তত আমার শেষ কয়েক মাসের অ্যাক্টিভিটি দেখে নিজের কাছে তাই মনে হল। সময়ের সাথে আমার মতামত বদলে যেতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক !

ভার্চুয়াল জগতের কিছু বন্ধুদের নতুন পোস্ট দেখতে না পারলে একটা ব্যাকুলতা কাজ করে। যেমনটা ছিল , অনেক আগের নিয়ম করে সকাল বিকাল আড্ডা দেওয়ার মতো। একবেলা আড্ডা না দিতে পারলে তৃষ্ণার্ত থাকতাম।

এখন এই আড্ডা ও দিনলিপির ফেসবুকের মাঝখান থেকে আপনি সিরিয়াস কিছু খুঁজে পেয়ে আমার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সেটা আপনার নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার। ভাইরে , আমি আমার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না, আর আপনি আমার দুইটা অনিয়মিত পোস্ট পইড়া নিয়ে ফেললেন ! সুতরাং আপনার সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব নিতান্তই আপনার ও আপনাদের , আমি কোন দায় বোধ করছি না।

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

মেক্সিকান ডায়েট

এক মহিলা ক্রেতার সঙ্গে সারাদিন এই অফিস সেই অফিস করতেছি । গাড়ী চালাতে চালাতেই সকাল থেকে সে ঘণ্টা খানেক পরে একবার একটা আপেল খায়, আবার কয়েকটা বাদাম খায় , একটা দই খায়। জিগাইলাম , ‘সকালের নাস্তা করো নাই, ঘনঘন খাচ্ছো, কাহিনী কি? সে যা বললো, ডাক্তারের ডায়েট মতো চলে , গত তিন সপ্তাহে তার তিন কেজি ওজন কমছে। ঘনঘন খাচ্ছে কিন্তু কমকম খাচ্ছে।
কাজ করতে করতে বেলা দুইটা। এক ট্র্যাডিশনাল মেক্সিকান রেস্তোরায় যেয়ে খাবার খেতে খেতে বেলা আড়াইটা। আমিতো ক্ষুধায় মরি। সুস্বাদু সব খাওয়া আসার পরে সেই ডায়েট করা ক্রেতা যেমনে হাপুস হুপুস করে খাওয়া শুরু করলো, তাঁর সারাদিনের ডায়েটের কথা চিন্তা করে আমি হাসি থামাইতে পারি না। খাওয়া দাওয়া শেষে টেবিল থেকে উঠতে মন চায় না। হেভীওয়েট খাওয়া ও তারপরে আছে টাইমজোনের কারণে ভ্রমণক্লান্তি। মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই।

আড়মোড়া ভেঙ্গে গাড়ী চালিয়ে অফিসের দিকে আসতে আসতে সে বললো, যদি একটা আলাদীনের জিনি পাওয়া যেতো, তাইলে একটা বর চেয়ে নিতাম। খাবো কিন্তু মোটা হবো না।

ওজন নিয়ে এই বিব্রত অবস্থা দেখি সব জায়গায় আছে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

মূদ্রার অপর পিঠ, বৈপিরিত্য

হাসিখুশি চরিত্রের বা একটু হৈহৈ-রৈরৈ বলে সর্বশ্রেণীর বড়ভাইদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ যাতায়াত বা প্রশ্রয় আছে ! এবং আমি সেটা উপভোগও করি। কিছুদিন আগে আমার ট্রেডের কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বড়ভাইদের সাথে দেখা হলো একটা পারিবারিক ডিনারে। যথারীতি উত্তরা থেকে মিরপুরে এসে আবার উত্তরাতে বউকে নিয়ে যাওয়ার সুবিখ্যাত আলস্যে দাওয়াতে আমি একা। ভাবীদের সাথে এক বড়ভাই পরিচয় করিতে দিয়ে বললেন ‘ এরে চিনছো? এইটাই জাহিদ ! ওই যে ফেসবুকে লেখালেখি করে।’

সে খাইতে খাইতে আরো বললো, আমার লেখা তাঁরা পড়েন কারণ , তাঁদের মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার। কেন দরকার জানিনা, মনে হলো- সারাক্ষণ নানা ইসলামী অনুশাসন ও চিন্তার মাঝখানে,আমার কিছু পোস্টে হয়তো একটু খোলা-হাওয়া পান! নাকি অনৈসলামিক চিন্তাকারী কাউকে দেখে করুণা অনুভব করেন , কে জানে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০২৩

করপোরেট অবজারভেশন অথবা নিছক বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কিছু কথা

তৃতীয় বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। গত বিশ বছর ধরে BGMEA-এর চলতি ও হবু নেতাদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়েছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটা এখানে বলে ফেলাটা মন্দ হবে না। তাঁদেরকে ‘হবু নেতা’ বলছি এই কারণে ; নির্বাচনের আগে অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও নির্বাচনের পরে সেই সব শিল্পপতি উদ্যোক্তা বড়ভাইদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁরা বাংলাদেশের চিরাচরিত নির্বাচন পরবর্তী নিয়ম মেনে চলেছেন !

প্রথমত: নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পরে আমাদের গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানাগুলোর নিজস্ব র‍্যাঙ্কিং থাকা উচিৎ ছিল ! বছর বিশেক আগেই আমার মতো শিক্ষানবিশের কাছেও মনে হয়েছিল– কারখানার রেটিং অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। রেটিং নেই বলেই আমাদের মধ্যে সুষম ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। এবং তার পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন নানা প্রান্তের নানা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা। BGMEA নিজেই র‍্যাঙ্কিং করতে পারত। কারখানার এই রেটিং আমাদের দেশের নিরপেক্ষ কারো মাধ্যমেই হতে পারত। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে।

আফসোস! সেই র‍্যাঙ্কিং অবশেষে হল, তবে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার পরে। ACCORD ও ALLIANCE নামের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ঘাড় ধরিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করিয়ে নিল। নিজেদের মতো করে তাঁরা রেটিং করে দিল। ফাঁকতালে ফায়ার-ডোর থেকে শুরু করে আরো কিছু পণ্যের মধ্যসত্ত্বভোগী কোম্পানিগুলো নমিনেশন নিয়ে দু’ পয়সা কামিয়ে নিল।

বছর দশেক আগেও দেখেছি গাজীপুরের কোন কারখানা যখন সবরকম নিয়মকানুন ও কমপ্লায়েন্স মেনে একটা প্রিন্টেড কটন টি-শার্টের দাম দিয়েছে $ ২.০০~ $ ৩.০০ সেখানে রামপুরা , বাড্ডা, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ বা অন্যকোন দুর্গম এলাকার ২/৩ লাইনের একটা কারখানা অথবা ‘হল-মার্কস’-এর মতো লুটের টাকার কারখানা দাম দিয়েছে $ ১.৫০ বা আরো কম। সাদা চামড়ার ক্রেতাদের এর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই কুখ্যাত ‘টেন্ডারবাজি’ । ও এতো দিয়েছে , তোমাকেও এতো দিতে হবে ! সবচেয়ে ভালো নামকরা ট্রেডিং এজেন্ট ও ভালো কারখানাগুলোকে এরা অসহনীয় টার্গেট মূল্য মেলাতে ও গেলাতে বাধ্য করত। এখনো করছে , এবং সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই আমাদের পথচলা।

আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভারত, চীনে এলাকাভিত্তিক পণ্য তৈরির সর্বনিম্ন মূল্য-তালিকা আছে। কারখানার ও এলাকাভিত্তিক রেটিং আছে বহু আগে থেকেই। ক্রেতা যে কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে কোন একটা দাম কোন একটা দাম চেয়ে বসলেন সেই সম্ভাবনা কম। আমাদেরও কারখানার রেটিং হল অবশেষে তবে অন্যের হাত দিয়ে। নিজের রান্নাঘর আর বাসস্থানকে বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট নিতে হল যে, আমাদের রান্নাঘরও ঠিক আছে, আমাদের বসবাসের জায়গাও ঠিক আছে !

দ্বিতীয়ত: BGMEA নেতাদের কাউকে কাউকে ফাঁকে ফোকরে বলার চেষ্টা করেছি, এতো কিছু করছেন, শ্রমিকদের ডাটাবেজ করছেন না কেন? আজকে একজন দাগী আসামী কোন একটা কারখানার সর্বনাশ করে আরেক এলাকার আরেক কারখানায় যোগ দিচ্ছে। কোনভাবেই তাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। সে গিয়ে অন্য এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। ডাটাবেজ থাকলে, নির্দিষ্ট শ্রমিক কত বেতনে শেষ চাকরিটি করেছে, ও কোন স্কেলের ও দক্ষতার সেটার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ডিজিটাল ডাটাবেজ অবশেষে শুরু হয়েছে বছর দুয়েক আগে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেটা থমকে আছে।

উপরের দুইটি বিষয় কেন হচ্ছে না– সেই ব্যাপারে আমার নিজের মত করে নিজস্ব মতামত আছে। আমরা নিজেরা নিজেদের কারখানাগুলোর রেটিং করিনি এতোদিন– সেটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আলস্য, দুর্নীতি , অতিলোভী, মুনাফাখোর মানসিকতা আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে নিজেদের মূল্যায়ন করতে দেয় নি।

আর শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি কারণ, কোন কোন মালিকেরা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি প্রতিবছরে এমন জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছেন, তাঁদের দরকার ছিল ‘তৈরি শ্রমিক’। সেটা একভাবেই সম্ভব ! পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে তৈরি শ্রমিককে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। দেড়গুণ বা দ্বিগুণ বেতন দিয়েও অনেক কারখানা অন্যদের শ্রমিক সরিয়েছেন। এখন সঠিক ডাটাবেজ হলে এটা ঠিক এইভাবে সম্ভব হতো না। নিজেদের স্বার্থেই হয়তো শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি এতোদিন।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পণ্যকে , বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য সরকারি লোকের উপরে ভরসা করে থাকলে, ‘সে গুড়ে বালি’। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে, লবি দিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় কিছু এক্সপোজিশন হয়, যেটাকে মেলা বলা যেতে পারে; ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা। ওইরকম কয়েকটি মেলায় যেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বুথ বা সেবা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যে মেধার লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছি ; মনে হয়েছে তার চেয়ে এঁদের না আসাই ভালো ছিল। স্বজনপ্রীতি দিয়ে গুচ্ছের সরকারি লোককে এই সব সফরে পাঠিয়ে কাজের চেয়ে দুর্নামই বেশি হয়েছে । অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্যতিক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার এখনো হয় নি।

চারিদিকে হতাশার কথা বলার মানুষের অভাব নেই ; আশাবাদের কথা বলার লোকের বড্ডো অভাব।নিজেদের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে, অন্য কেউ বাজিয়ে দেবে না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মালিকপক্ষ বুঝবেন ততই আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রেডের জন্য ভালো।

প্রথম প্রকাশ: ১৮ই মে, ২০১৭
[ উল্লেখ্য, এই লেখা যখন লিখেছি, তখনও বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি সেভাবে শুরু হয়নি, এখন আমাদের ৩০০ এর অধিক পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানা আছে। ]