ফেসবুক মানে মোড়ের আড্ডা

ইদানীং ফেসবুক আমার কাছে মোড়ের আড্ডা, আবার ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তিগত দিনলিপির মতো মনে হচ্ছে ! অন্তত আমার শেষ কয়েক মাসের অ্যাক্টিভিটি দেখে নিজের কাছে তাই মনে হল। সময়ের সাথে আমার মতামত বদলে যেতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক !

ভার্চুয়াল জগতের কিছু বন্ধুদের নতুন পোস্ট দেখতে না পারলে একটা ব্যাকুলতা কাজ করে। যেমনটা ছিল , অনেক আগের নিয়ম করে সকাল বিকাল আড্ডা দেওয়ার মতো। একবেলা আড্ডা না দিতে পারলে তৃষ্ণার্ত থাকতাম।

এখন এই আড্ডা ও দিনলিপির ফেসবুকের মাঝখান থেকে আপনি সিরিয়াস কিছু খুঁজে পেয়ে আমার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সেটা আপনার নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার। ভাইরে , আমি আমার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না, আর আপনি আমার দুইটা অনিয়মিত পোস্ট পইড়া নিয়ে ফেললেন ! সুতরাং আপনার সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব নিতান্তই আপনার ও আপনাদের , আমি কোন দায় বোধ করছি না।

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

মেক্সিকান ডায়েট

এক মহিলা ক্রেতার সঙ্গে সারাদিন এই অফিস সেই অফিস করতেছি । গাড়ী চালাতে চালাতেই সকাল থেকে সে ঘণ্টা খানেক পরে একবার একটা আপেল খায়, আবার কয়েকটা বাদাম খায় , একটা দই খায়। জিগাইলাম , ‘সকালের নাস্তা করো নাই, ঘনঘন খাচ্ছো, কাহিনী কি? সে যা বললো, ডাক্তারের ডায়েট মতো চলে , গত তিন সপ্তাহে তার তিন কেজি ওজন কমছে। ঘনঘন খাচ্ছে কিন্তু কমকম খাচ্ছে।
কাজ করতে করতে বেলা দুইটা। এক ট্র্যাডিশনাল মেক্সিকান রেস্তোরায় যেয়ে খাবার খেতে খেতে বেলা আড়াইটা। আমিতো ক্ষুধায় মরি। সুস্বাদু সব খাওয়া আসার পরে সেই ডায়েট করা ক্রেতা যেমনে হাপুস হুপুস করে খাওয়া শুরু করলো, তাঁর সারাদিনের ডায়েটের কথা চিন্তা করে আমি হাসি থামাইতে পারি না। খাওয়া দাওয়া শেষে টেবিল থেকে উঠতে মন চায় না। হেভীওয়েট খাওয়া ও তারপরে আছে টাইমজোনের কারণে ভ্রমণক্লান্তি। মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই।

আড়মোড়া ভেঙ্গে গাড়ী চালিয়ে অফিসের দিকে আসতে আসতে সে বললো, যদি একটা আলাদীনের জিনি পাওয়া যেতো, তাইলে একটা বর চেয়ে নিতাম। খাবো কিন্তু মোটা হবো না।

ওজন নিয়ে এই বিব্রত অবস্থা দেখি সব জায়গায় আছে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

মূদ্রার অপর পিঠ, বৈপিরিত্য

হাসিখুশি চরিত্রের বা একটু হৈহৈ-রৈরৈ বলে সর্বশ্রেণীর বড়ভাইদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ যাতায়াত বা প্রশ্রয় আছে ! এবং আমি সেটা উপভোগও করি। কিছুদিন আগে আমার ট্রেডের কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বড়ভাইদের সাথে দেখা হলো একটা পারিবারিক ডিনারে। যথারীতি উত্তরা থেকে মিরপুরে এসে আবার উত্তরাতে বউকে নিয়ে যাওয়ার সুবিখ্যাত আলস্যে দাওয়াতে আমি একা। ভাবীদের সাথে এক বড়ভাই পরিচয় করিতে দিয়ে বললেন ‘ এরে চিনছো? এইটাই জাহিদ ! ওই যে ফেসবুকে লেখালেখি করে।’

সে খাইতে খাইতে আরো বললো, আমার লেখা তাঁরা পড়েন কারণ , তাঁদের মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার। কেন দরকার জানিনা, মনে হলো- সারাক্ষণ নানা ইসলামী অনুশাসন ও চিন্তার মাঝখানে,আমার কিছু পোস্টে হয়তো একটু খোলা-হাওয়া পান! নাকি অনৈসলামিক চিন্তাকারী কাউকে দেখে করুণা অনুভব করেন , কে জানে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০২৩

করপোরেট অবজারভেশন অথবা নিছক বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কিছু কথা

তৃতীয় বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। গত বিশ বছর ধরে BGMEA-এর চলতি ও হবু নেতাদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়েছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটা এখানে বলে ফেলাটা মন্দ হবে না। তাঁদেরকে ‘হবু নেতা’ বলছি এই কারণে ; নির্বাচনের আগে অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও নির্বাচনের পরে সেই সব শিল্পপতি উদ্যোক্তা বড়ভাইদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁরা বাংলাদেশের চিরাচরিত নির্বাচন পরবর্তী নিয়ম মেনে চলেছেন !

প্রথমত: নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পরে আমাদের গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানাগুলোর নিজস্ব র‍্যাঙ্কিং থাকা উচিৎ ছিল ! বছর বিশেক আগেই আমার মতো শিক্ষানবিশের কাছেও মনে হয়েছিল– কারখানার রেটিং অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। রেটিং নেই বলেই আমাদের মধ্যে সুষম ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। এবং তার পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন নানা প্রান্তের নানা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা। BGMEA নিজেই র‍্যাঙ্কিং করতে পারত। কারখানার এই রেটিং আমাদের দেশের নিরপেক্ষ কারো মাধ্যমেই হতে পারত। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে।

আফসোস! সেই র‍্যাঙ্কিং অবশেষে হল, তবে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার পরে। ACCORD ও ALLIANCE নামের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ঘাড় ধরিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করিয়ে নিল। নিজেদের মতো করে তাঁরা রেটিং করে দিল। ফাঁকতালে ফায়ার-ডোর থেকে শুরু করে আরো কিছু পণ্যের মধ্যসত্ত্বভোগী কোম্পানিগুলো নমিনেশন নিয়ে দু’ পয়সা কামিয়ে নিল।

বছর দশেক আগেও দেখেছি গাজীপুরের কোন কারখানা যখন সবরকম নিয়মকানুন ও কমপ্লায়েন্স মেনে একটা প্রিন্টেড কটন টি-শার্টের দাম দিয়েছে $ ২.০০~ $ ৩.০০ সেখানে রামপুরা , বাড্ডা, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ বা অন্যকোন দুর্গম এলাকার ২/৩ লাইনের একটা কারখানা অথবা ‘হল-মার্কস’-এর মতো লুটের টাকার কারখানা দাম দিয়েছে $ ১.৫০ বা আরো কম। সাদা চামড়ার ক্রেতাদের এর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই কুখ্যাত ‘টেন্ডারবাজি’ । ও এতো দিয়েছে , তোমাকেও এতো দিতে হবে ! সবচেয়ে ভালো নামকরা ট্রেডিং এজেন্ট ও ভালো কারখানাগুলোকে এরা অসহনীয় টার্গেট মূল্য মেলাতে ও গেলাতে বাধ্য করত। এখনো করছে , এবং সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই আমাদের পথচলা।

আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভারত, চীনে এলাকাভিত্তিক পণ্য তৈরির সর্বনিম্ন মূল্য-তালিকা আছে। কারখানার ও এলাকাভিত্তিক রেটিং আছে বহু আগে থেকেই। ক্রেতা যে কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে কোন একটা দাম কোন একটা দাম চেয়ে বসলেন সেই সম্ভাবনা কম। আমাদেরও কারখানার রেটিং হল অবশেষে তবে অন্যের হাত দিয়ে। নিজের রান্নাঘর আর বাসস্থানকে বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট নিতে হল যে, আমাদের রান্নাঘরও ঠিক আছে, আমাদের বসবাসের জায়গাও ঠিক আছে !

দ্বিতীয়ত: BGMEA নেতাদের কাউকে কাউকে ফাঁকে ফোকরে বলার চেষ্টা করেছি, এতো কিছু করছেন, শ্রমিকদের ডাটাবেজ করছেন না কেন? আজকে একজন দাগী আসামী কোন একটা কারখানার সর্বনাশ করে আরেক এলাকার আরেক কারখানায় যোগ দিচ্ছে। কোনভাবেই তাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। সে গিয়ে অন্য এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। ডাটাবেজ থাকলে, নির্দিষ্ট শ্রমিক কত বেতনে শেষ চাকরিটি করেছে, ও কোন স্কেলের ও দক্ষতার সেটার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ডিজিটাল ডাটাবেজ অবশেষে শুরু হয়েছে বছর দুয়েক আগে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেটা থমকে আছে।

উপরের দুইটি বিষয় কেন হচ্ছে না– সেই ব্যাপারে আমার নিজের মত করে নিজস্ব মতামত আছে। আমরা নিজেরা নিজেদের কারখানাগুলোর রেটিং করিনি এতোদিন– সেটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আলস্য, দুর্নীতি , অতিলোভী, মুনাফাখোর মানসিকতা আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে নিজেদের মূল্যায়ন করতে দেয় নি।

আর শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি কারণ, কোন কোন মালিকেরা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি প্রতিবছরে এমন জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছেন, তাঁদের দরকার ছিল ‘তৈরি শ্রমিক’। সেটা একভাবেই সম্ভব ! পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে তৈরি শ্রমিককে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। দেড়গুণ বা দ্বিগুণ বেতন দিয়েও অনেক কারখানা অন্যদের শ্রমিক সরিয়েছেন। এখন সঠিক ডাটাবেজ হলে এটা ঠিক এইভাবে সম্ভব হতো না। নিজেদের স্বার্থেই হয়তো শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি এতোদিন।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পণ্যকে , বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য সরকারি লোকের উপরে ভরসা করে থাকলে, ‘সে গুড়ে বালি’। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে, লবি দিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় কিছু এক্সপোজিশন হয়, যেটাকে মেলা বলা যেতে পারে; ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা। ওইরকম কয়েকটি মেলায় যেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বুথ বা সেবা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যে মেধার লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছি ; মনে হয়েছে তার চেয়ে এঁদের না আসাই ভালো ছিল। স্বজনপ্রীতি দিয়ে গুচ্ছের সরকারি লোককে এই সব সফরে পাঠিয়ে কাজের চেয়ে দুর্নামই বেশি হয়েছে । অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্যতিক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার এখনো হয় নি।

চারিদিকে হতাশার কথা বলার মানুষের অভাব নেই ; আশাবাদের কথা বলার লোকের বড্ডো অভাব।নিজেদের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে, অন্য কেউ বাজিয়ে দেবে না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মালিকপক্ষ বুঝবেন ততই আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রেডের জন্য ভালো।

প্রথম প্রকাশ: ১৮ই মে, ২০১৭
[ উল্লেখ্য, এই লেখা যখন লিখেছি, তখনও বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি সেভাবে শুরু হয়নি, এখন আমাদের ৩০০ এর অধিক পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানা আছে। ]

উপলব্ধি: ৪৮

‘There is no set rule.’
পরিস্থিতি, ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, যুগ ও প্রযুক্তির প্রভাবে যে কোন একটা নিয়ম ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রযোজ্য নয় অর্থাৎ একইভাবে কাজ করে না। এই সহজ ব্যাপারটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেউ বুঝে ফেলে, আবার ঠিক বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেউ ‘একই নিয়ম সব জায়গায় চলবে’ – এই ব্যাপারে ভয়ঙ্কর মৌলবাদী হয়ে পড়ে।

নিয়মের ব্যত্যয়, সংস্করণ, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন মেনে নেওয়ার ব্যাপারে উদার পন্থা কাম্য। একটি পরিবার যে নিয়মে চলে, পাশের বাসার পরিবার কিছুটা পরিবর্তিত রূপে চলে। এক অফিসে যে নিয়মে চলে, হুবহু একই ধরণের পাশের অফিসটিতে সেই নিয়ম চলে না। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও বহুবিধ তন্ত্র একেক সমাজে, রাষ্ট্রে একেক রূপ ধারণ করে।
অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মাচার, জাগতিক সকল আচার ও নিয়ম স্থান-কাল-ভেদে পরিবর্তিত হয়।

উপলব্ধি: ৪৭

সামান্যতম সুযোগ থাকলেও , যে কোন অস্পষ্টতায়, অজ্ঞতায় প্রশ্ন করুন, জিজ্ঞেস করুন। যাকে জিজ্ঞেস করছেন সে আপনার সহকর্মী হতে পারে, আপনার অধস্তন হতে পারে। আপনার অজ্ঞতায় সে হয়তো আপনাকে সাময়িক নির্বোধ ভাবতে পারে। কিন্তু একবার বোকা হয়ে আপনি সারাজীবনের জন্য কিছু একটা শিখে গেলেন। আর যদি না জিজ্ঞেস করেন তবে সারাজীবনের জন্য বোকাই রয়ে গেলেন। সামান্য সময়ের জন্যে বোকা হওয়া সারাজীবনের জন্য বোকা হয়ে থাকার চেয়ে ভাল।