উপলব্ধি: ২৬

নিজেকে মেনে নিতে শিখুন, নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন। নিজেকে ক্ষমা করতে পারা ও নিজেকে মেনে নিতে পারার সক্ষমতা হচ্ছে নিজেকে ভালোবাসতে শেখা। সারাক্ষণ নিজেকে দোষারোপ করবেন না। সেলফ-টক বা নিজের সঙ্গে নিজে যখন কথা বলছেন, যা ঘটে গেছে, সেটার জন্যে নিজেকে সার্বিক দোষী ভাববেন না। নিজেকে সুযোগ দিন।

উপলব্ধি: ২৫

টানেলের দুইদিক থেকেই দেখার চেষ্টা করুন। আমাদের ধর্মে ও ইতিহাসে ঘুরে ফিরে এই কথা বহুবার বলা হয়েছে, ব্যক্তির আচরণ বুঝতে হলে, আপনি নিজে তাঁর অবস্থানে কী করতেন সেটা একবার হলেও উপলব্ধি করার।
কোন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি কী ধরণের আচরণ করতে পারে সেটা ঐ ব্যক্তির অবস্থানে নিজেকে চিন্তা না করতে পারলে বোঝা যায় না। কল্পনাশক্তির ব্যবহার করুন, নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বোঝার চেষ্টা করুন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি একটি পরিস্থিতিতে কেন ওইরকম আচরণ করল।

এই ব্যাপারটা চর্চা করতে পারলে, নিজেকে চরমভাবাপন্ন হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন। সত্যি কথা বলতে কী, এই চর্চা যদি শৈশব থেকে আমাদের প্রজন্মের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া যেতো, আমাদের সমাজ অনেক বেশি সহনীয় হত।

ঘুরে ফিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত দেখি। যদিও প্রথম বাক্যটি একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ‘গান্ধারীর আবেদন’ কবিতার , যাতে মাতৃ-স্বার্থের গন্ধ আছে। তারপরেও গান্ধারীর মুখনিঃসৃত এই চরণ গত শতাব্দীতে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় হয়েছে।
“…প্রভু, দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে-বিচার। যার তরে প্রাণ
কোনো ব্যথা নাহি পায় তারে দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার। ”
(গান্ধারীর আবেদন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।।)

আবার কিছুটা হলেও সংঘাত তৈরি করে তাঁর আরেকটি উক্তি। এই উক্তিও বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়। ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের নিখিলেশের স্বগতোক্তি। “ যে দুর্বল সে সুবিচার করতে সাহস করে না,— ন্যায়পরতার দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যায়ের দ্বারা সে তাড়াতাড়ি ফল পেতে চায়। ”

যতই বলি না কেন, জাজমেন্টাল না হওয়াই উত্তম। কিন্তু সেটা আর পারি কোথায় !
আপনি ক্ষমতাবান হন, দুর্বল হন, ক্ষমতালিপ্সু হন, ঊর্ধ্বতন হন—আপনাকে প্রতিদিন এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যেতেই হয়। তাই, বিচারের রায় বা সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলার আগে একটু সময় নিন।

উপলব্ধি: ২৪

কর্মজীবনে যদি ঊর্ধ্বতনের কাছে প্রয়োজনীয় কিছু চাইতে হলে, বলতে হলে — ভণিতা না করে , সরাসরি বলে ফেলার চেষ্টা করুন। আমি সেটা শিখেছি অনেক পরে। আমি মূলত অন্তর্মুখী। নিজের প্রয়োজনের কথা অনেক সময় বলে ফেলতে দেরি করেছি। অথবা এড়িয়ে গেছি। অনেক পরে এসে বুঝেছি, নিজের কথা অন্যকে দিয়ে বলানোর চেয়ে নিজে বলে ফেলাই ভাল। তবে, এই বলার ব্যাপারটাও সঠিক সময়ে হতে হবে। ভুল সময় হলে মুশকিল, হিতে বিপরীত হতে পারে।

 

উপলব্ধি: ২৩

যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, কর্মস্থলে, পরিবারে, বন্ধুমহলে– যতদূর পারেন ভণ্ডদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে আপনার একই সমান্তরালে ,কাছাকাছি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে যারা আছেন এবং আপনি মোটামুটিভাবে যাদের চিহ্নিত করতে পারেন তাদের কথা বলছি।

এর চেয়ে বরং সমাজের তথাকথিত চিহ্নিত শ্রেণির লোক, ছোটখাটো দোষত্রুটি আছে, দুর্নাম আছে কিন্তু ভণ্ড না, তাঁদের সঙ্গে অবলীলায় চলা সম্ভব। কারণ আপনি জানেন, সে খারাপ। ভণ্ড ব্যক্তিরা রঙ বদলানো গিরগিটির মতো। নিজের স্বার্থে যে কোন সময় ধর্ম দিয়ে বা নিজের অজ্ঞতা দিয়ে নিজের কৃত কুকর্মকে ঢাকতে চায়। যুক্তি দিয়ে চেপে ধরলে ভণ্ডলোকেরা শেষ আশ্রয় হিসাবে অজ্ঞতার ভাণ করেন, তবুও স্বীকার করেন না তাঁদের ভণ্ডামি।

উপলব্ধি: ২২

ঋতু-বৈচিত্র্য, বৈরী আবহাওয়া, ভূ-প্রাকৃতিক কারণে প্রকৃতির অসহনীয় আচরণ, অথবা নিয়ন্ত্রণের বাইরের উদ্ভূত কোন পরিস্থিতির টেনশন নিজের ঘাড়ে টেনে নেবেন না। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নানা ধরণের প্রতিকুল ঘটনাসমূহ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই ! ঢাকার ট্র্যাফিক, দেশের সরকার, রাষ্ট্রের
আচরণ, গ্রীষ্মের দুঃসহ গরম, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অন্যদেশের ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের দুরবস্থা, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি । এই রকম অসংখ্য ইস্যু আছে, যা ধীরে ধীরে সহনীয় হয়; ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যায়। এগুলো নিয়ে অবশ্যই চিন্তা করতে পারেন ; দুশ্চিন্তা না। গাড়ীতে বসে আছেন, চারপাশের বিশৃঙ্খলা দেখে লেগে গেলেন দেশের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে। রক্তচাপ বেড়ে গেল।

ছোটখাটো আরও কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো ইচ্ছে করলেই আপনি তাচ্ছিল্য করতে পারেন, এড়িয়ে যেতে পারেন। খাবার খেতে বসেছেন, বাথরুমে যাচ্ছেন, অসময়ে ফোন বাজছে তো বাজছেই। আপনার টেনশন বেড়ে গেল। এসব ক্ষেত্রে সময় নিন, ধীরেসুস্থে ফোন অ্যাটেন্ড করুন। যিনি আপনাকে খুঁজছেন তিনি বুঝমান হলে বুঝবেন আপনার ফোন দেরি করে ধরার কারণ। আর সেটা না বুঝেই কেউ যদি ফোন করতেই থাকেন, সেটা তাঁর সমস্যা।

আসলে, আমরা যারা ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হয়ে গেছি, তাঁদের ও যারা এখনো হননি, দয়া করে অনর্থক টেনশন করে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হবেন না।