বন্ধু দিবসে

বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হয়তো পরিবর্তিত হয় না ; মহাকালের স্রোতে বন্ধুত্বের এলাকা বাড়ে কমে, পরিমাপের মাপকাঠি বদলায়। মিরপুর বাংলা স্কুলের প্রথম দিনে পল্লবের সাথে বসার জায়গা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি। অতঃপর বন্ধুত্ব। যোগাযোগ নেই বছর কুড়ি। মঞ্জুরুল হাসান তুহিন ও শহীদ মোক্তারের সাথে দেখা, পরে তীব্র বন্ধুত্ব।স্কুল বদলে ক্লাস সিক্সে বাংলা স্কুলে আসলেও এরা আমাকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিলো।শাহীন, শামীম, জিল্লুর( রুবেল), শফিক, মিজান, টোটা, হাবিব , রিয়াদ,লাবু, সুমন( হায়দারের বড়ি), মাসুদ, রোল ৫ স্বপন , ফটকা স্বপন, ধলা স্বপন,পপুলার লাইব্রেরী সোহেল, সাইকেল সোহেল , মনা, জাহাঙ্গীর, সাইফুল আজম, জহির, পারভেজ( আর্মি) , কালা পারভেজ, তন্ময়, বাবু, ইলিয়াস, গলাছিলা মিঠু, কাইল্ল্যা মিঠু, সালাহউদ্দিন জুয়েল, নিজাম, স্বপন-সজল( দুইভাই) আরো কতো ! জাকির ছিল ফার্স্ট বয়,ওর সাথে আমার ছিল সম্মানজনক নিরাপদ দূরত্ব ! আশে পাশের স্কুলের আদমজীর ঝুলন, মনিপুরের মাহিনদের সাথে কলেজে ওঠার আগেপিছে পরিচয় । মহল্লা আলাদা হিসাব, আগের দুই ব্যাচ পর্যন্ত সিনিয়র জুনিয়র ছিলনা। আগের ব্যাচগুলোর কমল, সুমন, লিটু, এজাজ, চাইনিজ জুয়েল যেমন ছিল ; পরের ব্যাচের জিন্নাহ, আরেফিনরাও ছিল। কোনদিন যদি অটোবায়োগ্রাফি লিখি আমার জীবনের একটা বড়ো সৌন্দর্য ও বেড়ে ওঠার গল্প এদের সঙ্গে।
ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের খুব খুব সামান্য সময়ে আসলে সেভাবে বন্ধুত্বের শিকড় গজায় না। স্বল্প পরিসরে আদমজীর আনোয়ার হক শুভ, মনিপুরের কয়েকজন, গভঃ ল্যাব সেন্ট জোসেফের কয়েকজন, এছাড়া বিভিন্ন ক্যাডেট ও জেলা স্কুলের ভয়ংকর মেধাবীরা। এদের সাথে একদম যোগাযোগ নেই , হবেও না মনে হচ্ছে।
পরে ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা ফ্যাকাল্টি মাইগ্রেট (পরিসংখ্যান , রসায়ন ও ফলিত রসায়ন ) করতে করতে ইয়ার লস করে টেক্সটাইলে। এখানে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো আবারো, সেই স্কুল জীবনের মতো।
ওপেক্সের নতুন কর্মজীবনে আরো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাওয়া। টেক্স-ইবোতে এসে আবারো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকা বাড়লো।
আমার সবসময়ের অন্তর্মুখিতা, আলসেমি ঔদাসিন্যে কারো সাথে যোগাযোগ করিনা । কিন্তু, আমার বন্ধুভাগ্য আসলেই ঈর্ষণীয়। এঁরা কেমন করে যেন জেনে ফেলেছিল জাহিদ/জুয়েল ছেলেটা এরকমই।তারাই সারাক্ষণ আমাকে আগলে রেখেছে, যোগাযোগ করে চলেছে, ক্ষমা করে চলেছে। যেটা আমি ডিজার্ভ করি না, সে রকম একটা তীব্র ভালোবাসা এঁদের কাছে থেকে সারাজীবন পেয়ে পেয়ে আমি বখে গেছি। ধরে নিয়েছি এটাই স্বাভাবিক।
এখন আমার কাছের বন্ধু আমার টুনি ও দুই টুনটুনি। আমার অনেক ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ক্রোধ, কান্না, তীব্র ভালোবাসা, উচ্ছল আনন্দ এদের সঙ্গে।আমি কোন বিশেষ দিবসে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু , উৎসবের উপলক্ষ পেলে সেটাও ছাড়িয়া। বন্ধুত্ব চিরকালের ,সে যে ফরম্যাটেই হোক না কেন !

প্রথম প্রকাশঃ ২রা আগস্ট, ২০১৫

ট্রেডের মুরব্বীদের প্রেডিকশন মেনে নেবেন কীনা

কয়েকদিন আগে ক্লাস নিতে গিয়ে একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম।
ট্রেডের সিনিয়র হিসাবে অনুজ একজন শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা, ‘স্যার আমাদের অর্থনীতি আর গার্মেন্টস টেক্সটাইলের ব্যাপারে আপনার প্রেডিকশন কি?’

আমি বললাম, আমার প্রেডিকশনের কোন মূল্য আছে কী?

আমাদের রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী মন্ত্রী, নেতা, থেকে শুরু করে আমাদের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা ঝাল-টক শোর বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা নানা ধরণের প্রেডিকশন করছেন এবং তাঁরা সম্ভবত: সেটা দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা অথবা পরের মুখে ঝাল খেয়েই করছেন। অনেকসময় নিজেদের নিকট অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করে করছেন।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, কীভাবে যেন আমি টের পেয়ে গেছি—পৃথিবী আসলে চালাচ্ছে গুটি কয়েক অসম্ভব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজির মালিকেরা।

তাদেরকে বললাম, ধরেন ফেব্রুয়ারির এক সকালে কফি খেতে খেতে ভ্লাদিমির পুতিন সাহেবের মনে হল, নাহ্ ইউক্রেন আর ন্যাটোর বাড়াবাড়ি আর তো সহ্য হচ্ছে না। এর একটা বিহিত করা দরকার। সে আক্রমণ করে বসল ইউক্রেন।

একজন লোকের একটা সিদ্ধান্ত।
কিন্তু গোটা পৃথিবীর বাকী ৮০০ কোটি লোকের নাভিশ্বাস !

আবার একইভাবে ধরেন, চায়নার RMB (রিনমিনবি) কারেন্সি ইউএস ডলারের বিপরীতে ৬ থেকে ৬.৭৫ এর মধ্যে আছে বহুদিন ধরে। এটা পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে একটা সাম্য রেখে চলছে। চীনের মুদ্রানীতি ও সাপ্লাই চেনের উপর সারাবিশ্ব নির্ভরশীল হয়ে আছে।

কোন এক সকালে চীনের সকল ক্ষমতার অধিকারী জনাব প্রেসিডেন্ট শি জিন-পিং সাহেবের কফি খেতে খেতে মনে হতে পারে, চীনের মুদ্রা রফতানির স্বার্থে অবমূল্যায়ন করলে ভালো হয়। তিনি আদেশ দিয়ে বসলেন, কাল থেকে রিনমিনবি ৮ বা ৯ অথবা আরো বেশি হবে ইউএস ডলারের বিপরীতে।

দেখেন, একজন লোকের একক সিদ্ধান্তে পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে কী যে একটা হুলুস্থুল লেগে যেতে পারে। কেউ চিন্তাও করতে পারবে না কী দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে তৃতীয় বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ , যদি চীন তাঁর মুদ্রা হুট করে অবমূল্যায়ন করে।

আমাদের আপাত চেনা অথচ অচেনা পৃথিবী একটা জটিল দুর্বোধ্য নিয়মে চলে। কখন কোন্ রাষ্ট্রের কোন্ সিদ্ধান্তে আমাদের মতো ‘গরীবের বউ সবার ভাবীর’ কী যে দুর্যোগ নেমে আসবে তা কে জানে !

সুতরাং বড় বড় হরিদাস পালেরাও অনেক কথাই বলবে , সেটা শুনবেন , প্রচুর পড়াশোনা করবেন , কিন্তু যে কোন একজনের প্রেডিকশন নিজের ভিতরে নেবেন না। জানেন তো, Economist is someone who can explain why the things they predicted yesterday didn’t happen today ! অথবা An Economist is an expert who will know tomorrow why the things he predicted yesterday didn’t happen today!

অনুজ ছাত্ররা আমার অজ্ঞতা ঠিকই ধরতে পারলো বোধ করি।
কিন্তু মুরব্বী বলে আমাকে আর বিব্রত করলো না।

প্রথম প্রকাশ: ৩০শে জুলাই,২০২২

ফরচুন কুকিজ

এক রেস্টুরেন্টে খেতে বস্‌ছি কয়েকদিন । ওয়েটার খাওয়া শেষে চাইনিজ কুকিজ দিল সবাইকে। এইটারে মনে হয় ফরচুন কুকিজ বলে,মুচমুচে সমুচা টাইপ বিস্কুটের ভিতরে কাগজে আপনার ভাগ্য লেখা।আমারটা খুললাম । “ Your Financial situation will improve if you work on it”

যাহ্‌ শালা! এইজন্যই আমি ভাগ্যে বা সৌভাগ্যে বিশ্বাস করি না। আমি শুধু দুর্ভাগ্যে বিশ্বাস করি। পরিশ্রম করলে অর্থনৈতিক উন্নতি হবে, এইটা জানার জন্য গণক হওয়ার দরকার আছে ?

প্রথম প্রকাশঃ২৫শে জুন,২০১৩

ফেসবুক মানে মোড়ের আড্ডা

ইদানীং ফেসবুক আমার কাছে মোড়ের আড্ডা, আবার ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তিগত দিনলিপির মতো মনে হচ্ছে ! অন্তত আমার শেষ কয়েক মাসের অ্যাক্টিভিটি দেখে নিজের কাছে তাই মনে হল। সময়ের সাথে আমার মতামত বদলে যেতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক !

ভার্চুয়াল জগতের কিছু বন্ধুদের নতুন পোস্ট দেখতে না পারলে একটা ব্যাকুলতা কাজ করে। যেমনটা ছিল , অনেক আগের নিয়ম করে সকাল বিকাল আড্ডা দেওয়ার মতো। একবেলা আড্ডা না দিতে পারলে তৃষ্ণার্ত থাকতাম।

এখন এই আড্ডা ও দিনলিপির ফেসবুকের মাঝখান থেকে আপনি সিরিয়াস কিছু খুঁজে পেয়ে আমার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সেটা আপনার নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার। ভাইরে , আমি আমার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না, আর আপনি আমার দুইটা অনিয়মিত পোস্ট পইড়া নিয়ে ফেললেন ! সুতরাং আপনার সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব নিতান্তই আপনার ও আপনাদের , আমি কোন দায় বোধ করছি না।

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

ধর্মের আছর

আমার অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি গত বছর দুয়েক ধরে তাবলীগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তাঁর নানামুখী কর্মকাণ্ডে আমি অবাক, কাছের একজনের এতো আকস্মিক পরিবর্তন মেনে নেয়া মুশকিল। তাঁর ও তাঁর পরিবারের কী কী পরিবর্তন হতে পারে, সেই বিতং এ না যাই। দাড়ি রাখা ও কঠিন পর্দাপ্রথা ছাড়াও একটা পরিবারকে পুরোপুরি ইসলামী অনুশাসনে নিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। মাঝে ওরে ফোন দিতেও ভয় হইতো। ফোনে মিনিট চল্লিশেক নানা হাদিসের বয়ান দিয়ে সুপথে আসার নির্দেশ।

আমাদের অনেক বন্ধুকেই ছাত্রাবস্থা থেকে তাবলীগের সাথে জড়িত দেখেছি। আরেক বন্ধু , যাকে সেই ছাত্রজীবন থেকেই তাবলীগে জড়িত দেখেছি, হেরে জিগাইলাম , ‘ মামা কাহিনী কি? তোমারে তো দেখি আজ বছর কুড়ি ধরে, তোমার এইরকম আগ্রাসী তাবলীগি ভাবতো দেখি নাই। তুমি-তো সব ব্যাল্যান্স করে চলছো। ও যেটা বললো, ‘আসলে আমরাতো ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছি। কিন্তু ও( আমার নতুন তাবলীগ বন্ধু) সেটা পায় নি। এখন ওর উপর “আছরটা” একটু বেশী পড়ছে।অন্তত আমার কাছে ঘটনা পরিষ্কার হলো।

আমি কোন দুই বন্ধুর কথা বলছি আমার কাছের জনেরা( টেক্সটাইল সার্কেলের) সেটা টের পাবেন নিশ্চয়।
উল্লেখ্য, আমার খুব ঘনিষ্ঠ এই দুইবন্ধুর কেউ ফেসবুকে নাই।

আম্মা ক্যালেন্ডারের জুন মাসের ছবিটা দেখিয়ে বললেন উনি সুফিয়া কামাল কিনা ?
আমি বললাম না, ওটা নুরজাহান বেগমের ; ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদিকার । এই বছরের ক্যালেন্ডারে বারোজন মহীয়সী নারীকে তুলে ধরেছেন এই ব্যাংক এশিয়া । বেগম রোকেয়া থেকে— প্রথম মুসলিম মহিলা ডাক্তার জোহরা বেগম কাজী , ইলা মিত্র, সুফিয়া কামাল, ফিরোজা বেগম, রাণী হামিদ, তারামন বিবি, নভেরা আহমেদ, জোবেরা রহমান লিনু, আইরিন জুবাইদা খান, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার । এঁরা দেশ ও দশের উপকারে এসেছেন, খ্যাতি বয়ে এনেছেন , মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এঁরা নমস্য।

সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, অচলায়তন ভেঙ্গে বের হওয়া একজন ডাক্তার জোহরা বেগম কাজীকে
হাজারো উচ্চশিক্ষিত ঘরে বসে থাকা মহিলার চেয়ে সমাজের জন্য বেশী প্রয়োজনীয় মনে করি। জগতে এঁরা জগত আলো করে থাকুন। আমি শুধু এই আকাঙ্ক্ষাই করতে পারি , আমার দুই কন্যা যেন এঁদের মতো কেউ হয়ে উঠতে পারে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

 

মূদ্রার অপর পিঠ, বৈপিরিত্য

হাসিখুশি চরিত্রের বা একটু হৈহৈ-রৈরৈ বলে সর্বশ্রেণীর বড়ভাইদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ যাতায়াত বা প্রশ্রয় আছে ! এবং আমি সেটা উপভোগও করি। কিছুদিন আগে আমার ট্রেডের কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বড়ভাইদের সাথে দেখা হলো একটা পারিবারিক ডিনারে। যথারীতি উত্তরা থেকে মিরপুরে এসে আবার উত্তরাতে বউকে নিয়ে যাওয়ার সুবিখ্যাত আলস্যে দাওয়াতে আমি একা। ভাবীদের সাথে এক বড়ভাই পরিচয় করিতে দিয়ে বললেন ‘ এরে চিনছো? এইটাই জাহিদ ! ওই যে ফেসবুকে লেখালেখি করে।’

সে খাইতে খাইতে আরো বললো, আমার লেখা তাঁরা পড়েন কারণ , তাঁদের মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার। কেন দরকার জানিনা, মনে হলো- সারাক্ষণ নানা ইসলামী অনুশাসন ও চিন্তার মাঝখানে,আমার কিছু পোস্টে হয়তো একটু খোলা-হাওয়া পান! নাকি অনৈসলামিক চিন্তাকারী কাউকে দেখে করুণা অনুভব করেন , কে জানে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০২৩