এই জন্মদিনে অগ্রজ, অনুজ ও সতীর্থদের বহুমাত্রিক অন্তর্জালিক ( ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল) শুভেচ্ছায় আপ্লূত হয়ে গেছি। গতকাল থেকে কিছু কথা ঘুরছিল মাথায়। টুকে রেখে যাই, পরে ফিরে এসে দেখতে পারব।
আসলে শহুরে নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্মদিন নিয়ে তো তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা ছিল না আশির দশকে ; আমারও ছিলনা। কখন জন্মদিন আসে , কখন চলে যায় সেটা আম্মাই মাঝেসাঝে মনে করিয়ে দিতেন । হঠাৎ করে বলতেন, ‘আমার বাবাটা আজকের এই দিনে খুব ভোরে জন্মেছিল।’ আম্মার মুখে শোনা, আমার জন্মের আগে থেকেই বেশ কিছুদিন ধরে আব্বা বড় ফুফু-ফুফা,দাদা-দাদীদের সঙ্গে একান্নবর্তী হয়ে র্যাঙ্কিন স্ট্রিট ওয়ারীতে একটা বিশাল বাড়ীতে থাকতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী অরাজকতায় স্থানীয় নেতা ও মাস্তানদের সঙ্গে মামলা ও হাঙ্গামা করতে করতে ক্লান্ত বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই অস্থির সময়ে ডেমরার মাতুয়াইলে আব্বার ধর্ম-মায়ের বাড়ীতে জন্মেছিলাম আমি । নানা কারণে একসময় সব ছেড়ে আম্মা কয়েকবছরের জন্য নানার বাড়ী কুষ্টিয়া চলে যেতে বাধ্য হন। আমার বড়ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঠিক ৪ বছরের পার্থক্য। ও তখন হাঁটিহাঁটি পা পা। গাছ ঘেরা বড় একটা বারান্দা ছাড়া র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সেই বাড়ীর কোন স্মৃতি নেই আমার মনে।
মিরপুরের অবাঙ্গালী বিহারী অধ্যুষিত ১১ নাম্বারে আসার আগে আমাদের পরিবারটি কিছুদিন মিরপুরের চিড়িয়াখানার কাছে গুদারা ঘাট এলাকায় ভাড়া থাকতাম। খুব সকালে বাঘের হুংকার কানে আসত।ভীষণ পানির সমস্যা ছিল ওই এলাকায়। মাঝে মাঝেই হাঁড়িপাতিল নিয়ে ওয়াসার গাড়ীর কাছে পানির জন্য ভিড় জমে যেত। পরে চলে আসলাম , মিরপুরের পাইক পাড়ায় এক ডাক্তার সাহেবের বাসায়। বর্ষায় চারপাশে থইথই পানি , জলাবদ্ধতা। বিএডিসি কলোনির পাশে নতুন নগর গড়ে উঠছে। শহরের প্রধান রাস্তা মিরপুরে ১ নাম্বার থেকে সোজা কল্যাণপুর হয়ে চলে গেছে শ্যামলী, এলিফ্যান্ট রোডে। তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , গুলিস্তান, নবাবপুর, সদরঘাট। ডাক্তার মোশাররফ সাহেবের দুই ছেলে, দুই মেয়ে সবাই স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েছে। রনি ভাই, পরে বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে প্রবাসী। ভুলন ভাই, লালা-ভোলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সুশ্রী চেহারার রুপা আপা, দীপা আপা সদ্য কৈশোর পেরিয়ে প্রস্ফুটিত যৌবনে পা দিয়েছেন। ঠিক উপরের তালায় সিলেটি পরিবারের মিজান ভাই আর মিলি আপাদের পরিবার।
আমার প্রথম জন্মদিনের দাওয়াত মিলি আপাদের বাসায়। বেলুন ফুলিয়ে কেক কেটে জন্মদিন। ঠিক যেন বাংলা সিনেমার মত স্বপ্নময়। তারও কিছুদিন পরে চলে আসলাম মিরপুরের ১১ নাম্বারে নিজেদের পৌনে দুই কাঠার বাড়ীতে। সেই বেড়ে চলার কাহিনী ছিল মিষ্টি-মধুর। জন্মদিন মানেই আমার কাছে মনে হত, বাংলা সিনেমার হবু নায়ক-নায়িকার ‘ ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গেয়ে টেয়ে কেক কাটা। সদ্য কৈশোরে পা দিয়েও খুব বেদনাহত হওয়ার মতো বিষয় ছিল ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ ! সারাবছরের সবচেয়ে ভীতিকর বার্ষিক পরীক্ষার সময়ে ১৩ বা ১৪ তারিখে হয় সাধারণ বিজ্ঞান অথবা সাধারণ গণিত পরীক্ষা থাকত। সুতরাং জন্মদিন নিয়ে আম্মার কাছে ঘ্যানঘ্যান করার চেয়ে আমার চলতো ইয়া নফসি , ইয়া নফসি অবস্থা।
কলেজে ওঠার পরে আরেকটু বিস্তৃত সম্পর্কের জন্য , বন্ধুদের বাসায় দাওয়াত পেতাম। একটা সুনীল, শীর্ষেন্দু বা হুমায়ূন আহমদের বই দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে, চা-বিস্কুট দিয়ে জন্মদিনের সমাপ্তি ঘটতো।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়েও সেই একই অবস্থা। তেমন কোন হেরফের নেই জন্মদিন নিয়ে। জন্মদিন যে বড়লোকি ব্যাপার সেটা আমি অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলো।
বিবাহিত জীবনে আমার যেমন আমার বউয়ের জন্মদিনের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ছিল, ঠিক ছিল ওঁরও। আর ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের আগে গুচ্ছের আমেরিকান কোটার শিপমেন্টের চাপে জন্মদিন কোথা দিয়ে পার হয়ে যেত টেরই পেতাম না। আমার দুই টুনটুনি হওয়ার পরে , ইদানীং জন্মদিনটা দুইভাবে পালিত হয়। অফিসে সকল কর্মকর্তাকে সকালবেলায় জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা দেওয়ার রেওয়াজ আছে । আর সেই সঙ্গে থাকে, সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওনা খাওয়ার দাবী। মাত্রই গত বছর দশেক ধরে আমার জীবনে জন্মদিনের কেকের আবির্ভাব ঘটেছে। নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উপরের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্যই হয়তো এই বড়লোকি আনুষ্ঠানিকতা ঢুকে পড়েছে আমার জীবনে।
আব্বা আম্মার দীর্ঘ অসুস্থতার সময়টি কেটেছে আমার আর আমার সহধর্মীনির সান্নিধ্যে। আমি খুব মন দিয়ে তাঁদের জন্মদিন পালন করেছি শেষের বছর পাঁচেক। মাঝে মাঝে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখি। সেই সময়ের তোলা অসংখ্য ছবি আমাকে বেদনার্ত করে এখনো। সেই মধুর উষ্ণ আম্মার গা ঘেঁষে তোলা ছবিগুলো আমার হৃদয় মথিত করে !
কিডনি ডায়ালাইসিস নেওয়া আব্বা ও আম্মার চলে যাওয়াটা তো অবধারিত ছিলই! ২০১৪ এর ২৭শে জুলাই আব্বা আর ঠিক একান্ন-দিনের মাথায় ১৬ই সেপ্টেম্বর আম্মার চলে যাওয়াটা আমার জন্মদিনের সব আনন্দ ম্লান করে দিল। আম্মার আরো কিছুদিন না থেকে যাওয়াটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। ২০১৪ এর বিমর্ষ জন্মদিন, ২০১৫ তেও সেই একই হাহাকার ! নেই নেই আমার সবচেয়ে আস্থার জায়গাটা নেই ! কিন্তু শোকের আয়ু আর কতোদিন ! মানুষের জীবন কি থেমে থাকে। সেই একই ট্রেনের কামরায় উঠে বসেছে নতুন যাত্রী ; চলে গেছে পুরনো যাত্রীরা তাঁদের নির্ধারিত গন্তব্যে। দিনের পর দিন ট্রেনের কামরায় একই আসনে সব যাত্রীদের যে বসে থাকার উপায় নেই। তাই, নতুন যাত্রীরা ( আমার দুই টুনটুনি ) নিজেরাই কেক ম্যানেজ করে গভীর রাতে জাগিয়ে দিয়েছিল আমাকে । ঘুমঘুম চোখে গভীর ভালোবাসায় ভেসে যাই আমি। তারপরে গত পরশু কেটে গেছে অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীর অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল ভালোবাসায় ! সেই ভালোবাসার প্রত্যুত্তর দেওয়ার সামর্থ্য আমার কোথায় ?
২০১৬ সালের এই জন্মদিন আমার মনে থাকবে অনেকদিন। যারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন,ভালোবাসা জানিয়েছেন ; যারা নানা ব্যস্ততায় হয়তো মনে করেছেন আমার কথা কিন্তু শুভেচ্ছা জানাতে পারেন নি ; তাঁদের সবার প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা।
প্রকাশকালঃ ১৫ই ডিসেম্বর,২০১৯
সাম্প্রতিক মন্তব্য