by Jahid | Apr 11, 2023 | ছিন্নপত্র, দর্শন, লাইফ স্টাইল
ব্যক্তি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তাড়াহুড়ো করে জাজমেন্টাল না হওয়া। আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা।
আমি আমার পরবর্তী প্রজন্মকে সেটা জানিয়ে যেতে চাই। যদিও একজন মানুষের ব্যাপারে হুট করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সচরাচর আমাদের ধৈর্য হয় না, একটু অপেক্ষা করে ,সামগ্রিক ছবিটি যাচাই-বাছাই করার । হুট করেই অমুক ভালো, তমুক খারাপ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে চাই। সম্ভবত: এটি আমাদের মনে একটা স্বস্তি এনে দেয়। যে ব্যক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছাই, তাঁর সকল ক্রিয়াকর্ম আমাদের জাজমেন্টের চশমা দিয়ে দেখা শুরু করি।
নানা অভিজ্ঞতায় আমার উপলব্ধি হয়েছে যে, একজন মানুষ পুরোপুরি ভালো বা পুরোপুরি খারাপ হতে পারে না। জীবনের যে কোন পরিস্থিতিও তাই। সাদা কালোর মাঝে একটা রঙিন পৃথিবী আছে, সেটা আমার পরবর্তী প্রজন্মকে শিখতে হবে। নইলে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক ঘরোয়া আড্ডায় বললেন, অন্যদের কাছে আগে থেকে শুনে শুনে তিনি আমাদের ইশকুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের একটা খারাপ ইমেজ দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলেন। এবং ফলশ্রুতিতে আমাদের সবচেয়ে দক্ষ দুইজন শিক্ষকের মাঝে একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলতে দেখতাম। বিজ্ঞান শিক্ষক আমাদেরকে বলেছিলেন, এই পূর্বশ্রুত ধারণা ভেঙ্গে, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে তাঁর অনেক বছর সময় নষ্ট হয়েছিল। ঘুরে ফিরে সেই কথাটাই আসে। আগেই একজন ব্যক্তির সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলে, সেটা সহজে মেরামত করা যায় না।
প্রথম প্রকাশঃ নভেম্বর ২০২০
by Jahid | Jan 18, 2023 | ছিন্নপত্র, দর্শন, লাইফ স্টাইল
ফেসবুককে আমার প্রথম থেকেই মনে হতো একটা ঘরোয়া আড্ডার মতো। একটা লিটল ম্যাগাজিন পড়ার অনুভূতি থাকত। লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে যেমন সারাক্ষণ তরতাজা মচমচে স্বাদু অনুভূতির ছাপানো হরফ থাকে , সেইরকম । এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। অসাধারণ কিছু মেধাবী লেখকের দৈনন্দিন দিনলিপি পড়ার সুযোগ ঘটেছে। আমি আরো বেশি রাজনীতি ও সমাজ সচেতন হয়েছি। নবীন প্রজন্মের কিছু চিন্তক , দার্শনিক , কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা প্রতিদিন পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে। এঁদের একজন সতীর্থ আহসান। গতকাল , কিছু কথোপকথনের পরে, তিনি আমার লেখালেখি সম্বন্ধে কিছু বললেন। আমার কাছে ,সেটা অসংখ্য লাইক , লাভ, ওয়াও ইমোজি চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অনুমতি নিয়েই নিজের ওয়ালে পোস্ট করলাম।
“ আপনার লেখাজোকা ফেসবুকে যা প্রকাশিত হতো, মাঝেমধ্যে পড়া হত। হয়তো রিএকশন দিতাম, কখনো কখনো দিতাম না। আপনি মূলত প্রবন্ধ ঘরানার লেখা লিখে থাকেন। মোটামুটি লম্বা লম্বা বাক্যে। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না। যেন শ্বাসরুদ্ধকর কোনো ফিকশন পড়ছি, এমন একটা অনুভূতি জাগে। সেই টানা টানা শ্বাসরুদ্ধকর বাক্যগুলোর মাধ্যমে যে চিন্তার প্রকাশ ঘটান সেটা সব সময়ই কোনো না কোনো ভাবে চিন্তা উদ্রেককারী হয়ে থাকে।
পরিচ্ছন্ন ভাষা আর গোছানো চিন্তা আপনার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বোঝা যায় আপনি দুনিয়াকে অবহেলিত শোষিত পীড়িত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। গণমানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়– এমন কোনো আচরণ আপনাকে ক্রুদ্ধ আর ব্যথিত করে। সেই মনোভাবকেই আপনি শৈল্পিক ভাষায় উপমায় প্রকাশ করেন। আমি শুধু অনুরোধ করব, এই ক্রোধ/দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি আরেকটা স্টেপ যোগ করুন। যেটা হচ্ছে, সেই বিপর্যয়টা কীভাবে কাটিয়ে উঠা যায় সেটার পরামর্শ দিতে পারেন। দেশি বিদেশি নানা উদাহরণ সহযোগে। এতে আমার মনে হয়, আপনার লেখাটার গুরুত্ব আরো বাড়বে। আপনি নিজে কী, নিজে ঠিক বুঝতে পারছেন না, এর কারণ আত্মবিশ্বাসহীনতা। এইটা একটা মারাত্মক ব্যাধি জাহিদ ভাই। এই রোগে যারে ধরে সে সাধারণত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
এবার আরেকটা কথা শুনেন। আপনি থাকেন ২ নাম্বার রোডে। আর আমি থাকতাম ৩ নাম্বার রোডে। আপনার ঠিক বিপরীত রোডেই। আপনি বেশ কয়েকবার আড্ডার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি প্রায়ই আপনার বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে আসতাম। কিন্তু আপনাকে জানিয়ে যাওয়া হতো না। কারণ, সেই তীব্র হীনমন্যতা। আমি ওখানে থাকতাম, একাই লাগত। আপনার সাথে প্রায়ই আড্ডা দিতে ইচ্ছা হতো। সাহিত্য আড্ডা আর কি। কিন্তু তখনই আমার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যেত। এই জন্য দুঃখিত। সামনে কখনো গেলে, এই নেকাব আর রাখব না। এই যে আমার আত্মবিশ্বাসহীনতা, এইটা অনেকগুলো সম্ভাবনাকে খুন করে থাকবে। হয়ত মনের সব বাঁধা পেরিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে পারলে আমাদের চমৎকার সব সাহিত্য-আড্ডার অভিজ্ঞতা ঘটতে পারত। আপনার পরামর্শ বা কথাবার্তা আমার লেখাকে সমৃদ্ধ করতে পারত। আমার কোনো পরামর্শ হয়ত আপনারও কাজে লাগত। কিন্তু আমার এই আত্মবিশ্বাসহীনতা সে সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিলো।
আপনার লেখার হাত যথেষ্ট ভাল। চিন্তা পরিষ্কার। বইয়ে স্থান দেবার মত লেখা। শুধু একটু মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাস বিনিয়োগের অভাব। মনে যা আসে, লিখতে থাকুন, তা যতই খারাপই হোক, এতে লেখার ফ্লো টা ঠিক থাকে। এই ফ্লো খুব ইম্পরট্যান্ট জিনিস। আর সময় পেলেই নানা বই পড়বেন। লেখার ফ্লো তৈরিতে বই পাঠের ভূমিকা অনেক। চিন্তাও সমৃদ্ধ হয়।
লেখা থেকে ধর্ম আর রাজনৈতিক বিষয়টা যেন সরাসরি না আসে তা খেয়াল রাখবেন। জানেনই তো এইদেশে মুক্তভাবে কথা বলার পরিবেশ নাই। একটা পদ্ধতি আছে, সেটার মাধ্যমে আপনি ধর্ম ও রাজনীতিকেও সমালোচনা করতে পারবেন। সেটা আপোষ পদ্ধতি বা ছলনা পদ্ধতি। এমনভাবে লিখতে হবে যাতে মনে হয় আপনি তাদের বিপক্ষের কেউ না। তাদেরই একজন। বন্ধ বান্ধব যেমন নিজেদের বন্ধু বান্ধবদের সমালোচনা করে। এই রকম আর কি। তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে এই দুইটা বিষয় এড়িয়ে চলাই অধিকতর ভালো। লেখার মত দুনিয়ায় কত বিষয় আছে ভাই। তবুও এই দুইটাই যদি আপনাকে বেশি পীড়িত করে, তাহলে অবশ্যই ডিরেক্ট ম্যাথডে লিখবেন না। নানা ছলনার আশ্রয় নিবেন। এতে মূল কাজটাও হয়ে গেল, আপনিও টার্গেট হলেন না।
যা করুন, আর নিজেকে অবহেলা করবেন না। আপনাকে ক্লাসিক লেখক হতে হবে এই দিব্বি কে দিছে। আপনি একজন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিশেবে আপনার মতামত প্রকাশ করবেন দুই মলাটের মধ্যে। এবং, সেটা খুব ভাল ভাবে সম্পন্ন করার যথেষ্ট যোগ্যতা আপনার রয়েছে। জাস্ট শুরু করে দিন।”
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Apr 30, 2022 | ছিন্নপত্র
চাকরির সুবাদে দূরের কারখানাগুলোতে যেতে হয় প্রায়শ । সবুজ ধানক্ষেত , দিগন্তবিস্তৃত গাছগাছালির মাঝখানে হঠাৎ দানবীয় কারখানা ! মাঝে মাঝে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসার সময় নাগরিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগা জনপদের মাঝখান দিয়ে ঢাকার দিকে আসতে হয়। পিচ ঢালা রাস্তার পাশে হঠাৎ করে বিলুপ্ত প্রায় মাটির ঘর দেখা যায়। ঘন গাছে ঘেরা মাটির বাড়ীর ছোট্ট জানালার পাশে বিছানা। মনে হয়, ধ্যাত ! এই সব বাদ দিয়ে যদি ওই বিছানায় কিছুক্ষণ গা এলিয়ে দেওয়া যেত ! সঙ্গে থাকতো একটা প্রিয় বই।
কিছুক্ষণের মধ্যে ওই আধাশহর আধাগ্রামের রাস্তা ছেড়ে ঢাকার ক্লেদাক্ত যানজটে আমি সম্বিত ফিরে পাই—‘যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের –মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা!’
প্রথম প্রকাশঃ ৩০শে এপ্রিল,২০১৩
by Jahid | Apr 26, 2022 | ছিন্নপত্র, সমাজ ও রাজনীতি
২০১২ সালের মে মাসে ইউরোপে অফিসের কাজে। বেলজিয়াম (ব্রাসেলস্) থেকে নেদারল্যান্ড যাবো দ্রুতগতির ট্রেনে। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আরো দুই কলিগসহ। উপরে রৌদ্রে বেশ গরম লাগছিল। নীচে নেমে খোলা প্ল্যাটফর্মে এসে দেখি বেশ শীত লাগছে। পরনের জ্যাকেটটা খুলে হ্যাভারস্যাক ব্যাগে রেখে দিয়েছি। সেই মুহূর্তে ট্রেন চলে আসলো। জ্যাকেটটা গায়ে গলিয়ে স্যাম্পলের লাগেজটা, হ্যান্ড লাগেজটা নিয়ে হুড়োহুড়ি করে ট্রেনে উঠলাম।
ট্রেন ছাড়ার মিনিট দশেক পরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ গা দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। আমার হ্যাভারস্যাক ব্যাগটা প্লাটফর্মেই ফেলে এসেছি। আমার দুই কলিগের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন ! আমার ব্যাগে আমার পাসপোর্ট ছাড়াও আমার সবেধন নীলমণি অফিসের সব ডাটা ও ই-মেইল সহ নোটবুক আর পুরো ট্রাভেলের রাহা-খরচ হাজার পাঁচেক ইউরো ! ব্যাগের প্রথম জিপারটা খুললেই যে কেউ পেয়ে যাবে টাকার ওয়ালেট আর পাসপোর্ট। নোটবুক বাদ দিচ্ছি, ইউরোর পরিমাণ যা আছে, যে কোন লোককে লোভাতুর করতেই পারে।
প্রথমেই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলাম , বেলজিয়ামে কেউ পরিচিত আছে কীনা। আগের অফিসের ( মার্কেট ফিট ) পুরানা বস বেলজিয়ামের। ওই অফিসের ফ্রেন্ডরে ফোন দিলে সে নিশ্চয় আমাকে প্রাক্তন বসের নাম্বারটা দিবে। পাসপোর্ট বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে পেয়ে দেশে ফিরে যাওয়াটা প্রথম জরুরী। আমি সবচেয়ে খারাপ কী কী হতে পারে তাই দিয়ে শুরু করলাম। এটুকু মনে আছে, ব্রাসেলস্ এর ওই প্লাটফর্মে আমি শ’খানেক স্টুডেন্ট দেখেছি। এরিয়াটা বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরা।
কলিগ বলল, ‘জাহিদ ভাই চেকাররে কইয়া দ্যাখেন হে কোন হেল্প করতে পারে কিনা।’
লম্বা চুলের দাড়িওয়ালা এক চেকাররে ধরলাম, বেটা বেলজিয়ান- তেমন ইংরেজিতে পারদর্শী না। তবে সে সমস্যাটা বুঝলো। ওয়ারলেসে আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলল। আমাদের কেনা দূর-যাত্রার টিকিটগুলো যেন ব্যবহার করতে পারি , সেই ব্যবস্থা করলো। উপদেশ দিল, তোমরা সামনের স্টেশনে নেমে গিয়ে আবার পিছনে ব্রাসেলস্ এ ফিরে যাও। আমি স্টেশনমাস্টারকে বলেছি, সে খোঁজ করবে। শুধুমাত্র কপাল ভালো হলেই ব্যাগটা পেতে পারো। এতো ব্যস্ত প্লাটফর্মে তোমার ব্যাগ এতক্ষণ পড়ে থাকার সম্ভাবনা কম।
যতো সময় যাচ্ছে, আমাদের টেনশন ততোই বেড়ে চলেছে।
ঘণ্টা খানেক পরে আমরা ষ্টেশনে ফিরে গেলাম। যে বেঞ্চিতে বসেছিলাম দেখলাম সেটা শূন্য !
লম্বা প্লাটফর্মের মাঝখানে ছোট্ট কাঁচঘেরা রুম থাকে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য , গার্ডদের বসার জন্য। ষ্টেশন মাস্টারের কাছে যাওয়ার আগে কী মনে করে একবার ঢুঁ মারলাম। দেখি আমার হ্যাভারস্যাক ব্যাগটা পড়ে আছে একপাশে। ভীষণ মোটা গার্ড বেশ কিছুক্ষণ ওদের ভাষায় আমাকে গালাগালি করলো। কিছু যেহেতু বুঝি নাই, গায়ে মাখলাম না। আমি তখন শাব্দিক অর্থেই ‘জানে পানি’ পেয়েছি।
এতো কিছুর পরে আমার দুটো ধারণা হয়েছে, ইউরোপের আইনশৃঙ্খলা ভালো এইটা সবাই জানে। আমার কলিগদের অনেককেই লাগেজ হারানোসহ ছিনতাইয়ের কবলেও পড়েছে। ইস্ট ইউরোপের গরীব দেশগুলোর লক্ষ লক্ষ বেকারে পশ্চিম ইউরোপের বড় শহরগুলোতে ভরে গেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ইউরোপিয়ানরা আগের মতো আর গর্ব করে না।
যা বলছিলাম, যেহেতু ওইটা ইউনিভার্সিটি এলাকা এবং শতশত ছেলেমেয়ে যাতায়াত করছে, হয়তো ব্যাগটা পড়ে থাকতে দেখেও কেউ ধরেনি অন্য কোন স্টুডেন্টের বলে।
আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা মনে দাগ কেটেছে তা অন্য কারণে, আমি তেমন ধার্মিক নই। কিন্তু আমার ধার্মিক কলিগ এই দুর্বিষহ দেড় ঘণ্টার মধ্যে কয়েকবার বললো, ‘জাহিদ ভাই, আপনি ভালো মানুষ,আপনি এতো বড়ো বিপদে পড়তেই পারেন না।’
পুরো ঘটনার মধুরেনু সমাপেয়ু হওয়ার পরে সে আমার মনে করিয়ে দিল, ‘কইছিলাম না, আপনি বিপদে পড়তেই পারেন না!’
ভয়াবহ একটা ঝামেলার হাত থেকে বেঁচে বেসিক্যালি সবাই আমার কাছে ধন্যবাদার্হ ছিলেন, টিকেট চেকার, গার্ড এবং আমার কলিগ দুইজন!
প্রথম প্রকাশঃ ২২শে এপ্রিল ২০১৩
by Jahid | Apr 8, 2022 | ছিন্নপত্র, দর্শন
স্মৃতি ২০০৫ :
২০০৫-এর ডিসেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙ্গে হাসপাতালে। ডান হিপ জয়েন্টের ফিমার-অ্যাসিটাবুলাম গেছে ছুটে ! ভীষণ ব্যস্ত এই আমি আকস্মিক বিছানায়। দুর্বিষহ শারীরিক কষ্টের কথা বাদই দিলাম। বুড়ো হাড় ভাঙ্গলে জোড়া লাগানো যে কী কষ্টের, সে আর কহতব্য নহে !
কিন্তু, শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মানসিক যন্ত্রণাটা ছিল অসহনীয়।
প্রথম যে প্রশ্নটা মনে পীড়া দেওয়া শুরু করলো , ‘হোয়াই মি ? আমিই কেন? ’
প্রাথমিক এক সপ্তাহ ধর্মপ্রাণ আম্মাকে বলে চললাম , ‘এটা কেমন বিচার, আমার আশেপাশের কুৎসিত ও অর্থ-লোলুপ পশুসুলভ লোকগুলো দিব্যি হেঁটে চলে ফিরে খাচ্ছে আর আমি কোমর ভেঙ্গে হাসপাতালে? এটা কেমন বিচার?’
আম্মা নানারকম সান্ত্বনার কথা বলতেন। বলতেন, ‘আল্লাহ্ ভালো মানুষের পরীক্ষা নেয় দুনিয়াতে। পাপ কাটা যাচ্ছে।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু নিজেকে নিজে কোন সান্ত্বনা দিতে পারতাম না।
কেমন করে ভুলি, আমি ও আমার স্ত্রী তখন অপেক্ষা করছি আমাদের প্রথম আরধ্য সন্তানের জন্য! অনাগত সেই মুখ দেখবো, স্ত্রীর পাশে হাসপাতালে থাকবো ; সেই কবে থেকে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলাম। সেখানে আমি আমার অনাগত সন্তানের সেবা করবো কি, আমার সহধর্মিণীই তাঁর ওই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে আমার সেবা করে যাচ্ছেন। একটা কথা মাঝে মাঝে শুনতাম , সংসার এমন যে, প্রয়োজনে তোমাকে তোমার অর্ধাঙ্গী বা অর্ধাঙ্গিনীর মল-মূত্রও পরিষ্কার করতে হয়। এটা স্যাক্রিফাইস আর অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপার। সেটা যে, প্র্যাকটিকালি নিজের জীবনে দেখতে হবে, কে জানতো ! আমিতো আমার স্ত্রীর জন্য সামান্য হিন্দীকেশ ছিঁড়েও আঁটি বাঁধি নাই কোনদিন। আজ তাঁকেই কিনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে আমার মল-মূত্র ! দুর্বোধ্য , নিষ্ফল এক আক্রোশে ফুঁসতাম শুধু !
আমার চিকিৎসক বন্ধুরা, শুভানুধ্যায়ীরা একে একে সাহস দিতে লাগলেন। ডাক্তাররা বোঝালেন আমার ভগ্নদশা মেরামত ও নিরাময়যোগ্য এবং আমি আবার আগের মতো হাঁটতে চলতে পারবো। আমার অফিসও সেই সময় অসম্ভব সহানুভূতি দেখালো। বিছানার পাশে বসে সাহস দেয়া সেই সব মুহূর্তগুলোর কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না।
এক চিত হয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। পাশ ফিরতেও পারতাম না। ডান হাঁটুর নীচে হাড় ছিদ্র করে একটা লোহার রডে লাগানো হয়েছিল, সেই রডের সাথে ১৪ পাউন্ড লোহার ওজন ঝুলত। ওই বস্তুকে বলে ট্রাকশন ! দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ গোসল নাই, মল-মূত্র বিছানায়। কী যে অসহনীয় সেইদিনগুলো ; আমি এখনও ভাবলে শিউরে উঠি।
নানা ধরণের বই পড়তাম শুয়ে শুয়ে। সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাসমগ্র পড়ে ফেললাম। এবং তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তও হয়ে গেলাম। প্রায় ৭/৮ সপ্তাহ পরে ক্র্যাচে করে আবার নতুন করে হাঁটতে শেখা। এর মাঝে আমার মেয়ে জেবার জন্ম ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০০৬ । বুকের ওপর আম্মা ফুটফুটে একটা মনুষ্যশিশুকে শুইয়ে দিলেন। বসতেও পারিনা। ওভাবেই শুকনো চোখে আমার নীরব অশ্রুপাত।
আমেরিকান এক টেনিস খেলোয়াড় আর্থার অ্যাশ-এর একটা কথায় আমার প্রশ্নের আংশিক উত্তর পেয়েছিলাম। অন্তত আমাকে ওই বিশেষ কথাগুলো ‘হোয়াই মি? কেন আমিই ?’ এই প্রশ্নের ক্ষতে, তখনকার মতো কিছুটা হলেও একটা সান্ত্বনার প্রলেপ পড়েছিল।
আর্থার অ্যাশ ছিলেন আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম কালো খেলোয়াড় যিনি একাধারে ইউএস ওপেন, অস্ট্রেলিয়া ওপেন এবং উইম্বলডন জিতেছিলেন। আমেরিকার টেনিস ইতিহাসের কিংবদন্তি। ১৯৮৩ সালে তাঁর হৃদপিণ্ডে সার্জারি করার সময় রক্ত-বাহিত হয়ে এইডস (AIDS) আক্রান্ত হন তিনি। সারা আমেরিকা থেকে তাঁর ভক্তরা তাঁকে শুভেচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটিও ছুঁড়ে দিতেন, ‘আপনাকেই কেন এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হলো?’
তিনি বোধকরি নিজেকেও এই প্রশ্নই করেছিলেন, ‘হোয়াই মি? কেন আমিই ?’
এক পর্যায়ে এসে আর্থার অ্যাশ নিজেকে প্রবোধ দিলেন। উনি নিজেকে বোঝালেন ৩২ কোটি আমেরিকানদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া কয়েক কোটি কালোদের মধ্যে সৌভাগ্যবান তিনি একজন। ৫ লক্ষ প্রফেশনাল খেলোয়াড়দের তিনি একজন তিনি একজন। গ্র্যান্ড স্লামে পৌঁছানো শেষ পাঁচ হাজারের তিনি একজন। যে ৫০ জন উইম্বলডন পর্যন্ত গেছেন, তিনি তাদের একজন, সেমিফাইনালে শেষের চারজনের তিনি একজন এবং ফাইনাল খেলার দুইজনের একজন।
কাপ জেতার পরে বা জীবনের অন্যান্য অগুনিত সৌভাগ্যের ক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন একবারও ওঠেনি , ‘হোয়াই মি ? আমিই কেন?’
আর আজ যখন একটা অসুস্থতা তখন কেন এই প্রশ্ন?
আর্থার অ্যাশের এই অভিজ্ঞতা পড়ার পর আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পেরেছিলাম, কিছুটা হলেও !
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৩
by Jahid | Apr 1, 2022 | ছিন্নপত্র
ক্লাস সেভেন।
সমাজবিজ্ঞান আর সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষা পাশাপাশি দুই দিনে হয়। এটাই নিয়ম।বাংলা পরীক্ষার পর যেমন ইংরেজি। স্কুল ষাণ্মাসিক । যথারীতি রুটিন হাতে লিখে কপি করে টেবিলের সামনে টাঙ্গানো থাকে। গ্যাঁ গ্যাঁ করে মাথা দুলিয়ে পড়াশুনা চলে ।
পরীক্ষার হলে গিয়ে দোয়া দরূদ পড়ে খাতা ভাঁজ করে, কোশ্চেন পেপারের জন্য অপেক্ষা। ভীষণ কড়া মেজাজের নুরুল ইসলাম স্যার প্রশ্নপত্র দিলেন।
দ্বিতীয় বেঞ্চে আমি আমার পরের বেঞ্চে ক্লাসের সেকেন্ড বয় তুহিন।কোশ্চেন পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম, হাসি হাসি মুখ করে স্যারকে বললাম, ‘স্যার ভুল কোশ্চেন দিছেনতো । আজকে সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষা !’
স্যার এগিয়ে আসতে আসতেই , পিছন থেকে তুহিন মৃদুস্বরে খোঁচা দিলো, ‘গাধা বইস্যা পড়, কোশ্চেন ঠিকই আছে, আজকে সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা ! আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এই মুখস্থের সাবজেক্টে আমি অলওয়েজ ল্যাজেগোবরে ! আমিতো সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষার সেই রকম প্রিপারেশন নিয়ে এসেছি। সমাজ বিজ্ঞানে ঠনঠন !
তব্দা মেরে বসে পড়ে ফিসফিস করে বললাম, ‘দোস্ত এই যাত্রা বাঁচা !’
মহানুভব তুহিন বলল, ‘ঠিক আছে, আমি খাতা বাঁকা করে লিখছি, তুই দেখে দেখে ল্যাখ !’
শুরু হল, কসরত করে ঘণ্টা তিনেক ধরে আড়চোখে ওর গোটাগোটা হরফের লেখা দেখা আর কপি করা। সবগুলো অ্যানসার দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
তো কয়েকদিন পরে খাতা দিচ্ছেন স্যার। ততদিনে ক্লাসের সবাই আমার ঐ কুকীর্তির কথা জেনে গিয়েছিল।
তুহিনের রোল নাম্বার আমার আগে। ও পেয়েছে ৫৩ আউট অব ৭৫
আর আমি, পেয়েছি ৫৮ !
কাহিনী কি?
সঙ্গত কারণেই তুহিনের মন খারাপ। একই সঙ্গে আশপাশে ফিসফাস। ক্যামনে কি?
ঘটনা হচ্ছে, তুহিনের গোটাগোটা হাতের লেখা আমার চেয়ে স্লো।
ওর দুই লাইন কপি করে বসে না থেকে, অবসর সময়ে আমি আবঝাঁপ আরো কয়েক লাইন লিখে ফেলেছিলাম ; তারই ফলশ্রুতিতে আমার নাম্বার ওর চেয়ে বেশী !
মরাল অব দি স্টোরি ১: বিপদের বন্ধুই সবচেয়ে বড় বন্ধু।
মরাল অব দি স্টোরি ২: এই কাহিনীর পর থেকে রুটিন তোলার ব্যাপারে আমি ব্যাপক সাবধান হয়েছিলাম। জীবনে এক ভুল দুইবার হয় নাই !
প্রথম প্রকাশঃ ১লা এপ্রিল ২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য