ক্রেতা হিসাবে মহিলারা

অভিজ্ঞতাটা আমার অগ্রজের।

বাড়ির পাশে বাজারে ছোট চাচার এক বন্ধুর কসমেটিকসের দোকান ছিল। আমি ও ভাইয়া দুজনেই স্কুলে পড়ি।মাঝে সাঁঝে ছোটখাটো কিছু একটা, এই যেমন শীতের দিনের ভেসলিন বা ভ্যানিসিং ক্রিম কিনতে আম্মা দোকানে পাঠান। দোকানের মালিক হ্যান্ডসাম যুবক ; সারাক্ষণ কিশোরী তরুণীদের ভিড় লেগে থাকে। তবে মহিলা ক্রেতারা যে দাম নিয়ে বড্ড দরকষাকষি করে সেটা ওখানে দাঁড়ালেই টের পাওয়া যেত। হয়তো, ১ টাকা ডজনের কালো হেয়ার ক্লিপ যেটা এমনিতেই সস্তা ; সেটার দাম কমানোর জন্যও এরা এক ঘণ্টা পার করত!

তো ভাইয়া কী যেন একটা কিনতে গেছে , সেটার কথা বলে অপেক্ষা করছে। আগে থেকেই দুইজন তরুণী দোকানের অর্ধেক কসমেটিকস নামিয়ে সামনের ডিসপ্লের উপর স্তূপ করে রেখেছে। অবশেষে দুটি পণ্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দামাদামি আগেই কিছুটা হয়েছিল। ফাইনালি চাচা খুব দ্রুত লয়ে বললেন, আপনাদের কাছে কি আর দাম রাখব আপা ! এটা সাত আর এটা পাঁচ,মোট পনের টাকা ; আপনি তের টাকা দিয়েন। মহিলা ভীষণ খুশী হয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ১৩ টাকা বের করে দিয়ে চলে গেলেন।

ভাইয়া আর সেই চাচার বাকী কথোপকথন কি হয়েছিল জানি না। তবে এই ধরণের কাহিনী যে হয় সেটা বুঝলাম , যেদিন থেকে আমি বউয়ের সঙ্গে বাজার করা শুরু করলাম !

প্রকাশকালঃ ১১ই ডিসেম্বর,২০১৯

এই জীবন যদি জীবন হয় তাহলে আসল জীবন কোথায়।। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আমি প্রথমেই একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে আমার কথার শুরু করি। গল্পটা এ রকম যে, এক হাসপাতালে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে এক রোগী এল। সঙ্গে সঙ্গে তার এক্স-রে করা হলো। কিন্তু একি! রোগীর পেটের মধ্যে শত শত চায়ের চামচ দেখা গেল। তখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘তোমার পেটে এত চায়ের চামচ এল কী করে?’ সে তখন কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল, ‘স্যার, ওই যে বিখ্যাত ডাক্তার কাদির সাহেব, এফসিপিএস, এমআরপিএস বলেছেন দিনে দুই চামচ করে তিনবার খেতে।’

তো আমরা এই ডাক্তার কাদির সাহেবের মতো মানুষ দ্বারাই আসলে পরিচালিত হই। তারা যা বলেন, আমরা তা-ই করি। আমরা কখনো দেখি না চায়ের চামচ খাওয়া ভালো, না খারাপ। এটা আমরা ভাবি না। এতে আমাদের কোনো ভালো-খারাপ কিছু হয় কি না, সেটা আমরা বুঝতে পারি না। আমাদের জীবনে এই ডাক্তার কাদির কারা? এই কাদির হচ্ছেন আমাদের অভিভাবক, আত্মীয়, আমাদের বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীসহ গোটা পৃথিবী। তারা আমাদের যা করতে বলেন আমরা তা-ই করি। যেমন: আমার আব্বার কাছে শুনেছি যে তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তখন বলা হতো যে গণিত আর দর্শনই সেরা বিষয়। তাই এ দুটো পড়তে হবে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিলাম, তখন যুগ পাল্টে গেল। তখন সেরা হলো ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং। আবার মানবিকের শিক্ষার্থী হলে ইংরেজি অথবা অর্থনীতি। কারণ ওই দুটো দিয়ে সিএসপি হওয়ার সুবিধা ছিল। তারপর আরও সময় পার হলো। এখন এসে দাঁড়িয়েছে বিবিএ, এমবিএ। একের পর এক চাপের মধ্যে আমরা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছি না। কোনোকালেই আসলে কেউ কিছু করে উঠতে পারেনি। আমি কী চাই, আমি কী করতে ভালোবাসি, আমার প্রাণ কী চায়, আমার জীবনের আনন্দ কোথায়—এই খবর কেউ নিতে আসে না। ফলে আমরা সারা জীবন ধরে আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাই।

আমরা আমাদের কোনো দিন চিনতে পারি না। নিজেদের কোনো দিন খুঁজে বের করতে পারি না। আমরা আমাদের আনন্দজগৎকে তাই কোনো দিন আত্মস্থ করতে পারি না। অবশ্য এ রকম হওয়ার কারণ আছে। কেন আমাদের এসব বলা হয়? একটা কারণ হলো দারিদ্র্য। আমাদের দেশে কিছুসংখ্যক মানুষ ছাড়া বাকি সব মানুষ দারিদ্র্যসীমার এত নিচে থাকে যে নিজের ইচ্ছামতো কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। নিজের প্রাণের খোরাক জোগানোর সুযোগ আমরা কমই পাই। সুতরাং যেখানে অর্থ আছে, যেখানে টাকা আছে সেখানে আমাদের চলে যেতে হয়। সেটা আমাদের ভালো লাগুক আর না-ই লাগুক।

আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের বাবা–মাকে নিয়ে। যেমন আমরা ১১ ভাইবোন ছিলাম। আমার দাদারা ছিলেন মাত্র ১৮ ভাই এবং ১৪ বোন। এত ছেলে-মেয়ে সেকালে থাকত যে বাবা-মা তাদের ঠিক দেখেশুনে রাখতে পারত না। তাই তাদের নিয়ে তেমন কোনো চাপ ছিল না। তারা নিজেদের যা ইচ্ছা তাই হতে পারত। কিন্তু আজকে ছেলেমেয়ের সংখ্যা ২–এ নেমে এসেছে। সব সময় বাবা-মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যে তাঁর ছেলেমেয়ে কী করছে। আজকের ছেলেমেয়েরা যেন বন্দিশালাতে আটকে আছে। সর্বদা নজরদারির কড়া শিকলে বন্দী তারা। আজকের মতো অত্যাচারিত শিশু আমাদের দেশে কখনো ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, বাবা-মা যা হতে পারেননি, ওই ১-২ জন ছেলেমেয়ে দিয়ে তারা তার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা তো বড় কঠিন কাজ। এই বাচ্চা ছেলেমেয়ে কীভাবে এই বড় দায়িত্ব পালন করবে।

এরপর এল চাকরি। চাকরি এক মজার জায়গা। এখানে বাণিজ্যিক প্রভুরা তাঁদের মর্জি চালান। তিনজন মানুষ লাগবে। নেবে একজন। তাকে আবার বেতন দেবে দুজনের। তাতে টাকার পরিমাণ বাড়ে। সাথে যে চাকরি পেল সে নিজেও এত টাকা পেয়ে খুশি হয়। কিন্তু সকাল আটটায় অফিসে ঢুকে রাত ১০টা নাগাদ বাসায় ফেরার পর তার মনে আর কোনো শান্তি থাকে না। বাড়ির টেলিভিশনের সামনে টাইটা খুলে দিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। এই দৃশ্যটা দেখতে মোটেও ভালো লাগে না। তাদেরকে চিপে, পিষে তাদের সমস্ত রক্ত আমরা নিয়ে যাচ্ছি। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই এটা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। তখন কবি বলেছিলেন,
‘হোয়াট ইজ লাইফ ইফ ফুল
অব কেয়ার
উই হ্যাভ নো টাইম টু স্ট্যান্ড
অর স্টেয়ার’

এই যে ঊর্ধ্বশ্বাস জীবন, এই যে কাজ, এই যে ব্যস্ততা—এসব মিলিয়েই কি আমাদের জীবন? আমরা কি একটু দাঁড়াতে পারব না? আমরা কি একবার এই চারপাশের সুন্দর পৃথিবীর দিকে তাকানোর সুযোগ পাব না? এত অসাধারণ–অবিশ্বাস্য পৃথিবীতে আমরা যে এসেছি, সেটার কোনো আনন্দ কি আমরা নিতে পারব না? কেন এই কথা হয়েছিল? ১৮১৯ সালের দিকে ইংল্যান্ডে একটা আইন পাস হয়েছিল। কাউকে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। কী রকম মারাত্মক আইন আপনি চিন্তা করুন। তখন হয়তো ২২ ঘণ্টা খাটানো হতো। হয়তো কর্মীকে তারা ঘুমাতেই দিত না। এ রকম ভয়ংকর নির্যাতনও সেই সময়ে করা হয়েছে মানুষের ওপর। এই যে ‘মে ডে’তে শিকাগোতে শ্রমিকদের ওপরে গুলি করা হয়েছিল। শ্রমিকেরা কী চেয়েছিল? শুধু ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা ঘুম আর ৮ ঘণ্টা আনন্দ করার সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু প্রভুরা বলেছিল যে ৮ ঘণ্টা আনন্দ করা চলবে না। সেটার ভেতর ৬ ঘণ্টা তাদের জন্য কাজ করতে হবে। এই নিয়ে শেষ পর্যন্ত এ রকম দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে।
আমি আরেকটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শেষ করি। পথে যেতে যেতে একজন যুবকের সঙ্গে দেখা হলো অপূর্ব এক সুন্দরীর। সুন্দরীকে দেখেই সে প্রেমিক যুবক বলে বসল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’ আবার সুন্দরীরও এই যুবককে অপছন্দ নয়। তারও ভালো লেগেছে। কিন্তু সে বলল, ‘আমি একটু অসুবিধায় আছি। আমার বাড়ি হলো সাত সমুদ্রের ওপারে। আমি আমার বাবার সঙ্গে সেখানে যাচ্ছি। এখন তো আর আমাদের বিয়ে সম্ভব নয়। তুমি সেখানে এসো। তখন আমি এই বিষয়ে ভেবে দেখব।’

যুবক তো আর অপেক্ষা করতে পারল না। কিছুদিন পরেই সে সুন্দরীর জন্য সাত সমুদ্রের উদ্দেশে পাড়ি জমাল। প্রথম সমুদ্রের পাড়ে সে যখন গেল, সেখানে এক খেয়া মাঝি সাগর পার করে দেবে। সেই খেয়া মাঝি তাকে বলল, ‘আমি চাইলেই তোমাকে এই সমুদ্র পার করে দিতে পারি। কিন্তু এ জন্য তোমাকে তোমার হৃৎপিণ্ডের সাত ভাগের এক ভাগ দিয়ে দিতে হবে।’ সে ভাবল যে তার এত গভীর প্রেম। প্রেমের জন্য না হয় একটু ত্যাগ স্বীকার সে করলই। সে রাজি হয়ে যায় মাঝির কথায়। পার হলো সে প্রথম সাগর। দ্বিতীয় সাগরের খেয়া মাঝিও একই কথা বলল। এভাবে দিতে দিতে সাত সমুদ্র সে যখন পার হলো তখন দেখা গেল তার মাঝে হৃদয় বলে আর কিছুই নেই। তার হৃদয় খণ্ড খণ্ড হয়ে হারিয়ে গেছে।

এই যে আমাদের সময়ের ওপর যে নিষ্পেশন, যে টানাপোড়া চলে এই আমাদের ব্যস্ত জীবন নিয়ে, সেটা আমাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। আমাদের জীবন যে আনন্দের এক নতুন উৎস, সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। জীবনের এই আনন্দ আমরা খুঁজে পাই সময়ের কাছ থেকে। কেউ যদি আমাদের কাছ থেকে এই সময়কেই কেড়ে নেয়, তাহলে আমরা কীভাবে সুখী হয়ে বেঁচে থাকব? আমরাও যদি আমাদের সময়কে অন্য কাউকে দিয়ে দিতে থাকি, তাহলে আমাদের জীবন কোথায়? কীভাবে আমরা আমাদের ভেতরের মানুষকে গড়ে তুলব?

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প আছে যে এটা যদি বিড়াল হয় তাহলে কাবাব কোথায়। আবার এটাই যদি কাবাব হয় তাহলে বিড়ালটা কোথায়। তো এই জীবন যদি জীবন হয় তাহলে আসল জীবন কোথায়? তাই আমি এই তরুণদের কাছে বলব রবীন্দ্রনাথের একটি কথা:
‘বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই
গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম
দুটি নয়ন মেলে।’

এই যে অপরূপ বিশ্ব—তা আমাদের চোখ দিয়ে, আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের জীবন দিয়ে যদি উপভোগ না করে যাই তাহলে আর এই জীবনের মানে কী? আমি সবাইকে অনুরোধ করব এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে। কেননা তোমরা এখন জীবনের পথে অগ্রসর হতে যাচ্ছ। তোমাদের এখনই ভাবার সময়। পরে আর এসব ভেবে কোনো লাভ হবে না। তোমাদের আগামী সময়ের জন্য শুভকামনা রইল। সকলকে ধন্যবাদ।

[ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। গত ২৮ মার্চ ,২০১৯ ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন তিনি।]

প্রবাসী পরবাসী

প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে কিছু লিখতে গেলে আমরা যারা দেশেই থাকি, তাদের প্রতি আমাদের প্রচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্ব টের পাওয়া যায়। অনেকের অভিযোগ , প্রবাসীদের নানা কথাবার্তায় ও আচরণে দেশের ব্যাপারে করুণা বা ক্ষেত্র বিশেষে তাচ্ছিল্য প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়াটা স্বাভাবিক। পশ্চিমের যে কোন একটা মানবিক, উন্নত অত্যাধুনিক দেশের তুলনায় আমাদের রাষ্ট্র-যন্ত্র, প্রশাসন ও ছোট্ট ভূমিতে এই বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে আমরা তো জঙ্গলেই বাস করছি।

দুর্নীতি, অপশাসন, দুর্বৃত্তায়ন, ট্রাফিক জ্যাম, ভেজাল খাবার, রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা যে দিকে তাকানো যায় –এক সীমাহীন হতাশার হাহাকার। মৌলিক চাহিদার অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা চিকিৎসার মধ্যে মনে হয় বস্ত্র নিয়েই তেমন কোন অভিযোগ শুনি না । গার্মেন্টস শিল্পে রফতানির পরে বেঁচে থাকা বাড়তি কাপড় ও পোশাকে বাজার সয়লাব। আগে দুই ঈদ ছাড়া মানুষ পোশাক কেনার কথা চিন্তাও করত না। এখন ধনী দরিদ্র সবাই সারাবছর নানা জামা কাপড়ের ভিতরে থাকে।

অন্যদিকে দেশে যারা থাকে, তারাও সুযোগ পেলেই প্রবাসীদের আত্মীয় পরিজনহীন বিচ্ছেদকাতরতা ও নানা বেদনা নিয়ে কটাক্ষ করার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। প্রবাস মানেই উন্মুক্ত কারাগার । সব আছে , তবুও বন্দিদশা, ইত্যাদি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রবাস ও দেশ– দুই জায়গার বাংলাদেশীদের সাধুবাদ দিতে চাই। যারা প্রবাসে স্থায়ী হয়েছেন, তাঁরা এই দেশের যোগ্যতর। যোগ্যতা, সাহস, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার জোরেই তাঁরা বিদেশে গিয়ে থিতু হয়েছেন। দূর পরবাসে অসংখ্য ছোট্ট ছোট্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলেছেন। আরেক বিশাল জনগোষ্ঠী, যাঁরা শ্রমিক, তাঁদের আর্থিক প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বেদনা ও বঞ্চনার গল্প আরো মর্মান্তিক। পরিবারের সুখের জন্য জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়টুকু বিলিয়ে দিয়ে শেষ জীবনে রিক্তহাতে ফিরে আসতে হয় দেশের মাটিতেই।

এই যে দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে করুণা ও কটাক্ষের চাপানউতোর চলে, তার কারণ সম্ভবত: তাঁদের নিজ নিজ অবস্থানের গভীর অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার ঈর্ষা।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসে একটা ঘটনা আছে।
ঘটনা এই যে মাঘী পূর্ণিমায় চামুণ্ডা পূজার মেলায় কবিগানের পাল্লা হয়। নোটনদাস ও মহাদেব পাল—দুজনেই খ্যাতনামা কবিয়াল। মেলার দিনে মহাদেবের দল এসে আসরে বসল, কিন্তু নোটনদাসের সন্ধান নেই। একজন এসে জানালো নোটনদাস নেই। ‘বাসাতে কোথাও কেউ নাই মশায়—লোক না – জন না—জিনিস না , পত্তর না—সব ভো-ভোঁ করছে। কেবল শতরঞ্জিটা পড়ে রয়েছে—যেটা আমরা দিয়েছিলাম। শুনিয়া মেলা কর্ত্তৃপক্ষ স্তম্ভিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেল। লোকেরা হৈ হৈ করিয়া গোলমাল করিয়া উঠিল।’

তবে লেখক নোটনদাসের দোষ দেখেন না, গত মেলা থেকেই দুই কবিয়ালের টাকা পাওনা ছিল। আয়োজকরা বরাবর মাথায় আশীর্বাদ করে চলছিলেন। নোটন ও মহাদেব যেহেতু এই মেলায় বহুদিন ধরে গাওনা করে সেই কৃতজ্ঞতা ও চক্ষুলজ্জাতেই গতবার কিছু বলে নাই। কিন্তু এবারেও যখন নোটন প্রণাম করে হাত পাতল, তখন মোহান্ত টাকার পরিবর্তে তার হাতে দিলেন তাজা টকটকে একটা জবাফুল এবং আশীর্বাদ করলেন—‘ বেঁচে থাক বাবা, মঙ্গল হোক।’

ওজনদার দক্ষিণা ও নগদ বায়না পেয়ে সে দশ ক্রোশ দূরের মেলায় তার লোকজন নিয়ে ফিরতি ট্রেনে কেটে পড়ে।
“নোটন ভাগিয়াছে শুনিয়া অপর পাল্লাদার কবি মহাদেব আসরে বসিয়া মনে মনে আপসোস করিতেছিল। আজও পর্য্যন্ত নোটনের সহিত পাল্লায় কখনও সে পরাজয় স্বীকার করে নাই, কিন্তু আজ সে সর্ব্বান্তঃকরণে নীরবে পরাজয় স্বীকার করিল—সঙ্গে সঙ্গে নোটনকে বেইমান বলিয়া গালও দিল। তাহাকে বলিলে কি সেও যাইত না !”

দেশে যারা আছে, তাদের অনেকের অবস্থা সেই মহাদেবের মতো! সুযোগ পেলে সেও কি নোটনদসের মতো কেটে পড়ত না !

প্রকাশকালঃ ২রা ডিসেম্বর,২০১৯

কর্পোরেট লাইফস্টাইলস্‌

সরকারী কর্মকর্তাদের কথা বলতে পারব না। তবে আমাদের বেসরকারি কর্পোরেট কর্মকর্তাদের মাঝে কয়েক ধরণের লাইফ-স্টাইল আছে । ধরেন, একই বেতনে কাজ করে কয়েকজন সহকর্মী । তাদেরকে মোটা দাগে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথম প্রকার: বেতনের টাকা দিয়ে চলে। উপরি ইনকাম নেই, কিন্তু ঢাকার শহরে বউ-বাচ্চা আত্মীয়স্বজন নিয়ে স্ট্যাটাস মেইন্টেইন করতে হিমসিম খায়। মূলত: মধ্যবিত্ত, কিন্তু চালচলন ও মানসিকতা উচ্চ মধ্যবিত্তের।

দ্বিতীয় প্রকার: বেতনের বাইরে ইনকাম নেই, সামাজিক স্ট্যাটাসের দিকে তেমন নজর নেই। মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তা হীনতায় ভোগা শ্রেণী। যা বেতন পায়, তার সিংহভাগ ব্যয় করে সন্তানদের শিক্ষায়, বাকিটা সঞ্চয় করে ভবিষ্যতের জন্য। এরা জেনুইন মধ্যবিত্ত মানসিকতার এবং এই মানসিকতা থেকে উত্তরিত হতে পারে না।

তৃতীয় প্রকার: বেতনের টাকার বাইরে নানাধরনের উপরি ইনকাম আছে ; গাড়ীর মডেল , ফ্ল্যাটের সাইজ দেখলে টের পাওয়া যায়। ধর্মকর্মে খুব আত্মনিবেদিত। দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম আছে বা করার চিন্তা করে। পরিস্থিতি এদিক সেদিক হলে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সক্ষমতা আছে। উচ্চবিত্ত মানসিকতার, জীবন উপভোগ করে। এতকিছু থাকা স্বত্বেও নানা ধরণের ফালতু অনিশ্চয়তায় ভোগে।

চতুর্থ প্রকার: বেতনের টাকার বাইরে প্রচুর ইনকাম আছে, কিন্তু দেখাতে চায় না বা পারে না, সমাজের নজরে পড়ে যাবে বলে। নামে বেনামে সম্পত্তি করে, অসংখ্য এফডিআর করে। জীবন উপভোগের সবকিছু থাকতেও নিজেদেরকে বঞ্চিত করে চলে। নিম্নবিত্ত মানসিকতার যদিও অর্থনৈতিকভাবে উচ্চবিত্ত।

পঞ্চম প্রকার: আপনার কাছে কি মনে হয় ? কোন শ্রেণীকে আমি মিস করেছি ?

প্রকাশকালঃ২৮শে নভেম্বর,২০১৯

প্রযুক্তি ও বৈপিরীত্য

আচ্ছা , প্রযুক্তির উত্তরোত্তর ব্যবহারে কিছু  মানুষ এতো বিরক্ত কেন ?

আপনি গাড়ি ব্যবহার করছেন—দ্রুততর প্রযুক্তি।এখন প্রযুক্তি ভাল না, পরিবেশ-বান্ধব না বলে কি আপনি পুরনো যুগে ফিরে যেতে চাইবেন? আমাদের পক্ষে কি আর মান্ধাতার আমলের যানবাহন ব্যবহার করা সম্ভব? অথবা বিমানে চলাচল বাদ দিয়ে হেঁটে চলাফেরা করা ? মোবাইল ফোন ছাড়া আমাদের একদিনও চলবে ? হাজার ঠ্যাকায় পড়লেও আমি আপনি কি সেই অ্যানালগ টেলিফোনের যুগে ফিরে যেতে চাইব ?

সময়ের সাথে সাথে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে খাপ খাইয়ে চলার মানসিক সক্ষমতা অর্জন করা অনিবার্য ! অযুত-নিযুত প্রযুক্তির ভিতরে থেকে এই বৈপিরিত্য আর ভণ্ডামো করার কোন মানে হয় না !

প্রকাশকালঃ ৬ই নভেম্বর,২০১৯

ভ্রমণপিপাসু মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত

পূর্ববর্তী প্রজন্মে প্রচলিত ধারণা ছিল ভ্রমণ হচ্ছে আনন্দের ও শিক্ষার। তাঁরা তীর্থযাত্রা বা পুণ্যস্থান ভ্রমণ বা কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করত । কিন্তু যাত্রাপথের ঝক্কির জন্য অনেকাংশে ভ্রমণ ছিল ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর। আগের প্রজন্মে ভ্রমণ-বাতিকগ্রস্ত লোক ছিল না , তা নয়। আগেও ছিল, সেটা ছিল উচ্চবিত্ত ও একেবারে তরুণ সম্প্রদায়ের। এঁদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য যতোটা না ভ্রমণের জন্য ছিল –তার চেয়ে বেশি ছিল জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানো, কর্তব্য ফাঁকি দেওয়া এবং আত্মীয় স্বজনের উৎপাত থেকে দূরে থাকার জন্য।

মূলত: আগেও যেটা চিরন্তন সত্য ছিল, এখনও আছে ; সেটা হচ্ছে , যে এক জায়গা দশবার দেখে তার দেখা হয় সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন। আর দশটা জায়গা যে একবার করে দেখে তার দেখা হয় অসম্পূর্ণ । আর যে দশ মিনিটে একটা জায়গা দেখে তার দেখা হয় না কিছুই !

বর্তমানে আমাদের ভোগবাদী সমাজের প্রদর্শনকামী বাড়ন্ত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের বিনোদন এবং বড় মুক্তির জায়গা বছরে তিন-চারবার ভ্রমণ। আমাদের প্রাত্যহিকতায় আমরা ক্ষয়ে যাই । জীবনের নানাবিধ যন্ত্রণার মাঝে আমাদের বিনোদন ও মুক্তির দরকার ; খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার দরকার। আমাদের মন এই নাগরিক একঘেয়েমিতে শুকিয়ে যায়। ভ্রমণের আনন্দ এক পশলা বৃষ্টির মতো আমাদেরকে সতেজ করে দেয়।
পরিবারের সবাই আমরা আবার ঘুরতে যাব এই আকাঙ্ক্ষা ও আশা আমাদের বুঁদ করে রাখে ! ভ্রমণের সময় আমরা আকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা প্রায়শ:ই পাই না। কিন্তু যে আনন্দ উত্তেজনাই বোধ করি না কেন – ফিরে আসার পর আমরা সেই উত্তেজনায় আরও কিছু আরোপিত প্রলেপ দিই, সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি দিই। পাড়াপড়শির ঈর্ষা-কাতর চোখ আমাদের সাময়িক উত্তেজনা এনে দেয়। এর পরের দিনগুলো আমরা আবার স্মৃতিকাতর হয়ে থাকি ; প্রতিদিনের জীবিকার গ্লানিকে মেনে নিয়ে পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা করি।

এই মানসিক অবস্থাকে ঠিক নেশার সঙ্গে তুলনা করা যায় কিনা আমি জানি না। একবার একটা ডোজের আশু উত্তেজনার বিরতিতে আসক্ত ব্যক্তি যেমন নানা সুখ-কল্পনায় মেতে থাকে, কখন আবার আরেক ডোজ পাবে। ভ্রমণবাতিকগ্রস্থ অথবা ভ্রমণপিপাসু মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তদের হয়েছে সেই অবস্থা !

প্রকাশকালঃ ২রা নভেম্বর,২০১৬