জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার- দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

সুস্বাস্থ্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারকে কখনো ভোজন রসিক মনে হয় নি । আড্ডা চলতে চলতেই বললেন, আমি একটু খেয়ে নিই। আমরা চিপস, বিস্কুট চা খেতে খেতে স্যারের কথায় সায় দিলাম। ছোট্ট টিফিন বাটি থেকে, সামান্য একটু সবজি আর কয়েক চামচ ভাত- এই ছিল তাঁর রাতের খাবার। অম্লতার কথা , বুকজ্বালার কথা বললেন। প্রবাসী কয়েকজনকে একটা বিশেষ অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের কথাও বললেন।স্যার নিয়মিত হাঁটাহাটি করেন পার্কে। শুনে ভালো লাগল। পার্কের এক মুশকো জোয়ানপ্রায় ভদ্রলোক যার বয়স আন্দাজ ৬০-৬৫ তার প্রসঙ্গ ওঠালেন। ওই লোকের শারীরিক গঠন দেখে স্যারদের কয়েকজন বেশ ঈর্ষান্বিত । তো একদিন , তাকে কাছে ডেকে বলা হল, ভাই আপনি তো ভালোই শরীরখানি ধরে রেখেছেন। তো গর্বিত লোকটি , হু হা করে একটু দাঁড়িয়ে বুক টান করে মাসল টাসল দেখাতে গেলো। স্যার , চেয়ার থেকে উঠে অভিনয় করে দেখালেন। যেই না , ওই স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক বুকটান করতে গেলেন , লাগলো কোমরে টান, ইঁ-ইঁ-ইঁ করে কোঁকাতে লাগলেন তিনি। স্যারের দাঁড়িয়ে দেখানো অভিনয় প্রতিভায় আমরা বরাবরের মতই মুগ্ধ হ’লাম। সোজা কথা দেখতে স্বাস্থ্যবান হলেই হবে না হে, সুস্বাস্থ্য থাকতে হবে !

ক্যাডেটের এক বন্ধু ছিল সঙ্গে। কী কারণে ক্যাডেটের কথা প্রসঙ্গ আসলে, স্যার ক্যাডেটের সমালোচনা করেছিলেন কোন একটা অনুষ্ঠানে । ক্যাডেট হচ্ছে দাস তৈরীর কারখানা বা এই রকম কিছু। পরে কোন এক প্রিন্সিপালের সাক্ষাতে স্যারকে তিনি উত্তেজিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলেন। স্যার বলেছিলেন, আপনারা তো কোরআন শরীফ না, যে সমালোচনা করা যাবে না ! ক্যাডেট কলেজ, সরকার , সংসদ কোনকিছুই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সেনাবাহিনীর এই উচ্চম্মন্যতা দীর্ঘদিনের লালিত, একাডেমী থেকে মগজের মধ্যে প্রোথিত । এরা সবসময় একটা অযোগ্য অহমিকায় ভোগে।

প্রথম আলোর মতিউর রহমান সাহেবের কথা উঠলো। এইলোক যতোগুলো পত্রিকায় ছিলেন সবগুলোই দারুণ সফল। স্যার মতিউর সাহেবের পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ভদ্রলোকের কতখানি মেধাবী । সেটা আলোচনাসাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু কাজের প্রতি তার ডেডিকেশন ও মনে রাখার ক্ষমতা অতুলনীয়।

তথাকথিত অর্থশালী, বিত্তবানদের কথা হচ্ছিল। স্যার একদিন তাঁর কোন এক সচিব বন্ধুর গাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সচিবালয়ের গেটে বিশাল স্যালুট। তো স্যারের বন্ধু, স্যারকে খানিকটা প্রচ্ছন্ন অহংকারের সাথেই বললেন, দেখলি, কত্তোবড় সালাম। স্যার, মৃদু হেসে বললেন, সালাম তোকে নয়রে , তোর গাড়ীকে দিচ্ছে।

পৃথিবীতে কত হাজার পিয়নের চাকরি চলে গেছে, শুধুমাত্র ঠিক সময়ে সালাম দিতে না পারায়!

আরে, তুই এতো বড়লোক ধনী, অর্থশালী, ক্ষমতাবান, — তুচ্ছ একটা পিয়নের সালাম না দেওয়াতে তোর এতো ক্ষোভ ! স্যারে কথা আমার মনে গেঁথে গেল, আসলেই আমরা যারা বেসরকারী চাকরিতে আছি। কলে কারখানায় অনেক গার্ড বা পিয়নের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে। সালাম দিলে ভালোই লাগে। না দিলে সমস্যা নাই। কিন্তু সত্যিকারে বিত্তশালীরা কেউ স্যালুট মিস করলে ওই তুচ্ছ পিয়নের চাকরি থাকে না , সে আমি জানি ।

কেন বিত্তশালীরা আরো, আরো আরো টাকা কামাতে চায় ? আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললাম, নিরাপত্তার জন্য, ভোগের জন্য, পরবর্তী বংশধরদের জীবন আরো নিশ্চিত করার জন্য। স্যার অসম্মতি প্রকাশ না করেই, একটু অন্যভাবে উত্তর দিলেন, আসলে সব ধনীরাই নিজেদের আরো বড় করে দেখতে চায়। মনুষ্য চরিত্র, নিজেকে বড়ো দেখানো। তো বিত্তবানেরা পারেই ওইটা, তাই বেশী বেশী কামিয়ে যতো বড়ো হওয়া যায় আর কী !

বামুনের বাড়ীর কাকাতুয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারের পুরোন গল্প। “ গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” নামের খুব কম প্রচলিত একটা বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। বইটা পড়া ছিল, বলাতে স্যার বেশ খুশী হলেন। এইরে একটা ভালো পাঠক আছে আমার , বলে রসিকতাও করলেন আমার সাথে । স্যারের , খুব প্রিয় একটা বই “ বিস্রস্ত জর্নাল ”। কয়েকবছর পরপরই বইমেলায় নতুন করে সংস্করণ বের করেন। কিছু লেখা নতুন করে লেখেন, সংশোধন , পরিমার্জন আবার কিছু যোগ করেন। ‘ কণ্ঠস্বর’ এর সম্পাদক কিছুটা পারফেকশনিস্ট হবেন, সে আর নতুন কী ! আমি বললাম, কতোবার পরিমার্জন করবেন বিস্রস্ত জর্নাল-কে। মনে হল, আরো কয়েকবার করার ইচ্ছা আছে স্যারের।

এখন কি পড়ছেন , বলতেই বললেন, এক সঙ্গে ১৪টা বই শুরু করেছেন। জীবন ছোট, তাই বোধহয় এতো তাড়া স্যারের। হয়তো অস্থিরতা থেকেই , একসঙ্গে এতোগুলো বই শুরু করেছেন।

প্রবাসজীবন নিয়ে কথা উঠতেই বললেন। ১৮ বছর পর্যন্ত যে ভূমিতে মানুষের বসবাস। যে আলোহাওয়া, ভাষা, শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি পরিপার্শ্ব নিয়ে বেড়ে ওঠে মানুষ আঠারো বছর পর্যন্ত ; ওইখানেই শিকড় বসে যায় তার! ১৮ বছরেই একজন মানুষের চিন্তাচেতনার অনেকখানিই গড়ে ওঠে । তারপরে তাকে পৃথিবীর যে প্রান্তেই নিয়ে যাওয়া যাক না কেন ; শিকড়কে ভুলতে পারে না, বারে বারে ওই খানেই ফিরে আসে, ফিরে আসতে চায় ! কাউকে যদি, আরেকটু আগেভাগেই বছরের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে সে নতুন করে শিকড় গজাতে পারে।

চিন্তা করে দেখলাম , আমাদের বন্ধুদের যারাই একটু কম বয়েসে বিদেশ পাড়ি দিয়েছ, তাদের জীবন ও পিছুটান যতোখানি কম, অন্যরা যারা দেরি করে পাড়ি দিয়েছে তাদের ততোখানিই বেশী। কী বিপুল বেদনা নিয়েই না তারা দেশের মাটিতে ফিরে আসে বার বার। মাতৃভূমির সবকিছু নিয়েই তাদের ক্ষোভ, কিন্তু কোনভাবেই ভুলতে পারে না মাতৃভূমিকে !

মানব জীবনের ঐশ্বর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। মানুষ শীর্ষ দেখতে চায়, পূজা করে। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে হিমালয়। কিন্তু যতো আলোচনা মাত্র ২৯,০০০ ফিটের এভারেস্ট নিয়েই ! তোমার ঐশ্বর্য থাকলে তা মানুষের কাছে ধরা পড়বেই । স্যারের আগের একদিনের আলোচনার কথা মনে পড়ে গেল। হাজী মুহম্মাদ মহসীনের সময় এই ভারতবর্ষে কয়েক লক্ষ লোকের তাঁর সমপরিমাণ টাকা ছিল । কেউ তাদের কথা মনে রাখেনি। কিন্তু তাঁর সর্বস্ব ( তৎকালীন দেড় লক্ষ টাকা ) মানুষের কল্যাণে দান করেছিলেন। তাঁকে সারাজীবন মনে রেখেছে মানুষ । আসলেইতো মানুষ অকৃতজ্ঞ নয় । মানুষ ওই অসংখ্য ভোগী জমিদার ও রাজা-মহারাজাদেরকে মনে রাখে না, রাখে হাজী মুহম্মাদ মহসীনকে!

স্যারের বক্তৃতামালা নিয়ে কয়েকটা বই বের হয়েছে গত বইমেলায়, অনেকদিন পরে। স্যার একটু আফসোস করছিলেন, কতো প্রজ্জ্বলিত অনুভূতি কথামালা উনি জ্বালিয়ে গেছেন, কেউ মনে রাখেনি। কেন্দ্রের অনেককে অনেক বার বলেছেন, কোন আলোচনা হলে একটা ক্যাসেট রেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতে। হা হতিশ্যি ! চলে গেলে আর কোথায় পাবে বাছা !

স্যারের একটা প্রিয় তর্কের বিষয় হয়তো বার্ধক্য। বার্ধক্য নিয়ে স্যারের কখনোই হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। বছর কুড়ি আগেও কলেজ কর্মসূচির আলোচনায় , তাঁর বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্যার বার্ধক্যের জয়গান করতেন। স্যারের কথায়, বার্ধক্যতো একটা যোগ্যতা। আমার এই পরিপক্কতায় আসতে কতোখানি কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে !সবাইতো বৃদ্ধ হতে পারেনা। অনেকেই তার আগেই হারিয়ে যায়। ফুল হচ্ছে ফলের অন্তিম পরিণতির আগের মুহূর্ত। শেষের শুরু। মৃত্যু যদি হয় শেষ কথা তবে তাঁর দেদীপ্যমান শেষ প্রজ্বলনতো বার্ধ্যক্যেই !

আমাদের সবাইকে শরীরের যত্ন নিতে বললেন, কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন। ছেলেমেয়েদেরকে লাইব্রেরীতে যাওয়া আসা করাতে বললেন। স্যারের কাছে আমি মোটামুটি একটা প্রতিজ্ঞা করে আসলাম- বড়োকন্যাকে লাইব্রেরির সদস্য করে দেব। একটা ফর্মও তুলে এনেছি।

২০ বছরের দীর্ঘ বিরতিতে স্যারের সাথে অন্তরঙ্গ কয়েকঘন্টার আড্ডা কীভাবে যে কেটে গেল ! রাত আটটায় শুরু হয়ে কখন সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে! সবাই কেন্দ্র থেকে বের হলাম একরাশ স্মৃতিকাতরতা নিয়ে, ফেলে আসা ঐশ্বর্যময় দিনগুলোর কথা মনে করে। আবারো হয়তো দেখা হবে , এই ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে। স্যার সাদারঙের গাড়ীটি নিজে চালিয়ে বের হয়ে গেলেন । আমরাও বিদায় নিলাম , আবেশিত মনে, স্বপ্নতাড়িত হয়ে রওয়ানা দিলাম যার যার পথে !

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর, ২০১৫

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গেলাম বছর বিশেক পরে গত ২৪শে আগস্টে। কেন্দ্রের ৯০ ব্যাচের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতীর্থ কয়েকজনের সাথে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে স্যারের ছোট্টরুমে মুখোমুখি । মূলতঃ প্রবাসী সতীর্থ খাদিজা ও শাহনীলাই আড্ডার উদ্যোক্তা। স্যারের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।

আমার কাছে কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সমার্থক। ফোনে ফোনে ও কেন্দ্রের নতুন ছাদে চা-পুরি খেতে খেতে সতীর্থদের করজোড়ে অনুরোধও করলাম , আমার এই দীর্ঘ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের ব্যাপারটা স্যারের সামনে চেপে যেতে ; বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে । ভয় ছিল , স্যার যদি আমার আলস্য দেখে বিরক্ত হয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ ধ্যাত !’ বলে বসেন , তবে লজ্জার শেষ থাকবে না ! আসলে পড়াশুনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে কখন যে কলেজ কর্মসূচী , প্রাক-মৌলিক , মৌলিক ছেড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে গেলাম মনেই নেই ! একবার তার ছিঁড়ে গেলে যা হয়, সে আর লাগে না জোড়া।

এতো অনুরোধের পরেও , কয়েকটি বাক্যের কথপোকথনের পরেই , একজন মনে করিয়ে দিল, স্যার , জাহিদ বিশ বছর পরে কেন্দ্রে এসেছে ! স্যারের চিরকালীন প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখের অভ্যর্থনাই পেলাম মনে হল। হাঁফ, ছাড়লাম, পুরনোদের মাঝে মিশে যেতে পেরে। এতোদিন পরেও আমার মতো অভাগার ব্যাপারে স্যারের সহানুভূতিতে মুগ্ধ ! আসলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালীন।অনেক দূর থেকেও শিক্ষক যেমন টের পেয়ে যান জনারণ্যে কে তাঁর ছাত্র ; ঠিক তেমনি করেই ছাত্রটিও মুহুর্তেই পুনঃআবিষ্কার করে শিক্ষকের প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধার সম্পর্কটিকে । তবে, তাঁকে ( মানে ওই শিক্ষককে হতে হয় , মানবিক ও উদ্বুদ্ধকারী)। যে শিক্ষক ছাত্রের গায়ে বেতের বাড়ি, অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া কিছু করেন নাই ; মস্তিষ্কের উপরে , হৃদয়ের উপরে দাগ ফেলতে পারেন নাই, তাদের কথা আলাদা। কোন ছাত্রই তাদের দীর্ঘদিন মনে রাখনি। শিক্ষকতা তাদের কাছে ক্ষুন্নিবৃত্তির একটা উপায় মাত্র ছিল। আমার স্কুল জীবনে ও কলেজ জীবনে এরকম দায়সারা গোছের শিক্ষক নিতান্ত কম ছিল না। এখন আরো বেড়েছে।

প্রবাসী বন্ধুদের (খাদিজা,শাহনীলা) সাথে স্যারের আন্তরিক সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিতই হলাম ! এঁরা দূর লন্ডন ও কুয়েতে থেকেও কী গভীর মমতায় , কী শুদ্ধ শ্রদ্ধায় স্যারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। আর আমি বাংলামোটর থেকে মাইল দশেক দূরে মিরপুরে থেকেও কেন্দ্র , স্যার সবকিছু থেকে থেকে সহস্র মাইল দূরে !

৯০ সালে ঢাকা কলেজে স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। বিলাসী পড়াতেন মনে আছে! আমাদের উন্মুখ হৃদয়ে স্যারে একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট ছিল চিরকালীন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

এতোদিন পরে, কেন্দ্রে যাচ্ছি, রাস্তা একটাই জানি। এও শুনেছি, কেন্দ্র নাকি অনেক উঁচু ইমারতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সেই ছিমছাম সুরঞ্জনা , সামনে ঘাসের লন, লনের শেষে বৃদ্ধ আম গাছ, কিছুই নাকি নেই। কেন্দ্রের নতুন বিল্ডিং এর ব্যাপারে আমি আরেক সতীর্থ ডন আজাদের সাথে একমত পোষণ করলাম!কেন্দ্র তার রোম্যান্টিক মৃদুমন্দ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। ওঁর ভাষায় কেন্দ্রের চেহারা বৈপ্লবিক ও আগ্রাসী হয়েছে (Revolutionary and Aggressive ) ! এইটার দরকার ছিল।

সায়ীদ স্যার কিন্তু আগের মতোই আছেন।

কলেজ কর্মসূচীর মাধ্যমে ১৯৯০ বা ৯১ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাথে আমাদের পরিচয়। কারো কারো স্কুল থেকেই হয়তোবা। স্যারের আলোকচ্ছটায় মুগ্ধ কৈশোরের অনেকেই এখন চল্লিশোর্ধ। যদিও পেশা ও জীবিকার বৈচিত্র্যে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কেন্দ্রমুখী প্রাণের টান রয়ে গেছে সবার । এমন একটা উন্মুখ সময়ে স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় ! তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য । ঘন্টা খানেকের আড্ডায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল! আড্ডার শুরুতেই মনে হয়নি, এতোটা স্মৃতিমেদুরতা থাকবে, এইভাবে আমরা কয়েকজন ফিরে যাবো আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে। স্যার কলেজ কর্মসূচির সময়েও অনভিজ্ঞ তারুণ্যের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া, জ্ঞানবিজ্ঞানের যে কোন আলোচনায় আমরা স্যারের বয়স্য বিবেচিত হতাম বলে মনে আছে।

স্যারের সাথে একদিনের আড্ডা মানেতো এক দশকের ইন্সপিরেশন !স্মৃতিতে ধুলো পড়ার আগেই , আড্ডাটাকে দিনলিপির মতো করে লিখে রাখলাম। পরে এই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে ভালোই লাগবে!

দীর্ঘ বিরতিতে আলোচনার নতুন বিষয় ছিল আমাদের সন্তানদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা। আমরাও কয়েকজন জয়া আপা( স্যারে কনিষ্ঠা) ও লুনা আপার( জ্যৈষ্ঠা ) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কথার মাঝেই , আলোচনা শুরু হল

বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুর মতো একটা ভয়ংকর বিভীষিকা দানবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কলকাকলিমুখর জীবনের সামনে, এইটুকুই ! মৃত্যু নিয়ে স্যারের আর কোন কথা ছিল না।

মৃত্যু থেকে লাফ দিয়ে চলে গেলেন রোমান্টিসিজমে। কয়েক শতক আগেও আমদের সাহিত্যে, জীবনে কোথাও রোমান্টিকতা ছিলনা। এই উপমহাদেশের জীবন ছিল নিতান্তই জৈবিক , অন্নবস্ত্র বাসস্থান , যুদ্ধ, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন এইতো ! ষষ্ট শতকের কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কথা ওঠালেন স্যার। নির্বাসিত বিরহী যক্ষে তাঁর ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চায় মেঘের মাধ্যমে। এইটুকু ছাড়া পুরো বর্ণনায় প্রিয়ার দেহের বাঁক , কামনা আর হুতাশন। শারীরিকতা বা দৈহিকতাই প্রধান। রোমান্টিকতা নেই । সেই আমরাই একসময় , সংস্কৃত ইতিহাস থেকে উঠে এসে রোমান্টিকতায় ভেসে যাচ্ছি।

স্যারের পর্যবেক্ষনে মানুষ সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। আমরা সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমাদের সবার বিয়ের মোটামুটি কমবেশী বারো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে !

এক বন্ধুতো মন্তব্য করেই ফেলল, স্যার এইজন্যই সব কিছু পানসে পানসে লাগছে। রোমাঞ্চ নেই, বড্ডো একঘেয়েঁমি ! হাসির একটা হুল্লোর উঠলো ছোট্ট রুমটাতে।

ইংল্যান্ডে কোন একটা প্রাচীন স্থাপনা দেখার প্রসঙ্গ আসতেই , আলোচনা অজন্তা, ইলোরাতে চলে গেল। স্যারের মুখের সৌকর্যময় বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার নিজেরই ইচ্ছা করছিল, অজন্তা ও ইলোরা দেখতে।

কেন্দ্রের পুরোনোদের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা উঠলো, ডাঃ আব্দুন নুর তুষার ভাইয়ের ব্যাপারে স্যার বললেন, ছেলেটা মেধাবী, কেন আরো উপরে যেতে পারছে না বলতো ? নিজেই উত্তর দিলেন, কারণ ও অলস ! আরো পরিশ্রমী হলে ও অনেকদূর যেতে পারত।

নতুন সরকারের নানামুখী কাজের পাশাপাশি পুরনো আমলের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রসঙ্গ উঠল। সম্ভবতঃ নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মতো সরে জমিনে ফিল্ড ট্রিপের অভ্যাস থেকেই নাজমুল হুদার কথা উঠেছিল। তারও অভ্যাস ছিল হুট করে পথে নেমে নিজে নিজেই সরেজমিনে শো অফ করা ; বাহাদুরি দেখানো। তো স্যার একদিন নাজমুল হুদাকে বললেন, এইটা তার করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ নেতা কেন সম্মুখসমরে যাবে? নেতার হাতে কেন তরবারী থাকবে? কোন কারণে একজন সাধারণ জনগণ যদি নেতাকে বা মন্ত্রীকে একটা চড়ও মেরে বসে, মানসম্মান কী আর উঠে আসবে ?

ব্রাহ্মণ্য নিয়ে , কৌলিন্য বা এলিটিজম নিয়ে, যতোই দ্বেষ থাকুক না কেন, স্যার নিজেকে, শিক্ষকদেরকে সমাজের ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন । সেদিনও দিলেন। জাতভেদে যারা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, সমাজের মাথা তারাতো ব্রাহ্মণই । ব্রাহ্মণ মাথা চালাবে। যুদ্ধ করবে ক্ষত্রিয় । বৈশ্য করবে ব্যবসা। শূদ্র বাকী তুচ্ছ কাজগুলো। দাবার বোর্ডে রাজা স্বয়ং যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধ করে অন্যরা। তরবারীর এক খোঁচায় রাজা ঠুস্‌ করলেতো যুদ্ধই শেষ !

সরকার থেকে কেন্দ্র ডেমরা বা গেণ্ডারিয়াতে একটা জমি পেয়েছে। ঐখানে স্থাপনার জন্য দশ কোটি টাকার একটা আবেদন করে বসে আছেন কবে থেকে। স্যারের ইচ্ছা একটা মিলনায়তন বা প্লাজা টাইপকরে কেন্দ্রের কিছু অর্থসংস্থান করা। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীগুলোর খরচ, স্কুল কর্মসূচির খরচ, প্রকাশনা ইত্যাদি দিনে দিনে বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে ! ঘুরে ফিরে আত্মীয়তন্ত্রের কথা চলে আসলো, শত শত কোটি টাকা হাপিস হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু শিক্ষার জন্য দশকোটি মানেই দ্বারে দ্বারে ঘোরা।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য )

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর ২০১৫

টোনাকাহিনী( অনলাইন ক্লাস )

করোনাক্রান্তিতে আর সকলের মতোই টোনা ও টুনি তাহাদের সবেধননীলমণিদেরকে সহিত নানাবিধ কীর্তিকাহিনী লইয়া সময় অতিবাহিত করিতেছে। ইদানীং বৃহদাকার শিরঃপীড়া হইতেছে- দুই টুনটুনির অনলাইন ক্লাস। বাসায় একটা আদ্যিকালের ব্রডব্যান্ড লাইন রহিয়াছে ; রাউটার সহযোগে কয়েকজন ব্যবহার করিতাম । বড়টির জনৈক শিক্ষক আদেশ দিলেন, ভাগের ইন্টারনেটে চলিবে না ; একান্ত ব্যক্তিগত লাইন লাগিবে। ভাগের মা নাকি গঙ্গা পায় না ! ভাগের ইন্টারনেটে গতি কম । এই দুর্মূল্যের বাজারে গুচ্ছের টঙ্কা খরচ করিয়া আরেকটি সরবরাহ লাইন লইতে হইল। মাসের খরচে আরেকটি ওজন যুক্ত হইল। ছোটটির জন্য আগের লাইন।

হায় ! তাহাতেও কি সোয়াস্তি আছে ! ঝড়বৃষ্টি দূরে থাকুক, একটুখানি মেঘের গুড়গুড়ে আওয়াজে সেই ভাগের লাইন ও একান্ত ব্যক্তিগত লাইন যায় বিগড়াইয়া । সকাল আট ঘটিকায় ক্লাস। সাজিয়া গুজিয়া যন্ত্রের সম্মুখে বসিয়া দেখা গেল ইন্টারনেট লাইন বিকল। এক অনর্থক অস্বস্তিতে সরবরাহকারীদিগকে ফোন দাও রে, ডাকো রে চলিতে থাকে। এবং টুনির উত্তরোত্তর উত্তেজনা বৃদ্ধি হইতে থাকে।

অধুনা অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে অনলাইন পরীক্ষাও শুরু হইয়াছে । খরচ বৃদ্ধির আরেক প্রস্থ বুদ্ধি বাহির হইল; সরবরাহ লাইনে সমস্যা হইলে, মোবাইলের ডাটা ব্যাবহার করিয়া শিক্ষাদান সচল রাখিবার। সপ্তাহে সপ্তাহে নানা মোড়কে আবৃত ডাটা কিনিয়া তাহা ব্যাকআপ হিসাবে রাখা শুরু হইল। সেই ডাটার কিয়ৎ ব্যবহৃত হয় ; সিংহভাগ অপচিত হয় মেয়াদোত্তীর্ণ নামক ফাঁকিবাজির কারণে।

শিক্ষার খরচ ক্রমশ: বাড়িয়া যাইতে লাগিল।

দিনকয়েক আগে ছোটটির ক্লাস চলিতেছিল দিব্যি। কিয়ৎক্ষণ পার হইলে, তাহার আর্তচিৎকার ! জুম নামক বিশেষ শ্রেণীকক্ষে সে ঢুকিতে পারিতেছে না। কহিলাম, এই তো দেখিলাম কিছুক্ষণ আগেও আরেক শিক্ষিকার কক্ষে অবস্থান করিতেছিলে। অকস্মাৎ, কী হইল !

আবারও কী বালুকণা তুলিতে গিয়ে সাবমেরিন লাইন কর্তিত হইয়াছে !
আরেক কক্ষে বড়টির খবর লওয়া হইল। সে দিব্যি পাঠরত রহিয়াছে। কম্পিউটার নামক যন্ত্র বিগড়াইলে তাহাকে পুনশ্চালনা করিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয় ; ইহা টোনা সেই আশির দশকে শিখিয়াছে। সে তাহাই করিল, হা হতোস্মি !

উত্তেজিত টুনি, অবশেষে ছোটটির সতীর্থ আরেক শিক্ষার্থিনীর মাতাকে মোবাইল সহযোগে খোঁজ লইল। সকলেই নাকি দিব্যি শিক্ষালাভ করিতেছে। শুধু ছোটটির শিক্ষা বাধাগ্রস্ত। পাঠদানের একেবারে শেষে ছোটটির সহচরীর মাতা কর্তৃক শ্রেণিশিক্ষিকাকে ধরিয়া তাহাকে কক্ষে প্রবেশ করানো হইল। সেই শিক্ষিকা অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়া তিরস্কার শুরু করিয়া দিলেন। তিনি নাকি তাহার সভাকক্ষে নতুন নাম দেখিয়া প্রবেশ করিতে দেন নাই। কেননা, ছোটটি —যে কীনা সদ্য পরীক্ষাহীন শিক্ষাবর্ষ কাটাইয়া তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইয়া যারপরনাই উৎফুল্লিত ; যাহার পিতৃপ্রদত্ত নাম ‘শ্রেয়া নুসরাহ’, সেই নাম , কী কারণে যেন পরিবর্তিত করিয়া রাখিয়াছে ‘আই অ্যাম নো বডি’ ! সুতরাং শিক্ষিকার কোন কসুর নেই। তিনি সঠিক কাজটিই করিয়াছেন ; ‘আই অ্যাম নো বডি’ নামক ব্যক্তিকে শিক্ষাগৃহে অনুপ্রবেশ করিতে না দিয়া।

আমি ছোটটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম , নাম পরিবর্তনের হেতু কি ? ( উল্লেখ্য, নাম কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, তাহা টোনাই মাত্র দিন কয়েক আগে শিখিয়াছে। সম্ভবত: ছোটটি তাহা দেখিয়াছিল। ) সে ইংরেজদের মতো কাঁধ ঝাঁকাইল। ইহার অর্থ অনেক রকম হইতে পারে । ‘আমার ইচ্ছে !’ ‘তো ?’ ‘সমস্যাটা কি?’ ‘আশ্চর্য !’ অথবা ‘মুড়ি কিনিয়া খাও গিয়া !’

এবং যথারীতি টুনি আমার চতুর্দশ বংশলতিকা তুলিয়া শাপশাপান্ত করিতে থাকিল। কোন কুক্ষণে , এই বংশের পাল্লায় সে পড়িয়াছে ; কেন এই বংশের সন্তানেরা সহজ নিয়মে চলিতে চাহে না ; কেন এই বংশে তাহাকে শকুন্তলার ন্যায় পাঠাইয়া দিয়া তাহার হাড়মাস জ্বালানোর ব্যবস্থা করিয়াছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

উত্তরপ্রজন্মের কীর্তির জন্য আমার সকল প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা তিরস্কৃত হইতে থাকিল। এই তিরস্কার কতোকাল অবধি চলিবে সে সর্বময়ই জানে!

[ প্রকাশকালঃ ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ ]