by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
পিকনিক ১৯৮১ স্টাইলঃ
ক্লাস টুতে পড়ি , জীবনের প্রথম পিকনিক। ক্লাস টিচার বললেন, ‘কাল সকালে ৮:০০ টায় ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্কে পিকনিক। বাসা থেকে প্লেট আর গ্লাস নিয়া আসবা!’ ওক্কে ! স্কুল ড্রেস দুইবার করে ইস্তিরি করি। সাদা কেড্সে চক মারি। সারারাত এপাশ ওপাশ, মিস যেন না হয় !
আম্মা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভঙ্গুর চীনামাটির জায়গায় ষ্টীলের গ্লাস-প্লেট দিলেন। পলিথিন ব্যাগে গ্লাস-প্লেট নিয়া স্কুলের বাসের কাছে হাজির। ন্যাশনাল পার্ক। হতাশ ! কিছু শাল গাছ, কয়েকটা ডোবা টাইপ পুকুর, মাঝে মাঝে ক্ষত চিহ্নের মতো ন্যাড়া ধানক্ষেত ! দুই তিন বন্ধু মিলে অবশেষে একটা বড়ই গাছ আবিষ্কার করি , কাঁচা বড়ই খেয়ে মুখ কষা ! পরের বছরগুলোতে ঘুরেফিরে ওই একই জায়গায় কয়েকবার। নিজের গ্লাস-প্লেট নিয়ে গেছি একবারই। প্রতিবার সন্ধ্যায় ফেরার পথে মুক্ত স্বাধীন চিৎকার । বাসের উপরে মাইকে বাজে—‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায় —।’
চাকরিক্ষেত্রে দেখা গেল, আমাদের টেক্সটাইল মিল কল-কারখানা সব ওই দিকে এবং সপ্তাহে ৩/৪ দিন যেতে হয় ন্যাশনাল পার্কের ধারপাশ দিয়ে । শালবন দেখি, হঠাৎ হঠাৎ পুরানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে। প্রথম পিকনিক , প্রথম প্রেমের মতোই ভুলিনি । নিজের গ্লাস প্লেট নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো বুঝি নাই। এমন না যে, ওই সময়ে ডেকোরেটর ছিল না। হয়তো, খরচ কমানোর জন্য সবাইকে বাসা থেকে গ্লাস-প্লেট আনতে বলেছিলেন। বড় হওয়ার পরে সেই ক্লাস টিচারের সাথে আর দেখা হয় নাই, হলে জিজ্ঞেস করতাম।
পিকনিক ২০১৩ স্টাইলঃ
মেয়ের স্কুল পিকনিক। টু মিনিট ইনস্ট্যান্ট নুডল্সের মতো সব প্রিপ্যাকড । স্থান সেই ভাওয়ালের আশে পাশের একটা স্পট। দুই মেয়েকে নিয়ে বউয়ের চারদিন আগের থেকে প্রিপারেশন। ম্যাচিং ড্রেস, কয়েকটা ব্যাগ, ক্যামেরা, হাল্কা খাবার, পানি , কী নাই !
সাজানো গোছানো দেয়াল ঘেরা বদ্ধ পিকনিক স্পট। গাড়ীতেই নাস্তা। নামার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার পাতা, ছায়া ঘেরা বাগান। ফুটফুটে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। ঠিক দুপুর একটায় প্যাকেট খাবার, পানি, কোল্ড ড্রিঙ্কস মায় টিস্যু পর্যন্ত। বিকালে পিঠা –চা। আর আমার বিনোদন ? পিচ্চি গুলার সাথে একান্ত কিছু সময় , আর অন্য বাচ্চাদের মায়েদের দিকে ইতি উতি তাকানো, হা হা হা !
ধুর ! এইটা কোন পিকনিক হইলো !
পাদটীকা:
এই ফেব্রুয়ারিতে বছর চারেক পরে কন্যাদের পিকনিক হয়েছে ‘ফ্যান্টাসি কিংডম’-এ। কারো সঙ্গে কারো কথা বার্তা নেই। যার যার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাইডগুলোতে উঠছে। টিকেট দিয়ে খাবার নিচ্ছে। যেটুকু কথাবার্তা বাসে যেতে যেতে। আরো বছর চারেক পরে কি পিকনিকের কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটার জন্য অপেক্ষা।
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার , দুইজনই ছিলেন ঢাকা কলেজে আমাদের শিক্ষক।
সায়ীদ স্যার যতখানি হাস্যোজ্জ্বল, জনপ্রিয়, মিডিয়া-খ্যাত ; ইলিয়াস স্যার ছিলেন ঠিক ততখানিই অন্তর্মুখী , বিষণ্ণ , একা। শুনেছিলাম উনি চিলেকোঠার সেপাই এর লেখক। কী যেন পুরস্কারও পেয়েছেন ।
সাদা কালো চুলে, মোটা ফ্রেমের চশমা, একটু ধীরে ডান পা টেনে হাঁটতেন , মনে আছে !
স্মৃতি থেকে লিখছি ! সতীর্থ কারো মনে পড়বে হয়তো —শুনেছিলাম তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল সেই সময়েই । উনি আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকে ‘ সমুদ্রের প্রতি রাবণ’ পড়িয়েছিলেন। বড়জোর তিন চারটা ক্লাস করেছিলাম। একটা মাইকেলীয় শব্দ লিখে বলেছিলেন– ‘প্রতিটি কাব্যে প্রকাশ হওয়ার পর ডিকশনারির লোকজন এসে নাকি বলতেন, ‘এই শব্দটা তো বাংলা শব্দকোষে নাই।’ মাইকেলের নাকি উত্তর হতো, ‘এখন থেকে থাকবে ! ‘ এই একটা কথা দিয়ে মাইকেলের স্পর্ধিত চেহারাটা ফুটিয়ে তুলতেন তিনি ।
৯০ই এর উত্তাল দিন !আমরা তখন নাসিম বানু ম্যাডাম , আজাদ স্যারের বাড়ি বাড়ি টিউশনিতে দৌড়াই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার যে কতো বড়ো মাপের লেখক ছিলেন , মানুষ ছিলেন ; অতো কাছ থেকে দেখেও তা বোঝার মতো সামর্থ্য সেই নাবালক বয়সে যেমন ছিলনা , এখনও নেই !
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
শরীর ঠিক সায় দিচ্ছে না।
আমার প্রিয়ভাজন প্রকৌশলী বড়ভাই একদিন বলেছিল, ‘ জাহিদ! চল্লিশ পার হলে শরীরের যত্ন নিও। সব মেশিনের পার্টস পত্তরের একটা নির্দিষ্ট ওয়ারেন্টি পিরিয়ড থাকে। সেই একইভাবে আমাদের দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড আছে, চল্লিশের আগ পর্যন্ত। এর পরে কোন কিছু ড্যামেজ হলে, আর কিছু করার নাই !
সাময়িক এই অসুস্থতার কথা অফিসের কয়েকজন জানে। অনেক দূরে থাকে, কিন্তু যোগাযোগে খুব কাছের যারা, তাঁদের কয়েকজন– কুল্লে বড়জোর জনা দশেক জানে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের কেউ কেউ আমার ভিতরে কিছুটা বিক্ষিপ্ততা, অসংলগ্নতা দেখেছেন। একটা অস্থিরতা আমি লুকিয়ে রাখতে পারছি না । কীভাবে এই অবস্থা হয়েছে, তাঁর একটা ডিজিটাল বর্ণনা ফেসবুকে রেখে দিলে মন্দ কিছু না। পরে নিজেই ফিরে এসে দেখতে পারব।
আবার কেউ নতুন করে জিজ্ঞেস করলে, ফেসবুকের পাতা খুলে দেখিয়ে দিতে পারব। বারবার বলতে হবে না ! হতে পারে, হয়তো খানিকটা ভার্চুয়াল সমবেদনা পাওয়ার সম্ভাবনায় আমার এই লেখা। এখন তো আর সেই দিন নাইরে ভাই , যে কারো অসুস্থতার সংবাদে ফলমূল হরলিকস নিয়ে বাসায় হাজির হবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা। একেতো সব ফলেই ফরমালিন আতঙ্ক ; আর হরলিকসে যে ঘোড়ার ডিমের কোন পুষ্টিগুণই নাই– সেটা ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে।
হয়েছে কী , গত ৮ তারিখ বুধবার উত্তরা থেকে মিরপুর বাসায় যাওয়ার পথে বিশ্বরোডের আগে জ্যামে পড়লাম। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দুই ঘণ্টা বসে থাকলাম, হাজারো গাড়ির সারি। এমনিতে সন্ধ্যায় নাস্তা খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার, বাসায় পৌঁছে রাতের খাবার খেয়ে নিই একবারে। একে ক্ষুধা, আরেকদিকে ঐ ভয়ংকর স্থবিরতায় আমার মাথা ধরে গেল। বাসায় গিয়ে ঘুমিয়েও সেই মাথা ধরে থাকাটা আর গেল না। দুইদিন পরে শুক্রবার সকালে উত্তরা আসতে লাগল চার ঘণ্টা। ইজতেমার মুসল্লিদের চাপে রাস্তা প্রায় অচল। মাথা ধরা আরো বেড়ে চলল। এর কয়েকদিন পরে আরেকদিন সন্ধ্যায় একই অবস্থা।
১৬ তারিখ দুপুরে মনে হচ্ছিল মাথার পিছনের তীব্র ব্যথায় মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে। সহধর্মীনিকে ফোনে বলার পরে প্রেশার মাপাতে বলল। ডিজিটাল মেশিনের সবার ভরসা কম। অদ্ভুতুড়ে রিডিং ১৭৭/১১৫ । বোঝা গেল কিছু একটা হয়েছে। আমিও ভাবলাম ভুলভাল রিডিং, কিন্তু পরে দেখা গেল মেশিন ঠিক আছে, আমিই ঠিক নাই ! অফিসের নানাবিধ কাজের চাপ, কম ঘুম, জ্যাম সবকিছু মিলিয়ে শরীর বেঁকে বসেছে।
ওষুধের ব্যাপারে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আমার আলস্য সুবিখ্যাত! আমার বিগত দুই যুগের নানা অনিয়মের কথা আমার স্ত্রী কী করে মনে রেখেছে কে জানে ! প্রতিটি অনিয়মের কথা মনে করিয়ে আমার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করে ঠেলতে ঠেলতে সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের একটা হাসপাতালে নিয়ে গেল। অপেক্ষার প্রহর শেষে ডাক্তারের মুখোমুখি , সে আমাকে যাই জিজ্ঞেস করে তাই তে আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিই। সিগারেট খান ? হ্যাঁ। ওজন ৮৮ কেজি ! হ্যাঁ। বীফ-মাটন ? হ্যাঁ। কার্বোহাইড্রেট, মিষ্টি? হ্যাঁ।উনি খুব হতাশার স্বরে বললেন, আপনি শেষ কবে চেক-আপ করিয়েছেন। বললাম বছর দেড়েক হবে মনে হয়। তখন তো বড় কোন সমস্যা ছিল না। কোলেস্টরেল, ক্রিয়েটিনাইন সবতো ভালই ছিল।
ডাক্তার সাহেব, আরো গম্ভীরভাবে বললেন, আপনি কি জানেন আপনি সম্ভাব্য একটা স্ট্রোক থেকে মাত্র কিছুটা দূরে ছিলেন?
আমি হাসি হাসি মুখ করে কাঁধ ঝাঁকালাম। ডাক্তার-রোগীর পুরো কনভারসেশন চলার সময় আমার সহধর্মীনি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে আমাকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছিল । ডাক্তার সাহেব তিন ধরণের প্রেশারের ওষুধ দিলেন। তক্ষুনিই পারলে খাইয়ে দেন।
বাসায় এসে আমার সবচেয়ে কাছের চিকিৎসক বন্ধু যে নিউইয়র্ক প্রবাসী, তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। সে সব শুনে বলল, তোর এই ব্লাড প্রেশার আকস্মিক, অনেকগুলো অস্বস্তি মিলিয়ে হুট করে হয়েছে। এই ধরণের পেশেন্টকে একবারে এতোগুলো ওষুধ দেওয়াটা বেশি হয়ে যায় রে । তোর তো আবার ডাক্তার-ওষুধ নিয়ে বিতৃষ্ণা আছে ; বরং তুই প্রথম একটা ওষুধ খা, আর ঘুমের ওষুধ খেতে থাক। অফিস থেকে পুরো একটা সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাসায় সময় কাটা। সেরে যাবে। সকালে হাঁটার অভ্যাস ছিল, সেটাও কয়েকদিনের জন্য বাদ দিতে বলল।
অফিস থেকে ছুটি নিতে পারিনি। আজ অমুক ভাইস প্রেসিডেন্ট, কাল তমুক ডিরেক্টর অফিসে হাজির। এখন বিছানায় পড়ে থাকার প্রশ্নই আসে না। চাকরির বাজার এমনিতেই মন্দা ! এক সপ্তাহ ধরে বিপি ওঠানামা করছে, প্রায়শ: মাপছি আবার ভুলে যাচ্ছি। নানা অস্বস্তিতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছি।
ভয় পাচ্ছি না , তবে রুদ্রের সেই কবিতার মতো, ‘অজান্তেই চমকে ওঠি ; জীবন, ফুরালো নাকি!’
“চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।।
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…”
প্রকাশকালঃ ২৪শে জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
হল লাইফে এক বন্ধু , মাঝে মাঝে ধর্ষণ নিয়া হালকা রসিকতা করতো।” When rape is inevitable , you better enjoy it ; জোর কইরা মিষ্টি খাওয়াইলে কি, মিষ্টির স্বাদ তিতা হইব”–টাইপের কথাবার্তা ! হয়তো, বয়সটাই ওইরকম ছিল, সব কিছু নিয়া ফাজলামো করার। আমার ধারণা , এখনকার ওই বয়সের ছেলেদের মধ্যে ওর মতো এক দুইজন পাওয়া যাবে।
আমাদের হলের পাশে আরেকটা ছাত্রাবাস ছিল। অল্প শিক্ষিত, চাঁদাবাজ, ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা কিছু মস্তান ছিল ওদের নেতৃত্বে । আমরা অনেকখানি বিরক্তির সাথে ওদের নাম উচ্চারণ করতাম। মানসিক তফাৎ ছিল হাজার মাইলের।
একদিন ঐ বন্ধুরে ত্যাক্ত হইয়া কইলাম-‘ দোস্ত, তুই এত মেধাবী ছাত্র। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হইতাছস। ধর গিয়া , পাশের অই মস্তানদের মধ্যে একজন সমকামী আছে। সে তোরে, সন্ধ্যার সময় কিডনাপ কইরা তোর পুটু মাইরা দিলো! ‘
তোর শারিরীক ক্ষতি হয়তো তেমন কিছু হইল না। কিন্তু তোর যে মানসিক বিপর্যয় হবে ; সেইটা অপূরনীয় ! সারাজীবনের জন্য তুই সমাজে অচ্ছুৎ, বিকলাঙ্গ হয়ে বেচেঁ থাকবি।
বন্ধু ব্যাপারটা ভিজুয়ালাইজ করলো কিনা জানিনা। কিন্তু এর পর আর কখনো তারে ধর্ষণ নিয়া রসিকতা করতে দেখি নাই।
প্রকাশকালঃ ১৭ই জানুয়ারি, ২০১৭
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
গতকল্য ১৯শে জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ টোনা টুনির ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী ছিল। যথারীতি সারাদিনের কর্মস্থলের চাপে পিষ্ট হইয়া টোনার গৃহে প্রবেশ। ম্লান সম্ভাষণে সন্ধ্যার শুরু। যেহেতু, অধুনা শহর ঢাকায় আনন্দ বিনোদন উদযাপনের দুইটি মাত্র পথ খোলা রহিয়াছে। হয়, নিজ গৃহে আরো কিছু ঘনিষ্ঠজনকে ডাকিয়া ঘৃত তৈল মিশ্রিত খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন। অথবা আশেপাশের কোন খাদ্য সরবরাহকারী দোকানে যাইয়া গুচ্ছের অর্থ খরচ করিয়া ভক্ষণ।
গত রজনীতে টোনা টুনির বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী করুণাবশতঃ নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। দুই ছোট টুনটুনিকে লইয়া টোনা ও টুনি রেস্তোরাঁয় আপ্যায়িত হইতে গিয়াছিল।
কথা তাহা নহে ! প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি টোনা টুনির বিবাহিত জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও ভালোবাসার অন্তঃসলিল ধারা একইসঙ্গে বহিয়া চলিয়াছে।
বিবাহের প্রাক্বালে টোনা, টুনিকে সান্ত্বনা দিয়াছিল । যেহেতু, বিশেষ সামাজিক দিবসগুলোতে কোথা হইতে যেন টোনার কপালে রাজ্যের ঝামেলা ও জঞ্জাল আসিয়া জোটে। সেইহেতু , বিশেষ দিবসের যথাযথ প্রাপ্য, টোনা টুনিকে অন্য কোন সাধারণ দিনে উদযাপনে ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিল। অদ্যাবধি, টোনা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। টুনিও গত্যন্তর না দেখিয়া ইহা মানিয়া লইয়াছে!
সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর শুভকামনা জানাইবার সময়, টোনা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ আমাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ এই দীর্ঘ ১৬ বছর যেমন তেমন করিয়া হইলেও সংসার তো করিতেছি!’
টুনি তদপেক্ষা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ বরং আমাকেই বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ। টোনার মতো বেহিসাবি, ছন্নছাড়া, নির্বোধের সঙ্গে অদ্যাবধি ঘরসংসার করিয়া চলিতেছি বলিয়া !’
জ্যেষ্ঠা টুনটুনি মৃদু হাসিয়া মধ্যবর্তিনী হইয়া কহিল, ‘ কাহাকেও পুরস্কৃত করিবার প্রয়োজন দেখিতেছি না ! প্রতিটি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীতেই এবম্বিধ বাক্যাবলী হইয়া থাকে !’
মনে বুঝিলাম, আমাদের সেইদিনের ছোট্ট টুনটুনি বড়ো হইয়া গিয়াছে। নহিলে , জগতের এই স্বাভাবিক সত্য সে এতো সহজে কী করিয়া বুঝিয়া ফেলিল !
প্রকাশকালঃ ২০শে জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
২০০১ সালের এক বিষণ্ণ শীতের বিকালে আমরা পৌঁছালাম আমার হবু জীবনসঙ্গিনীর বাড়িতে; কুমারখালী কুষ্টিয়ায়। তারপর নানা আয়োজন উপচারের ভিতর দিয়ে সামাজিকভাবে আমাদের জীবনের শুরু।
প্রথমদিকের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখতেন বরকনের দুই পিতামাতা। নিজের বড়ভাই-ভাবী এবং জনৈক গহনার দোকানদার ; যার কাছ থেকে গহনা কেনা হয়েছিল। প্রায়শ: ব্যাংক থেকে ফরমেটেড শুভেচ্ছা আসতো। আব্বা-আম্মা প্রয়াত হওয়ার পরে শুভেচ্ছা জানানোর জনসংখ্যা গেল কমে।
চতুর্দশী বড় কন্যা রাত বারোটায় এসে হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জানিয়ে চমকে দিল ! বোধ করি বাকী জীবনে একজন শুভেচ্ছা-দাত্রী বাড়ল।
বাস্তবতা ১ : সত্য সবসময় সুন্দরই হয় না ; অনেকাংশে তা অশ্লীলতার সীমারেখায় ঘোরাফেরা করে ! দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।
‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’
বাস্তবতা ২ : অনেক আগে শোনা, স্মৃতি থেকে লিখছি।
এক ডাক্তারের ডাক পড়েছে শীতের গভীর রাতে। বহু কষ্টে লেপের ভিতরে থেকে বেরিয়ে রোগীর বাসায়। কিছুক্ষণ রোগীকে দেখে তিনি বললেন, ‘আপনাদের আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন খবর পাঠান, আসতে বলেন!’
রোগীসহ সবাই বুঝে গেলেন, আর বেশি সময় নেই ! যথারীতি সবাইকে খোঁজ দেওয়া হল।
সবাই এলে, উৎসুক কেউ একজন জানতে চাইলেন, ‘রোগীর অবস্থা কি খুব খারাপ ! আর কতক্ষণ সময় আছে ?’
ডাক্তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন, ‘না, না রোগী একদম সুস্থ, কোন আশংকা নেই!’
‘তবে যে আপনি সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে ডেকে পাঠালেন !’
ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘এই গভীর রাতে এইরকম একটা আনন্দের সংবাদ আমি একা একা সেলিব্রেট করব, সেটা কী ঠিক হবে ! তাই সবাইকে ডাকা, সবাই মিলে সেলিব্রেট করেন !
ডাক্তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন।
তো, বাস্তব জগতের ৩/৪ জন মাত্র আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখে।
অথচ, আমি চলছি এক অদ্ভুতুড়ে অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল জগতের ভিতর দিয়ে। যেখানে বাস্তব মানুষগুলোর চেয়ে বেশি সময় কাটছে এঁদের সঙ্গে। আমি সারাদিন ধরে এঁদের নানা ঢংয়ের নানা ধরণের সেলিব্রেশনের ছবিতে লাইক কমেন্ট করি। বিবাহ বার্ষিকী, অন্নপ্রাশন , হাতেখড়ি, প্রথম স্কুলে যাবার দিন, বাচ্চার জিপিএ ফাইভ, প্রথম প্রপোজালের দিন, প্রথম ব্রেকাপের দিন, বাচ্চার প্রতিটি জন্মদিন ও স্কুলের প্রতিটি সাফল্যের সেলিব্রেশন,তাঁদের মামাতো , কাকাতো ফুফাতো, জ্যাঠাতো ভাইবোনের সব সাফল্যের সেলিব্রেশনে আমি অংশগ্রহণ করে থাকি। একই ভাবে, তাঁদের রক্তদানের ছবি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহা উঁহু গেলামরের সেলফির ছবিতে ; শ্বশুর, চাচা, বাবা, ফুফা, ভাইবোন, কাকা কাকী, মামা মামী জগাই মাধাই সবার মৃত্যু সংবাদে স্যাড ইমো দিই, সমবেদনা জানাই।
তো আমার সেই কাছের ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক বেদনাঘন দিনের ১৯তম বার্ষিকীতে কিছু সমবেদনা তো আশা করতেই পারি। যদিও সব লাইক কমেন্টস ভার্চুয়াল হবে। আমি যেমন কাউকে একগোছা গোলাপ কখনো পাঠাইনি, কী করে আশা করি আমি পাব !
অতঃপর কোন এক গোধূলি বেলায় আমার প্রয়াত আম্মার কথা প্রসঙ্গে আমার সহধর্মিণীকে বলেছিলাম, ‘ জানো, আম্মা আমার জীবনের দুইটা অসাধারণ ভালো কাজ করেছে।
সে জিজ্ঞেস করল কি কি ?
প্রথমটি, আমাকে এই অসাধারণ পৃথিবীতে এনে। তাঁর প্রতি এই কৃতজ্ঞতা আমৃত্যু থাকবে।
দ্বিতীয়টি , তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করে। তুমি না থাকলে, আমি কোথায় ভেসে যেতাম।
প্রথম কথায় তাঁর কোন রিঅ্যাকশন ছিল না।
দ্বিতীয় কথায় আমার সহধর্মিণী অবিশ্বাসের সরু চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। আমি বুঝে গেলাম , নারীর বিশ্বাস অর্জন কোন পুরুষের পক্ষে একজীবনে সম্ভব না !
প্রকাশকালঃ ১৯শে জানুয়ারি,২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য