আহা জীবন!আহারে জীবন !!

গতকাল বিকেলে, প্রায় গোধূলি লগ্নে কিছুক্ষণের জন্য মহল্লার খোলা রাস্তায় হাঁটছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের দেখা ; দুই লাজুক কিশোর কিশোরী আমার ঠিক বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছিল। চারিদিকে চাইতে চাইতে ; সবার নজর বাঁচিয়ে একজনের কাঁধের সঙ্গে আরেকজনের কাঁধের মৃদু স্পর্শ হচ্ছিল। প্রতিটি অলৌকিক স্পর্শেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল দুজনেই। অনুভূতির স্পর্শকাতরতা কতখানি বিস্ফোরক হলে ঐ কেঁপে ওঠা থাকে, তা আমি জানি। ঐ বয়স যে আমিও পার করে এসেছি !

‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।’

আহা জীবন ! আহারে জীবন !!

প্রকাশকালঃ ১৪ই ফেব্রুয়ারি,২০২০

বইপড়া, বইমেলা আর বইকেনা

২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি আমার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিক্রুটমেন্ট ইন্টারভিউয়ের বোর্ডে বসতাম। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ইউনিভার্সিটির সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরতাজা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে ভালই লাগত। প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা বলার সময়ে দুটো প্রধান শ্রেণির মুখোমুখি হতাম। একদল ছিল, বিনয়ের সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী যে স্যালারি স্ট্রাকচার আছে, সেটা জেনে দরকষাকষি করত। আরেকদল ছিলেন, যারা নিজেদেরকে বেশি মূল্যবান ভাবত অথবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য খুব বেশি বেতন চেয়ে বসত।

আমার মনে আছে, আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করেছি, সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে গেলাম। একজন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, অন্য চাকুরিপ্রার্থীর চেয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা , হেনতেন অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই উচিৎ তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়া। আমি যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, সেটা আমি তাকে প্রথমে বলিনি , সেও জানে না। তো , এক পর্যায়ে বললাম–আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আপনার ১০ বছরের মাধ্যমিক আর ২ বছরের উচ্চমাধ্যমিকের ভালো ফলাফলের উপরে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, গত ৪/৫ বছরে যতোখানি শেখার কথা ছিল গ্রাজুয়েশনে তার এক চতুর্থাংশও আপনি শেখেন নাই। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেভেলের পড়াশোনা সম্পর্কে আমার মোটামুটি ভালো আইডিয়া আছে।

ক্যান্ডিডেট তখন গিয়ে বুঝতে পারল, আমার কথার যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো না। মূলত: স্নাতক লেভেলে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাঁকির পরিমাণ সীমাহীন । সীমিত কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সিনিয়রদের নোটের ফটোকপি আর নীলক্ষেতের বই ফটোকপির দোকানে দৌড়াদৌড়ি করে শিক্ষাজীবন শেষ করে।

বই পড়ার ব্যাপারে আমার হয়েছে তাই। আমি ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত দস্যু বনহুর , সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন, তিন গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিকে ডুবে ছিলাম। এরপরে বন্ধুর বড়ভাইদের লাইব্রেরিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার,বুদ্ধদেব গুহ আর নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিচয়। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। আমাদের বাসায় নিয়মিত ঈদসংখ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের শারদীয় পূজা সংখ্যা রাখা হোত। সেই উপলক্ষে সমকালীন মোটামুটি সব লেখকদের লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার।

স্কুল জীবন পার হয়ে , বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় কলেজ কর্মসূচির মাধ্যমে ; ৯০ সালের শেষের দিকে। তখন কেন্দ্রের বাছাই করা বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের কাছে শুনে শুনে আরো কিছু ক্লাসিক পড়ে ফেললাম। কলেজ কর্মসূচির পরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের পড়ার অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য মৌলিক উৎকর্ষ নামের একটা ছোট পাঠচক্র চালালেন। আগের পড়া লেখকদের কারো কারো রচনার বিস্তৃত পড়া হল। যতদূর মনে আছে, ঐ মৌলিক উৎকর্ষে আমরা কয়েকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসসমগ্র পড়ে ফেললাম। ঐ বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা আর ছোটগল্পের সঙ্গে আর সবার যতোটুকু পরিচয়, আমাদেরও ততোটুকু। তারপরেও ১৭/১৮ বছরের কয়জনই বা রবীন্দ্রনাথের সবগুলো উপন্যাস পড়ে ফেলে ! অন্যদের চেয়ে একটু বেশি পড়া নিয়ে আমাদের বিস্ময় ছিল, ভালোলাগা ছিল।

তবে স্যারের সামনে আমরা ম্রিয়মান হয়ে থাকতাম । আমাদের সবাই স্যারের কথা শুনে ভাবতাম একজীবনে একজন মানুষের পক্ষে এতো বই পড়া কীভাবে সম্ভব ! বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের এতো এতো বই সায়ীদ স্যার কীভাবে পড়েছেন আবার সেই সব পঠিত বইয়ের শ্রেষ্ঠ লাইনগুলো কীভাবে মনেও রেখেছেন ! আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম , যেহেতু পাকেচক্রে আমারও কিছু ক্লাসিক পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ব্যাপারটা আমাদের ব্যাচের বন্ধুদের ভিতরেও ছিল। বেশি পড়া নিয়ে কোনরকম আত্মশ্লাঘা বা কম পড়াদের ব্যাপারে তাচ্ছিল্য ছিল না।

তবে শুনেছি, আমাদের পরবর্তী ব্যাচগুলোতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। বাগান বড় হলে , বাগানে ফুল গাছের সঙ্গে সঙ্গে আগাছাও বাড়ে। এদেরই কারো কারো উন্নাসিকতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ব্যাপারে অন্যদের একটা ভুল মেসেজ দিয়ে বসে। যাই হোক, সেটা হতেই পারে।

তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পড়া নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। টেক্সটাইলে আসার আগে আমি কয়েক মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রিতে পড়েছিলাম। তো, কী কারণে যেন কয়েকজন বিজ্ঞান অনুষদের বন্ধুরা আড্ডা মারতে গেছি মধুর ক্যান্টিন বা তার আশেপাশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল । আমি বোধহয় মৃদু ভাষায় কিছু একটা বলেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের কুলীন ছাত্র-ছাত্রীদের কয়েকজন এমন করে আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালো –মনে হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরে তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার। বিজ্ঞানের ছাত্র , চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে কথা বলাটা সমীচীন না ! এই অভিজ্ঞতা আমার নিতান্তই আংশিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। ধরে নিচ্ছি, ভুল করে আমি কিছু কলাভবনের কিছু উন্নাসিকের আড্ডার মাঝে গিয়ে পড়েছিলাম, যারা আমাকে ব্রাত্য ভেবেছিল ।

যাই হোক ৯০ সালের আশেপাশের কয়েকবছরে আমি যে পরিমাণ বই পড়েছি তার এক দশমাংশও আমি গত কুড়ি বছরে পড়ি নি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেলাম ; চাকরিতে আরো কাহিল অবস্থা। স্থির হয়ে বই পড়ার অবকাশ কোথায় ? আমার যতদূর মনে পড়ে আমি এই সময়ে প্রতিবছরে বড়জোর হাতে গুণে ৪ থেকে ৫ টির বেশি বই পড়তে পারিনি।

শেষবারের মতো বাসা বদলেছি ২০১৫ সালের শুরুতে। ড্রয়িং রুমে নিজের মতো করে একটা বুকশেলফ করলাম। বইমেলায় গিয়ে নিজের পছন্দের বই কেনা শুরু করলাম। শুধু কেনাই হয়, পড়া হয় না কিছুই। দিন যায়, মাস যায় ; প্রতিবছর বইমেলা থেকে নতুন পুরনো লেখকদের বই কিনি। কন্যার জন্য লাইব্রেরিতে খাতা-কলম কিনতে গেলে হুট করে একটা দুইটা কিনি। বই কিনি , কিন্তু পড়ি না ! মূলত: আমার বইয়ের আলমিরায় বর্তমান বইগুলোর শতকরা ১০ভাগ বইও আমার পড়া হয়নি। আমার বইয়ের আলমিরা দেখে কারো যদি ধারণা হয় আমি এখনো অনেক পড়ি, তিনি ভুল ভাবছেন ; তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব।
২০২০ সালের এই বইমেলায় আমি বই কিনব কী কিনব না তাই নিয়ে দোলাচলে আছি। গত পাঁচ বছরের কেনা বইগুলোরই তো কিছু পড়া হয়নি।

২০১৬ সালের আগেও আমি মিরপুর থেকে উত্তরাতে আমার কর্মস্থলে আসতাম ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ বড়জোর ৬০ মিনিটে। মেট্রো রেলওয়ের কাজ শুরু হওয়ার পরে আমার জীবন হয়ে গেল বীভৎস ট্র্যাফিকময়। পুরো মিরপুর আর আমার চলাচলের পথে জায়গায় জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি । সপ্তাহের দুইএক দিন আগের মতোই হয়তো সময় মেনে যাওয়া আসা সম্ভব; বাকী চারদিন কখন , কোথায় এবং কেন কীভাবে আমাকে ঘণ্টাখানেক, ঘণ্টা দুয়েক জ্যামে বসে থাকতে হবে সেটার সদুত্তর দেওয়ার মতো কেউ এই ধরাধামে নাই !

এখন সারাদিন পরে ট্র্যাফিক ঠেলে ঠেলে রাতের খাবার ; কিছুটা সময় কন্যাদেরকে দেওয়ার পরে যখন একটা বই পড়া শুরু করি ; কয়েক পাতা পড়তে না পড়তেই ঘুমে ঢলে পড়ি । আবার নতুন ভোর আসে ; আবার সেই ট্র্যাফিক, অফিস আবার সেই রাত্রি করে বাড়ি ফেরা। বেসরকারি চাকরিতে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন ; তাও আবার এরশাদের বদমাইশির জন্য রোববারে একার মতো একা। সেই একটা দিন নানা বাকী থাকা কাজ আর কন্যাদের স্কুল-কোচিং এ দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কখন কেটে যায় বোঝা যায় না।

কেউ কেউ বলেছে, জ্যামে পড়লে বই খুলে বসতে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে আমি সামান্য দৈনিক পত্রিকাও পড়তে পারি না। কয়েক মিনিট পরেই মাথা ভোঁ ভোঁ করে। ঢাকা শহরের এই ট্র্যাফিকময় ব্যস্ত জীবনে বই পড়ার অবসর কোথায় সেটাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। সে ক্ষেত্রে শুধু শুধু অর্থের অপচয় করে বই কেনার দরকার কী সেটাই ভাবছি !

প্রকাশকালঃ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০

ছোটগল্পের চেষ্টা

মাথার কাছের জানালা , হাস্নুহেনা গাছ ছিল একটা । হাত দিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছোঁয়া যায়। ছোট খালা বললো, ‘ যে রকম গন্ধ, দেখিস সাপ আসবে!’ ঢাকার শহরে সাপ ? মানুষই টিকতে পারে না !

তবু মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে একবার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকাতাম যদি সাপ দেখা যায় ! মনটা হু হু করতো, কিংবা গভীর রাতে বিষণ্ণ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
আসলে, হাস্নুহেনা গাছ আর সাপ পর্যন্ত ঠিক আছে । পরের গুলো আমার লেখকস্বত্বার আরোপিত আবেগ ! এর পরে ধরেন, আমি আমার আশে পাশের সবার চরিত্র বিশ্লেষণ করে টক-ঝাল কিছু শুরু করলেই একটা ছোট গল্প হয়ে যেতে পারে!

মুশকিল হচ্ছে, আমি সেই ছোট্টবেলায় বিছানায় হিসু করতাম এবং গভীর রাতে আমার ঘুম আগেও ভাঙ্গে নাই, এখনো ভাঙ্গে না !ছোট গল্প? দিল্লি দূর অস্ত !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৭

পিকনিক ১৯৮১ এবং ২০১৩

পিকনিক ১৯৮১ স্টাইলঃ

ক্লাস টুতে পড়ি , জীবনের প্রথম পিকনিক। ক্লাস টিচার বললেন, ‘কাল সকালে ৮:০০ টায় ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্কে পিকনিক। বাসা থেকে প্লেট আর গ্লাস নিয়া আসবা!’ ওক্কে ! স্কুল ড্রেস দুইবার করে ইস্তিরি করি। সাদা কেড্‌সে চক মারি। সারারাত এপাশ ওপাশ, মিস যেন না হয় !
আম্মা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভঙ্গুর চীনামাটির জায়গায় ষ্টীলের গ্লাস-প্লেট দিলেন। পলিথিন ব্যাগে গ্লাস-প্লেট নিয়া স্কুলের বাসের কাছে হাজির। ন্যাশনাল পার্ক। হতাশ ! কিছু শাল গাছ, কয়েকটা ডোবা টাইপ পুকুর, মাঝে মাঝে ক্ষত চিহ্নের মতো ন্যাড়া ধানক্ষেত ! দুই তিন বন্ধু মিলে অবশেষে একটা বড়ই গাছ আবিষ্কার করি , কাঁচা বড়ই খেয়ে মুখ কষা ! পরের বছরগুলোতে ঘুরেফিরে ওই একই জায়গায় কয়েকবার। নিজের গ্লাস-প্লেট নিয়ে গেছি একবারই। প্রতিবার সন্ধ্যায় ফেরার পথে মুক্ত স্বাধীন চিৎকার । বাসের উপরে মাইকে বাজে—‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায় —।’
চাকরিক্ষেত্রে দেখা গেল, আমাদের টেক্সটাইল মিল কল-কারখানা সব ওই দিকে এবং সপ্তাহে ৩/৪ দিন যেতে হয় ন্যাশনাল পার্কের ধারপাশ দিয়ে । শালবন দেখি, হঠাৎ হঠাৎ পুরানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে। প্রথম পিকনিক , প্রথম প্রেমের মতোই ভুলিনি । নিজের গ্লাস প্লেট নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো বুঝি নাই। এমন না যে, ওই সময়ে ডেকোরেটর ছিল না। হয়তো, খরচ কমানোর জন্য সবাইকে বাসা থেকে গ্লাস-প্লেট আনতে বলেছিলেন। বড় হওয়ার পরে সেই ক্লাস টিচারের সাথে আর দেখা হয় নাই, হলে জিজ্ঞেস করতাম।

পিকনিক ২০১৩ স্টাইলঃ

মেয়ের স্কুল পিকনিক। টু মিনিট ইনস্ট্যান্ট নুডল্‌সের মতো সব প্রিপ্যাকড । স্থান সেই ভাওয়ালের আশে পাশের একটা স্পট। দুই মেয়েকে নিয়ে বউয়ের চারদিন আগের থেকে প্রিপারেশন। ম্যাচিং ড্রেস, কয়েকটা ব্যাগ, ক্যামেরা, হাল্কা খাবার, পানি , কী নাই !
সাজানো গোছানো দেয়াল ঘেরা বদ্ধ পিকনিক স্পট। গাড়ীতেই নাস্তা। নামার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার পাতা, ছায়া ঘেরা বাগান। ফুটফুটে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। ঠিক দুপুর একটায় প্যাকেট খাবার, পানি, কোল্ড ড্রিঙ্কস মায় টিস্যু পর্যন্ত। বিকালে পিঠা –চা। আর আমার বিনোদন ? পিচ্চি গুলার সাথে একান্ত কিছু সময় , আর অন্য বাচ্চাদের মায়েদের দিকে ইতি উতি তাকানো, হা হা হা !
ধুর ! এইটা কোন পিকনিক হইলো !

পাদটীকা:

এই ফেব্রুয়ারিতে বছর চারেক পরে কন্যাদের পিকনিক হয়েছে ‘ফ্যান্টাসি কিংডম’-এ। কারো সঙ্গে কারো কথা বার্তা নেই। যার যার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাইডগুলোতে উঠছে। টিকেট দিয়ে খাবার নিচ্ছে। যেটুকু কথাবার্তা বাসে যেতে যেতে। আরো বছর চারেক পরে কি পিকনিকের কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটার জন্য অপেক্ষা।

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩

ঢাকা কলেজে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার , দুইজনই ছিলেন ঢাকা কলেজে আমাদের শিক্ষক।

সায়ীদ স্যার যতখানি হাস্যোজ্জ্বল, জনপ্রিয়, মিডিয়া-খ্যাত ; ইলিয়াস স্যার ছিলেন ঠিক ততখানিই অন্তর্মুখী , বিষণ্ণ , একা। শুনেছিলাম উনি চিলেকোঠার সেপাই এর লেখক। কী যেন পুরস্কারও পেয়েছেন ।
সাদা কালো চুলে, মোটা ফ্রেমের চশমা, একটু ধীরে ডান পা টেনে হাঁটতেন , মনে আছে !

স্মৃতি থেকে লিখছি ! সতীর্থ কারো মনে পড়বে হয়তো —শুনেছিলাম তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল সেই সময়েই । উনি আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকে ‘ সমুদ্রের প্রতি রাবণ’ পড়িয়েছিলেন। বড়জোর তিন চারটা ক্লাস করেছিলাম। একটা মাইকেলীয় শব্দ লিখে বলেছিলেন– ‘প্রতিটি কাব্যে প্রকাশ হওয়ার পর ডিকশনারির লোকজন এসে নাকি বলতেন, ‘এই শব্দটা তো বাংলা শব্দকোষে নাই।’ মাইকেলের নাকি উত্তর হতো, ‘এখন থেকে থাকবে ! ‘ এই একটা কথা দিয়ে মাইকেলের স্পর্ধিত চেহারাটা ফুটিয়ে তুলতেন তিনি ।

৯০ই এর উত্তাল দিন !আমরা তখন নাসিম বানু ম্যাডাম , আজাদ স্যারের বাড়ি বাড়ি টিউশনিতে দৌড়াই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার যে কতো বড়ো মাপের লেখক ছিলেন , মানুষ ছিলেন ; অতো কাছ থেকে দেখেও তা বোঝার মতো সামর্থ্য সেই নাবালক বয়সে যেমন ছিলনা , এখনও নেই !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩

চল্লিশোর্ধ শরীর যখন বেগতিক

শরীর ঠিক সায় দিচ্ছে না।

আমার প্রিয়ভাজন প্রকৌশলী বড়ভাই একদিন বলেছিল, ‘ জাহিদ! চল্লিশ পার হলে শরীরের যত্ন নিও। সব মেশিনের পার্টস পত্তরের একটা নির্দিষ্ট ওয়ারেন্টি পিরিয়ড থাকে। সেই একইভাবে আমাদের দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড আছে, চল্লিশের আগ পর্যন্ত। এর পরে কোন কিছু ড্যামেজ হলে, আর কিছু করার নাই !

সাময়িক এই অসুস্থতার কথা অফিসের কয়েকজন জানে। অনেক দূরে থাকে, কিন্তু যোগাযোগে খুব কাছের যারা, তাঁদের কয়েকজন– কুল্লে বড়জোর জনা দশেক জানে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের কেউ কেউ আমার ভিতরে কিছুটা বিক্ষিপ্ততা, অসংলগ্নতা দেখেছেন। একটা অস্থিরতা আমি লুকিয়ে রাখতে পারছি না । কীভাবে এই অবস্থা হয়েছে, তাঁর একটা ডিজিটাল বর্ণনা ফেসবুকে রেখে দিলে মন্দ কিছু না। পরে নিজেই ফিরে এসে দেখতে পারব।

আবার কেউ নতুন করে জিজ্ঞেস করলে, ফেসবুকের পাতা খুলে দেখিয়ে দিতে পারব। বারবার বলতে হবে না ! হতে পারে, হয়তো খানিকটা ভার্চুয়াল সমবেদনা পাওয়ার সম্ভাবনায় আমার এই লেখা। এখন তো আর সেই দিন নাইরে ভাই , যে কারো অসুস্থতার সংবাদে ফলমূল হরলিকস নিয়ে বাসায় হাজির হবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা। একেতো সব ফলেই ফরমালিন আতঙ্ক ; আর হরলিকসে যে ঘোড়ার ডিমের কোন পুষ্টিগুণই নাই– সেটা ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে।

হয়েছে কী , গত ৮ তারিখ বুধবার উত্তরা থেকে মিরপুর বাসায় যাওয়ার পথে বিশ্বরোডের আগে জ্যামে পড়লাম। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দুই ঘণ্টা বসে থাকলাম, হাজারো গাড়ির সারি। এমনিতে সন্ধ্যায় নাস্তা খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার, বাসায় পৌঁছে রাতের খাবার খেয়ে নিই একবারে। একে ক্ষুধা, আরেকদিকে ঐ ভয়ংকর স্থবিরতায় আমার মাথা ধরে গেল। বাসায় গিয়ে ঘুমিয়েও সেই মাথা ধরে থাকাটা আর গেল না। দুইদিন পরে শুক্রবার সকালে উত্তরা আসতে লাগল চার ঘণ্টা। ইজতেমার মুসল্লিদের চাপে রাস্তা প্রায় অচল। মাথা ধরা আরো বেড়ে চলল। এর কয়েকদিন পরে আরেকদিন সন্ধ্যায় একই অবস্থা।

১৬ তারিখ দুপুরে মনে হচ্ছিল মাথার পিছনের তীব্র ব্যথায় মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে। সহধর্মীনিকে ফোনে বলার পরে প্রেশার মাপাতে বলল। ডিজিটাল মেশিনের সবার ভরসা কম। অদ্ভুতুড়ে রিডিং ১৭৭/১১৫ । বোঝা গেল কিছু একটা হয়েছে। আমিও ভাবলাম ভুলভাল রিডিং, কিন্তু পরে দেখা গেল মেশিন ঠিক আছে, আমিই ঠিক নাই ! অফিসের নানাবিধ কাজের চাপ, কম ঘুম, জ্যাম সবকিছু মিলিয়ে শরীর বেঁকে বসেছে।
ওষুধের ব্যাপারে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আমার আলস্য সুবিখ্যাত! আমার বিগত দুই যুগের নানা অনিয়মের কথা আমার স্ত্রী কী করে মনে রেখেছে কে জানে ! প্রতিটি অনিয়মের কথা মনে করিয়ে আমার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করে ঠেলতে ঠেলতে সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের একটা হাসপাতালে নিয়ে গেল। অপেক্ষার প্রহর শেষে ডাক্তারের মুখোমুখি , সে আমাকে যাই জিজ্ঞেস করে তাই তে আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিই। সিগারেট খান ? হ্যাঁ। ওজন ৮৮ কেজি ! হ্যাঁ। বীফ-মাটন ? হ্যাঁ। কার্বোহাইড্রেট, মিষ্টি? হ্যাঁ।উনি খুব হতাশার স্বরে বললেন, আপনি শেষ কবে চেক-আপ করিয়েছেন। বললাম বছর দেড়েক হবে মনে হয়। তখন তো বড় কোন সমস্যা ছিল না। কোলেস্টরেল, ক্রিয়েটিনাইন সবতো ভালই ছিল।

ডাক্তার সাহেব, আরো গম্ভীরভাবে বললেন, আপনি কি জানেন আপনি সম্ভাব্য একটা স্ট্রোক থেকে মাত্র কিছুটা দূরে ছিলেন?
আমি হাসি হাসি মুখ করে কাঁধ ঝাঁকালাম। ডাক্তার-রোগীর পুরো কনভারসেশন চলার সময় আমার সহধর্মীনি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে আমাকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছিল । ডাক্তার সাহেব তিন ধরণের প্রেশারের ওষুধ দিলেন। তক্ষুনিই পারলে খাইয়ে দেন।

বাসায় এসে আমার সবচেয়ে কাছের চিকিৎসক বন্ধু যে নিউইয়র্ক প্রবাসী, তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। সে সব শুনে বলল, তোর এই ব্লাড প্রেশার আকস্মিক, অনেকগুলো অস্বস্তি মিলিয়ে হুট করে হয়েছে। এই ধরণের পেশেন্টকে একবারে এতোগুলো ওষুধ দেওয়াটা বেশি হয়ে যায় রে । তোর তো আবার ডাক্তার-ওষুধ নিয়ে বিতৃষ্ণা আছে ; বরং তুই প্রথম একটা ওষুধ খা, আর ঘুমের ওষুধ খেতে থাক। অফিস থেকে পুরো একটা সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাসায় সময় কাটা। সেরে যাবে। সকালে হাঁটার অভ্যাস ছিল, সেটাও কয়েকদিনের জন্য বাদ দিতে বলল।
অফিস থেকে ছুটি নিতে পারিনি। আজ অমুক ভাইস প্রেসিডেন্ট, কাল তমুক ডিরেক্টর অফিসে হাজির। এখন বিছানায় পড়ে থাকার প্রশ্নই আসে না। চাকরির বাজার এমনিতেই মন্দা ! এক সপ্তাহ ধরে বিপি ওঠানামা করছে, প্রায়শ: মাপছি আবার ভুলে যাচ্ছি। নানা অস্বস্তিতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছি।
ভয় পাচ্ছি না , তবে রুদ্রের সেই কবিতার মতো, ‘অজান্তেই চমকে ওঠি ; জীবন, ফুরালো নাকি!’

“চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।।
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…”

প্রকাশকালঃ ২৪শে জানুয়ারি, ২০২০