আশির দশকে নিম্নমধ্যবিত্তরা

দুই টাকা কেজি মূলা ; আঠারো -বিশ টাকায় মাঝারি সাইজের ইলিশ। বাসায় হঠাৎ মেহমান, কিন্তু আম্মার কাছে নগদ টাকা নাই।
পাড়ার দোকানের আবার বাকীর ব্যাপারে অলিখিত একটা সার্কিট ব্রেকার ছিল। পাঁচশ টাকার উপরে হলে নতুন বাকী বন্ধ। মহল্লাবাসী ঘনিষ্ঠ খালাম্মাদের আগের মাসের ধার শোধ করা হয়নি। আম্মা একটু দূরে কম পরিচিত খালাম্মার বাসায় পাঠালেন। ‘আম্মা একশ টাকা ধার চেয়ে পাঠিয়েছে, আগামী সপ্তাহে দিয়ে দেবে।’

বাসার গেটে মাথা নিচু করে পা দিয়ে মাটি খুঁটতে খুঁটতে অসীম অপেক্ষা। টাকা ধার চাওয়া যে একটা অসম্মানের ব্যাপার , ওই ছোট্ট বয়েসেও আমি বুঝতাম। মাঝে মাঝে ওই মিশনেও ব্যর্থ। আর , আব্বা আছেন আব্বার মতো। সকালের নাস্তা , রাতের রুটি-তরকারী কোথা থেকে আসবে, সেইটা তো আম্মার দায়িত্ব। রাশভারী বড়মামা ঢাকা আসলেই আম্মা পাকোয়ান ভাজা পরোটা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। উনিও ভালোমন্দ খেতে পছন্দ করতেন। দেশের কেউ আসলে, আম্মা যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতেন, আমরা অভাবে আছি বুঝতে দিতে চাইতেন না।
মাঝে মাঝে উপায়ন্তর না দেখে পুরানো খাতা,পেপার, ডানোর ডিব্বা ভাঙারীর দোকানে দেড়-দুই টাকা কেজিতে বিক্রি ; অতঃপর মেহমান ম্যানেজ।

এই যে , নিম্ন মধ্যবিত্তের টানাপড়েন আর প্রাত্যহিক সংগ্রাম—আমার দুই কন্যা কি কখনো বুঝবে ? নাকি, আমি ওদের কখনো বুঝতে দিতে চাই !

আমার ভালোবাসার কন্যারা তোমরা হয়তো অন্যরকম অন্যকোন টানাপড়েনে পার করবে জীবনের অন্যকোন অংশ ; আপাতত: সাইকেল বা ভিডিও গেমের অপর্যাপ্ততা নিয়ে আমার সাথে অনুরাগ দেখাতে থাকো !

প্রকাশকালঃ মার্চ,  ২০১৩

নারী দিবস

আমার দুই কন্যা ( আট বছর আর দেড় বছর)।

বউ ক্ষান্তি দিছে ,আমিও দিছি, দ্বিতীয় সন্তানের জন্য বছর দুয়েক হাঁটুর চামড়া ছিইল্যা ধস্তাধস্তি করতে হইছে। আমি দুই কন্যারে নিয়া ব্যাপক খুশী। সুস্থ-সবল সন্তান আমার কাছে নিয়ামতের মতো। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।

আমার আম্মা মাঝে মাঝে তবু একটু গাঁইগুঁই করে, একটা ছেলে হইলে ভালো হয়। দুইডা মাইয়া, বিয়া হইয়া গেলে কি নিয়া থাকবি! মরলে খাটিয়া টানবো কেডা ?

বুঝি , কন্যা সন্তান, সে দারিদ্রসীমার নিচে হোক বা উচ্চবিত্তের ঘরে হোক, সে একটা বাড়তি দায়িত্ব বা বোঝার মতো আমাদের সমাজে বড় হইতে থাকে। সে সম্পদ না, সে দেনা– ঋণের বোঝা।

সেদিন, রবিবারে কাক-ডাকা ভোরে বউ কাঁচা বাজারে নিয়া গেল। পথে হাজারো বস্ত্রবালিকার টিফিন ক্যারিয়ার হাতে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কইলাম এরা আমার সতীর্থ, সহকর্মী। ( উল্লেখ্য, আমি গার্মেন্টসে কাজ করি।) কইলাম , চাইয়া দেখো , এঁরা এখন আর এদের পরিবারের বোঝা না। এঁরা ঋণাত্মক নয়, শূন্যও নয়, এঁরা আমাদের অর্থনীতির ধনাত্মক শক্তি। এঁরা এখন আয় করে,এঁরা পরিবারের ও দেশের সম্পদ।এঁরা মাথা উঁচু কইরা বাঁচা শিখছে; এঁরা বাংলাদেশটার চেহারা বদলাইয়া দিছে।

আমি নারীবাদ নারীদিবস বুঝি না, আমার পরিসংখ্যান জ্ঞান সেই রকম সীমিত। কিন্তু , আজ যে লাখো নারী ঘরের বাইরে এসে, ঘাম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে দেশটারে শত বৎসর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁদের স্যালুট।

প্রকাশকালঃ ৮ই মার্চ,২০১৩

আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত

আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত।

নিতান্তই নিজের পরিবারের কারো গায়ে আঁচড় না লাগা পর্যন্ত আমি সবকিছু মেনে নিয়ে নিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। এবং আমার এই সুবিধাবাদী চরিত্র বদলাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

পরিবহন শ্রমিকদের অযৌক্তিক ধর্মঘটের ব্যাপারটা আমাকে বিপর্যস্ত করতে পারেনি। গতরাতে উত্তরা থেকে মিরপুরে পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে পৌঁছেছি। বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ; দেশোদ্ধার করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। যেহেতু , আমার একটা ভাঙ্গাচোরা গাড়ী আছে ; তাই সকালে উঠে ট্রেডিং অফিসের কেরানীগিরির জন্য মাথা নিচু করে চলে এসেছি।

পথে আসতে আসতে আমি আমার মতো আরও অনেক ছোটবড় মাপের সুবিধাবাদীদের অসহায়ত্ব দেখেছি। কোথাও কোন প্রতিবাদ নেই। আছে ক্ষোভ আর অর্থহীন আস্ফালন !

আমি ভয়ংকর ট্র্যাফিক জ্যামে বসেও মাথা ঠাণ্ডা রাখি, সবকিছু মেনে নিই ; কারণ আমার কিছু করার নেই; অন্যেরা কেন করছে না সেটা ভেবে আমি ক্ষুদ্ধ হই। গ্যাসের দাম বাড়ছে, এটা আমাকে স্পর্শ করে না। ‘ সবার চললে আমারও চলবে!’– এই রকমের মনোভাব নিয়ে চলি। কেউ আসার পথে মাইক্রোবাসে কিডন্যাপ হয়েছে, কারো ছিনতাই হয়েছে, কেউ দুর্ঘটনায় হত বা আহত হয়েছে, আমাকে তা ভাবায় না। আমি শুধু আমার দুই কন্যার কথা ভাবি। তাঁদের ভবিষ্যতের পাথেয় জোগাড় করার জন্য উদয়াস্ত প্রাণপাত করি।

আবার আমি আশাবাদের কথাও বলি, সবাইকে আশাবাদী হতে বলি। আমি সবকিছু মেনে নিই। আমার কোন প্রতিবাদ নেই। আমি একটা বিষণ্ণ তেলাপোকার জীবন যাপন করি। সারাদিনে অসংখ্য নানা বর্ণের তেলাপোকার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলি। আমি খাই এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেশের ব্যাপারে আহা উঁহু করি।

আচ্ছা , আমি কি সেই ফরাসি বিপ্লব বা মার্কসবাদের হিসাবে শতভাগ সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া হতে পেরেছি ?

প্রকাশকালঃ ১লা মার্চ,২০১৭

টোনা কাহিনী। ঢাকার ট্র্যাফিক

প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন শহর ঢাকায় এতো দুর্বিষহ যানজট হইতেছে, আর কেনই বা আমি টোনার গৃহে প্রত্যাবর্তনে রাত্রি হইয়া যাইতেছে তাহা বোধগম্য নহে !

ইদানীং রাত্রির আহারের পরে কিঞ্চিৎ কাল বোকা-বাক্সের দিকে চাহিতে না চাহিতেই চক্ষু মুদিয়া আসে।

কয়েক দিবস পূর্বে, শ্রান্ত হইয়া গৃহদ্বারে করাঘাত করিতেই টুনি অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিল, আজও যদি জ্যেষ্ঠা টুনটুনিকে উহার বিদ্যালয়ের পাঠ না দেখাইয়া আকস্মিক নিদ্রা যাও ; তাহা হইলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! আহার সারিয়া টুনটুনির কাছে বসিয়া আবিষ্কার করিলাম, সে সবকিছুই অল্পবিস্তর পড়িয়াছে গভীরতায় যাইতে পারিতেছে না। উহাকে চুম্বক, চৌম্বকীয় শক্তি ও পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু বুঝাইতে বুঝাইতে আমি ক্রমশ: সম্মুখ-পানে ঢুলিতে লাগিলাম। আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম–আমার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিয়াছি , দেহ ক্ষীণকায় হইয়াছে। অধিক গতিতে হাঁটিতে হাঁটিতে বিমানের মতো আমি শূন্যে ভাসিয়া উড়িতে পারিতেছি। কিছুক্ষণ উড়িয়া আবার পদব্রজে চলিতেছি আবার উড়িতেছি! দূরত্ব অতিক্রম করা আমার কাছে সহজসাধ্য।

আহা ! মনে অসীম শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। ভাবিলাম , এক্ষণে মিরপুর হইতে উত্তরার কর্মস্থলে যাইবার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিতে হইবে না। টুনটুনিকে বাসায় আসিয়া শিক্ষাদান করিতে পারিব, টুনির অশ্রাব্য তিরস্কার শুনিতে হইবে না !
কিন্তু মুহূর্ত-মধ্যে জ্যেষ্ঠা টুনটুনির ধাক্কায় নিদ্রা টুটিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল ! সে স্মিতহাস্যে কহিল, নিজের শয্যায় গিয়া নিদ্রা যাও পিতা। তোমার এমত সঙ্গিন অবস্থা মাতা টুনির চোখে পড়িলে অনর্থক লঙ্কাকাণ্ড হইবে !

পুনরায় নিদ্রা যাইতে যাইতে পার্শ্ববর্তী টুনিকে বলিতে শুনিলাম , অধুনা ‘মুখ-পুস্তিকায়’ এতো পুনঃপ্রচার করিতেছ কেন ? আরো গভীর নিদ্রায় তলাইয়া যাইতে যাইতে কহিলাম, শহর ঢাকার এমত অবস্থার আশু পরিবর্তন না হইলে নতুন কিছু লিখিবার অবকাশ কোথায় ? যানজটও শেষ হইবে না ; আমারও ডানা গজাইবে না ; অবসন্ন দেহ ও মন লইয়া নতুন কিছু লেখালেখির অবসরও বোধ করি পাইব না !
সে কি বুঝিল কে জানে !

প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০১৭

আধুনিক বিয়ে

গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে হয়েছে। ঢাকার বিয়েতে বছর বিশেক আগে খাবার মেনু যা ছিল, এখনো তাই ; শুধু রোস্টের মুরগী দেশী থেকে ফার্মের হয়েছে, বাকী আগের মতোই।

নতুন যে ব্যাপারটি চোখে পড়ল বা আমাদের প্রজন্মের হিসাবে খানিকটা দৃষ্টিকটু লাগল, তা শেয়ার করতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রজন্মের বিয়েতে লাজুক অবনত নববধূ ছিল অনুষ্ঠানের একটা সৌন্দর্য। অধুনা, নববধূদের আগ্রাসী আচরণে আমি একবার খুশিও হলাম আবার পুরনো মূল্যবোধের মানুষ বলেই হয়তো কিছুটা মর্মাহতও হলাম। বিয়ের আসরে নববধূরা এতো স্বচ্ছন্দে তাঁদের সদ্য-প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বার্তা বলছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ; যেচে সবার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল – তা দেখে মনে হচ্ছিল এঁদের মনে হয় বছর দশেকের প্রেমের পরে বিয়ে। অথচ আমি খুব ভালোভাবে জানি, এঁদের পারস্পরিক পরিচয় দুই-তিনদিনেরও কম।পুরোটাই অ্যারেঞ্জড্‌ ম্যারেজ !
আমাদের সময়ে প্রেমের বিয়েগুলোতেও নববধূরা লোক দেখানোর জন্য হলেও হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে দামী মেকআপ নষ্ট করে ফেলত। সেই হিসেবে কান্নাকাটির পর্বের সমাপ্তি আমি অর্থনৈতিক হিসাবে সাশ্রয়ী বিবেচনা করছি। এখনকার বিয়ের আসরে বর-কনের মধ্যে বরটিকেই বড্ড চুপচাপ, মৃদু , ম্লান, ত্রস্ত ও বলির পাঁঠা মনে হয়েছে।

জীবনসঙ্গিনী প্রাপ্তির তীব্র ব্যাকুলতা আমার আগের প্রজন্মে কেমন ছিল সেটা আমার আম্মার মুখে শোনা একটা ‘রিয়েল লাইফ’ ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

আম্মার গ্রামে বা আশে পাশে কোথাও এক দরিদ্র চাষির মেয়ের সঙ্গে আরেক কৃষিজীবী কামলা চাষির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে। হবু শ্বশুর আর হবু জামাতা দু’জনই সকালে চাষের কাজে যায়। মেয়ের বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হয়তো ফসল তোলা, বা আর্থিক অনটনের ব্যাপার ছিল। এখন ব্যাকুল হবু জামাতার তো আর তর সইছে না। প্রতি সকালে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের পরেই তার মৃদু ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়। তারিখ কবে ঠিক করছেন, দেরী হচ্ছে কেন , এইসব। এইরকম কয়েকদিন হওয়ার পরে শ্বশুর খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন,
” রাখো রে বাপু ! বল্‌লিই তো হয় না ; আমার তো একটা গোছগাছ আয়োজনের ব্যাপার আছে, নাকি ? তোমার আর কি ! তুমি তো বাপু নিবের পারলিই শুইবের পারো ! ( তুমি তো বাপু, নিয়ে যেতে পারলেই শুতে পার !) ”

পুরুষ-শাসিত সমাজে ব্যাকুলতা প্রকাশের ব্যক্তিটি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে ভালই লাগছে! আবার আধুনিক নববধূদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে , এঁদের সবার সেই চাষি হবু জামাতার চেয়েও অবস্থা শোচনীয় । কোনমতে বিয়েটা হলেই শুতে পারবে সেইটাই হয়তো সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখছে তাঁদের ; সৌজন্য-সামাজিকতার লেশমাত্রও চোখে পড়ছে না !

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬

থ্রি ইডিয়টস অথবা কীভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এলাম।

ছোটবেলায় আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র মানেই রনি ভাইয়ের মতো বেশী পাওয়ারের চশমা পড়া ভালো ছাত্র কেউ একজন। ১৯৭৯-তে আমরা মিরপুর পাইকপাড়াতে ভাড়া থাকতাম। বাড়ীওয়ালার ছোট-ছেলে রনিভাই ঢাকা কলেজের ছাত্র আর বুয়েটের জন্য পড়াশুনা করতেন। রাজ্যের এলোমেলো বই , গ্লোব , খেলনা, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে রুম ভরা। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলেন। ভুলন ভাই আর রনিভাই ছিল পিঠাপিঠি এবং তাঁদের বালখিল্য সুপারম্যান ও টারজানের লড়াইয়ে আমি রেফারিং করতাম। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে যে, পেটে বিদ্যা লাগে এইটা বুঝতাম।

পরে বড়-ফুফুর বাড়ীতে অন্তর্বর্তীকালীন থাকা অবস্থায় তাঁর ননদ নন্দিনী আন্টির দেখা। সম্ভবত: ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তাঁর ভাইয়ের বাড়ীতে ছুটি কাটাচ্ছেন আর পাত্রস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। উনার বিয়ে হয়ে গেল আরেক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। আবারো বুঝলাম সুন্দরী পাত্রী পেতে হলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে ! জীবনের যে কোন হিসাব নিকাশ থেকে শুরু করে সবরকম অংকেই আমি কাঁচা , সরল অংকের ফল সামনের বেঞ্চের তুহিনের যদি আসে ১ আমার আসে ১৪৫৩/১৮৫৬; কী মুশকিল !

পরিবারের চাপে ও সামাজিক এক্সপেকটেশনে বিজ্ঞান বিভাগে। তাছাড়া আমাদের সময় স্যাররাই ঠিক করে দিতেন রোল ১ থেকে ৩০ সাইন্স বাকীগুলো আর্টস বা কমার্স। নীচের কেউ যদি সাইন্সে পড়তে চায়, আব্বা-আম্মা সহ যোগাযোগ করতে হবে। আমি আবার ক্লাসে অংক, বিজ্ঞানে মাঝারি নাম্বার পেলেও বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, ভূগোলে উপরের দিকে থাকতাম। দেখা যেতো ফার্স্ট বয়, সেকেন্ড বয় অংক বিজ্ঞানে আমার চেয়ে ১৫ নাম্বার বেশী পেয়েছে। আর আমি অন্য আবঝাঁপ সাবজেক্টে তাঁদের চেয়ে ১০/১২ নাম্বার বেশী পেয়েছি। গড়পড়তায় ক্লাসে আমি আমি থার্ড ফোর্থ কিছু একটা হতাম।

আমার মেধা হয়তো সামাজিক সাহিত্যিক সাবজেক্টে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল।হলে কী হবে, সামাজিক চাপেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়া ! যদিও একটা পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান আমি ভীষণ এনজয় করেছি এবং এখনো করে চলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ, বঙ্কিম, মধুসূদন পড়ার জন্য বাংলা বিভাগে ভর্তি না হলেও চলে। কিন্তু , আপেক্ষিকতার সূত্র বোঝার জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা ভালো। একজন সাহিত্যের ছাত্র বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে পড়াশুনা করার বা উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু, একজন বিজ্ঞানের ছাত্রের সাহিত্যে উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী !

এমন হয়েছে, টিএসসিতে গণ আড্ডায় বসেছি, কলাভবনের ভাই-বেরাদররা এমনভাবে কথা বার্তা শুরু করলো যেন আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনি নাই। কেমন করে বোঝাই ওই ক্লাসিকগুলো আমরাও অনেক আগেই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু , আঁতলামি করতে মন চাইতো না । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি বলে যদি কেউ আমাকে সাহিত্যের মফিজ ভাবে, সেটা তাঁর সমস্যা, আমার না। আমি কি পড়েছি বা কি জানি সেটাতো প্রমাণ করার কিছু না। শেক্সপিয়ার, গ্যেটে , র্যাঁবো থেকে কোট করে কেউ যদি ভাবে সাহিত্যে তাঁদের একচ্ছত্র অধিকার, আমার কী করার আছে!

এইচএসসি দিয়েই আমি বুঝে গেছিলাম , বুয়েটে চান্স পাওয়ার চান্স কম! ৩/৪ মাসের সত্যিকারের পড়াশুনা করে এইচএসসি পাশ করা যায়। বুয়েটের জন্য আরও ঘাম ঝরাতে হয়। আমার টাইমিং ঠিক ছিল না। আই মিসড দ্য ট্রেন ! বুয়েটে ব্যর্থ হয়ে , অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ‘ক’ ইউনিটে ২৫০ এর পরের সিরিয়াল। কী মনে করে ‘ঘ’ ইউনিটেও পরীক্ষা দিলাম। যতদূর মনে আছে মেধাতালিকায় ২৯তম।মহল্লার বন্ধু বড়ভাইয়ের ব্যাপক উৎসাহ দিল- ‘আরে মিঞা , এইটাই তোমার লাইন, চোখকান বুইজা আই আর বা Economics এ পড়া শুরু করো এইগুলা খুব হট সাবজেক্ট। ভালোমতো রেজাল্ট করলে বিদেশী ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, মায় শিক্ষকতা কইরা বা , কনসালটেন্সি কইরাও হুলুস্থূল জীবন।’

সোজা ভাইবা বোর্ডে গেলাম। স্যারেরা জিজ্ঞাস করলেন , ‘তুমি ইকোনমিক্সে ভর্তি হলে থাকবে তো ? নাকি বিজ্ঞান অনুষদে চলে যাবে?’ আমি মুখ চোখ সেই রকম সিরিয়াস করে বললাম, ‘আমার অনেক দিনের স্বপ্ন স্যার অর্থনীতিতে পড়া!’ স্যারেরা একটা ভর্তি ফরমে অর্থনীতি বিভাগের স্ট্যাম্পিং দিয়ে বললেন , ‘যাও টাকা জমা দিয়া ভর্তি হও।’ ওইদিকে বিজ্ঞান অনুষদে প্রথমবারে পেলাম Statistics । বাসায় গিয়া ভয়ে ভয়ে আব্বাকে বললাম আমি Economics-এ পড়তে চাই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তোকে সাইন্স পড়েয়েছি কি Economics পড়ার জন্য ? আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা পড়ে এসেছি। Economics- আর্টসের সাবজেক্ট, এর সাথে সাইন্সের কী সম্পর্ক !’ আমি আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম বিজ্ঞান অনুষদের সাবজেক্ট ভালো পাই নাই, এর চেয়ে Economics ভালো । কিন্তু আমার তোতলামি ধোপে টিকলো না। তার পরেও অর্থনীতি বিভাগের ভর্তির ছাড়পত্র অনেকদিন আমি রেখে দিয়েছিলাম কাছে, মাঝে মাঝে খুলে দেখতাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম ! বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি হলাম পরিসংখ্যানে, অ্যানেক্স বিল্ডিং এ যাই মাঝে মাঝে। ক্লাস করি কী করি না , আর একই সাথে সম্ভবত: নজরুল ইসলাম হলের বুয়েটের এক বড়ভাইয়ের কাছে যাইয়া দ্বিতীয়বারের বুয়েট প্রিপারেশন নিই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহ তিনেক না যেতেই নোটিশ আসলো ,সামনের সীট ফাঁকা হয়েছে, আমি এখন ইচ্ছা করলে রসায়ন বিভাগে মাইগ্রেট করতে পারি। ভাবলাম, যাই, কেমিস্ট্রিই ভালো , সেই সঙ্গে কার্জন হলের আশে পাশে থাকতে পারা যাবে। কেমিস্ট্রিতে হুমায়ূন আহমেদ স্যার সম্ভবত: শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। ওইখানে কিছুদিন ক্লাস করতে করতে আবার নোটিশ সিরিয়াল এগিয়েছে ইচ্ছা করলে Applied Chemistry-তে মাইগ্রেট করতে পারব। ততদিনে এদিক সেদিক পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছি। ঢাকার বাইরে একটাও না। আমি ঢাকার বাইরে পড়তে যেতে কোনভাবেই রাজী ছিলাম না। ভাই-বেরাদারদের পরীক্ষায় সাহায্য করে বেড়াতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে জাহাঙ্গীর নগরে পরীক্ষা দিয়ে ইলেক্ট্রনিকস পেলাম। যাকে হেল্প করতে গিয়েছিলাম, তাঁর কিছুটা হেল্প করতে পেরেছিলাম ; আর সময় পেয়ে বসে না থেকে খাতা কমপ্লিট করেছিলাম।

তো, বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হয়ে সপ্তাহের একদিন দুইদিন কার্জন হলে যাই। ১২ টাকা দিয়া চিকেন বিরিয়ানি খাই, চৈতালিতে বাড়ী ফিরি। মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধবের সাথে ঢাকা মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে বা টিএসসিতে আড্ডা মারি। সপ্তাহে একদিন বুয়েটের নজরুল হলে যাই। সেই বড় ভাইয়ের কাছে কিছু মডেল টেস্ট দিই। আর বাকী চারদিন মহল্লার রেগুলার বছরে বুয়েটে চান্স পাওয়া আমাদের ব্যাচের সেশনজটের আটকা পোলাপানের সঙ্গে আড্ডা দিই।

এর মাঝখানে এক বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম তুইল্যা আনছি। তোমাগো হেল্প লাগবে, ৮/১০ জন একলগে ভর্তি ফর্ম জমা দিলে , আমি হেল্প পামু, য্যাম্নেই সীট পড়ুক না কেন !’ সেই ফ্রেন্ডই সবকিছু করলো। ভর্তি পরীক্ষার দিন ভুলে বসে আমি সকালে আরেক ফ্রেন্ডের বাসায় কার্ড পিটাচ্ছি। সে এসে ধরে নিয়ে গেল।যাতায়াতের ভাড়া, চা- সিগারেটের খরচ তার। তাঁকে কিছু হেল্প করতেও পারলাম। আমি নিজের খাতাও পূর্ণ করলাম। পরে দেখি, আমি মেরিট লিস্টে, কিন্তু বন্ধু ওয়েটিং লিস্টে !

ওই সময় আব্বাকে কেউ বোঝালো , টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই ভালো সাবজেক্ট । আমার জনৈক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আবার কোন টেক্সটাইলে যেন অনেক বেতনের চাকরি করেন। টেক্সটাইলে এক্সপার্ট লোকের অভাব আছে, চাহিদা অনেক। আমার ছোটমামারও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারে ভোট ছিল। আমি যতোই গাঁইগুঁই করি না কেন আব্বার ঝাড়ির চোটে তৎকালীন কলেজ অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি-তে ভর্তি হয়ে যেতে হল। ওইদিকে ওয়েটিং লিস্টের ফ্রেন্ডটাও জোরাজুরি করলো। তাছাড়া অনিশ্চয়তাও ভালো লাগছিল না। অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে গেলাম ভর্তি হয়ে টেক্সটাইলে। ওখানকার জীবন, হল লাইফ, সে আরেক কাহিনী।

আব্বা অনিয়মিতভাবে হিন্দি সিনেমা দেখতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই সময়ে যদি আমির খান থ্রি ইডিয়ট( 3 Idiots) ছবিটা বানাতো আর আমার আব্বা যদি কোনক্রমে সেটা দেখে ফেলতেন; তাহলে আজ হয়তো আমি একজন অর্থনীতিবিদ হতে পারতাম !