by Jahid | Jan 13, 2022 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন, লাইফ স্টাইল
কিছুদিন আগে প্রথম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে অক্ষর পরিচয়ে ‘ও’ অক্ষরের জন্য ‘ওড়না চাই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। বছরের শুরুতে প্রাচীন ও প্রগতিশীলদের মধ্যে শুরু হয়েছে বাদানুবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে কোন ইস্যু নিয়ে হৈচৈ দুই-একদিনের বেশী থাকে না। এখন যেহেতু ব্যাপারটা সবাই ভুলে যেতে বসেছে , আমি আমার কর্পোরেট অবজার্ভেশনে ওড়না ও নারীদের কর্ম পরিবেশ নিয়ে দুয়েক কথা বলতেই পারি।
পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই কন্যা-শিশুদেরকে ওড়না ও ওড়না দিয়ে বুক ঢেকে রাখার ব্যাপারটা শেখানো হয়। পুরো ব্যাপারটি নারীর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্ব, তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, ধর্মীয় অনুশাসন ও মা-খালাদের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে হয়ে থাকে। আমাদের অবদমনের পুরুষ শাসিত সমাজে একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ একটা অদ্ভুতুড়ে উপায়ে তৈরি হয় । প্রথমত: যৌনতা ও তার যে কোন আলোচনা আমাদের সমাজে নিষিদ্ধ ও ট্যাবু। আগেও ছিল , এখনো এই মুক্ত অন্তর্জালের সময়েও আছে। দ্বিতীয়ত: নারী-শিশুটি যে নিজের পরিবারের পিতা ও ভাই ছাড়া পৃথিবীর অন্য সকল পুরুষের কাছে অনিরাপদ সেটা মা, খালারা গ্রামের একটি শিশুকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে একদম দেরী করেন না।
একই সঙ্গে গ্রামের একটি ছেলে কীভাবে যেন জেনে ফেলে– অকর্মণ্য , অপদার্থ পুরুষ হলেও, শুধুমাত্র পুরুষ হওয়াও একটা বিশাল সৌভাগ্য ও গুণ। এবং মেয়েটির ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। পুত্রসন্তান প্রসবকারী জননীদের দাম বেশী। ৩/৪ টি কন্যা সন্তানের পর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম অথবা আরেকজন তরুণীকে সম্ভোগ করে পুত্রলাভের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। গ্রামে বিয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের বিচার-মূল্যে সবচেয়ে নির্বোধ, উন্মাদ যাই হোক না কেন, একজন যুবকের জন্য পাত্রী ঠিকই জুটে যায়। অথচ, সচ্ছল পরিবারের মাঝারি চেহারার বা শ্যামলা মেয়েদের পাত্রস্থ করতেও হিমসিম খেতে হয় পুরো পরিবারকে।
কয়েকটি শিক্ষিত সংস্কৃতমনা জেলা ছাড়া বেশিরভাগ জেলা শহরগুলোর সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার জায়গাটা ভীষণভাবেই দুর্বল। না আছে ভালো কোন ক্লাব, না আছে লাইব্রেরি না আছে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা। বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ছেলেরা কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহপাঠী ছিল। এঁদের সঙ্গে চলে বুঝতে পারি ওঁদের কৈশোর আর আমাদের ঢাকা শহরের বেড়ে ওঠা কৈশোরে বড় কোন পার্থক্য নেই। তবে কিছু জেলা শহরে ধর্মের প্রকোপ বেশী, পর্দাপ্রথা বেশী। সেখানে অনেককে শৈশব কৈশোরে বড় একটা অংশে বেড়ে উঠতে হয়ে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্কে একমুখী অজ্ঞানতা নিয়ে। মফঃস্বলে বেড়ে ওঠা আমার এক দুঃসম্পর্কের মামার কথা মনে পড়ছে। তিনি সারাজীবন বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ করে প্রায় নারী বিবর্জিত জীবন যাপন করেছিলেন। বিয়ের পরে নতুন মামীর প্রতিটা চালচলন ও কর্মকাণ্ড তাঁর কাছে বিস্ময়কর মনে হত। একজন অধরা আকাঙ্ক্ষিত নারীও যে খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি আর সবার মতো মল-মূত্র ত্যাগ করে, বায়ু ত্যাগ করে সেটা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল ! নতুন মামীকে নিয়ে তাঁর আদিখ্যেতা ছিল দেখার মতো। প্রায়শ: আমাদের শুনতে হোতো, জানিস আজ তোর মামী এইটা করেছে ! জানিস, আজ তোর মামী সেইটা করেছে। আমরা কিশোর বয়সেই বিরক্ত বোধ করতাম।
আমাদের শহুরে ছেলেদের কৈশোরের দুঃসহতা ছিল। তবুও সংখ্যা গরিষ্ঠরা একটা মানসিক স্থিতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি। মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা, মহল্লার মুরব্বীরা, কো-এডুকেশন অথবা কোচিং লেভেলেই মেয়েদের সংগে চলাফেরা একটা স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। অল্পবিস্তর বিকৃতি যে ছিল না , তাও বলব না।
কিছুদিন আগে আমি, আমার স্ত্রী, আর দশ বছরের কন্যা বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার স্ত্রী হঠাৎ করে মেয়েকে আরো কাছে টেনে নিয়ে ওর পরিধেয় কাপড় ঠিক করে দিল আর আমাকে নিয়ে একটু দুরে গিয়ে দাঁড়াল। আমি একটু অবাক চোখে তাকালে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর পাওয়া গেল না। ফেরার পথে জানালো, আমার ঠিক পিছন থেকে এক মাঝবয়সী বিকৃত পুরুষ নাকি জুলজুল করে কন্যার দিকে তাকিয়ে ছিল! কেউ তাকালে কী করবেন ? আমার সহপাঠিনীরা সেই সময়ে পাবলিক বাসে করে মিরপুর থেকে ইডেন , হোম ইকোনমিকস্ , সিটি কলেজে যাওয়ার সময় তাঁদেরকে কি পরিমাণে বিব্রত হতে হত জানি। বাসে কন্ডাকটর থেকে শুরু করে প্রৌঢ় , যুবক, কিশোর সবার চেষ্টা থাকত তাঁদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর। অনেক সহপাঠিনীই ব্যাগ ও বই দুই হাতে বুকের সামনে চেপে ধরে রাখত। কিন্তু শরীরের অন্য স্পর্শকাতর অংশগুলোতে কারো না কারো অবাঞ্ছিত ,অনিচ্ছাকৃত(!) শারীরিক চাপ পড়তই। আবার এটাও ঠিক , সেই সময়েও অনেক সচেতন পুরুষ এই ব্যাপারটাকে বুঝে আমাদের সহপাঠিনীদেরকে নিরাপদ জায়গায় , মানে ড্রাইভারের বাঁ পাশের সিটে বসার ব্যবস্থা করতেন।
এখন তো অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। উন্মুক্ত-স্থানে বা পাবলিক বাসে একজন স্বাভাবিক পোশাকের তরুণীকেও জুলজুল করে, অশ্লীল বাঁকা চোখে পুরো বাসের পুরুষগুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কয়জনকে বলবেন দৃষ্টি বদলাতে ? ধার্মিকরা ধরেই নিয়েছেন , এর সমাধান বেশী করে বোরখা ও হিজাব পড়া। সেটি করেও যে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না সে উদাহরণ ভুরিভুরি।
আমাদের বাঙালী পুরুষের সামগ্রিক আচরণ কতখানি সভ্য ও শ্লীল হওয়া উচিৎ সেটা পরিবার থেকে, বিদ্যালয় থেকে তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয় নি। ইঁচড়েপাকা বন্ধু, কাজের ছেলে আর পাড়ার ডেঁপো ছেলে কাছ থেকে তার কুশিক্ষা শুরু হয়। এক পর্যায়ে নারীকে যোনি ও স্তনের সমন্বিত একটি ভোগ্যপণ্যের বাইরে কিছুই সে ভাবতে পারে না ! প্রতিটি নারী , সে যে বয়সেরই হোক না কেন তাদের কাছে ভোগ্য ও রমনযোগ্য মনে হয়।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমার দশ বছরে কন্যা শিশুকে বোঝাতে হচ্ছে সে এই সমাজে কোথাও নিরাপদ নয়। তাঁর চারদিকে বসবাস করছে কুৎসিত, বিকৃত ও মুখোশ-ধারী পুরুষ পশু ; এর চেয়ে আফসোসের আর কি হতে পারে।
এবার দেখি আমাদের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে নারীদের সামাজিক অবস্থা কিরকম । একযুগ আগেও ক্যারিয়ার সচেতন মেয়েটিকে স্কুল, কলেজ , ব্যাংক ছাড়া অন্য কোথাও চাকরি করতে দিতে পারিবারিক বাঁধা আসত। এখন কর্পোরেট পরিবেশ অনেক নারীবান্ধব হয়েছে। নানা ধরণের প্রযুক্তির( মোবাইল ফোন ) উৎকর্ষতায় তাঁদের জীবন নিরাপদ। কিন্তু ঠিক উল্টো অবস্থা হয়েছে বাইরের রাস্তায় । অফিসে একটা শৃঙ্খলিত নিয়মনীতির ভিতরে একজন নারী যতোখানি নিরাপদ ; রাস্তা-ঘাটে সে ততোখানি অনিরাপদ।
আমার যে কাজের ক্ষেত্র–মার্কেটিং মার্চেন্ডাইজিং , সেখানে আমরা বহুবার নারী সহকর্মীদের উৎসাহিত করেছি দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার পরিকল্পনার কথা ভাবতে । কিন্তু এখানেও সেই পুরুষ আধিপত্যের প্রচ্ছন্ন বাঁধা।
প্রথমত: পুরুষ কর্মকর্তারা নারীদেরকে তাঁদের নিজেদের বিভাগে নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে নিতে চান না। যুক্তি হিসাবে তারা নারী কর্মচারীদের অফিস টাইমের শেষেই তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার প্রবণতাকে তুলে ধরেন। নারী কর্মচারী হয়তো কাজের চাপে ইচ্ছে করলেই আরো ঘন্টাখানেক থেকে যেতে পারেন অফিসে, কিন্তু বাইরের রাস্তার পরিবেশ ও স্বামী-সন্তানের চাপ , তাঁকে বাড়তি সময়দানে নিরুৎসাহিত করে।
দ্বিতীয়ত: পশ্চিমা দেশের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকসময় সন্ধ্যার পরও অফিসে থাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অথবা ক্রেতা আসলে তাঁদের সঙ্গে রাতের খাবারে উপস্থিত থাকার সৌজন্যতা থাকে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য সব গার্মেন্টস উৎপাদনকারী দেশে সামাজিক অবস্থান ভেদে মার্চেন্ডাইজিং এর পুরো দখল নিয়ে রেখেছেন নারীরা।ব্যতিক্রম আমাদের দেশে। পুরুষ-শাসিত বলেই তাদের প্রাধান্য বেশী। যদিও গার্মেন্টস কারখানায় নারী শ্রমিকের জয়জয়কার।
তৃতীয়ত: একজন পুরুষ সহকর্মীকে দিনের যে কোন সময়ে যে কোন কারখানায় প্রোডাকশন ফলো আপের জন্য পাঠানো যায়। নারী সহকর্মীর জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহন ছাড়া ও দিনের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কারখানায় যাতায়াতের প্রশ্নই ওঠে না।
এছাড়া আরেকটি ভয়ংকর অমানবিক দিক আছে, যেটা আমাদের কর্পোরেট কর্মকর্তারা মুখে উচ্চারণ করেন না। কিন্তু ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ঠিকই বের হয়ে আসে। সেটা হচ্ছে, নারী কর্মচারীদের অন্তঃসত্ত্বা কালীন কর্মবিরতির সময়টি। এটা কেউ বিবেচনা করতে রাজী নয় যে মাতৃত্বের মতো একটা মহৎ বিশাল কর্মযজ্ঞে নারী তাঁর শরীর ক্ষয় করে বংশরক্ষার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। পশ্চিমা দেশে প্রায় বছর খানেকের বেতনসহ মাতৃত্ব কালীন ছুটি ছাড়াও ইচ্ছেমতো বেতন-বিহীন ছুটি প্রযোজ্য। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও ছুটির বিরতির পরে নারী কর্মচারীকে তাঁর আগের অবস্থানে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে কর্পোরেট নারীদের অবস্থান ঠিক তার বিপরীতে। একজন দক্ষ নারী কর্মচারীর বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই, তাঁর নতুন অভিভাবক স্বামী –শ্বশুরকুলের নিত্যনতুন সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। আর তারপরে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় ধরণের ধাক্কা আসে মাতৃত্ব কালীন সময়টিতে। মাতৃত্ব কালীন ছুটিতে যাওয়া মানেই ধরে নেওয়া যায় তাঁর ক্যারিয়ারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেল। একটা বিরতি দিয়ে ফিরে এসে, নারী কর্মচারী তাঁর আগের অবস্থান ফিরে পান না । তাঁকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। তা ছাড়া পারিপার্শ্বিক চাপে তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান হয়ে পড়ে নতুন শিশুটি। এইসব বহুমুখী সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে কর্পোরেট উচ্চপদস্থরা যতোই নারীবান্ধব কথাবার্তা বলেন না কেন ; নিয়োগদানের ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য থাকে পুরুষ কর্মচারীর দিকে।
কর্পোরেট পরিবেশ নিয়ে আমার মতামতের সঙ্গে অনেকের মিলবে না ; কারণ আমার দেখা পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশ যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আছে ; ঠিক তেমনি অনেক খারাপ পরিবেশও আছে। মোটা-দাগে, একটা সময় ছিল কর্পোরেট জগতের মেয়েদেরকে তাঁদের ঊর্ধ্বতনরা ও সহকর্মীরা সহজলভ্য ভাবতেন। মেধাবী ছাত্রীরা শিক্ষকতা করবে ; নিরাপদ পেশা। আর মোটামুটি সুন্দরী মেয়েরা সুপাত্রের গলায় ঝুলে পড়বে। নিজের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে অনেক মেধাবী মেয়েরা বেসরকারি অফিসে কাজ করা শুরু করেছেন গত তিন দশকে। কিন্তু, এখনো নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে নিজের স্বামীর পায়ে দাঁড়ানোকে পরিবার থেকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে থাকে।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা ছেলেদের একটা সুবিধা ছিল, নারী সহকর্মী হেসে কথা বললে আমাদের হাসিমাখা প্রত্যুত্তর ছিল। কিন্তু মফস্বল থেকে আসা অনেকে হাসি মুখে কথা বলাকে প্রেমের প্রাথমিক প্রশ্রয় বলে ধরে নিতেন। এই সমস্যার পাশাপাশি ছিল, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নারী কর্মচারীদেরকে সহজলভ্য ধরে নিতেন। অনেক লোভী ঊর্ধ্বতনকে নারী কর্মচারীকে দৈহিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে অপদস্থ করতে দেখেছি। আমার এক নারী সহকর্মী একবার এক কর্মকর্তার রুম থেকে বের হয়ে যা বললেন, তার সাদা বাংলা দাঁড়ায় –কথা বলার চেয়েও সেই পুরুষ কর্মকর্তার চোখ সারাক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁর বুকের দিকে নয়তো অন্য কোন বাঁকে।
আমাদের সচেতন সাবধানী কর্মকর্তাদের নারী সহকর্মীর সঙ্গে যে কোন আলাপ আলোচনায় সচেতনভাবে তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়। মুশকিল হচ্ছে, সব পুরুষকেই নারী এক চোখে দেখা শুরু করে বলে যে কোন সাক্ষাতেই তাঁর প্রথম কাজটি হয় ওড়না ঠিক করা।
প্রাথমিকভাবে ওড়না মাথায় দেওয়ার ব্যাপারটি হচ্ছে, মুরব্বী শ্রেণির কাউকে দেখে সম্মান দেখানো। এটি কর্পোরেট জগতে নেই। দ্বিতীয়টি আছে। গলায় ওড়না থাকাটা ক্যাজুয়াল মুডের ব্যাপার। কিন্তু সামনে কোন পুরুষ পড়লেই অবচেতন মনেই তাঁর হাত বুকের অংশের ওড়নাটুকু ঠিকঠাক করে নেয়। নারীরা পুরুষ দেখলেই বার বার ওড়না ঠিক কেন করে তা এক কথায় বলা উচিৎ হবে না। এবং সব পুরুষের সামনেই সবাই এমনটা করে , তাও না। চরিত্র ভেদে পুরুষটির আচরণ ও চোখের আবর্তন দেখে নারীটি বুঝে নেয় তাঁকে কি করতে হবে। এটা মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। পাঁচ মিনিটের কথোপকথনে কেউ যদি পনের কুড়িবার ওড়না ঠিক করে ; তাঁর দু’রকম অর্থ হতে পারে। হয়, নারীটি অবচেতনে পুরনো দীর্ঘ অভ্যাসের কারণে অস্বস্তি বোধ করছে পুরুষটির সামনে। অথবা , আসলে সে কি করবে বুঝতে না পেরে বা অস্থিরতা ঢাকতে ওড়না ঠিক করে চলেছে। পাশ্চাত্য তো অবশ্যই ; এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেকগুলো দেশেও ওড়না বাহুল্যপ্রায়। আমাদের জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ওড়না বিলুপ্তির কোন সম্ভাবনা দেখছি না। আরো কয়েক জেনারেশন ওড়না ব্যাপক ও বহুলভাবেই থাকবে।
প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১৭
by Jahid | Jan 23, 2021 | দর্শন, লাইফ স্টাইল
এই ধরেন, কয়েকবছর আগেও আরেক মহল্লার বন্ধু আত্মীয়রা কে কেমন ফাঁপরে আছে, কেমন যাচ্ছে দিনকাল ; সেটা জানার সহজ উপায় ছিল না। শাশুড়ির কেলানি, ননদের কূটনামি , স্বামীর সঙ্গে খিটমিট করে গিন্নীরা ডালে পাঁচফোড়ন দিত, বাচ্চাকে খাওয়াতো। আর মাঝেসাঁঝে সুযোগ পেলে বলতো, যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যাবে। ঘটক শালা থেকে শুরু করে বাপ ভাইকে শাপান্ত করতো, কোন অলক্ষুণের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছে বলে ; বিড়াল পার করে আর খোঁজ নেয় না বলে। দুইবাড়ি পরের সমবয়সী কোন প্রতিবেশিনীর সঙ্গে কোন এক বিকেলে দেখা হলে, খুব মেপে মেপে সেই সাধারণ কথাগুলোই শেয়ার করতো যেগুলো খুব বিপদজনক বড় মাপের না। যেগুলো সারা পাড়া ঘুরে নিজের কাছে উল্টো ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। আর রাত হলে স্বামী সোহাগে দিনের কূটকচাল, অভিমান ভুলে যেতে যেতে ভোর হলে, সেইসব গিন্নিরা আবার লেগে পড়তো সংসারে।
সদ্য কৈশোরের বয়ঃসন্ধিকালীন অস্থির , ছাত্রাবস্থায় হালকা ডাব্বা মেরে স্যারের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে পাড়ার মোড়ে বিড়ি ফুঁকত যে ছেলেগুলো। আর আড়ে ঠারে মহল্লার সুন্দরী কিশোরী কখন ব্যালকনিতে আসে সেই প্রতীক্ষায় থাকতো যে ছেলেগুলো। সেই ছেলেরাই আবার চাকরি করতে গিয়ে ট্র্যাফিক ঠেলতে ঠেলতে শাপান্ত করতো সরকারকে। অফিসে বসের ঝাড়ি খেয়ে , পকেটমার হয়ে, বাসের ভিড়ে শার্টের হাতা ছিঁড়ে, হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে দরোজায় কড়া নেড়ে প্রিয়মুখ দেখে সব যেতো ভুলে।
আমাদের চিরচেনা সেই ছেলেমেয়েদের বয়স হয়েছে। এখন তারা অবাধ , নিরবচ্ছিন্ন অনলাইন ভার্চুয়াল পৃথিবী পেয়ে চরমভাবাপন্ন হয়ে গেছে। একটা ‘অনাবশ্যক’ হুতাশন আর অস্থিরতায় কাটছে তাদের এইসব দিনরাত্রি।
মানুষতো জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই নিজেকে প্রকাশ ও প্রমাণ করতে চায়। দেখবেন – তুচ্ছ মানবশিশু হামাগুড়ি দিলেও সারা পরিবার উচ্ছ্বসিত হয় ; হাঁটি হাঁটি পা পা করলেও সারা পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আধো আধো অর্থহীন বুলি ফুটলেও উচ্ছ্বাস, খাবার উগড়ে দিলেও উচ্ছ্বাস , হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেও , বাবা রে সোনা রে, ওরে কে রে বলে উচ্ছ্বাস। এই যে, কোন একটা কিছু করেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা ও মনোযোগ পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানবশিশু, বড় হতে হতে যখন দেখে, সে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই; বাড়ির বাইরে তো তার আর তেমন কোন পরিচয় নেই– তখন সে একটা কিছু হওয়ার জন্যে সে উঠে পড়ে লাগে। তারপর গুচ্ছের পড়াশোনা করে উপার্জনক্ষম হলেও কোথায় যেন মনোযোগের আকাল পড়ে। পাড়ার ডাকসাইটে সুন্দরী তরুণীদের বিয়ের কয়েক-দশক কেটে গেলে চারপাশে আর কোন মুগ্ধ চোখ কিংবা অকারণ উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্য থাকে না। সেটা তারা মেনে নিতে শেখে। সংসারে মন দেয়, ঘরকন্না করে, বাচ্চাদের বড় করে, বিয়ে দেয়।
ভার্চুয়াল জগতের আগের জগত ছিল কিছুটা আলোড়নহীণ। ভার্চুয়াল জগতের অনাবশ্যক ক্রমাগত বিস্ফোরক আলোড়ন আর উচ্ছ্বাস সুযোগ এনে দিয়েছে হুমড়ি খেয়ে পড়া শিশুটিকে ! সেই বয়স্ক শিশুটি পড়ে গেছে যেন তেন প্রকারে মনোযোগ পাওয়ার অভ্যস্ততার চিরন্তন চক্রে।
যা ঘটছে, আর যা আপনি ভার্চুয়ালি প্রকাশ করছেন , সেখানে কিন্তু আগেও ফাঁক ছিল। সেই ফাঁক , মাপাহাসি চাপাকান্নার সেই মেকি প্রদর্শনকামিতা ও সহানুভূতিলিপ্সা একইরকম আছে । তেমন কিছু বদলায়নি । পুঁজিবাদ, ভোগবাদিতার অন্য সব সার্বজনীন সুবিধার মতো এ শুধু সংখ্যাতেই বেড়েছে, বিশাল সেই সংখ্যা ! দেখার চোখ থাকলে, সহজেই দুঃখবিলাসী , প্রদর্শনকামী , অতিআত্মপ্রেমি, অস্থির , বিভ্রান্ত, পরশ্রীকাতর,অনাবশ্যক হতাশ, অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ঈর্ষাপরায়ণ সংখ্যাহীন মানুষকে দেখতে পাবেন।
যতোই ইমোজি থাকুক, মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলো কি আর বদলে যাবে এতো সহজে !
by Jahid | Dec 1, 2020 | লাইফ স্টাইল
নারীপুরুষ নির্বিশেষে একজীবনে বেশ কয়েকবার প্রেমে পড়ে। কেউ সেটা প্রকাশ করে , কেউ করে না ; কেউ করতে পারে না। যতো বড় ভালোবাসার বিয়েই হোক না কেন ; একযুগ পরে সেই ভালোবাসার তীব্রতা ফিকে হয়ে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা মাস ছয়েকেই হয়ে যায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতে বিবাহবিচ্ছেদের দামামা বাজে। সন্তানাদিসহ অথবা ব্যতীত সব ডিভোর্সের নানাবিধ সামাজিক, পারিবারিক , আর্থিক কারণগুলো সবাই খালি চোখে দেখেন , আলোচনা করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা আলোচনার বাইরে, অবহেলিত থেকে যায় , সেটা হচ্ছে দম্পতির যৌনজীবন। বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ শারীরিক সমঝোতা না হওয়া। শারীরিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। দাম্পত্যের শুরুতে বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের সেই উত্তুঙ্গ, শীর্ষানুভূতি থাকে তা একসময় থিতু হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন:
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।
যুগ পেরিয়ে দাম্পত্যে তখন একজনের অঙ্গ কাঁদলেও আরেকজনের আর কাঁদে না।
যাই হোক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসাবে, চল্লিশের পরপর অনেক পুরুষের টেস্টাস্টেরন হরমোন কমে না গিয়ে বরং বেড়ে যায় আর নারীর এস্ট্রোজেন হরমোন কমে গিয়ে ঋতুবিরতি বা মেনোপজ হয় ! এই প্রাকৃতিক অবিচার কীভাবে হয়েছে , কেন হয়েছে , কে জানে ! তাই, মাঝবয়সে সংসারের অনেক পুরুষ ঠিকই ‘ছোঁকছোঁক করে সম্ভোগের জন্য এবং চিহ্নিত হয় তথাকথিত যৌনকাতর হিসাবে। পুরুষ পরিতৃপ্তি খুঁজে ফেরে যেনতেন করে হলেও স্খলনের মাঝে। পুরুষ পৃথিবীর সকল সব চাপ ঝেড়ে ফেলতে চায় রাতের শয্যায়।
ওদিকে বিবাহিতা নারীটির শরীরে ভাটা এসেছে, মোটেও তা নয়। মেনোপজ বা প্রি-মেনোপজের মুখোমুখি হলে, শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়েও যৌনজীবন ধরে রাখা যায় ; সেটা না ভেবে , যৌনজীবন শেষ হয়ে গেছে বলে ভুল ধারণা করে বসে থাকে নারী। দৈহিকতা তখন আর নারীটির প্রায়োরিটি থাকে না। এটাও সত্য , বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নারী শুধুমাত্র স্ত্রী ও শয্যাসঙ্গিনী থেকে পরিবর্তিত হয়ে সার্বক্ষণিক ‘মা’ -এর দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই আমার মনে হয় দৈহিকতা নিয়ে একটা বোঝাপড়া মধ্যবয়সী দম্পতিদের থাকা উচিৎ। বোঝাপড়া স্বচ্ছ হলে, চাহিদা ও যোগানের ; আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির একটা ভারসাম্য থাকে। চাহিদার তুলনায় জোগানের পার্থক্যের কারণে দৈহিকতা বরং আরো বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সকল বিবাহিত পুরুষের সমস্যা বোধকরি এরকম: গতরাতে দৈহিকতা হয়েছে, আজ রাতেও হতে পারে। হলে ভালো হয়। অথবা গতকাল বা গত পরশু হয়নি , আজ হতে পারে, হওয়া উচিৎ। সে প্রায় প্রতি রাতেই একটা সুপ্ত কিন্তু উদগ্র যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। হতেও পারে, নাও হতে পারে ; হতেও পারে, নাও হতে পারে।
মাঝবয়সে এসে , সংসারে বিবাহিতা নারীর উপর সারাদিনে শারীরিক-মানসিক ধকল তো আর কম যায় না। তাদের সারাদিনের চিন্তা তো শুধু পুরুষের মতো রাতের শয্যার দৈহিকতা নিয়ে না। যুক্তিসঙ্গত কারণে হয়তো সেই রাতে যৌনতা হয় না। পরের রাতেও অনেক দেরি করে বিছানায় আসে নারী ; শ্বশুরের সেবা, সন্তানদের কোচিং , পরীক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। মধ্যবিত্ত পুরুষকুলের অফিস আর রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যামের কিছু হ্যাপা ছাড়া তেমন কোন শারীরিক কসরত থাকে না। তাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সঙ্গম। তাই একটা অনিশ্চিত বিরতির চক্রে পড়ে যায় তার তীব্র শারীরিক কামনা। এই যে, আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির একটা ফারাক তৈরি হয় ; সেখান থেকেই শুরু হয়, বিবাহিত পুরুষ ও নারীর দূরে সরে যাওয়ার চিরন্তন সমস্যা। খুব ধীরে ধীরে একে অন্যের কাছ থেকে শারীরিকভাবে তারা দূরে সরে যেতে থাকে। একজন আরেকজনের কাছে আরাধ্য না হয়ে অভ্যস্ত কিন্তু অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন এবং এটাকেই স্বাভাবিক ভাবা শুরু করেন। তৈরি হয় অনতিক্রম্য মানসিক দূরত্ব। নানা সুতোয় বাঁধা পড়ে সংসার চলে সংসারের নিয়মে, টুকটুক করে। কিন্তু সুর কেটে যায়। কারো কারো এভাবেই আরো কয়েকবছর কেটে গেলে যৌনতাহীন জীবনকেই স্বাভাবিক মনে হয়। সামাজিকভাবেও সেটা ভালো চোখে দেখা হয়, তাদেরকে বলা হয়, আর কত ! হয়েছে তো অনেকদিন।
ফিরে আসি আগের আলোচনায়। মূলতঃ ঋতুচক্র শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরপর কয়েকদিন নারী তার যৌন স্পর্শকাতরতার চূড়ায় থাকে। এ সময়ে নারী যৌনতা তো উপভোগ করেই ; পুরুষের জন্যও সেটা উপভোগ্য হয়। ঋতুচক্র শুরু আর শেষ এবং অব্যবহিত পরে মোট ১০ দিন নিরাপদ সময়ে ন্যূনতম ২ বা ততোধিক দিন যৌনতা থাকলে ভাল। এরপরের বাকী থাকে অনিরাপদ ১৭/১৮ দিন । এই দিনগুলোতে সর্বোচ্চ কতোদিন দিন আকাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিৎ ? প্রতি তিনদিনে একদিন হলে ছয় বার । সেটা পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষিত হলে তো কোন সমস্যা না। কিন্তু আমাদের সংসারের নারীরা হয়তো এই বয়েসে এসে এই ফ্রিকোয়েন্সির জন্য সামাজিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। অথচ বেশিরভাগ পুরুষ ভেবে থাকে, একদিন পরপর তিন সপ্তাহে ন্যূনতম ৮ বা ১০ বার যৌনতা তো হওয়া উচিৎ। যৌনতার এই ফ্রিকোয়েন্সি, বিবাহিত জীবনের শুরুতে খুব স্বাভাবিক, কিন্তু মাঝবয়সে এসে প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি বলে নারী ধরে নেয়।
পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, হোমোস্যাপিয়েন্স পুরুষ জেগে থাকার সারাক্ষণ তো যৌনকাতর হয়ে থাকেই ; ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও সে যৌনতার স্বপ্নই দ্যাখে। অথচ অন্য সকল প্রাণী বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে যৌনকাতর হয়। তাদের যৌনতা বিবর্তনের ধারায় বংশবৈচিত্রের ও বংশরক্ষার। গরু, ছাগল, হাতি ঘোড়া, বাঘ, সিংহ থেকে থেকে শুরু করে সকল পশুপাখি ঘরের কুকুর বিড়ালও শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মাসে কামার্ত হয়। বছরের বাকী মাসে এদের খাদ্য-সংগ্রহ, সন্তানের লালনপালন ছাড়া অন্য কোন কর্মবৈচিত্র থাকে না। নারী প্রাণীদেরও ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এই হোমোস্যাপিয়েন্সদের যৌনতা শুধু বছরের নির্দিষ্ট সময়ের বংশ-প্রকৃতি রক্ষার জন্য না। যৌনতার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক প্রেক্ষাপট, সবল-দুর্বলের হিসাব, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিকতা রক্ষার চেষ্টা বা পরিশেষে নিখাদ আনন্দ লাভই মুখ্য হয়ে থাকে। আমরা যৌনতার ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় বেশ একটা ব্যতিক্রমী আচরণ করে থাকি। সে আরেক আলোচনা।
হোমোস্যপিয়েন্স নারীর যৌনতার জাদুর কাঠি বিবর্তনের ধাক্কায় আরো গভীরে চলে গেছে। ভেবে দেখেন যে, পুরুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্নায়ুগুলো দেহের বাইরে যৌনাঙ্গের মাথায় পাতলা একটা চামড়ার নীচে প্রায় উন্মুক্ত হয়ে আছে । আর অন্যদিকে নারীর স্পর্শকাতর জি-স্পট , অর্গাজম অথবা চরম-পুলক নিয়ে চলছে যুগের পর যুগ তর্কবিতর্ক। যেটা সচরাচর দেখা যায়, নারীদের জি-স্পট চামড়ার প্রায় দুই-তিন ইঞ্চি গভীরে। সেটিও অনেক নারী চিহ্নিত করতে পারে ; বেশিরভাগই পারে না। পুরুষের চরম-পুলক স্খলনের মাধ্যমে জাজ্বল্যমান। নারীর ক্ষেত্রে সেটা চিররহস্যময়। সুতরাং স্পর্শকাতরতায় হোমোস্যাপিয়েন্স পুরুষ প্রজাতি খামোখাই এগিয়ে আছে। পোশাক থেকে শুরু করে কোন কিছুর হালকা ঘর্ষণেই সে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আর নারীর যৌনতাকে ধীরে ধীরে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে জাগিয়ে তুলতে হয়; তাকে সিক্ত করতে হয় তারপরে না সেই আরাধ্য যৌনমিলনের প্রশ্ন আসে।
পুরুষদের যৌনকাতরতার কথা বলে শেষ করলে আলোচনা বড্ডো একপেশে হয়ে যায়। দিনশেষে আমি লেখক, নিজেও একজন পুরুষ। নিরপেক্ষতার জায়গাটা থাকছে না। যৌনতায় অনুৎসাহী নির্জীব পুরুষও নারীদের কাছে একইরকম যন্ত্রণার। উপমহাদেশের নারীর বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। মাসের পর মাস, পুরুষের নির্জীবতার কথা কাউকে বললে ছিনাল বা খাইখাই নারী হিসাবে কুখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পুরুষকে যৌনতায় আগ্রহী করে তোলা ও যৌনজীবনে বৈচিত্র্য আনার কথা নারী কখনই বলে উঠতে পারে না। অথচ পাঠক, ‘কামসূত্র’ আমাদের এই উপমহাদেশেরই আর তা নিয়ে পশ্চিমের গবেষণা অদ্যাবধি চলমান। পুরুষ সামাজিকতা থেকে জেনে বসে আছে যে, যৌনতার পরিমিতিবোধ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক। আর নারী সেই বাল্যকাল থেকে মা-খালাদের কাছে শিখে এসেছে যৌনস্পৃহাকে অবদমিত করে রাখতে হয়। এ রকম একটা প্রাগৈতিহাসিক মনোভাব , যৌনতাকে অস্পৃশ্য ভাবা যে অসুস্থতা, সেটা নারীকে কে বোঝাবে !
দাম্পত্যের বাইরে যৌন স্বাধীনতা পুরুষের যৎসামান্য থাকলেও নারীর ক্ষেত্রে তা শূন্যের কাছাকাছি। পুরুষ হিসাবে আপনি মিক্সড ফ্রুট সালাদ বা রুচির পরিবর্তনের কথা ঠাট্টা করে হলেও বলতে পারেন, বড়ো কোন অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না তা। কিন্তু নারী রুচির পরিবর্তনের কথা বললেই, সারা সমাজ তাকে বেশ্যামাগী থেকে শুরু করে যতোরকম পুরুষতান্ত্রিক অশ্লীল গালিতে জর্জরিত করে ফেলবে।
সারাদিন পরে ঘরে ফিরে পুরুষ স্নানাহার সেরে পত্রিকা হাতে টিভির সামনে বসে পড়ে। আর ভাবে, সে সারা দুনিয়া উদ্ধার করে এসেছে। অন্যদিকে, নারী সারাদিনের কাজের চাপে নিজেকে সিনিয়র গৃহপরিচারিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নিজেকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে পরস্পরের কাছে উপস্থাপনের তাগিদ বিয়ের প্রথম কয়েকবছর থাকে। তারপরে পুরুষ তার নোয়াপাতি ভুঁড়ি চুলকাতে চুলকাতে, গোঁফের কোনে ডালের দাগ মেখেই টিভি দেখতে বসেন। আর নারী সেই সকালের পরিহিত সালোয়ার বা শাড়ী যেটা ঘামে ভিজে দুর্গন্ধ হয়ে গেছে সেটা নিয়েই আশেপাশে গৃহকর্ম করে যেতে থাকেন। গুটি কয়েক সচেতন নারী ও পুরুষ হয়তো শয্যায় আসার আগে স্নান সেরে সুগন্ধি মাখেন। নিজেকে একটু হলেও ছিমছাম ও আকর্ষণীয় করে তোলেন, সে যৌনতার কারণেই হোক বা এমনিতেই।
উল্টোদিকে কর্মজীবী নারীরা নিজেকে তার অফিসের জন্য যেভাবে প্রতিদিন প্রস্তুত করে, তার ছিটেফোঁটাও কি গৃহের পুরুষটির জন্য করে ? ‘ঘর কা মুরগি ডাল বরাবর’ তাই বলে সবকিছুকেই সহজলভ্য ও চিরস্থায়ী ভাবার বোকামি করা কি ঠিক ? অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আর যৌন স্বাধীনতাকে এক করে ফেলেন তারা। দিনশেষে তাদের আচরণও একজন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষের মতো হয়ে যায়, সেটা তারা টেরও পান না। যখন টের পান ; তখন সম্পর্কের তারে মরিচা ধরে যায়।
ঘরের নারীকে শরীর সচেতন হতে বললেই সেটা পুরুষতান্ত্রিক চাহিদা হয়ে যায় না। নারীকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে থাকতে বললেই সেটা বাজারের বা মিডিয়ার নারীর ছলাকলায় অভ্যস্ত নারীদের সমতুল্য করা হয় না। একটা স্বাভাবিক পরিচ্ছন্ন প্রবৃত্তিকে অবহেলা করে আমাদের দাম্পত্য ও সংসারে আমরা কোন স্থায়ী সম্পর্কের প্রমাণ দিয়ে চলি , সেটা কে জানে !
তাই, হে পুরুষেরা ! নারীকে বুঝুন, নারীর যৌনতাকে বুঝুন।
আর হে নারীকুল ! পুরুষদের শারীরিক দুর্বলতাকে বুঝুন । পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়ার এই সম্পর্ককে একটা নিয়ন্ত্রিত কিন্তু আনন্দময় অবস্থানে নিয়ে আসুন। মধ্যবয়সে পুরুষ যেন নিজেকে রিক্ত বা যৌনবঞ্চিত না ভাবে।
আবারো মনে করিয়ে দিই, জীবন সংক্ষিপ্ত, যৌনজীবন তারচেয়েও সংক্ষিপ্ত ! তাই সেটা উপভোগ্য করে তুলুন।
পাঠ করার জন্য ধন্যবাদ।।
প্রকাশকালঃ ১২ই অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Dec 1, 2020 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
বড়কন্যার ছোটবেলা থেকেই মাছমাংসে অনীহা। সদ্য কৈশোরে পড়েছে। নিজের মতামত আছে । আবার, আমাকেও ওর মত মন দিয়ে শুনতে হয়। যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হয়। এই প্রজন্মের নতুন ট্রেন্ড প্রাণীজ আমিষ বর্জন করে নিরামিষাশী হওয়া। কেউ ভেজিটেরিয়ান কেউ কট্টর ভেগান। এরা প্রাণীহত্যাকে নিরুৎসাহিত করে। প্রাণীজ আমিষ না খাওয়ার পিছনে হাজারটি কারণ দেখায়। স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে গ্লোবাল ওয়ার্মিং পর্যন্ত এর প্রভাব। বড়টির দেখাদেখি ছোটকন্যাও একই পথের। সেও দুপুর ও রাতের দৈনিক খাবারে মাছমাংস খেতে চায় না। তবে, ফাস্টফুডের দোকানে ফ্রাইড চিকেনে এদের আপত্তি নেই ! চিকেন বারবিকিউ পিজা, বিফ পিজায়ও নেই কোন আপত্তি।
গত দুই দশকে বেশিরভাগ শিশুকিশোরদের মাছ মাংসের ব্যাপারে অনীহা দেখছি। তবে একটু বয়স হলে বন্ধুদের সঙ্গে চলে চলে অনেকটা ঠিক হয়ে যায়। কেন এদের এই অনীহা ? আমার ধারণা এই অনীহা এসেছে সহজলভ্যতা ও প্রাচুর্য থেকে। আশির দশকে , আমাদের ছোট্ট সংসারে অন্যতম বিনোদন ছিল ছুটির দিনে একটু ভালমন্দ খাবার। গরুর মাংস, সঙ্গে সিজনাল মাছ। আর শাকসবজি তো প্রাত্যহিক ছিল। সকালের নাস্তায় হঠাৎ দুয়েকদিন পর সবজি ভাজির সঙ্গে ডিম। আস্ত ডিমের চেয়ে ভাগাভাগিটা ছিল স্বাভাবিক। কারো বাড়ি বেড়াতে গেলে অথবা বাসায় দাওয়াত থাকলে , তবেই ছোটবড় সবার পাতে আস্ত ডিম পাতে পড়ত।
কবে থেকে শুরু হয়েছিল মনে নেই, তবে সপ্তাহের একদিন ছিল মিটলেস ডে। ঐদিন কসাইখানায় গরুছাগল কাটা হোতো না। নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তের জন্য তরকারি বাড়ন্ত থাকত। সবকিছুই মেপে রান্না করা হতো। মায়েরা ভাত বেড়ে বাতাস করতে করতে তরকারি বেড়ে দিত। খাবার সময়ে কেউ না কেউ পাশে বসে থাকত। আবার কৈশোরে কোচিং সেরে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে আলাদা বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখা হোতো।রঙ্গিন টিভি আর ফ্রিজ মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে ঢুকেছে ৯০ এর দশকে। আর ফ্রিজ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাজা সবজি আর তরতাজা মাছমাংসের স্বাদ ভুলতে বসেছি আমরা।
আমার এক স্কুলবন্ধু ফ্রিজের খাবারের ব্যাপারে ভীষণ বিরক্ত ছিল। বাঘ সিংহ যেমন শিকার করে একটু খেয়ে ফেলে রাখে দেয় , মড়ি বানায় ; তারপরে দুইদিন পরে এসে আবার খায়। ফ্রিজ আসার পরে আমাদের অবস্থা হয়েছে তাই। তাজা খাওয়া বাদ। বাজার থেকে যা আসে, সব ঢুকে পড়ে ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজের গভীর পাকস্থলীতে। দিনের পর দিন , মাসের পর মাস অথবা বছর জুড়ে ঠাণ্ডায় জমে জমে প্রতিটা কোষের সাইটোপ্লাজম আর মাইটোকন্ড্রিয়ার রস বের হয়ে শুকনো ছিবড়ে হওয়ার পরে রান্নার চুলায় পৌঁছায় তা। সেই ছিবড়ে হওয়া মাছমাংসে কতোখানি পুষ্টিগুণ থাকে জানিনা ; তবে ন্যাচারাল স্বাদ যে পুরোটাই চলে যায়, সে দিব্যি করে বলা যায়।
আর কী নেই সেই ফ্রিজে ! এই বছরের কোরবানির মাংস, পরের বছরের শবে বরাতে খাওয়া। এপ্রিল-মে মাসের তাজা ইলিশ মড়ি হয়ে পড়ে থাকে ফ্রিজের এক কোনায়। পহেলা বৈশাখে সেই বিস্বাদ ইলিশ পাতে ওঠে। কিছুদিন আগে বাসার ডিপ ফ্রিজ গেল বিগড়ে । আমার গিন্নী ধীরে ধীরে সবকিছু বের করা শুরু করলেন। করোনাকালীন বাসায় থাকি বলেই, সেই দুর্লভ দৃশ্য চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হল । একেকটা আইটেম বের করেন আমি বিস্মিত হই। অপেক্ষা করি আর কী বের হয় দেখার জন্য ! কবে কোন প্রস্তর যুগে কক্সবাজারের কেনা শুটকি মাছ থেকে শুরু করে গাজর, ছোলা, মটরশুঁটি কী নেই ! মাছ মাংসের পোঁটলাগুলোর এমনতর অবস্থা যে, গিন্নী নিজেই ভুলে গেছেন ভিতরে কোন পদের মাছ ! পুরো ফ্রিজের মালপত্র বের করা দেখে বিস্মিত হচ্ছি দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন , আমি কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছি কীনা । আমি বললাম, যেভাবে অতিপুরাতন জিনিসপত্র বের হচ্ছে, এক পোঁটলা ডাইনোসরের মাংস কখন বের হবে সেই অপেক্ষা করছি। ফ্রিজ নষ্ট হওয়ায় তার মেজাজ এমনিতেই তিরিক্ষে , তারপরেও একটা অগ্নিদৃষ্টি হেনেই বিরতি দিলেন। কিছু পোঁটলা হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিকটাত্মীয়দের বাসায় ফ্রিজ না সারা অবধি রেখে আসতে বললেন।
সেকালে , আমরা মাছ মাংস ডিম , আমিষের কাঙাল ছিলাম। সপ্তাহের পরপর দুইদিন শুধু নিরামিষ হলে মুখ অন্ধকার হতো। আম্মা গজগজ করতে করতে দুইভাইকে ডিম ভেজে ভাগ করে দিতেন। অথচ, অধুনা মধ্যবিত্তের ঘরে ডিম, মাছ, মাংস মজুদ থাকে সারামাসের জন্য, প্রায়শ: সারা বছরের জন্য। কিন্তু প্রাচুর্যের চাপে শিশুকিশোরেরা দৈনিক বাসায় তৈরি প্রাত্যহিক খাবারের চেয়ে ফাস্টফুডে আসক্ত। মাছেভাতে বাঙালি নাম ঘুচে যাওয়ার উপক্রম।স্বাস্থ্যচিন্তা, পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ফ্রিজে রাখা বিস্বাদ আমিষের প্রভাব পড়েছে বড়দের উপরেও। নানা কারণে অনেকেই মাংস এড়িয়ে চলেন।
বড়কন্যার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ওর প্রিয় আলু ভর্তা , ডিম ও যে কোন ধরণের সবজি। ঢেঁড়স সবচেয়ে প্রিয়। মুরগির মাংস কদাচিৎ মুখে তুললেও গোমাংস দেখলেই নাক কুঁচকায়। যেহেতু কৈশোরে পা দিয়েছে, ওর মতামতের দাম দিই , জোরাজুরি না করে, জানার চেষ্টা করি। কেন খাচ্ছে না বোঝার চেষ্টা করি। একদিন বললাম মাছমাংস না খেলে বাড়ন্ত শরীরে নানা প্রোটিন, ভিটামিনের কমতি থেকে যেতে পারে। পড়াশোনা করে বলে, উল্টো আমাকে নানা তথ্য উপাত্ত দিয়ে বোঝাল যে ভেগানরা পৃথিবীর জন্য অনেক উপকারী। সে বড় হলে ভেগান হবে।
গতকাল খেতে বসে বললাম, প্রাণীহত্যা বা যে কোন প্রাণহত্যা যদি খারাপ হয়। তাহলে তো সবজি খাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। সকল উদ্ভিদের প্রাণ আছে, প্রমাণিত সত্য। সে হু হা করল। আমি বললাম, তোমার সবচেয়ে যে প্রিয় খাবার ডিম ; সেটাও খাওয়া বাদ দেওয়া উচিৎ। কারণ প্রতিটি ডিম একেকটা সম্ভাব্য মুরগি অথবা মোরগ।
আমরা একটা দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যদিয়ে কৃষিতে থিতু হয়েছি। ছিলাম তো একসময় মাংসাশী শিকারির দল। আর প্রাণিজগতে ফুডচেইন বা খাদ্যশৃংখলে একজন আরেকজনের উপর নির্ভরশীল। এখানে এক প্রজাতি আরেক প্রজাতির খাবার বলেই না শৃঙ্খলা আছে। আর শুধুমাত্র খাবারের জন্য চাষাবাদ করে যে মাছ মাংস উৎপাদন করা হচ্ছে সে গুলো খেলে সমস্যা কোথায়, সেটাই দুর্বোধ্য !
অবশ্যই খাদ্যাভ্যাস যার যার। কিন্তু একজন আমিষাশী মানুষ খারাপ আর আপনি নিরামিষাশী বলে ভাল মানুষ হয়ে গেলেন , সেটা কিরকম কথা ! প্রতি মুহূর্তে আমাদের নিঃশ্বাসে কোটি ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস ও অণুজীব ঢুকছে, কেউ বেঁচে থাকছে, কেউ মরে যাচ্ছে। তো, এদের জীবনরক্ষার্থে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকতে হবে ?
প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই প্রাণীহত্যা নিয়ে আহা উঁহু করাটা আমার কাছে বড্ডো আদিখ্যেতা মনে হয়। সারাবছর তো ডিম,দুধ, মাছমাংস খেলেন ; এখন কোরবানির বিরোধিতা করে সারাদেশের এতোবড় একটা অর্থনৈতিক চক্রকে তুচ্ছ জ্ঞান করার কী আছে !
আমার বয়স অর্ধশতকের কাছাকাছি। গোমাংস ও সকল লোহিতমাংস ( রেডমিট) খাওয়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু আমি কম খাই বা বেশি খাই সেটা আলোচ্য নয়। আমার বিশ্বাস পশু কোরবানির এই ট্রেন্ড ধর্মীয়দৃষ্টিতে যতোটা যৌক্তিক , অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে সেটা আরো বেশি যৌক্তিক। পুরো কোরবানিকে ঘিরে লক্ষলক্ষ পরিবারের পশুপালন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ভাগ্য জড়িত।
কোরবানি দিন এবং দিন কয়েক কবজি ডুবিয়ে খান।
সবাইকে ঈদ মোবারক। ঈদের শুভেচ্ছা ।
প্রকাশকালঃ ৩১শে জুলাই,২০২০
by Jahid | Dec 1, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন, লাইফ স্টাইল
সততার নানা রকমফের আছে– আর্থিক, ধার্মিক, আত্মিক, শারীরিক ইত্যাদি। শুধু অর্থনৈতিক সততার ব্যাপারে নিজস্ব কিছু স্বগতোক্তি! মোটা দাগে, আমার দেখা তিনটি শ্রেণী আছে। আমি জাজমেন্টাল হতে চাচ্ছি না, কারণ আমি নিজেও একটা গ্রুপে পড়ি !
প্রথম শ্রেণীঃ আপনি নিখাদ অসৎ। আপনি জানেন, আপনি কিভাবে অর্থ উপার্জন করছেন। পরিবারের ও সমাজের আশেপাশের সবার কমবেশি ধারণা আছে আপনার বেতন ও সম্পদের বৈষম্যের ব্যাপারটা। পৃথিবীর সকল প্রাপ্য ও অপ্রাপ্য সুবিধা আপনার চাইই চাই । যোগ্যতার চেয়েও বেশীকিছু আপনার পায়ের কাছে গড়াগড়ি দেবে ; কঠিন পৃথিবীতে ধাক্কা খেতে খেতে , সেটা কীভাবে করতে হয় আপনি শিখে গেছেন। সততা, নৈতিকতা ইত্যাদি নিয়ে দোটানায় থাকার মতো বিলাসী সময় আপনার নাই। আরো চাই, আরো চাই করতে করতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছেন। তবে সোসাইটির কাছে আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ! আপনার মতো এই বিশেষ শ্রেণি না থাকলে , শিল্পায়ন অসম্ভব ও পুঁজিবাদের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটত ! আপনার ধার্মিকতা নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন নেই। পরিপার্শ্বের কাছে, আপনার এলাকায়, বন্ধুমহলে আপনার অর্জিত সম্পদের গল্প ঈর্ষার সাথে বলা হতে থাকে।
দ্বিতীয় শ্রেণীঃ মূলত: আপনি অসৎ ও লোভী। কিন্তু সমাজে সৎ হওয়ার ভান করে সম্মান পেতে আপনি প্রতিনিয়ত উন্মুখ ! সবাইকে সততার কথা বলেন। অথচ আপনি ঠিক ঠিক জানেন কতটুকু আপনার প্রাপ্য, আপনার মাত্রাতিরিক্ত অনোপার্জিত অর্থ নিয়ে আপনার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। আপনি সর্বদাই নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছেন- আমি ঠিক পথেই আছি ; এই যুগে এভাবেই সম্পদ অর্জন করতে হয়, এভাবেই করা উচিৎ, সবাই এভাবেই করে ! সময় গেলে এই সুবর্ণ সুযোগ আর পাওয়া যাবে না ! আপনি দান-ধ্যান করেন , ধর্মেও মন আছে। কিন্তু মনের গহীনে এই প্রাচুর্যের ব্যাপারে আপনি চিন্তা করতে করতে আবার গা ঝাড়া দিয়ে টাকা কামানোতে মন দেন । যদিও আপনি জানেন , অনেক যোগ্য লোকের চেয়ে বেশীরকমের প্রাচুর্যে আছেন। তবুও প্রথম শ্রেণীর ওই পরাক্রান্ত, চক্ষুলজ্জাহীন দুর্দান্ত সাহসী অসৎ লোকদের সঙ্গে তুলনা করে আপনি নিজেকে সৎ ও ধার্মিক ভেবে সান্ত্বনা পেতে চান !
তৃতীয় শ্রেণীঃ আপনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ! কারণে বা অকারণে কেমন করে যেন আপনি সু্যোগের অভাবে সৎ থেকে গেছেন ! কিন্তু পূর্বোক্ত দুই শ্রেণীর বৈভব ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়ে সারাক্ষণ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের মত নিজেকে ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির ভাবতে থাকেন। ধার্মিকতা পুরোটাই আছে । কী কী সম্পদ করেছেন , এইসব প্রশ্ন আসলেই সুযোগমত আপনি যে সৎ সেটা তোতাপাখির মত কপচাতে থাকেন। আপনি সৎ সেই কথা বলে , নিজের পিঠ নিজে চাপড়ান, শ্রোতার কাছ থেকে সান্ত্বনা বা সততার বাহবা পেতে চান !
আগের দুই শ্রেণীর ব্যাপারে একটা ক্ষোভ মেশানো ঈর্ষা আপনাকে ক্লান্ত করে। তাদের অসততা যতোটুকু আছে তার চেয়েও বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের আপনি পশুতুল্য করে নিজের বঞ্চনার ক্ষতে বাতাস দিতে থাকেন। যা আপনি ভুলে থাকতে চান, তাই আপনাকে গ্রাস করে প্রতিমুহূর্তে ! মনের গহীনে যথারীতি প্রাচুর্যে উপচিয়ে পড়া শ্রেণিকে ঘৃণা করেন। সমস্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছু কেন আপনার নেই, সেটা নিয়ে হা হুতাশতো আছেই !
এই তিন শ্রেণীর বাইরেও ক্ষীণধারায় আরো কয়েকটি শ্রেণি আছে হয়তো ! তবে কারা যে হাস্যকর রকমের বেদনাদায়ক , ক্ষতিকর বা প্রয়োজনীয় সেটা অবশ্য এখানে আলোচ্য নয়!
by Jahid | Dec 1, 2020 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
শৈশবের বইপড়ার অভ্যাস সেবা প্রকাশনী দিয়ে শুরু হয়েছিল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একটা পাঠ রুচি তৈরি করে দিয়েছে।
ছোটবেলায় যে কোন বই এক বসায় অথবা একটানা কয়েকদিনে শেষ করেছি। সমরেশ মজুমদার , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঢাউস আকৃতির বইগুলোর পাঠস্মৃতি মনে আছে। এখন বৃহদায়তনের বই পড়া শুরু করার আগে গেলে তিনবার চিন্তা করি। শুরু করলে কবে শেষ হবে ; আদৌ শেষ হবে কীনা কে জানে ! কয়েকটা বই একসঙ্গে শুরু করে , দেখা গেল কোনটাই শেষ না করে ফেলে রেখেছি।
গত কয়েকবছরের বইমেলায় কেনা বই পড়া হয়নি। বই পড়ার সেই প্যাশন জীবিকার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়েছে বহুবছর আগেই। জীবনে বই একমাত্র বিনোদন নয় আমাদের প্রজন্মের। অনলাইন সাহিত্য, ব্লগ, ফেসবুক এসে বইয়ের জায়গা দখল করেছে।
বড়কন্যার বইপড়ার অভ্যাস শুরুতেই আমার মধ্য-চল্লিশের মতো। একসঙ্গে কয়েকটা বই শুরু করে আর একেকটা একেক বেলায় পড়ে। আরেকটা বড় পার্থক্য হচ্ছে, সে পড়ে ইংরেজি ভাষার বই। আমি সারাজীবনে ইংরেজি নন-ফিকশন বই পড়েছি ঠ্যাকায় পরে সাকুল্যে হাতে গোনা কয়েকটি। আর বড়কন্যার স্কুলের পড়াশোনার মাধ্যম যেহেতু ইংরেজি ; ঐ ভাষাতেই ওর স্বাচ্ছন্দ্য বেশি।
আজ সকালে ওর পড়ার টেবিলে কী কী বই পড়ছে সেটা চোখে পড়ল।
আর নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল।
প্রকাশকালঃ ২রা জুলাই,২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য