by Jahid | Nov 29, 2020 | লাইফ স্টাইল
ফরমায়েশি লেখায় আমার কিছুটা অবহেলা আছে। বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, ভ্যালেন্টাইন ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি আমি এড়িয়ে চলি। কীভাবে যেন আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে, এসবই পুঁজিবাদের পণ্য কেনাবেচার ধান্ধা। কেনাবেচা মন্দ কিছু নয় অবশ্যই ; তবে মানুষের আদিখ্যেতা এড়িয়ে চলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি আর কী !
জগতের নিয়মে নারীপুরুষের ভালোবাসাবাসি থাকবে। কৈশোরের বয়ঃসন্ধি পেরুলেই বিপরীত কাউকে দেখলে মন উদাস হবে, ‘কি জানি কিসেরি লাগি প্রাণ করে হায় হায়’ !—হবে। আমাদের এক বড়ভাই বলেছিল সেই ৯০-এর দশকে কয়েকমাস খানেক কিশোরীর পিছনে পিছনে হেঁটে একদিন সেই কিশোরী কী মনে করে যেন পিছন ফিরে দেখল, কে তাঁকে ফলো করছে। সেই বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল সেই কিশোরের বন্ধুরা, ‘তাকাইছে ! তাকাইছে ! দোস্ত ! ও আমার দিকে তাকাইছে !’ চিৎকারে।
কৈশোরের পরে কাঠখড় পুড়িয়ে গুচ্ছের কষ্ট করে ভালো কোথাও ভর্তি হও রে ! অনার্স কর রে, মাস্টার্স কর রে ! চাকরি খোঁজ রে, আরো কিছুদিন পরে সেই বহু আরাধ্য মধুর সমাপ্তি বিবাহ ! নিজের হাতের উপর সেই হাত। “ ‘আমি পাইলাম, ‘ আমি ইহাকে পাইলাম।’ কাহাকে পাইলাম । এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে। ” সেই অনুভূতি ! তীব্র রোমাঞ্চের পর নতুন প্রজন্মের আগমন। অতঃপর বহমান জীবন, সেই চাকরি, সেই ট্রাফিক, সেই গোমড়ামুখো বস আর পাশের টেবিলের উচ্চস্বরে কথা বলা সহকর্মীদের সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। আবার সেই ট্রাফিক ঠেলে বাসায় এসে, দুটো নাকে মুখে দিয়েই বিছানায়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ একই রুটিন। এর মাঝে একটা বয়সের পরে দৈহিকতা নিতান্তই অভ্যস্ততার ঘেরাটোপে আটকে যায়। এই চিত্র ঢাকার বা যে কোন ব্যস্ত মহানগরের সবখানে।
২০০১ এর দিকে এক জার্মান ক্রেতার কাজ করতাম। নারী পোশাকের জন্য, Blind Date Casual এবং Blind Date Women নামের দুইটা লেবেল ছিল তাঁদের ! তো সিনিয়র ক্রেতা আমাকে বোঝালেন Blind Date শব্দটির ভিতরে এক অদ্ভুত ধরণের রোমাঞ্চ আছে, যেটা নারী ক্রেতাকে উৎসাহিত করে সেই লেবেলের পোশাক কিনতে। তখন ইউরোপে Blind Dating হয়তো খুব প্রচলিত ও মাছ-ভাতের মতো কিছু একটা। কিন্তু এখন আমাদের দেশে ল্যান্ড ফোনের যুগ থেকেই শুরু হল প্রজন্মের রোমাঞ্চ। তাঁর আগে যে চিঠির যুগ ছিল, সেখানেও ধীরগতির কিছুটা রোমাঞ্চ ছিল। আমার এক বন্ধু তখন পত্র-মিতালীর পত্রিকাগুলোতে নিজেরটা সহ অন্য কয়েকজনের চাঁদা দিয়ে ছাপাতে দিত। সেই পত্রিকায় আমাদের মূল নামের সংগে কিছুটা ছদ্মনাম জড়িয়ে দেওয়া নাম। আমার নাম ছিল সম্ভবত: অমি জাহিদ। কেন সেই নাম, মনে নাই। তবে যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রাবাসের নাম দেওয়া থাকত, দেশের নানা প্রান্ত থেকে চিঠি আসত। কাঁচা হাতে বন্ধু হওয়ার নিবেদন। বেশির ভাগ স্কুলের সেভেন এইটের মেয়ে। কিছু আসতো কলেজ থেকে। আমাদের কেউ কেউ সুন্দর নাম দেখে মেয়েদের কাছে চিঠি পাঠাতো। কেউ উত্তর দিত, কেউ দিত না।
এই সব পত্র-মিতালী নিয়ে আমাদের মজার কিছু স্মৃতি আছে, কেউ কেউ সশরীরে চলে আসত, যেহেতু হলের রুম নাম্বার সহ ঠিকানা দেওয়া থাকত।
হলের একটা মাত্র ফোন, নীচের গেস্ট রুমে, লক করা থাকত। ফোন শুধু আসত, যাওয়ার নিয়ম ছিল না। তো সেই ফোনের তার ছিঁড়ে প্যারালাল লাইন করে আরেক ফোন সেটে কথা বলার অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হবু প্রকৌশলীদের পক্ষেই সম্ভব। আমার মনে হয়, ৯০ এর দশকের বেশিরভাগ ছাত্রাবাস হলগুলোর একই চিত্র। আমরা যখন হল জীবন শুরু করি তার কিছুদিন আগেই পঁচিশ কয়েন দিয়ে ফোন করার বক্সগুলো উঠে গেছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে।
ল্যান্ডফোনে অহরহ ক্রস কানেকশন হত। আমাদের বাসার ফোন নাম্বার ছিল, ৩৮৩৩৪১ ও পরে ৯০০৩৫৬৪ । কাছাকাছি নাম্বারে করেছে কেউ আর সেটা আমাদের ফোন লাইনে চলে এসেছে , সেটা প্রতিদিন তিন চারবার হতো। মাঝে-সাঁঝে ক্রস কানেকশন হতো। মানে আমি কোথাও ফোন করেছি ; হুট করে অন্য দুইজনের ব্যক্তিগত কথোপকথনের সঙ্গে আমার লাইন কানেক্টেড হয়ে যেত। হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা নবদম্পতি কথা বলছে। আমি আর টেলিফোন অপারেটর শুনছি সেই বিনা পয়সার বিনোদন।
এক বন্ধুর বাড়িতে ক্রস কানেকশনে কলেজ পড়ুয়া এক তরুণীর সঙ্গে কথাবার্তা, আমরা সবাই ফান হিসাবে নিলেও জনৈক বন্ধু সেই মেয়ের সঙ্গে সিরিয়াস প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গেল। বিয়ে হয় হয় অবস্থা ! শেষে পাত্রের বাবা-মার মত না থাকায় আর হয় নি।
মোবাইল আসার পর, ক্রস কানেকশনের বিনোদন শেষ। নতুন প্রযুক্তির খরচ বেশি। প্রিপেইড ফোন দিয়ে , প্রেম ও রোমান্স জমে না। ৬ টাকা পার মিনিট কল চার্জ। তো সেই দুর্মূল্যের বাজারেও আমার এক বন্ধু প্রেম করত। যেখানে আমাদের সারাদিন দেশে বিদেশে কথা বলে বিল আসে ৫ হাজার টাকা। তার মাসের মাঝখানে ১৮ হাজার টাকার বিলের জন্য লাইন কেটে দেয় ! বিল পরিশোধ করে লাইন রি-কানেক্ট করে আবার তার প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে। সেই যুগে সে কীভাবে মাসে ৩০ হাজার টাকার কথা বলতো সেটা এখনো একটা বিস্ময় বটে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে রমনা পার্ক বেশ জনপ্রিয় ও আপাত: নিরাপদ একটা ডেটিং প্লেস ছিল। কিছু অনিয়ম যে হোত না সেটা বলা যাবে না ! তবুও প্রেমিক-প্রেমিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কপোতকপোতি এসে সকালে ও বিকালে ভিড় করত রমনা পার্কে। টিএসসি-তে। আমাদের বন্ধুদের অনেকের তার হবু স্ত্রীদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে। বয়স হয়ে গেছে, বলতে দ্বিধা নেই ; আমার হবু স্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রিয় ডেটিং প্লেস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকা। এতো সাবধানে চলার পরও ডিএমসির (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ)-এর ব্যাচ মেটদের কাছে ধরা খেতে হয়েছে কয়েকবার। আর প্রিয় ছিল রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে ওকে ওঁর আগারগাঁও এর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দেওয়া।
ভুলে যাওয়ার আগে বলে ফেলি, রমনা পার্ক নিয়ে আমদের সেই ৯০ সালের দিকে রসিকতা প্রচলিত ছিল।
হয়েছে কী, নানা বয়সের প্রেমিক-প্রেমিকা ও কপোতকপোতির দেখা মিলত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
মাঝেমাঝেই অনেককে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া গেলে টহল পুলিশ হুমকিধামকি দিয়ে উঠিয়ে দিত।
তেমনই এক সন্ধ্যায় এক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে টহল পুলিশ কিছুটা অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল।তাদের কথোপকথন ছিল এইরকম:
: কি ব্যাপার , আপনারা এখানে কি করেন?
: না, মানে আমরা তো স্বামী-স্ত্রী।
: স্বামী-স্ত্রী তো বাসায় যান, এইখানে কি ?
: ইয়ে মানে, আমি একজনের স্বামী আর উনি আরেকজনের স্ত্রী !
আমার নিজের অভিজ্ঞতা না দিলে লেখাটা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। নামোল্লেখ না করে বন্ধুদের প্রেম ও বিরহের কথা যেহেতু বলে ফেলেছি কয়েকটি।তাঁদের সবাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আছে, এবং নাম উল্লেখ না করায় হাঁফ ছেড়ে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে !
২০০২/৩ হবে হয়তো। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে এবং একইসঙ্গে চাকরির সবচেয়ে বিপদসংকুল সময়ে এক তরুণী দুই-তিনদিন করে মোবাইলে ফোন দিল। মধুর ভাষিণী । সপ্তাহ খানেকের মাথায়, রমজানের সময় রিকশায় আমি আর আমার আরেক কলিগ অন্য এক অফিসের ইফতার পার্টিতে মুখরক্ষা করতে যাচ্ছি। এর মাঝে সেই তরুণীর ফোন। আগের কয়েকটা আলাপ দীর্ঘ ছিল, কেন জানি না –এই বারেরটা আর দীর্ঘ করতে ইচ্ছে করলো না।
কথা শুনে বুঝে ফেলেছিলাম যে, সে আমার অফিসের অন্য কোন তরুণী সহকর্মীর মাধ্যমে আমার ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিয়েছে ।
ফোনালাপের মাঝে আমি জানতে চাইলাম,আপনি আসলে কি চান ? ।
ন্যাকা গলায় উত্তর এলো ‘বন্ধু হতে চাই, আমরা কি বন্ধু হতে পারি না! ’
উল্লেখ্য, সেটা ছিল মোবাইল ফোনের যুগ, এইসব নানারকম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ফেটওয়ার্কিং ছিলনা। ছিলনা কোন ভার্চুয়াল জগত।
‘আপনি জানেন আমি বিবাহিত?’
‘জানি।’
‘তাহলে আপনার আর আমার বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বা সীমানাটা কোথায় ?’
আমি বললাম, ‘ ধরেন, আপনার সাথে আমি মাস তিন-চারেক গুচ্ছের টাকা খরচ করে ফোনাফুনি করলাম ( সেই সময় কলরেটের কথা চিন্তা করেন, ৬ টাকা/মিনিট!)
তারপর ? তারপর , কোন এক পবিত্র বিকালে আপনি আমার সঙ্গে বা আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করব।
তরুণী গলায় মধু ঢেলে বলল , ‘তাতো চাইতেই পারি ! পারি না ?’
‘ধরেন অফিসের এতো ঝামেলার মধ্যে সময় বের করে কয়েকদিন চাইনিজ টাইনিজ খেলাম!’
তরুণী নীরব সম্মতি জানালো , ‘হুম।’ ( মানে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেতে চায় ! )
‘তারপরে একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি হবে, তারপর আরো মাস ছয়েকের মাথায় মাথায় এই সম্পর্ক হয়তো বিছানা পর্যন্তও যেতে পারে !’
তরুণী এবার কিছুটা বিব্রত মনে হলো । বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলছেন কেন?’
সে তখনো বোঝেনি ,আলোচনা কোনদিকে যাচ্ছে।
বললাম ‘আমার মতো একজন ব্যস্ত কামলা টাইপের মানুষ ছয়মাস বা একবছর ধরে বিবাহিত জীবনের পাশাপাশি রোমাঞ্চের জন্য এতো সময় বা অর্থ নষ্ট কেন করবে বলেন ! সেটা না করে আমরা কি পুরো ব্যাপারটাকে সংক্ষিপ্ত করতে পারি না? আপনি ঠিকানা দেন ইফতার সেরে আপনার বিছানায় চলে আসি!’
তরুণী তোতলাতে শুরু করলো।
যাই হোক, ওই কাষ্ঠল ফোনালাপের পরে সে আর কখনো আমাকে ফোন দেয় নাই; ফোন দেওয়ার প্রশ্নও আসে না ! এবং আমার বিবাহবহির্ভূত রোমাঞ্চের ও সম্ভাব্য পরকীয়ার ওইখানেই অকাল প্রয়াণ ঘটলো !
এক পর্যায়ে আমাদের বন্ধুদের সবাই চাকরি বাকরিতে ঢুকে গেল। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বিদেশে আবাস গড়ল। বিয়ের দশ বারো বছর পরে অনেকের আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে তাঁদের সহধর্মিণীরা সংসারধর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পারস্পরিক সম্পর্কে একটা অভ্যস্ততা চলে আসল। একটা ছাড়া ছাড়া ভাব আর কী !
দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।
‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’
কোন ঘরোয়া আলোচনায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বলেছিলেন, মানুষ নাকি সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। সম্পর্কের নতুন করে ঝালাই মেরামতের দরকার হয়ে ওঠে এই সময়।
পুরুষেরা নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে খুঁজে ফেরে কিছুটা রিলিফ, স্বস্তি, রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চার, নতুনত্ব। আর বিবাহিতারা খুঁজে ফেরেন তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই প্রশংসিত চোখগুলোকে। বিয়ের পরে সন্তানাদি , স্থূলত্ব সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় সব রোমাঞ্চ। সংসার , সংসার, বাচ্চার স্কুল কোচিং রোজ সেই এক ঘেয়ে রুটিন। স্বামীরা ট্র্যাফিক ঠেলে এসে রাতের খাবার খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাসে ঘুমিয়ে পড়েন। কারো গায়ে কারো হাত পড়লে শুনতে হয়, বিরক্ত কোর না তো , ঘুমাও ! কাল সকালে অনেক কাজ জমে আছে।
ঠিক এই সময়ে মানব-মানবী জ্যোৎস্নায় ভূত দেখে।
আমার এক বন্ধুর শেয়ার করা লেখায় দেখেছিলাম , সে লিখেছে শুরুটা নাকি এভাবে হয়!
: ভাবী, আপনি দুই বাচ্চার মা! আপনাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। দেখে মনে হয়, মাত্র ইন্টার-পাশ করছেন! সিরিয়াসলি!
: মন খারাপ কেন ভাবী? ভাইয়া ঝগড়া টগড়া করলো নাকি?……. আপনার মতো এরকম একটা মানুষের সাথেও ঝগড়া করা যায়????? বিশ্বাসই হচ্ছে না!
: জন্মদিনে কি কি করলেন আপনারা? …….কি? ভাইয়ার অফিস?…..কি যে বলেন!…. আমি এরকম একটা বউ পেলে জন্মদিন উপলক্ষে এক সপ্তাহর ছুটি নিতাম!…. হাইসেন না, সিরিয়াসলি!
উল্টোদিকে ভাইদেরকেও ভাবীরা নানা প্রশংসা করে ফেলে।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য প্রতিষ্ঠিত চল্লিশোর্ধ বিবাহিত পুরুষেরা যেমন অনেক নিরাপদ, ঠিক তেমনি নিরাপদ ত্রিশোর্ধ এক বা দুই সন্তানের জননী বিবাহিতারা। এই উভয়পক্ষের মনের ভিতরে প্রশংসা পাওয়ার আগুন নিভে গেলেও ধোঁয়া থেকে যায়। এলাকার ডাকসাইটে সুন্দরী, কলেজ কাঁপানো, ভার্সিটির করিডোরে ভক্ত পরিবেষ্টিত সুন্দরীরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সচিব আমলার বউ হয়ে যায়, তাঁদের না থাকে কোন নিজস্ব পরিচয় , না থাকে আশে পাশে প্রশংসার চোখগুলো ! এইসব স্পর্শকাতর বিবাহিতারা লোল পুরুষের নিরাপদ আবাস। পরকীয়ায় জড়িয়ে তার প্রেমে এখনও পুরুষকুল হাবুডুবু খাচ্ছে এটা ভেবে ভেবে , এক গভীর পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে যায় ঐ সুন্দরীরা। সে যে বিদুষী, রূপবতী , গুণবতী –শুধুমাত্র সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে সে গৃহবন্দী হয়ে আছে , সেই ব্যাপারে সে নানা সমবেদনা আশা করে। চালাক পুরুষ মাত্রই সেই আকাঙ্ক্ষার চারাগাছে পানি দেওয়া শুরু করে। মুখোমুখি কথা বলার সক্ষমতা খুব কম লোকের থাকে, অথচ ফোনে সেটা আরেকটু সহজ। মনের অনেক কথা বলে ফেলে যায়। আর মোবাইলের যুগের পরে এখন ভার্চুয়াল অন্তর্জালের সময়ে সেই সুযোগ অনেক বেশি। মেসেঞ্জারে তো কথার ফুলঝুরি ছোটে।
একটা সময়ে ঘরের নারীরা স্বামীর ব্যাপারে আস্থাশীল হয়ে পড়ে, জানে কোথায় আর যাবে! বাচ্চা কাচ্চার টানে দিনের শেষে এই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হবে।
আমার এক বন্ধু বাচ্চাকে স্কুলে দিতে গিয়ে বহুদিন ধরে বাচ্চার বান্ধবীদের মায়েদের সান্নিধ্য পেয়েছিল। তার বউ জেনে যাওয়ার পরে যথারীতি নানা মানঅভিমানের পরে তাঁরা এখন প্রবাসে ঘাঁটি গেড়েছে।
আরেক বন্ধু ছিল টাইম-জোনের বিপরীতে ; তার পড়তো রাতের ডিউটি — তার রাত মানে তখন বাংলাদেশের দিন। কীভাবে কীভাবে সে নানা বিবাহিতার সঙ্গে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাতভর কথা বলে সম্পর্ক গড়ে তুলত। সেটা সে দেশে ফিরে এলে দৈহিকতায় শেষ হত। চোরের দশদিন , গৃহস্থের একদিন ! সেও বউয়ের কাছে ধরা খেয়ে এখন লাইনে চলে এসেছে।
বিয়ে করে একজন জীবনসঙ্গিনীকে পেতে আমাদের সমাজে পুরুষদের যে পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয় সারাজীবন ধরে। সেই জীবনসঙ্গিনী ও সংসারকে আরেক রোমাঞ্চের জন্য হারিয়ে ফেলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয় ,সেটাও বিশাল বেদনাদায়ক। আস্থার সংকট একবার হলে সেটা ফিরে আসতে সময় তো লাগেই।
বহুদিন আগে আমরা যখন একে একে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসাবে বিবেচিত হওয়া শুরু করলাম। আমার এক উচ্চপদস্থ বন্ধুর পশ্চিমা সিইও তাঁকে বলেছিল, সময় পেলেই যেন রিল্যাক্স করে ! সিইও-এর দৃষ্টিতে রিল্যাক্স মানে অনেক কিছু হতে পারে। হতে পারে সেটা জিম, ট্রাভেল, অ্যালকোহল,সেক্স, গ্যাম্বলিং, আড্ডা ইত্যাদি ইত্যাদি ! তাঁর মতে, যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা , যাদেরকে সারাক্ষণ অনেক প্রেশারের মধ্যে কাজ করতে হয় তাঁদের যে কোন একটা সিদ্ধান্তের উপর মুলতঃ প্রতিষ্ঠানের ও একই সঙ্গে অনেক মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত যারা নেয়, তাঁদের একটু রিল্যাক্স করার, ব্যাপারটা জায়েজ আছে। তবে, মানুষ সে উচ্চপদস্থ হোক বা নিম্ন তার একঘেয়ে জীবনের রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চার আবশ্যক। নিম্নবিত্তদের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমসিম খেতে হয়। Maslow’s hierarchy of needs হিসাব করলে নিম্নবিত্তদের সেকেন্ডারির চাহিদার দিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায় ?
পুরনো দিনে ফিরে যাই আবার ! ৯০ এর দশকের শেষের দিকে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাচের সবাই শিক্ষা সফরে ভারতে। এক পর্যায়ে কোলকাতায়। শেষ বিকেলে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে এতো ঘনিষ্ঠভাবে কপোত কপোতীদের কে দেখে গাইডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দাদা এ কী অবস্থা ! সে হাসি মুখে বলেছিল, কী করবে বলুন দাদা বলুন। সারা কোলকাতায় প্রেমিক প্রেমিকাদের বসার জায়গাই বা আছে কটা। বাদ দিন দাদা, ওদিকে তাকাবেন না !
অঞ্জন দত্তের বেলা বোসের গান তখন খুব জনপ্রিয়। এমন হয়েছে, আমি সেই ২৪৪১১৩৯ নাম্বারে ফোন দিয়ে বলেছি এটা কি বেলা বোসের নাম্বার। ওপাশ থেকে হেড়ে গলায় উত্তর এলো ওটা কী একটা দোকানের ফোন নাম্বার যারা কী সব সাপ্লাই টাপ্লাই দেয়। সেই সঙ্গে আরো বলল, যে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এরকম কল পেয়ে থাকেন। অঞ্জন দত্তের আমাদের সময়তো তাই গেছে, সারা ঢাকা শহরে একটা ভাল পার্ক নেই, দুদণ্ড বসে কথা বলার জায়গা নাই। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চন্দ্রিমা উদ্যানে হকারদের অত্যাচার যারা আগের দশকে প্রেমিকাকে নিয়ে গেছেন তাঁরা জানেন। এখন সেটার কোন উন্নতি হয় নি বলেই আমি জানি। প্রেমিক প্রেমিকা দেখা করছে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে, বার্গার হাউজে, এটা কোন কথা হল !
আমার এক মামা ; সারা জীবন বয়েজ স্কুল , কলেজ, ইউনিভার্সিটি করে অবশেষে বিয়ের দেখা। তার জীবন এতোটাই নারী-বিবর্জিত ছিল যে, বিয়ে করার পর নতুন মামীর প্রতিটা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনতে পাওয়া যেত। তুমি এইটাও পার, তুমি এইটাও পার? মর জ্বালা, সে সম্ভবত: নতুন মামীর সকালের প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাকেও বিস্ময়ের সাথে নিয়েছিল। নারী বিবর্জিত শৈশব কৈশোরের পুরুষেরা অনেক বেশি বিপদসংকুল হয়। একই ভাবে পুরুষ-বর্জিত সমাজে যে নারী বেড়ে ওঠে।
এই মধ্যবয়সে আমাদের একই সালে এসএসসি পাশ করাদের একটা সারাদেশব্যপী একটা ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে মাস ছয়েক ধরে। আমাকে কেউ একজন অ্যাড করেছে গত ডিসেম্বরে। সিংহভাগ তরুণ-তরুণীদের বয়সটাই শুধু বেড়েছে। কৈশোরিক প্রগলভতা যায় নি। পুরনো বান্ধবীরা যারা ছিল সেই বয়সের আরাধ্য, তাঁদের অনেকেই এখন ফেসবুকের গ্রুপে। কৈশোরে যার সঙ্গে কথা বলাতো দূরে থাক, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। তাঁদের কে ভার্চুয়াল জগতে পেয়ে আমাদের ছেলে বন্ধুদের হ্যাংলামি চোখে বাঁধে । ঠিক তেমনি, মহল্লার একসময়ের ডাকসাইটে সুন্দরীরা যাঁদের মেদ জমেছে, চোখের নীচে কালি, ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁরাও তাঁদের রূপমুগ্ধদের এতোদিন পরে হাতের নাগালে পেয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত ! সেই স্কুলের দিনগুলোতে , আমাদের যখন মানসিক বয়স ১৩-১৪ তে আটকে ছিল, আমাদের বান্ধবীদের তখন প্রকৃতির নিয়মে দ্রুত বেড়ে উঠছিল হরিণীর শরীর । আমাদের বান্ধবীরা বুঝে গিয়েছিল, কী অমূল্য সম্পদের মালিক তাঁরা ! সারাক্ষণ নানা বয়সের যুবকদের আহাজারি তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছে ! বান্ধবীদের বড় একটা অংশ তড়িঘড়ি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত সফলদের বিয়ে-টিয়ে করে ঘরসংসারী হয়ে গেল।
আজ এতোগুলো বছর পরে , তাঁদের রূপমুগ্ধদের একসঙ্গে পেয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁদের নানা ভঙ্গীর ছবি লোডের বাহার আর লাইক গোনার হুল্লোড় শুরু হয়ে গেছে। শিকারি বিড়ালের মতো এরা ইঁদুরকে একবার ধরে আবার ছাড়ে। আবার ধরে, আবার ছাড়ে ! মারেও না , খায় ও না ! এটাই খেলার মজা । বয়স হয়েছে , কিন্তু সেই শিকারির ট্রেনিং তো আর ভুলে যায় নি সে। এর মাঝেই কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত সম্পর্ক দাঁড় করিয়ে ফেলে , সেটা কোথায় গিয়ে গড়ায় সে তারাই জানে।
ঠিক কেমন মেয়েদের সঙ্গে পরকীয়ার জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত পুরুষরা? স্ত্রীরা ভাবেন যে পরকীয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিনী হয়তো তাঁদের চেয়ে আকর্ষণীয় উদ্ভিন্ন যৌবনা , দুষ্টুমি আর গ্ল্যামারের একটা মিশ্রণ ! কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। পরকীয়া হয় অনেকাংশে সমবয়সী পুরুষ-নারীর অথবা তার বেশি বয়সী কারো সঙ্গে । এমনকি স্ত্রীয়ের চেয়ে অনেক কম সুন্দর ও শিক্ষিতাদের সঙ্গে । কীভাবে কীভাবে যেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিনী তার টার্গেট করা পুরুষটির মনের শূন্য জায়গাটি দখল করে নেয়। যে বিষয়গুলো নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন কথা বলেন না। তাঁদের পয়েন্ট অভ ইন্টারেস্ট না , সেইগুলোতেই আলোচনা এগুতে এগুতে পুরুষটি খুঁজে পায় তার মানসিক অবলম্বনকে । মানসিক শূন্যতা আর ফিল ইন দি গ্যাপ থেকেই সম্পর্ক বাড়তে বাড়তে অবধারিতভাবে দৈহিকতায় যেয়ে শেষ হয়। সেটা নিয়ে কোন জড়তা থাকে না উভয়পক্ষের কারো মাঝে ।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ভাল কী মন্দ কীএসব নিয়ে মন্তব্য করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি লেখার শুরুতেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, পরকীয়ার একপেশে মন্দ দিকের পাশাপাশি ভালো দিকও আছে। পরকীয়া নতুন করে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। সারাদিন ধরে একজন পুরুষ অফিসের কর্মকর্তা, বাসায় ফিরে কারো পুত্র, কারো পিতা, কারো কাকা-জ্যাঠা, কারো স্বামী ! ঠিক একই ভাবে নারীটির পরিচয় কারো মা, কারো কন্যা, কারো চাচী-ফুফু, কারো স্ত্রী ! সমাজের আরোপিত পরিচয়ের বাইরে আর কোন পরিচয় থাকা সম্ভব না। সেই নারী ও পুরুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে সব ব্যাপারে অনেক সচেতন ও সাবধানী হয়ে যায়, নিজেকে আরো বেশী করে গুছিয়ে তোলেন। দাম্পত্যের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি মেলে। আবার একটা অপরাধ বোধ থেকে নিজের জীবনসঙ্গী অথবা জীবনসঙ্গিনীর ব্যাপারে ভালোবাসা বেড়ে যায়, সম্পর্কের উন্নতি হয়। সবচেয়ে বড়কথা নিজেকে নতুন করে ভালোবাসা শুরু করে পুরুষ ও নারী !
বলাই বাহুল্য, পরকীয়ার সম্পর্ক ঠিক কতদূর যাবে, কোথায় থামতে হবে সেটা অংশগ্রহণকারীদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে ! একই কর্মকাণ্ডে একজন দিব্যি সংসার করে চলেছেন ; তো আরেক জনের সংসার ভেঙ্গে একাকার। একটা সম্পর্কের বিনিময় মূল্য কতোখানি দিতে হচ্ছে সেটাই তাঁদের আগামীর পথ নির্ধারণ করে দেয়। । সামান্য অথবা অসামান্য রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চারের বিনিময়ে আপনি কী কী পেতে পারেন অথবা কী কী হারাতে পারেন, সেই হিসাব আপনার নিজস্ব।
সবার জন্য ভালোবাসা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা !
প্রকাশকালঃ ৭ই ফেব্রুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
পিকনিক ১৯৮১ স্টাইলঃ
ক্লাস টুতে পড়ি , জীবনের প্রথম পিকনিক। ক্লাস টিচার বললেন, ‘কাল সকালে ৮:০০ টায় ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্কে পিকনিক। বাসা থেকে প্লেট আর গ্লাস নিয়া আসবা!’ ওক্কে ! স্কুল ড্রেস দুইবার করে ইস্তিরি করি। সাদা কেড্সে চক মারি। সারারাত এপাশ ওপাশ, মিস যেন না হয় !
আম্মা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভঙ্গুর চীনামাটির জায়গায় ষ্টীলের গ্লাস-প্লেট দিলেন। পলিথিন ব্যাগে গ্লাস-প্লেট নিয়া স্কুলের বাসের কাছে হাজির। ন্যাশনাল পার্ক। হতাশ ! কিছু শাল গাছ, কয়েকটা ডোবা টাইপ পুকুর, মাঝে মাঝে ক্ষত চিহ্নের মতো ন্যাড়া ধানক্ষেত ! দুই তিন বন্ধু মিলে অবশেষে একটা বড়ই গাছ আবিষ্কার করি , কাঁচা বড়ই খেয়ে মুখ কষা ! পরের বছরগুলোতে ঘুরেফিরে ওই একই জায়গায় কয়েকবার। নিজের গ্লাস-প্লেট নিয়ে গেছি একবারই। প্রতিবার সন্ধ্যায় ফেরার পথে মুক্ত স্বাধীন চিৎকার । বাসের উপরে মাইকে বাজে—‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায় —।’
চাকরিক্ষেত্রে দেখা গেল, আমাদের টেক্সটাইল মিল কল-কারখানা সব ওই দিকে এবং সপ্তাহে ৩/৪ দিন যেতে হয় ন্যাশনাল পার্কের ধারপাশ দিয়ে । শালবন দেখি, হঠাৎ হঠাৎ পুরানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে। প্রথম পিকনিক , প্রথম প্রেমের মতোই ভুলিনি । নিজের গ্লাস প্লেট নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো বুঝি নাই। এমন না যে, ওই সময়ে ডেকোরেটর ছিল না। হয়তো, খরচ কমানোর জন্য সবাইকে বাসা থেকে গ্লাস-প্লেট আনতে বলেছিলেন। বড় হওয়ার পরে সেই ক্লাস টিচারের সাথে আর দেখা হয় নাই, হলে জিজ্ঞেস করতাম।
পিকনিক ২০১৩ স্টাইলঃ
মেয়ের স্কুল পিকনিক। টু মিনিট ইনস্ট্যান্ট নুডল্সের মতো সব প্রিপ্যাকড । স্থান সেই ভাওয়ালের আশে পাশের একটা স্পট। দুই মেয়েকে নিয়ে বউয়ের চারদিন আগের থেকে প্রিপারেশন। ম্যাচিং ড্রেস, কয়েকটা ব্যাগ, ক্যামেরা, হাল্কা খাবার, পানি , কী নাই !
সাজানো গোছানো দেয়াল ঘেরা বদ্ধ পিকনিক স্পট। গাড়ীতেই নাস্তা। নামার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার পাতা, ছায়া ঘেরা বাগান। ফুটফুটে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। ঠিক দুপুর একটায় প্যাকেট খাবার, পানি, কোল্ড ড্রিঙ্কস মায় টিস্যু পর্যন্ত। বিকালে পিঠা –চা। আর আমার বিনোদন ? পিচ্চি গুলার সাথে একান্ত কিছু সময় , আর অন্য বাচ্চাদের মায়েদের দিকে ইতি উতি তাকানো, হা হা হা !
ধুর ! এইটা কোন পিকনিক হইলো !
পাদটীকা:
এই ফেব্রুয়ারিতে বছর চারেক পরে কন্যাদের পিকনিক হয়েছে ‘ফ্যান্টাসি কিংডম’-এ। কারো সঙ্গে কারো কথা বার্তা নেই। যার যার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাইডগুলোতে উঠছে। টিকেট দিয়ে খাবার নিচ্ছে। যেটুকু কথাবার্তা বাসে যেতে যেতে। আরো বছর চারেক পরে কি পিকনিকের কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটার জন্য অপেক্ষা।
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩
by Jahid | Nov 29, 2020 | লাইফ স্টাইল
নারী দেহের কমনীয় বাঁকগুলো দেখে আমি এখনো বলে উঠি বাহ্ , চমৎকার ! এর বেশী কিছু না।
অনেক অনেক বছর আগে, ৯০/৯১ হবে হয়তো । সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল ; সাহিত্য কেন্দ্রের ছোট্ট খোলা ছাদের এক খোলা আসরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার অনেকটা এরকমটি বলছিলেন, “এই উজ্জ্বল আলোতে ( সামনের বাতিটিকে দেখিয়ে) আমরা লুকিয়ে রেখেছি আমাদের হিংস্র পশুকে ; আমাদের শিক্ষা, বিবেক, সামাজিক অবস্থান, আমদের সভ্য করে রেখেছে ; নিয়ন্ত্রিত রেখেছে। যদি আলো নিভে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। যদি অন্ধকারের কাছে তোমাদের দায়বদ্ধতা জমা থাকে ; জবাবদিহিতার কোন সম্ভাবনা না থাকে । তোমাদের ভিতরের পশুগুলো বের হয়ে পড়বেই। ঝাঁপিয়ে পড়বে- তোমরা তোমাদের পাশের সহপাঠিনীদের ওপর !”
কৈশোর পেরুনো আমাদের কয়েকজন সদ্য তরুণ ভীষণ মর্মাহত হলাম। বলেন কি স্যার ! আলো থাক বা অন্ধকার ,আমরা দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী ছেলেরা কখনো এই কাজ করতে পারি ?
জীবনের বেশগুলো বছর পার হয়ে এখন মনে হয়, স্যার হয়তো সত্যিই বলেছিলেন। আমরা কত কসরত করে, ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ, পাপ, শাস্তি, শিক্ষা, সভ্যতার প্রলেপের পর প্রলেপ দিয়ে লুকিয়ে রাখি আমাদের পশুটাকে।
নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কের বাইরে , নারী পুরুষের মুখোমুখি হওয়া মানেই কি শিকার আর শিকারির মুখোমুখি হওয়া ? সম্পর্কটা কি শুধুই খাদ্য-খাদকের ? হরিণটি অজস্র শব্দের ফাঁকেও কীভাবে যেন টের পেয়ে যায়, তার সামনে বা আশে পাশে মাংসাশী পশু ; তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করে কোনদিকে সম্ভাব্য বিপদ। নারীদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। মাংসাশী পশুটি ক্ষুধার্ত ও আগ্রাসী না থাকলেও হরিণটি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেনা।
আমার জীবন হয়তো আলো-অন্ধকারে কেটে যাবে। কিন্তু এই জনপদে কতখানি জায়গাতেই বা আলো পৌঁছচ্ছে ? দীর্ঘ দায়বদ্ধতা-হীন অন্ধকারে শিকার-শিকারির ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্পর্ক কি চলতেই থাকবে ?
প্রকাশকালঃ জানুয়ারি, ২০১৩
by Jahid | Nov 29, 2020 | দর্শন, লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
এই ডিসেম্বরে কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রবাসী বন্ধুদের কল্যাণে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমাদের ৯০ ব্যাচের কয়েকজনের পরপর দু’টি ঘরোয়া আড্ডা হয়ে গেছে। স্যারের সঙ্গে সময় কাটানোর মহার্ঘ স্মৃতি কিছুটা ধরে রাখতে পারলে ব্যক্তিগতভাবে আমার দু’টো সুবিধা। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ; আর বহুদিন পরে হলেও ফিরে এসে এই স্মৃতিগুলো নেড়ে দেখার সুযোগ।
শিক্ষক-ছাত্রের ঘরোয়া অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো এতো বেশী অনাড়াম্বরময় ছিল যে, সেখানে বাঙালির আলস্য থেকে শুরু করে বার্ধক্য, মৃত্যু-বেদনা নিয়েও কথা হয়েছে। শিক্ষক-ছাত্রের ঘরোয়া আড্ডা অন্য কারো বিনোদনের কারণ হলে সেটা বাড়তি পাওনা।
আড্ডার শুরুতে আমাদের প্রবাসী সতীর্থ মনে করিয়ে দিল, ‘জাহিদের তো নিয়মিত আসার কথা ছিল। ও কি এসেছিল ?’ স্যার সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে অনেক উৎসাহ নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ ও তো প্রায় দশ বারো বার এসেছে!’ স্যারের বলার ভঙ্গীতে সবাই টের পেয়ে গেল, আমি গতবছর দেখা করে যাওয়ার পরে এই প্রথম আবার এলাম। আমাকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা চলল।
স্যার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে নতুন স্বপ্নের কথা শোনালেন। সরকারের কাছ থেকে পাওয়া জমিতে কেরানীগঞ্জের ওখানে প্রায় ২ বিঘার উপরে আরেকটি বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র হচ্ছে। নীচে কমিউনিটি সেন্টার থাকবে। যেটার উপার্জন থেকে, কিছুটা হলেও কেন্দ্র চালানোর সাশ্রয় হবে। আমাদের সময়ে প্রায় ২৬ বছর আগে কেন্দ্রের পাঠক-সংখ্যা ছিল হাজারে। এখন শুধুমাত্র স্কুল পর্যায়েই ২৫ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী কেন্দ্রের বই পরে। ২০১৯ সালে স্যারের স্বপ্ন ৪০ লক্ষ ছেলেমেয়েকে কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে আনার।
কেন্দ্রের কেন কোন প্রচারণা নেই , এই প্রশ্নের উত্তরে স্যারের সোজা জবাব, প্রচারণা তাঁর পছন্দের নয়। আমার নিজেরও তাই মনে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে বই পড়ার মাধ্যমে একটা ছেলে বা মেয়ের সে মানসজগৎ গড়ে ওঠে ; বাজারই প্রচারণায় অসংখ্য অনাকাঙ্ক্ষিত বাহুল্যকে সেই টোটকা দেওয়া অর্থহীন। পরিশীলিত মন একদিনে হয় না; সময় লাগে। কেন্দ্রের ভিতরে অনেকগুলো ছোট ছোট কয়েকটা মিলনায়তন করা হয়েছে, কোনটি বড় সেমিনারের জন্য, কোনটি পাঠচক্রের। স্যার আমাদের সবাইকে দেখালেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শিক্ষকতার পাশাপাশি কবিতা আন্দোলন চালিয়েছেন ষাটের দশকে ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করে। ওই পত্রিকা ধরে উঠে এসেছেন ষাটের দশকের প্রথম সারির কবি ও লেখকেরা। পরের দেড়যুগ মেতে ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র টিভি চ্যানেলে শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা নিয়ে। পরিশীলিত রুচির দর্শক গড়ে তোলার পেছনে তাঁর অবদান আছে। তাঁর মূল পরিচয় শিক্ষকতা চালিয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে। শিক্ষক হিসাবে স্যারের সাফল্য অগণনযোগ্য, অপরিমেয় এবং কিংবদন্তীতুল্য ! সবকিছু নিয়ে মেতে থাকায় নিজের লেখালেখির দিকে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারেন নি। দেখা হওয়ার পরে সৌজন্য কুশলাদি জিজ্ঞেস করার পরে এখন কি কি পড়ছেন, বা লেখালেখির কি অবস্থা জিজ্ঞেস করা হলে , হাসিমুখে বললেন, ‘ শোন হে আরেকটু বেশী করে লেখালেখি করতে পারলে ওই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের ( পড়ুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কাছাকাছি পরিমাণ লিখে ফেলতে পারতাম!’ আমাদের কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘পরিমাণ বেশী হওয়াই কি সব? গুণগত মান না থাকলে পরিমাণ বেশী দিয়ে কি হবে?’ স্যার বললেন, ‘ভুলে যেও না কোয়ান্টিটি নিজেও কিন্তু একটা কোয়ালিটি।’
সত্যিই , স্যার নানা কাজে মেতে থাকায়, নিজের লেখক সত্তাকে সময় দিতে পারেননি । স্যারের আড়ালে আমি আর আরেক সতীর্থ বলে ফেললাম, লেখক সত্তার চেয়ে স্যারের শিক্ষক-সুলভ উদ্দীপক বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ড অনেক বেশী জনপ্রিয় ও কার্যকর। তা ছাড়া আরো দশজন লেখকের মতো তিনি নিজের লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আমরা তাঁকে পেতাম কোথায়? তাই যা হয়েছে, বাংলাদেশের বৃহত্তম স্বার্থের জন্য ভালোই হয়েছে।
কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর পৌঁছানোর কথা থাকলেও সবার দেরী হয়ে যায় ঢাকার ট্র্যাফিকে । প্রবাসী বন্ধুরা ঢাকার ট্রাফিকের পাশাপাশি ঢাকার যত্রতত্র ফেলে রাখা নোংরা আবর্জনা ও ঢাকার মানুষের নাগরিক আচরণ-বোধ , সিভিকসেন্সের অভাবের কথা ওঠাল। জনসংখ্যার চাপ নাকি অন্যকোন কারণে রাস্তাঘাটে মানুষের থুতু ফেলার পরিমাণ বেড়ে গেছে , কে জানে। বাঙালির সমস্যা হচ্ছে, বাইরের দেশে আমরা আইন মেনে চলি, নিজের দেশে ঠিক তার উল্টো। আমাকে বিভিন্ন দেশে অফিসের কাজে যেতে হয়। এই যাত্রাগুলোর বেশীরভাগই এমিরেট্স এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দুবাই-এ ট্রানজিট থাকে। ওই ফ্লাইটগুলোর জায়গায় এখন অনেক বাজেট ফ্লাইট এসেছে। প্রবাসী শ্রমিকেরা ইদানীং এমিরেট্সের ফ্লাইট তেমন ব্যবহার করেন না। এমিরেট্স একসময় উচ্চবিত্ত , মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সবধরনের যাত্রীর প্রধান বাহন ছিল। ইদানীং উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের প্রাধান্য বেশী। তো বছর পাঁচেক আগে, আমি ক্লান্ত হয়ে ঢাকার ইমিগ্রেশন পার করে লাগেজ বেল্টে এসে দাঁড়িয়েছি মাত্র। ওই ফ্লাইটের সিংহভাগ ভাগ প্রবাসী শ্রমিক। প্রতি ফ্লাইটেই আমাকে এঁদের কারো না কারো এম্বার্কেশন ফর্ম ফিলাপ করে দিতে হত।যাই হোক, লাগেজ বেল্টের কাছে এসে দেখি এক প্রবাসী শ্রমিক হুট করে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। আমি হতভম্ব ! কাছে গিয়ে বললাম, সিগারেট খাচ্ছেন কেন। তো , সে একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দিল। তাঁকে প্রথমে বুঝিয়ে বললাম, দুবাই এয়ারপোর্টে কোথায় সিগারেট ধরালেন না। যে কয়দিন দুবাইয়ে ছিলেন , নিয়ম মেনে চললেন ; যেই না বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছেন, সব নিয়মকানুন ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করল? আমার উত্তেজিত বাদানুবাদে এয়ারপোর্ট পুলিশ এসে পড়লে, ঘটনার ওখানেই শেষ হয়। যে শিক্ষাটা পরিবার থেকে হওয়া উচিৎ, সেটা বয়সকালে শাস্তিযোগ্য অপরাধের ভয় দেখিয়ে কতখানি সাফল্য পাওয়া যাবে। নিজের কফ থুতু নিজের ভিতরে রাখা উচিৎ। অসংখ্য জীবাণু কফ থুতুর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে ; সেটা প্রাপ্তবয়স্কদের না বুঝিয়ে স্কুলে স্কুলে বোঝানো উচিৎ। থুতু-কফ ফেলা, যত্রতত্র মূত্রত্যাগ আমাদের বাঙালিরা বাইরে গেলে কখনই করে না ; দেশে অবলীলায় করে। জানে, নিয়ম ভাঙ্গাটাই নিয়ম। বাইরে গেলে আমিও চকলেট টফির মোড়ক আশেপাশে বিন-বক্স না পেলে পকেটে রেখে দিই, যথাস্থানে ফেলে দেওয়ার জন্য ! সেই আমিই হয়তো ঢাকার রাস্তায় যা ইচ্ছে তাই ফেলছি, কারণ এটাই নিয়ম আর সাধারণ জনগণের জন্য পাবলিক টয়লেট বা বিন-বক্স কিছুই নেই বললেই চলে।
বাঙালির আলস্য নিয়ে স্যারের ব্যঙ্গাত্মক কথা বার্তা আগেও শুনেছি, আবার শুনলাম। কেউ একজন কেন্দ্রের টয়লেটের পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করলে , স্যার মনে করিয়ে দিলেন এই কেন্দ্রেও বাঙ্গালীর আলস্য পৌঁছে গেছে। কাজ শেষ হওয়ার পর, সামান্য ইউরিনাল ফ্ল্যাশ করতেও এঁদের আলস্য লাগে। বাধ্য হয়ে স্যার ,পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কে বলে দিয়েছেন প্রতি ১০-১৫ মিনিট পরপর যেন টয়লেটগুলোকে ফ্ল্যাশ করার হয়।
আসলে ঢাকা শহর তো একটা বিশাল গ্রামের মতো। অন্য পুরনো শহরের মতো দীর্ঘস্থায়ী রুচিসম্পন্ন জনগোষ্ঠী এখানে গড়ে ওঠার সুযোগ পায় নি। মূল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মফঃস্বলের রুচিসম্পন্ন সংস্কৃতিবানদের চেয়েও বেশী প্রাদুর্ভাব বিশুদ্ধ গ্রাম্য জনগণের। গ্রাম থেকে স্কুল পেরিয়ে অথবা না পেরিয়ে জীবিকার তাগিদে এক বিশাল জনস্রোত চলে আসছে ঢাকায় । তাই এই গ্রাম্য ঢাকাবাসীর নাগরিক সচেতনতা গড়ে উঠতে সময় লাগছে।
আরো কিছু বদভ্যাসের অভ্যাসের কথা উঠে এলো আলোচনায় । স্যারের আঙুল মটকানোর অভ্যাস আছে । এই বাজে অভ্যাসটা আমার ও আছে কোনভাবেই নিষ্কৃতি পাইনি। কতো জনে লজ্জা দিয়েছে, তবু যাচ্ছে না। স্যার নাকি , এটি নিয়ে কোন একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। ডাক্তার তাঁকে হতাশ করে বলেছেন, ‘ছোট বেলা হলে মুরব্বী কারো এক ধমকেই এটা সেরে যেতে পারত। এই বয়সে এখন আর সম্ভব নয়।’
এই কথার হাত ধরেই সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য প্রসঙ্গে কোয়ান্টাম ও মহাজাতকের কথা এসে পড়ল। আমি নিজেও একটু অবাক হয়েছিলাম, স্যার নিজেই যেখানে বাতিঘর, তাঁর কেন কোয়ান্টাম করতে হবে। স্যারে বেশ কিছু ভিডিও ক্লিপ বক্তৃতা ইউটিউবে দেখেছিলাম কোয়ান্টামের প্রশংসায়। যা বললেন , বেশ কয়েকবছর আগে তাঁর হঠাৎ করে ক্লান্তি ভর করেছিল। কোন কারণ ছাড়াই ওজন দ্রুত কমে যাচ্ছিল অথচ কোন অসুস্থতা নেই। মনে হয়েছিল, এটাই বোধহয় সেই ‘বার্ধক্য’ ! অবশেষে বার্ধক্য চলেই এসেছে। কোয়ান্টামের শহীদ আল বুখারীর সঙ্গে স্যারের পরিচয় অনেকদিনের। তিনি অনেকবার তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। স্যারের স্ত্রীও কোয়ান্টামের ব্যাপারে সপ্রশংস। কি মনে করে একদিন হাজির হলেন কোয়ান্টামের অনুষ্ঠানে। প্রথমদিনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উনি বুঝে গেলেন তাঁর সমস্যটা কোথায়। আসলে জগতের সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে, সুন্দর যেমন নিজের সৌন্দর্যকে দেখে না ; যেমন করে চোখ নিজে সবকিছু দেখতে পায় , কিন্তু সে নিজেকে দেখতে পায় না। মস্তিষ্কও ঠিক তেমনি সারাক্ষণ অন্যকে পরিচালনা করে চলেছে, কিন্তু তাঁকে পরিচালনা করার কেউ নেই ! মস্তিষ্কের আচরণ কিছুটা নির্বোধের মতই মনে হয়। তাঁকে যদি ভুলিয়ে ভালিয়ে কিছু বোঝানো যায় , সে বুঝে ফেলে। কোয়ান্টামের মূল ব্যাপারটি হয়তো তাই। স্যার ভাবা শুরু করেছিলেন, বার্ধক্য এসে গেছে, এই অটো সাজেশন ব্যাপারটিকে প্রভাবিত করছিল তাঁর শরীরে। যেই না তিনি উল্টো ভাবা শুরু করলেন ফিরে গেলেন আগের তারুণ্যে।
আমাদের প্রাত্যহিক কাজের আমনুষিক চাপ, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির গড়মিল , হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানো আর নিরবচ্ছিন্ন হতাশার জীবন। কেন এতো হতাশা চারিদিকে? জীবনের প্রাপ্তিও তো কম নয় ! তবু কেন প্রাপ্তির তুলনায় অপ্রাপ্তিকে নিয়ে আমাদের এতো হা হুতাশ। যে কথাটা বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রণিধানযোগ্য , সেটা হচ্ছে, আমাদের জীবনের ৯৫ ভাগই আশার মাত্র ৫ ভাগ বা তারও কম হয়তো নিরাশার। কিন্তু নিরাশার ব্যাপারটিকে নিয়ে মানুষ বেশী আলোচনা করে, সেটি মনে রাখে দীর্ঘদিন।
স্যারের সঙ্গে পরিচয় সেই ৯০ সাল থেকে। মাঝখানে দীর্ঘ বিরতিতে প্রায় ২০ বছর পরে স্যারে সঙ্গে মুখোমুখি আড্ডা। স্যার সব সময় ধর্ম নিয়ে যে কোন আলোচনাকে সযত্নে এড়িয়ে যেতেন। আমার নিজের একটা ব্যাখ্যা আছে এই ব্যাপারে। সেই বছর পঁচিশেক আগেই কেন জানি মনে হয়েছিল ওই কথাটা । আসলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পড়ানো হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত লেখকদের লেখাগুলো –তাঁদের কেউ তো আর তথাকথিত ধার্মিক বা ধর্মগুরু ছিলেন না। আমাদের পড়তে হয়েছে চিরায়ত বিশ্বসাহিত্য থেকে শুরু করে চিরায়ত বাংলা সাহিত্যের বেছে নেওয়া লেখাগুলো। ওই লেখাগুলোর কিছুটা প্রভাব আমাদের সদ্য প্রস্ফুটিত মনের উপরে পড়েছেই। ধর্মশিক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের পুরো পরিবার ও সমাজ উঠে পড়ে লেগেইছিল। স্যার তাই ধর্ম অধর্ম নিয়ে নতুন করে কিছু কখনই বলেননি।
আবার মোল্লা পুরোহিতরা সারাজীবন প্রগতির বিরুদ্ধে, সকল প্রশ্নের বিরুদ্ধে। আশির দশকে সেই আশংকা একেবারে যে ছিল না , তা নয়। ওই সময়েও কোন একজন মেধাবী লেখককে বা কোন প্রতিষ্ঠানকে কোনভাবে ধর্মবিরোধী তকমা লাগিয়ে দিতে পারলে তাঁর দফারফা হয়ে যেত ; সে আমাদের বহুবারের দেখা। স্যার তাই , নিখাদ সাহিত্যের বাইরে কোন কিছু বলতেন না। হতে পারে, ধর্মের মতো নির্জীব একটা বিষয় নিয়ে আলোচনায় তাঁর উৎসাহও ছিলনা। আলোর সংস্পর্শে এলে কাউকে আর আলাদা করে পথ দেখিয়ে দিতে হয় না । নিজের জ্বালানো আলোতে পথ খুঁজে নিতে পারবে তাঁর ছাত্ররা, সেই বিশ্বাস তাঁর ছিল। সেই সময়েও যেমন অনেক প্র্যাকটিসিং ধার্মিক লোকের আনাগোনা ছিল কেন্দ্রে। এখনো আমাদের মধ্যে বন্ধুদের মাঝে অনেক প্র্যাকটিসিং মুসলমান আছেন। কোন দ্বিধা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের কেটে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রশিক্ষক সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে অবলীলায় এখন অনেক কথাই জিজ্ঞেস করে ফেলি আমরা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানের শাসনামলে ধর্মীয় পাণ্ডাদের উপদ্রব ছিল। তা ছিল সীমাবদ্ধ কয়েকটি জায়গায়। পাণ্ডাদের যন্ত্রণার পাশাপাশি একটা সুস্থ, পরিশীলিত মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠেছিল। সাধারণের মাঝে হিজাব, বোরখার প্রকোপ বা ধর্ম নিয়ে ‘গেল গেল’ রব ছিল না। এখন প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে এসে, ধর্মীয় পাণ্ডাদের উপদ্রব যেমনটি বেড়েছে ; প্রগতিশীলরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মাঝে হিজাব, পর্দার মতো ব্যাপারটা বুঝে না বুঝে ফ্যাশনের মতো জেঁকে বসেছে। আমি স্যারকে সেটাই মনে করিয়ে দিলাম, ষাটের দশকের চেয়েও ধর্মের প্রকোপ এতো বেশী কেন, এতো ধার্মিক লোক তবু কেন এতো ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ? স্যার এড়িয়ে যেতে যেতে যেটুকু বললেন, তাঁর মতে বর্তমান পুরো মুসলিম সমাজ হীনমন্যতায় ভুগছে। ছোট্ট একটা দেশ ইজরাইল, ৬ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে সারা আরব বিশ্বকে ত্রস্ত করে রেখেছে। সারা বিশ্বে যাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী হচ্ছে ১৫ মিলিয়নের মত। সেই তুলনায় মুসলিম আছে সারা বিশ্বে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ( ১৬০০ মিলিয়ন) । স্পষ্টত: ইহুদীদের তুলনায় মুসলমান আছে প্রায় ১০০ গুণ ! কিন্তু ওই গুটিকয়েক ইহুদীদের দাপটে পুরো মুসলিম সমাজ তটস্থ । ইজরাইলও জানে, কোন মুসলিম দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র যাওয়ার মানে তাঁদের অস্তিত্ব শেষ ! একটা সুইচ , একটা বাটনে তাঁদের পিতৃভূমি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে ; তাই প্রাণপণে তাঁদের চেষ্টা থাকে তাঁদের সর্বোচ্চ মেধা ও শক্তি দিয়ে মুসলিম সমাজকে পারমাণবিক শক্তিমত্তা থেকে দুরে রাখা। এই এক অস্তিত্বের সংকটের দোটানায় নানা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে। মুসলিম সমাজ বলেই নয়, যখনই একটি সমাজের মানুষ হীনমন্যতায় ভোগে সে বেশী করে তাঁর পুরনো বাতিল হয়ে যাওয়া কৃষ্টি, সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে। বেশী করে মুসলমানিত্ব দেখানো, হিজাব এবং এর সঙ্গে উপজাত হিসাবে সন্ত্রাসবাদের কারণ ঘুরে ফিরে সেই ইজরায়েলের সঙ্গে না পেরে ওঠার হীনমন্যতা।
আমাদের অনেকে চলে গেছি কোন দূর প্রান্তে। জীবিকার নিষ্পেষণে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের খোঁজ খবর রাখার সময় হয়ে ওঠে না। অনেকে যোগাযোগ রাখতে চায়; কেন্দ্র ছেড়ে যেতে চায় না। কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে কতশত নতুন ছেলেমেয়ের মুখ আসে প্রতিবছর। পুরনোদের আর প্রয়োজন নেই। স্যার মনে করিয়ে দিলেন, বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরনোর পর স্কুল পার হওয়ার পর, কেউ কি ইচ্ছে করলেই স্কুলে ফিরে আস্তে পারে ? কেউ যদিও আসে, সেটা হবে মর্মান্তিক ও হাস্যকর। কেন্দ্রকে , স্যার কে যখন আমাদের প্রয়োজন ছিল, আমাদের একটা সম্পর্ক ছিল , এখন আর নেই। আমাদের আর কেন্দ্রে ফিরে আসার দরকার নেই, আমরা ব্রাত্য হয়ে গেছি। স্যার অনেকবার বলেছেন গুরু দ্বিবিধ হয়, একধরনের গুরু শিষ্যকে এমনভাবে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে ; এক পর্যায়ে দেখা যায় গুরু ছাড়া শিষ্য শ্বাসপ্রশ্বাসও নিতে পারছে না। আরেক ধরণের গুরু আছেন, যারা শিষ্যদেরকে এমনভাবে সময় দেন , তৈরি করেন , এক পর্যায়ে শিষ্যরা নিজের ডানায় উড়তে পারে। স্যার সম্ভবত: অথবা সেই দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষক যাঁদের শিষ্যদের ডানায় ওড়ার জন্য গুরুর দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। কেন্দ্রের অনেক পুরনো ছাত্ররা তাঁদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে নি। আব্দুন নুর তুষার সম্পর্কে স্যার সেই কথাই বললেন। এতো বহুমুখী প্রতিভা নিয়েও কোন একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তুষার ভাই মনোযোগ দিতে পারেন নি।
আগের বারেও স্যারের সঙ্গে যখন কথা হয়েছে, স্যার বলেছেন তিনি একসঙ্গে ১০-১২টি বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন লেখকের বই পড়া শুরু করেন। এই বছরে এসে স্যার সেটা পরিবর্তন করেছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, এটা একজন লেখকের প্রতি অন্যায়। যে কোন একজন লেখকের লেখা একটি সময়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া উচিৎ। অনেকগুলো লেখকের লেখা একসঙ্গে পড়লে, কোন একজন নির্দিষ্ট লেখকের লেখাকে সেইভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। আমিও এই ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখলাম, আসলেই তো।
বেঁচে থাকা নিয়ে তীব্র আশাবাদ স্যারের সবসময় ছিল, তা এই দুই আড্ডায় নতুন করে আবার উঠে এলো। মহাকালের প্রেক্ষিতে এই মহাবিশ্ব আমার কাছে কি বা আমি মহাকালের কাছে কতখানি তুচ্ছাতিতুচ্ছ সেটার চেয়েও বড় ব্যাপার আমি নিজে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের একটা অংশ হতে পেরেছি। উদাহরণ দিলেন , যে আকাশকে এই মুহূর্তে আমি দেখছি, সেটা আমার আকাশ !
দিন দশেক পরেই দ্বিতীয় আড্ডায় যেতে যেতে যথারীতি দেরী। স্যার কিছু কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমাদের একজন বলে আসল, আমরা কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়া বা ক্যান্টিনে থাকছি। কিছুক্ষণ পরে হাতের কাজ সেরে স্যার হাজির হলেন আমাদের চলতি আড্ডায় । কেউ কেউ লেখালেখি করছে, অনেকেই করছে না। আবার আমাদের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমেই সবার যোগাযোগ রক্ষা। হুট করে আমাদের আলোচনা মোড় নিলো ফেসবুকে। কে কিভাবে নিজেকে প্রকাশিত করে, সেটা নিয়ে।
স্যারের সোজা কথা, ফেসবুক মানুষকে অস্তিত্বের সংকট ও আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে মুক্তি দিয়েছে। রাস্তায় বের হলে, আমি আর তুমি সবাই তো একেকটা পোকামাকড়ের চেয়ে বেশী কিছু না। সেই আমাকে ফেসবুক সুযোগ দিয়েছে, নিজের আলাদা একটা পরিচয় তুলে ধরতে। সুশ্রী ছবি, চলতি হাওয়ার মুচমুচে বক্রোক্তি এনে দিচ্ছে লাইক, কমেন্টস। আমি যে কেউ সেটার একটা স্বস্তি অনুভূতি এনে দেয় ফেসবুক। কিন্তু সাময়িক স্বস্তির ফেসবুক মূলত: অস্থির সময়কে আরো অস্থির করে তোলে। যারা লেখালেখি করতে চায়, তাঁদের ফেসবুক থেকে দুরে থাকাই ভালো। বড় কিছু , গভীর কিছু পেতে হলে স্বল্পমেয়াদী ফেসবুকের লাইক ও আত্মপরিচয়ের স্বস্তির জায়গা থেকে সরে আসা ভাল।
আমাদের নিজেদের অনেক গল্প জমে ছিল। স্যার যখন ক্যান্টিনে এসে আমাদের সঙ্গে বসলেন, আমাদের কথার ফাঁকে স্যারকে কথা বলতে হচ্ছিল। একটা সময় ছিল, সারাক্ষণ তাঁর কথা শোনার জন্য আমরা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতাম। সময়ের প্রেক্ষিতে আমাদের বয়স হয়েছে। আমাদের নিজেদের গল্প হয়েছে। আমাদের লেখিকা বন্ধু , যে একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী , গৃহিণী, মা ও পরিবারের অংশ। তাঁর মুশকিল হচ্ছে, সে ফেসবুকে যাই লেখে না কেন সেটা নিয়ে তাঁকে সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়ে, কে কি ভাবল। প্রেমের কবিতা লিখলে স্বামী বেচারা না ভেবে বসে, তাঁর কবি স্ত্রী আবার নতুন করে প্রেমে পড়ে গেল কিনা ! কোন অপছন্দের কথা, কোন তীব্রতার কথা লিখতে গেলে তাঁকে ভাবতে হয়– এতো ছাত্র ছাত্রী আছে ; তাঁরা এটাকে কিভাবে নেবে। এমনও হয়েছে, সে একটা লেখা লিখে আবার অস্বস্তি থেকে মুছেও ফেলেছে।
লেখিকা বন্ধু আমার ফেসবুকের লেখালেখির অকপটতাকে সাধুবাদ জানালো। কারণ আমি অনেক কিছু লিখে ফেলি হুট করে। আজ পর্যন্ত, কোন লেখা আমাকে মুছতে হয়নি। হতে পারে পুরুষ-শাসিত সমাজে এটা আমদের একটা প্রিভিলেজ। আবার আমার লেখার বিষয় কবিতা বা গল্প নয়। আমি নিতান্তই কর্পোরেট অব্জার্ভেশন বা টুকটাক স্মৃতিচারণ করি। সেই অর্থে আমার পরিবারের , সমাজের বা আমার বন্ধু-তালিকার বন্ধুদের প্রতি আমি তেমন কোন দায়বদ্ধতা বোধ করি না ।
আমার মুখোমুখি একজন বন্ধু বসে থাকলে, তাঁর সঙ্গে যৌনতা নিয়ে যেভাবে কথা বলতে পারি। ফেসবুকে হয়তো সামান্য শালীনতা রেখে বলি; কিন্তু বলি , কোন দ্বিধা ছাড়াই বলি।
লেখালেখির ব্যাপারে স্যারের মন্তব্য ছিল, লেখকদের সামাজিক দায়বদ্ধতার সীমারেখা অতিক্রম করেই মাঝে মাঝে লিখতে হয়। নতুবা আবুল কালাম আজাদের মতো লিখে রেখে বলে যেতে হবে , মৃত্যুর ২৫ বছর পরে যেন তা প্রকাশিত হয় ! সারাক্ষণ পাঠকের কথা ভেবে লিখতে গেলে সেটা ‘নিজের’ লেখা হবে না। ঠিক এই ব্যাপারটাই আমাকে ফেসবুক থেকে দুরে ঠেলে দেয়। এখানে পাঠক ও বন্ধুদের একটা এক্সপেকটেশন থাকে।সারাক্ষণ নিজের সামাজিক অবস্থানের কথা , পরিবারের কথা, অফিসের কথা চিন্তা করতে হয় ; সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাল্যান্স করে, সবাইকে নাখোশ না করে, খুশী করে লিখতে গেলে নিজস্বতা থাকে না।
স্যারের উপস্থাপক জীবনের কথা উঠতেই , উনি অকপটে স্বীকার করলেন, এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে, টিভি উপস্থাপনার সময়কে উনি সবচেয়ে বেশী উপভোগ করেছেন। প্রায় আশির দশক পর্যন্ত বিটিভি নিয়ে মেতে ছিলেন তিনি। আমাদের সৌভাগ্য হয়নি স্যারের সেই সময়ের অনুষ্ঠান দেখার। কিছু আর্কাইভ ছিল, কিন্তু কোন এক মহাপরিচালকের নির্বুদ্ধিতায় সপ্ত ডিঙ্গার সব রেকর্ডগুলোকে পুনঃ ব্যবহার করা হয়েছিল। মানে, পুরনো ফিতে মুছে তার উপরে আবার নতুন অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়েছিল ! তাই কোন স্মৃতি আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের প্রজন্ম কিছুটা পেয়েছি তাঁকে আশির দশকের ঈদ আনন্দমেলায় সামান্য কয়েক মিনিটের অতিথি হিসাবে। অবশ্য কয়েক মিনিটের উপস্থিতিতেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দর্শককে বুঝিয়ে দিতেন , কেন তিনি অন্য সবার চেয়ে ব্যতিক্রম।
কেন টিভি ছেড়ে দিলেন, সেটা স্যার স্মৃতিচারণে লিখে গেছেন। আবারো বললেন। তিনি মূলত: শিক্ষকতা জীবনের প্রথম থেকেই সাদামাটা পাঞ্জাবী পায়জামা পড়তেন। টিভির কোন এক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনের খাতিরেই তিনি হালকা কারুকাজ করা নীল রঙের একটা পাঞ্জাবি পড়েছিলেন। পরেরদিন ঢাকা কলেজে গেলে একজন অভিমানী ছাত্র তাঁকে আলাদা ডেকে তাঁর পোশাকের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল। ছাত্রটি মনে করিয়ে দিয়েছিল , স্যারের জায়গা সব ছাত্রের কাছে অনেক উঁচু স্থানে ; আর দশজন মিডিয়া কর্মীর মত নয়। স্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন , বললেন দুইদিক রক্ষা করে চলতে হয় তাঁকে। ছাত্রটি নাকি বলেছিল, তাহলে আমাদের কাছে আসার দরকার নেই, আপনি ওই জগতেই থাকেন। এই ঘটনা স্যারকে টিভি ছেড়ে দেওয়ায় প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়টুকু তিনি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে দিয়েছেন অধ্যাপনায়, লেখালেখি ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলায়।
ওই সময়ের টিভি অনুষ্ঠানের মান আর এই সময়ে অনুষ্ঠানের মানের কথা উঠলে, আমরা এক কথায় সায় দিলাম , সত্তুর আশির দশকের টিভি অনুষ্ঠানের মান অনেক ভালো ছিল। সাদাকালো টিভি বলেই নয়, টিভি সবসময় ইন্টেলেকচুয়ালদের জায়গা। এখানে, সুন্দর বা সুন্দরী হতেই হবে ; রঙচঙে পোশাক পড়তেই হবে তা নয়। উপস্থাপক যদি তাঁর বাগ্মিতা দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করতে পারে, তাঁর পোশাক ও চেহারা ধর্তব্য হয় না। সেই সময়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কথা ভেবে শিউরে উঠলেন স্যার। প্রতি সপ্তাহে ৭৫ মিনিটের অনুষ্ঠান করা, নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে, চাট্টি খানি কথা নয়।
ঘুরে ফিরে লেখালেখির প্রসঙ্গ চলেই আসে। লেখক হচ্ছে দুই জাতের ; এক জাতের লেখক আছেন যারা লেখক হয়েই জন্মেছেন, প্রথম লেখা থেকেই লেখক। কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম জাতের লেখক। আরেক জাতের লেখক আছেন, যারা লিখতে লিখতে লেখক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ দ্বিতীয় জাতের লেখক। স্যারের ‘ বিস্রস্ত জর্নাল’– বইটি গত বছরে পরিবর্ধন ও সংশোধন করেছেন। এইবার ও নাকি করবেন। আমি যেহেতু স্যারে প্রবন্ধের সব বই কিনে নিজের সংগ্রহে রাখি ; আমাকে ওই বইটা আবার কিনতে হবে দেখে কিঞ্চিৎ উষ্মা প্রকাশ করলাম। বললাম , এর শেষ কোথায়? প্রতিবছর একই বই সংশোধন ও পরিবর্ধন করলে আমাদের মতো পাঠকের প্রতিবারই কিনতে হবে অথবা আমরা বঞ্চিত হয়ে থাকব সর্বশেষ লেখাটি থেকে। স্যার মনে করিয়ে দিলেন , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিটা লেখায় অনেক কাটাকাটি করতেন। লেভ তলস্তয় ‘ ওয়্যার অ্যান্ড পিস’ নামের বিশাল কলেবরের বইটি নাকি ১২ থেকে ১৩ বার পুনর্লিখন করেছিলেন। নিজের লেখায় তৃপ্তি না আসা পর্যন্ত উনি পরিমার্জন করে গেছেন। হয়তো সেই কারণেই ওই মহা কাব্যিক লেখা আজ আমাদের সামনে মহীরুহের সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি জীবনানন্দের কয়েকটি কবিতার কথা বললাম, যেটি জীবনানন্দ কয়েকবার পুনর্লিখন করেছেন। আমার কাছে প্রতিটা কবিতার শব্দচয়ন ভালো লেগেছে। কারণ তাঁর শব্দ চয়ন এতো সুন্দর এতো কাব্যিক, যাই লিখেছেন প্রতিবার সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। জীবনানন্দ একটা কবিতা হয়তো কোন ছোট পত্রিকায় লিখেছেন। ছাপা অক্ষরে দেখার পরে নিজে থেকেই মনে হয়েছে, ঠিক হয়নি। উনি আবার পরিমার্জন করেছেন। অবশেষে কাব্যে হিসাবে প্রকাশ করার আগে আরো একবার পরিমার্জন করেছেন। এতো গভীর পরিশ্রমের পরেই এসেছে ওই অদ্ভুত ভালোলাগার কবিতার লাইনগুলো।
স্যার, নিজের লেখা পরিমার্জনের স্পৃহাতে নাখোশ নন। তাঁর বক্তব্য চলমান জীবন্ত লেখকেরাই লেখা পরিমার্জন করে চলেন। মৃত লেখকদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
তলস্তয় নাকি শেক্সপিয়ারের রচনা ভালভাবে বোঝার জন্য ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন। শেক্সপিয়ার পড়ে তলস্তয় বলেছিলেন শেক্সপিয়ারের রচনার দশ লাইন পরেই নাকি অযৌক্তিক কথা এসে পড়ে। উনি এগারো লাইনও যুক্তি ধরে রাখতে পারেননি। শেষ বয়েসে তলস্তয় বুঝতে পেরেছিলেন , মানুষের পক্ষেও বেশীক্ষণ যুক্তি দিয়ে কথা বলা সম্ভব না। নির্দিষ্ট সময় পর পর অযৌক্তিক কিছু এসেই যায়।
মৃত্যু ও বার্ধক্যের প্রসঙ্গ চলে আসে আমাদের আলোচনায়। দ্রুত অতিক্রান্ত সময়ে আমাদের সামনে অবধারিত ভাবে বার্ধক্য সঙ্গী হিসাবে ও মৃত্যু আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে । কীভাবে এর সঙ্গে বসবাস করতে পারব। স্যার বার্ধক্যের গুণকীর্তন করেছেন আগের অনেক বক্তৃতায়। আজও করলেন, আমাদের একজনকে দেখিয়ে বললেন, আমি তো তোমাদের লক্ষ্য , তোমাদের পরিণতি। তোমরা তো আমার এই বয়েসে এসে আমার মতোই হতে চাও। যা তোমরা হতে চাইছ, আমি তাই। সুতরাং বার্ধক্য নিয়ে তাঁর কোন হুতাশন নেই।
প্রিয়জন হারানোর বেদনা, মৃত্যুর বেদনা আমাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এঁর সঙ্গে কিভাবে সহাবস্থান সম্ভব ? আসলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বেদনাবোধ কমে না, হয়তো বাড়তেই থাকে, কিন্তু তাকে মেনে নেওয়ার সহনশীল হওয়ার একটা প্রাপ্তবয়স্কতা চলে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।” যখন লিখেছিলেন ভানু সিংহের পদাবলী ছদ্মনামে, তখন তিনি নিতান্তই যুবক। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মৃত্যুর হাহাকার নিয়ে কথা বলার বয়সতো সেটি ছিল না। তবে কেন তিনি হাহাকার করেছেন? বরং বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে ওই হাহাকার যথোপযুক্ত ছিল। মূলত: বয়সের সঙ্গে সহনশীলতা বেড়ে গেছে, মেনে নেওয়ার , অভিযোজনের ক্ষমতা বেড়ে গেছে বলেই প্রৌঢ়ত্বে মৃত্যু নিয়ে কোন ভাবালুতা ছিলনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
আড্ডা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কত কথা অব্যক্ত রয়ে গেল। কিন্তু রাত সাড়ে এগারোটা বা বারোটা বেজে গেলে উঠে পড়তেই হয় যার যার গন্তব্যে।ফিরতি পথ জুড়ে ভালোলাগার রেশ থেকে যায় সবার মাঝে।
সবাইকে ২০১৭ সালের ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা !
প্রকাশকালঃ ডিসেম্বর,২০১৭
by Jahid | Nov 29, 2020 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
বন্ধু-তালিকা পূর্ণ হয়নি, কিছু আছে বাকী।
কিন্তু মাঝে মাঝে আমাকেও যে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হয়। যাঁদের লেখা আমাকে থমকে দেয়, চিন্তা করতে বাধ্য করে, মনে হয়, আরে ! এই লোকের সঙ্গে আমার আগে কেন যোগাযোগ হয়নি ! তাঁদেরকে বিনীতভাবে বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠাই, কেউ অ্যাকসেপ্ট করে , কেউ করে না তাঁদের বন্ধু-তালিকা জুকারবার্গের কোটা হিসাবে পূর্ণ হয়ে গেছে বলে। আমি তাঁদেরকে ফলো করি। কিছুদিন তাঁদের স্ট্যাটাস ‘সি ফার্স্ট’ করে রাখি। বিস্মিত হই, কীভাবে লেখেন এঁরা ! আমার বন্ধু-তালিকায় কিছু রিকোয়েস্ট পেন্ডিং আছে, তাঁদেরকে অ্যাড করতে পারছি না , মূলত: আমার নিজের সক্ষমতাই হারিয়ে যাবে বলে। দয়া করে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মুশকিল হচ্ছে, এখন যদি নতুন করে কাউকে অ্যাড করতে হয় , তবে – পুরনো কাউকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিছুদিন আগে কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছিলাম। দেখা গেল, একই ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে তিন চারটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, প্রতিবার রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন আর আমি অ্যাকসেপ্ট করেছি। একই লোকের কয়েকটা অ্যাকাউন্টের যুক্তিসঙ্গত কারণ কী কী থাকতে পারে আমি জানি না। তবে, আমার ধারণা, এঁরা হয়তো পাসওয়ার্ড ভুলে গিয়েছিলেন অথবা নানাবিধ কারণে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়েছে ; কিন্তু বহুবছর ধরে পুরনো অ্যাকাউন্টগুলো আর ব্যবহার করেন না। এরকম গোটা বিশেক কমিয়েছিলাম মাত্র। কাকে রেখে কাকে সরাবো , সেটা একটা কনফিউশনের ব্যাপার হয়ে গেল। সেই চেষ্টা বাদ দিলাম।
আমার বন্ধু-তালিকায় কেউ কেউ ফেসবুকে আছেন, কদাচিৎ ব্যবহার করেন না, হয়তো করবেন ও না ; কিন্তু সবার আছে বলে তাঁর নিজেরও একটা অ্যাকাউন্ট কেউ খুলে দিয়েছে। এঁদের কাছে ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে বাস্তবের জগতে অনেক বেশী মূল্যবান।। সে রকম কাউকে মুছে ফেললে আশা করি তাঁরা মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার সুযোগ পাবেন না। কারণ তাঁরা সারাবছরে হ্যাপি নিউ ইয়ার, ঈদ মুবারক অথবা নিজের জন্মদিনের দিন ছাড়া ফেসবুকেই তো ঢোকেন না !
হয়েছে কী ! ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের ফেসবুকে আসা। অন্য সবার মতো আমিও ‘মুরাদ টাকলা’ বাংলিশ ভাষায় ফেসবুকিং করতাম। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল কয়েকটা বছর , মাসে একটা ‘ Dosto Kemon Achis’ টাইপ স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুক চালানো। মাঝে সাঝে পিকনিক ও গেট টুগেদারের ছবিটবি দিতাম। সেভাবে বাংলায় টাইপ করতে পারতাম না, বাংলিশ লিখে অন্যদের বিরক্তও করতাম না।
নিজেকে প্রকাশ করার আনন্দ আর সেই আনন্দে লেখালেখির ফ্লো আসল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে — গণজাগরণ মঞ্চের শুরু থেকে। আমার এক বন্ধু সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মিঞা মোহম্মদ হুসাইনুজ্জামান শামীম( Miah M. Hussainuzzaman) যে একাধারে ব্লগার এবং সচলায়তনে লেখালেখি করত–সে আমাকে অভ্র শিখে বাংলা লেখায় উৎসাহিত করল। বাংলায় লেখালেখি শুরু হল। নানা অভিজ্ঞতা, যেগুলো আসলে দিনলিপির মতো ; সেগুলো ফেসবুকে দেওয়া শুরু করলাম। শামীমের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশী ব্লগার বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হল। বাংলা ব্লগ যে এতো এগিয়েছে, লেখার মান যে এতোটা বেড়েছে — সেটা ‘সচলায়তন’ না পড়লে বুঝতাম না। দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা এই ব্লগিং এ জড়িত। ২০১৩ সাল আমার চোখের সামনে দিনরাত নানা মাপের বাংলা রম্যরচনা, কবিতা, প্রবন্ধ ঘুরতে লাগল। চরম উদাস নামের এক ছদ্মনামের ব্লগারের লেখারতো রীতিমত ভক্ত হয়ে গেলাম। সৈয়দ মুজতবা আলীর পরে এই লেভেলের স্যাটায়ার আরও কেউ লিখেছে কীনা জানি না। তবে, এই ভদ্রলোককে আমি আমার গুরুর কাতারে রাখলাম।
ফেসবুককে আমার তখন মনে হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনের মতো মুচমুচে স্বাদের। এখনো, তাই মনে হয় ; ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিপস চানাচুর খাওয়ার মতো। খেতে ভালোই লাগে, কিন্তু এতে না ভরে পেট, না আছে পুষ্টিগুণ।
২০১৩ সালের দিকে বন্ধু সংখ্যা বাড়ানো কিছুটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার ছিল ! ওর ২০০ বন্ধু আর আমার মাত্র ১০০ ! আচ্ছা, দেখি কী করে বাড়ানো যায়। তো, সেভাবে চেনা অচেনা, কোন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড নাই, তাদেরকেও নিজের বসার ঘরে দাওয়াত দিলাম। কিছুদিন পরে লক্ষ্য করলাম হুজুগে সংখ্যাই শুধু বেড়েছে, অথচ অনেকের সঙ্গে মন মানসিকতা ও চিন্তা চেতনার বিন্দুমাত্র মিল নেই আমার ! আবার এমন অনেকে আছেন, যাঁদের সঙ্গে কোনকিছুতেই আমার মতের মিল হয় না , হবে না , হওয়ার সম্ভাবনা কম; কিন্তু তাঁদের বিপ্রতীপ চিন্তা, মাইক্রোস্কোপের উল্টো পাশ থেকে দেখার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে ।
ফেসবুক আমার জন্য শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মোবাইল স্ক্রিনের চকচকে বিপ্লবী অথবা মোটিভেশনাল কথা বলা ভার্চুয়াল লোকটি আর সামনে জড়সড় হয়ে বসা লোকটির মাঝে হাজার মাইলের তফাৎ ! সেটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে।
ফেসবুকের বাইরে আমার অনেক বন্ধু আছে, যারা হয়তো আমার ফেসবুকে আছেন অথবা নাই ; আমার পোস্ট পড়েন অথবা পড়েন না ; লাইক কমেন্টস কখনো করেন না বা করবার মতো সময়ই নেই তাঁদের। তাঁদের সঙ্গে আমার প্রতিনিয়ত কথা হয়, হাসাহাসি হয়। লাইক, লাভ,ওয়াও , স্যাড, অ্যাংগ্রি ইমোর বাইরে আমাদের জান্তব সম্পর্ক। এই সম্পর্ক ‘কী বোর্ডের’ এক ক্লিকে হয় নি। এক ক্লিকে যাবেও না। এই সব বন্ধুত্ব আমার কাছে অনেক মূল্যবান। এই সম্পর্কগুলো আমার গত ৩০ বছর ধরে গড়ে তুলতে হয়েছে। ফেসবুকের ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আর লাইক কমেন্টস গুণে গুণে আমার জীবন কাটে না। কারো কাটা উচিৎও না। তাই, বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে রেসপন্স না পেলে ভাববেন না, আমি ‘ভাব’ দেখাচ্ছি। আমার ফেসবুক ও কমেন্টস পাবলিক করা আছে। ফ্রেন্ড লোগোর উপর টিক চিহ্ন না থাকলেও আমার যে কোন মন্তব্যে আপনি একমত ও দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
আগামী নতুন বছর, নতুন আশার আলো ভাসিয়ে দিক না চাইতে পাওয়া আমাদের এই একটি মাত্র জীবনকে। আমার মতো অধমের যে কোন ভুল ত্রুটি ক্ষমা করার মতো মহানুভব হয়ে উঠুন সবাই। শরীরের যত্ন নিন, পরিবারকে সময় দিন। সবার জন্য শুভকামনা। সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা।
প্রকাশকালঃ ৩১শে ডিসেম্বর,২০১৯
by Jahid | Nov 29, 2020 | লাইফ স্টাইল, সমাজ ও রাজনীতি
২১। বিবাহ বা ব্রহ্মচর্য, যেটাই মানুষ বেছে নিক না কেন আখেরে তাকে পস্তাতে হবে। সক্রেটিস।।
২২। যে ব্যক্তি স্ত্রীকে বশে রাখতে পারেন, তিনি একটি জাতিকে চালনা করার উপযুক্ত। বালজাক।।
২৩। আমার দুটো বিয়ের একটিও সুখের হয় নি। প্রথম স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। দ্বিতীয়জন যায় নি ! প্যাট্রিক মুর, ইংরেজ জ্যোতির্বিদ।।
২৪। পুরুষ নারীকে বিয়ে করে এই আশায় যে তারা কখনো বদলাবে না। নারী পুরুষকে বিয়ে করে এই আশায় যে তারা বদলাবে। স্বভাবতই তারা দুজনেই হতাশ হয়। আলবার্ট আইনস্টাইন।।
২৫। বিয়ে হলো মূত্রত্যাগের মতোই প্রাকৃতিক, অযৌক্তিক এবং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। লিসা হফম্যান, লেখক।।
২৬। মেয়েরা যতো স্বাধীন হতে চেষ্টা করে তত অসুখী হয়। ব্রিজিত বার্দো, ফরাসি মডেল , অভিনেত্রী।।
২৭। নারীর সতীত্ব পুরুষের বৃহত্তম আবিষ্কার। কর্নেলিয়া অটিস স্কিনার, আমেরিকান অভিনেতা।।
২৮। প্রেম হলো ভুতের মতো , ভাবলে আছে না ভাবলে নাই। মিশেল ফুকো। ফরাসী দার্শনিক।।
২৯। একজন বুদ্ধিমতী চুমু দেবে কিন্তু ভালোবাসবে না, শুনবে কিন্তু বিশ্বাস করবে না এবং তাকে ছেড়ে যাওয়ার আগেই সে ছেড়ে চলে যাবে। মেরিলিন মনরো।।
৩০। ভালো মেয়েরা স্বর্গে যায়, খারাপ মেয়েরা সব জায়গায় যেতে পারে। মে ওয়েস্ট, আমেরিকান অভিনেত্রী।।
৩১। যাই ঘটুক না কেন বিয়ে করে ফেল। স্ত্রী ভালো হলে সুখী হবে, না হলে দার্শনিক। সক্রেটিস।।
৩২। আমার সারা শরীর ব্যাথা করছিল, সেই সঙ্গে ছিল বমি বমি ভাব। বুঝতে পারলাম, হয় আমি প্রেমে পড়েছি, নয়তো আমার গুটিবসন্ত হয়েছে। উডি অ্যালেন। আমেরিকান অভিনেতা।।
৩৩। আমার টাকাপয়সার নব্বইভাগ মদ এবং মেয়েমানুষের পেছনে ব্যয় করেছি।বাকী টাকাটা একদম জলে গেছে। জর্জ বেস্ট, ইংলিশ ফুটবলার।।
৩৪। একটি মেয়ের দোষ জানতে হলে বান্ধবীদের কাছে গিয়ে তার প্রশংসা করো। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন।।
৩৫। বিয়ের আগে আপনার চোখ খোলা রাখুন। তারপর আধবোজা করে বন্ধ করুন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন।।
৩৬। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, আমার স্ত্রীকে আমার সঙ্গে বিয়েতে রাজি করাতে পারা। উইনস্টন চার্চিল।।
৩৭। টাকা দিয়ে ভালোবাসা কেনা যায় না, কিন্তু দরদাম করার মতো একটা শক্ত অবস্থান অর্জন করা যায়। ক্রিস্টোফার মার্লো, ব্রিটিশ নাট্যকার।।
৩৮। প্রেমিক হওয়া সহজ, স্বামী হওয়া শক্ত। মাঝে মাঝে দু’চারটা মজার কথা বলে মন জয় করা যায়, কিন্তু প্রতিদিন রসোক্তি করা সম্ভব নয়। বালজাক।।
৩৯। রমণী খাবার সাজানো টেবিলের মতো, যার দিকে পুরুষ খাবার আগে ও পরে ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকায়। বালজাক।।
৪০। মেয়েদের স্তনকে একই সঙ্গে নান্দনিক ও ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখা উচিত। ম্যুরা পাতিসিয়ে, ফরাসী সেনাধ্যক্ষ।।
৪১। নারী পুরুষের জীবনে এক অসহ্য, অবাধ্য ও অপরিত্যাজ্য সহচারিণী। লেভ তলস্তয়।।
৪২। বলা হয় ঘোড়ার শক্তি তার মুখে ও নিতম্বে। এ সত্য নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জোনাথান সুইফট।।
৪৩। জঞ্জাল ফেলবার সবচেয়ে ভালো ঝুড়ি হচ্ছে বিবাহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।।
৪৪। মহিলাদের নিয়ে মুশকিল এই যে, এঁরা আলাপ-আলোচনায় অপটু, অথচ কথা বলার শক্তি হারান না । জর্জ বার্নার্ড শ।।
৪৫। আজকের সভ্যতায় পুরুষকে মাপা হয় ব্যাংকের ফিগার দিয়ে আর মেয়েদের মাপা হয় দেহের ফিগার দিয়ে। শঙ্কর, কথাসাহিত্যিক।।
প্রকাশকালঃ১২ই ডিসেম্বর,২০১৯
সাম্প্রতিক মন্তব্য