by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
শরীর ঠিক সায় দিচ্ছে না।
আমার প্রিয়ভাজন প্রকৌশলী বড়ভাই একদিন বলেছিল, ‘ জাহিদ! চল্লিশ পার হলে শরীরের যত্ন নিও। সব মেশিনের পার্টস পত্তরের একটা নির্দিষ্ট ওয়ারেন্টি পিরিয়ড থাকে। সেই একইভাবে আমাদের দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড আছে, চল্লিশের আগ পর্যন্ত। এর পরে কোন কিছু ড্যামেজ হলে, আর কিছু করার নাই !
সাময়িক এই অসুস্থতার কথা অফিসের কয়েকজন জানে। অনেক দূরে থাকে, কিন্তু যোগাযোগে খুব কাছের যারা, তাঁদের কয়েকজন– কুল্লে বড়জোর জনা দশেক জানে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের কেউ কেউ আমার ভিতরে কিছুটা বিক্ষিপ্ততা, অসংলগ্নতা দেখেছেন। একটা অস্থিরতা আমি লুকিয়ে রাখতে পারছি না । কীভাবে এই অবস্থা হয়েছে, তাঁর একটা ডিজিটাল বর্ণনা ফেসবুকে রেখে দিলে মন্দ কিছু না। পরে নিজেই ফিরে এসে দেখতে পারব।
আবার কেউ নতুন করে জিজ্ঞেস করলে, ফেসবুকের পাতা খুলে দেখিয়ে দিতে পারব। বারবার বলতে হবে না ! হতে পারে, হয়তো খানিকটা ভার্চুয়াল সমবেদনা পাওয়ার সম্ভাবনায় আমার এই লেখা। এখন তো আর সেই দিন নাইরে ভাই , যে কারো অসুস্থতার সংবাদে ফলমূল হরলিকস নিয়ে বাসায় হাজির হবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা। একেতো সব ফলেই ফরমালিন আতঙ্ক ; আর হরলিকসে যে ঘোড়ার ডিমের কোন পুষ্টিগুণই নাই– সেটা ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে।
হয়েছে কী , গত ৮ তারিখ বুধবার উত্তরা থেকে মিরপুর বাসায় যাওয়ার পথে বিশ্বরোডের আগে জ্যামে পড়লাম। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দুই ঘণ্টা বসে থাকলাম, হাজারো গাড়ির সারি। এমনিতে সন্ধ্যায় নাস্তা খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার, বাসায় পৌঁছে রাতের খাবার খেয়ে নিই একবারে। একে ক্ষুধা, আরেকদিকে ঐ ভয়ংকর স্থবিরতায় আমার মাথা ধরে গেল। বাসায় গিয়ে ঘুমিয়েও সেই মাথা ধরে থাকাটা আর গেল না। দুইদিন পরে শুক্রবার সকালে উত্তরা আসতে লাগল চার ঘণ্টা। ইজতেমার মুসল্লিদের চাপে রাস্তা প্রায় অচল। মাথা ধরা আরো বেড়ে চলল। এর কয়েকদিন পরে আরেকদিন সন্ধ্যায় একই অবস্থা।
১৬ তারিখ দুপুরে মনে হচ্ছিল মাথার পিছনের তীব্র ব্যথায় মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে। সহধর্মীনিকে ফোনে বলার পরে প্রেশার মাপাতে বলল। ডিজিটাল মেশিনের সবার ভরসা কম। অদ্ভুতুড়ে রিডিং ১৭৭/১১৫ । বোঝা গেল কিছু একটা হয়েছে। আমিও ভাবলাম ভুলভাল রিডিং, কিন্তু পরে দেখা গেল মেশিন ঠিক আছে, আমিই ঠিক নাই ! অফিসের নানাবিধ কাজের চাপ, কম ঘুম, জ্যাম সবকিছু মিলিয়ে শরীর বেঁকে বসেছে।
ওষুধের ব্যাপারে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আমার আলস্য সুবিখ্যাত! আমার বিগত দুই যুগের নানা অনিয়মের কথা আমার স্ত্রী কী করে মনে রেখেছে কে জানে ! প্রতিটি অনিয়মের কথা মনে করিয়ে আমার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করে ঠেলতে ঠেলতে সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের একটা হাসপাতালে নিয়ে গেল। অপেক্ষার প্রহর শেষে ডাক্তারের মুখোমুখি , সে আমাকে যাই জিজ্ঞেস করে তাই তে আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিই। সিগারেট খান ? হ্যাঁ। ওজন ৮৮ কেজি ! হ্যাঁ। বীফ-মাটন ? হ্যাঁ। কার্বোহাইড্রেট, মিষ্টি? হ্যাঁ।উনি খুব হতাশার স্বরে বললেন, আপনি শেষ কবে চেক-আপ করিয়েছেন। বললাম বছর দেড়েক হবে মনে হয়। তখন তো বড় কোন সমস্যা ছিল না। কোলেস্টরেল, ক্রিয়েটিনাইন সবতো ভালই ছিল।
ডাক্তার সাহেব, আরো গম্ভীরভাবে বললেন, আপনি কি জানেন আপনি সম্ভাব্য একটা স্ট্রোক থেকে মাত্র কিছুটা দূরে ছিলেন?
আমি হাসি হাসি মুখ করে কাঁধ ঝাঁকালাম। ডাক্তার-রোগীর পুরো কনভারসেশন চলার সময় আমার সহধর্মীনি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে আমাকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছিল । ডাক্তার সাহেব তিন ধরণের প্রেশারের ওষুধ দিলেন। তক্ষুনিই পারলে খাইয়ে দেন।
বাসায় এসে আমার সবচেয়ে কাছের চিকিৎসক বন্ধু যে নিউইয়র্ক প্রবাসী, তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। সে সব শুনে বলল, তোর এই ব্লাড প্রেশার আকস্মিক, অনেকগুলো অস্বস্তি মিলিয়ে হুট করে হয়েছে। এই ধরণের পেশেন্টকে একবারে এতোগুলো ওষুধ দেওয়াটা বেশি হয়ে যায় রে । তোর তো আবার ডাক্তার-ওষুধ নিয়ে বিতৃষ্ণা আছে ; বরং তুই প্রথম একটা ওষুধ খা, আর ঘুমের ওষুধ খেতে থাক। অফিস থেকে পুরো একটা সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাসায় সময় কাটা। সেরে যাবে। সকালে হাঁটার অভ্যাস ছিল, সেটাও কয়েকদিনের জন্য বাদ দিতে বলল।
অফিস থেকে ছুটি নিতে পারিনি। আজ অমুক ভাইস প্রেসিডেন্ট, কাল তমুক ডিরেক্টর অফিসে হাজির। এখন বিছানায় পড়ে থাকার প্রশ্নই আসে না। চাকরির বাজার এমনিতেই মন্দা ! এক সপ্তাহ ধরে বিপি ওঠানামা করছে, প্রায়শ: মাপছি আবার ভুলে যাচ্ছি। নানা অস্বস্তিতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছি।
ভয় পাচ্ছি না , তবে রুদ্রের সেই কবিতার মতো, ‘অজান্তেই চমকে ওঠি ; জীবন, ফুরালো নাকি!’
“চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।।
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…”
প্রকাশকালঃ ২৪শে জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
হল লাইফে এক বন্ধু , মাঝে মাঝে ধর্ষণ নিয়া হালকা রসিকতা করতো।” When rape is inevitable , you better enjoy it ; জোর কইরা মিষ্টি খাওয়াইলে কি, মিষ্টির স্বাদ তিতা হইব”–টাইপের কথাবার্তা ! হয়তো, বয়সটাই ওইরকম ছিল, সব কিছু নিয়া ফাজলামো করার। আমার ধারণা , এখনকার ওই বয়সের ছেলেদের মধ্যে ওর মতো এক দুইজন পাওয়া যাবে।
আমাদের হলের পাশে আরেকটা ছাত্রাবাস ছিল। অল্প শিক্ষিত, চাঁদাবাজ, ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা কিছু মস্তান ছিল ওদের নেতৃত্বে । আমরা অনেকখানি বিরক্তির সাথে ওদের নাম উচ্চারণ করতাম। মানসিক তফাৎ ছিল হাজার মাইলের।
একদিন ঐ বন্ধুরে ত্যাক্ত হইয়া কইলাম-‘ দোস্ত, তুই এত মেধাবী ছাত্র। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হইতাছস। ধর গিয়া , পাশের অই মস্তানদের মধ্যে একজন সমকামী আছে। সে তোরে, সন্ধ্যার সময় কিডনাপ কইরা তোর পুটু মাইরা দিলো! ‘
তোর শারিরীক ক্ষতি হয়তো তেমন কিছু হইল না। কিন্তু তোর যে মানসিক বিপর্যয় হবে ; সেইটা অপূরনীয় ! সারাজীবনের জন্য তুই সমাজে অচ্ছুৎ, বিকলাঙ্গ হয়ে বেচেঁ থাকবি।
বন্ধু ব্যাপারটা ভিজুয়ালাইজ করলো কিনা জানিনা। কিন্তু এর পর আর কখনো তারে ধর্ষণ নিয়া রসিকতা করতে দেখি নাই।
প্রকাশকালঃ ১৭ই জানুয়ারি, ২০১৭
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
গতকল্য ১৯শে জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ টোনা টুনির ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী ছিল। যথারীতি সারাদিনের কর্মস্থলের চাপে পিষ্ট হইয়া টোনার গৃহে প্রবেশ। ম্লান সম্ভাষণে সন্ধ্যার শুরু। যেহেতু, অধুনা শহর ঢাকায় আনন্দ বিনোদন উদযাপনের দুইটি মাত্র পথ খোলা রহিয়াছে। হয়, নিজ গৃহে আরো কিছু ঘনিষ্ঠজনকে ডাকিয়া ঘৃত তৈল মিশ্রিত খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন। অথবা আশেপাশের কোন খাদ্য সরবরাহকারী দোকানে যাইয়া গুচ্ছের অর্থ খরচ করিয়া ভক্ষণ।
গত রজনীতে টোনা টুনির বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী করুণাবশতঃ নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। দুই ছোট টুনটুনিকে লইয়া টোনা ও টুনি রেস্তোরাঁয় আপ্যায়িত হইতে গিয়াছিল।
কথা তাহা নহে ! প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি টোনা টুনির বিবাহিত জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও ভালোবাসার অন্তঃসলিল ধারা একইসঙ্গে বহিয়া চলিয়াছে।
বিবাহের প্রাক্বালে টোনা, টুনিকে সান্ত্বনা দিয়াছিল । যেহেতু, বিশেষ সামাজিক দিবসগুলোতে কোথা হইতে যেন টোনার কপালে রাজ্যের ঝামেলা ও জঞ্জাল আসিয়া জোটে। সেইহেতু , বিশেষ দিবসের যথাযথ প্রাপ্য, টোনা টুনিকে অন্য কোন সাধারণ দিনে উদযাপনে ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিল। অদ্যাবধি, টোনা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। টুনিও গত্যন্তর না দেখিয়া ইহা মানিয়া লইয়াছে!
সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর শুভকামনা জানাইবার সময়, টোনা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ আমাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ এই দীর্ঘ ১৬ বছর যেমন তেমন করিয়া হইলেও সংসার তো করিতেছি!’
টুনি তদপেক্ষা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ বরং আমাকেই বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ। টোনার মতো বেহিসাবি, ছন্নছাড়া, নির্বোধের সঙ্গে অদ্যাবধি ঘরসংসার করিয়া চলিতেছি বলিয়া !’
জ্যেষ্ঠা টুনটুনি মৃদু হাসিয়া মধ্যবর্তিনী হইয়া কহিল, ‘ কাহাকেও পুরস্কৃত করিবার প্রয়োজন দেখিতেছি না ! প্রতিটি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীতেই এবম্বিধ বাক্যাবলী হইয়া থাকে !’
মনে বুঝিলাম, আমাদের সেইদিনের ছোট্ট টুনটুনি বড়ো হইয়া গিয়াছে। নহিলে , জগতের এই স্বাভাবিক সত্য সে এতো সহজে কী করিয়া বুঝিয়া ফেলিল !
প্রকাশকালঃ ২০শে জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
২০০১ সালের এক বিষণ্ণ শীতের বিকালে আমরা পৌঁছালাম আমার হবু জীবনসঙ্গিনীর বাড়িতে; কুমারখালী কুষ্টিয়ায়। তারপর নানা আয়োজন উপচারের ভিতর দিয়ে সামাজিকভাবে আমাদের জীবনের শুরু।
প্রথমদিকের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখতেন বরকনের দুই পিতামাতা। নিজের বড়ভাই-ভাবী এবং জনৈক গহনার দোকানদার ; যার কাছ থেকে গহনা কেনা হয়েছিল। প্রায়শ: ব্যাংক থেকে ফরমেটেড শুভেচ্ছা আসতো। আব্বা-আম্মা প্রয়াত হওয়ার পরে শুভেচ্ছা জানানোর জনসংখ্যা গেল কমে।
চতুর্দশী বড় কন্যা রাত বারোটায় এসে হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জানিয়ে চমকে দিল ! বোধ করি বাকী জীবনে একজন শুভেচ্ছা-দাত্রী বাড়ল।
বাস্তবতা ১ : সত্য সবসময় সুন্দরই হয় না ; অনেকাংশে তা অশ্লীলতার সীমারেখায় ঘোরাফেরা করে ! দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।
‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’
বাস্তবতা ২ : অনেক আগে শোনা, স্মৃতি থেকে লিখছি।
এক ডাক্তারের ডাক পড়েছে শীতের গভীর রাতে। বহু কষ্টে লেপের ভিতরে থেকে বেরিয়ে রোগীর বাসায়। কিছুক্ষণ রোগীকে দেখে তিনি বললেন, ‘আপনাদের আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন খবর পাঠান, আসতে বলেন!’
রোগীসহ সবাই বুঝে গেলেন, আর বেশি সময় নেই ! যথারীতি সবাইকে খোঁজ দেওয়া হল।
সবাই এলে, উৎসুক কেউ একজন জানতে চাইলেন, ‘রোগীর অবস্থা কি খুব খারাপ ! আর কতক্ষণ সময় আছে ?’
ডাক্তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন, ‘না, না রোগী একদম সুস্থ, কোন আশংকা নেই!’
‘তবে যে আপনি সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে ডেকে পাঠালেন !’
ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘এই গভীর রাতে এইরকম একটা আনন্দের সংবাদ আমি একা একা সেলিব্রেট করব, সেটা কী ঠিক হবে ! তাই সবাইকে ডাকা, সবাই মিলে সেলিব্রেট করেন !
ডাক্তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন।
তো, বাস্তব জগতের ৩/৪ জন মাত্র আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখে।
অথচ, আমি চলছি এক অদ্ভুতুড়ে অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল জগতের ভিতর দিয়ে। যেখানে বাস্তব মানুষগুলোর চেয়ে বেশি সময় কাটছে এঁদের সঙ্গে। আমি সারাদিন ধরে এঁদের নানা ঢংয়ের নানা ধরণের সেলিব্রেশনের ছবিতে লাইক কমেন্ট করি। বিবাহ বার্ষিকী, অন্নপ্রাশন , হাতেখড়ি, প্রথম স্কুলে যাবার দিন, বাচ্চার জিপিএ ফাইভ, প্রথম প্রপোজালের দিন, প্রথম ব্রেকাপের দিন, বাচ্চার প্রতিটি জন্মদিন ও স্কুলের প্রতিটি সাফল্যের সেলিব্রেশন,তাঁদের মামাতো , কাকাতো ফুফাতো, জ্যাঠাতো ভাইবোনের সব সাফল্যের সেলিব্রেশনে আমি অংশগ্রহণ করে থাকি। একই ভাবে, তাঁদের রক্তদানের ছবি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহা উঁহু গেলামরের সেলফির ছবিতে ; শ্বশুর, চাচা, বাবা, ফুফা, ভাইবোন, কাকা কাকী, মামা মামী জগাই মাধাই সবার মৃত্যু সংবাদে স্যাড ইমো দিই, সমবেদনা জানাই।
তো আমার সেই কাছের ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক বেদনাঘন দিনের ১৯তম বার্ষিকীতে কিছু সমবেদনা তো আশা করতেই পারি। যদিও সব লাইক কমেন্টস ভার্চুয়াল হবে। আমি যেমন কাউকে একগোছা গোলাপ কখনো পাঠাইনি, কী করে আশা করি আমি পাব !
অতঃপর কোন এক গোধূলি বেলায় আমার প্রয়াত আম্মার কথা প্রসঙ্গে আমার সহধর্মিণীকে বলেছিলাম, ‘ জানো, আম্মা আমার জীবনের দুইটা অসাধারণ ভালো কাজ করেছে।
সে জিজ্ঞেস করল কি কি ?
প্রথমটি, আমাকে এই অসাধারণ পৃথিবীতে এনে। তাঁর প্রতি এই কৃতজ্ঞতা আমৃত্যু থাকবে।
দ্বিতীয়টি , তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করে। তুমি না থাকলে, আমি কোথায় ভেসে যেতাম।
প্রথম কথায় তাঁর কোন রিঅ্যাকশন ছিল না।
দ্বিতীয় কথায় আমার সহধর্মিণী অবিশ্বাসের সরু চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। আমি বুঝে গেলাম , নারীর বিশ্বাস অর্জন কোন পুরুষের পক্ষে একজীবনে সম্ভব না !
প্রকাশকালঃ ১৯শে জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
সরকারের কোন হিসাবেই আমার বা আমাদের আস্থা নেই ! শোনা যায় বাংলাদেশের ৭০ ভাগের কাছাকাছি লোক নাকি স্বাক্ষর। এর মধ্যে খুব সামান্য একটা জনগোষ্ঠী টেক্সট বুকের বাইরে কিছু পড়ে অথবা পড়ে না। আবার তার চেয়েও সামান্য একটা অংশ ফিকশন বা নন ফিকশন কিছু পড়ে। আর ক্ষুদ্রতম একটা অংশ পড়ার পাশাপাশি লেখালেখি করে বা চেষ্টা করে।
এখন ধরেন, অন্যদের কথাবার্তা শুনে শুনে –আমি নিজেকে তাদের একজন বলে গণ্য করে ফেললাম ! এবং এটা সেটা পড়াশোনা করে, পুরনো ধ্যানধারণার উপর ভিত্তি করে, রূপান্তর করে নতুনের মতো কিছু একটা দাঁড় করলাম।
ধরেন সেই লেখার যৎসামান্য ভ্যালু আছে অথবা নাই। না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
গুগল বলছে, এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ১৩ কোটি বই লিখিত হয়েছে। ১০ হাজার বছরের পুরনো বই রক্ষিত আছে মাত্র ৩টি !
৫ হাজার বছরের পুরনো বই আছে, ৫১ টি, হাজার বছরের পুরনো বই ২১৩টি। এখন এই ১৩ কোটি বইয়ের জীবনকাল কয়েকশ বছর পরে কী হতে পারে, আন্দাজ করা যায়।
১০ বছর আগেও প্রতিবছর বই প্রকাশিত হতো সারাবছরে মাত্র ২ লক্ষ !
এখন প্রতিবছর বই প্রকাশিত হচ্ছে ২০ লক্ষ ! জ্ঞানের বিশাল প্রবাহে আমাদের সমকালীন পৃথিবী।
মূল কথায় আসি, আমার সন্তান সে কালো হোক,বোঁচা হোক আমার সন্তান। আমার যেহেতু সৃষ্টি , আমার কাছে তো তা মূল্যবান মনে হতেই পারে। মহাকালের প্রেক্ষিতে যেহেতু আমি, আপনি ও আমাদের সন্তানেরা কেউই থাকবে না; তার মূল্য ও মূল্য-হীনতার প্রশ্ন অবান্তর।
পনেরো আনা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ ছাগলের যতটুকু শিং আছে, তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙের পনেরো আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি। ময়ূরের লেজ যে কেবল রংচঙে জিতিয়াছে, তাহা নহে— তাহার বাহুল্যগৌরবে শালিক-খঞ্জন-ফিঙার পুচ্ছ লজ্জায় অহরহ অস্থির।……… জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। কারণ, যাওয়া চাই। যাওয়াটাই একটা সার্থকতা। নদী চলিতেছে— তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং আমন-ধানের খেতে ব্যবহার হইয়া যায় না। তাহার অধিকাংশ জলই কেবল প্রবাহ রাখিতেছে। আর-কোনো কাজ না করিয়া কেবল প্রবাহরক্ষা করিবার একটা বৃহৎ সার্থকতা আছে। তাহার যে-জল আমরা খাল কাটিয়া পুকুরে আনি, তাহাতে স্নান করা চলে, কিন্তু তাহা পান করে না; তাহার যে-জল ঘটে করিয়া আনিয়া আমরা জালায় ভরিয়া রাখি, তাহা পান করা চলে, কিন্তু তাহার উপরে আলোছায়ার উৎসব হয় না।………
আমরা যাহাকে ব্যর্থ বলি, প্রকৃতির অধিকাংশই তাই। সূর্যকিরণের বেশির ভাগ শূন্যে বিকীর্ণ হয়, গাছের মুকুল অতি অল্পই ফল পর্যন্ত টিঁকে। কিন্তু সে যাঁহার ধন তিনিই বুঝিবেন। সে-ব্যয় অপব্যয় কি না, বিশ্বকর্মার খাতা না দেখিলে তাহার বিচার করিতে পারি না। আমরাও তেমনি অধিকাংশই পরস্পরকে সঙ্গদান ও গতিদান ছাড়া আর-কোনো কাজে লাগি না; সেজন্য নিজেকে ও অন্যকে কোনো দোষ না দিয়া, ছটফট না করিয়া, প্রফুল্ল হাস্যে ও প্রসন্ন গানে সহজেই অখ্যাত অবসানের মধ্যে যদি শান্তিলাভ করি, তাহা হইলেই সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই যথার্থভাবে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করিতে পারি।……
সকল ঘাস ধান হয় না। পৃথিবীতে ঘাসই প্রায় সমস্ত, ধান অল্পই। কিন্তু ঘাস যেন আপনার স্বাভাবিক নিষ্ফলতা লইয়া বিলাপ না করে— সে যেন স্মরণ করে যে, পৃথিবীর শুষ্ক ধূলিকে সে শ্যামলতার দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে, রৌদ্রতাপকে সে চিরপ্রসন্ন স্নিগ্ধতার দ্বারা কোমল করিয়া লইতেছে। বোধ করি ঘাসজাতির মধ্যে কুশতৃণ গায়ের জোরে ধান্য হইবার চেষ্টা করিয়াছিল— বোধ করি সামান্য ঘাস হইয়া না থাকিবার জন্য, পরের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিয়া জীবনকে সার্থক করিবার জন্য তাহার মধ্যে অনেক উত্তেজনা জন্মিয়াছিল— তবু সে ধান্য হইল না। কিন্তু সর্বদা পরের প্রতি তাহার তীক্ষ্ম লক্ষ নিবিষ্ট করিবার একাগ্র চেষ্টা কিরূপ, তাহা পরই বুঝিতেছে। মোটের উপর এ-কথা বলা যাইতে পারে যে, এরূপ উগ্র পরপরায়ণতা বিধাতার অভিপ্রেত নহে। ইহা অপেক্ষা সাধারণ তৃণের খ্যাতিহীন, স্নিগ্ধসুন্দর, বিনম্র-কোমল নিষ্ফলতা ভালো।”
শতভাগ অথবা প্রবল সম্ভাবনা আছে, আমার কাছে যে চিন্তাটি নতুন মনে হচ্ছে ; গভীর আবেগে আমি সারা দিনরাত ব্যয় করছি যে চিন্তার পিছনে ; সেটা ঐ ১৩ কোটি বইয়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অসংখ্যবার লিখিত হয়েছে।সুতরাং আমার নব আবিষ্কৃত আবেগ ও ধ্যানধারণা বহু আগেই বাতিলের খাতায় চলে গেছে। যারা সত্যিকার সৃষ্টিশীল যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ষোল আনার মধ্যে এক আনা, প্রয়োজনীয় —তাঁদের কথা বাদ দিয়ে , যারা বাকী পনেরো আনা, এই আমার মতো—তাদের কেউ, যদি সবার মিথ্যা প্ররোচনায় বা অনুপ্রেরণায় কষ্টেসৃষ্টে একটা বই প্রকাশ করেও ফেলে, সেটা আসলে অর্থহীন। বছর দশেক পরে, আমার কন্যাদের স্তূপীকৃত নানা বইয়ের ফাঁকে সেই বইয়ে ধুলো পড়বে। জেলা শহরের অখ্যাত কোন লাইব্রেরিতে শেষের সেলফের উপরের সারিতে মাকড়সার জালের সঙ্গে তার সহাবস্থান হবে। তারপর, দুই দশক পরে এই প্রয়োজনীয় পৃথিবীর কাছে সেটা আবর্জনার বাইরে আর কিছু না !
তাহলে আমি কি লেখালেখি করব না ?
লেখালেখির একটা উদ্দেশ্য তো থাকেই নতুন করে কিছু বোঝার চেষ্টা করা। অথবা অন্যদের চিন্তাগুলো নাড়াচাড়া করে নিজের সময়ের প্রেক্ষিতে নিজের মতো করে কিছু বলা। সমকালে সেটার দাম থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।
তাহলে আমি কেন লিখব ?
নিজের জীবনের এই সামান্য সময়, ১৩ কোটি বইয়ের মাঝে, আরেকটি বই বাড়িয়ে কেন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট করব ? আমার লেখালেখি যদি আমার প্রজন্মকে নতুন কিছু চিন্তা করাতে নাই পারে, বৃথা কেন কষ্ট করব আমি ?
নাকি শুধুমাত্র নিজের আনন্দের জন্য লিখব, প্রকাশিত হওয়ার আনন্দে লিখব?
এটাতো ঠিক যে, বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জীন আমরা বয়ে নিয়ে চলছি গত ৪৪ কোটি বছর ধরে ! প্রকৃতি চেয়েছে প্রাণের ধারাবাহিকতা রক্ষা হোক। হোক তার সৃষ্টির প্রায় পুরোটাই অর্থহীন, মূল্যহীন। কিন্তু এই প্রবণতা না থাকলে তো সৃষ্টির উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্য রক্ষিত হবে না ! আমার ছোটমামা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং এর সিনিয়র প্রফেসর, বাংলাদেশের জেনেটিক্স জগতের ওস্তাদ মানুষ। আমাকে হাসতে হাসতে একদিন বলছিলেন, ‘বুঝলা ভাগ্নে, প্রাণী যাতে বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সেজন্য প্রকৃতি তাদের যৌনমিলনে আনন্দ দিয়ে দিয়েছে। এক কাজে দুই কাজ হয় ! প্রকৃতির স্বার্থও রক্ষিত হয় ; আবার প্রাণীরাও আনন্দ চিত্তে সেটা করে !’
লেখালেখির ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কি তাই না ? হয়তো কিছু সফল সৃষ্টির অপেক্ষায় , এক আনা প্রয়োজনীয় লেখার জন্য বাকী পনেরো আনাদের নিয়ে প্রকৃতির এই বিশাল আয়োজন। সেই অর্থে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় লেখালেখির দরকার। তা না হলে, কারো কারো শ্রেষ্ঠ লেখাটা রচিত হবে না ; আর সেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছুতেও পারবেন না।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, দুইটা উদ্দেশ্যেই লেখালেখি করা দরকার। প্রকৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আর নিজের আনন্দের জন্য।
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
আপনি থেকে তুমি আর তুমি থেকে তুই সম্বোধনে আসতে কিছুটা সময় লাগে আমার।
আমাদের মিরপুরের মহল্লায় ৮৬ ব্যাচের সবাইকে ভাই বলতাম। ৮৭ ব্যাচের একজন ছিল, সে আমাদের সঙ্গেই চলত, সুতরাং তুমি। আর ৮৮, ৮৯, ৯০ আর ৯১ ব্যাচে আপনি সম্বোধনের বালাই ছিল না। কেউ কাউকে তুমি বলেছে তো আরেকজন বলেছে তুই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রেগুলার ব্যাচে কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হয়ে দেখলাম, ৮৯ ব্যাচের অনেকে আছে। সেটা তাঁদের সমস্যা, ইয়ার লস তো আমি দিই নাই। তাই রেগুলার ব্যাচের সঙ্গে সঙ্গে ৮৯ ব্যাচের সবাইকে তুমি, তুই বলে চালিয়েছি।
একই সমস্যায় পড়লাম আমি যখন ইয়ার লস দিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলাম ৯১ ব্যাচের সঙ্গে !এক ব্যাচ জুনিয়র ছেলেরা তুই তোকারি করত ! হা হা হা ! অবশ্য, আশার কথা ক্লাস শুরু হওয়ার পরে দেখা গেল আমাদের সঙ্গে রেগুলার ব্যাচের ছেলেদের চেয়ে ‘ধরা খাওয়া’ ব্যাচ বেশি। সুতরাং আমাদের তুই তোকারি নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হল না।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে, দুই কিশোরীকে পেলাম , ওদেরকে তুমি থেকে তুই বলতে বছর-খানেক লাগল।
এই যে জড়তা সেটা কিন্তু অনেকের নাই। শুধুমাত্র প্রথম পরিচয়ে আরেক ব্যাচ মেটকে তুই বলার মতো স্মার্টনেস আমার নেই। মাস খানেক আগেও ৯০ ব্যাচের এক সেনাকর্মকর্তা বন্ধুর বাসায় ঘরোয়া আড্ডা। সে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর লং কোর্সের আরেক উচ্চপদস্থ বন্ধুর সঙ্গে।এদের একজন ৯০ ব্যাচের আরেকজন ৮৯ ব্যাচের। দুইজনকেই আপনি বলে শুরু করে শেষে তুমি বলে বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম। হুট করে তুই-তে নেমে আসতে হলে আরও কয়েকটা আড্ডা দরকার।
কর্পোরেট চাকরিতে আছি প্রায় ২১ বছর ধরে। এমন অনেক মালিকের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে, যারা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু স্যার বা বস বলা ছাড়া তো উপায় নেই ! যদিও তিনিও ভদ্রতা রেখে জাহিদ ভাই বা আপনি করেই বলেছে।
আবার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করছি, স্বভাবতই আপনি সম্পর্ক। কিন্তু , বছর দুয়েকের মাথায় জানা গেল, সে আমার ৯০ ব্যাচেরই। কিন্তু তখন সম্বোধনের যে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, তা আর ভাঙ্গা হয়ে ওঠেনি।
উল্টোটাও হয়েছে অনেকবার। ওপেক্স গ্রুপে কাজ করার সময়, আমাদের সহকর্মী ছিল ৮৪,৮৫,৮৬ ব্যাচের কয়েকজন। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা এমন পর্যায়ের ছিল, একে অপরকে তুই বলে চালিয়েছি। অফিসের চিপায় এক সিগারেট ভাগ করে খেয়েছি, আর দুইজনের দুই বস যে আসলেই খাঁটি বাঞ্চোত ও চুতিয়া সে ব্যাপারে একমত হয়েছি।
আমি বিয়ে করলাম ২৮ বছর বয়সে ২০০১ সালে। আমার পাশের ডিপার্টমেন্টে সঙ্গে জাহাঙ্গীর নগরের গণিত বিভাগের এক আদম কাজ করত। সম্ভবত: ও ৮৫/৮৬ ব্যাচের। ওর সঙ্গে আমার কাকা-কাকা সম্পর্ক কেন যে হয়েছিল জানি না। ও আমাকে কাকা বলত, আমিও তাই।
তো, আমার বিয়ের কথা শুনে সে বলল, খালাম্মাকে বল আমার জন্যেও একটা মেয়ে দেখতে। আমি বললাম, তুই তো বুইড়ারে। তোরে মেয়ে দেবে কে, বয়স তো ৩৬ পার হয়ে গেছে তোর ! আম্মা মেয়ে দেখতে গেলে প্রথমেই তো পাত্রের বয়স জিজ্ঞেস করবে।
সে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, খালাম্মাকে বলিস আমার ৩২ বছর চলছে !
আমি বললাম, সেটা কী করে হয় !
সে আরো সিরিয়াস ভঙ্গীতে জবাব দিল, শোন্ জাহিদ বিয়ের বাজারে পাত্রের বয়স কখনোই ৩২ পার হয় না !
টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি আর গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজে আমার সঙ্গে কাজ করেছে, আমার চেয়ে জুনিয়র কিন্তু অসাধারণ মেধাবী কয়েকজন। তাঁদের অনেকেই সত্যিকারের এন্ট্রাপ্রেনার। অনেকে সঠিক সময়ে চাকরি ছেড়ে বিশাল কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। চাকরি করার সময় তাঁদের সাথে আপনি আপনি সম্পর্ক ছিল। এখনো আছে। শুধুমাত্র আমার এসএসসি পাশের সাল তাঁর চেয়ে এগিয়ে আছে– সেই অনধিকার চর্চায় তাঁকে আমি কখনোই তুমি বলতে পারি নি। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা আপনিতেই আটকে আছে।
আবার ট্রেডিং অফিসে এখনো আমার কয়েকজন সহকর্মী আছেন, যারা ৮২ থেকে ৮৬ ব্যাচের। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠিতে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে নানা কারণে আমি তাঁদের উপরে চলে এসেছি। আমি ‘ অমুক সাহেব’ বা শুধু ‘অমুক’ বলে ডাকলেও –তাঁরা দূরত্ব বজায় রেখে আমাকে ‘জাহিদ ভাই’ বলেছে এবং বলছে। আমি এভাবেই অভ্যস্ত। হুট করে শুধু বয়স বা ব্যাচের অজুহাতে কাউকে তুমি বলা আমার হয়ে ওঠেনি। হোক সে আমার ব্যাচের অথবা নিচের।
উল্লেখ্য, একবছর জলাঞ্জলি দিয়ে যখন ৯১ ব্যাচের সঙ্গে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, আমার নিজের ব্যাচের ঢাকা কলেজের অথবা পূর্ব পরিচিত ৯০ ব্যাচের সবাইকে তুই তোকারি করেছি ঠিকই । কিন্তু রেগুলার ব্যাচের কারো কারো সঙ্গে তো দূরত্ব ছিলই; তাঁদেরকে ভাই , আপনি বলে চালাতে হয়েছে। যদিও রেগুলার ব্যাচের একজন এই গ্রুপে আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, জাহিদ আর আপনি বলতে হবে না, তুমি বইল !
এতো গেল পুরুষ মহলের কাহিনী। নারীমহলে আমার অবস্থা আরো শোচনীয়!
আমার দশ বছরের জুনিয়র যে ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় আছে, তাঁকে আপনি বলতে আমার কখনোই বাঁধেনি। কয়েকজন লেখক লেখিকা আছেন, দারুণ তাঁদের লেখা। জানি তাঁরা বয়সে আমার ছোট বা সমবয়সী। কিন্তু সেই অজুহাতে আমি তাঁদেরকে কখনোই তুই দূরে থাক, তুমিও বলিনি।
অন্যদিকে অনেক ধনকুবের বয়স্ক গার্মেন্টস মালিক আছেন যারা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর, জিএম সবাইকে তুমি বলে অভ্যস্ত ; তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ইচ্ছে করেই অন্য অফিসের কর্মকর্তাদের তুমি বলে একটা ডমিনেটিং অ্যাডভান্টেজ নিতে চান। আমি তাঁদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে চলেছি। আমার চেয়ে বয়সে ও পজিশনে বড় কেউ যদি আমাকে তুমি বলে ভাল বোধ করেন, করুক না , আমি সমস্যা দেখি না। বরং তাঁদের এই তুমি বলার অ্যাডভান্টেজ আমিও নিয়েছি। বড় কোন সমস্যায় সিনিয়র ভাইয়ের কাছে যেমন করে আবদার করা যায়, আমিও আবদার করে আমার কাজ উদ্ধার করেছি। তবে, আমার চেয়ে বয়সে ছোট কেউ এখন পর্যন্ত আমাকে হুট করে তুমি বা তুই তোকারি করেনি এই যা রক্ষে !
৯০ ব্যাচের একটা ‘সমগ্র বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে। আমাকেও কেউ সংযুক্ত করেছে । আগের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সাথে নানা জেলার অনেক বন্ধু-বান্ধবীর সম্মিলন। সদ্য পাওয়া বন্ধু ও বান্ধবীদের কাছে আমার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করলাম।
এই আপনি , তুমি , তুই ব্যালেন্স করে করেই পেশাগত ও সামাজিক জীবনে আমার তিন দশক চলে গেছে । আমার মতো কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে, যে হুট করে তুমি বা তুইতে নামতে পারে না। কিছুটা প্রাচীনপন্থী । আবার আধুনিক ও আধুনিকারাও আছে, যারা অনেক স্বচ্ছন্দ– সম্পর্কের এই গভীরতা বৃদ্ধিতে। যাই হোক, আমার মতের সঙ্গে হয়তো কেউ একমত পোষণ করবে, অনেকেই করবে না ; সেটাও আমি জানি।
সবার জন্য শুভকামনা !
প্রকাশকালঃ ৩রা জানুয়ারি, ২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য