উপলব্ধি: ৩২

কথা শুনুন, ভালো শ্রোতা বিলুপ্তপ্রায়। মনো-বৈজ্ঞানিকরা বহুবছর ধরেই মাল্টিটাস্কিং করতে অনুৎসাহিত করছেন। কেননা, কেউ যদি সত্যিকার মনোযোগ দিয়ে কারো কথা শোনে, তবে তাঁর পক্ষে অন্য কাজ করা সম্ভব নয়। গ্রিক দার্শনিক Epictetus সেই হাজার দুয়েক বছর আগেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন –‘We have two ears and one mouth so that we can listen twice as much as we speak.’

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সবার কাছে লক্ষ লক্ষ অভাবিত তথ্য, নিজেকে প্রকাশিত করার অভিনব সব সামাজিক মাধ্যম। সবাই বলতেই চায়, দেখাতেই চায়, কেউ হৃদয় দিয়ে, একটু সময় নিয়ে কারো কথা শুনতে চায় না। বক্তার তুলনায় শ্রোতা আশঙ্কাজনক-ভাবে কম।

যতদূর বুঝতে পেরেছি, আমি শ্রোতা হিসাবে ভালো। আমি অনেকের প্রিয়ভাজন নই সেটা যেমন সত্য, তেমনি অনেকে আমাকে ভীষণ পছন্দ করেন তার কারণ আমি মন দিয়ে কথা শুনি। শর্ত প্রযোজ্য: তাঁদের কথাই মন দিয়ে শুনি যাঁদের কথা মিনিমাম লেভেলের শ্রাব্য।

কাউকে জানতে হলে, কারো কাছাকাছি হতে হলে, তাঁর কথা মন দিয়ে কথা শুনুন।
কারো ব্যর্থতার গল্প, বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, হেরে যাওয়ার গল্প, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গল্প। শুনুন মন দিয়ে শুনুন।
সিনেমার পর্দায় নয়, আমাদের জীবনের গল্পের নায়ক-নায়িকারা আমাদের চারপাশেই আছেন।

উপলব্ধি: ৩১

কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের একদম শতভাগ বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। এই যেমন Gut Feelings এর সঠিক বাংলা খুঁজে পাচ্ছি না। অন্তর্দৃষ্টি, অবচেতন, প্রজ্ঞা, বোধ অনেককিছুই হতে পারে। ব্যাপারটা এমন যে, কোন কোন সিদ্ধান্ত মানুষ যুক্তি তর্কের বাইরে গিয়ে তাঁর সহজাত অনুভূতি থেকে নিয়ে থাকে। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই নিজের গাট ফিলিংস ( Gut Feelings) কে গুরুত্ব দিতে হয়।

হয়েছে কী, কয়েকশ বছর আগের একজন সাধারণ মানুষ সারাদিনে যে পরিমাণ সিদ্ধান্ত নিতেন, তাঁর চেয়ে এখন কয়েক হাজারগুণ বেশি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। জীবন এখন অনেক জটিল, বিস্তৃত ও দুর্বোধ্য। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনকে একেকটা মোড়ে বাঁক খাইয়ে কোথা থেকে কোথায় যে নিয়ে যেতে পারে !

সারাদিনে আমাদের যতগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাঁর বেশির ভাগ শারীরিকভাবে রিফ্লেক্টিভ ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে থাকে, সেগুলো নিতে গভীর চিন্তার দরকার পড়ে না। বৈজ্ঞানিক সূত্রে আধুনিক মানুষ সারাদিনে নাকি কম বেশি ৩৫ হাজারের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে! এতো সিদ্ধান্তের মাঝে কিছুকিছু সিদ্ধান্ত আছে যেটা নিতে আমাদের সময় লাগে, চিন্তা করতে হয়, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি কাজ করে। আমার জীবনের আমি যখন দেখেছি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে, সেটা মাল্টিপল চয়েজ থেকে শুরু করে অনেক কিছুতে– যেখানে আমি তেমন কিছু বুঝতেই পারছি না, বা আমার কাছে যথেষ্ট ইনফরমেশন নাই। সে ক্ষেত্রে যে উত্তরটা ‘প্রথমবার’ মনে এসেছিল সেটাতে টিক দিয়ে চলে এসেছি। মনের গভীরে ঝাঁপ দেওয়ার যথেষ্ট সময় না থাকলে, এই পদ্ধতি কার্যকর। কারণ আপনার অর্জিত জ্ঞান আপনাকে প্রথমবারেই আপনার জন্যে সবচেয়ে অনুকূল সিদ্ধান্তটি আপনার মানস-পটে ভাসিয়ে তুলবে। এরপর যতো আপনি সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন, ততো বেশি অপশন আপনার সামনে আসবে , বিভ্রান্তি ও দ্বিধা বাড়বে বৈ কমবে না।

আরেক অগ্রজ আমাকে শিখিয়েছিল, ‘When you are deep doubt, follow your heart, listen to you heart , not your fear ! And if your heart isn’t responding, talk to your mother !’

নিজের হৃদয়ের কথা শোনা ভালো। ওই যে বলে না, নিজের বুদ্ধিতে মরাও ভালো। আরেকজনের বুদ্ধিতে মরলে আফসোস থাকবে, কেন যে ঐ কথা শুনতে গেলাম ! অনেকসময় হৃদয়ও দিশাহীন হয়ে পড়ে, কোন সাড়া পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে আরেকটা ব্যাপার আমি বহুবছর মেনে চলেছি, আম্মার সঙ্গে কথা বলতাম। পড়াশোনা, চাকরি, ক্যারিয়ার,বিয়ে , জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আম্মার সঙ্গে কথা হয়েছে। হতে পারে, বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একমাত্র জন্মদাত্রী মা-ই সন্তানের নিঃস্বার্থ শুভাকাঙ্ক্ষী। সন্তানের সর্বোচ্চ শুভাকাঙ্ক্ষী জন্মদাত্রী ছাড়া অন্য কারো হতে পারাটা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।

এমন না যে, আমার মা উচ্চশিক্ষিতা ছিলেন। তিনি একেবারেই সাধারণ গৃহিণী ছিলেন। যতোবার আম্মার কাছে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে গেছি ; উনি অনেকক্ষণ মন দিয়ে শুনেছেন। তারপর আমার মতামতের ভিতর থেকেই উনি বুঝে ফেলতেন আসলে আমার জন্যে কোনটা ভালো হবে, সেটাই তিনি বেছে নিতে বলতেন। গভীর অন্ধকারেও আমার মায়ের মশালের আলোয় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আমার জন্যে দীর্ঘমেয়াদে ভালো হয়েছে।
যাঁদের মা বেঁচে আছে, তাঁরা সৌভাগ্যবান। আর যাঁদের জননী প্রয়াত হয়েছেন, তাঁরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের গাট ফিলিংসের উপরে ভরসা রাখুন।

উপলব্ধি: ২৯

আমি সেই অর্থে কর্মঠ বা পরিশ্রমী লোক নই। এবং সম্ভবত: আলস্য থেকেই আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অনুৎসাহ আছে। তাই যখনই সুযোগ পেয়েছি, অফিসে ও পরিবারে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মকে হস্তান্তর করেছি।
যে কাজ আমি অনেকদিন করার পরে একটা দক্ষতা অর্জন করেছি, খুব ভালোভাবে পারি, রোজ রোজ সেই একই কাজ কেন করব– সেটা আমার মাথায় ঢোকে না। কর্মস্থলে আমার অনেক দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময় পর আমার অনুজ কর্মকর্তাদের ডেলিগেট করেছি। আমি অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি।

যদিও আমাদের প্রাইভেট সেক্টরে এই ডেলিগেশনের সুফল ও কুফল দুইই আছে।
আমার ভিতরে শিক্ষক-সুলভ কিছুটা ঔদার্য আছে বোধকরি। শিক্ষকরা যে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আনন্দ পান। শিক্ষকরা জানেন একজন ছাত্রকে সমস্ত শিক্ষা বিলিয়ে দিলেও তাঁর কোন ক্ষতি নেই, কারণ ছাত্রটি কখনো তাঁর প্রতিযোগী হবে । আমিও তাই করেছি, কখনও ভাবিনি, আমার জুনিয়র কর্মকর্তাকে সবকিছু ডেলিগেট করলে, তাঁকে আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে কাজ করতে দিলে সে আমার প্রতিযোগী হবে। মুশকিল হচ্ছে, আমি এভাবে ভাবিনি , কিন্তু আমার মালিকপক্ষ ও কয়েকজন অনুজ আমার বদান্যতার সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু এতে করেও এতোগুলো বছর পরেও আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

উপলব্ধি: ২৮

অফিস মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরবেন না।

আমার প্রাথমিক কর্মজীবন ছিল টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে শিফটিং ডিউটির ।
এ,বি,সি শিফট। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা ; দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা আর সি শিফট হচ্ছে রাত দশটা থেকে ভোর ৬টা।
আমি যখন শিফটের গাড়ি ধরতে অন্ধকার কাক-ডাকা ভোরে বাসা থেকে বের হতাম, তখন মহল্লার সবাই গভীর ঘুমে নিমগ্ন।
শিফটিং ডিউটির সময় মনে হতো আমি সারাক্ষণ কাজের ভিতরে আছি। সারারাত নির্ঘুম কেটে দিনের বেলায় গড়াগড়ি দিয়ে আবার শিফট ধরতে ধরতে মনে হতো, আমি লেখক হুমায়ূন আহমদের ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি’ নামের এক উপন্যাসের অসীম চক্রে পড়ে গেছি। দিনরাত একাকার। কারখানার ডরমিটরিতে থেকে ডিউটি দিতে আরো অসহনীয় লাগত। বরং বাসায় ফিরে এলে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও নিজের বিছানা, আপনজন আর পরিচিত মহল্লা দেখে মনে হতো আমি বিশ্রামে আছি। শিফটিং ডিউটির একটা সুবিধা ছিল, শিফট বুঝিয়ে দিয়ে আসলে তেমন কোন দুশ্চিন্তা থাকতো না।

প্রোডাকশন থেকে যখন সেলস, মার্কেটিং, মার্চেন্ডাইজিং এ চলে আসলাম, কাজের ধরণটা এমন যে, এখানেও সারাক্ষণ মনে হতো অফিস করছি।
মোবাইল প্রযুক্তি আসার পরে আমি একসময় তিক্তবিরক্ত হয়ে গেলাম। দিনরাত২৪ ঘণ্টাই আমাকে ফোনের উপরে থাকতে হতো।

আমি যখন Mothercare Sourcing BD-তে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসাবে কাজ করা শুরু করলাম, তখন আমাদের ৭ সোর্সিং ম্যানেজারকে আমাদের ডিরেক্টর একটা করে ব্ল্যাকবেরি দিলেন।সবাই ভীষণ খুশি। শুধু আমি ব্ল্যাকবেরি নিতে অস্বীকৃতি জানালাম। সে অবাক হলো। কারণ তখন ব্ল্যাকবেরি ছিল দারুণ সম্মান ও ফ্যাশনের একটা জিনিস। যার হাতে ব্ল্যাকবেরি সে যে হোমরাচোমরা বোঝা যেত। যাই হোক, আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম,দেখো আমি সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি ইমেইল আর ফোনে থাকি। বাসায় যখন ফিরি তখন অতি-জরুরি কিছু ছাড়া দাপ্তরিক কাজগুলোর ঝামেলা নিতে চাচ্ছি না। এতে করে বরং আমার প্রোডাক্টিভিটি কমে যাবে। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে আমার প্রথম কন্যা সবে হামাগুড়ি দিচ্ছে; বাসায় ফিরে আমি সারাক্ষণ ডুবে থাকি ওঁকে নিয়ে। ঐ যে আমার অভ্যাস হয়ে গেল, বাসায় ইমেইল কিংবা দাপ্তরিক কাজ না নিয়ে যাওয়ার, সেটা গত ১৬ বছরে একই রকম আছে।

এই ডিজিটাল যুগে সারাক্ষণ ইমেইল না দেখে সাময়িকভাবে কর্মক্ষেত্রে কিছুটা পজিশন ও পারফরমেন্সের ক্ষতি হয়েছে,অন্য সহকর্মীদের মতো আপডেট থাকতে পারিনি।
তবে আমার মনে হয়েছে আখেরে লাভ হয়েছে আমার ও আমার পরিবারের।

উপলব্ধি: ২৭

মানুষকে বিশ্বাস করুন ; সামান্য দ্বিধা ও সঙ্কোচ নিয়েই করুন।
অসঙ্কোচ বিশ্বাসে আপনি ঠকে গেলে বড় ধরণের ধাক্কা খাবেন, হয়তো ভেঙ্গে পড়বেন, উঠে দাঁড়ানো মুশকিল হবে। আমার কাছে মনে হয়, বিশ্বাস করতে হলে, নিজের ভিতরে কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে করাই উত্তম।

একটা উদাহরণ দিই।
শহর ঢাকার অগণিত ভ্রাম্যমাণ ভিক্ষুকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। শহরের অর্ধেক ভিক্ষুক সত্যিকারের ভিক্ষুক নাকি, পরিযায়ী, ভ্রাম্যমাণ, অলস, অকর্মণ্য, ধান্ধাবাজ –সে ব্যাপারে সকলেরই সন্দেহ আছে। রাস্তার ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষা দিতে আমার
নিজেরও অনীহা আছে। এরা এমনভাবে আপনাকে বেহেশতের লোভ দেখাবে অথবা দোজখের ভয় দেখাবে যে, সেই লোভেই হোক বা ভয়েই হোক আপনি ভিক্ষা দিয়ে পরকাল সামলাবেন। কোন কারণে, ভিক্ষা দিতে আপনি অস্বীকৃতি জানালে, আপনাকে ক্রমাগত বিরক্ত করতে থাকবে, আপনার গাড়ি ধাক্কা দেবে, অভিসম্পাত করতে থাকবে।

আমি পারতপক্ষে রাস্তার ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিই না ; আবার কাউকে ভিক্ষা দিলেও চিন্তা করিনা, ‘সত্যিকারের’ ভিক্ষুক কীনা। সেই একইভাবে , অনেকেই নানা সময়ে ছোট অংকের ধার চেয়েছে, যেটা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁদেরকে সাহায্য বা ধার দিলেও ধরে নিয়েছি, সেটা আর কখনো ফেরত পাব না। ফেরত পেলে খুশী হয়েছি। তাঁদের সঙ্গেই বড় অংকের আর্থিক লেনদেনে গেছি, যাঁদেরকে দীর্ঘদিন ধরে আমি চিনি।