উপলব্ধি: ২০

প্রযুক্তি!

যখন যে প্রযুক্তি এসেছে , তার ভালো দিক মন্দ-দিক বোঝার চেষ্টা করুন। প্রযুক্তির বৈভব , পরাভব মেনে নিতেই হবে। আজকের পৃথিবী এমনভাবে সংযুক্ত হয়ে আছে, এর বাইরে আপনি থাকতে চাইলে আপনাকে বনবাস নিতে হবে। আমার দুই কন্যাকে নানা প্রযুক্তির পাশাপাশি রেখেও বই পড়তে উৎসাহিত করেছি। বই এমন একটা মাধ্যম, যেখানে আপনার কল্পনাশক্তি কাজ করে, মাথা খাটাতে হয়। বই ইলেকট্রনিক অন্য সব মিডিয়ার মতো রেডিমেড ইনস্ট্যান্ট নুডলস নয়। বইকে আমি এখনো তুলনা করি, রান্না করে পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়ার মতো। জীবনের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে নিজে বেছে বাজার করতে হয়, সেগুলো নানা প্রক্রিয়ার পরে রান্না করে তারপরে সুস্বাদু খাদ্যে পরিণত করতে হয়। তাই, অন্য সকল ইনস্ট্যান্ট মিডিয়ার সঙ্গে বইয়ের তফাৎ আজন্ম থাকবে।

টিভি ও ইন্টারনেট আমাদের আসক্ত করে রাখে । কীভাবে রাখে সেটা নিয়ে একবার বড়কন্যার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বেশ কয়েকবছর আগে, বড়কন্যাকে বোঝালাম, ধরো তোমার আই-কিউ ৯০। কিন্তু টিভি, ভিডিও গেম, ইন্টারনেটের যে কোন প্রোগ্রাম একক কোন ব্যক্তির করা নয়। ধরো তাঁদের ভিতরে কয়েকজনের আই কিউ তোমার চেয়ে অনেক বেশি। তাঁদের সম্মিলিত আই কিউ দিয়ে সে অনেক সময় ব্যয় করে একটা অনুষ্ঠান করেছে, সেটা তোমাকে আটকে রাখার জন্য, আসক্ত করার জন্য। ছুটিতে , অলস সময়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে কিছুক্ষণ সময় দেওয়া যায়। কিন্তু সময় তো অফুরন্ত নয়। নানাবিধ কার্যকরী কাজে নিজেদেরকে নিযুক্ত করতে হয়। পড়াশোনা, কর্মজীবন, পরিবারকে সময় দিতে হয়। যা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ না, এড়িয়ে যান। নিজের প্রায়োরিটি দিয়ে প্রযুক্তিকে পরাভূত করা শিখতে হয়।

উপলব্ধি: ১৯

জীবন উদযাপন করতে শিখুন। পরিবারকে সময় দিন, বছরে নিয়ম করে একঘেয়েমি কাটাতে সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যান। যদি আর্থিক সামর্থ্য ও সময় না থাকে, কাছে ধারে হলেও কোথাও যান। কোথাও যেতে না পারলে, কাছে ধারের রেস্টুরেন্টে যান। আনন্দ উদযাপন করুন। । না চাইতেই পাওয়া এই অসাধারণ, অমূল্য জীবনকে উদযাপন করা শিখুন।

অনেক আগে, ৯৭-৯৮ সালে যখন OPEX Group এ কর্মরত ছিলাম, ক্যারল ব্রাউন নামের এক মহিলা ক্রেতা ছিলেন, আশির কাছে বয়স। আমাদের তৎকালীন চেয়ারম্যান সর্বেসর্বা ক্যাপ্টেন আনিসুর রহমান সিনহা স্যারের খুব প্রিয়ভাজন। আমেরিকান এই ভদ্রমহিলার অর্ডার খুব ছোট ছোট সংখ্যার হলেও আমাদেরকে খুব মনোযোগ দিয়ে ফলোআপ করতে হত।

উনি খুব হাসি খুশী থাকতেন। দারুণ বাহারি রঙের পোশাক পড়তেন। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে উনি আমাকে বলেছিলেন, Jahid, life is not a dress rehearsel, never keep your best wine in the stock for an occasion! ঠিকই তো, জীবন তো আর মঞ্চ নয়– বার বার রিহার্সাল দেওয়ার সুযোগ কোথায়! যা করবার, বা বলবার বলে ফেলতে হয়; বারবার সেই সুযোগ আসে না। আবার আনন্দ করার জন্য উৎসব বা বিশেষ দিনের অপেক্ষা অনেকাংশে বোকামি।

উপলব্ধি: ১৮

সামাজিক ও জীবিকার শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও মানুষের একটি ইন্টেলেকচুয়াল, বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনাচরণ থাকা দরকার। জীবনের নানা পর্যায়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। শৈশব থেকে শুরু করে এই পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সেও আমাদের সঙ্গে নানা আলোচনা হয়। স্যার আমাদের (তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের ) অনেকের সীমাবদ্ধতা বোঝেন। সামাজিক চাপে , জীবিকার কাছে আমাদের নতিস্বীকারের দুর্বোধ্য বেদনাও বোঝেন। তারপরেও তিনি আমাদের সবসময় বলতেন, যে জীবিকাতেই আমরা থাকি না কেন , আমাদের একটা বুদ্ধিবৃত্তিক, সংবেদনশীল জীবন থাকা দরকার ; সম্পন্ন জীবনবোধ থাকা দরকার। কেউ যদি দিনের পর দিন কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে তার মন শুকিয়ে যায়।

স্যার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষিত, উদ্বুদ্ধ করেছেন সারাজীবন। ব্যস্ত, ঊর্ধ্বশ্বাস এই জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি আমাদেরকে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে বলতেন। মানুষ প্রকৃতির কোল থেকে উঠে এসেছে। আমাদের আদি ও অকৃত্রিম প্রবণতা হচ্ছে আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া স্বস্তি-বোধ করা। এবং আমরা প্রকৃতির কাছে গেলেই সবচেয়ে সজীব, প্রাণবন্ত ,উৎফুল্ল হয়ে উঠি।

উপলব্ধি: ১৭

নিরাপত্তাহীনতা বা ইনসিকিউরিটি !
জীবনের সবচেয়ে অবিচ্ছেদ্য অনুভূতি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা । সীমিত আকারে থাকা ভালো। বেশি নয়। আপনার আসল নিরাপত্তা-বোধ আপনার নিজের কাছে, আপনার প্রিয়জন ও পরিবারের কাছে। অসীম পরিমাণ অর্থকড়ি থাকলেও সেটা আপনার জীবনকে নিরাপত্তার স্বস্তি দেবে না।

যে নিরাপত্তাহীনতায় আমাদের মধ্যবিত্ত অগ্রজরা ভুগেছিলেন ; তা আমাদের মাঝে বংশানুক্রমে চলে আসে। বিদ্যা-শিক্ষা, উপার্জন, পরিশ্রম, প্রতিযোগিতায় নানারকম প্রাপ্তি ও অর্জন দিয়ে জীবনের অর্ধেক সময় ব্যয় করে আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ করার চেষ্টা করি । শিক্ষা, চাকরি,ব্যবসা ,টাকা, গাড়ী, বাড়ি, শেষ-বয়সের জন্যে সেভিংস ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলত: এর কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ বা সীমারেখা তো নেই। মাথাগোঁজার একখানি জমি হলে কি মানুষ নিরাপদ ? সে কী ক্রমাগত আরও জমির মালিক হতে চায় না ! একটা ফ্ল্যাট হলে আরেকটা করে নিরাপত্তা পোক্ত করতে চায়। নগরীর এই প্রান্তে কিছু থাকলে, ঐ প্রান্তে । ব্যক্তি লাখ টাকার ব্যাংক ডিপোজিট যেমন নিরাপত্তাহীন থাকে ; কোটি টাকা ডিপোজিটেও তাই।

কোন কিছু দিয়েই আমরা নিজেদেরকে নিশ্ছিদ্র নিরাপদ করতে পারিনা বা নিরাপদ ভাবতে পারিনা। পরবর্তী বংশধরদেরকেও একই ভাবে নিরাপদ করার ক্রমাগত চেষ্টা করে যাই। স্বদেশ থেকে দূর পরবাসে প্রবাসী হয়ে জীবনকে আরও নিরাপদ করতে চাই। একটা ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড় ক্রমাগত আমাদের ত্রস্ত করে, ক্লান্ত করে। আর এই অসাধারণ জীবন আমাদের হাতের ফাঁক গলে কখন যে নীচে পড়ে যায় , আমরা টেরও পাইনা ! নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিতে নিতে জীবন শেষ হয়ে যায় !

উপলব্ধি: ১৬

অনিশ্চয়তা বা আনসারটেইনিটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতক্ষণ বেঁচে আছেন, আপনার সমস্যা থাকবে এবং অনিশ্চয়তা থাকবে। আমরা কেউই জানিনা – আগামীকাল কী হবে, আগামী সপ্তাহে বা বছরে কী হবে! আমরা ভুলে যাই, পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে থেকে আমার মত সাধারণ লোকের জন্য এই অনিশ্চয়তা সমানুপাতিক-ভাবে আছে। এই অজানা অনিশ্চয়তাকে ঘিরেই আমাদের বৈচিত্র্যময় লৌকিকতা , আচার-আচরণ,ধর্ম ও সামাজিকতা গড়ে ওঠে। আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে দেখা শুরু করি। কীভাবে জীবনকে দেখতে হবে আমরা অন্যের কাছ থেকে শিখে ফেলি বা অনুকরণ করা শুরু করি। প্রচলিত পথেই অনিশ্চয়তাকে কাটাতে চেষ্টা করি। কিন্তু পেরে উঠি না। অনিশ্চয়তাকে যে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না, এটাও মেনে নিতে পারি না। তাই, পরিমিত অনিশ্চয়তা শরীর ও মনের জন্য ভালো ; অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা বাড়াবে অনর্থক হতাশা ও উদ্বেগ, সেটি শরীর-মন কোনটির জন্যেই ভাল নয়।

 

উপলব্ধি: ১৫

কৌতূহলী হন, বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখুন, চর্চা করুন। কীভাবে বিস্মিত হতে হয়, সেটা প্রতিনিয়ত চর্চায় রাখার জন্যে শিশুদের সঙ্গে অথবা নিজের চেয়ে কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে মেলামেশা করুন, যোগাযোগ রাখুন। সমবয়সী অথবা বয়স্ক লোকেরা অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের ব্যাপারে আশাবাদী থাকেন না ; একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে থাকেন। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক দূরত্বের পাশাপাশি সবুজ, কাঁচা তারুণ্যের সাহচর্যে থাকুন।