ছোটবেলায় আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র মানেই রনি ভাইয়ের মতো বেশী পাওয়ারের চশমা পড়া ভালো ছাত্র কেউ একজন। ১৯৭৯-তে আমরা মিরপুর পাইকপাড়াতে ভাড়া থাকতাম। বাড়ীওয়ালার ছোট-ছেলে রনিভাই ঢাকা কলেজের ছাত্র আর বুয়েটের জন্য পড়াশুনা করতেন। রাজ্যের এলোমেলো বই , গ্লোব , খেলনা, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে রুম ভরা। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলেন। ভুলন ভাই আর রনিভাই ছিল পিঠাপিঠি এবং তাঁদের বালখিল্য সুপারম্যান ও টারজানের লড়াইয়ে আমি রেফারিং করতাম। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে যে, পেটে বিদ্যা লাগে এইটা বুঝতাম।
পরে বড়-ফুফুর বাড়ীতে অন্তর্বর্তীকালীন থাকা অবস্থায় তাঁর ননদ নন্দিনী আন্টির দেখা। সম্ভবত: ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তাঁর ভাইয়ের বাড়ীতে ছুটি কাটাচ্ছেন আর পাত্রস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। উনার বিয়ে হয়ে গেল আরেক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। আবারো বুঝলাম সুন্দরী পাত্রী পেতে হলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে ! জীবনের যে কোন হিসাব নিকাশ থেকে শুরু করে সবরকম অংকেই আমি কাঁচা , সরল অংকের ফল সামনের বেঞ্চের তুহিনের যদি আসে ১ আমার আসে ১৪৫৩/১৮৫৬; কী মুশকিল !
পরিবারের চাপে ও সামাজিক এক্সপেকটেশনে বিজ্ঞান বিভাগে। তাছাড়া আমাদের সময় স্যাররাই ঠিক করে দিতেন রোল ১ থেকে ৩০ সাইন্স বাকীগুলো আর্টস বা কমার্স। নীচের কেউ যদি সাইন্সে পড়তে চায়, আব্বা-আম্মা সহ যোগাযোগ করতে হবে। আমি আবার ক্লাসে অংক, বিজ্ঞানে মাঝারি নাম্বার পেলেও বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, ভূগোলে উপরের দিকে থাকতাম। দেখা যেতো ফার্স্ট বয়, সেকেন্ড বয় অংক বিজ্ঞানে আমার চেয়ে ১৫ নাম্বার বেশী পেয়েছে। আর আমি অন্য আবঝাঁপ সাবজেক্টে তাঁদের চেয়ে ১০/১২ নাম্বার বেশী পেয়েছি। গড়পড়তায় ক্লাসে আমি আমি থার্ড ফোর্থ কিছু একটা হতাম।
আমার মেধা হয়তো সামাজিক সাহিত্যিক সাবজেক্টে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল।হলে কী হবে, সামাজিক চাপেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়া ! যদিও একটা পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান আমি ভীষণ এনজয় করেছি এবং এখনো করে চলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ, বঙ্কিম, মধুসূদন পড়ার জন্য বাংলা বিভাগে ভর্তি না হলেও চলে। কিন্তু , আপেক্ষিকতার সূত্র বোঝার জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা ভালো। একজন সাহিত্যের ছাত্র বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে পড়াশুনা করার বা উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু, একজন বিজ্ঞানের ছাত্রের সাহিত্যে উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী !
এমন হয়েছে, টিএসসিতে গণ আড্ডায় বসেছি, কলাভবনের ভাই-বেরাদররা এমনভাবে কথা বার্তা শুরু করলো যেন আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনি নাই। কেমন করে বোঝাই ওই ক্লাসিকগুলো আমরাও অনেক আগেই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু , আঁতলামি করতে মন চাইতো না । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি বলে যদি কেউ আমাকে সাহিত্যের মফিজ ভাবে, সেটা তাঁর সমস্যা, আমার না। আমি কি পড়েছি বা কি জানি সেটাতো প্রমাণ করার কিছু না। শেক্সপিয়ার, গ্যেটে , র্যাঁবো থেকে কোট করে কেউ যদি ভাবে সাহিত্যে তাঁদের একচ্ছত্র অধিকার, আমার কী করার আছে!
এইচএসসি দিয়েই আমি বুঝে গেছিলাম , বুয়েটে চান্স পাওয়ার চান্স কম! ৩/৪ মাসের সত্যিকারের পড়াশুনা করে এইচএসসি পাশ করা যায়। বুয়েটের জন্য আরও ঘাম ঝরাতে হয়। আমার টাইমিং ঠিক ছিল না। আই মিসড দ্য ট্রেন ! বুয়েটে ব্যর্থ হয়ে , অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ‘ক’ ইউনিটে ২৫০ এর পরের সিরিয়াল। কী মনে করে ‘ঘ’ ইউনিটেও পরীক্ষা দিলাম। যতদূর মনে আছে মেধাতালিকায় ২৯তম।মহল্লার বন্ধু বড়ভাইয়ের ব্যাপক উৎসাহ দিল- ‘আরে মিঞা , এইটাই তোমার লাইন, চোখকান বুইজা আই আর বা Economics এ পড়া শুরু করো এইগুলা খুব হট সাবজেক্ট। ভালোমতো রেজাল্ট করলে বিদেশী ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, মায় শিক্ষকতা কইরা বা , কনসালটেন্সি কইরাও হুলুস্থূল জীবন।’
সোজা ভাইবা বোর্ডে গেলাম। স্যারেরা জিজ্ঞাস করলেন , ‘তুমি ইকোনমিক্সে ভর্তি হলে থাকবে তো ? নাকি বিজ্ঞান অনুষদে চলে যাবে?’ আমি মুখ চোখ সেই রকম সিরিয়াস করে বললাম, ‘আমার অনেক দিনের স্বপ্ন স্যার অর্থনীতিতে পড়া!’ স্যারেরা একটা ভর্তি ফরমে অর্থনীতি বিভাগের স্ট্যাম্পিং দিয়ে বললেন , ‘যাও টাকা জমা দিয়া ভর্তি হও।’ ওইদিকে বিজ্ঞান অনুষদে প্রথমবারে পেলাম Statistics । বাসায় গিয়া ভয়ে ভয়ে আব্বাকে বললাম আমি Economics-এ পড়তে চাই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তোকে সাইন্স পড়েয়েছি কি Economics পড়ার জন্য ? আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা পড়ে এসেছি। Economics- আর্টসের সাবজেক্ট, এর সাথে সাইন্সের কী সম্পর্ক !’ আমি আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম বিজ্ঞান অনুষদের সাবজেক্ট ভালো পাই নাই, এর চেয়ে Economics ভালো । কিন্তু আমার তোতলামি ধোপে টিকলো না। তার পরেও অর্থনীতি বিভাগের ভর্তির ছাড়পত্র অনেকদিন আমি রেখে দিয়েছিলাম কাছে, মাঝে মাঝে খুলে দেখতাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম ! বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি হলাম পরিসংখ্যানে, অ্যানেক্স বিল্ডিং এ যাই মাঝে মাঝে। ক্লাস করি কী করি না , আর একই সাথে সম্ভবত: নজরুল ইসলাম হলের বুয়েটের এক বড়ভাইয়ের কাছে যাইয়া দ্বিতীয়বারের বুয়েট প্রিপারেশন নিই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহ তিনেক না যেতেই নোটিশ আসলো ,সামনের সীট ফাঁকা হয়েছে, আমি এখন ইচ্ছা করলে রসায়ন বিভাগে মাইগ্রেট করতে পারি। ভাবলাম, যাই, কেমিস্ট্রিই ভালো , সেই সঙ্গে কার্জন হলের আশে পাশে থাকতে পারা যাবে। কেমিস্ট্রিতে হুমায়ূন আহমেদ স্যার সম্ভবত: শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। ওইখানে কিছুদিন ক্লাস করতে করতে আবার নোটিশ সিরিয়াল এগিয়েছে ইচ্ছা করলে Applied Chemistry-তে মাইগ্রেট করতে পারব। ততদিনে এদিক সেদিক পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছি। ঢাকার বাইরে একটাও না। আমি ঢাকার বাইরে পড়তে যেতে কোনভাবেই রাজী ছিলাম না। ভাই-বেরাদারদের পরীক্ষায় সাহায্য করে বেড়াতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে জাহাঙ্গীর নগরে পরীক্ষা দিয়ে ইলেক্ট্রনিকস পেলাম। যাকে হেল্প করতে গিয়েছিলাম, তাঁর কিছুটা হেল্প করতে পেরেছিলাম ; আর সময় পেয়ে বসে না থেকে খাতা কমপ্লিট করেছিলাম।
তো, বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হয়ে সপ্তাহের একদিন দুইদিন কার্জন হলে যাই। ১২ টাকা দিয়া চিকেন বিরিয়ানি খাই, চৈতালিতে বাড়ী ফিরি। মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধবের সাথে ঢাকা মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে বা টিএসসিতে আড্ডা মারি। সপ্তাহে একদিন বুয়েটের নজরুল হলে যাই। সেই বড় ভাইয়ের কাছে কিছু মডেল টেস্ট দিই। আর বাকী চারদিন মহল্লার রেগুলার বছরে বুয়েটে চান্স পাওয়া আমাদের ব্যাচের সেশনজটের আটকা পোলাপানের সঙ্গে আড্ডা দিই।
এর মাঝখানে এক বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম তুইল্যা আনছি। তোমাগো হেল্প লাগবে, ৮/১০ জন একলগে ভর্তি ফর্ম জমা দিলে , আমি হেল্প পামু, য্যাম্নেই সীট পড়ুক না কেন !’ সেই ফ্রেন্ডই সবকিছু করলো। ভর্তি পরীক্ষার দিন ভুলে বসে আমি সকালে আরেক ফ্রেন্ডের বাসায় কার্ড পিটাচ্ছি। সে এসে ধরে নিয়ে গেল।যাতায়াতের ভাড়া, চা- সিগারেটের খরচ তার। তাঁকে কিছু হেল্প করতেও পারলাম। আমি নিজের খাতাও পূর্ণ করলাম। পরে দেখি, আমি মেরিট লিস্টে, কিন্তু বন্ধু ওয়েটিং লিস্টে !
ওই সময় আব্বাকে কেউ বোঝালো , টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই ভালো সাবজেক্ট । আমার জনৈক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আবার কোন টেক্সটাইলে যেন অনেক বেতনের চাকরি করেন। টেক্সটাইলে এক্সপার্ট লোকের অভাব আছে, চাহিদা অনেক। আমার ছোটমামারও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারে ভোট ছিল। আমি যতোই গাঁইগুঁই করি না কেন আব্বার ঝাড়ির চোটে তৎকালীন কলেজ অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি-তে ভর্তি হয়ে যেতে হল। ওইদিকে ওয়েটিং লিস্টের ফ্রেন্ডটাও জোরাজুরি করলো। তাছাড়া অনিশ্চয়তাও ভালো লাগছিল না। অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে গেলাম ভর্তি হয়ে টেক্সটাইলে। ওখানকার জীবন, হল লাইফ, সে আরেক কাহিনী।
আব্বা অনিয়মিতভাবে হিন্দি সিনেমা দেখতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই সময়ে যদি আমির খান থ্রি ইডিয়ট( 3 Idiots) ছবিটা বানাতো আর আমার আব্বা যদি কোনক্রমে সেটা দেখে ফেলতেন; তাহলে আজ হয়তো আমি একজন অর্থনীতিবিদ হতে পারতাম !
সাম্প্রতিক মন্তব্য