বস্ত্রকথা ( জুন ২০১৩) :

গার্মেন্টস নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কয়েকজন ক্রেতা ও মালিকপক্ষের বিচ্ছিন্ন মন্তব্য ও মতামতের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরছি। আমি এইখানে কোন পক্ষ অবলম্বন করছি না। আমি চাই, গার্মেন্টস ট্রেড থাকুক, প্রফেশনাল মালিক , শ্রমিক ও কর্মচারীরা কাজ করুক। কতিপয় অর্থগৃধ্নু মালিকের ও ক্রেতার জন্য সবাইকে দোষারোপের চলতি হাওয়া থেকে বের হয়ে আসুক মিডিয়া। যে কয় ডলারের ব্যবসাই করেন না কেন, ভালো পরিবেশে উন্নত শ্রমিকবান্ধব কারখানায় করেন।

ভাইরে, আমার আকাংখা দিয়ে তো আর বাংলাদেশ চলে না, তাই অন্যদের কিছু মন্তব্য শুনিঃ

ক্রেতাদের কিছু মন্তব্যঃ

১। বাংলাদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকের মতামত– আমারাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সস্তা শ্রমের দেশ । আমরা অপরিহার্য, চীনে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আমরা ছাড়া পশ্চিমা ক্রেতাদের যাওয়ার কোন জায়গা নাই। ক্রেতাদের কথা –কিন্তু, একটা কথা সবাই ভুলে যাচ্ছো, পৃথিবীর মোট বস্ত্রচাহিদার ৪ থেকে ৫ শতাংশ মাত্র বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ২১/২২ বিলিয়ন ডলারের বাজার।

কথা সত্য , একক দেশ হিসাবে তোমরা চীনের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম। কিন্তু , ঐ যে বলেনা, বিশাল ব্যবধানে দ্বিতীয়, তোমরা তাই।

তো, কিছু বড়ো ক্রেতার অবস্থান অনেকটা এইরকম, ‘ বাংলাদেশ নিজেরে অপরিহার্য ভাইবো না। আমরা যদি ৯৫% বস্ত্র অন্য দেশ থেকে সোর্সিং করতে পারি। তোমাদের ৫% অন্য কোথাও থেকে ঠিকই আমরা ম্যানেজ করে নিব।’

ডাটা স্ট্যাটিস্টিক্স দিয়ে পোস্ট ভারি করবো না, কেউ উৎসাহী হলে, গুগলে যাইয়া দেখেন।

২। প্রতি পিস টি-শার্টে তোমাগো আরো দশ সেন্ট দিলে নাকি তোমরা শ্রমিক কল্যানের সব কিছু কইর‍্যা ফালাইব্যা । তোমাদের মতো দুর্নীতিবাজ জাতির পক্ষ থেকে কে গ্যারান্টি দেবে যে, ঐ অতিরিক্ত ১০ সেন্ট শ্রমিকের কল্যানেই লাগাইবা, নাকি হুদা মিছা মালিক ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের লাভের পরিমাণ খামোখা বাড়াইবা। শ্রমিক যেইখানে ছিল সেইখানেই থাকবে।

৩। যেকোন বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশেই বছর তিরিশেক পরে শ্রমঘন ভারী বা লোটেক শিল্প থেকে হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে গেছে। তোমাগো অবস্থা যা, তোমরা আরো তিরিশ বছরেও হাইটেকে যাইতে পারবা না ! তাইওয়ান, কোরিয়া, চায়না, শ্রীলংকা , মেক্সিকো যে দেশেই এই গার্মেন্টস শিল্প ছিল তারা তাঁদের প্রথম ৩০ বছর পরে কোথায় আর তোমরা কোথায় !

৪।মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ক্রেতা হিসাবে আমি আমার সর্বোচ্চ গুণগতমান সর্বনিম্ন খরচে চাইব। তোমার এখানে না পেলে অন্য জায়গায় যাবো। এখন তোমার দ্বায়িত্বই বেশী নিজস্ব ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও কমপ্লায়েন্স করার জন্য তোমাদেরকেই ঠিক করতে হবে কীভাবে শ্রমবান্ধব পরিবেশে গার্মেন্টস উৎপাদন করবা।

আমার নিজের কথা, নতুন পে স্কেলে শ্রমিকের বেতন ৫০% বাড়লেও আমি মনে করি, তারপরেও বাংলাদেশ গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।

মালিকপক্ষের বিচ্ছিন্ন কিছুকথা:

১।ভাই, গত তিরিশ বছরে সড়ক ও লঞ্চ দুর্ঘটনায় কতোজন মারা গেছে আর এতোবড় একটা গার্মেন্টস শিল্পে কতজন মারা গেছে, একটু কাইন্ডলি কম্পেয়ার করেন। একতরফা একটা দুইটা দুর্ঘটনা দিয়ে পুরো ট্রেডটারে কালপ্রিট বানাইয়েন না।

২।গাঁটের টাকা খরচ করে, বউয়ের গহনা বিক্রি করে, বাড়ি জমি বন্ধক রেখে ১৮ থেকে ২০% ব্যাংক ইন্টারেস্টে ব্যবসা করতে আসছেন। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কথা যদি বলেন– ব্যবসার অন্যতম উদ্দেশ্যতো মুনাফা , নাকি ? ব্যবসায় যদি মুনাফা না থাকে শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলেন, তাইলে আপনারাই ব্যবসায় নামেন। সামাজিকতা করেন , চ্যারিটি করেন। বছর শেষে ব্যাংক লোন শোধ করতে হবে , মুনাফা করতে হবে আবার অদক্ষ শ্রমিকের জন্য সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক দিতে হবে। ভালো , ভালো না !

৩।গ্রামের একটা অশিক্ষিত, বা স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক কোন প্রাথমিক ট্রেনিং ছাড়া এসে বসে যে পারিশ্রমিক পাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্য কোন সেক্টরে মনে করেন, চিংড়ী ঘেরে, কৃষিকাজে, দিনমজুরী করে, ঘরামী করে, যদি এর চেয়ে বেশী পাইতো, তাইলে কি তারা গার্মেন্টসে কাজ করতে আসতো ? সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাচ্ছে বলেইতো তারা এই সেক্টরে !

আবার ডিমান্ড সাপ্লাই চেইন মেনে, শ্রমিকের প্রতুলতা ও অপ্রতুলতাই তাঁদের মজুরী কতো হবে ঠিক করে। আমরাতো শিকল দিয়ে বাইন্ধা রাখি নাই, পোপের মতো কথা বললেতো হবে না। ৫শ টাকা বেশী পাইলে, মালিকের কোন হ্যাডাটা ঠিক রাখতেছে শ্রমিকেরা। ঠিকইতো অন্য আরেক জায়গায় চলে যাচ্ছে।

দক্ষতার কথা বলেন, চীনা একটা শ্রমিক যে দক্ষতা নিয়ে কাজ করে , তার ৩০% দক্ষতাও আমাদের বেশীরভাগ শ্রমিকের নাই। ওদের বেতন বেশী হবে নাতো কী আমাদের রোকেয়া কুলসুমের বেতন বেশী হবে !

৪। সরকার , মিডিয়া সবাই বাংলাদেশের আর কোন শ্রমিকদের জন্য বছরে বছরে আপনারা বেতন বাড়াচ্ছেন বা বেতন বাড়ানোর জন্য প্রেসার দিচ্ছেন ? অন্যরা কী কি দোষ করছে। বৈষম্যতো আপনারাও করছেন। এখন গার্মেন্টসের শ্রমিকের বেতন ৮০০০ টাকা দিলে অন্য সব সরকারী বেসরকারী শ্রমিকেরা কী দোষ করলো। অন্য সব সেক্টরের শ্রমিকের বেতনও বাড়াতে হবে।

শ্রমিকের বেতন ৫০% বাড়াইলেন। সঙ্গে সঙ্গে কী হবে জানেন। বাড়ীভাড়া বাড়বে, খাদ্যের দাম বাড়বে, বাসভাড়া বাড়বে , বেকারীর দাম বাড়বে, ডিমের দাম বাড়বে। বাড়তি টাকার পুরোটাই অন্যের পকেটে যাবে। মুদ্রাস্ফীতির দায় শুধু মালিকদের উপর চাপাচ্ছেন কেনো?

সুশীল সমাজের একজন বললেন, তিরিশ বছরে গার্মেন্টস মালিকেরা সরকারকে কি দিয়েছেন। ২৫% ইনসেন্টিভ নিছেন। সারাক্ষণ গ্যাস বিদ্যুৎ নিয়ে চাপাচাপি করছেন। ট্যাক্স দিছেন কতো? কিছু কইলেই, কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে আরো সহযোগিতা করতে বলেছেন। যে পরিমাণ ট্যাক্স ফাঁকি দিছেন, ওইটা দিয়া আরো হাজার খানেক ইপিজেড তৈরী করা যাইতো। কর্মচারী আমরা যারা, কয়জন ঠিকমতো ট্যাক্স দিই। বছরের মে-জুন মাস থেকে দৌড়াদৌড়ি ক্যামনে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়।

তবে, উপরের সবকটা মন্তব্যেই আমার পরিচিত কোন না কোন ক্রেতা বা মালিক করছেন।আমি মনে করি , শ্রমিক, মালিক,ক্রেতা , সরকার ও বিরোধীদলের একটা সমন্বিত প্রক্রিয়া দরকার। সমন্ব্যহীনভাবে একেক জন একেকভাবে কি কি করতে চাচ্ছেন, বোঝা মুশকিল।উল্লেখ্য, শ্রমিক পক্ষের কারো সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয় নাই, কিন্তু টিভি মিডিয়াতে তাঁদের দাবী দাওয়া অত্যন্ত স্পষ্ট। সেইটা আমরা কমবেশী সবাই জানি।

আমার শৈশবের যৌন শিক্ষা, আমাদের বেড়ে ওঠা ও আধুনিক বিকৃত প্রজন্ম

(পুরনো ও প্রিয় একটি লেখা, যা এই অস্বস্তিকর বাংলাদেশের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক।)

আজ সকালে কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ভাঙ্গাগাড়ীতে পুরনো সিডি খুঁজছিলাম, কিশোর কুমারের একটা বাংলা সিডিও পেলাম, চালু করতেই সেই ঐশ্বরিক দরাজ গলা বেজে উঠলো।
“তারে আমি চোখে দেখিনি , তার অনেক গল্প শুনেছি,
গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি।।
আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন,
বইতে পারে না তারও বিবশ মন ;
ভালোবাসার ভালো কথা শুনে নাকি শিহরিয়া যায় শুনেছি।।
চোখেতে তার স্বপ্ন শুনি ভীড় করে থাকে,
মরণ শুনেছি হাতছানি দিয়া ডাকে,
বিষের আবার ভালোমন্দ কীরে যখন আমি মরতে বসেছি !!! ”

কিশোর কুমার , মান্না দে আমাদের দুই প্রজন্ম আগের হলেও এঁদের গান আমাদেরকেও মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলাব্যান্ডের উত্থানের সমসাময়িক সময়ে ফিতা ক্যাসেটের যুগে এঁরাই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের।

গানের লাইনটি আবার খেয়াল করুন , ‘আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন, বইতে পারে না তারও বিবশ মন !’
দৃশ্যকল্পটি কেমন? যৌবন ছল্‌কে পড়ছে, উদ্ভিন্ন বাঁকগুলো আপনাকে মুগ্ধ করছে।
যদিও আমি আমার কন্যাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষারত , তারপরেও ভণ্ডামি না করে বলতে পারি, আমার ‘পুরুষ-চোখ’ কিন্তু ঠিক ঠিকই অতিক্রম কারিণী সকলের , যাঁদের যৌবন ছল্‌কে যাচ্ছিল তাদের দেখছিল।

বর্তমানের একাধারে নারীদের উপর নিরবচ্ছিন্ন যৌন নিপীড়নের হেডলাইন দেখতে দেখতে আমি বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। পুরুষ হিসাবে আমি লজ্জিত। মনোবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানা কুইক রেন্টাল টোটকা দিয়ে এই ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে উঠে আসার পথ , উত্তরণের বাৎলাচ্ছেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, পুরোপুরি উৎপাটন করা সম্ভব না হলেও এই অসুস্থতার সার্বিক নিরাময় সম্ভব। এবং সেটা শুধুমাত্র শৈশবে সঠিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে।

বালককে বুঝতে হবে, সে শিশ্ন-ধারী মানুষ ঠিক আছে, কিন্তু বালিকা শিশ্ন-হীন দ্বিতীয় লিঙ্গের দুর্বল কেউ না। বালককে নারীর মাহাত্ম্য বোঝাতে, নারীর মর্যাদা শেখাতে খুব বেশী সময় লাগারতো কথা না। বালকের মা আছে, বোন আছে, অন্য শ্রদ্ধেয়া আত্মীয়ারা আছেন। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে তাকে নারীর মর্যাদা শেখাতে হবে।
রহস্যময় দৈহিক বাঁক নিয়ে যে নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে একজন মানুষ এবং তোমার চেয়েও অধিকতম মানুষ। বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরুৎপাদনের বিশাল শারীরিক যন্ত্রণার দায়িত্ব প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে। বালককে বুঝতে হবে , বোঝাতে হবে নারী শুধুমাত্র স্তন ও যোনীর সমষ্টি একটা ভোগের বস্তু নয় !

পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাটা পেলে ভাল। নইলে শিক্ষায়াতনে। পরিবারের একজন পুরুষকে দেখলে প্রথমেই আমরাতো তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি না !
পোশাক, জুতা, আর্থিক-সামাজিক অবস্থা হেন তেনর পরে তার বিশাল বপু বা স্থূলত্ব নিয়ে কথা হয়।

কিন্তু একজন নারীকে দেখলে কেন প্রথমেই তাঁর স্তন ও নিতম্বের দিকে জুলজুলে নজর যাচ্ছে ? সমস্যাটা কোথায় ? তাঁর অন্যসব বৈশিষ্ট্য কেন আলোচিত হয় না ? একজন কিশোরী , তরুণী আমার সামনে এসে প্রথমেই কেন তাঁর বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকাঢাকি করা শুরু করে দেয়। কী তাঁকে ভীত করে তোলে, যে সামনের পুরুষটির ( হোক সে কিশোর, তরুণ , মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ) সামনে সে ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ! কে তাঁর মনে এই অ-নিরাপত্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে?

বাদ দিই, তাত্ত্বিক আলোচনা। সাহস বা দুঃসাহস করে যদি আমার প্রজন্মের যৌন শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করি , তাহলেও কী কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে না !

অন্য সকলের মতোই আমারও কৈশোরের অসহনীয় বয়ঃসন্ধির একাকীত্ব, দেহের অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা ছিল। ছিল মন খারাপ করা বিকেলবেলা। নিজেকে অপাঙতেয় , তুচ্ছ , অবহেলিত ভাবার দুঃসহ দিনরাত্রি। আমি মোটামুটি নজরে পড়ার মতো ভালো ছাত্র ছিলাম। পরিবারের ও শিক্ষকদের আলাদা একটা এক্সপেকটেশনের ভার আমাকে বইতে হতো। কিন্তু আমিও তো একটা কিশোর। আমার যে ছেলে বন্ধুটি , মেয়েদের স্কুলের সামনে যেয়ে সদ্য কিশোরীদের উদ্ভাসিত চাহনি, রহস্যময় বাঁক দেখে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করতো ,তাতে আমার মনটাও তো হু হু করে উঠতো।

সে ছিল এক কল্পনার রাজ্য। যদিও আমার শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির সমানুপাত বৃদ্ধির পরিমাপ নিয়ে আমার পরিবারে দ্বিধা আছে।আমার মানসিক বৃদ্ধি শরীরের তুলনায় শ্লথ। আমি স্তন্যপায়ী ছিলাম ৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এবং কেন জানিনা , আম্মাও আমার অত্যাচারকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন অতোগুলো বছর। বছর পাঁচেক পর্যন্ত আমার বেড়ে ওঠা নানাবাড়ি কুষ্টিয়াতে। অস্পষ্ট আবছা মনে আছে, হয়তো স্মৃতিতেই পুনঃ-নির্মিত হয়ে আছে। গ্রামের বাচ্চারা ছিল যৌনতার ব্যাপারে অকালপক্ব । সহচর-সহচরী খেলার সাথীদের হঠাৎ বাল্যবিবাহ, তাঁদের যৌনতার অভিজ্ঞতার নিষিদ্ধ আলোচনা তাদেরকে পাকিয়ে দেয়। কোনটা শিশ্ন, যোনি, স্তন, কোনটার কী কাজ, সেটা আমাদের সময়ে আমাদের গ্রামের খেলার সাথীরা ভালোই বুঝতো। পুরোপুরি নাগরিক হতে হতে ৭৯ সাল। প্রতি ঈদে পার্বণে নানাবাড়ি যেতে হোত, যৌন জ্ঞানের পার্থক্যটা তখন চোখে পড়ার মতো ছিল । মোরগ-মুরগী বা কুকুরের সংগমে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও গ্রামের শিশুদের জন্য সেটা ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ।

বছর সাতেক থেকে তেরো চৌদ্দ পর্যন্ত সেই অর্থে আমার যৌন চেতনা ছিলনা। অন্তত: আমার কিছুই মনে নেই।ক্লাস ফাইভে আমার সহপাঠিনী মিতু প্রেম করা শুরু করলো বা অধুনা যেটাকে বলে ক্রাশ খেল অপু নামের জনৈক নবম শ্রেণীর উদীয়মান গায়কের সঙ্গে। ওইটা আমার মনে আছে।

ক্লাস সিক্সে স্কুলের পরিবর্তন। স্কুল পরিবর্তনের পরে , নতুন স্কুলের পোলাপানের সঙ্গে এলোমেলো সখ্যতা গড়ে উঠল। ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয় সবাই আমার বন্ধু ছিল। সবাই আমাকে আপন করে নিল।

বাসায় মামা চাচা ও গ্রামের আত্মীয়স্বজন অপর্যাপ্ত। দুই বেডরুম,ডাইনিং বাসাতে মাসের বেশীরভাগ দিন আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্লোরিং করতে হোত। দেশের বাড়ির কেউ না কেউ, হয় চিকিৎসা নয় এয়ারপোর্ট বা চিড়িয়াখানা দেখতে বাড়িতে জিইয়ে থাকত।

বাসায় মামা , চাচা কেউ না কেউ যাওয়া আসার মধ্যে থাকতোই। তাদের ফিসফিসে নারীদেহ নিয়ে কথাবার্তা কানে বাজতো। হ্যাঁ, নারীর নগ্নদেহের ছবি একটা শিরশিরে অনুভূতি এনে দিত। মামা-চাচাদের কারো না কারো অসাবধানে বিছানার তোষকের তলায় ফেলে রাখা নিউজপ্রিন্ট ছাপার পর্ণ পত্রিকা হাতে পড়লো। বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সম্ভবত: অর্ধ-নগ্ন ছবির একসেট প্লেয়িং কার্ডও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন দেখেছিলাম। তো, প নামের এক নতুন স্কুল-বন্ধু স্বমেহনের ব্যাপারটা কেমন করে যেন মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আমি জানি না, আমার সব বন্ধুদের সবাই, হয়তো নিজে নিজেই স্বমেহনের আনন্দ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এটা কেই আমরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। এর মাঝে কেউ কেউ স্বমেহন যে খারাপ তা বলে তীব্র অপরাধ-বোধ ঢুকিয়ে দিল। এটা খুব খারাপ, পাপ হবে, শরীর শুকিয়ে খারাপ হয়ে যাবে, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইট পর্যন্ত যৌনমিলনের ব্যাপারে আমার জ্ঞানের পরিধি ছিল এই যে, শারীরিক মিলনে পুরুষাঙ্গ ও নারীর পায়ুপথ ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এইটের শেষের দিকে ক্লাসের অভিজ্ঞ ডেঁপো ছেলেদের জ্ঞান বিতরণে মানব-মানবীর শারীরিক মিলনের সব কিছু সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !

কিন্তু পড়াশোনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা , কৈশোরের একাকীত্ব স্বমেহনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল আমাকে ও আমাদেরকে।
এসএসসি পরীক্ষার পরপরই আমরা ঘোষণা দিয়ে বড়ো হয়ে গেলাম। এখন আমরা সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা কলেজ ছাত্র। এবং ‘জ’ নামের এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের প্রথম দলবেঁধে পর্ণ-ছবি দেখা। ঢাকা কলেজে ভয়ঙ্কর মেধাবী মেধাতালিকার বন্ধুদের ছড়াছড়ি। আমরা মিরপুরের ছেলেপেলে ছিলাম নিতান্ত মফস্বলী মফু । গভর্নমেন্ট ল্যাব: বা ধানমণ্ডি বয়েজের পেন্টিয়াম ভার্সনের পোলাপানের কাছে আমরা ছিলাম ডজ মুডের কম্পিউটার। একদিন কেউ একজন আমাদের মিরপুরবাসীকে জিজ্ঞাস করলো আমরা বাংলা পর্ণ বা চটি পড়েছি কীনা। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সে বললো , তোরা তো এখনও শিক্ষিতই হস্ নাই, আয় তোদের শিক্ষিত করি। তো ওই চটি পড়ে আমরা অদ্ভুতুড়ে কিছু পশ্চিমবঙ্গীয় যৌনাঙ্গের ও মিলন পদ্ধতির নাম শিখলাম। বেশীরভাগ পুস্তিকা বটতলায় ছাপানো, নীলক্ষেত উত্তম ভাঁড়ারঘর ছিল সকল কলেজ-গামী ছাত্রদের কাছে।

আমার ধারনা, আমাদের মানসিক গঠনে, ওই সামান্য তথ্য বিকৃতি তেমন দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলতে পারে নাই। সমাজ ও পরিবারের এক্সপেকটেশনের চাপ আমাদেরকে অনেকটা একমুখী করে রেখেছিল( স্বমেহনের ব্যাপারটা ছাড়া। পরবর্তীতে আমি পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, স্বমেহন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাপ আর স্বাস্থ্যভঙ্গের ভুল বিকৃত তথ্য যদিও আমার কৈশোরের একটা অংশ বিষময় করে দিয়েছিল। )

বয়েজ স্কুলে পড়লেও নানা কারণে কোচিং ও মহল্লার ভালো ছাত্র হওয়ার বদৌলতে সতীর্থ সমবয়সী বান্ধবী ছিল। কিন্তু ওদের মানসিক পরিপক্বতা ছিল আমার বা আমদের চেয়ে বছর দশেক এগিয়ে। সম্পর্কটা ছিল নিতান্তই বড়বোন-ছোটভাই টাইপের। বিকৃতিহীন স্বাস্থ্যকর।

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জীবনে নতুন করে কোন তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের সম্ভাবনা ছিল না।
যথারীতি কয়েকজন প্লেবয় বন্ধু ছিল, যাদের ব্যবহারিক জ্ঞান ওই পর্ণ-পত্রিকার গল্পের চেয়েও উত্তেজক ছিল। তারা তাদের যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলত। আমরা অবদমিত মন নিয়ে তাদের রোমাঞ্চের ও মৈথুনের শীৎকার শুনতাম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তারপরে তো বিবাহিত জীবন, ‘দারা পুত্র পরিবার , তুমি কার কে তোমার !’

স্কুলকলেজের ডেঁপো বন্ধুদের কেউ কেউ, ভিড়ের বাসে আরেকজনের সাথে ধাক্কা খেয়েছে বা ধাক্কা না খেয়েই কল্প গল্প বানিয়ে বলেছে এটা বোঝা মুশকিল ছিল । যৌনতার ব্যাপারে ওই বয়সটা ছিল, সবকিছু বিশ্বাস করার, হা করে শোনার।

আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা অ্যাভারেজ একটা ছেলের যৌন-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেকটা আমার মতোই। ছোটখাটো ভুল তথ্য ,স্বমেহন বা পর্ণ ছাড়া আমি কোন বিকৃতি দেখিনা।

কিন্তু এর মাঝে মধ্যবর্তী নতুন একটা বিকৃত প্রজন্ম এসেছে ; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, বা মাইক্রোবাসে তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করছে, তাদেরকে আমি চিনি না। দুর্ভাগ্য, এই বিকৃতদের সাথেই প্রতিমুহূর্ত বসবাস করতে হচ্ছে আমাকে আমাদেরকে !

[ প্রকাশকালঃ ১৪ই জুন,২০১৫ ]

প্রেক্ষাপট: টানবাজার , আফগানিস্তান ও নাইন-ইলেভেন এবং আমাদের অবদমিত সমাজের বাই-প্রোডাক্ট !

পুরনো প্রেক্ষাপটে লেখা, গত পরশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণে কিছু সংযুক্তি করে আবার লিখছি। প্রতিটি ধর্ষণ পুরুষ হিসাবে আমার মাথা নত করে দেয়। আমার বোন, আমার কন্যা ও আমার নারী সহকর্মীদের দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতে পারি না। প্রতিটি ধর্ষণ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি পুরুষ সমাজের প্রতিভূ , এবং আমি আরেকজন নারীর জন্য নিরাপদ নই।

ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকার ও রাষ্ট্র কি কি করতে পারে ও করা উচিৎ সেটা নিয়ে আমার আলোচ্য নয়। একদিকে বিলুপ্তপ্রায় প্রগতিশীল অংশ আরেকদিকে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য ও বিশাল ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মতোও আরেক জনগোষ্ঠীর মাঝে আমরা পড়েছি উভয়সংকটে।

সমাজের মল-মূত্র, স্যানিটারি ন্যাপকিন, উচ্ছিষ্টের জায়গা ডাস্টবিন। গলিত অর্ধগলিত আবর্জনা ফেলার ও পরিষ্কার করার নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যার প্রয়োজন সে ফেলবে, যাদের পরিষ্কার করার দরকার সে একটা সময়ে এসে পরিষ্কার করবে। যে বা যারা দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না, তাঁরা অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের জীবনের অতি অপরিহার্য এই নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা যেন নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে পুরো মহল্লায় ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে। নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে আপনার ব্যবহার করা কনডম ঝুলবে পাশের বাড়ির কার্নিশে । আপনার কাজের বুয়া সবজির উচ্ছিষ্ট ফেলবে আপনার সামনের সুন্দর সাজানো বাগানে !

ময়লা খারাপ , দুর্গন্ধ খারাপ এই অজুহাতে তো ডাস্টবিন তুলে দেওয়া যাবে না। নাকি, আমরা সবাই ইউটোপিয়া নামের কল্পরাজ্য বা পবিত্র গ্রন্থে বর্ণিত সেই স্বর্গরাজ্য চাই । খেলাম কিন্তু হাগুমুতু হবে না। মেশক-আম্বরের গন্ধে ভরে থাকবে সবার উজ্জ্বল দেহ !

কয়েক বছর আগে তখন বারাক ওবামা ক্ষমতায়, অফিসের ট্রাভেলে মাঝপথে দিন কয়েকের বিরতি নিয়েছি স্কুল-বন্ধুর বাসায় । ভার্জিনিয়া, আম্রিকায়। তো এক শুক্রবার সকালে বন্ধু কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার সময় বন্ধুর স্বগতোক্তি ,স্কুলের পতাকা নামানো ক্যান মামা? কেউ মারাটারা গেল নাকি! নিউজ চ্যানেল দ্যাখ তো কাহিনী কি। আমি হু হা করে ইউটিউবে গান শোনায় মনোযোগ দিই । গাড়ীতে ওয়াই ফাই লাগানো। আমেরিকার পতাকা অর্ধনমিত কেন, সেটা জানা আমার প্রায়োরিটি না !

আসার পথে গ্যাস স্টেশন, অফিস, মনোহারী দোকান সবখানেই পতাকা নামানো দেখে একবার ভাবলাম কাউকে জিজ্ঞাস করি। ভাগ্যিস করিনি ! বাসায় এসে দুপুরে খেতে খেতে বন্ধু-পত্নীর কথায় মনে পড়ে যায় আজ ১১ই সেপ্টেম্বর ( নাইন-ইলেভেন) ! দুজনেই বিব্রত বোধ করি।

কারো কোন তির্যক মন্তব্য বা মতামত পছন্দ হলে আমার দীর্ঘদিন মনে থাকে।
বছর পনেরো আগে মহল্লার পান-বিড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে এক বড়ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। সদ্যই টানবাজার ও কান্দুপট্টি সাফল্যের সঙ্গে উচ্ছেদ করা হয়েছে পবিত্রতার দোহাই দিয়ে ! মূলত: প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের জমি ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বের ফাঁকে পড়ে যায় যৌনকর্মীরা । আশির দশকের শুরুতে একবার উচ্ছেদ করা হয়েছিল, নানা কারণে ধুঁকে ধুঁকে চললেও ৯৯ সালে পুরোপুরি গৃহহারা হন যৌনকর্মীরা। এরপর একে একে, নিমতলি, ইংলিশ রোড, টাঙ্গাইল সব জায়গা থেকে পতিতা-পল্লী উচ্ছেদ করা হয়।

সামাজিক গবেষণার অনেকগুলো শব্দ আছে, পুনর্বাসন, পতিতাবৃত্তি, নিরাপত্তা হীনতা ,সামাজিক অব্যবস্থা, ইসলামী অনুশাসন , দারিদ্র্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যেহেতু গবেষক নই, আমার চিন্তা ক্ষুদ্র একটা জায়গায় এসে ঘুরপাক খায়। উল্লেখ্য, পৃথিবীর এই আদিমতম পেশার প্রতি আমার কোন সমর্থন নেই। নিজের দেহ বিক্রি করে ক্ষুন্নিবৃত্তির চেয়ে অসম্মানের কিছু নেই।

কিন্তু শেষ বিকেলের ওই আলোচনার বিষয় ছিল, উচ্ছেদ করলেই কি নির্মূল হবে। এঁরা তো ছড়িয়ে পড়বে ঢাকা শহরের সম্ভব অসম্ভব সমস্ত জায়গায়। পরবর্তী এক যুগ আমরা দেখেছি কীভাবে পতিতাবৃত্তি নানা চেহারায় পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে, ভদ্রপল্লিতে নানা ডাইমেনশনে ছড়িয়ে পড়েছিল ।

পুঁজিবাদের কথা , গণতন্ত্রের কথা বলবেন ; আর তার উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট নিয়ে নাক সিঁটকাবেন ; কেমন করে হবে! সামাজিক সুস্বাস্থ্যের জন্য, পুঁজিবাদের বাই প্রোডাক্ট হিসাবে যৌন-ব্যবসা টিকে থাকবেই। বড়োজোর প্রাতিষ্ঠানিক যৌনকর্মীদের কে আপনি ভাসমান পতিতাবৃত্তিতে ঠেলে দেবেন! এর পরে আপনি আশা করবেন আপনার ভাই-বন্ধু-পুত্ররা তাঁদের কখনই খুঁজে পাবে না ?

আপনি কথায় কথায় গণতন্ত্রের দোহাই দেবেন, আপনি আফগানিস্তানে হামলা করবেন, ইরাকে হামলা করবেন ; ফিলিস্তানিদের গৃহচ্যুতিতে ইজরাইলকে সমর্থন দেবেন। আবার আশা করবনে , আপনার নিরাপত্তা সবসময় অ-বিঘ্নিত থাকবে ! ভীমরুলের চাকে খোঁচা দেবেন, আর তারা আপনার পরিপার্শ্বের কাউকে কে হুল ফোটাবে না ? আপনি এটাকে কতোখানি গন্ডীবদ্ধ করে রাখতে পারছেন সেটা আলোচ্য ও বিবেচ্য হওয়া উচিৎ ছিল।

ধর্ম সন্ত্রাসতো হাজার বছরের পুরনো ! সভ্যতা-অসভ্যতা যতদিন থাকবে, ধর্মসন্ত্রাসও থাকবে। আমেরিকা ধর্মসন্ত্রাসীদের গন্ডীবদ্ধ না করে নিজেদেরকেই অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকা তার বাজেটের বড়ো একটা অংশ ধর্মসন্ত্রাসীদের পুনর্বাসনে খরচ করলে হয়তো, টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়তো না।

ইউরোপও দিনের পর দিন আমেরিকার অনৈতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসে সরবে ও নীরবে সমর্থন দিয়েছে। আজ তার উত্তাপ নিজের ঘরে টের পাচ্ছে তারা। শরণার্থীর ছদ্মবেশে হয়তোবা ‘আইএস’-কেও আশ্রয় দিতে হচ্ছে !

প্রতিটা এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা চেকিং পার হই আর মনে মনে বলি, আমার দেখা পৃথিবী দুই সময়ে বিভক্ত, নাইন- ইলেভেনের আগের পৃথিবী আর নাইন-ইলেভেনের পরের পৃথিবী !

অন্যদিকে, আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ পরিবার বিবর্জিত হয়ে ঢাকা নামের এক কুৎসিত শহরে দিনের পর দিন আর মাসের পর মাস পার করে। আমাদের বাড়ীর দারোয়ান, রিকশাচালক, প্রাইভেট ড্রাইভার, বাস-ট্রাক-থ্রি হুইলার চালক থেকে শুরু করে দোকানের কর্মচারী ও নানা প্রান্তিক জনসংখ্যা।

আপনার কি মনে হয়, এঁরা যৌন তাড়না বিবর্জিত প্রাণী ? এছাড়া রয়েছে, উঠতি তরুণ, বখে যাওয়া অ্যাডিক্ট যুব সমাজ। আচ্ছা বাদ দেন, এঁদের ব্যাপারে আপনার সহানুভূতি নাও থাকতে পারে। আপনি তো ফেসবুকে দেশ উদ্ধার করা আর বাইরে ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকা সমাজের প্রিভিলেজড একটা অংশ। কেউ আছে, শারীরিকভাবে পঙ্গু, অতি দরিদ্র নারী বিয়ে করে তারপর যৌন কামনা মেটানোর অর্থনৈতিক অবস্থা সহসাই আসার সম্ভাবনা কম যাঁদের। তাঁদের এই কামনা-বাসনা রিলিজের কোন ব্যবস্থা কি রেখেছে আমাদের অতি-ধার্মিক সমাজ ?

সমাজকে যথাসম্ভব দুর্গন্ধ মুক্ত রাখতে হলে নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছাড়া আমি তো কোন উপায় দেখি না।

প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর,২০১৫

“ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !”

কীভাবে প্রথম কথা , কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব আজ তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, মনেও নেই আমার । আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে টেক্সটাইলে প্রথমবারের মতো সেকেন্ড শিফট শুরু, প্রশাসনিক জটিলতায় প্রথমদিকে নতুনদের সাথে একটু ব্রাত্য বা হালকা দূরত্ব থাকলেও ঠিক মাস দুয়েকের মধ্যে সবাই সবার অসম্ভব কাছের হয়ে গেলাম।ছোট্ট শহীদ আজিজ হলের আবহাওয়াই বদলে গেল ; অনেকদিন পরে একবারে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রের পদচারনায়।

যদিও আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার তেমন কেউ ছিল না, ; তবে অন্য বোর্ডের কয়েকজন ছিল। সবচেয়ে বেশী মানসিক সাদৃশ্য যেটা ছিল সবার মধ্যে, সেটা হচ্ছে একধরনের মনক্ষুন্নতা—প্রকৌশলের সবচেয়ে অভিজাত প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ভর্তি ব্যর্থতার। হ্যাঁ, আমাদের সবাই হয়তো তথাকথিত সর্বোচ্চ মেধাবী ছিলাম না ; কিন্তু আমাদের মেধা ঠিক ফেলে দেওয়ার মতোও ছিল না। ঢাকা ও বাংলাদেশের জেলাশহরের নানাপ্রান্তের দূর্দান্ত ডাকসাইটে কয়েকজন ছাত্রের দেখা হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো মেধাবী ছিল সুমন। টেক্সটাইলের স্পিনিং ,ডাইং- ফিনিশিং এর চাপ এড়িয়ে ওঁর গন্তব্য যে শিক্ষকতা সেটা আমাদের মনে হয়নি কখনো।

পরীক্ষা এগিয়ে এলেই খুঁজে পেলাম আমাদের ২০তম ব্যাচের সবচেয়ে আস্থাবান বন্ধুকে আতিকুজ্জামান সুমনকে। আগের ব্যাচের সেলিম ভাইয়ের নোট বেশ পপুলার ছিল, তবে তাঁর হাতের লেখা ছিল একটু বড়ো টাইপের।সেই তুলনার সুমনের হাতের লেখা ছিল শাব্দিক অর্থেই মুক্তার মতো। সুমনের নোট ছাড়া কোন পরীক্ষা উৎরানো যাবে কল্পনাই করতে পারতাম না। PL( Preparatory Leave) শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দলবেঁধে ওঁকে তাগিদ দিতাম, দোস্ত ওই চ্যাপ্টারের নোটটা কবে শেষ করবি?

সম্ভবতঃ থার্ড ইয়ারে আমি একবার জিজ্ঞাস করলাম, সেলিম ভাইয়ের তো এই টপিক্সে একটা ভালো নোটই ছিল, তুই আবার নিজে বানাতে গেলি ক্যান। ওর উত্তর ছিল মনে রাখার মতো , পুরনো নোট আর পাঠ্যবই মিলিয়ে নিজের নোট করতে গেলে পড়া হয়ে যায়, আর নিজের লেখা নোট পড়তে বেশী ভালো লাগে,সেই সঙ্গে তোদেরও কাজে লাগে। মানুষ এতো নিঃস্বার্থ হয় কীভাবে !

ওর নোটই যে আমাদের একমাত্র পাথেয় পরীক্ষার পুলসিরাত পার হওয়ার সেটা ও ভালোভাবেই জানতো। নরমাল সাদা কাগজের ফটোকপি ভালো হয় না, তাই গুচ্ছের টাকা খরচ করে ওঁ সাদা অফসেটে পেলিক্যান কালির ইয়ুথ কলমের ঝকঝকে দূর্দান্ত লেখনীতে নোট করতো। সাদা লুঙ্গি পড়ে তকতকে টেবিলে উবু হয়ে নোট করছে সুমন, একটা চিরচেনাভঙ্গী ! বেশ ক্ষীণতনু ছিল , হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে ঈর্ষাও ছিল আবার ঠাট্টাও করতাম সবাই। জেনেটিক্যালি ও একটু হালকা স্বাস্থ্যের ছিল। শেষ দেখায়ও ওঁকে ওই ভাবেই পেয়েছি। মনে পড়ে, আমাদের ফটোকপি করতে সুবিধা হবে বলে ও মেশিনের ডায়াগ্রামগুলোও মাঝে মাঝেই কালো কালির কলমে করতো। ওঁর নোট হাতে পাওয়া মানে ছিল ওই সেমিস্টারের অর্ধেক পড়া হয়ে যাওয়া।

সারা ছাত্রজীবনে ওঁর চাপে পড়েই আমি নিজের হাতে শুধুমাত্র Viscose Fiber ও Fabric Designing চাপ্টারের নোট করেছিলাম। ওঁর অনুরোধ ছিল, মামা, তুই ওই চ্যাপ্টারে নোট করে ফ্যাল, আমি ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং গুলো করেই সময় করতে পারছি না। ওঁর ব্যস্ততার দিকে চেয়েই ওই নোট করা এবং সারা ছাত্রজীবনে ওই প্রথম এবং ওই শেষ। কিন্তু সুমনের হাতের লেখার পাশে আমার লেখা একেবারেই মানাচ্ছিল না। পরবর্তীতে আমি আর কোন নোট তৈরীও করিনি। একটু ভালোও লাগছিল, সারাবছর আমিই শুধু সুমনের নোট পড়ি, এই প্রথম ওঁ আমার নোট ফটোকপি করছে !

গত ডিসেম্বরে ছুটি রিসোর্টে সপরিবারে দেখা ! এর পরের গেট টুগেদারগুলোতে নানা কারণে ওঁর সাথে আমার দেখা হয়নি, বা হলেও ঠিক অনেকক্ষণ কথা হয়নি। রাত্রিযাপনের ওই ছুটিতে আমার স্ত্রীর সাথে ওঁর স্ত্রীর, ওঁর কন্যাদের বাচ্চাগুলোর ও আমার বাচ্চাদের মিথষ্ক্রিয়া। মিনা( আমার সহধর্মিনী) গত দুইদিন ধরে বারবার আফসোস করছে থেকে থেকে।

হল জীবনের অফুরান অসংখ্য স্মৃতি আছে। কিন্তু ওঁর মাঝে যে সদাহাস্যময় পরোপকারী মানুষটিকে আমরা দেখেছি, পেয়েছি– নিজেরা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। হুট করে জার্মানিতে পড়তে চলে গেলে সম্পর্কে একটু বিচ্ছিনতা এসেছিল , পরের বছরগুলোতে সেটা আর আমি আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আজ বেশী করে মনে পড়ছে বিশেষ একটা দিনের কথা !

চাকরি শুরু করার পরে আমরা যে যার কর্মক্ষেত্রে, ভীষণ ব্যস্ত। মোবাইলের যুগও তেমন করে শুরু হয়নি। ১৯৯৯ সালে ল্যান্ডফোনেই ওঁ জানালো, বহুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আমরা যেন অ্যাটেন্ড করি।৪০তম সমাবর্তন, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন আসবেন !আমার চরিত্রানুযায়ী যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইলেও ওঁ আমাকে বোঝাল এটা বিরাট সৌভাগ্যের সুযোগ । গ্রাজুয়েশেনের গাউন পরে সবার ছবি থাকে, আমাদেরও থাকবে। অনেকখানি ওঁর চাপে পড়েই সমাবর্তনে যাওয়া।

রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! “ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !” তাইতো, আমরা কথা কইছি, তুই নিরুত্তর। তোর অন্যলোকের যাত্রা শুভ হোক বন্ধু !

সমাবর্তনের দিনে আমার নিজের কোন ক্যামেরা ছিল না, ওঁর ক্যামেরায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললো ওঁ !অনেকবার অনেকবছর ধরে ভেবেছি ওঁর কাছ থেকে ছবির কপিগুলো চেয়ে নেব। এই ১৬ বছরে আর হল কই ! থাক্‌ তোর ক্যামেরায় তোলা ছবি আমার আর লাগবে না ! তুই নিজেইতো একটা ছবি হয়ে গেলি !

প্রকাশকালঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার- দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

সুস্বাস্থ্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারকে কখনো ভোজন রসিক মনে হয় নি । আড্ডা চলতে চলতেই বললেন, আমি একটু খেয়ে নিই। আমরা চিপস, বিস্কুট চা খেতে খেতে স্যারের কথায় সায় দিলাম। ছোট্ট টিফিন বাটি থেকে, সামান্য একটু সবজি আর কয়েক চামচ ভাত- এই ছিল তাঁর রাতের খাবার। অম্লতার কথা , বুকজ্বালার কথা বললেন। প্রবাসী কয়েকজনকে একটা বিশেষ অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের কথাও বললেন।স্যার নিয়মিত হাঁটাহাটি করেন পার্কে। শুনে ভালো লাগল। পার্কের এক মুশকো জোয়ানপ্রায় ভদ্রলোক যার বয়স আন্দাজ ৬০-৬৫ তার প্রসঙ্গ ওঠালেন। ওই লোকের শারীরিক গঠন দেখে স্যারদের কয়েকজন বেশ ঈর্ষান্বিত । তো একদিন , তাকে কাছে ডেকে বলা হল, ভাই আপনি তো ভালোই শরীরখানি ধরে রেখেছেন। তো গর্বিত লোকটি , হু হা করে একটু দাঁড়িয়ে বুক টান করে মাসল টাসল দেখাতে গেলো। স্যার , চেয়ার থেকে উঠে অভিনয় করে দেখালেন। যেই না , ওই স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক বুকটান করতে গেলেন , লাগলো কোমরে টান, ইঁ-ইঁ-ইঁ করে কোঁকাতে লাগলেন তিনি। স্যারের দাঁড়িয়ে দেখানো অভিনয় প্রতিভায় আমরা বরাবরের মতই মুগ্ধ হ’লাম। সোজা কথা দেখতে স্বাস্থ্যবান হলেই হবে না হে, সুস্বাস্থ্য থাকতে হবে !

ক্যাডেটের এক বন্ধু ছিল সঙ্গে। কী কারণে ক্যাডেটের কথা প্রসঙ্গ আসলে, স্যার ক্যাডেটের সমালোচনা করেছিলেন কোন একটা অনুষ্ঠানে । ক্যাডেট হচ্ছে দাস তৈরীর কারখানা বা এই রকম কিছু। পরে কোন এক প্রিন্সিপালের সাক্ষাতে স্যারকে তিনি উত্তেজিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলেন। স্যার বলেছিলেন, আপনারা তো কোরআন শরীফ না, যে সমালোচনা করা যাবে না ! ক্যাডেট কলেজ, সরকার , সংসদ কোনকিছুই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সেনাবাহিনীর এই উচ্চম্মন্যতা দীর্ঘদিনের লালিত, একাডেমী থেকে মগজের মধ্যে প্রোথিত । এরা সবসময় একটা অযোগ্য অহমিকায় ভোগে।

প্রথম আলোর মতিউর রহমান সাহেবের কথা উঠলো। এইলোক যতোগুলো পত্রিকায় ছিলেন সবগুলোই দারুণ সফল। স্যার মতিউর সাহেবের পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ভদ্রলোকের কতখানি মেধাবী । সেটা আলোচনাসাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু কাজের প্রতি তার ডেডিকেশন ও মনে রাখার ক্ষমতা অতুলনীয়।

তথাকথিত অর্থশালী, বিত্তবানদের কথা হচ্ছিল। স্যার একদিন তাঁর কোন এক সচিব বন্ধুর গাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সচিবালয়ের গেটে বিশাল স্যালুট। তো স্যারের বন্ধু, স্যারকে খানিকটা প্রচ্ছন্ন অহংকারের সাথেই বললেন, দেখলি, কত্তোবড় সালাম। স্যার, মৃদু হেসে বললেন, সালাম তোকে নয়রে , তোর গাড়ীকে দিচ্ছে।

পৃথিবীতে কত হাজার পিয়নের চাকরি চলে গেছে, শুধুমাত্র ঠিক সময়ে সালাম দিতে না পারায়!

আরে, তুই এতো বড়লোক ধনী, অর্থশালী, ক্ষমতাবান, — তুচ্ছ একটা পিয়নের সালাম না দেওয়াতে তোর এতো ক্ষোভ ! স্যারে কথা আমার মনে গেঁথে গেল, আসলেই আমরা যারা বেসরকারী চাকরিতে আছি। কলে কারখানায় অনেক গার্ড বা পিয়নের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে। সালাম দিলে ভালোই লাগে। না দিলে সমস্যা নাই। কিন্তু সত্যিকারে বিত্তশালীরা কেউ স্যালুট মিস করলে ওই তুচ্ছ পিয়নের চাকরি থাকে না , সে আমি জানি ।

কেন বিত্তশালীরা আরো, আরো আরো টাকা কামাতে চায় ? আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললাম, নিরাপত্তার জন্য, ভোগের জন্য, পরবর্তী বংশধরদের জীবন আরো নিশ্চিত করার জন্য। স্যার অসম্মতি প্রকাশ না করেই, একটু অন্যভাবে উত্তর দিলেন, আসলে সব ধনীরাই নিজেদের আরো বড় করে দেখতে চায়। মনুষ্য চরিত্র, নিজেকে বড়ো দেখানো। তো বিত্তবানেরা পারেই ওইটা, তাই বেশী বেশী কামিয়ে যতো বড়ো হওয়া যায় আর কী !

বামুনের বাড়ীর কাকাতুয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারের পুরোন গল্প। “ গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” নামের খুব কম প্রচলিত একটা বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। বইটা পড়া ছিল, বলাতে স্যার বেশ খুশী হলেন। এইরে একটা ভালো পাঠক আছে আমার , বলে রসিকতাও করলেন আমার সাথে । স্যারের , খুব প্রিয় একটা বই “ বিস্রস্ত জর্নাল ”। কয়েকবছর পরপরই বইমেলায় নতুন করে সংস্করণ বের করেন। কিছু লেখা নতুন করে লেখেন, সংশোধন , পরিমার্জন আবার কিছু যোগ করেন। ‘ কণ্ঠস্বর’ এর সম্পাদক কিছুটা পারফেকশনিস্ট হবেন, সে আর নতুন কী ! আমি বললাম, কতোবার পরিমার্জন করবেন বিস্রস্ত জর্নাল-কে। মনে হল, আরো কয়েকবার করার ইচ্ছা আছে স্যারের।

এখন কি পড়ছেন , বলতেই বললেন, এক সঙ্গে ১৪টা বই শুরু করেছেন। জীবন ছোট, তাই বোধহয় এতো তাড়া স্যারের। হয়তো অস্থিরতা থেকেই , একসঙ্গে এতোগুলো বই শুরু করেছেন।

প্রবাসজীবন নিয়ে কথা উঠতেই বললেন। ১৮ বছর পর্যন্ত যে ভূমিতে মানুষের বসবাস। যে আলোহাওয়া, ভাষা, শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি পরিপার্শ্ব নিয়ে বেড়ে ওঠে মানুষ আঠারো বছর পর্যন্ত ; ওইখানেই শিকড় বসে যায় তার! ১৮ বছরেই একজন মানুষের চিন্তাচেতনার অনেকখানিই গড়ে ওঠে । তারপরে তাকে পৃথিবীর যে প্রান্তেই নিয়ে যাওয়া যাক না কেন ; শিকড়কে ভুলতে পারে না, বারে বারে ওই খানেই ফিরে আসে, ফিরে আসতে চায় ! কাউকে যদি, আরেকটু আগেভাগেই বছরের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে সে নতুন করে শিকড় গজাতে পারে।

চিন্তা করে দেখলাম , আমাদের বন্ধুদের যারাই একটু কম বয়েসে বিদেশ পাড়ি দিয়েছ, তাদের জীবন ও পিছুটান যতোখানি কম, অন্যরা যারা দেরি করে পাড়ি দিয়েছে তাদের ততোখানিই বেশী। কী বিপুল বেদনা নিয়েই না তারা দেশের মাটিতে ফিরে আসে বার বার। মাতৃভূমির সবকিছু নিয়েই তাদের ক্ষোভ, কিন্তু কোনভাবেই ভুলতে পারে না মাতৃভূমিকে !

মানব জীবনের ঐশ্বর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। মানুষ শীর্ষ দেখতে চায়, পূজা করে। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে হিমালয়। কিন্তু যতো আলোচনা মাত্র ২৯,০০০ ফিটের এভারেস্ট নিয়েই ! তোমার ঐশ্বর্য থাকলে তা মানুষের কাছে ধরা পড়বেই । স্যারের আগের একদিনের আলোচনার কথা মনে পড়ে গেল। হাজী মুহম্মাদ মহসীনের সময় এই ভারতবর্ষে কয়েক লক্ষ লোকের তাঁর সমপরিমাণ টাকা ছিল । কেউ তাদের কথা মনে রাখেনি। কিন্তু তাঁর সর্বস্ব ( তৎকালীন দেড় লক্ষ টাকা ) মানুষের কল্যাণে দান করেছিলেন। তাঁকে সারাজীবন মনে রেখেছে মানুষ । আসলেইতো মানুষ অকৃতজ্ঞ নয় । মানুষ ওই অসংখ্য ভোগী জমিদার ও রাজা-মহারাজাদেরকে মনে রাখে না, রাখে হাজী মুহম্মাদ মহসীনকে!

স্যারের বক্তৃতামালা নিয়ে কয়েকটা বই বের হয়েছে গত বইমেলায়, অনেকদিন পরে। স্যার একটু আফসোস করছিলেন, কতো প্রজ্জ্বলিত অনুভূতি কথামালা উনি জ্বালিয়ে গেছেন, কেউ মনে রাখেনি। কেন্দ্রের অনেককে অনেক বার বলেছেন, কোন আলোচনা হলে একটা ক্যাসেট রেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতে। হা হতিশ্যি ! চলে গেলে আর কোথায় পাবে বাছা !

স্যারের একটা প্রিয় তর্কের বিষয় হয়তো বার্ধক্য। বার্ধক্য নিয়ে স্যারের কখনোই হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। বছর কুড়ি আগেও কলেজ কর্মসূচির আলোচনায় , তাঁর বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্যার বার্ধক্যের জয়গান করতেন। স্যারের কথায়, বার্ধক্যতো একটা যোগ্যতা। আমার এই পরিপক্কতায় আসতে কতোখানি কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে !সবাইতো বৃদ্ধ হতে পারেনা। অনেকেই তার আগেই হারিয়ে যায়। ফুল হচ্ছে ফলের অন্তিম পরিণতির আগের মুহূর্ত। শেষের শুরু। মৃত্যু যদি হয় শেষ কথা তবে তাঁর দেদীপ্যমান শেষ প্রজ্বলনতো বার্ধ্যক্যেই !

আমাদের সবাইকে শরীরের যত্ন নিতে বললেন, কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন। ছেলেমেয়েদেরকে লাইব্রেরীতে যাওয়া আসা করাতে বললেন। স্যারের কাছে আমি মোটামুটি একটা প্রতিজ্ঞা করে আসলাম- বড়োকন্যাকে লাইব্রেরির সদস্য করে দেব। একটা ফর্মও তুলে এনেছি।

২০ বছরের দীর্ঘ বিরতিতে স্যারের সাথে অন্তরঙ্গ কয়েকঘন্টার আড্ডা কীভাবে যে কেটে গেল ! রাত আটটায় শুরু হয়ে কখন সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে! সবাই কেন্দ্র থেকে বের হলাম একরাশ স্মৃতিকাতরতা নিয়ে, ফেলে আসা ঐশ্বর্যময় দিনগুলোর কথা মনে করে। আবারো হয়তো দেখা হবে , এই ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে। স্যার সাদারঙের গাড়ীটি নিজে চালিয়ে বের হয়ে গেলেন । আমরাও বিদায় নিলাম , আবেশিত মনে, স্বপ্নতাড়িত হয়ে রওয়ানা দিলাম যার যার পথে !

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর, ২০১৫

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গেলাম বছর বিশেক পরে গত ২৪শে আগস্টে। কেন্দ্রের ৯০ ব্যাচের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতীর্থ কয়েকজনের সাথে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে স্যারের ছোট্টরুমে মুখোমুখি । মূলতঃ প্রবাসী সতীর্থ খাদিজা ও শাহনীলাই আড্ডার উদ্যোক্তা। স্যারের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।

আমার কাছে কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সমার্থক। ফোনে ফোনে ও কেন্দ্রের নতুন ছাদে চা-পুরি খেতে খেতে সতীর্থদের করজোড়ে অনুরোধও করলাম , আমার এই দীর্ঘ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের ব্যাপারটা স্যারের সামনে চেপে যেতে ; বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে । ভয় ছিল , স্যার যদি আমার আলস্য দেখে বিরক্ত হয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ ধ্যাত !’ বলে বসেন , তবে লজ্জার শেষ থাকবে না ! আসলে পড়াশুনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে কখন যে কলেজ কর্মসূচী , প্রাক-মৌলিক , মৌলিক ছেড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে গেলাম মনেই নেই ! একবার তার ছিঁড়ে গেলে যা হয়, সে আর লাগে না জোড়া।

এতো অনুরোধের পরেও , কয়েকটি বাক্যের কথপোকথনের পরেই , একজন মনে করিয়ে দিল, স্যার , জাহিদ বিশ বছর পরে কেন্দ্রে এসেছে ! স্যারের চিরকালীন প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখের অভ্যর্থনাই পেলাম মনে হল। হাঁফ, ছাড়লাম, পুরনোদের মাঝে মিশে যেতে পেরে। এতোদিন পরেও আমার মতো অভাগার ব্যাপারে স্যারের সহানুভূতিতে মুগ্ধ ! আসলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালীন।অনেক দূর থেকেও শিক্ষক যেমন টের পেয়ে যান জনারণ্যে কে তাঁর ছাত্র ; ঠিক তেমনি করেই ছাত্রটিও মুহুর্তেই পুনঃআবিষ্কার করে শিক্ষকের প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধার সম্পর্কটিকে । তবে, তাঁকে ( মানে ওই শিক্ষককে হতে হয় , মানবিক ও উদ্বুদ্ধকারী)। যে শিক্ষক ছাত্রের গায়ে বেতের বাড়ি, অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া কিছু করেন নাই ; মস্তিষ্কের উপরে , হৃদয়ের উপরে দাগ ফেলতে পারেন নাই, তাদের কথা আলাদা। কোন ছাত্রই তাদের দীর্ঘদিন মনে রাখনি। শিক্ষকতা তাদের কাছে ক্ষুন্নিবৃত্তির একটা উপায় মাত্র ছিল। আমার স্কুল জীবনে ও কলেজ জীবনে এরকম দায়সারা গোছের শিক্ষক নিতান্ত কম ছিল না। এখন আরো বেড়েছে।

প্রবাসী বন্ধুদের (খাদিজা,শাহনীলা) সাথে স্যারের আন্তরিক সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিতই হলাম ! এঁরা দূর লন্ডন ও কুয়েতে থেকেও কী গভীর মমতায় , কী শুদ্ধ শ্রদ্ধায় স্যারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। আর আমি বাংলামোটর থেকে মাইল দশেক দূরে মিরপুরে থেকেও কেন্দ্র , স্যার সবকিছু থেকে থেকে সহস্র মাইল দূরে !

৯০ সালে ঢাকা কলেজে স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। বিলাসী পড়াতেন মনে আছে! আমাদের উন্মুখ হৃদয়ে স্যারে একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট ছিল চিরকালীন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

এতোদিন পরে, কেন্দ্রে যাচ্ছি, রাস্তা একটাই জানি। এও শুনেছি, কেন্দ্র নাকি অনেক উঁচু ইমারতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সেই ছিমছাম সুরঞ্জনা , সামনে ঘাসের লন, লনের শেষে বৃদ্ধ আম গাছ, কিছুই নাকি নেই। কেন্দ্রের নতুন বিল্ডিং এর ব্যাপারে আমি আরেক সতীর্থ ডন আজাদের সাথে একমত পোষণ করলাম!কেন্দ্র তার রোম্যান্টিক মৃদুমন্দ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। ওঁর ভাষায় কেন্দ্রের চেহারা বৈপ্লবিক ও আগ্রাসী হয়েছে (Revolutionary and Aggressive ) ! এইটার দরকার ছিল।

সায়ীদ স্যার কিন্তু আগের মতোই আছেন।

কলেজ কর্মসূচীর মাধ্যমে ১৯৯০ বা ৯১ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাথে আমাদের পরিচয়। কারো কারো স্কুল থেকেই হয়তোবা। স্যারের আলোকচ্ছটায় মুগ্ধ কৈশোরের অনেকেই এখন চল্লিশোর্ধ। যদিও পেশা ও জীবিকার বৈচিত্র্যে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কেন্দ্রমুখী প্রাণের টান রয়ে গেছে সবার । এমন একটা উন্মুখ সময়ে স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় ! তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য । ঘন্টা খানেকের আড্ডায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল! আড্ডার শুরুতেই মনে হয়নি, এতোটা স্মৃতিমেদুরতা থাকবে, এইভাবে আমরা কয়েকজন ফিরে যাবো আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে। স্যার কলেজ কর্মসূচির সময়েও অনভিজ্ঞ তারুণ্যের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া, জ্ঞানবিজ্ঞানের যে কোন আলোচনায় আমরা স্যারের বয়স্য বিবেচিত হতাম বলে মনে আছে।

স্যারের সাথে একদিনের আড্ডা মানেতো এক দশকের ইন্সপিরেশন !স্মৃতিতে ধুলো পড়ার আগেই , আড্ডাটাকে দিনলিপির মতো করে লিখে রাখলাম। পরে এই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে ভালোই লাগবে!

দীর্ঘ বিরতিতে আলোচনার নতুন বিষয় ছিল আমাদের সন্তানদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা। আমরাও কয়েকজন জয়া আপা( স্যারে কনিষ্ঠা) ও লুনা আপার( জ্যৈষ্ঠা ) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কথার মাঝেই , আলোচনা শুরু হল

বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুর মতো একটা ভয়ংকর বিভীষিকা দানবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কলকাকলিমুখর জীবনের সামনে, এইটুকুই ! মৃত্যু নিয়ে স্যারের আর কোন কথা ছিল না।

মৃত্যু থেকে লাফ দিয়ে চলে গেলেন রোমান্টিসিজমে। কয়েক শতক আগেও আমদের সাহিত্যে, জীবনে কোথাও রোমান্টিকতা ছিলনা। এই উপমহাদেশের জীবন ছিল নিতান্তই জৈবিক , অন্নবস্ত্র বাসস্থান , যুদ্ধ, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন এইতো ! ষষ্ট শতকের কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কথা ওঠালেন স্যার। নির্বাসিত বিরহী যক্ষে তাঁর ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চায় মেঘের মাধ্যমে। এইটুকু ছাড়া পুরো বর্ণনায় প্রিয়ার দেহের বাঁক , কামনা আর হুতাশন। শারীরিকতা বা দৈহিকতাই প্রধান। রোমান্টিকতা নেই । সেই আমরাই একসময় , সংস্কৃত ইতিহাস থেকে উঠে এসে রোমান্টিকতায় ভেসে যাচ্ছি।

স্যারের পর্যবেক্ষনে মানুষ সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। আমরা সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমাদের সবার বিয়ের মোটামুটি কমবেশী বারো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে !

এক বন্ধুতো মন্তব্য করেই ফেলল, স্যার এইজন্যই সব কিছু পানসে পানসে লাগছে। রোমাঞ্চ নেই, বড্ডো একঘেয়েঁমি ! হাসির একটা হুল্লোর উঠলো ছোট্ট রুমটাতে।

ইংল্যান্ডে কোন একটা প্রাচীন স্থাপনা দেখার প্রসঙ্গ আসতেই , আলোচনা অজন্তা, ইলোরাতে চলে গেল। স্যারের মুখের সৌকর্যময় বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার নিজেরই ইচ্ছা করছিল, অজন্তা ও ইলোরা দেখতে।

কেন্দ্রের পুরোনোদের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা উঠলো, ডাঃ আব্দুন নুর তুষার ভাইয়ের ব্যাপারে স্যার বললেন, ছেলেটা মেধাবী, কেন আরো উপরে যেতে পারছে না বলতো ? নিজেই উত্তর দিলেন, কারণ ও অলস ! আরো পরিশ্রমী হলে ও অনেকদূর যেতে পারত।

নতুন সরকারের নানামুখী কাজের পাশাপাশি পুরনো আমলের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রসঙ্গ উঠল। সম্ভবতঃ নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মতো সরে জমিনে ফিল্ড ট্রিপের অভ্যাস থেকেই নাজমুল হুদার কথা উঠেছিল। তারও অভ্যাস ছিল হুট করে পথে নেমে নিজে নিজেই সরেজমিনে শো অফ করা ; বাহাদুরি দেখানো। তো স্যার একদিন নাজমুল হুদাকে বললেন, এইটা তার করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ নেতা কেন সম্মুখসমরে যাবে? নেতার হাতে কেন তরবারী থাকবে? কোন কারণে একজন সাধারণ জনগণ যদি নেতাকে বা মন্ত্রীকে একটা চড়ও মেরে বসে, মানসম্মান কী আর উঠে আসবে ?

ব্রাহ্মণ্য নিয়ে , কৌলিন্য বা এলিটিজম নিয়ে, যতোই দ্বেষ থাকুক না কেন, স্যার নিজেকে, শিক্ষকদেরকে সমাজের ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন । সেদিনও দিলেন। জাতভেদে যারা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, সমাজের মাথা তারাতো ব্রাহ্মণই । ব্রাহ্মণ মাথা চালাবে। যুদ্ধ করবে ক্ষত্রিয় । বৈশ্য করবে ব্যবসা। শূদ্র বাকী তুচ্ছ কাজগুলো। দাবার বোর্ডে রাজা স্বয়ং যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধ করে অন্যরা। তরবারীর এক খোঁচায় রাজা ঠুস্‌ করলেতো যুদ্ধই শেষ !

সরকার থেকে কেন্দ্র ডেমরা বা গেণ্ডারিয়াতে একটা জমি পেয়েছে। ঐখানে স্থাপনার জন্য দশ কোটি টাকার একটা আবেদন করে বসে আছেন কবে থেকে। স্যারের ইচ্ছা একটা মিলনায়তন বা প্লাজা টাইপকরে কেন্দ্রের কিছু অর্থসংস্থান করা। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীগুলোর খরচ, স্কুল কর্মসূচির খরচ, প্রকাশনা ইত্যাদি দিনে দিনে বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে ! ঘুরে ফিরে আত্মীয়তন্ত্রের কথা চলে আসলো, শত শত কোটি টাকা হাপিস হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু শিক্ষার জন্য দশকোটি মানেই দ্বারে দ্বারে ঘোরা।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য )

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর ২০১৫