কেন এই অর্থহীন লেখালেখির ব্যর্থ চেষ্টা !

সরকারের কোন হিসাবেই আমার বা আমাদের আস্থা নেই ! শোনা যায় বাংলাদেশের ৭০ ভাগের কাছাকাছি লোক নাকি স্বাক্ষর। এর মধ্যে খুব সামান্য একটা জনগোষ্ঠী টেক্সট বুকের বাইরে কিছু পড়ে অথবা পড়ে না। আবার তার চেয়েও সামান্য একটা অংশ ফিকশন বা নন ফিকশন কিছু পড়ে। আর ক্ষুদ্রতম একটা অংশ পড়ার পাশাপাশি লেখালেখি করে বা চেষ্টা করে।

এখন ধরেন, অন্যদের কথাবার্তা শুনে শুনে –আমি নিজেকে তাদের একজন বলে গণ্য করে ফেললাম ! এবং এটা সেটা পড়াশোনা করে, পুরনো ধ্যানধারণার উপর ভিত্তি করে, রূপান্তর করে নতুনের মতো কিছু একটা দাঁড় করলাম।
ধরেন সেই লেখার যৎসামান্য ভ্যালু আছে অথবা নাই। না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

গুগল বলছে, এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ১৩ কোটি বই লিখিত হয়েছে। ১০ হাজার বছরের পুরনো বই রক্ষিত আছে মাত্র ৩টি !
৫ হাজার বছরের পুরনো বই আছে, ৫১ টি, হাজার বছরের পুরনো বই ২১৩টি। এখন এই ১৩ কোটি বইয়ের জীবনকাল কয়েকশ বছর পরে কী হতে পারে, আন্দাজ করা যায়।
১০ বছর আগেও প্রতিবছর বই প্রকাশিত হতো সারাবছরে মাত্র ২ লক্ষ !
এখন প্রতিবছর বই প্রকাশিত হচ্ছে ২০ লক্ষ ! জ্ঞানের বিশাল প্রবাহে আমাদের সমকালীন পৃথিবী।

মূল কথায় আসি, আমার সন্তান সে কালো হোক,বোঁচা হোক আমার সন্তান। আমার যেহেতু সৃষ্টি , আমার কাছে তো তা মূল্যবান মনে হতেই পারে। মহাকালের প্রেক্ষিতে যেহেতু আমি, আপনি ও আমাদের সন্তানেরা কেউই থাকবে না; তার মূল্য ও মূল্য-হীনতার প্রশ্ন অবান্তর।
পনেরো আনা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ ছাগলের যতটুকু শিং আছে, তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙের পনেরো আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি। ময়ূরের লেজ যে কেবল রংচঙে জিতিয়াছে, তাহা নহে— তাহার বাহুল্যগৌরবে শালিক-খঞ্জন-ফিঙার পুচ্ছ লজ্জায় অহরহ অস্থির।……… জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। কারণ, যাওয়া চাই। যাওয়াটাই একটা সার্থকতা। নদী চলিতেছে— তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং আমন-ধানের খেতে ব্যবহার হইয়া যায় না। তাহার অধিকাংশ জলই কেবল প্রবাহ রাখিতেছে। আর-কোনো কাজ না করিয়া কেবল প্রবাহরক্ষা করিবার একটা বৃহৎ সার্থকতা আছে। তাহার যে-জল আমরা খাল কাটিয়া পুকুরে আনি, তাহাতে স্নান করা চলে, কিন্তু তাহা পান করে না; তাহার যে-জল ঘটে করিয়া আনিয়া আমরা জালায় ভরিয়া রাখি, তাহা পান করা চলে, কিন্তু তাহার উপরে আলোছায়ার উৎসব হয় না।………
আমরা যাহাকে ব্যর্থ বলি, প্রকৃতির অধিকাংশই তাই। সূর্যকিরণের বেশির ভাগ শূন্যে বিকীর্ণ হয়, গাছের মুকুল অতি অল্পই ফল পর্যন্ত টিঁকে। কিন্তু সে যাঁহার ধন তিনিই বুঝিবেন। সে-ব্যয় অপব্যয় কি না, বিশ্বকর্মার খাতা না দেখিলে তাহার বিচার করিতে পারি না। আমরাও তেমনি অধিকাংশই পরস্পরকে সঙ্গদান ও গতিদান ছাড়া আর-কোনো কাজে লাগি না; সেজন্য নিজেকে ও অন্যকে কোনো দোষ না দিয়া, ছটফট না করিয়া, প্রফুল্ল হাস্যে ও প্রসন্ন গানে সহজেই অখ্যাত অবসানের মধ্যে যদি শান্তিলাভ করি, তাহা হইলেই সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই যথার্থভাবে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করিতে পারি।……
সকল ঘাস ধান হয় না। পৃথিবীতে ঘাসই প্রায় সমস্ত, ধান অল্পই। কিন্তু ঘাস যেন আপনার স্বাভাবিক নিষ্ফলতা লইয়া বিলাপ না করে— সে যেন স্মরণ করে যে, পৃথিবীর শুষ্ক ধূলিকে সে শ্যামলতার দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে, রৌদ্রতাপকে সে চিরপ্রসন্ন স্নিগ্ধতার দ্বারা কোমল করিয়া লইতেছে। বোধ করি ঘাসজাতির মধ্যে কুশতৃণ গায়ের জোরে ধান্য হইবার চেষ্টা করিয়াছিল— বোধ করি সামান্য ঘাস হইয়া না থাকিবার জন্য, পরের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিয়া জীবনকে সার্থক করিবার জন্য তাহার মধ্যে অনেক উত্তেজনা জন্মিয়াছিল— তবু সে ধান্য হইল না। কিন্তু সর্বদা পরের প্রতি তাহার তীক্ষ্ম লক্ষ নিবিষ্ট করিবার একাগ্র চেষ্টা কিরূপ, তাহা পরই বুঝিতেছে। মোটের উপর এ-কথা বলা যাইতে পারে যে, এরূপ উগ্র পরপরায়ণতা বিধাতার অভিপ্রেত নহে। ইহা অপেক্ষা সাধারণ তৃণের খ্যাতিহীন, স্নিগ্ধসুন্দর, বিনম্র-কোমল নিষ্ফলতা ভালো।”

শতভাগ অথবা প্রবল সম্ভাবনা আছে, আমার কাছে যে চিন্তাটি নতুন মনে হচ্ছে ; গভীর আবেগে আমি সারা দিনরাত ব্যয় করছি যে চিন্তার পিছনে ; সেটা ঐ ১৩ কোটি বইয়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অসংখ্যবার লিখিত হয়েছে।সুতরাং আমার নব আবিষ্কৃত আবেগ ও ধ্যানধারণা বহু আগেই বাতিলের খাতায় চলে গেছে। যারা সত্যিকার সৃষ্টিশীল যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ষোল আনার মধ্যে এক আনা, প্রয়োজনীয় —তাঁদের কথা বাদ দিয়ে , যারা বাকী পনেরো আনা, এই আমার মতো—তাদের কেউ, যদি সবার মিথ্যা প্ররোচনায় বা অনুপ্রেরণায় কষ্টেসৃষ্টে একটা বই প্রকাশ করেও ফেলে, সেটা আসলে অর্থহীন। বছর দশেক পরে, আমার কন্যাদের স্তূপীকৃত নানা বইয়ের ফাঁকে সেই বইয়ে ধুলো পড়বে। জেলা শহরের অখ্যাত কোন লাইব্রেরিতে শেষের সেলফের উপরের সারিতে মাকড়সার জালের সঙ্গে তার সহাবস্থান হবে। তারপর, দুই দশক পরে এই প্রয়োজনীয় পৃথিবীর কাছে সেটা আবর্জনার বাইরে আর কিছু না !

তাহলে আমি কি লেখালেখি করব না ?

লেখালেখির একটা উদ্দেশ্য তো থাকেই নতুন করে কিছু বোঝার চেষ্টা করা। অথবা অন্যদের চিন্তাগুলো নাড়াচাড়া করে নিজের সময়ের প্রেক্ষিতে নিজের মতো করে কিছু বলা। সমকালে সেটার দাম থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।

তাহলে আমি কেন লিখব ?

নিজের জীবনের এই সামান্য সময়, ১৩ কোটি বইয়ের মাঝে, আরেকটি বই বাড়িয়ে কেন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট করব ? আমার লেখালেখি যদি আমার প্রজন্মকে নতুন কিছু চিন্তা করাতে নাই পারে, বৃথা কেন কষ্ট করব আমি ?
নাকি শুধুমাত্র নিজের আনন্দের জন্য লিখব, প্রকাশিত হওয়ার আনন্দে লিখব?

এটাতো ঠিক যে, বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জীন আমরা বয়ে নিয়ে চলছি গত ৪৪ কোটি বছর ধরে ! প্রকৃতি চেয়েছে প্রাণের ধারাবাহিকতা রক্ষা হোক। হোক তার সৃষ্টির প্রায় পুরোটাই অর্থহীন, মূল্যহীন। কিন্তু এই প্রবণতা না থাকলে তো সৃষ্টির উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্য রক্ষিত হবে না ! আমার ছোটমামা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং এর সিনিয়র প্রফেসর, বাংলাদেশের জেনেটিক্স জগতের ওস্তাদ মানুষ। আমাকে হাসতে হাসতে একদিন বলছিলেন, ‘বুঝলা ভাগ্নে, প্রাণী যাতে বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সেজন্য প্রকৃতি তাদের যৌনমিলনে আনন্দ দিয়ে দিয়েছে। এক কাজে দুই কাজ হয় ! প্রকৃতির স্বার্থও রক্ষিত হয় ; আবার প্রাণীরাও আনন্দ চিত্তে সেটা করে !’
লেখালেখির ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কি তাই না ? হয়তো কিছু সফল সৃষ্টির অপেক্ষায় , এক আনা প্রয়োজনীয় লেখার জন্য বাকী পনেরো আনাদের নিয়ে প্রকৃতির এই বিশাল আয়োজন। সেই অর্থে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় লেখালেখির দরকার। তা না হলে, কারো কারো শ্রেষ্ঠ লেখাটা রচিত হবে না ; আর সেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছুতেও পারবেন না।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, দুইটা উদ্দেশ্যেই লেখালেখি করা দরকার। প্রকৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আর নিজের আনন্দের জন্য।

প্রসঙ্গ আপনি, তুমি, তুই

আপনি থেকে তুমি আর তুমি থেকে তুই সম্বোধনে আসতে কিছুটা সময় লাগে আমার।

আমাদের মিরপুরের মহল্লায় ৮৬ ব্যাচের সবাইকে ভাই বলতাম। ৮৭ ব্যাচের একজন ছিল, সে আমাদের সঙ্গেই চলত, সুতরাং তুমি। আর ৮৮, ৮৯, ৯০ আর ৯১ ব্যাচে আপনি সম্বোধনের বালাই ছিল না। কেউ কাউকে তুমি বলেছে তো আরেকজন বলেছে তুই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রেগুলার ব্যাচে কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হয়ে দেখলাম, ৮৯ ব্যাচের অনেকে আছে। সেটা তাঁদের সমস্যা, ইয়ার লস তো আমি দিই নাই। তাই রেগুলার ব্যাচের সঙ্গে সঙ্গে ৮৯ ব্যাচের সবাইকে তুমি, তুই বলে চালিয়েছি।
একই সমস্যায় পড়লাম আমি যখন ইয়ার লস দিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলাম ৯১ ব্যাচের সঙ্গে !এক ব্যাচ জুনিয়র ছেলেরা তুই তোকারি করত ! হা হা হা ! অবশ্য, আশার কথা ক্লাস শুরু হওয়ার পরে দেখা গেল আমাদের সঙ্গে রেগুলার ব্যাচের ছেলেদের চেয়ে ‘ধরা খাওয়া’ ব্যাচ বেশি। সুতরাং আমাদের তুই তোকারি নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হল না।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে, দুই কিশোরীকে পেলাম , ওদেরকে তুমি থেকে তুই বলতে বছর-খানেক লাগল।
এই যে জড়তা সেটা কিন্তু অনেকের নাই। শুধুমাত্র প্রথম পরিচয়ে আরেক ব্যাচ মেটকে তুই বলার মতো স্মার্টনেস আমার নেই। মাস খানেক আগেও ৯০ ব্যাচের এক সেনাকর্মকর্তা বন্ধুর বাসায় ঘরোয়া আড্ডা। সে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর লং কোর্সের আরেক উচ্চপদস্থ বন্ধুর সঙ্গে।এদের একজন ৯০ ব্যাচের আরেকজন ৮৯ ব্যাচের। দুইজনকেই আপনি বলে শুরু করে শেষে তুমি বলে বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম। হুট করে তুই-তে নেমে আসতে হলে আরও কয়েকটা আড্ডা দরকার।

কর্পোরেট চাকরিতে আছি প্রায় ২১ বছর ধরে। এমন অনেক মালিকের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে, যারা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু স্যার বা বস বলা ছাড়া তো উপায় নেই ! যদিও তিনিও ভদ্রতা রেখে জাহিদ ভাই বা আপনি করেই বলেছে।
আবার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করছি, স্বভাবতই আপনি সম্পর্ক। কিন্তু , বছর দুয়েকের মাথায় জানা গেল, সে আমার ৯০ ব্যাচেরই। কিন্তু তখন সম্বোধনের যে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, তা আর ভাঙ্গা হয়ে ওঠেনি।

উল্টোটাও হয়েছে অনেকবার। ওপেক্স গ্রুপে কাজ করার সময়, আমাদের সহকর্মী ছিল ৮৪,৮৫,৮৬ ব্যাচের কয়েকজন। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা এমন পর্যায়ের ছিল, একে অপরকে তুই বলে চালিয়েছি। অফিসের চিপায় এক সিগারেট ভাগ করে খেয়েছি, আর দুইজনের দুই বস যে আসলেই খাঁটি বাঞ্চোত ও চুতিয়া সে ব্যাপারে একমত হয়েছি।

আমি বিয়ে করলাম ২৮ বছর বয়সে ২০০১ সালে। আমার পাশের ডিপার্টমেন্টে সঙ্গে জাহাঙ্গীর নগরের গণিত বিভাগের এক আদম কাজ করত। সম্ভবত: ও ৮৫/৮৬ ব্যাচের। ওর সঙ্গে আমার কাকা-কাকা সম্পর্ক কেন যে হয়েছিল জানি না। ও আমাকে কাকা বলত, আমিও তাই।
তো, আমার বিয়ের কথা শুনে সে বলল, খালাম্মাকে বল আমার জন্যেও একটা মেয়ে দেখতে। আমি বললাম, তুই তো বুইড়ারে। তোরে মেয়ে দেবে কে, বয়স তো ৩৬ পার হয়ে গেছে তোর ! আম্মা মেয়ে দেখতে গেলে প্রথমেই তো পাত্রের বয়স জিজ্ঞেস করবে।
সে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, খালাম্মাকে বলিস আমার ৩২ বছর চলছে !
আমি বললাম, সেটা কী করে হয় !
সে আরো সিরিয়াস ভঙ্গীতে জবাব দিল, শোন্‌ জাহিদ বিয়ের বাজারে পাত্রের বয়স কখনোই ৩২ পার হয় না !

টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি আর গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজে আমার সঙ্গে কাজ করেছে, আমার চেয়ে জুনিয়র কিন্তু অসাধারণ মেধাবী কয়েকজন। তাঁদের অনেকেই সত্যিকারের এন্ট্রাপ্রেনার। অনেকে সঠিক সময়ে চাকরি ছেড়ে বিশাল কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। চাকরি করার সময় তাঁদের সাথে আপনি আপনি সম্পর্ক ছিল। এখনো আছে। শুধুমাত্র আমার এসএসসি পাশের সাল তাঁর চেয়ে এগিয়ে আছে– সেই অনধিকার চর্চায় তাঁকে আমি কখনোই তুমি বলতে পারি নি। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা আপনিতেই আটকে আছে।

আবার ট্রেডিং অফিসে এখনো আমার কয়েকজন সহকর্মী আছেন, যারা ৮২ থেকে ৮৬ ব্যাচের। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠিতে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে নানা কারণে আমি তাঁদের উপরে চলে এসেছি। আমি ‘ অমুক সাহেব’ বা শুধু ‘অমুক’ বলে ডাকলেও –তাঁরা দূরত্ব বজায় রেখে আমাকে ‘জাহিদ ভাই’ বলেছে এবং বলছে। আমি এভাবেই অভ্যস্ত। হুট করে শুধু বয়স বা ব্যাচের অজুহাতে কাউকে তুমি বলা আমার হয়ে ওঠেনি। হোক সে আমার ব্যাচের অথবা নিচের।

উল্লেখ্য, একবছর জলাঞ্জলি দিয়ে যখন ৯১ ব্যাচের সঙ্গে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, আমার নিজের ব্যাচের ঢাকা কলেজের অথবা পূর্ব পরিচিত ৯০ ব্যাচের সবাইকে তুই তোকারি করেছি ঠিকই । কিন্তু রেগুলার ব্যাচের কারো কারো সঙ্গে তো দূরত্ব ছিলই; তাঁদেরকে ভাই , আপনি বলে চালাতে হয়েছে। যদিও রেগুলার ব্যাচের একজন এই গ্রুপে আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, জাহিদ আর আপনি বলতে হবে না, তুমি বইল !
এতো গেল পুরুষ মহলের কাহিনী। নারীমহলে আমার অবস্থা আরো শোচনীয়!
আমার দশ বছরের জুনিয়র যে ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় আছে, তাঁকে আপনি বলতে আমার কখনোই বাঁধেনি। কয়েকজন লেখক লেখিকা আছেন, দারুণ তাঁদের লেখা। জানি তাঁরা বয়সে আমার ছোট বা সমবয়সী। কিন্তু সেই অজুহাতে আমি তাঁদেরকে কখনোই তুই দূরে থাক, তুমিও বলিনি।

অন্যদিকে অনেক ধনকুবের বয়স্ক গার্মেন্টস মালিক আছেন যারা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর, জিএম সবাইকে তুমি বলে অভ্যস্ত ; তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ইচ্ছে করেই অন্য অফিসের কর্মকর্তাদের তুমি বলে একটা ডমিনেটিং অ্যাডভান্টেজ নিতে চান। আমি তাঁদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে চলেছি। আমার চেয়ে বয়সে ও পজিশনে বড় কেউ যদি আমাকে তুমি বলে ভাল বোধ করেন, করুক না , আমি সমস্যা দেখি না। বরং তাঁদের এই তুমি বলার অ্যাডভান্টেজ আমিও নিয়েছি। বড় কোন সমস্যায় সিনিয়র ভাইয়ের কাছে যেমন করে আবদার করা যায়, আমিও আবদার করে আমার কাজ উদ্ধার করেছি। তবে, আমার চেয়ে বয়সে ছোট কেউ এখন পর্যন্ত আমাকে হুট করে তুমি বা তুই তোকারি করেনি এই যা রক্ষে !

৯০ ব্যাচের একটা ‘সমগ্র বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে। আমাকেও কেউ সংযুক্ত করেছে । আগের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সাথে নানা জেলার অনেক বন্ধু-বান্ধবীর সম্মিলন। সদ্য পাওয়া বন্ধু ও বান্ধবীদের কাছে আমার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করলাম।
এই আপনি , তুমি , তুই ব্যালেন্স করে করেই পেশাগত ও সামাজিক জীবনে আমার তিন দশক চলে গেছে । আমার মতো কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে, যে হুট করে তুমি বা তুইতে নামতে পারে না। কিছুটা প্রাচীনপন্থী । আবার আধুনিক ও আধুনিকারাও আছে, যারা অনেক স্বচ্ছন্দ– সম্পর্কের এই গভীরতা বৃদ্ধিতে। যাই হোক, আমার মতের সঙ্গে হয়তো কেউ একমত পোষণ করবে, অনেকেই করবে না ; সেটাও আমি জানি।
সবার জন্য শুভকামনা !

প্রকাশকালঃ ৩রা জানুয়ারি, ২০২০

স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীভাগ্য

আমার জন্ম ৭৩ সালে পুরনো ঢাকায় র‍্যাঙ্কিন স্ট্রীট ওয়ারীতে।

পারিবারিক দুর্যোগে ঢাকা ছেড়ে নানাবাড়িতে থাকতে হয়েছিল বছর খানেক। আমার প্রথম স্কুল বাটিকামারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমারখালী, কুষ্টিয়া। মাস তিনেক ওইখানেই হাতেখড়ি ; সম্ভবত: ৭৮/৭৯ সাল হবে। পরের স্কুল , মিরপুর উপশহর প্রাথমিক বিদ্যালয় ; মিরপুর ১নং বাস স্ট্যান্ড। বছর খানেক। ততদিনে আমাদের আদিবাস বিক্রি করে আমরা পুরনো ঢাকা ছেড়ে মিরপুরে চলে এসেছি। ক্লাস টু-এর মাঝামাঝি মিরপুর ১১ নাম্বারে বাসার পাশের একটা কিন্ডারগার্টেন জান্নাত একাডেমীতে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ওখানেই। ক্লাস সিক্সে চলে আসি মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়, মিরপুর ১১-তে । এসএসসি দিলাম এখান থেকেই। পরে, ঢাকা কলেজ। একবছর জলাঞ্জলির কয়েকদিন কলাভবনে ইকোনমিকস-এ ! ভর্তি বাতিল করে বিজ্ঞান বিভাগের মান রক্ষা করতে কেমিস্ট্রিতে মাস ছয়েক। আবার অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে মাইগ্রেট করার মুহূর্তে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ।

গ্রামের প্রথম স্কুলের তেমন কোন স্মৃতি মনে নাই। বড়মাঠ আর বিশাল বড়ই গাছের পাশে টিনের চালের স্কুল। মাঝখানে দেওয়ালের পরিবর্তে বাঁশের বেড়া। এক ক্লাসের হৈচৈ আরেক ক্লাসে পৌঁছে যায়। সেই স্কুলে কাজিনদের সঙ্গে স্কুলে গেছি কী যাই নি। রিলিফের সাদা অ্যারারুটের বিস্কুটে আর টিকা দেওয়ার ভয়ে স্কুলের জানালা দিয়ে হাপিশ হয়ে যাওয়া মনে আছে।

দ্বিতীয় স্কুল মিরপুর উপশহর প্রাথমিকের কথাও তেমন মনে নেই। বাস স্ট্যান্ডের কাছে, সারাক্ষণ রিকশা-গাড়ির প্যাঁ পোঁ আওয়াজ। বাসার কাজের লোক স্কুলে নিয়ে যেত আসত।
জান্নাত একাডেমীর কথা মনে আছে ভালোমতো। কো এডুকেশন / সহশিক্ষা ছিল। সামিনা, শাহানাজ, ইসরাত জাহান মিতুর কথা মনে আছে। ছেলেদের নাম মনে আছে কিছু, কিন্তু এই গ্রুপে এতো বেশি ছেলে যে ওরা প্রাসঙ্গিক না !
সামিনা ফার্স্ট গার্ল ছিল, আমি সেকেন্ড। সামান্য নাম্বারের ব্যবধানে প্রতিবার এই মেয়ে ফার্স্ট হত। কীভাবে যেন, এক স্যার আমাকে ছেলেমেয়ে তুলে খোঁচা দিল। আমি ক্লাস ফোরে অনেক নাম্বারের ব্যবধানে ফার্স্ট হওয়া শুরু করলাম সবাইকে পিছে ফেলে। শুরু হল আমার পড়ালেখার ইঁদুর দৌড়। পরীক্ষায় কেউ যদি ২টা রচনা পড়ে একটা কমন পায়, আমাকে পড়তে হয় ১৫টা , কারণ আমি ভাল ছাত্র। কোন রিস্কে নেওয়া যাবে না ! এই যে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার জন্য হুদাই বেশি বেশি পড়ার প্যারা এসএসসি পর্যন্ত চলল।

মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ক্যাম্পাস ছিল প্রায় মাইল খানেক দূরত্বে। মাঝে মাঝে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময়ে আমাদের উঠতি কৈশোরের আকুল চোখ মেয়েদের স্কুলের দিকে চেয়ে থাকত। আহা ! পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শনা পরীগুলো ঐ দালানে পড়ে। সদ্য যৌবনা এইট-নাইনের মেয়েরা বেণী দুলিয়ে স্কুলে যায় আর আসে। মেয়েদের স্কুলের মহল্লার ছেলেদের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসাবে কোন কোন মেয়েদের পরিচয় আছে। আমরা ওদের কাছে গল্প শুনি আর হাপিত্যেশ করি। বয়েজ স্কুলে পড়লে যা হয় আর কী।তবে বছরের একটা দিন ‘ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ হত ছেলেদের স্কুলের মাঠে। ওই দিন স্বর্গের সব উর্বশী , অপ্সরারা ধবধবে সাদা পোশাকে আমাদের মাঠে এসে হাজির হত। আমরা বয়েজ স্কুলের উঠতি বয়সের চ্যাংড়া পোলাপান জুলজুল করে চেয়ে থাকতাম।

বিকালে খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসার সময়, কোন কোন ডেঁপো বন্ধু বলত ফিসফিসিয়ে, জানিস এইটা সামিনাদের বাসা, ওইটা ইভাদের বাসা, এইটা নার্গিসদের বাসা। আরে চিনলি না, ওই যে নোয়াখালীর নার্গিস বেশ দেখতে, মুকুল যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর প্রতিদিন সকাল বিকাল বাইসাইকেল নিয়ে একনজর দেখার জন্য চক্কর দিচ্ছে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদের কথা শুনতাম। কারণ আমার সেই অর্থে কোন মেয়ে বান্ধবী ছিল না।

ক্লাস নাইনের কোচিং এ গিয়ে পরিচয় হল, অন্য স্কুলের ডাকসাইটে রূপসী নিপার সঙ্গে। গার্লস আইডিয়ালে পড়ে। দুলাভাই নামকরা ডেন্টিস্ট। স্কুলের মেয়েদের ভিতরে পরিচয় হল, সঞ্চিতা, লুসি, কান্তাদের সঙ্গে। কুল্লে এই !

পরবর্তীতে ভার্সিটি লাইফে আরও কয়েকজন সতীর্থ বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয়, ফারহানা হাকিম কণা ,সামিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুঃখের ব্যাপার এই যে, স্কুলে ৯০ সালে ছেলেদের ব্যাচে ছিলাম ১৬০ জনের মত। যাঁদের প্রায় ১৫০ জনের সংগেই খায়খাতির ছিল, এখনো কম বেশি আছে। অথচ একই স্কুলের ১৬০ জন মেয়েদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চিনি মাত্র ১০ জনকে। কো-এডুকেশন স্কুল হলে হয়তো জীবনটা আরও মধুর, সৌকর্যময় ও অভিজ্ঞতালব্ধ হত। কী আর করা !

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে গিয়ে ১২০ জন ছেলেদের মধ্যে কী করে যেন দুই কিশোরীকে পেলাম। একজন নাইমা ইফফাত সুলতানা আরেকজন দেল রায়না মিত্রা। নাইমার আবার ক্যাম্পাসে আসার আগেই প্রেম ছিল সিনিয়র একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। মিত্রারও তাই।
তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে যে, আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৈশোর ও যৌবনে আমাদের নারী বন্ধুত্ব বিহীন এক শুষ্ক মরুভূমিতে কাটাতে হয়েছে।
৬ নং মহল্লার সঞ্চিতাদের ( Rahman Sanchita ) সঙ্গে পরিচয় সিক্স-সেভেন থেকেই। শহীদদের বাসায় ঈদে-পার্বণে দেখা হয়। একমাত্র সঞ্চিতার সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব দিনে দিনে আরও প্রগাঢ় হয়েছে। ও আমাদের একমাত্র বান্ধবী যে সম্পর্কের দাম দিতে জানে, সবধরনের রসিকতা বোঝে, আমাদের সকল বেদনার সমব্যথী। তুই তুই সম্পর্ক আজ ৩৫ বছর ধরে। ও একাই , অনেক বান্ধবী না থাকার দুঃখ ভুলিয়ে রেখেছে !

২০১৬ সালের স্কুলের ৫০ বছর পুর্তির রি-ইউনিয়নে ও তারপরে নতুন করে পরিচয় হল আরও কয়েকজনের সঙ্গে। আমরা অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, আমাদের এই স্কুল বান্ধবীদের অনেকেই তাঁদের ন্যাকামো ও অন্য সীমাবদ্ধতাসহ আটকে আছে সেই ক্লাস নাইনের মানসিকতায়। হতে পারে , এদের কারো কারো খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়ে অসময়ে সন্তানের লালনপালনের চাপে শুষ্কংকাষ্ঠং হয়ে গেছে। এদের কারো সন্তান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কেউ মেয়ে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে। আর সেখানে আমাদের ছেলেবন্ধুদের ছানাপোনা সবে প্রাইমারী- সেকেন্ডারি স্কুলে হামাগুড়ি দিচ্ছে । পুরনো স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হয়ে বান্ধবীরা নানা আদিখ্যেতায়, বাচালতায় মেতে উঠল। কিন্তু কোথায় যেন তার ছেঁড়া মনে হল।

ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন করে ভাইবার, মেসেঞ্জার পেয়ে নানা পুরনো কথার, পুরনো স্মৃতি ঝলসে উঠল। কে কার বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করত , কবে কোথায় ধরা খেয়েছে এই সব আর কী। কিন্তু সঞ্চিতা ও জাহাঙ্গীর নগরের ফারহানা হাকিম কণা ( Farhana Kona ) ছাড়া অন্য বান্ধবীদের রসবোধ সামান্য অথবা নেই। সামান্য ঠাট্টা ফাজলামোকে ন্যাকামো ও আদিখ্যেতার দিকে নিয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের কাছে সঞ্চিতা বন্ধুত্বের মানকে এমন একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে গেছে, অন্যদের সঙ্গে আর ফ্রিকোয়েন্সি মিলল না।

এর মাঝে আমাদের পারিবারিক গেট টুগেদারে স্বামীসহ বান্ধবীরা ও সস্ত্রীক আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হল। খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা বার্ডে আমাদের ঝটিকা সফর হল। সঞ্চিতা-তুষার ভাইয়ের সঙ্গে দারুণ কিছু ঘোরাফেরা হল।( তুষার ভাই সঞ্চিতার হাজব্যান্ড, আরেক রসিক মানুষ )। আমি সঞ্চিতাদের বাসায় আছি, অথবা কোন রিসোর্টে কয়েক বন্ধু সহ সঞ্চিতা তুষার ভাইদের গ্রুপের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছি– এটা আমাদের স্ত্রীরা জানলে নিশ্চিন্ত থাকে। ভাগ্যিস, এই মেয়েটা ছিল, নইলে আমাদের স্ত্রীদের কাছে আমাদের সকল স্কুল বান্ধবীরা ন্যাকা ও ইমম্যাচিউর হিসাবেই চিহ্নিত হত।

যদিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমার পরিচয় হয়েছিল অসাধারণ কিছু বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে। যাদের অনেকেই এখন উদীয়মান লেখকের কাতারে আছে। কেউ কেউ সাংবাদিকতা ও অন্য মিডিয়াতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। বান্ধবীদের অপ্রাপ্তিটাকে ওঁদের সঙ্গে সময় কাটালে ভুলে যেতে হয়।

ধান ভানতে শিবের গীত ! মোদ্দা কথা ডিজিটাল যুগে নতুন করে একটা গ্রুপে কেউ আমাকে অ্যাড করেছে ‘সারাবাংলা ৯০-৯২’ গ্রুপ। এখানে এসে আমি ঠিক সঞ্চিতার মানসিক বয়সের লেভেলের অনেক বান্ধবীকে হুট করে পেয়ে গেলাম। জানিনা আমাদের এই পরিচয় ও আড্ডা ভার্চুয়ালই থাকবে কীনা, অথবা কোনদিন কারো সঙ্গে কোন গেট টুগেদারে দেখাসাক্ষাৎ হবে কীনা। আমি নিজেকে বড্ডো বেশি সৌভাগ্যবান মনে করছি ; কারণ বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ আর সেমি-বয়েজ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির বঞ্চনাকে গ্রুপের অসংখ্য উদারমনা সমবয়সী বান্ধবীরা সুদে আসলে পুষিয়ে দিল। বন্ধুরা তো আছই, কিন্তু বান্ধবীরা তোমাদের জন্য আবারো অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা।

টোনাকাহিনী

আমার ১৩ বছরের বড় টুনটুনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে , সে বিয়ে করবে না! ক্লাস এইট অবধি পড়তে পড়তে, সে কীভাবে যেন টের পেয়ে গেছে—বিয়ে মানেই সামান্য কিছু সুবিধার বিনিময়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করা !

এদিকে এদের একমাত্র খালার বিয়ে হয়েছে বছর দেড়েক আগে। বিয়ে উপলক্ষে শাড়ি-চুড়ি-গহনা-ফটো-শুট দেখে ছোটটি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ও বিয়ে করবে। মেয়েরা বিয়ে করলে সেটার যে অনেক প্রাপ্তি সেটা ৮ বছরের টুনটুনি বুঝে ফেলেছে।

ইটের খাঁচায় বড় হওয়া নাগরিক শিশু বলে, সুইমিং পুলের প্রতি ছোটটির উৎসাহ অসীম। যে কোন ভ্রমণে হোটেল বুকিং দেওয়ার আগে আমাকে খেয়াল রাখতে হয় সেখানে যেন অতি অবশ্যই সুইমিং পুল থাকে। দুপুরে হোক বা রাতে হোক, প্রতিদিন প্রতিবার পুলে নেমে সে অন্তত ৩/৪ ঘণ্টার আগে ক্ষান্তি দেয় না!

এইবারের সপ্তাহ খানেকের থাইল্যান্ড ভ্রমণে সুইমিং পুল প্রীতির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে, ডলফিন প্রীতি। সাফারি পার্কে, ডলফিনদের দারুণ একটা শো ছিল। আমরা বড়রাই মুগ্ধ হয়ে চিন্তা করছিলাম , কীভাবে এদের ট্রেনিং দিয়েছে এঁরা ! সবকিছু দেখে মনে হয়েছে এদের বুদ্ধিমত্তা তো মানুষের প্রায় কাছাকাছি !

যাই হোক , দেশে ফেরার আগে ছোট টুনটুনি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে তার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। এবং এখানে যে কোন তর্কবিতর্ক চলবে না, সেটা আমরা জানি।যতো তাড়াতাড়ি হোক, সে একটা সুইমিং পুল ও কিছু ডলফিন কিনবে!  বিয়েটা এখন আর তার প্রায়োরিটি না !

৯০ দশকের বন্ধুত্ব

আমাদের ছিল সীমাবদ্ধ বিনোদন। রেডিও ছাড়া সবেধন নীলমনি বিটিভি, সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্লাসিক, ওয়েস্টার্ন, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা আর সবশেষে আধা সের হূমায়ুন আহমেদ, এক চিমটি ইমদাদুল হক মিলনের সাথে এক টেবিল চামচ সমরেশ , সুনীল, শীর্ষেন্দুর ঘুঁটা দেওয়া সাহিত্য !

রসময় গুপ্ত সবে এলেন ! এলেন, দেখালেন, জয় করলেন আর সবচেয়ে জনপ্রিয় অবশ্যপাঠ্য সাহিত্যিক(!) হয়ে গেলেন। সেটা নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা আমাদের সবার। গ্রুপে আমার মতো ১৬ বছরের চ্যাংড়া ছাড়াও অনেক কাঁচাপাকা চুলের ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার আছেন। তাদের কথা কনসিডার করে, এটা শুধু একপেশে পোস্ট হিসাবেই থাকুক। সবার অভিজ্ঞতা কমেন্টসে আসলে, আমি জাহিদ প্রথমদিনেই এই গ্রুপ থেকে নির্বাসিত হব, লিশ্চিত !

তো, ঢাকা কলেজে যাই , একটা দুইটা ক্লাস করি কী করি না ! প্র্যাক্টিকাল ক্লাস থাকলে দুপুর পর্যন্ত থাকি , নইলে প্রাইভেট স্যার/ ম্যাডামদের কাছে টাকা নষ্ট করতে যাই !

সপ্তাহ খানিকের মাথায় আমাদের মিরপুরবাসী দুই মফিজ -ঝুলন আর আমাকে মণিশঙ্কর রায় নামের মেধা তালিকার এক ছেলে পাকড়ালো। ‘ এই তোরা চটি পড়েছিস ?’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি! পড়ি নি। ‘ বলিস কী ! তোরা তো অশিক্ষিত রে ! আয় , তোদের শিক্ষিত করি ! ‘
অত:পর তিন কিশোরের নীলক্ষেত ভ্রমণ। চটির মতো সাহিত্য(!) যে ভাড়া পাওয়া যায় , কে জানত ! এবং ঢাকা কলেজের কোন এক নির্জন গ্যালারিতে বসে দুই মফিজের শিক্ষিত (!) হওয়া ! কথ্য কোলকাতার অদ্ভুতুড়ে অশ্লীলতায় বিনোদন খুঁজে পাওয়া !

মণিশঙ্কর রায় ডিএমসি পাশ করে নাম করা ডাক্তার , আমেরিকা থাকে। গত ২৯ বছর কোন যোগাযোগ নেই ! শুনেছি ও কোন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না । কারো সংগে ওই দুর্দান্ত মেধাবী ছেলেটির যোগাযোগ থাকলে আমার ভালোবাসা পৌঁছে দিও। ওকে বোল, আই স্টিল রিমেম্বার হিম ! লাভ ইউ মণিশঙ্কর রায় !

আমদের ফেসবুকের মেসেন্জার ছিল না, রাতজাগা মোবাইল প্যাকেজ টকটাইম ছিল না ! ছিল এক ঘোড়ার ডিমের ল্যান্ড ফোন। কলরেট বেশি বলে থাকত আব্বা – আম্মার ঘরে তালাবদ্ধ ! ক্রস কানেকশনে কিছুটা ফান ছিল। কিন্তু নিজেদের নধ্যে আমাদের প্রকাশভঙ্গী ছিল অনাবিল, জড়তামুক্ত ! আমরা অবলীলায় একজন আরেকজনকে যা বলতে পারতাম, তা এখন চরম অভদ্রতা !
যেমন :
উহ্ হু ! দোস্ত সকালে দাঁত মাজ নাই!
উহ্ হু ! এই একই শার্ট কয়দিন ধইরা পড়তাছস? কাঁচতে পারস না!
অথবা নতুন কেনা জিনস পড়া কাউকে-
মাম্মা , প্যান্টটা তো দারুণ হইছে , ঢাকা কলেজের সামনে থিকা নাকি বঙ্গবাজার থিকা কিনলা ? কত পড়ছে ?

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৯

দর্শন ও চিন্তার জগতের বেসিক আগে জানতে হয়।

আমাদেরকে দর্শন ও চিন্তার জগতের বেসিক আগে জানতে হয় ; তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে আমরা চিন্তাকে আরো বিস্তৃত করতে পারি !

ধরুন , একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত মনোযোগ থাকে শুধুমাত্র মিষ্টান্নের প্রতি। খাওয়ার জন্য আরো যে হাজার বিকল্প স্বাদ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেটা বুঝতে বয়স ও অভিজ্ঞতা লাগে।

যখন আমাদের মানসিক বয়স বেসিক চাহিদা পূরণ করার পর পরিপার্শ্বের বৈচিত্রে মুগ্ধ হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে ; তখনই আমাদের জানার তৃষ্ণা মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের মুখোমুখি করে আমাদেরকে।

মিষ্টি ছাড়াও যে টক, ঝাল, তিতা ও স্বাদহীনতার স্বাদ অবারিত ছড়িয়ে আছে তা গ্রহনের জন্য আপনি ও আপনারা উন্মুখ হয়ে উঠুন। জ্ঞানের ভুরিভোজনে আমাদের সকলের শৈশব অতিক্রান্ত হোক! শুভকামনা !

প্রকাশকালঃ ২৫শে ডিসেম্বর,২০১৯