by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার জন্ম ৭৩ সালে পুরনো ঢাকায় র্যাঙ্কিন স্ট্রীট ওয়ারীতে।
পারিবারিক দুর্যোগে ঢাকা ছেড়ে নানাবাড়িতে থাকতে হয়েছিল বছর খানেক। আমার প্রথম স্কুল বাটিকামারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমারখালী, কুষ্টিয়া। মাস তিনেক ওইখানেই হাতেখড়ি ; সম্ভবত: ৭৮/৭৯ সাল হবে। পরের স্কুল , মিরপুর উপশহর প্রাথমিক বিদ্যালয় ; মিরপুর ১নং বাস স্ট্যান্ড। বছর খানেক। ততদিনে আমাদের আদিবাস বিক্রি করে আমরা পুরনো ঢাকা ছেড়ে মিরপুরে চলে এসেছি। ক্লাস টু-এর মাঝামাঝি মিরপুর ১১ নাম্বারে বাসার পাশের একটা কিন্ডারগার্টেন জান্নাত একাডেমীতে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ওখানেই। ক্লাস সিক্সে চলে আসি মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়, মিরপুর ১১-তে । এসএসসি দিলাম এখান থেকেই। পরে, ঢাকা কলেজ। একবছর জলাঞ্জলির কয়েকদিন কলাভবনে ইকোনমিকস-এ ! ভর্তি বাতিল করে বিজ্ঞান বিভাগের মান রক্ষা করতে কেমিস্ট্রিতে মাস ছয়েক। আবার অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে মাইগ্রেট করার মুহূর্তে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ।
গ্রামের প্রথম স্কুলের তেমন কোন স্মৃতি মনে নাই। বড়মাঠ আর বিশাল বড়ই গাছের পাশে টিনের চালের স্কুল। মাঝখানে দেওয়ালের পরিবর্তে বাঁশের বেড়া। এক ক্লাসের হৈচৈ আরেক ক্লাসে পৌঁছে যায়। সেই স্কুলে কাজিনদের সঙ্গে স্কুলে গেছি কী যাই নি। রিলিফের সাদা অ্যারারুটের বিস্কুটে আর টিকা দেওয়ার ভয়ে স্কুলের জানালা দিয়ে হাপিশ হয়ে যাওয়া মনে আছে।
দ্বিতীয় স্কুল মিরপুর উপশহর প্রাথমিকের কথাও তেমন মনে নেই। বাস স্ট্যান্ডের কাছে, সারাক্ষণ রিকশা-গাড়ির প্যাঁ পোঁ আওয়াজ। বাসার কাজের লোক স্কুলে নিয়ে যেত আসত।
জান্নাত একাডেমীর কথা মনে আছে ভালোমতো। কো এডুকেশন / সহশিক্ষা ছিল। সামিনা, শাহানাজ, ইসরাত জাহান মিতুর কথা মনে আছে। ছেলেদের নাম মনে আছে কিছু, কিন্তু এই গ্রুপে এতো বেশি ছেলে যে ওরা প্রাসঙ্গিক না !
সামিনা ফার্স্ট গার্ল ছিল, আমি সেকেন্ড। সামান্য নাম্বারের ব্যবধানে প্রতিবার এই মেয়ে ফার্স্ট হত। কীভাবে যেন, এক স্যার আমাকে ছেলেমেয়ে তুলে খোঁচা দিল। আমি ক্লাস ফোরে অনেক নাম্বারের ব্যবধানে ফার্স্ট হওয়া শুরু করলাম সবাইকে পিছে ফেলে। শুরু হল আমার পড়ালেখার ইঁদুর দৌড়। পরীক্ষায় কেউ যদি ২টা রচনা পড়ে একটা কমন পায়, আমাকে পড়তে হয় ১৫টা , কারণ আমি ভাল ছাত্র। কোন রিস্কে নেওয়া যাবে না ! এই যে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার জন্য হুদাই বেশি বেশি পড়ার প্যারা এসএসসি পর্যন্ত চলল।
মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ক্যাম্পাস ছিল প্রায় মাইল খানেক দূরত্বে। মাঝে মাঝে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময়ে আমাদের উঠতি কৈশোরের আকুল চোখ মেয়েদের স্কুলের দিকে চেয়ে থাকত। আহা ! পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শনা পরীগুলো ঐ দালানে পড়ে। সদ্য যৌবনা এইট-নাইনের মেয়েরা বেণী দুলিয়ে স্কুলে যায় আর আসে। মেয়েদের স্কুলের মহল্লার ছেলেদের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসাবে কোন কোন মেয়েদের পরিচয় আছে। আমরা ওদের কাছে গল্প শুনি আর হাপিত্যেশ করি। বয়েজ স্কুলে পড়লে যা হয় আর কী।তবে বছরের একটা দিন ‘ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ হত ছেলেদের স্কুলের মাঠে। ওই দিন স্বর্গের সব উর্বশী , অপ্সরারা ধবধবে সাদা পোশাকে আমাদের মাঠে এসে হাজির হত। আমরা বয়েজ স্কুলের উঠতি বয়সের চ্যাংড়া পোলাপান জুলজুল করে চেয়ে থাকতাম।
বিকালে খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসার সময়, কোন কোন ডেঁপো বন্ধু বলত ফিসফিসিয়ে, জানিস এইটা সামিনাদের বাসা, ওইটা ইভাদের বাসা, এইটা নার্গিসদের বাসা। আরে চিনলি না, ওই যে নোয়াখালীর নার্গিস বেশ দেখতে, মুকুল যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর প্রতিদিন সকাল বিকাল বাইসাইকেল নিয়ে একনজর দেখার জন্য চক্কর দিচ্ছে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদের কথা শুনতাম। কারণ আমার সেই অর্থে কোন মেয়ে বান্ধবী ছিল না।
ক্লাস নাইনের কোচিং এ গিয়ে পরিচয় হল, অন্য স্কুলের ডাকসাইটে রূপসী নিপার সঙ্গে। গার্লস আইডিয়ালে পড়ে। দুলাভাই নামকরা ডেন্টিস্ট। স্কুলের মেয়েদের ভিতরে পরিচয় হল, সঞ্চিতা, লুসি, কান্তাদের সঙ্গে। কুল্লে এই !
পরবর্তীতে ভার্সিটি লাইফে আরও কয়েকজন সতীর্থ বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয়, ফারহানা হাকিম কণা ,সামিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুঃখের ব্যাপার এই যে, স্কুলে ৯০ সালে ছেলেদের ব্যাচে ছিলাম ১৬০ জনের মত। যাঁদের প্রায় ১৫০ জনের সংগেই খায়খাতির ছিল, এখনো কম বেশি আছে। অথচ একই স্কুলের ১৬০ জন মেয়েদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চিনি মাত্র ১০ জনকে। কো-এডুকেশন স্কুল হলে হয়তো জীবনটা আরও মধুর, সৌকর্যময় ও অভিজ্ঞতালব্ধ হত। কী আর করা !
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে গিয়ে ১২০ জন ছেলেদের মধ্যে কী করে যেন দুই কিশোরীকে পেলাম। একজন নাইমা ইফফাত সুলতানা আরেকজন দেল রায়না মিত্রা। নাইমার আবার ক্যাম্পাসে আসার আগেই প্রেম ছিল সিনিয়র একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। মিত্রারও তাই।
তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে যে, আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৈশোর ও যৌবনে আমাদের নারী বন্ধুত্ব বিহীন এক শুষ্ক মরুভূমিতে কাটাতে হয়েছে।
৬ নং মহল্লার সঞ্চিতাদের ( Rahman Sanchita ) সঙ্গে পরিচয় সিক্স-সেভেন থেকেই। শহীদদের বাসায় ঈদে-পার্বণে দেখা হয়। একমাত্র সঞ্চিতার সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব দিনে দিনে আরও প্রগাঢ় হয়েছে। ও আমাদের একমাত্র বান্ধবী যে সম্পর্কের দাম দিতে জানে, সবধরনের রসিকতা বোঝে, আমাদের সকল বেদনার সমব্যথী। তুই তুই সম্পর্ক আজ ৩৫ বছর ধরে। ও একাই , অনেক বান্ধবী না থাকার দুঃখ ভুলিয়ে রেখেছে !
২০১৬ সালের স্কুলের ৫০ বছর পুর্তির রি-ইউনিয়নে ও তারপরে নতুন করে পরিচয় হল আরও কয়েকজনের সঙ্গে। আমরা অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, আমাদের এই স্কুল বান্ধবীদের অনেকেই তাঁদের ন্যাকামো ও অন্য সীমাবদ্ধতাসহ আটকে আছে সেই ক্লাস নাইনের মানসিকতায়। হতে পারে , এদের কারো কারো খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়ে অসময়ে সন্তানের লালনপালনের চাপে শুষ্কংকাষ্ঠং হয়ে গেছে। এদের কারো সন্তান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কেউ মেয়ে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে। আর সেখানে আমাদের ছেলেবন্ধুদের ছানাপোনা সবে প্রাইমারী- সেকেন্ডারি স্কুলে হামাগুড়ি দিচ্ছে । পুরনো স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হয়ে বান্ধবীরা নানা আদিখ্যেতায়, বাচালতায় মেতে উঠল। কিন্তু কোথায় যেন তার ছেঁড়া মনে হল।
ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন করে ভাইবার, মেসেঞ্জার পেয়ে নানা পুরনো কথার, পুরনো স্মৃতি ঝলসে উঠল। কে কার বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করত , কবে কোথায় ধরা খেয়েছে এই সব আর কী। কিন্তু সঞ্চিতা ও জাহাঙ্গীর নগরের ফারহানা হাকিম কণা ( Farhana Kona ) ছাড়া অন্য বান্ধবীদের রসবোধ সামান্য অথবা নেই। সামান্য ঠাট্টা ফাজলামোকে ন্যাকামো ও আদিখ্যেতার দিকে নিয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের কাছে সঞ্চিতা বন্ধুত্বের মানকে এমন একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে গেছে, অন্যদের সঙ্গে আর ফ্রিকোয়েন্সি মিলল না।
এর মাঝে আমাদের পারিবারিক গেট টুগেদারে স্বামীসহ বান্ধবীরা ও সস্ত্রীক আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হল। খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা বার্ডে আমাদের ঝটিকা সফর হল। সঞ্চিতা-তুষার ভাইয়ের সঙ্গে দারুণ কিছু ঘোরাফেরা হল।( তুষার ভাই সঞ্চিতার হাজব্যান্ড, আরেক রসিক মানুষ )। আমি সঞ্চিতাদের বাসায় আছি, অথবা কোন রিসোর্টে কয়েক বন্ধু সহ সঞ্চিতা তুষার ভাইদের গ্রুপের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছি– এটা আমাদের স্ত্রীরা জানলে নিশ্চিন্ত থাকে। ভাগ্যিস, এই মেয়েটা ছিল, নইলে আমাদের স্ত্রীদের কাছে আমাদের সকল স্কুল বান্ধবীরা ন্যাকা ও ইমম্যাচিউর হিসাবেই চিহ্নিত হত।
যদিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমার পরিচয় হয়েছিল অসাধারণ কিছু বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে। যাদের অনেকেই এখন উদীয়মান লেখকের কাতারে আছে। কেউ কেউ সাংবাদিকতা ও অন্য মিডিয়াতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। বান্ধবীদের অপ্রাপ্তিটাকে ওঁদের সঙ্গে সময় কাটালে ভুলে যেতে হয়।
ধান ভানতে শিবের গীত ! মোদ্দা কথা ডিজিটাল যুগে নতুন করে একটা গ্রুপে কেউ আমাকে অ্যাড করেছে ‘সারাবাংলা ৯০-৯২’ গ্রুপ। এখানে এসে আমি ঠিক সঞ্চিতার মানসিক বয়সের লেভেলের অনেক বান্ধবীকে হুট করে পেয়ে গেলাম। জানিনা আমাদের এই পরিচয় ও আড্ডা ভার্চুয়ালই থাকবে কীনা, অথবা কোনদিন কারো সঙ্গে কোন গেট টুগেদারে দেখাসাক্ষাৎ হবে কীনা। আমি নিজেকে বড্ডো বেশি সৌভাগ্যবান মনে করছি ; কারণ বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ আর সেমি-বয়েজ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির বঞ্চনাকে গ্রুপের অসংখ্য উদারমনা সমবয়সী বান্ধবীরা সুদে আসলে পুষিয়ে দিল। বন্ধুরা তো আছই, কিন্তু বান্ধবীরা তোমাদের জন্য আবারো অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা।
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার ১৩ বছরের বড় টুনটুনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে , সে বিয়ে করবে না! ক্লাস এইট অবধি পড়তে পড়তে, সে কীভাবে যেন টের পেয়ে গেছে—বিয়ে মানেই সামান্য কিছু সুবিধার বিনিময়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করা !
এদিকে এদের একমাত্র খালার বিয়ে হয়েছে বছর দেড়েক আগে। বিয়ে উপলক্ষে শাড়ি-চুড়ি-গহনা-ফটো-শুট দেখে ছোটটি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ও বিয়ে করবে। মেয়েরা বিয়ে করলে সেটার যে অনেক প্রাপ্তি সেটা ৮ বছরের টুনটুনি বুঝে ফেলেছে।
ইটের খাঁচায় বড় হওয়া নাগরিক শিশু বলে, সুইমিং পুলের প্রতি ছোটটির উৎসাহ অসীম। যে কোন ভ্রমণে হোটেল বুকিং দেওয়ার আগে আমাকে খেয়াল রাখতে হয় সেখানে যেন অতি অবশ্যই সুইমিং পুল থাকে। দুপুরে হোক বা রাতে হোক, প্রতিদিন প্রতিবার পুলে নেমে সে অন্তত ৩/৪ ঘণ্টার আগে ক্ষান্তি দেয় না!
এইবারের সপ্তাহ খানেকের থাইল্যান্ড ভ্রমণে সুইমিং পুল প্রীতির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে, ডলফিন প্রীতি। সাফারি পার্কে, ডলফিনদের দারুণ একটা শো ছিল। আমরা বড়রাই মুগ্ধ হয়ে চিন্তা করছিলাম , কীভাবে এদের ট্রেনিং দিয়েছে এঁরা ! সবকিছু দেখে মনে হয়েছে এদের বুদ্ধিমত্তা তো মানুষের প্রায় কাছাকাছি !
যাই হোক , দেশে ফেরার আগে ছোট টুনটুনি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে তার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। এবং এখানে যে কোন তর্কবিতর্ক চলবে না, সেটা আমরা জানি।যতো তাড়াতাড়ি হোক, সে একটা সুইমিং পুল ও কিছু ডলফিন কিনবে! বিয়েটা এখন আর তার প্রায়োরিটি না !
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
আমাদের ছিল সীমাবদ্ধ বিনোদন। রেডিও ছাড়া সবেধন নীলমনি বিটিভি, সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্লাসিক, ওয়েস্টার্ন, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা আর সবশেষে আধা সের হূমায়ুন আহমেদ, এক চিমটি ইমদাদুল হক মিলনের সাথে এক টেবিল চামচ সমরেশ , সুনীল, শীর্ষেন্দুর ঘুঁটা দেওয়া সাহিত্য !
রসময় গুপ্ত সবে এলেন ! এলেন, দেখালেন, জয় করলেন আর সবচেয়ে জনপ্রিয় অবশ্যপাঠ্য সাহিত্যিক(!) হয়ে গেলেন। সেটা নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা আমাদের সবার। গ্রুপে আমার মতো ১৬ বছরের চ্যাংড়া ছাড়াও অনেক কাঁচাপাকা চুলের ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার আছেন। তাদের কথা কনসিডার করে, এটা শুধু একপেশে পোস্ট হিসাবেই থাকুক। সবার অভিজ্ঞতা কমেন্টসে আসলে, আমি জাহিদ প্রথমদিনেই এই গ্রুপ থেকে নির্বাসিত হব, লিশ্চিত !
তো, ঢাকা কলেজে যাই , একটা দুইটা ক্লাস করি কী করি না ! প্র্যাক্টিকাল ক্লাস থাকলে দুপুর পর্যন্ত থাকি , নইলে প্রাইভেট স্যার/ ম্যাডামদের কাছে টাকা নষ্ট করতে যাই !
সপ্তাহ খানিকের মাথায় আমাদের মিরপুরবাসী দুই মফিজ -ঝুলন আর আমাকে মণিশঙ্কর রায় নামের মেধা তালিকার এক ছেলে পাকড়ালো। ‘ এই তোরা চটি পড়েছিস ?’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি! পড়ি নি। ‘ বলিস কী ! তোরা তো অশিক্ষিত রে ! আয় , তোদের শিক্ষিত করি ! ‘
অত:পর তিন কিশোরের নীলক্ষেত ভ্রমণ। চটির মতো সাহিত্য(!) যে ভাড়া পাওয়া যায় , কে জানত ! এবং ঢাকা কলেজের কোন এক নির্জন গ্যালারিতে বসে দুই মফিজের শিক্ষিত (!) হওয়া ! কথ্য কোলকাতার অদ্ভুতুড়ে অশ্লীলতায় বিনোদন খুঁজে পাওয়া !
মণিশঙ্কর রায় ডিএমসি পাশ করে নাম করা ডাক্তার , আমেরিকা থাকে। গত ২৯ বছর কোন যোগাযোগ নেই ! শুনেছি ও কোন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না । কারো সংগে ওই দুর্দান্ত মেধাবী ছেলেটির যোগাযোগ থাকলে আমার ভালোবাসা পৌঁছে দিও। ওকে বোল, আই স্টিল রিমেম্বার হিম ! লাভ ইউ মণিশঙ্কর রায় !
আমদের ফেসবুকের মেসেন্জার ছিল না, রাতজাগা মোবাইল প্যাকেজ টকটাইম ছিল না ! ছিল এক ঘোড়ার ডিমের ল্যান্ড ফোন। কলরেট বেশি বলে থাকত আব্বা – আম্মার ঘরে তালাবদ্ধ ! ক্রস কানেকশনে কিছুটা ফান ছিল। কিন্তু নিজেদের নধ্যে আমাদের প্রকাশভঙ্গী ছিল অনাবিল, জড়তামুক্ত ! আমরা অবলীলায় একজন আরেকজনকে যা বলতে পারতাম, তা এখন চরম অভদ্রতা !
যেমন :
উহ্ হু ! দোস্ত সকালে দাঁত মাজ নাই!
উহ্ হু ! এই একই শার্ট কয়দিন ধইরা পড়তাছস? কাঁচতে পারস না!
অথবা নতুন কেনা জিনস পড়া কাউকে-
মাম্মা , প্যান্টটা তো দারুণ হইছে , ঢাকা কলেজের সামনে থিকা নাকি বঙ্গবাজার থিকা কিনলা ? কত পড়ছে ?
প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৯
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, দর্শন
আমাদেরকে দর্শন ও চিন্তার জগতের বেসিক আগে জানতে হয় ; তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে আমরা চিন্তাকে আরো বিস্তৃত করতে পারি !
ধরুন , একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত মনোযোগ থাকে শুধুমাত্র মিষ্টান্নের প্রতি। খাওয়ার জন্য আরো যে হাজার বিকল্প স্বাদ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেটা বুঝতে বয়স ও অভিজ্ঞতা লাগে।
যখন আমাদের মানসিক বয়স বেসিক চাহিদা পূরণ করার পর পরিপার্শ্বের বৈচিত্রে মুগ্ধ হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে ; তখনই আমাদের জানার তৃষ্ণা মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের মুখোমুখি করে আমাদেরকে।
মিষ্টি ছাড়াও যে টক, ঝাল, তিতা ও স্বাদহীনতার স্বাদ অবারিত ছড়িয়ে আছে তা গ্রহনের জন্য আপনি ও আপনারা উন্মুখ হয়ে উঠুন। জ্ঞানের ভুরিভোজনে আমাদের সকলের শৈশব অতিক্রান্ত হোক! শুভকামনা !
প্রকাশকালঃ ২৫শে ডিসেম্বর,২০১৯
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, দর্শন
কর্মক্ষেত্রের হে তরুণের দল!
আমাদের চল্লিশোর্ধদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা দেখে আমরা অমানবিক মেশিন হয়ে গেছি বলবেন না অথবা অযথা বিস্মিত হবেন না।
এই বিস্ময় আমাদেরও ছিল ! আমরাও উঁচু গলায় বলেছি -অমুক স্যার তো নিজের পরিবারের কাছে অপ্রয়োজনীয় —, আছে খালি অফিস আর কাজ !
তমুক স্যারের কি আর আড্ডা দেওয়ার কোন বন্ধু আছে ! নাকি বউ-বাচ্চাকে সময় দিতে হয় ! নাকি , রাত জেগে মুভিজ দেখতে হয় ! এই আবালে সকাল সকাল সময়মতো অফিসে আসবে না তো কী , আমি আসব ?
যে কথাটা, হে তরুণ, আপনি ভুলে যাচ্ছেন—আমাদের মূলত সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় আছে কষ্টেসৃষ্টে বছর পনের ! তারপরের বাকী বছরগুলো আধক্ষয়া শরীর টেনে টেনে পার করা! আসন্ন বার্ধক্যে আমাদের নিজেদের চিকিৎসার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলে হয়তো দম ফেলবার ফুরসত থাকত ! সে আর হচ্ছে কোথায় !
সামনের মাত্র অল্প কয়েকটি বছরের অনিশ্চয়তা আর পাহাড় সমান কাজের বীভৎস চেহারা— না দিচ্ছে আমাদেরকে জীবনকে উপভোগ করতে ; না দিচ্ছে আপনাদের মতো তারুণ্যের আলস্যে মেতে থাকতে !
আমাদের এই অতরুণসুলভ, মেপে চলা , তাড়াহুড়োর কর্মদক্ষতার পিছনের করুণ কাহিনী উপলব্ধি করতে হলে আপনার বয়স পন্চাশের কাছাকাছি আসতে হবে !
তার আগ পর্যন্ত, আমাদের তাচ্ছিল্য দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে সমবেদনা দেখাতে ভুলবেন না, এই কামনা করতেই পারি !
প্রকাশকালঃ ২৪শে ডিসেম্বর,২০১৯
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
এই জন্মদিনে অগ্রজ, অনুজ ও সতীর্থদের বহুমাত্রিক অন্তর্জালিক ( ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল) শুভেচ্ছায় আপ্লূত হয়ে গেছি। গতকাল থেকে কিছু কথা ঘুরছিল মাথায়। টুকে রেখে যাই, পরে ফিরে এসে দেখতে পারব।
আসলে শহুরে নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্মদিন নিয়ে তো তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা ছিল না আশির দশকে ; আমারও ছিলনা। কখন জন্মদিন আসে , কখন চলে যায় সেটা আম্মাই মাঝেসাঝে মনে করিয়ে দিতেন । হঠাৎ করে বলতেন, ‘আমার বাবাটা আজকের এই দিনে খুব ভোরে জন্মেছিল।’ আম্মার মুখে শোনা, আমার জন্মের আগে থেকেই বেশ কিছুদিন ধরে আব্বা বড় ফুফু-ফুফা,দাদা-দাদীদের সঙ্গে একান্নবর্তী হয়ে র্যাঙ্কিন স্ট্রিট ওয়ারীতে একটা বিশাল বাড়ীতে থাকতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী অরাজকতায় স্থানীয় নেতা ও মাস্তানদের সঙ্গে মামলা ও হাঙ্গামা করতে করতে ক্লান্ত বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই অস্থির সময়ে ডেমরার মাতুয়াইলে আব্বার ধর্ম-মায়ের বাড়ীতে জন্মেছিলাম আমি । নানা কারণে একসময় সব ছেড়ে আম্মা কয়েকবছরের জন্য নানার বাড়ী কুষ্টিয়া চলে যেতে বাধ্য হন। আমার বড়ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঠিক ৪ বছরের পার্থক্য। ও তখন হাঁটিহাঁটি পা পা। গাছ ঘেরা বড় একটা বারান্দা ছাড়া র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সেই বাড়ীর কোন স্মৃতি নেই আমার মনে।
মিরপুরের অবাঙ্গালী বিহারী অধ্যুষিত ১১ নাম্বারে আসার আগে আমাদের পরিবারটি কিছুদিন মিরপুরের চিড়িয়াখানার কাছে গুদারা ঘাট এলাকায় ভাড়া থাকতাম। খুব সকালে বাঘের হুংকার কানে আসত।ভীষণ পানির সমস্যা ছিল ওই এলাকায়। মাঝে মাঝেই হাঁড়িপাতিল নিয়ে ওয়াসার গাড়ীর কাছে পানির জন্য ভিড় জমে যেত। পরে চলে আসলাম , মিরপুরের পাইক পাড়ায় এক ডাক্তার সাহেবের বাসায়। বর্ষায় চারপাশে থইথই পানি , জলাবদ্ধতা। বিএডিসি কলোনির পাশে নতুন নগর গড়ে উঠছে। শহরের প্রধান রাস্তা মিরপুরে ১ নাম্বার থেকে সোজা কল্যাণপুর হয়ে চলে গেছে শ্যামলী, এলিফ্যান্ট রোডে। তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , গুলিস্তান, নবাবপুর, সদরঘাট। ডাক্তার মোশাররফ সাহেবের দুই ছেলে, দুই মেয়ে সবাই স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েছে। রনি ভাই, পরে বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে প্রবাসী। ভুলন ভাই, লালা-ভোলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সুশ্রী চেহারার রুপা আপা, দীপা আপা সদ্য কৈশোর পেরিয়ে প্রস্ফুটিত যৌবনে পা দিয়েছেন। ঠিক উপরের তালায় সিলেটি পরিবারের মিজান ভাই আর মিলি আপাদের পরিবার।
আমার প্রথম জন্মদিনের দাওয়াত মিলি আপাদের বাসায়। বেলুন ফুলিয়ে কেক কেটে জন্মদিন। ঠিক যেন বাংলা সিনেমার মত স্বপ্নময়। তারও কিছুদিন পরে চলে আসলাম মিরপুরের ১১ নাম্বারে নিজেদের পৌনে দুই কাঠার বাড়ীতে। সেই বেড়ে চলার কাহিনী ছিল মিষ্টি-মধুর। জন্মদিন মানেই আমার কাছে মনে হত, বাংলা সিনেমার হবু নায়ক-নায়িকার ‘ ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গেয়ে টেয়ে কেক কাটা। সদ্য কৈশোরে পা দিয়েও খুব বেদনাহত হওয়ার মতো বিষয় ছিল ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ ! সারাবছরের সবচেয়ে ভীতিকর বার্ষিক পরীক্ষার সময়ে ১৩ বা ১৪ তারিখে হয় সাধারণ বিজ্ঞান অথবা সাধারণ গণিত পরীক্ষা থাকত। সুতরাং জন্মদিন নিয়ে আম্মার কাছে ঘ্যানঘ্যান করার চেয়ে আমার চলতো ইয়া নফসি , ইয়া নফসি অবস্থা।
কলেজে ওঠার পরে আরেকটু বিস্তৃত সম্পর্কের জন্য , বন্ধুদের বাসায় দাওয়াত পেতাম। একটা সুনীল, শীর্ষেন্দু বা হুমায়ূন আহমদের বই দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে, চা-বিস্কুট দিয়ে জন্মদিনের সমাপ্তি ঘটতো।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়েও সেই একই অবস্থা। তেমন কোন হেরফের নেই জন্মদিন নিয়ে। জন্মদিন যে বড়লোকি ব্যাপার সেটা আমি অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলো।
বিবাহিত জীবনে আমার যেমন আমার বউয়ের জন্মদিনের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ছিল, ঠিক ছিল ওঁরও। আর ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের আগে গুচ্ছের আমেরিকান কোটার শিপমেন্টের চাপে জন্মদিন কোথা দিয়ে পার হয়ে যেত টেরই পেতাম না। আমার দুই টুনটুনি হওয়ার পরে , ইদানীং জন্মদিনটা দুইভাবে পালিত হয়। অফিসে সকল কর্মকর্তাকে সকালবেলায় জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা দেওয়ার রেওয়াজ আছে । আর সেই সঙ্গে থাকে, সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওনা খাওয়ার দাবী। মাত্রই গত বছর দশেক ধরে আমার জীবনে জন্মদিনের কেকের আবির্ভাব ঘটেছে। নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উপরের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্যই হয়তো এই বড়লোকি আনুষ্ঠানিকতা ঢুকে পড়েছে আমার জীবনে।
আব্বা আম্মার দীর্ঘ অসুস্থতার সময়টি কেটেছে আমার আর আমার সহধর্মীনির সান্নিধ্যে। আমি খুব মন দিয়ে তাঁদের জন্মদিন পালন করেছি শেষের বছর পাঁচেক। মাঝে মাঝে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখি। সেই সময়ের তোলা অসংখ্য ছবি আমাকে বেদনার্ত করে এখনো। সেই মধুর উষ্ণ আম্মার গা ঘেঁষে তোলা ছবিগুলো আমার হৃদয় মথিত করে !
কিডনি ডায়ালাইসিস নেওয়া আব্বা ও আম্মার চলে যাওয়াটা তো অবধারিত ছিলই! ২০১৪ এর ২৭শে জুলাই আব্বা আর ঠিক একান্ন-দিনের মাথায় ১৬ই সেপ্টেম্বর আম্মার চলে যাওয়াটা আমার জন্মদিনের সব আনন্দ ম্লান করে দিল। আম্মার আরো কিছুদিন না থেকে যাওয়াটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। ২০১৪ এর বিমর্ষ জন্মদিন, ২০১৫ তেও সেই একই হাহাকার ! নেই নেই আমার সবচেয়ে আস্থার জায়গাটা নেই ! কিন্তু শোকের আয়ু আর কতোদিন ! মানুষের জীবন কি থেমে থাকে। সেই একই ট্রেনের কামরায় উঠে বসেছে নতুন যাত্রী ; চলে গেছে পুরনো যাত্রীরা তাঁদের নির্ধারিত গন্তব্যে। দিনের পর দিন ট্রেনের কামরায় একই আসনে সব যাত্রীদের যে বসে থাকার উপায় নেই। তাই, নতুন যাত্রীরা ( আমার দুই টুনটুনি ) নিজেরাই কেক ম্যানেজ করে গভীর রাতে জাগিয়ে দিয়েছিল আমাকে । ঘুমঘুম চোখে গভীর ভালোবাসায় ভেসে যাই আমি। তারপরে গত পরশু কেটে গেছে অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীর অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল ভালোবাসায় ! সেই ভালোবাসার প্রত্যুত্তর দেওয়ার সামর্থ্য আমার কোথায় ?
২০১৬ সালের এই জন্মদিন আমার মনে থাকবে অনেকদিন। যারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন,ভালোবাসা জানিয়েছেন ; যারা নানা ব্যস্ততায় হয়তো মনে করেছেন আমার কথা কিন্তু শুভেচ্ছা জানাতে পারেন নি ; তাঁদের সবার প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা।
প্রকাশকালঃ ১৫ই ডিসেম্বর,২০১৯
সাম্প্রতিক মন্তব্য