জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার | প্রথম পর্ব

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গেলাম বছর বিশেক পরে গত ২৪শে আগস্টে। কেন্দ্রের ৯০ ব্যাচের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতীর্থ কয়েকজনের সাথে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে স্যারের ছোট্টরুমে মুখোমুখি । মূলতঃ প্রবাসী সতীর্থ খাদিজা ও শাহনীলাই আড্ডার উদ্যোক্তা। স্যারের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।

আমার কাছে কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সমার্থক। ফোনে ফোনে ও কেন্দ্রের নতুন ছাদে চা-পুরি খেতে খেতে সতীর্থদের করজোড়ে অনুরোধও করলাম , আমার এই দীর্ঘ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের ব্যাপারটা স্যারের সামনে চেপে যেতে ; বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে । ভয় ছিল , স্যার যদি আমার আলস্য দেখে বিরক্ত হয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ ধ্যাত !’ বলে বসেন , তবে লজ্জার শেষ থাকবে না ! আসলে পড়াশুনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে কখন যে কলেজ কর্মসূচী , প্রাক-মৌলিক , মৌলিক ছেড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে গেলাম মনেই নেই ! একবার তার ছিঁড়ে গেলে যা হয়, সে আর লাগে না জোড়া।

এতো অনুরোধের পরেও , কয়েকটি বাক্যের কথপোকথনের পরেই , একজন মনে করিয়ে দিল, স্যার , জাহিদ বিশ বছর পরে কেন্দ্রে এসেছে ! স্যারের চিরকালীন প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখের অভ্যর্থনাই পেলাম মনে হল। হাঁফ, ছাড়লাম, পুরনোদের মাঝে মিশে যেতে পেরে। এতোদিন পরেও আমার মতো অভাগার ব্যাপারে স্যারের সহানুভূতিতে মুগ্ধ ! আসলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালীন।অনেক দূর থেকেও শিক্ষক যেমন টের পেয়ে যান জনারণ্যে কে তাঁর ছাত্র ; ঠিক তেমনি করেই ছাত্রটিও মুহুর্তেই পুনঃআবিষ্কার করে শিক্ষকের প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধার সম্পর্কটিকে । তবে, তাঁকে ( মানে ওই শিক্ষককে হতে হয় , মানবিক ও উদ্বুদ্ধকারী)। যে শিক্ষক ছাত্রের গায়ে বেতের বাড়ি, অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া কিছু করেন নাই ; মস্তিষ্কের উপরে , হৃদয়ের উপরে দাগ ফেলতে পারেন নাই, তাদের কথা আলাদা। কোন ছাত্রই তাদের দীর্ঘদিন মনে রাখনি। শিক্ষকতা তাদের কাছে ক্ষুন্নিবৃত্তির একটা উপায় মাত্র ছিল। আমার স্কুল জীবনে ও কলেজ জীবনে এরকম দায়সারা গোছের শিক্ষক নিতান্ত কম ছিল না। এখন আরো বেড়েছে।

প্রবাসী বন্ধুদের (খাদিজা,শাহনীলা) সাথে স্যারের আন্তরিক সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিতই হলাম ! এঁরা দূর লন্ডন ও কুয়েতে থেকেও কী গভীর মমতায় , কী শুদ্ধ শ্রদ্ধায় স্যারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। আর আমি বাংলামোটর থেকে মাইল দশেক দূরে মিরপুরে থেকেও কেন্দ্র , স্যার সবকিছু থেকে থেকে সহস্র মাইল দূরে !

৯০ সালে ঢাকা কলেজে স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। বিলাসী পড়াতেন মনে আছে! আমাদের উন্মুখ হৃদয়ে স্যারে একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট ছিল চিরকালীন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

এতোদিন পরে, কেন্দ্রে যাচ্ছি, রাস্তা একটাই জানি। এও শুনেছি, কেন্দ্র নাকি অনেক উঁচু ইমারতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সেই ছিমছাম সুরঞ্জনা , সামনে ঘাসের লন, লনের শেষে বৃদ্ধ আম গাছ, কিছুই নাকি নেই। কেন্দ্রের নতুন বিল্ডিং এর ব্যাপারে আমি আরেক সতীর্থ ডন আজাদের সাথে একমত পোষণ করলাম!কেন্দ্র তার রোম্যান্টিক মৃদুমন্দ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। ওঁর ভাষায় কেন্দ্রের চেহারা বৈপ্লবিক ও আগ্রাসী হয়েছে (Revolutionary and Aggressive ) ! এইটার দরকার ছিল।

সায়ীদ স্যার কিন্তু আগের মতোই আছেন।

কলেজ কর্মসূচীর মাধ্যমে ১৯৯০ বা ৯১ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাথে আমাদের পরিচয়। কারো কারো স্কুল থেকেই হয়তোবা। স্যারের আলোকচ্ছটায় মুগ্ধ কৈশোরের অনেকেই এখন চল্লিশোর্ধ। যদিও পেশা ও জীবিকার বৈচিত্র্যে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কেন্দ্রমুখী প্রাণের টান রয়ে গেছে সবার । এমন একটা উন্মুখ সময়ে স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় ! তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য । ঘন্টা খানেকের আড্ডায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল! আড্ডার শুরুতেই মনে হয়নি, এতোটা স্মৃতিমেদুরতা থাকবে, এইভাবে আমরা কয়েকজন ফিরে যাবো আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে। স্যার কলেজ কর্মসূচির সময়েও অনভিজ্ঞ তারুণ্যের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া, জ্ঞানবিজ্ঞানের যে কোন আলোচনায় আমরা স্যারের বয়স্য বিবেচিত হতাম বলে মনে আছে।

স্যারের সাথে একদিনের আড্ডা মানেতো এক দশকের ইন্সপিরেশন !স্মৃতিতে ধুলো পড়ার আগেই , আড্ডাটাকে দিনলিপির মতো করে লিখে রাখলাম। পরে এই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে ভালোই লাগবে!

দীর্ঘ বিরতিতে আলোচনার নতুন বিষয় ছিল আমাদের সন্তানদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা। আমরাও কয়েকজন জয়া আপা( স্যারে কনিষ্ঠা) ও লুনা আপার( জ্যৈষ্ঠা ) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কথার মাঝেই , আলোচনা শুরু হল

বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুর মতো একটা ভয়ংকর বিভীষিকা দানবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কলকাকলিমুখর জীবনের সামনে, এইটুকুই ! মৃত্যু নিয়ে স্যারের আর কোন কথা ছিল না।

মৃত্যু থেকে লাফ দিয়ে চলে গেলেন রোমান্টিসিজমে। কয়েক শতক আগেও আমদের সাহিত্যে, জীবনে কোথাও রোমান্টিকতা ছিলনা। এই উপমহাদেশের জীবন ছিল নিতান্তই জৈবিক , অন্নবস্ত্র বাসস্থান , যুদ্ধ, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন এইতো ! ষষ্ট শতকের কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কথা ওঠালেন স্যার। নির্বাসিত বিরহী যক্ষে তাঁর ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চায় মেঘের মাধ্যমে। এইটুকু ছাড়া পুরো বর্ণনায় প্রিয়ার দেহের বাঁক , কামনা আর হুতাশন। শারীরিকতা বা দৈহিকতাই প্রধান। রোমান্টিকতা নেই । সেই আমরাই একসময় , সংস্কৃত ইতিহাস থেকে উঠে এসে রোমান্টিকতায় ভেসে যাচ্ছি।

স্যারের পর্যবেক্ষনে মানুষ সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। আমরা সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমাদের সবার বিয়ের মোটামুটি কমবেশী বারো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে !

এক বন্ধুতো মন্তব্য করেই ফেলল, স্যার এইজন্যই সব কিছু পানসে পানসে লাগছে। রোমাঞ্চ নেই, বড্ডো একঘেয়েঁমি ! হাসির একটা হুল্লোর উঠলো ছোট্ট রুমটাতে।

ইংল্যান্ডে কোন একটা প্রাচীন স্থাপনা দেখার প্রসঙ্গ আসতেই , আলোচনা অজন্তা, ইলোরাতে চলে গেল। স্যারের মুখের সৌকর্যময় বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার নিজেরই ইচ্ছা করছিল, অজন্তা ও ইলোরা দেখতে।

কেন্দ্রের পুরোনোদের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা উঠলো, ডাঃ আব্দুন নুর তুষার ভাইয়ের ব্যাপারে স্যার বললেন, ছেলেটা মেধাবী, কেন আরো উপরে যেতে পারছে না বলতো ? নিজেই উত্তর দিলেন, কারণ ও অলস ! আরো পরিশ্রমী হলে ও অনেকদূর যেতে পারত।

নতুন সরকারের নানামুখী কাজের পাশাপাশি পুরনো আমলের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রসঙ্গ উঠল। সম্ভবতঃ নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মতো সরে জমিনে ফিল্ড ট্রিপের অভ্যাস থেকেই নাজমুল হুদার কথা উঠেছিল। তারও অভ্যাস ছিল হুট করে পথে নেমে নিজে নিজেই সরেজমিনে শো অফ করা ; বাহাদুরি দেখানো। তো স্যার একদিন নাজমুল হুদাকে বললেন, এইটা তার করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ নেতা কেন সম্মুখসমরে যাবে? নেতার হাতে কেন তরবারী থাকবে? কোন কারণে একজন সাধারণ জনগণ যদি নেতাকে বা মন্ত্রীকে একটা চড়ও মেরে বসে, মানসম্মান কী আর উঠে আসবে ?

ব্রাহ্মণ্য নিয়ে , কৌলিন্য বা এলিটিজম নিয়ে, যতোই দ্বেষ থাকুক না কেন, স্যার নিজেকে, শিক্ষকদেরকে সমাজের ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন । সেদিনও দিলেন। জাতভেদে যারা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, সমাজের মাথা তারাতো ব্রাহ্মণই । ব্রাহ্মণ মাথা চালাবে। যুদ্ধ করবে ক্ষত্রিয় । বৈশ্য করবে ব্যবসা। শূদ্র বাকী তুচ্ছ কাজগুলো। দাবার বোর্ডে রাজা স্বয়ং যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধ করে অন্যরা। তরবারীর এক খোঁচায় রাজা ঠুস্‌ করলেতো যুদ্ধই শেষ !

সরকার থেকে কেন্দ্র ডেমরা বা গেণ্ডারিয়াতে একটা জমি পেয়েছে। ঐখানে স্থাপনার জন্য দশ কোটি টাকার একটা আবেদন করে বসে আছেন কবে থেকে। স্যারের ইচ্ছা একটা মিলনায়তন বা প্লাজা টাইপকরে কেন্দ্রের কিছু অর্থসংস্থান করা। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীগুলোর খরচ, স্কুল কর্মসূচির খরচ, প্রকাশনা ইত্যাদি দিনে দিনে বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে ! ঘুরে ফিরে আত্মীয়তন্ত্রের কথা চলে আসলো, শত শত কোটি টাকা হাপিস হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু শিক্ষার জন্য দশকোটি মানেই দ্বারে দ্বারে ঘোরা।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য )

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর ২০১৫

প্রসঙ্গঃ অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।

কিছু কথা সবার সঙ্গে বলতে বলতে মনে হয়, এ বোধহয় আমার একেবারে নিজস্ব কথা। হয়তো নানা পড়ার ফাঁকে ; কথাশোনার ফাঁকে, কথাগুলো আমারই হয়ে গেছে। আমাদের উপমহাদেশীয় সমাজের প্রেক্ষিতে আমার যা মনে হয়ঃ আমাদের জন্ম হওয়ার পর দুটো চালিকাশক্তি আমাদের সর্বোচ্চ প্রভাবিত করে চলে ও একপর্যায়ে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে !

প্রথমটি হচ্ছে , নিরাপত্তাহীনতা বা ইনসিকিউরিটি ! যে নিরাপত্তাহীনতায় আমাদের মধ্যবিত্ত অগ্রজরা ভুগেছিলেন, তা আমাদের মাঝে বংশানুক্রমে চলে আসে। পরিশ্রম, প্রতিযোগিতায় নানারকম প্রাপ্তি ও অর্জন দিয়ে আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ করার চেষ্টা করি । পড়াশোনা, চাকরি,ব্যবসা , টাকা, গাড়ী, সেভিংস ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলতঃ এটার কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ বা সীমারেখা নেই। মাথাগোঁজার একখানি জমি হলে কি মানুষ নিরাপদ ! সে কী ক্রমাগত আরো জমির মালিক হতে চায় না ! একটা ফ্ল্যাট হয়েছে আরেকটা করে নিরাপত্তা বাড়াতে চায়। নগরীর এই প্রান্তে কিছু থাকলে,অপরপ্রান্তে । একই ব্যক্তির লাখ টাকার ব্যাংক ডিপোজিট যেমন তাকে নিরাপত্তা এনে দিতে পারে না ; কোটি টাকা ডিপোজিটেরও সেই সম্ভাবনা নেই। কোন কিছুতেই আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ করতে পারিনা বা নিরাপদ ভাবতে পারিনা। পরবর্তী বংশধরদেরকেও একই ভাবে নিরাপদ করার ক্রমাগত চেষ্টা করে যাই। স্বদেশ থেকে প্রবাসী হয়ে জীবনকে আরো নিরাপদ করতে চাই। একটা উর্ধ্বশ্বাস দৌড় ক্রমাগত আমাদের ত্রস্ত করে।

আর , জীবন আমাদের হাতের ফাঁক গলে কখন নীচে পড়ে যায় , আমরা টেরও পাইনা ! নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিতে নিতে জীবন শেষ হয়ে যায় !

দ্বিতীয়টি হচ্ছে , অনিশ্চয়তা বা আনসারটেইনিটি। আমরা কেউই জানিনা – আগামীকাল কী হবে , আগামী সপ্তাহে বা বছরে কী হবে ! আমরা ভুলে যাই, পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে থেকে আমার মত সাধারণ লোকের জন্য এই অনিশ্চয়তা সমানুপাতিকভাবে আছে। এই অজানা অনিশ্চয়তাকে ঘিরেই আমাদের বৈচিত্রময় লৌকিকতা , আচার-আচরণ,ধর্ম ও সামাজিকতা গড়ে ওঠে। আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে দেখা শুরু করি। কীভাবে জীবনকে দেখতে হবে আমরা অন্যের কাছ থেকে শিখে ফেলি। আর , অনিশ্চয়তাকে কাটাতে চেষ্টা করি। কিন্তু পেরে উঠি না। অনিশ্চয়তাকে যে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না, এটাও মেনে নিতে পারি না।
নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য । তবে , এদেরকেই জীবনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে দেয়াটা যৌক্তিক নয় । হয়তো , এদের সঙ্গে সহাবস্থান ও সমঝোতা করে চলে , এই দুইয়ের মাঝেই জীবনকে খুঁজে নিতে হয় !

বিনয় ও অহংকার

আমার মনে হয়, বিনয় ও অহংকার দু’টি আচরণই এক্সট্রিম বা চরমভাবাপন্ন । ভুল বোঝাবুঝির সমূহ সম্ভাবনা । বিনয়ী ব্যক্তিকে সচরাচর শক্তিহীন ও নির্বোধ ভাবা হয়। অহংকারী, উদ্ধত লোকের সুবিধা হচ্ছে তাঁকে নির্বোধ ভাবার সুযোগ অন্যদের কম। কিন্তু এঁদের সমস্যা হচ্ছে এঁরা মানবিক হতে পারেন না। অহংবোধ তাঁদেরকে এক ভীষণ দূরত্বের নিঃসঙ্গ দ্বীপ করে রাখে।

এর মাঝামাঝি মানবিকতার পরিমিতিবোধ নিয়ে চলাটাই শ্রেয়।

[প্রকাশকাল: ১৭ই জুন,২০১৩ ]

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( কর্পোরেট আতঙ্ক )

একজন হতাশ, ব্যর্থ লোকের সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো আজকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন বলে উনাকে ব্যর্থ একজন বললাম।কারণ , আমার চারপাশের সবাই মানুষকে অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়েই মাপেন। ভদ্রলোক বছরকয়েক আগে বড়ো কর্পোরেট চাকরি করতেন, বাইপাস সার্জারিতে সহায়-সম্বল শেষ। শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘবিরতিতে উনি উনার চাকরিজীবনের আগের পজিশন হারিয়েছেন। এইটা খুব স্বাভাবিক । তাঁর অধস্তনরা উনাকে ফেলে চলে গেছে সামনের দিকে , বয়স ও শারীরিক কারণে নতুন চাকরি পাওয়া অনেকটা জটিল হয়ে গেছে। সবাই, এড়িয়ে চলেন। হুম হাম করে পাশ কাটিয়ে যান।

ভেবেছিলেন ব্যবসা করবেন। ব্যবসা করার যোগ্যতা বা মূলধন কিছুই নাই। কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নাই। ত্রিশঙ্কু অবস্থা । আমি নিজে , ব্যবসার ‘ব’ ও বুঝি না। উনাকে বললাম, ‘চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে হলেও পুরোনা মালিকের ওখানে জয়েন করেন , যে পজিশনেই হোক না কেন, আপনারে দিয়া ব্যবসা হবে না। কিছুদিন চাকরি করার পরে হয়তো কোন না কোন পথ পেয়ে যাবেন।’

আমাদের কর্পোরেট জগতের সবাই, খুব ভিতরে একজন আতংকিত ব্যর্থ মানুষকে বয়ে নিয়ে চলছি। আমরা কেউ জানি না, কখন কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যর্থ লোকটা বের হয়ে আসবে সামনে !

[ প্রথম প্রকাশ ৭ই জুন,২০১৩ ]

স্বগতোক্তিঃ অনিশ্চয়তা।

কিছুদিন আগে কলিগের পারিবারিক ঝামেলার ইস্যুতে  ঢাকার জজকোর্ট পাড়ায় যেতে হয়েছিল। ঘর্মাক্ত , বিষণ্ণ কয়েক ঘণ্টায়  মলা-ঢ্যালা-চিংড়ী উকিল পেরিয়ে অবশেষে সিনিয়র উকিলকে পেলাম। অসংখ্য সারিবদ্ধ আলোবাতাসহীন  খুপরি ঘরের মতো চেম্বার! সরুগলিতে সিনিয়র উকিলের চেম্বারের  ঠিক সামনেই একটা কসাইয়ের দোকান। লাল-লাল-গোলাপি ছিলে রাখা সারিসারি ছাগল-ভেড়া-খাসি ঝুলছে। নীচেই কয়েকটা ছাগল বেঁধে রাখা, অপেক্ষমাণ । আমি মোবাইলে ছবি তুলি না সচরাচর। তোলা উচিৎ ছিল। দৃশ্যটার আপেক্ষিক তাৎপর্য ওই মুহূর্তের জন্য ও  হয়তোবা সবসময়ের জন্যই আছে। ঝুলে থাকা সহযাত্রীর মাংসপিণ্ডের পাশে বসে নিশ্চিন্তে ঘাস চিবানো, জাবর কাটা। চরম আশাবাদ, নৈরাশ্য, অনুদ্বিগ্নতা, নির্লিপ্ততার  দারুণ একটা মিশ্রণ। ওই যে , সিনেমায় থাকে না , সিম্বোলিক শট্‌। মোমবাতি কাঁপতে কাঁপতে নিভে যাওয়া। দুইটা পাখি পাশাপাশি ঠোঁটে ঠোঁটে। অর্থটা  দর্শকের কাছে খুব স্পষ্ট, আলাদা ব্যাখ্যা লাগে না !

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কোন একটা বইয়ে অনেকটা এইরকম একটা দৃশ্যপট ছিল , সাপে ব্যাঙ ধরেছে। অর্ধেক শরীর সাপের মুখের ভিতরে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। একটা পতঙ্গ উড়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে, ব্যাঙটা খপ্‌ করে জিভ বাড়িয়ে দিল। যতক্ষণ জীবন ততক্ষণ উপভোগ! আমিতো আশাবাদই  দেখি।

টাইটানিক যখন ডুবে যাচ্ছিল, হাজারো যাত্রীর জীবনের সর্বোচ্চ অনিশ্চয়তার চরম আতঙ্কের  মাঝেও  কিছু লোক কিন্তু তাঁদের গিটার, বাঁশী নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে সঙ্গীতে মগ্ন ছিল। বিদায় হে যাত্রীসকল, বিদায়। বেঁচে থাকুন বা চলে যান, যাত্রা শুভ হোক !  হ্যাঁ , অনেকে বেঁচে গেছেন, অনেকে  অসহনীয়  যন্ত্রণায় বরফ-শীতল অতলান্তিকে বিলীন হয়ে  গেছেন, তাঁদের সবার প্রতিই আমার সমবেদনা। আমাকেও  যদি বেছে নিতে বলা হয়, আপনি কী করতেন। আমিও সবার মতোই একটা কিছু নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতাম। কিন্তু, ওই কয়েকজনের দিকে আমি সারাটাজীবন ঈর্ষা নিয়ে তাকিয়েই থাকবো।  থাকুক না কিছু বোকা নির্বোধ মানুষ যারা সবার চিন্তার বাইরে চিন্তা করতে পারেন সবার কাজের বাইরে কাজ করতে পারেন !

[ প্রথম প্রকাশঃ ১৯শে মে, ২০১৫ ]

স্বগতোক্তিঃ একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী!

আমার কাছে মনে হয় , একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী। একেকটা আলাদা ভুবন। আলাদা আলাদা সৌরজগতের মতোই বিশেষ কেউকেউ আবার আলো দিয়ে উজ্জ্বল করে রাখে চারপাশ। যে বয়সেরই হোক না কেন , পরিবারের কারো অকালমৃত্যুই সহ্যাতীত কষ্টের। কিন্তু, যখন পরিবারের মেরুদণ্ড উপার্জনক্ষম কারো মৃত্যু হয়। শুধু শারীরিক ও মানসিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুরো পরিবারটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে ওই সৌরজগতে !
হ্যাঁ ,জীবন থেমে থাকে না। এই মুহূর্তে আমার অকাল-প্রস্থানেও কারো হয়তো কিছু যাবে আসবে না। আমি হয়তো এই পৃথিবীর কাছে কেউ নই, কিন্তু আমার প্রিয়জনের কাছে আমিই তাদের পৃথিবী।

“TO THE WORLD YOU MAY NOT BE SOMEONE; BUT TO SOMEONE YOU ARE THE WORLD! “
আমার কন্যারা হয়তো একটু অনাদর অবহেলায় বেড়ে উঠবে। হয়তো প্রথম প্রথম সপ্তাহে একবার , পরে দুই সপ্তাহে একবার খাবারের প্লেটে আমিষ পড়বে। হয়তো একটা ডিম চার ভাগ করে খেতে হবে। আমার প্রয়াণে আমার উপর নির্ভরশীল লোকগুলো কেউ না খেয়ে হয়তো মারা যাবে না– কিন্তু যে চিরস্থায়ী মানসিক অর্থনৈতিক বিকলাঙ্গতার অসহায় মুহূর্ত পার করতে থাকবে তারা , সেটা কল্পনা করতেও আমার সারা মস্তিষ্কে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।
সাভারের একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডে কতোগুলো আলাদা পৃথিবীর প্রস্থান, আলো নিভে গেল কতো পরিবারের, কতো আলাদা আলাদা সৌরজগতের ।

[ প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে এপ্রিল,২০১৩ ]