করপোরেট অবজারভেশন অথবা নিছক বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কিছু কথা

তৃতীয় বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। গত বিশ বছর ধরে BGMEA-এর চলতি ও হবু নেতাদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়েছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটা এখানে বলে ফেলাটা মন্দ হবে না। তাঁদেরকে ‘হবু নেতা’ বলছি এই কারণে ; নির্বাচনের আগে অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও নির্বাচনের পরে সেই সব শিল্পপতি উদ্যোক্তা বড়ভাইদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁরা বাংলাদেশের চিরাচরিত নির্বাচন পরবর্তী নিয়ম মেনে চলেছেন !

প্রথমত: নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পরে আমাদের গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানাগুলোর নিজস্ব র‍্যাঙ্কিং থাকা উচিৎ ছিল ! বছর বিশেক আগেই আমার মতো শিক্ষানবিশের কাছেও মনে হয়েছিল– কারখানার রেটিং অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। রেটিং নেই বলেই আমাদের মধ্যে সুষম ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। এবং তার পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন নানা প্রান্তের নানা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা। BGMEA নিজেই র‍্যাঙ্কিং করতে পারত। কারখানার এই রেটিং আমাদের দেশের নিরপেক্ষ কারো মাধ্যমেই হতে পারত। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে।

আফসোস! সেই র‍্যাঙ্কিং অবশেষে হল, তবে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার পরে। ACCORD ও ALLIANCE নামের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ঘাড় ধরিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করিয়ে নিল। নিজেদের মতো করে তাঁরা রেটিং করে দিল। ফাঁকতালে ফায়ার-ডোর থেকে শুরু করে আরো কিছু পণ্যের মধ্যসত্ত্বভোগী কোম্পানিগুলো নমিনেশন নিয়ে দু’ পয়সা কামিয়ে নিল।

বছর দশেক আগেও দেখেছি গাজীপুরের কোন কারখানা যখন সবরকম নিয়মকানুন ও কমপ্লায়েন্স মেনে একটা প্রিন্টেড কটন টি-শার্টের দাম দিয়েছে $ ২.০০~ $ ৩.০০ সেখানে রামপুরা , বাড্ডা, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ বা অন্যকোন দুর্গম এলাকার ২/৩ লাইনের একটা কারখানা অথবা ‘হল-মার্কস’-এর মতো লুটের টাকার কারখানা দাম দিয়েছে $ ১.৫০ বা আরো কম। সাদা চামড়ার ক্রেতাদের এর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই কুখ্যাত ‘টেন্ডারবাজি’ । ও এতো দিয়েছে , তোমাকেও এতো দিতে হবে ! সবচেয়ে ভালো নামকরা ট্রেডিং এজেন্ট ও ভালো কারখানাগুলোকে এরা অসহনীয় টার্গেট মূল্য মেলাতে ও গেলাতে বাধ্য করত। এখনো করছে , এবং সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই আমাদের পথচলা।

আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভারত, চীনে এলাকাভিত্তিক পণ্য তৈরির সর্বনিম্ন মূল্য-তালিকা আছে। কারখানার ও এলাকাভিত্তিক রেটিং আছে বহু আগে থেকেই। ক্রেতা যে কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে কোন একটা দাম কোন একটা দাম চেয়ে বসলেন সেই সম্ভাবনা কম। আমাদেরও কারখানার রেটিং হল অবশেষে তবে অন্যের হাত দিয়ে। নিজের রান্নাঘর আর বাসস্থানকে বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট নিতে হল যে, আমাদের রান্নাঘরও ঠিক আছে, আমাদের বসবাসের জায়গাও ঠিক আছে !

দ্বিতীয়ত: BGMEA নেতাদের কাউকে কাউকে ফাঁকে ফোকরে বলার চেষ্টা করেছি, এতো কিছু করছেন, শ্রমিকদের ডাটাবেজ করছেন না কেন? আজকে একজন দাগী আসামী কোন একটা কারখানার সর্বনাশ করে আরেক এলাকার আরেক কারখানায় যোগ দিচ্ছে। কোনভাবেই তাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। সে গিয়ে অন্য এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। ডাটাবেজ থাকলে, নির্দিষ্ট শ্রমিক কত বেতনে শেষ চাকরিটি করেছে, ও কোন স্কেলের ও দক্ষতার সেটার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ডিজিটাল ডাটাবেজ অবশেষে শুরু হয়েছে বছর দুয়েক আগে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেটা থমকে আছে।

উপরের দুইটি বিষয় কেন হচ্ছে না– সেই ব্যাপারে আমার নিজের মত করে নিজস্ব মতামত আছে। আমরা নিজেরা নিজেদের কারখানাগুলোর রেটিং করিনি এতোদিন– সেটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আলস্য, দুর্নীতি , অতিলোভী, মুনাফাখোর মানসিকতা আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে নিজেদের মূল্যায়ন করতে দেয় নি।

আর শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি কারণ, কোন কোন মালিকেরা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি প্রতিবছরে এমন জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছেন, তাঁদের দরকার ছিল ‘তৈরি শ্রমিক’। সেটা একভাবেই সম্ভব ! পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে তৈরি শ্রমিককে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। দেড়গুণ বা দ্বিগুণ বেতন দিয়েও অনেক কারখানা অন্যদের শ্রমিক সরিয়েছেন। এখন সঠিক ডাটাবেজ হলে এটা ঠিক এইভাবে সম্ভব হতো না। নিজেদের স্বার্থেই হয়তো শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি এতোদিন।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পণ্যকে , বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য সরকারি লোকের উপরে ভরসা করে থাকলে, ‘সে গুড়ে বালি’। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে, লবি দিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় কিছু এক্সপোজিশন হয়, যেটাকে মেলা বলা যেতে পারে; ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা। ওইরকম কয়েকটি মেলায় যেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বুথ বা সেবা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যে মেধার লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছি ; মনে হয়েছে তার চেয়ে এঁদের না আসাই ভালো ছিল। স্বজনপ্রীতি দিয়ে গুচ্ছের সরকারি লোককে এই সব সফরে পাঠিয়ে কাজের চেয়ে দুর্নামই বেশি হয়েছে । অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্যতিক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার এখনো হয় নি।

চারিদিকে হতাশার কথা বলার মানুষের অভাব নেই ; আশাবাদের কথা বলার লোকের বড্ডো অভাব।নিজেদের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে, অন্য কেউ বাজিয়ে দেবে না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মালিকপক্ষ বুঝবেন ততই আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রেডের জন্য ভালো।

প্রথম প্রকাশ: ১৮ই মে, ২০১৭
[ উল্লেখ্য, এই লেখা যখন লিখেছি, তখনও বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি সেভাবে শুরু হয়নি, এখন আমাদের ৩০০ এর অধিক পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানা আছে। ]

দুটি দুই দশকের আলাদা গল্প।

দুটি দুই দশকের আলাদা গল্প।
শৈশব-কৈশোরের কাহিনী আরেক দশকে এসে কীভাবে মনে প্রশ্ন তোলে, সেটা পড়ার পরেই জানা যাবে।
আশির দশকে মহল্লার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বড়ভাইদের প্রবাসে উপার্জনের জনপ্রিয় একটা গন্তব্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান।
পকেটভর্তি টাকা নিয়ে ফিরে এসে মহল্লার সুন্দরীদের বিয়ে-টিয়ে করে থিতু হতেন।
‘জাপান এই , জাপান সেই’ বলে মুখে ফেনা তুলতেন তারা। জাপানি লোকের সময় সচেতনতা, নিয়মানুবর্তিতা আর মহানুভবতার একই গল্প বারবার শুনতে হতো।
একবার এক বড়ভাই বলেছিলেন, যে এলাকায় তিনি থাকতেন, সেখানকার বেকারির বৃদ্ধা মহিলা মালিকটি সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বেকারিগুলো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফেলে দিতো। বেকারি জাতীয় খাবারের মেয়াদ থাকে ৩/৪ দিন। কিন্তু শীতের সময় ৫/৬ দিনেও তেমন কিছু হয় না। তো সেই বড়ভাইয়ের সঙ্গে বেকারির মহিলার খাতির ছিল, সেগুলো রাতে ফেলে দেওয়ার আগেই তিনি তাকে কিছু নিয়ে নিতে দিতেন।
দুই দশক পরে উত্তরাতে।
সম্ভবত: ২০০৪ সালের দিকেই সুবিখ্যাত একটা মিষ্টির দোকানের শাখা খোলা হলো। আমার তৎকালীন বস রাকিব ভাই, সচরাচর একা চলতে পছন্দ করতেন না। সারাক্ষণ কলিগ ও বন্ধু পরিবেষ্টিত থেকে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে। তো অফিসে নিচে কিছু একটা কিনতে যাচ্ছেন বা আশে পাশে কোথাও যাচ্ছেন। ডেস্কের পাশে এসে বলতেন, ‘ওই মিঞা! চলেন তো একটু নিচে।’ আমার কাজের চাপ কেমন, ব্যস্ত আছি কীনা , সেসবের ধার ধারতেন না।
তো সেই রকম এক বিকেলে তার সঙ্গে নিচে গেছি। আমাদের বিল্ডিং এর পাশের সেই সুবিখ্যাত মিষ্টির দোকান। রাকিব ভাই কারো বাসায় যাবেন সেই উপলক্ষেই।
জীবনে প্রথম ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ টাইপ দোকানের বাইরে করপোরেট একটা দোকানে আমার পদার্পণ।
সুসজ্জিত দোকান, নিয়ন আলোর নিচে প্রাইস ট্যাগে দাম লিখে রাখা মিষ্টি। বসার জন্যে সোফা, হালকা খাবারের জন্যে টেবিল, স্মার্ট সেলসম্যান দেখে আমি তব্দা মেরে গেলাম।
আরো তব্দা খেলাম, যখন মিষ্টির দাম দেখলাম। সব পরিচিত মিষ্টিই। কিন্তু দাম আকাশচুম্বী।
ঐ সময়, মিরপুর ও উত্তরার ভালো মিষ্টির দোকানের দামী মিষ্টির দামও ২০০ টাকা কেজি পার হতো না। মেহমান বুঝে আমরা ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ১৮০ বা ২০০ টাকা কেজির মিষ্টি নিতাম।
সেই চেইনশপে মিষ্টির দামই শুরু হয়েছে ৪০০ টাকা থেকে আর শেষ হয়েছে ৮০০+ টাকায়।
স্মৃতি থেকে লিখছি, দুধের লিটার ১৬ টাকা থেকে ২০ টাকা। চিনির দামও তাই।
মার্চেন্ডাইজার মন আমার মনে-মনে ‘কস্ট প্রাইস’ আর ‘রিটেইল প্রাইসের’ তুলনা করছি।
এক কেজি মিষ্টির দাম কীভাবে ৮০০ টাকা হয় ! আমি মেলাতেই পারছিলাম না।
পাশের সেলস ম্যানেজারকে বললাম, ‘ভাই আপনাদের দোকানের মিষ্টির বিশেষত্ব কি?
উনি একাধারে ব্র্যান্ডিং করা শুরু করলেন,এই অভিজাত মিষ্টির দোকানের হেড অফিস কানাডায়, শাখা আছে সেখানেও। সবচেয়ে ভালো পরীক্ষিত দুধ, উন্নত চিনি ব্যবহার করা হয়, কর্ম-পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট, ইত্যাদি ইত্যাদি।’
আমি মিনমিন করে বললাম, ‘তারপরেও ভাই এতো দাম কেমন করে হয়?’
উনি আমাকে শেষ তথ্যটি দিয়ে কুপোকাত করে দিলেন। বললেন, ‘আমাদের মিষ্টির এক্সপায়ার ডেট আছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হলে আমার সেই মিষ্টি ফেলে দিই।’
আমি তার এই তথ্যে কুপোকাত না হয়ে উল্টো প্রশ্ন করলাম, ‘ভাই, মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি কোথায় ফেলেন?’
পাশ থেকে রাকিব ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরেহ মিঞা, আপনি সারাজীবন বাঁইক্যাই থাইকা গেলেন!’
প্রথম প্রকাশঃ ২০শে ফেব্রুয়ারি ,২০২৬

ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা মার্চ ২০২৬

সদ্য-প্রয়াত ইন্টেরিম সরকার নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।
এই অধমও যদি তালিকা করি,চার-পাঁচ পাতার কমে হবে না। কিন্তু এতো কিছুর মধ্যে ব্যক্তিগত তালিকাতে প্রশংসা করার মতো তিনটা ব্যাপার খুঁজে পেলাম।
প্রথমত নানাবিধ দুর্নীতি ও ব্যাংক তহবিল তসরুপ এবং এস আলম গ্রুপের চোদ্দ-পনেরো হাজার কোটি টাকা পাচারের পরে, প্রায়-দেউলিয়া একটা দেশের অবস্থা ততোটা শোচনীয় হয়নি, যতোটা আশঙ্কা করেছিল সবাই। এর কৃতিত্ব ইন্টেরিমকে দিতেই হয়।
দ্বিতীয়ত দেশ-বিদেশের বহুমুখী চাপের জন্যেই হোক বা অন্য কোন কারণে , নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন দিয়ে একটা গণতান্ত্রিক সরকারে কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। আবারো প্রশংসাযোগ্য।
তৃতীয়ত আরেকটি ধন্যবাদ কাকে জানাবো, জানিনা। ঢাকা শহরের ট্রাফিক কন্ট্রোলের যেই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা অথবা প্রশাসক অথবা উপদেষ্টা যিনি প্রধান সড়ক এবং উপ-প্রধান সড়কের ছোট ছোট ‘ইউ টার্ন’ কমিয়ে ‘ লং ইউ টার্ন’ প্রচলিত করেছেন। ব্যাটারি টেসলার উপর্যুপরি সোদনের পরেও ঢাকা শহরে আমরা যে এখনো ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ে চলাচল করতে পারছি, তার অন্যতম ধন্যবাদ ঐ দূরদর্শী ভদ্রলোকের। কেউ আমার হয়ে তাঁকে ধন্যবাদ পৌঁছে দিয়েন।
চতুর্থ ধন্যবাদ চা-বিলাসী আমার পক্ষ থেকে Seylon Instant Milk Tea Sachet প্যাকের জন্য Abul Khair Consumer Goods Division (AKCGD)- কে ! বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের প্রধান পানীয় দুধ-চা। সেটা তৈরির আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতি হচ্ছে দীর্ঘসময় গুড়ো চা ফুটিয়ে, তারপরে দুধ-চিনি মিশিয়ে পরিবেশন। নব্বইয়ের দশকে ‘কনডেন্সড মিল্ক’ বাজারে এলে ফোটানো লিকার চায়ের সঙ্গে সেটা মিশিয়ে পরিবেশন করার ব্যাপারটা গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ল।এখন আপনি দেশের যে কোন প্রান্তে গিয়ে দুধ-চা চাইলেই পাবেন। অথচ এটার যে একটা ইনস্ট্যান্ট প্যাক বাজারে আনা যায়, সেটা এই ২০২৫ সালে এসে আমার চোখে পড়ল। গত মাস ছয়েক যখন তখন দুধ-চায়ের জন্যে Seylon প্রাত্যহিক হয়ে গেছে আমার জীবনে।
যদিও গুগল মামা বলল, আবুল খায়ের গ্রুপ ২০০৪ সালেই নাকি বাজারে প্রচলন এনেছে ; কিন্তু ম্যাসিভ মার্কেটিং করেছে ২০২৫ সাল থেকে। অথচ, আমি সেই ২০০১ সালে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া , ইন্দোনেশিয়ায় এই ইনস্ট্যান্ট চা দেখেছি। সহজ,সাশ্রয়ী। এমন হয়েছে, এই জিনিষের প্রতি আমার মুগ্ধতা দেখে, সিঙ্গাপুরের সহকর্মী সুজান সুশান্তো প্রায় প্রতি বছর আমার জন্যে কয়েক প্যাকেট পাঠাতো।
জীবনের নানাবিধ প্যারায় পর্যুদস্ত হলেও আমি আশাবাদী মানুষ। ছোট ছোট আনন্দে জীবন ভরিয়ে রাখতে চাই। এক কাপ কড়া লিকারের দুধ-চা আমার জীবনে যেরকম তৃপ্তির আনন্দ দেয়; আপনাদের সকলের জীবন সেরকম তুচ্ছ আনন্দে ভরে উঠুক।
অগ্রিম ঈদ মুবারক অগ্রজ, অনুজ, সহকর্মী, সতীর্থ বন্ধু-বান্ধবী, আত্মীয়স্বজন সবাইকে।

রাষ্ট্র ও ক্ষমতা বর্বরদের হাতেই ছিল, আছে, থাকবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম শাসনামলের শেষের দিকে ২০২১ সালে তাঁর নানা কুকীর্তি, করোনা ভাইরাস নিয়ে নানাবিধ বাগাড়ম্বর, আস্ফালন দেখেশুনে আমরা বীতশ্রদ্ধ, বিরক্ত। তো বড় কন্যা জিজ্ঞেস করল, কীভাবে ট্রাম্পের মতো অসভ্য, বর্বর একজন লোক পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী, সমৃদ্ধ দেশের প্রেসিডেন্ট হলেন ?
আমি আশাবাদের জায়গা থেকে, স্বস্থ থাকার প্রেরণায় আমার মতো করে কন্যাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
বললাম, পৃথিবীতে রাজরাজড়াদের কীর্তি-কাহিনী কমবেশি মাত্র হাজার পাঁচেক বছরের ইতিহাসটুকুই জানি। এর মধ্যে প্রজ্ঞাবান, দার্শনিক, সত্যিকার কল্যাণকামী রাষ্ট্রনায়কদের স্মরণ করতে গেলে হাতের আঙুল পাঁচ বা ছয়ে গিয়ে থেমে যায়। আর বাকী লক্ষ লক্ষ রাজা, রাজাধিরাজ, সম্রাট, রাষ্ট্রনায়করা হচ্ছেন শোষণ,পীড়ন দমনের ধারাবাহিকতা মাত্র।
মানবিক উদারতা, অহিংসা এবং সব মতের মানুষের প্রতি সমবেদনা জানানো দার্শনিক, সুশাসক পৃথিবীতে বিরল। হাজার বছরে মাত্র কয়েকবার এঁদের দেখা মিলেছে।
বললাম, আমাকে যদি জিজ্ঞেস কর, আমার ক্ষুদ্র ইতিহাসজ্ঞানে প্রথমেই যার নাম মনে আসে, তিনি’ মেডিটেশন’- বইয়ের দার্শনিক রোমান সম্রাট মারকাস অরেলিয়াস (Marcus Aurelius)। তারপরে আসে, সম্রাট অশোকের (Ashoka Maurya) কথা। যদিও তাঁর প্রারম্ভিক যুদ্ধ-জীবন দিয়ে তর্ক আছে।
এরপরে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ; অটোমান সাম্রাজ্য সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট; মোঘল সম্রাট আকবর দ্য গ্রেট; আমেরিকার আব্রাহাম লিংকন; মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ; সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ । এই দেখো, আট জনের পরে আমি আর কাউকে খুঁজেই পাচ্ছি না।
সুতরাং বহু হাজার বছর ধরে,রাষ্ট্র , রাজনীতি ও ক্ষমতা নিষ্ঠুর,চতুর, পীড়নকারী, অসভ্য, বর্বরদের হাতেই ছিল। আরো শত বছর পরে আমার কথার প্রতিধ্বনি যদি থেকে যায়, সেই পাঠক যেন এটা ভেবে স্বস্থ থাকে, পৃথিবী এরকমই ছিল, আছে এবং থাকবে।
প্রথম প্রকাশঃ ২৩শে মার্চ, ২০২৬

বেঁচে থাকাটা আসলেই চমৎকার !

অবহেলায় বেড়ে ওঠা আমার ছোট্ট মেয়েটা দেড় বছরে পা দিল ।
আধো আধো বুলিতে, সারাক্ষণ সবাইকে ত্রস্ত করে রেখেছে সে । ধর্‌ ধর্‌ ধর্‌ , গেলো গেলো গেলো টাইপ অবস্থা আর কী ! কখন, কোথায় সে হিসু করবে, পটি করবে; কখন কেন কোনটা ফেলবে কোনই আন্দাজ নাই।
ওর তুলনায় আমার বড় মেয়েটা অনেক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আব্বা-আম্মা অসুস্থ হওয়ার পর আমার স্ত্রীর ব্যস্ততা বেড়ে গেছে, বেড়ে গেছে আমারও। এই মেয়েটা আমাকে ২৪ ঘণ্টায় জাগ্রত অবস্থায় পায় মাত্র ঘণ্টা খানেক। বাকী যেটুকু সময়ই বাসায় থাকি , হয় ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে আসি অথবা ও রাত জেগেই থাকে আমি ভোঁসভোঁস করে ঘুমাই।
আমার আম্মা আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকে, আর বড়কন্যা ‘পাপা’ বলে ডাকে।
ছোট মেয়েটা এর মাঝামাঝি গিয়ে আমাকে ডাকে ‘ বাপা’ বলে।
কাছাকাছি হলেই গেলেই বাপা, বাপা বাপা ডাক দিয়ে গা ঘেঁষে ওঠে !
এইসব মুহূর্তের জন্য আমি ভাবি, বেঁচে থাকাটা আসলেই চমৎকার !

প্রথম প্রকাশ: ১১ই এপ্রিল, ২০১৩