টোনাকাহিনী। ফেসবুক ও টুনটুনি

আমার দুই টুনটুনির জ্যেষ্ঠাটির সহিত আমার আলাপচারিতা বা নৈকট্য খানিকটা বেশী। ছোট টুনটুনি কিঞ্চিৎ সেলিব্রেটি টাইপ হইয়াছে, যথোপযুক্ত বিষয় বা পরিবেশ-প্রতিবেশ না পাইলে, সে যাহার তাহার সহিত আড্ডার অর্গল না খুলিয়া বরং নীরব হইয়া থাকে। বিদ্যালয়ের পাঠাভ্যাসের খোঁজ লইতে গিয়া প্রসঙ্গান্তরে কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘পঞ্চম-শ্রেণী পড়ুয়ারা মধ্যবর্তী খাদ্যগ্রহণের সময় কি ধরণের আলাপ-আড্ডা করিয়া থাকে?’

টুনটুনি কহিল, গতকল্য তাহাদের আলোচ্য ছিল কাহার কাহার মাতার ফেসবুক আসক্তি আছে তাহা ! আমি ভিমড়ি খাইতে খাইতে নিজেকে সামলাইলাম ! টুনটুনি কহিল , বিস্ময়কর-ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বালকবালিকা নাকি হস্ত উত্তোলন করিয়া সায় দিয়াছে যে , তাহাদের মাতারা ফেসবুক আসক্ত ! আমার কন্যা টুনটুনি হস্ত উত্তোলন করে নাই! কেননা সে জানে তাহার মাতা, টুনির ওই আসক্তি নাই। কথা শেষ হইয়াও হইল না শেষ, কাঁধ ঝাঁকাইয়া স্মিতহাস্যে সে বলিল, ভাগ্যিস প্রশ্নটা মাতা লইয়া ছিল, পিতা ফেসবুক আসক্ত কিনা তাহা আলোচ্য হইলে, তাহাকে নাকি দুই হস্ত উত্তোলন করিতে হইত!

সন্ধ্যায় সে আমাকে আবার পাকড়াও করিল, ফেসবুকের ইতিহাস কি কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সংক্ষেপে যাহা বিশ্বাস করি তাহাই বলিলাম। বলিলাম, মূলত: নতুন প্রযুক্তি সর্বদাই আমাকে আকৃষ্ট করে এবং আমি তাহা সর্বদাই সাদরে বরণ করিয়া লইয়াছি। সমগ্র জনগোষ্ঠী সাদা আলোকোজ্জ্বল সরু ট্রাই-ফসফেট ফ্লুরোসেন্ট বাতি ব্যবহার করা শুরু করিলে আমি কেন হলদেটে টাংস্টেন ফিলামেন্টের বর্তুলাকার বাতি ব্যবহার করিব ? যুগের সাথে তাল মিলাইয়া চলিতে হইবে, ইহাই রীতি।

তবে, কথা থাকিয়া যায়। সকল যুগে সকল প্রযুক্তির শুভঅশুভ দুই দিকই ছিল ও থাকিবে। ব্যবহারকারীরা উহার শুভ-দিক বাছিয়া লইবে নাকি অশুভ-দিক লইয়া মাতামাতি করিবে, তাহা নিতান্তই তাহাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি ; ইহাতে প্রযুক্তির দায়ভার কোথায় ?
বুদ্ধিমতী টুনটুনি সহজেই আমি টোনার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিতে পারিল ও নিজের পড়ায় মনোনিবেশ করিল।

[ প্রকাশকালঃ ২২শে নভেম্বর, ২০১৬ ]

টোনাকাহিনী ( বিরল কেশ )

গত অপরাহ্ণে কন্যা  বড়  টুনটুনি কহিল, ‘ পিতা তোমার বিরল কেশ দিনেদিনে আরও বিরল হইতেছে এবং একাধারে প্রবল ধবলবর্ণের প্রকোপে তোমাকে আরও অকালবৃদ্ধ দেখাইতেছে। আমার অন্য সকল সখীদের পিতা তোমার বয়স্য বা অগ্রজ হইলেও তোমার তুলনায় তাহারা অনেক তরুণতম। দয়া করিয়া অবশিষ্ঠ যাহা কেশ বর্তমান আছে তাহা কালো রঙে রঞ্জিত কর ; তোমার এহেন বার্ধক্যপীড়িত চেহারা পছন্দ হইতেছে না। তুমি কি দেখ নাই, জননী নিয়মিত কেশপরিচর্যা করে, সৌন্দর্যবর্ধনকারী দক্ষ দোকানসমূহে মাসিক বরাদ্দে যাতায়াত করে ; ফলশ্রুতিতে তাহার চুলের সঠিক বর্ণ ও তাহার নিজের বয়স আন্দাজ করা মুশকিল হইয়া পড়ে !’

একবার ভাবিলাম তাহাকে বুঝাইয়া বলি, ‘ইহাই নিয়তি ! কেশ পক্ক হইবে, চর্ম ঝুলিয়া যাইবে, গেঁটেবাত হইবে ; ইহার পরে একসময় মধুমেহ, হৃদরোগ একত্রে আসিয়া আমাকে অবসন্ন জীবনসায়হ্নে উপস্থিত করিবে।’ পরে ভাবিলাম, এই মুহূর্তে তাহার জন্য এই ব্যাখ্যা অধিকতর বেদনাদায়ক হইবে ; যাহা অপ্রয়োজনীয় , অনাবশ্যকও বটে ! অতিবাহিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সকল বাস্তবতা বুঝিতে সক্ষম হইবে।

অতঃপর আমার চিরাচরিত আশাবাদী মন লইয়া হাসিহাসি মুখশ্রী করিয়া কন্যাকে কহিলাম, ‘আমার যে এখনো কয়েকগুচ্ছ কেশ মস্তিষ্কের উপরিধারে বর্তমান আছে, আমি তাহাতেই অপরিসীম খুশী। চুলের ধবলবর্ণ লইয়া দুশ্চিন্তা করিবার অবকাশ কোথায়!’

প্রকাশকালঃ ১লা অক্টোবর,২০১৬

ভার্চুয়াল জীবন ও চার আনার শিক্ষা

ছোট্ট দুইটা গল্প বছর ত্রিশেক আগে শোনা। স্মৃতি থেকে লিখছি। অনেকেরই মূল গল্পদু’টো হয়তো আরেকটু ভাল করে জানা আছে ।

গল্প ১ :

বহুদিন আগের কথা , সমাজে টোল ছিল , পাঠশালা ছিল, পণ্ডিতও ছিল। এবং নদী পার হওয়ার একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। এখন অনেক নদী ও খালই হেঁটে পার হওয়া যায় ।

তো একদিন এক পন্ডিত নৌকায় নদী পার হচ্ছিলেন । নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে অক্ষরজ্ঞানহীন মাঝিকে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন,

: মাঝি তুমি কি ত্রিকোণমিতি জানো?

: নাহ্‌।

:তবেতো তোমার জীবনের চার আনাই মিছে।

: তুমি মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলতে পারো?

: না তো।

: তবেতো তোমার জীবনের আট আনাই মিছে।

: তুমি কি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন সম্পর্কে ধারণা আছে ?

: এগুলো কি খায় নাকি গায়ে মাখে বাবু সাব?

: তোমারতো দেখি জীবনের বারো আনাই বৃথা !

এমন সময় নদীতে ঝড় উঠলো । বড় বড় ঢেউ এসে নৌকায় আঘাত করা শুরু করলো। পন্ডিতও ডুবে মরার শঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে লাগল।

দূরাবস্থা দেখে মাঝি বললো, বাবু সাব আপনি কি সাঁতার জানেন?

: না। সাঁতারতো জানিনা।

মাঝি হাসি দিয়ে বললেন, জনাব! আপনার দেখি জীবনের ষোল আনাই মিছে !

গল্প ২ :

খেয়া নৌকারও আগের কথা। নদী পার হওয়া নিশ্চয়ই আরো ঝক্কির ছিল। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া জনমনিষ্যিহীন শূন্য ঘাট পড়ে থাকতো । নদীর পাশে কোন এক জনপদে একদল সন্ন্যাসী বাস করত। একজন সদগুরুও ছিলেন। অনেক শিষ্যের মাঝে একনিষ্ঠ এক শিষ্য সাধনায় গুরুকেও প্রায় হার মানিয়ে দিল।

দীর্ঘ একযুগের সাধনার পরে শিষ্য এসে গুরুকে বললো, গুরু আমি এখন সাধনার বলে পানির উপরে হাঁটতে পারি, হেঁটে নদী পার হতে পারি।

শিষ্য পরিবেষ্টিত গুরু উল্টো প্রশ্ন করলেন , নদী পার হতে কয় আনা লাগে রে ?

: চার আনা।

: বারো বৎসরের সাধনায় তুই মাত্র চার আনার শিক্ষা অর্জন করলি !

ফুটনোট : গুরু সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন, হাতির দু’ই রকম দাঁত থাকে, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার ! অনেক গল্পের দ্বৈত অর্থ থাকে। উপরের গুলোরও হয়তো আছে, হয়তো নেই !

টোনাকাহিনী ও গৃহপরিচারিকা

অফিসে আসিবার সময় টুনি কহিল, টোনা আমাদের পার্টটাইম গৃহপরিচারিকাকে দেখিয়া হৃদয়ে মায়া অনুভব করি। সে অতি প্রত্যূষ ৫ ঘটিকার সময় গাত্রোত্থান করিয়া ৬টা-৮টা ; ৮টা-১০টা ; ১০টা-১ ঘটিকা গৃহে গৃহে দাসীগিরি করে। অতঃপর , আবারো অপরাহ্ণ ৪ ঘটিকা হইতে দ্বিতীয় শিফটে আরো দুই গৃহে রাত দশ ঘটিকাকাল দাসীগিরি করে।

আহারে !

আমি টুনির প্রত্যুত্তর না করিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িলাম ; আমাদের গৃহের পার্টটাইম গৃহপরিচারিকাটির জন্য নহে ; নিজের জন্য !
হায় টুনি ! গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্তে এই টোনাকে উদয়াস্ত কীরকম দাসত্ববৃত্তি করিতে হইতেছে তাহা তোমার চোখে পড়িল না !

“ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !”

কীভাবে প্রথম কথা , কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব আজ তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, মনেও নেই আমার । আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে টেক্সটাইলে প্রথমবারের মতো সেকেন্ড শিফট শুরু, প্রশাসনিক জটিলতায় প্রথমদিকে নতুনদের সাথে একটু ব্রাত্য বা হালকা দূরত্ব থাকলেও ঠিক মাস দুয়েকের মধ্যে সবাই সবার অসম্ভব কাছের হয়ে গেলাম।ছোট্ট শহীদ আজিজ হলের আবহাওয়াই বদলে গেল ; অনেকদিন পরে একবারে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রের পদচারনায়।

যদিও আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার তেমন কেউ ছিল না, ; তবে অন্য বোর্ডের কয়েকজন ছিল। সবচেয়ে বেশী মানসিক সাদৃশ্য যেটা ছিল সবার মধ্যে, সেটা হচ্ছে একধরনের মনক্ষুন্নতা—প্রকৌশলের সবচেয়ে অভিজাত প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ভর্তি ব্যর্থতার। হ্যাঁ, আমাদের সবাই হয়তো তথাকথিত সর্বোচ্চ মেধাবী ছিলাম না ; কিন্তু আমাদের মেধা ঠিক ফেলে দেওয়ার মতোও ছিল না। ঢাকা ও বাংলাদেশের জেলাশহরের নানাপ্রান্তের দূর্দান্ত ডাকসাইটে কয়েকজন ছাত্রের দেখা হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো মেধাবী ছিল সুমন। টেক্সটাইলের স্পিনিং ,ডাইং- ফিনিশিং এর চাপ এড়িয়ে ওঁর গন্তব্য যে শিক্ষকতা সেটা আমাদের মনে হয়নি কখনো।

পরীক্ষা এগিয়ে এলেই খুঁজে পেলাম আমাদের ২০তম ব্যাচের সবচেয়ে আস্থাবান বন্ধুকে আতিকুজ্জামান সুমনকে। আগের ব্যাচের সেলিম ভাইয়ের নোট বেশ পপুলার ছিল, তবে তাঁর হাতের লেখা ছিল একটু বড়ো টাইপের।সেই তুলনার সুমনের হাতের লেখা ছিল শাব্দিক অর্থেই মুক্তার মতো। সুমনের নোট ছাড়া কোন পরীক্ষা উৎরানো যাবে কল্পনাই করতে পারতাম না। PL( Preparatory Leave) শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দলবেঁধে ওঁকে তাগিদ দিতাম, দোস্ত ওই চ্যাপ্টারের নোটটা কবে শেষ করবি?

সম্ভবতঃ থার্ড ইয়ারে আমি একবার জিজ্ঞাস করলাম, সেলিম ভাইয়ের তো এই টপিক্সে একটা ভালো নোটই ছিল, তুই আবার নিজে বানাতে গেলি ক্যান। ওর উত্তর ছিল মনে রাখার মতো , পুরনো নোট আর পাঠ্যবই মিলিয়ে নিজের নোট করতে গেলে পড়া হয়ে যায়, আর নিজের লেখা নোট পড়তে বেশী ভালো লাগে,সেই সঙ্গে তোদেরও কাজে লাগে। মানুষ এতো নিঃস্বার্থ হয় কীভাবে !

ওর নোটই যে আমাদের একমাত্র পাথেয় পরীক্ষার পুলসিরাত পার হওয়ার সেটা ও ভালোভাবেই জানতো। নরমাল সাদা কাগজের ফটোকপি ভালো হয় না, তাই গুচ্ছের টাকা খরচ করে ওঁ সাদা অফসেটে পেলিক্যান কালির ইয়ুথ কলমের ঝকঝকে দূর্দান্ত লেখনীতে নোট করতো। সাদা লুঙ্গি পড়ে তকতকে টেবিলে উবু হয়ে নোট করছে সুমন, একটা চিরচেনাভঙ্গী ! বেশ ক্ষীণতনু ছিল , হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে ঈর্ষাও ছিল আবার ঠাট্টাও করতাম সবাই। জেনেটিক্যালি ও একটু হালকা স্বাস্থ্যের ছিল। শেষ দেখায়ও ওঁকে ওই ভাবেই পেয়েছি। মনে পড়ে, আমাদের ফটোকপি করতে সুবিধা হবে বলে ও মেশিনের ডায়াগ্রামগুলোও মাঝে মাঝেই কালো কালির কলমে করতো। ওঁর নোট হাতে পাওয়া মানে ছিল ওই সেমিস্টারের অর্ধেক পড়া হয়ে যাওয়া।

সারা ছাত্রজীবনে ওঁর চাপে পড়েই আমি নিজের হাতে শুধুমাত্র Viscose Fiber ও Fabric Designing চাপ্টারের নোট করেছিলাম। ওঁর অনুরোধ ছিল, মামা, তুই ওই চ্যাপ্টারে নোট করে ফ্যাল, আমি ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং গুলো করেই সময় করতে পারছি না। ওঁর ব্যস্ততার দিকে চেয়েই ওই নোট করা এবং সারা ছাত্রজীবনে ওই প্রথম এবং ওই শেষ। কিন্তু সুমনের হাতের লেখার পাশে আমার লেখা একেবারেই মানাচ্ছিল না। পরবর্তীতে আমি আর কোন নোট তৈরীও করিনি। একটু ভালোও লাগছিল, সারাবছর আমিই শুধু সুমনের নোট পড়ি, এই প্রথম ওঁ আমার নোট ফটোকপি করছে !

গত ডিসেম্বরে ছুটি রিসোর্টে সপরিবারে দেখা ! এর পরের গেট টুগেদারগুলোতে নানা কারণে ওঁর সাথে আমার দেখা হয়নি, বা হলেও ঠিক অনেকক্ষণ কথা হয়নি। রাত্রিযাপনের ওই ছুটিতে আমার স্ত্রীর সাথে ওঁর স্ত্রীর, ওঁর কন্যাদের বাচ্চাগুলোর ও আমার বাচ্চাদের মিথষ্ক্রিয়া। মিনা( আমার সহধর্মিনী) গত দুইদিন ধরে বারবার আফসোস করছে থেকে থেকে।

হল জীবনের অফুরান অসংখ্য স্মৃতি আছে। কিন্তু ওঁর মাঝে যে সদাহাস্যময় পরোপকারী মানুষটিকে আমরা দেখেছি, পেয়েছি– নিজেরা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। হুট করে জার্মানিতে পড়তে চলে গেলে সম্পর্কে একটু বিচ্ছিনতা এসেছিল , পরের বছরগুলোতে সেটা আর আমি আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আজ বেশী করে মনে পড়ছে বিশেষ একটা দিনের কথা !

চাকরি শুরু করার পরে আমরা যে যার কর্মক্ষেত্রে, ভীষণ ব্যস্ত। মোবাইলের যুগও তেমন করে শুরু হয়নি। ১৯৯৯ সালে ল্যান্ডফোনেই ওঁ জানালো, বহুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আমরা যেন অ্যাটেন্ড করি।৪০তম সমাবর্তন, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন আসবেন !আমার চরিত্রানুযায়ী যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইলেও ওঁ আমাকে বোঝাল এটা বিরাট সৌভাগ্যের সুযোগ । গ্রাজুয়েশেনের গাউন পরে সবার ছবি থাকে, আমাদেরও থাকবে। অনেকখানি ওঁর চাপে পড়েই সমাবর্তনে যাওয়া।

রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! “ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !” তাইতো, আমরা কথা কইছি, তুই নিরুত্তর। তোর অন্যলোকের যাত্রা শুভ হোক বন্ধু !

সমাবর্তনের দিনে আমার নিজের কোন ক্যামেরা ছিল না, ওঁর ক্যামেরায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললো ওঁ !অনেকবার অনেকবছর ধরে ভেবেছি ওঁর কাছ থেকে ছবির কপিগুলো চেয়ে নেব। এই ১৬ বছরে আর হল কই ! থাক্‌ তোর ক্যামেরায় তোলা ছবি আমার আর লাগবে না ! তুই নিজেইতো একটা ছবি হয়ে গেলি !

প্রকাশকালঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার- দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

সুস্বাস্থ্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারকে কখনো ভোজন রসিক মনে হয় নি । আড্ডা চলতে চলতেই বললেন, আমি একটু খেয়ে নিই। আমরা চিপস, বিস্কুট চা খেতে খেতে স্যারের কথায় সায় দিলাম। ছোট্ট টিফিন বাটি থেকে, সামান্য একটু সবজি আর কয়েক চামচ ভাত- এই ছিল তাঁর রাতের খাবার। অম্লতার কথা , বুকজ্বালার কথা বললেন। প্রবাসী কয়েকজনকে একটা বিশেষ অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের কথাও বললেন।স্যার নিয়মিত হাঁটাহাটি করেন পার্কে। শুনে ভালো লাগল। পার্কের এক মুশকো জোয়ানপ্রায় ভদ্রলোক যার বয়স আন্দাজ ৬০-৬৫ তার প্রসঙ্গ ওঠালেন। ওই লোকের শারীরিক গঠন দেখে স্যারদের কয়েকজন বেশ ঈর্ষান্বিত । তো একদিন , তাকে কাছে ডেকে বলা হল, ভাই আপনি তো ভালোই শরীরখানি ধরে রেখেছেন। তো গর্বিত লোকটি , হু হা করে একটু দাঁড়িয়ে বুক টান করে মাসল টাসল দেখাতে গেলো। স্যার , চেয়ার থেকে উঠে অভিনয় করে দেখালেন। যেই না , ওই স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক বুকটান করতে গেলেন , লাগলো কোমরে টান, ইঁ-ইঁ-ইঁ করে কোঁকাতে লাগলেন তিনি। স্যারের দাঁড়িয়ে দেখানো অভিনয় প্রতিভায় আমরা বরাবরের মতই মুগ্ধ হ’লাম। সোজা কথা দেখতে স্বাস্থ্যবান হলেই হবে না হে, সুস্বাস্থ্য থাকতে হবে !

ক্যাডেটের এক বন্ধু ছিল সঙ্গে। কী কারণে ক্যাডেটের কথা প্রসঙ্গ আসলে, স্যার ক্যাডেটের সমালোচনা করেছিলেন কোন একটা অনুষ্ঠানে । ক্যাডেট হচ্ছে দাস তৈরীর কারখানা বা এই রকম কিছু। পরে কোন এক প্রিন্সিপালের সাক্ষাতে স্যারকে তিনি উত্তেজিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলেন। স্যার বলেছিলেন, আপনারা তো কোরআন শরীফ না, যে সমালোচনা করা যাবে না ! ক্যাডেট কলেজ, সরকার , সংসদ কোনকিছুই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সেনাবাহিনীর এই উচ্চম্মন্যতা দীর্ঘদিনের লালিত, একাডেমী থেকে মগজের মধ্যে প্রোথিত । এরা সবসময় একটা অযোগ্য অহমিকায় ভোগে।

প্রথম আলোর মতিউর রহমান সাহেবের কথা উঠলো। এইলোক যতোগুলো পত্রিকায় ছিলেন সবগুলোই দারুণ সফল। স্যার মতিউর সাহেবের পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ভদ্রলোকের কতখানি মেধাবী । সেটা আলোচনাসাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু কাজের প্রতি তার ডেডিকেশন ও মনে রাখার ক্ষমতা অতুলনীয়।

তথাকথিত অর্থশালী, বিত্তবানদের কথা হচ্ছিল। স্যার একদিন তাঁর কোন এক সচিব বন্ধুর গাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সচিবালয়ের গেটে বিশাল স্যালুট। তো স্যারের বন্ধু, স্যারকে খানিকটা প্রচ্ছন্ন অহংকারের সাথেই বললেন, দেখলি, কত্তোবড় সালাম। স্যার, মৃদু হেসে বললেন, সালাম তোকে নয়রে , তোর গাড়ীকে দিচ্ছে।

পৃথিবীতে কত হাজার পিয়নের চাকরি চলে গেছে, শুধুমাত্র ঠিক সময়ে সালাম দিতে না পারায়!

আরে, তুই এতো বড়লোক ধনী, অর্থশালী, ক্ষমতাবান, — তুচ্ছ একটা পিয়নের সালাম না দেওয়াতে তোর এতো ক্ষোভ ! স্যারে কথা আমার মনে গেঁথে গেল, আসলেই আমরা যারা বেসরকারী চাকরিতে আছি। কলে কারখানায় অনেক গার্ড বা পিয়নের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে। সালাম দিলে ভালোই লাগে। না দিলে সমস্যা নাই। কিন্তু সত্যিকারে বিত্তশালীরা কেউ স্যালুট মিস করলে ওই তুচ্ছ পিয়নের চাকরি থাকে না , সে আমি জানি ।

কেন বিত্তশালীরা আরো, আরো আরো টাকা কামাতে চায় ? আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললাম, নিরাপত্তার জন্য, ভোগের জন্য, পরবর্তী বংশধরদের জীবন আরো নিশ্চিত করার জন্য। স্যার অসম্মতি প্রকাশ না করেই, একটু অন্যভাবে উত্তর দিলেন, আসলে সব ধনীরাই নিজেদের আরো বড় করে দেখতে চায়। মনুষ্য চরিত্র, নিজেকে বড়ো দেখানো। তো বিত্তবানেরা পারেই ওইটা, তাই বেশী বেশী কামিয়ে যতো বড়ো হওয়া যায় আর কী !

বামুনের বাড়ীর কাকাতুয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারের পুরোন গল্প। “ গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” নামের খুব কম প্রচলিত একটা বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। বইটা পড়া ছিল, বলাতে স্যার বেশ খুশী হলেন। এইরে একটা ভালো পাঠক আছে আমার , বলে রসিকতাও করলেন আমার সাথে । স্যারের , খুব প্রিয় একটা বই “ বিস্রস্ত জর্নাল ”। কয়েকবছর পরপরই বইমেলায় নতুন করে সংস্করণ বের করেন। কিছু লেখা নতুন করে লেখেন, সংশোধন , পরিমার্জন আবার কিছু যোগ করেন। ‘ কণ্ঠস্বর’ এর সম্পাদক কিছুটা পারফেকশনিস্ট হবেন, সে আর নতুন কী ! আমি বললাম, কতোবার পরিমার্জন করবেন বিস্রস্ত জর্নাল-কে। মনে হল, আরো কয়েকবার করার ইচ্ছা আছে স্যারের।

এখন কি পড়ছেন , বলতেই বললেন, এক সঙ্গে ১৪টা বই শুরু করেছেন। জীবন ছোট, তাই বোধহয় এতো তাড়া স্যারের। হয়তো অস্থিরতা থেকেই , একসঙ্গে এতোগুলো বই শুরু করেছেন।

প্রবাসজীবন নিয়ে কথা উঠতেই বললেন। ১৮ বছর পর্যন্ত যে ভূমিতে মানুষের বসবাস। যে আলোহাওয়া, ভাষা, শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি পরিপার্শ্ব নিয়ে বেড়ে ওঠে মানুষ আঠারো বছর পর্যন্ত ; ওইখানেই শিকড় বসে যায় তার! ১৮ বছরেই একজন মানুষের চিন্তাচেতনার অনেকখানিই গড়ে ওঠে । তারপরে তাকে পৃথিবীর যে প্রান্তেই নিয়ে যাওয়া যাক না কেন ; শিকড়কে ভুলতে পারে না, বারে বারে ওই খানেই ফিরে আসে, ফিরে আসতে চায় ! কাউকে যদি, আরেকটু আগেভাগেই বছরের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে সে নতুন করে শিকড় গজাতে পারে।

চিন্তা করে দেখলাম , আমাদের বন্ধুদের যারাই একটু কম বয়েসে বিদেশ পাড়ি দিয়েছ, তাদের জীবন ও পিছুটান যতোখানি কম, অন্যরা যারা দেরি করে পাড়ি দিয়েছে তাদের ততোখানিই বেশী। কী বিপুল বেদনা নিয়েই না তারা দেশের মাটিতে ফিরে আসে বার বার। মাতৃভূমির সবকিছু নিয়েই তাদের ক্ষোভ, কিন্তু কোনভাবেই ভুলতে পারে না মাতৃভূমিকে !

মানব জীবনের ঐশ্বর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। মানুষ শীর্ষ দেখতে চায়, পূজা করে। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে হিমালয়। কিন্তু যতো আলোচনা মাত্র ২৯,০০০ ফিটের এভারেস্ট নিয়েই ! তোমার ঐশ্বর্য থাকলে তা মানুষের কাছে ধরা পড়বেই । স্যারের আগের একদিনের আলোচনার কথা মনে পড়ে গেল। হাজী মুহম্মাদ মহসীনের সময় এই ভারতবর্ষে কয়েক লক্ষ লোকের তাঁর সমপরিমাণ টাকা ছিল । কেউ তাদের কথা মনে রাখেনি। কিন্তু তাঁর সর্বস্ব ( তৎকালীন দেড় লক্ষ টাকা ) মানুষের কল্যাণে দান করেছিলেন। তাঁকে সারাজীবন মনে রেখেছে মানুষ । আসলেইতো মানুষ অকৃতজ্ঞ নয় । মানুষ ওই অসংখ্য ভোগী জমিদার ও রাজা-মহারাজাদেরকে মনে রাখে না, রাখে হাজী মুহম্মাদ মহসীনকে!

স্যারের বক্তৃতামালা নিয়ে কয়েকটা বই বের হয়েছে গত বইমেলায়, অনেকদিন পরে। স্যার একটু আফসোস করছিলেন, কতো প্রজ্জ্বলিত অনুভূতি কথামালা উনি জ্বালিয়ে গেছেন, কেউ মনে রাখেনি। কেন্দ্রের অনেককে অনেক বার বলেছেন, কোন আলোচনা হলে একটা ক্যাসেট রেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতে। হা হতিশ্যি ! চলে গেলে আর কোথায় পাবে বাছা !

স্যারের একটা প্রিয় তর্কের বিষয় হয়তো বার্ধক্য। বার্ধক্য নিয়ে স্যারের কখনোই হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। বছর কুড়ি আগেও কলেজ কর্মসূচির আলোচনায় , তাঁর বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্যার বার্ধক্যের জয়গান করতেন। স্যারের কথায়, বার্ধক্যতো একটা যোগ্যতা। আমার এই পরিপক্কতায় আসতে কতোখানি কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে !সবাইতো বৃদ্ধ হতে পারেনা। অনেকেই তার আগেই হারিয়ে যায়। ফুল হচ্ছে ফলের অন্তিম পরিণতির আগের মুহূর্ত। শেষের শুরু। মৃত্যু যদি হয় শেষ কথা তবে তাঁর দেদীপ্যমান শেষ প্রজ্বলনতো বার্ধ্যক্যেই !

আমাদের সবাইকে শরীরের যত্ন নিতে বললেন, কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন। ছেলেমেয়েদেরকে লাইব্রেরীতে যাওয়া আসা করাতে বললেন। স্যারের কাছে আমি মোটামুটি একটা প্রতিজ্ঞা করে আসলাম- বড়োকন্যাকে লাইব্রেরির সদস্য করে দেব। একটা ফর্মও তুলে এনেছি।

২০ বছরের দীর্ঘ বিরতিতে স্যারের সাথে অন্তরঙ্গ কয়েকঘন্টার আড্ডা কীভাবে যে কেটে গেল ! রাত আটটায় শুরু হয়ে কখন সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে! সবাই কেন্দ্র থেকে বের হলাম একরাশ স্মৃতিকাতরতা নিয়ে, ফেলে আসা ঐশ্বর্যময় দিনগুলোর কথা মনে করে। আবারো হয়তো দেখা হবে , এই ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে। স্যার সাদারঙের গাড়ীটি নিজে চালিয়ে বের হয়ে গেলেন । আমরাও বিদায় নিলাম , আবেশিত মনে, স্বপ্নতাড়িত হয়ে রওয়ানা দিলাম যার যার পথে !

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর, ২০১৫