উপলব্ধি: ৮

শুধু বুদ্ধিমান লোকে আর শক্তিশালী লোক বেঁচে থাকবে অন্যেরা মরে যাবে, পৃথিবীটা মোটেও সেই নিয়মে চলে না। কয়েক হাজার বছর ধরে নির্বোধ, শুক্রাণুর ব্যাপক অপচয় হিসাবে খ্যাত বহু ব্যক্তির ক্ষমতার আস্ফালন দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি। অযোগ্য, দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সৌভাগ্যে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি।

বিশ্বের বিখ্যাত ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট উভেরিয়ান লটারি (Ovarian Lottery) শব্দটিকে জনপ্রিয় করেছেন ; ব্যক্তি কখন বা কোথায় জন্মগ্রহণ করছেন সেই সৌভাগ্যের কথা বলেছেন। একজন ব্যক্তি কখন কোথায় জন্মগ্রহণ করছে সেটা তাঁর জীবনের বড় ধরণের প্রভাব রাখে। যে লোকটিকে আপনার আপাতত অযোগ্য , অথর্ব মনে হচ্ছে, কোনভাবে সে হয়তো আগেই উভেরিয়ান লটারি জিতে বসে আছে।

বৈষয়িক জীবনের ম্যারাথন রিলে রেসে অনেক এগিয়ে থাকা লোকটি হয়তো তাঁর পিতা ও পরিবারের কাছ থেকে ব্যাটনটি যখন পেয়েছেন; তখন হয়তো আপনার পিতা সেই স্টেডিয়ামের দর্শক-সারিতেই পৌঁছায়নি। নিয়তির পরিহাসে প্রাপ্ত ব্যক্তিটির যাপিত সৌভাগ্যের ব্যাপারটি যদি আপনি সদয় বিবেচনায় আনেন, আপনার মানসিক স্থৈর্য বাড়বে বৈ কমবে না।

(Ovarian Lottery: Ovarian Lottery is a thought experiment popularized by Warren Buffet. It stresses the importance of luck and the influence of when/where we are born in this world on our life outcomes.)

উপলব্ধি: ৭

তর্কে কেউ নাকি জেতে না। আমরা যাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের তর্ক বলি ; সেটাকে অনেকে বড় আঙ্গিকে ‘বিতর্ক’ বলেন। আমি প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের কথা বলছি না। আমি বলছি, প্রাত্যহিক জীবনের সহকর্মীর সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে, ভিন্নমতের, ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কারো সঙ্গে যে তর্কগুলো আমরা করে থাকি– হতে পারে সেটা ফেসবুকে, হতে পারে মুখোমুখি অথবা অন্য কোন প্ল্যাটফর্মে—সেটার কথা।

ব্যক্তি পর্যায়ের তর্কগুলো অনেকাংশে ‘কুতর্কে’ পর্যবসিত হয়। আমি যেটা বুঝেছি, একজনের সচেতন উপলব্ধি আরেকজনকে দেওয়া খুব মুশকিল। এই ধরাধামে আবির্ভূত মহামানবের বাণী হাজার বছর পার হয়েও মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি ; আর আমি-আপনি তো নস্যি সেক্ষেত্রে। মজার ব্যাপার , সাধারণ মানুষের প্রবণতা হচ্ছে, যেভাবেই হোক তর্কে জেতা। জেতার জন্যে তাঁরা মূলক, অমূলক, ভিত্তিহীন, জানা-অজানা নানা বিষয়কে রেফারেন্স হিসাবে হাজির করেন। কবেকার কোন ‘টক-শো’-তে কোন অধ্যাপক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কি বলেছিল সেটার কথা বলেন। কবেকার কোন প্রাগৈতিহাসিক বিলুপ্ত পুস্তকে কী কী বলা আছে সেটার কথা বলেন।

কিন্তু তর্ক সচরাচর কোন সমঝোতায় পৌঁছায় না। আমার তো মনে হয়, এই ধরণের তর্কে জিতে যাওয়ার একটা সান্ত্বনামূলক অবস্থায় পৌঁছাতে যে পরিমাণ শ্রম ও শক্তি অপচয় করবেন; সেটা না করে মৃদু হেসে নিশ্চুপ থাকা অনেকাংশে মঙ্গলজনক। যোগ্য তার্কিক না হলে আমি কখনই নিজের শক্তিক্ষয় করিনা।

ব্যক্তি তাঁর পরিবার, শিক্ষায়তন, কর্মস্থল ও পরিপার্শ্বের সাহচর্যে সুদীর্ঘ অনেক বছর ধরে কিছু রুচি, যুক্তি, অযুক্তি, সংস্কার, কালচার নিয়ে বেড়ে ওঠে; তাকে কোন নতুন মতবাদ, মতাদর্শ শুনিয়ে লাভ নেই—যদি না সে নিজে থেকে সেটা আপনার কাছ থেকে শুনতে চায়!

উপলব্ধি: ৬

বাংলাদেশে রোগীর চেয়ে চিকিৎসক বেশি। সামান্য অসুস্থতায়, আত্মীয় পরিজন, ভাই-বেরাদর, কাকা-জ্যাঠাদের পরামর্শ ও উপদেশ বর্ষিত হতে থাকে। মনো-বৈজ্ঞানিক সত্য এই যে, উপদেশদাতা নাকি অন্যকে উপদেশ দেওয়ার ছলে নিজেকেই নিজে উপদেশ দেন। জীবনের যে কোন বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে অথবা শারীরিক অসুস্থতায় অভিজ্ঞ ও প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীর পরামর্শ কতোখানি নেবেন আর কতোখানি বাদ দেবেন ; অথবা আদৌ ধর্তব্যে নেবেন কীনা সেটা হিসাব করে চলুন।

প্রত্যেক মানুষের কিছু সামাজিক এক্সপার্টিজ থাকে, যেখানে তাঁর পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা আছে এবং ঐ বিশেষ ক্ষেত্রে তাঁর উপদেশ বা পরামর্শ আপনার মন দিয়ে শোনা উচিৎ । সবসময় উপদেশ ও পরামর্শের ব্যাপারেই অনীহা বা চরমভাবাপন্ন হওয়ার কোন মানে হয় না।

আমার প্রয়াত পিতার সবচেয়ে বড় শারীরিক দুর্বলতা ছিল তাঁর পাকস্থলী। সারাজীবন তিনি পেটের গণ্ডগোলে ভুগতেন। নানা রকম টোটকা আর ওষুধের মহড়া চলত। টেবিলের উপরে ফ্লাজিল, অ্যামোডিস ইত্যাদির জমে থাকত। এবং আমাদের তিন ভাইয়ের সামান্য ভুটভাটে তাঁর নানাবিধ ইন্সট্রাকশন জারী হত। কিন্তু , আমি জেনে শুনে পেট খারাপের যে কোন ব্যাপারে তাঁর মতামত কানে নিতাম না। যদিও সে প্রতিদিন ইসবগুলের ভুষি খা, পাকা বেল খা, কাঁচা কলা খা, পাকা কলা খা, এটা খা, সেটা খা বলেই চলতেন। তাঁর পাকস্থলী বিষয়ক উপদেশমালা গ্রাহ্যে না আনলেও আইনজীবী হিসাবে তাঁর মতামতকে সর্বোচ্চ দাম দিতাম। ঠিক একইভাবে আমার ছোটমামাও সেই অর্থে খুব সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না ; ছাত্রজীবনে সর্বদা তাঁর জ্বর-সর্দি-কাশি লেগেই থাকত ; কিন্তু পড়াশোনায় ভীষণ ভাল ছিলেন। তাই পড়াশোনার ব্যাপারে তাঁর মতামত বিবেচনায় আসত সর্বাগ্রে।

কোন বিষয়ে যার/যাদের, পরামর্শ ও উপদেশ গ্রাহ্যে আনবেন, ঐ ক্ষেত্রে তাঁর/তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের ইতিহাস একটু যাচাই করে নেবেন।

উপলব্ধি: ৫

শৈশবে পরিবারের গুরুজনদের কাছ থেকে শুরু করে পাঠ্যবইয়ে ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি…’ তে আমাদের অভ্যস্ততা। এখনো প্রতিদিন আমরা শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য নানা অভ্যাস গড়ে তোলার বিজ্ঞাপনে জর্জরিত। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমি বিশ্বাস করি ‘ Make a good habit and habit will make you. Conversely, bad habits destroyes you!’

সুতরাং একটু ধৈর্য ধরে কোন একটা ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সেটা সারাজীবনের সহায়। আবার একটা বদভ্যাস হয়ে গেলে সেটারও মূল্য চুকাতে হয়।

ছাত্রজীবনে আমি নিশাচর ছিলাম, বলা-বাহুল্য এই প্রজন্মের অনেকেই তাই। কিন্তু কর্মজীবনে ঢুকেও একই অভ্যাস থেকে বের হতে দীর্ঘযুদ্ধ করতে হয়েছে। তখন শরীর সতেজ ছিল, সারারাত জেগে স্টার মুভিজ দেখেও পরের দিন অফিসে ঝিমুনি আসেনি। কিন্তু একসময় টের পেলাম, শরীর এই অত্যাচার আর নিতে পারছে না। আমার এক জার্মান ক্রেতা-বন্ধু বলত, দি স্মল থিংস মেক অ্যা বিগ ডিফারেন্স। খুব ছোট্ট ছোট্ট অভ্যাস পুরো জীবনকে বদতে দিতে পারে। চেষ্টা করুন, ছোট্ট করে হলেও কিছু ভালো অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে।

উপলব্ধি: ৪

ডু নট লেট আদার ডিফাইন ইয়োরসেলফ। নিজেকে অন্যের দ্বারা সংজ্ঞায়িত হতে না দেওয়াই শ্রেয়। সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে আত্মোপলব্ধির, নিজেকে জানার প্রতিনিয়ত চেষ্টা ছিল। এটা থাকা উচিৎ। অন্য কেউ এসে অকস্মাৎ আপনার দুর্বলতা চিহ্নিত করে, আপনার সব আত্মবিশ্বাসের মূলে বিষ ঢেলে দেবে সেটা হতে দেবেন না। কেউ আপনার অযাচিত সমালোচনা করলে আপনি দেখার ও বোঝার চেষ্টা করেন, সে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী কীনা, তাঁর সামাজিক অভিজ্ঞতা ও অবস্থান আদৌ আপনাকে সমালোচনা করার অবস্থায় আছে কীনা অথবা তাঁর মন্তব্য আপনার আদৌ নেওয়ার দরকার আছে কীনা !

উপলব্ধি: ৩

নিজের সঙ্গে নিজে ও নিজের পরিবারের সঙ্গে সবসময় সৎ থাকতে হয়। পরিবারের প্রতি আপনি যেমন সহানুভূতিশীল,অসীম মমত্ববোধ করেন; নিজের প্রতিও একই রকম মমতা, সমঝোতা ও থাকা দরকার। এই অন্যায্য পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষকে সারাক্ষণ পরিবেশ প্রতিবেশের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। বাইরের প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে, আপনার যে শক্তি দরকার তার শক্তিমত্তা নির্ভর করবে আপনার নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কেমন তা এবং আপনার নিজের পরিবার,বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানদের সম্পর্ক কেমন তার উপর। নিজের পরিবারে সঙ্গে দূরত্ব ও অসমঝোতায় যে পরিমাণ শক্তিক্ষয় হবে, বাইরের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না।

আমি যে কোন পরিস্থিতি—সে হোক চাকরি বা ব্যবসায়িক জীবনের ব্যর্থতা, অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা সবকিছু একসময় আমার জন্মদাত্রীর সঙ্গে আর পরে অবলীলায় সহধর্মিণীর সঙ্গে শেয়ার করি। বহুবার এমন অনেককে পেয়েছি, চাকরি হারিয়ে নিজের পরিবারে সঙ্গে দিনের পর দিন অভিনয় করে চলেছেন। অন্য সব দিনের মতো সকালে অফিসের পোশাক পরে বের হয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেছেন। আমি তাঁদেরকে বলেছি, যুদ্ধটা আপনি একা করছেন কেন? আপনার পরিবারে জন্য আপনি জীবন সর্বস্ব করছেন, তাদের সঙ্গে কেন অভিনয় করছেন ? আপনার জীবনের প্রতিকূল অবস্থাতো চিরস্থায়ী নয়। এই যুদ্ধে আপনি তাদেরকেও সামিল করুন। ঘরে ও বাইরে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে করে নিজে নিঃশেষ করার কোন মানে হয় না। বিশ্বাস করেন, অনেকে ফিরে এসে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন আমার ওই সৎ পরামর্শটুকুর জন্য।