বন্ধু দিবসে

বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হয়তো পরিবর্তিত হয় না ; মহাকালের স্রোতে বন্ধুত্বের এলাকা বাড়ে কমে, পরিমাপের মাপকাঠি বদলায়। মিরপুর বাংলা স্কুলের প্রথম দিনে পল্লবের সাথে বসার জায়গা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি। অতঃপর বন্ধুত্ব। যোগাযোগ নেই বছর কুড়ি। মঞ্জুরুল হাসান তুহিন ও শহীদ মোক্তারের সাথে দেখা, পরে তীব্র বন্ধুত্ব।স্কুল বদলে ক্লাস সিক্সে বাংলা স্কুলে আসলেও এরা আমাকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিলো।শাহীন, শামীম, জিল্লুর( রুবেল), শফিক, মিজান, টোটা, হাবিব , রিয়াদ,লাবু, সুমন( হায়দারের বড়ি), মাসুদ, রোল ৫ স্বপন , ফটকা স্বপন, ধলা স্বপন,পপুলার লাইব্রেরী সোহেল, সাইকেল সোহেল , মনা, জাহাঙ্গীর, সাইফুল আজম, জহির, পারভেজ( আর্মি) , কালা পারভেজ, তন্ময়, বাবু, ইলিয়াস, গলাছিলা মিঠু, কাইল্ল্যা মিঠু, সালাহউদ্দিন জুয়েল, নিজাম, স্বপন-সজল( দুইভাই) আরো কতো ! জাকির ছিল ফার্স্ট বয়,ওর সাথে আমার ছিল সম্মানজনক নিরাপদ দূরত্ব ! আশে পাশের স্কুলের আদমজীর ঝুলন, মনিপুরের মাহিনদের সাথে কলেজে ওঠার আগেপিছে পরিচয় । মহল্লা আলাদা হিসাব, আগের দুই ব্যাচ পর্যন্ত সিনিয়র জুনিয়র ছিলনা। আগের ব্যাচগুলোর কমল, সুমন, লিটু, এজাজ, চাইনিজ জুয়েল যেমন ছিল ; পরের ব্যাচের জিন্নাহ, আরেফিনরাও ছিল। কোনদিন যদি অটোবায়োগ্রাফি লিখি আমার জীবনের একটা বড়ো সৌন্দর্য ও বেড়ে ওঠার গল্প এদের সঙ্গে।
ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের খুব খুব সামান্য সময়ে আসলে সেভাবে বন্ধুত্বের শিকড় গজায় না। স্বল্প পরিসরে আদমজীর আনোয়ার হক শুভ, মনিপুরের কয়েকজন, গভঃ ল্যাব সেন্ট জোসেফের কয়েকজন, এছাড়া বিভিন্ন ক্যাডেট ও জেলা স্কুলের ভয়ংকর মেধাবীরা। এদের সাথে একদম যোগাযোগ নেই , হবেও না মনে হচ্ছে।
পরে ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা ফ্যাকাল্টি মাইগ্রেট (পরিসংখ্যান , রসায়ন ও ফলিত রসায়ন ) করতে করতে ইয়ার লস করে টেক্সটাইলে। এখানে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো আবারো, সেই স্কুল জীবনের মতো।
ওপেক্সের নতুন কর্মজীবনে আরো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাওয়া। টেক্স-ইবোতে এসে আবারো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকা বাড়লো।
আমার সবসময়ের অন্তর্মুখিতা, আলসেমি ঔদাসিন্যে কারো সাথে যোগাযোগ করিনা । কিন্তু, আমার বন্ধুভাগ্য আসলেই ঈর্ষণীয়। এঁরা কেমন করে যেন জেনে ফেলেছিল জাহিদ/জুয়েল ছেলেটা এরকমই।তারাই সারাক্ষণ আমাকে আগলে রেখেছে, যোগাযোগ করে চলেছে, ক্ষমা করে চলেছে। যেটা আমি ডিজার্ভ করি না, সে রকম একটা তীব্র ভালোবাসা এঁদের কাছে থেকে সারাজীবন পেয়ে পেয়ে আমি বখে গেছি। ধরে নিয়েছি এটাই স্বাভাবিক।
এখন আমার কাছের বন্ধু আমার টুনি ও দুই টুনটুনি। আমার অনেক ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ক্রোধ, কান্না, তীব্র ভালোবাসা, উচ্ছল আনন্দ এদের সঙ্গে।আমি কোন বিশেষ দিবসে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু , উৎসবের উপলক্ষ পেলে সেটাও ছাড়িয়া। বন্ধুত্ব চিরকালের ,সে যে ফরম্যাটেই হোক না কেন !

প্রথম প্রকাশঃ ২রা আগস্ট, ২০১৫

বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ। সুবোধ সরকার ॥

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও গ্রামীণ অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা। আপনারা আমাকে বলেন, যে একটা ছেলে, আজকেও যদি মাধ‍্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পেরোয় , কিংবা মফস্বলের অর্থহীন কোন বিশ্ববিদ‍্যালয় কলেজ থেকে ততোধিক অর্থহীন কোন বিষয়ে স্নাতক করে—জেলা শহরে বা পরিত্যক্ত ঢাকা নামের শহরে আসা ছাড়া তার কর্মসংস্থান কোথায়?
সামাজিক ট‍্যাবু ইশকুলে পড়াশোনা করলে আরো তীব্র হয়। একটা টেবিল-চেয়ারের অশ্লীল চাকরির জন‍্যে তাকে হন‍্যে হতে হয়!
এতো এতো উন্নয়নের ঢাকঢোল আর ইতিহাস, সংবিধানের সংস্কার কী কাজেই বা লাগে, যদি ন‍্যূনতম কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র করতে না পারে !
চলুন বরং প্রাসঙ্গিক একটা কবিতা পড়ি।

“বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ।
সুবোধ সরকার ॥ “
রূপমকে একটা চাকরি দিন– এম-এ পাস, বাবা নেই
আছে প্রেমিকা সে আর দু-এক মাস দেখবে, তারপর
নদীর এপার থেকে ওপারে গিয়ে বলবে , রূপম,
আজ চলি
তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন।
রূপমকে একটা চাকরি দিন, যেন কোন কাজ
পিওনের কাজ হলেও চলবে।
তমাল বাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে
যারা কথা বলেন
তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় ।
তমালবাবু মামাকে বললেন , রূপমের একটা চাকরি দরকার।
মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে ,
জ্যাঠা বললেন
বাতাসকে ।
মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে
প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে , সে বলল দক্ষিণের অরণ্যকে
অরণ্য বলল আগুনকে , আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে
আলিমুদ্দিন ছুটলো নদীকে বলার জন্য,
নদী এসে আছড়ে পড়ল
উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল ;
রূপমকে একটা চাকরি দাও , এম-এ পাস করে বসে আছে
ছেলেটা
কয়েকমাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়ি ফিরছিলাম সন্ধেবেলায়
গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম
জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি
সারাগায়ে ঘাস, খড়কুটো, হাতের মুঠোয়
ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন ।
পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম?
ভারত সরকারের এক টাকার কয়েনের দিকে আমার চোখ
সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর
এম-এ পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয়
সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে।
একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম-এ পড়ান , কোন আহ্লাদে
আটখানা
বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন ? তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের
ফোন বেজে উঠল,ফোন বেজে চলল,
ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে , আরো কুড়ি বছর
বাজবে।
বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে
নদী উপকূল থেকে উপকূলে আছড়ে পড়ে বলল:
রূপমকে একটা চাকরি দিন।
কে রূপম ?
রূপম আচার্য , বয়স ২৬, এম-এ পাস
বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে।

২রা আগস্ট, ২০২৫

আট বছর আগের একদিন। জীবনানন্দ দাশ।।

“আট বছর আগের একদিন। জীবনানন্দ দাশ।।”

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে—ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’ল তার সাধ।

বধু শুয়ে ছিল পাশে—শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো—জ্যোৎস্নায়,—তবু সে দেখিল
কোন্‌ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল—লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবে না আর।

‘কোনোদিন জাগিবে না আর
জাগিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম—অবিরাম ভার
সহিবে না আর—’
এই কথা বলেছিলো তারে
চাঁদ ডুবে চ’লে গেলে—অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে।

তবুও তো প্যাঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়——অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি।

ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন— যেন কোন্‌ বিকীর্ণ জীবন
অধিকার ক’রে আছে ইহাদের মন;
দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে
একগাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা একা;
যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা
এই জেনে।

অশ্বত্থের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে
বলেনি কি: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার!——
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।’
জানায়নি প্যাঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?

জীবনের এই স্বাদ—সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের—
তোমার অসহ্য বোধ হ’ল;-

মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে—গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প;—কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু – আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।

জানি—তবু জানি
নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;
অর্থে নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,
চোখ পালটায়ে কয়: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?
চমৎকার!—
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার —’

হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব—বুড়ি চাঁদটারে আমি
ক’রে দেব কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু’জনে মিলে শূন্য ক’রে চলে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

গতকাল অফিস ছুটির ঠিক আগে, এক অগ্রজের জন্য অপেক্ষা করছি। ট্রাফিকে আটকে দেরী করলেন। তাঁর সাধারণ ব্যবসায়ী পরিচয়ের অগোচরে আরেকটি পরিচয় আবিষ্কৃত হল– করলাম উনি জীবনানন্দ প্রেমিক। ‘ আট বছর আগের একদিন’ মুখে মুখে বলে গেলেন ! তাঁর মতে, বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ ; রবীন্দ্রনাথ যদি সাহিত্যের বটবৃক্ষ হয়ে থাকেন ; জীবনানন্দ তাহলে তাঁর ছায়ায় নিটোল কাব্যের বনসাই। ‘কবি’ এর বাইরে জীবনানন্দের অন্য সব পরিচয় গৌণ !
বছর কুড়ি আগে ‘ আট বছর আগের একদিন’ প্রথম পড়েছিলাম ; এবং সারাদিন বিষণ্ণ হয়ে ছিলাম। কিছু বাক্য আমাকে আমাদেরকে রক্তাক্ত , বিক্ষত মৃতপ্রায় করে যায় ! আমার প্রিয় অনেকগুলো উচ্চারণ এই কবিতায় আছে। কিন্তু জীবনের ক্লান্তি, নিরশা, বিপন্ন বিস্ময় ছাড়াও জীবনের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা ভয়ংকর আশাবাদের বৈপিরিত্য প্রাথমিক পঠনে আমার ও আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় !

“এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবে না আর। ”

আত্মহত্যাকারীর প্রতি প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছু নেই !

“তবুও তো প্যাঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়—অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে। ”

কী অসাধারণ আশাবাদের জয়গান। আরেকটু বেঁচে থাকার আকুতি ! আরেকটি প্রভাতের ইশারা।

“রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি। ”

মাছিও রক্ত ক্লেদ থেকে সোনালি সূর্যালোকে চলে যায় !

“জীবনের এই স্বাদ—সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের—
তোমার অসহ্য বোধ হ’ল;-”
জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধের এর চেয়ে উদাত্ত আহ্বান আর কী হতে পারে !

প্রথম প্রকাশঃ ৩০শে জুলাই , ২০২০

ট্রেডের মুরব্বীদের প্রেডিকশন মেনে নেবেন কীনা

কয়েকদিন আগে ক্লাস নিতে গিয়ে একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম।
ট্রেডের সিনিয়র হিসাবে অনুজ একজন শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা, ‘স্যার আমাদের অর্থনীতি আর গার্মেন্টস টেক্সটাইলের ব্যাপারে আপনার প্রেডিকশন কি?’

আমি বললাম, আমার প্রেডিকশনের কোন মূল্য আছে কী?

আমাদের রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী মন্ত্রী, নেতা, থেকে শুরু করে আমাদের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা ঝাল-টক শোর বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা নানা ধরণের প্রেডিকশন করছেন এবং তাঁরা সম্ভবত: সেটা দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা অথবা পরের মুখে ঝাল খেয়েই করছেন। অনেকসময় নিজেদের নিকট অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করে করছেন।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, কীভাবে যেন আমি টের পেয়ে গেছি—পৃথিবী আসলে চালাচ্ছে গুটি কয়েক অসম্ভব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজির মালিকেরা।

তাদেরকে বললাম, ধরেন ফেব্রুয়ারির এক সকালে কফি খেতে খেতে ভ্লাদিমির পুতিন সাহেবের মনে হল, নাহ্ ইউক্রেন আর ন্যাটোর বাড়াবাড়ি আর তো সহ্য হচ্ছে না। এর একটা বিহিত করা দরকার। সে আক্রমণ করে বসল ইউক্রেন।

একজন লোকের একটা সিদ্ধান্ত।
কিন্তু গোটা পৃথিবীর বাকী ৮০০ কোটি লোকের নাভিশ্বাস !

আবার একইভাবে ধরেন, চায়নার RMB (রিনমিনবি) কারেন্সি ইউএস ডলারের বিপরীতে ৬ থেকে ৬.৭৫ এর মধ্যে আছে বহুদিন ধরে। এটা পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে একটা সাম্য রেখে চলছে। চীনের মুদ্রানীতি ও সাপ্লাই চেনের উপর সারাবিশ্ব নির্ভরশীল হয়ে আছে।

কোন এক সকালে চীনের সকল ক্ষমতার অধিকারী জনাব প্রেসিডেন্ট শি জিন-পিং সাহেবের কফি খেতে খেতে মনে হতে পারে, চীনের মুদ্রা রফতানির স্বার্থে অবমূল্যায়ন করলে ভালো হয়। তিনি আদেশ দিয়ে বসলেন, কাল থেকে রিনমিনবি ৮ বা ৯ অথবা আরো বেশি হবে ইউএস ডলারের বিপরীতে।

দেখেন, একজন লোকের একক সিদ্ধান্তে পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে কী যে একটা হুলুস্থুল লেগে যেতে পারে। কেউ চিন্তাও করতে পারবে না কী দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে তৃতীয় বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ , যদি চীন তাঁর মুদ্রা হুট করে অবমূল্যায়ন করে।

আমাদের আপাত চেনা অথচ অচেনা পৃথিবী একটা জটিল দুর্বোধ্য নিয়মে চলে। কখন কোন্ রাষ্ট্রের কোন্ সিদ্ধান্তে আমাদের মতো ‘গরীবের বউ সবার ভাবীর’ কী যে দুর্যোগ নেমে আসবে তা কে জানে !

সুতরাং বড় বড় হরিদাস পালেরাও অনেক কথাই বলবে , সেটা শুনবেন , প্রচুর পড়াশোনা করবেন , কিন্তু যে কোন একজনের প্রেডিকশন নিজের ভিতরে নেবেন না। জানেন তো, Economist is someone who can explain why the things they predicted yesterday didn’t happen today ! অথবা An Economist is an expert who will know tomorrow why the things he predicted yesterday didn’t happen today!

অনুজ ছাত্ররা আমার অজ্ঞতা ঠিকই ধরতে পারলো বোধ করি।
কিন্তু মুরব্বী বলে আমাকে আর বিব্রত করলো না।

প্রথম প্রকাশ: ৩০শে জুলাই,২০২২

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সিনেমা মানেই ভালো সিনেমা নয়।

দিন কয়েক আগে, বিমানে ঝিমাতে ঝিমাতে ছবির মেনু ঘাঁটতে গিয়ে বাংলা ছবি পেলাম , ‘ বিদেহীর খোঁজে রবীন্দ্রনাথ’। নাম দেখে উৎসাহিত হয়ে দেখা শুরু করলাম।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এরকম ফালতু একটা ছবি পশ্চিমবঙ্গের লোক বানাতে পারে , ভাবতেই ত্যক্ত , বিরক্ত ও বিমর্ষ হচ্ছি। এতো সুন্দর একটা বিষয় নিয়ে, শান্তি নিকেতনের লোকেশনে কীভাবে কতকগুলো আবাল ছেলেমেয়েদের নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য একটা ছবি হতে পারে ! যেমন অভিনেতা-নেত্রীদের উচ্চারণ, তেমন তাদের পোশাক ও অঙ্গভঙ্গি ! বলিহারি আমার ধৈর্যও , ঘণ্টা দেড়েক ধরে ছবিটা দেখলামও ! শর্মিলা ঠাকুরের সাক্ষাতকারটাও ভীষণরকম আন-প্রফেশনাল, বিশ্রী বাজে।

পুরো ছবিতে একটা শব্দই নতুন লেগেছে, ‘পাতি NRI’ (Non Residential Indian) মানে গেঁয়ো NRI ! এই গেঁয়ো NRI এর জায়গায় গেঁয়ো NRB (Non Residential Bangladeshi) বসালেও ঠিক থাকবে। ফেসবুকে ও যাওয়া আসার পথে মাঝে মাঝেই গেঁয়ো কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়। সময়ের সর্বোচ্চ উন্নত পশ্চিমা দেশে থেকেও এঁদের গেঁয়ো মন মানসিকতা দেখে আমি প্রতিবারই বিমর্ষ হই।

প্রথম প্রকাশঃ২৫শে জুন,২০১৩