by Jahid | Nov 26, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার,সহজ করে তোলার অনেক চমৎকার উপায় আছে।
প্রতিনিয়ত ধাক্কা খেতে খেতে আমাকে শিখতে হয়েছে সেটা ! ক্যারিয়ারের একটা পর্যায় ছিল, সারাক্ষণ ত্রস্ত থাকতাম কখন জানি কী হয় ভেবে ভেবে । যতো দিন যাচ্ছে শিখেই চলেছি। নানাভাবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। হ্যাঁ , আমি বিশ্বাস করি … লার্নিং ইজ এ নেভার এন্ডিং প্রসেস ! এই যেমন , সমস্যাকে শুধুই ‘সমস্যা’ হিসাবে দেখা শিখতে অনেক সময় লেগেছ ।
মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট সারাক্ষণ সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের কাছে সব সমস্যা উগড়ে দিতে চায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পছন্দও করে। সব সমস্যায় তাঁরা আপডেট থাকতে পারলে ভাবে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য ! যদিও প্রাত্যহিক সমস্যার সেই তীব্র প্রেশার কিন্তু মিড লেভেল ম্যানাজারদেরকেই নিতে হয় !
কিছুদিন আগে একটা কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ল , কোন একটা ওয়েবে। ভালো লেগে গেল । এটা সমস্যাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটু বদলে দিয়েছে আমার। সমস্যার সংজ্ঞা একজন ম্যানেজারের কাছে কি হওয়া উচিৎ ?
“If you can’t tell me what you’d like to be happening, he said, you don’t have a problem yet. You’re just complaining. A problem only exists if there is a difference between what is actually happening and what you desire to be happening.”
সতীর্থ কলিগদের অন্য উদাহরণ দিয়া বোঝাই। ধরেন আপনার শিপমেন্ট দেরী হয়েছে । সেটা এসে সিনিয়র ম্যানেজারকে বললেন। তাহলে , ব্যাপারটা কি দাঁড়াচ্ছে ? আপনি কি চান ? সে এই দুরবস্থা থেকে ম্যাজিক দিয়ে তিনি সব ঠিক করে ফেলবেন ! আপনি নিজে কি জানেন এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কি কি উপায় আছে? আপনি কি জানেন কি কি হওয়া উচিৎ ? যদি জানেন কি করতে হবে, তাহলে তো এটা কোন সমস্যাই না ; যেহেতু সমাধানের উপায়টা আপনার জানা আছে।
আরেকদিকে ধরেন, চৈত্র মাসের গরম, ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম, ধুলাবালি, হরতাল, দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আপনি কথা বলতেই পারেন। কিন্তু , এগুলো কি আপনার একার সমস্যা? না এগুলো সমস্যা না, এগুলো একধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এবং আপনি যখন এই প্রসঙ্গগুলি নিয়ে কথা বলছেন , সেটা হচ্ছে অভিযোগের ভঙ্গীতে ! এগুলো সিম্পলি কমপ্লেইন। কেন এগুলো সমস্যা না ? কারণ , আপনি আসলে জানেন না কী হওয়া উচিৎ।এটা আপনার কন্ট্রোলে নাই । আপনার জানা বা চাওয়া দিয়ে এগুলোর কোন সমাধানও নাই ! বরং আপনি এই পরিস্থিতিগুলোর সাথে অ্যাডজাস্ট করতে পারেন,মেনে নিতে পারেন।
আমি আরেকটা উদাহরণ সচরাচর আমার সহকর্মীদের দিই। বলি, আমার নিজের জীবনের বড়ো একটা শিক্ষা হচ্ছে– “ Changing yourself is much more easier than changing the whole world.”
আসলে আমাকে কাজ করতে হয় কিছু উচ্চশিক্ষিত উচ্চাভিলাষী তরুণদেরকে নিয়ে। যারা প্রত্যেকে আমাদের জেনারেশনের চেয়ে মেধাবী ও সংবেদনশীল। কিন্তু আমাদের জীবন তো তাঁদের মতো এতোখানি ডিজিটালাইজড ছিল না। আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ বিঘ্নকারী ছিল টিভি ! এছাড়া বই ও আড্ডাকে আমরা পজিটিভলিই নিয়েছিলাম।
এখন নবীন প্রজন্মের জীবন ও জীবনযাত্রা এতো বেশী জটিল হয়ে গেছে; চাইলেও তাঁদের মনোযোগের শতভাগ কাজের ক্ষেত্রে দিতে পারেন না তাঁরা। দারুণ একটা বৈপিরিত্যময় সময়ের তরুণদের সঙ্গে আমাকে চলতে হয়। আমার অভিজ্ঞতার কিছুটা পুরনো এবং অনেকখানিই তাঁদের ডিজিটাল যুগে অকার্যকর হয়ে গেছে জেনেও অনবরত বাচালের মতো কথা বলে চলি।
by Jahid | Nov 26, 2020 | ছিন্নপত্র
ছোটবেলায় আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র মানেই রনি ভাইয়ের মতো বেশী পাওয়ারের চশমা পড়া ভালো ছাত্র কেউ একজন। ১৯৭৯-তে আমরা মিরপুর পাইকপাড়াতে ভাড়া থাকতাম। বাড়ীওয়ালার ছোট-ছেলে রনিভাই ঢাকা কলেজের ছাত্র আর বুয়েটের জন্য পড়াশুনা করতেন। রাজ্যের এলোমেলো বই , গ্লোব , খেলনা, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে রুম ভরা। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলেন। ভুলন ভাই আর রনিভাই ছিল পিঠাপিঠি এবং তাঁদের বালখিল্য সুপারম্যান ও টারজানের লড়াইয়ে আমি রেফারিং করতাম। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে যে, পেটে বিদ্যা লাগে এইটা বুঝতাম।
পরে বড়-ফুফুর বাড়ীতে অন্তর্বর্তীকালীন থাকা অবস্থায় তাঁর ননদ নন্দিনী আন্টির দেখা। সম্ভবত: ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তাঁর ভাইয়ের বাড়ীতে ছুটি কাটাচ্ছেন আর পাত্রস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। উনার বিয়ে হয়ে গেল আরেক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। আবারো বুঝলাম সুন্দরী পাত্রী পেতে হলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে ! জীবনের যে কোন হিসাব নিকাশ থেকে শুরু করে সবরকম অংকেই আমি কাঁচা , সরল অংকের ফল সামনের বেঞ্চের তুহিনের যদি আসে ১ আমার আসে ১৪৫৩/১৮৫৬; কী মুশকিল !
পরিবারের চাপে ও সামাজিক এক্সপেকটেশনে বিজ্ঞান বিভাগে। তাছাড়া আমাদের সময় স্যাররাই ঠিক করে দিতেন রোল ১ থেকে ৩০ সাইন্স বাকীগুলো আর্টস বা কমার্স। নীচের কেউ যদি সাইন্সে পড়তে চায়, আব্বা-আম্মা সহ যোগাযোগ করতে হবে। আমি আবার ক্লাসে অংক, বিজ্ঞানে মাঝারি নাম্বার পেলেও বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, ভূগোলে উপরের দিকে থাকতাম। দেখা যেতো ফার্স্ট বয়, সেকেন্ড বয় অংক বিজ্ঞানে আমার চেয়ে ১৫ নাম্বার বেশী পেয়েছে। আর আমি অন্য আবঝাঁপ সাবজেক্টে তাঁদের চেয়ে ১০/১২ নাম্বার বেশী পেয়েছি। গড়পড়তায় ক্লাসে আমি আমি থার্ড ফোর্থ কিছু একটা হতাম।
আমার মেধা হয়তো সামাজিক সাহিত্যিক সাবজেক্টে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল।হলে কী হবে, সামাজিক চাপেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়া ! যদিও একটা পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান আমি ভীষণ এনজয় করেছি এবং এখনো করে চলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ, বঙ্কিম, মধুসূদন পড়ার জন্য বাংলা বিভাগে ভর্তি না হলেও চলে। কিন্তু , আপেক্ষিকতার সূত্র বোঝার জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা ভালো। একজন সাহিত্যের ছাত্র বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে পড়াশুনা করার বা উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু, একজন বিজ্ঞানের ছাত্রের সাহিত্যে উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী !
এমন হয়েছে, টিএসসিতে গণ আড্ডায় বসেছি, কলাভবনের ভাই-বেরাদররা এমনভাবে কথা বার্তা শুরু করলো যেন আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনি নাই। কেমন করে বোঝাই ওই ক্লাসিকগুলো আমরাও অনেক আগেই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু , আঁতলামি করতে মন চাইতো না । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি বলে যদি কেউ আমাকে সাহিত্যের মফিজ ভাবে, সেটা তাঁর সমস্যা, আমার না। আমি কি পড়েছি বা কি জানি সেটাতো প্রমাণ করার কিছু না। শেক্সপিয়ার, গ্যেটে , র্যাঁবো থেকে কোট করে কেউ যদি ভাবে সাহিত্যে তাঁদের একচ্ছত্র অধিকার, আমার কী করার আছে!
এইচএসসি দিয়েই আমি বুঝে গেছিলাম , বুয়েটে চান্স পাওয়ার চান্স কম! ৩/৪ মাসের সত্যিকারের পড়াশুনা করে এইচএসসি পাশ করা যায়। বুয়েটের জন্য আরও ঘাম ঝরাতে হয়। আমার টাইমিং ঠিক ছিল না। আই মিসড দ্য ট্রেন ! বুয়েটে ব্যর্থ হয়ে , অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ‘ক’ ইউনিটে ২৫০ এর পরের সিরিয়াল। কী মনে করে ‘ঘ’ ইউনিটেও পরীক্ষা দিলাম। যতদূর মনে আছে মেধাতালিকায় ২৯তম।মহল্লার বন্ধু বড়ভাইয়ের ব্যাপক উৎসাহ দিল- ‘আরে মিঞা , এইটাই তোমার লাইন, চোখকান বুইজা আই আর বা Economics এ পড়া শুরু করো এইগুলা খুব হট সাবজেক্ট। ভালোমতো রেজাল্ট করলে বিদেশী ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, মায় শিক্ষকতা কইরা বা , কনসালটেন্সি কইরাও হুলুস্থূল জীবন।’
সোজা ভাইবা বোর্ডে গেলাম। স্যারেরা জিজ্ঞাস করলেন , ‘তুমি ইকোনমিক্সে ভর্তি হলে থাকবে তো ? নাকি বিজ্ঞান অনুষদে চলে যাবে?’ আমি মুখ চোখ সেই রকম সিরিয়াস করে বললাম, ‘আমার অনেক দিনের স্বপ্ন স্যার অর্থনীতিতে পড়া!’ স্যারেরা একটা ভর্তি ফরমে অর্থনীতি বিভাগের স্ট্যাম্পিং দিয়ে বললেন , ‘যাও টাকা জমা দিয়া ভর্তি হও।’ ওইদিকে বিজ্ঞান অনুষদে প্রথমবারে পেলাম Statistics । বাসায় গিয়া ভয়ে ভয়ে আব্বাকে বললাম আমি Economics-এ পড়তে চাই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তোকে সাইন্স পড়েয়েছি কি Economics পড়ার জন্য ? আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা পড়ে এসেছি। Economics- আর্টসের সাবজেক্ট, এর সাথে সাইন্সের কী সম্পর্ক !’ আমি আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম বিজ্ঞান অনুষদের সাবজেক্ট ভালো পাই নাই, এর চেয়ে Economics ভালো । কিন্তু আমার তোতলামি ধোপে টিকলো না। তার পরেও অর্থনীতি বিভাগের ভর্তির ছাড়পত্র অনেকদিন আমি রেখে দিয়েছিলাম কাছে, মাঝে মাঝে খুলে দেখতাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম ! বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি হলাম পরিসংখ্যানে, অ্যানেক্স বিল্ডিং এ যাই মাঝে মাঝে। ক্লাস করি কী করি না , আর একই সাথে সম্ভবত: নজরুল ইসলাম হলের বুয়েটের এক বড়ভাইয়ের কাছে যাইয়া দ্বিতীয়বারের বুয়েট প্রিপারেশন নিই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহ তিনেক না যেতেই নোটিশ আসলো ,সামনের সীট ফাঁকা হয়েছে, আমি এখন ইচ্ছা করলে রসায়ন বিভাগে মাইগ্রেট করতে পারি। ভাবলাম, যাই, কেমিস্ট্রিই ভালো , সেই সঙ্গে কার্জন হলের আশে পাশে থাকতে পারা যাবে। কেমিস্ট্রিতে হুমায়ূন আহমেদ স্যার সম্ভবত: শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। ওইখানে কিছুদিন ক্লাস করতে করতে আবার নোটিশ সিরিয়াল এগিয়েছে ইচ্ছা করলে Applied Chemistry-তে মাইগ্রেট করতে পারব। ততদিনে এদিক সেদিক পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছি। ঢাকার বাইরে একটাও না। আমি ঢাকার বাইরে পড়তে যেতে কোনভাবেই রাজী ছিলাম না। ভাই-বেরাদারদের পরীক্ষায় সাহায্য করে বেড়াতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে জাহাঙ্গীর নগরে পরীক্ষা দিয়ে ইলেক্ট্রনিকস পেলাম। যাকে হেল্প করতে গিয়েছিলাম, তাঁর কিছুটা হেল্প করতে পেরেছিলাম ; আর সময় পেয়ে বসে না থেকে খাতা কমপ্লিট করেছিলাম।
তো, বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হয়ে সপ্তাহের একদিন দুইদিন কার্জন হলে যাই। ১২ টাকা দিয়া চিকেন বিরিয়ানি খাই, চৈতালিতে বাড়ী ফিরি। মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধবের সাথে ঢাকা মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে বা টিএসসিতে আড্ডা মারি। সপ্তাহে একদিন বুয়েটের নজরুল হলে যাই। সেই বড় ভাইয়ের কাছে কিছু মডেল টেস্ট দিই। আর বাকী চারদিন মহল্লার রেগুলার বছরে বুয়েটে চান্স পাওয়া আমাদের ব্যাচের সেশনজটের আটকা পোলাপানের সঙ্গে আড্ডা দিই।
এর মাঝখানে এক বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম তুইল্যা আনছি। তোমাগো হেল্প লাগবে, ৮/১০ জন একলগে ভর্তি ফর্ম জমা দিলে , আমি হেল্প পামু, য্যাম্নেই সীট পড়ুক না কেন !’ সেই ফ্রেন্ডই সবকিছু করলো। ভর্তি পরীক্ষার দিন ভুলে বসে আমি সকালে আরেক ফ্রেন্ডের বাসায় কার্ড পিটাচ্ছি। সে এসে ধরে নিয়ে গেল।যাতায়াতের ভাড়া, চা- সিগারেটের খরচ তার। তাঁকে কিছু হেল্প করতেও পারলাম। আমি নিজের খাতাও পূর্ণ করলাম। পরে দেখি, আমি মেরিট লিস্টে, কিন্তু বন্ধু ওয়েটিং লিস্টে !
ওই সময় আব্বাকে কেউ বোঝালো , টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই ভালো সাবজেক্ট । আমার জনৈক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আবার কোন টেক্সটাইলে যেন অনেক বেতনের চাকরি করেন। টেক্সটাইলে এক্সপার্ট লোকের অভাব আছে, চাহিদা অনেক। আমার ছোটমামারও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারে ভোট ছিল। আমি যতোই গাঁইগুঁই করি না কেন আব্বার ঝাড়ির চোটে তৎকালীন কলেজ অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি-তে ভর্তি হয়ে যেতে হল। ওইদিকে ওয়েটিং লিস্টের ফ্রেন্ডটাও জোরাজুরি করলো। তাছাড়া অনিশ্চয়তাও ভালো লাগছিল না। অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে গেলাম ভর্তি হয়ে টেক্সটাইলে। ওখানকার জীবন, হল লাইফ, সে আরেক কাহিনী।
আব্বা অনিয়মিতভাবে হিন্দি সিনেমা দেখতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই সময়ে যদি আমির খান থ্রি ইডিয়ট( 3 Idiots) ছবিটা বানাতো আর আমার আব্বা যদি কোনক্রমে সেটা দেখে ফেলতেন; তাহলে আজ হয়তো আমি একজন অর্থনীতিবিদ হতে পারতাম !
by Jahid | Nov 26, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
সেদিন ট্রেডের এক বড়ভাই আফসোস করে বলছিলেন , ‘বুঝলা জাহিদ, একসময় ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে অধীনস্থরা বুঝে শুনে চলত। রুমে ঢোকার আগে খোঁজ খবর নিত- বসের মুড কেমন আছে, ইত্যাদি।এখন আমাগো ম্যানেজাররাই উল্টা অধীনস্থদের সমঝে চলি ! যারা ব্যবসা এনে দিচ্ছে, এঁদেরকে নানারকম ‘স্নেহ’ দিয়ে প্রতিষ্ঠানে খুশী রাখতে হচ্ছে ! সেই স্নেহ তাঁদের অযাচিত দাবিদাওয়া থেকে শুরু করে, টেবিলের তলা দিয়ে নগদ অর্থ পর্যন্ত হয়ে থাকে!’
ওয়েল, আপনি যদি সেই ব্যবসা এনে দেওয়া কর্মচারী হয়ে থাকেন। বসের মেজাজ কেমন আছে , সেসব নিয়ে থোড়াই কেয়ার করবেন। কেননা, আপনি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বাকি সবাই ধইঞ্চা ! আপনার এনে দেওয়া ব্যবসায় সবাই দুইবেলার সাদা-ভাত খাচ্ছে, সেটা কেন আপনি ভুলে যাবেন বা অন্যকে ভুলতে দেবেন ?
আর যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় শ্রেণীর কেউ হন, যাকে মাস শেষের বেতন দিয়েই প্রতিষ্ঠান ভেবে থাকে, একে চাকরিতে রাখা হয়েছে এই দুর্মূল্যের বাজারে, এই তো কত ! তাহলে, আপনার জন্য সেই প্রাগৈতিহাসিক ম্যানেজমেন্টের নিয়ম ফলো করতে হবে। বেতন বৃদ্ধি, ছুটির দরখাস্ত যে কোন যৌক্তিক চাহিদাই হোক না কেন, বসের কাছে বা মালিকের কাছে সেটা উত্থাপনের আগে বুঝে নিন তাঁর মুড কেমন । ভুলে যাবেন না , আপনি ধইঞ্চা শ্রেণী থেকে উত্তরিত না হতে পারলে, খামোখা বসের ঝাড়ি খাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। একটু আগেই হয়তো আপনার মালিক সেই ব্যবসা এনে দেওয়া কর্মচারীর সঙ্গে হো হো হা হা করছিলেন। যেই না আপনি রুমে ঢুকে কোন কথা বললেন! ঊর্ধ্বতনের চেহারা বাংলা পাঁচের মতো হয়ে যাবে। ব্যবসা মন্দা,লোক ছাঁটাই ইত্যাদি নানা বাউল-সঙ্গীত শুরু করে দেবেন তিনি। একসময় দেখবেন আপনি যে কিছু যৌক্তিক দাবী নিয়ে এসেছিলেন সেটা ভুলে গিয়ে কতক্ষণে ওই ঝাড়ির হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবেন সেই চিন্তা করছেন। এটাই নিদারুণ বাস্তবতা !
আর যদি আপনি দুগ্ধ-প্রদানকারী প্রাণী হয়ে থাকেন। বসের বা মালিকের মেজাজ যাই থাক না কেন ; আপনাকে দেখা মাত্রই তাঁদের মেজাজ তবিয়ত শীতল হয়ে যাবে। কোনদিন যদি সামনে বসে ইয়েও করে ফেলেন আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, দুর্গন্ধের কথা ভুলে তাঁরা আপনার মল-মূত্রের হলদেটে সোনালী রঙ নিয়ে উৎফুল্ল হবেন।
by Jahid | Nov 26, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
ক্লাস সিক্সে থাকতে পড়েছিলাম, ‘Live your life in a way ; so you don’t have to hide your diary!’ ‘জীবনকে এমনভাবে যাপন করুন, যাতে আপনার ডায়েরী লুকোতে না হয়!’
স্কুলজীবনে কিভাবে কিভাবে যে দিনলিপি বা ডায়েরী লেখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল কে জানে ! সুবিধা ছিল ছোট্টমনের ব্যকুল কথাগুলো পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারতাম। মনের ভার কমে যেত।সেদিন দেখি কাঁচা হাতের লেখায় কয়েকটা ডায়েরী এখনো বুকশেলফের কোনায় পড়ে আছে। উল্টেপাল্টে দেখলাম, পড়াশোনার কথা, পরীক্ষার কথার সঙ্গে কিছু ছড়া-কবিতাতে ভরা। উচ্চমাধ্যমিকে উঠে পড়াশোনার চাপ ও নানাবিধ কারণে দিনলিপিতে আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
মিরপুরের আমাদের বাড়ীটি ছিল খানিকটা লঙ্গরখানার মত। আব্বা এবং আম্মা দুজনেই ছিলেন গ্রামের বাড়ীরে সঙ্গে ঢাকার একমাত্র যোগসূত্র। ঐদিকে বড়মামা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। প্রশাসনিক নানা কাজে দলবলসহ ঢাকার ছোটবোনের বাড়ীতে আসতেন। নিকট ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়রাও আসতেন বিদেশ-গামী কাউকে বিদায় দিতে। কেউ আসতেন শুধুমাত্র ঢাকা শহর দেখতে। এয়ারপোর্ট দেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশু-পার্ক , বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা ছিল অন্যতম বিনোদন-স্থান। চিড়িয়াখানা আমাদের বাসা থেকে মাইল তিনেক দূরে , সুতরাং আমাকে গাইডের ভূমিকা নিতে হত। অসংখ্যবার চিড়িয়াখানা যেতে যেতে এমনটি হয়েছিল, আমি চোখ বুজে হেঁটে হেঁটে বলে দিতে পারতাম বানরের খাঁচার ডানপাশ দিয়ে কত পা গেলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খাঁচা।
মেহমানদের অগ্রাধিকারে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো নিজের বিছানা তাঁদেরকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে ফ্লোরিং করতে হত। মেহমান থাকলে খুশীই হতাম। সকালের নাস্তায় রুটির জায়গায় পাকোয়ান ডালডা ভাজা পরোটা, হালুয়া,ডিমভাজা, গরুর মাংস ইত্যাদি।নাস্তা শেষে আম্মার হাতের সেই অসাধারণ দুধ চা। মেহমানের বিদায়ের আগের দিন একপ্রস্ত পোলাও মাংসের ফিস্ট অবধারিত! ওই সময়ে যেহেতু ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল, হয়তো মেহমানের উৎপাত নিয়ে কিছু একটা বেফাঁস লিখে রেখেছিলাম নিতান্তই ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি হিসাবে। অন্যের ব্যক্তিগত দিনলিপি পড়াটা অভদ্রতা সেটা আমি জানতাম ; আমার বড়মামা জানতেন না বা মানতেন না। উনি সেই ডায়রি অন্য সবাইকে পড়ে শুনিয়ে সে এক কেলেঙ্কারি !
ফেসবুককে কিছুটা সাম্প্রতিক তথ্যের মুচমুচে ম্যাগাজিন, কিছুটা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, কিছুটা লিটল ম্যাগাজিনের সুস্বাদু সাহিত্যের এবং সর্বাংশে ব্যক্তিগত দিনলিপির একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়। আমি ব্যক্তিগত দিনলিপির স্বগতোক্তির জায়গাটা ওইভাবেই প্রকাশ করি, যাতে স্বচ্ছতা থাকে বিব্রত না হতে হয়।
মূলত: মনুষ্য চরিত্র তেমন দুর্বোধ্য নয়। সামাজিকতার আত্মপ্রকাশে সে চাইবে সবচেয়ে সুশ্রী পোশাক, চেহারা ও আচরণে নিজেকে প্রকাশিত করতে। সেই রঙিন আলোর হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় আড়ালে ভঙ্গুর, একাকী,রিক্ত,ব্যর্থ-পরাজিত মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল !
প্রকাশকালঃ ২৩শে নভেম্বর,২০১৬
by Jahid | Nov 26, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার দুই টুনটুনির জ্যেষ্ঠাটির সহিত আমার আলাপচারিতা বা নৈকট্য খানিকটা বেশী। ছোট টুনটুনি কিঞ্চিৎ সেলিব্রেটি টাইপ হইয়াছে, যথোপযুক্ত বিষয় বা পরিবেশ-প্রতিবেশ না পাইলে, সে যাহার তাহার সহিত আড্ডার অর্গল না খুলিয়া বরং নীরব হইয়া থাকে। বিদ্যালয়ের পাঠাভ্যাসের খোঁজ লইতে গিয়া প্রসঙ্গান্তরে কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘পঞ্চম-শ্রেণী পড়ুয়ারা মধ্যবর্তী খাদ্যগ্রহণের সময় কি ধরণের আলাপ-আড্ডা করিয়া থাকে?’
টুনটুনি কহিল, গতকল্য তাহাদের আলোচ্য ছিল কাহার কাহার মাতার ফেসবুক আসক্তি আছে তাহা ! আমি ভিমড়ি খাইতে খাইতে নিজেকে সামলাইলাম ! টুনটুনি কহিল , বিস্ময়কর-ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বালকবালিকা নাকি হস্ত উত্তোলন করিয়া সায় দিয়াছে যে , তাহাদের মাতারা ফেসবুক আসক্ত ! আমার কন্যা টুনটুনি হস্ত উত্তোলন করে নাই! কেননা সে জানে তাহার মাতা, টুনির ওই আসক্তি নাই। কথা শেষ হইয়াও হইল না শেষ, কাঁধ ঝাঁকাইয়া স্মিতহাস্যে সে বলিল, ভাগ্যিস প্রশ্নটা মাতা লইয়া ছিল, পিতা ফেসবুক আসক্ত কিনা তাহা আলোচ্য হইলে, তাহাকে নাকি দুই হস্ত উত্তোলন করিতে হইত!
সন্ধ্যায় সে আমাকে আবার পাকড়াও করিল, ফেসবুকের ইতিহাস কি কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সংক্ষেপে যাহা বিশ্বাস করি তাহাই বলিলাম। বলিলাম, মূলত: নতুন প্রযুক্তি সর্বদাই আমাকে আকৃষ্ট করে এবং আমি তাহা সর্বদাই সাদরে বরণ করিয়া লইয়াছি। সমগ্র জনগোষ্ঠী সাদা আলোকোজ্জ্বল সরু ট্রাই-ফসফেট ফ্লুরোসেন্ট বাতি ব্যবহার করা শুরু করিলে আমি কেন হলদেটে টাংস্টেন ফিলামেন্টের বর্তুলাকার বাতি ব্যবহার করিব ? যুগের সাথে তাল মিলাইয়া চলিতে হইবে, ইহাই রীতি।
তবে, কথা থাকিয়া যায়। সকল যুগে সকল প্রযুক্তির শুভঅশুভ দুই দিকই ছিল ও থাকিবে। ব্যবহারকারীরা উহার শুভ-দিক বাছিয়া লইবে নাকি অশুভ-দিক লইয়া মাতামাতি করিবে, তাহা নিতান্তই তাহাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি ; ইহাতে প্রযুক্তির দায়ভার কোথায় ?
বুদ্ধিমতী টুনটুনি সহজেই আমি টোনার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিতে পারিল ও নিজের পড়ায় মনোনিবেশ করিল।
[ প্রকাশকালঃ ২২শে নভেম্বর, ২০১৬ ]
সাম্প্রতিক মন্তব্য