by Jahid | Jul 30, 2026 | করপোরেট অবজারভেশন, ছিন্নপত্র, দর্শন, লাইফ স্টাইল
কয়েকদিন আগে ক্লাস নিতে গিয়ে একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম।
ট্রেডের সিনিয়র হিসাবে অনুজ একজন শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা, ‘স্যার আমাদের অর্থনীতি আর গার্মেন্টস টেক্সটাইলের ব্যাপারে আপনার প্রেডিকশন কি?’
আমি বললাম, আমার প্রেডিকশনের কোন মূল্য আছে কী?
আমাদের রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী মন্ত্রী, নেতা, থেকে শুরু করে আমাদের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা ঝাল-টক শোর বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা নানা ধরণের প্রেডিকশন করছেন এবং তাঁরা সম্ভবত: সেটা দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা অথবা পরের মুখে ঝাল খেয়েই করছেন। অনেকসময় নিজেদের নিকট অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করে করছেন।
কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, কীভাবে যেন আমি টের পেয়ে গেছি—পৃথিবী আসলে চালাচ্ছে গুটি কয়েক অসম্ভব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজির মালিকেরা।
তাদেরকে বললাম, ধরেন ফেব্রুয়ারির এক সকালে কফি খেতে খেতে ভ্লাদিমির পুতিন সাহেবের মনে হল, নাহ্ ইউক্রেন আর ন্যাটোর বাড়াবাড়ি আর তো সহ্য হচ্ছে না। এর একটা বিহিত করা দরকার। সে আক্রমণ করে বসল ইউক্রেন।
একজন লোকের একটা সিদ্ধান্ত।
কিন্তু গোটা পৃথিবীর বাকী ৮০০ কোটি লোকের নাভিশ্বাস !
আবার একইভাবে ধরেন, চায়নার RMB (রিনমিনবি) কারেন্সি ইউএস ডলারের বিপরীতে ৬ থেকে ৬.৭৫ এর মধ্যে আছে বহুদিন ধরে। এটা পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে একটা সাম্য রেখে চলছে। চীনের মুদ্রানীতি ও সাপ্লাই চেনের উপর সারাবিশ্ব নির্ভরশীল হয়ে আছে।
কোন এক সকালে চীনের সকল ক্ষমতার অধিকারী জনাব প্রেসিডেন্ট শি জিন-পিং সাহেবের কফি খেতে খেতে মনে হতে পারে, চীনের মুদ্রা রফতানির স্বার্থে অবমূল্যায়ন করলে ভালো হয়। তিনি আদেশ দিয়ে বসলেন, কাল থেকে রিনমিনবি ৮ বা ৯ অথবা আরো বেশি হবে ইউএস ডলারের বিপরীতে।
দেখেন, একজন লোকের একক সিদ্ধান্তে পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইনে কী যে একটা হুলুস্থুল লেগে যেতে পারে। কেউ চিন্তাও করতে পারবে না কী দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে তৃতীয় বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ , যদি চীন তাঁর মুদ্রা হুট করে অবমূল্যায়ন করে।
আমাদের আপাত চেনা অথচ অচেনা পৃথিবী একটা জটিল দুর্বোধ্য নিয়মে চলে। কখন কোন্ রাষ্ট্রের কোন্ সিদ্ধান্তে আমাদের মতো ‘গরীবের বউ সবার ভাবীর’ কী যে দুর্যোগ নেমে আসবে তা কে জানে !
সুতরাং বড় বড় হরিদাস পালেরাও অনেক কথাই বলবে , সেটা শুনবেন , প্রচুর পড়াশোনা করবেন , কিন্তু যে কোন একজনের প্রেডিকশন নিজের ভিতরে নেবেন না। জানেন তো, Economist is someone who can explain why the things they predicted yesterday didn’t happen today ! অথবা An Economist is an expert who will know tomorrow why the things he predicted yesterday didn’t happen today!
অনুজ ছাত্ররা আমার অজ্ঞতা ঠিকই ধরতে পারলো বোধ করি।
কিন্তু মুরব্বী বলে আমাকে আর বিব্রত করলো না।
প্রথম প্রকাশ: ৩০শে জুলাই,২০২২
by Jahid | May 18, 2026 | করপোরেট অবজারভেশন, কর্পোরেট অবজার্ভেশন, লাইফ স্টাইল
তৃতীয় বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। গত বিশ বছর ধরে BGMEA-এর চলতি ও হবু নেতাদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়েছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটা এখানে বলে ফেলাটা মন্দ হবে না। তাঁদেরকে ‘হবু নেতা’ বলছি এই কারণে ; নির্বাচনের আগে অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও নির্বাচনের পরে সেই সব শিল্পপতি উদ্যোক্তা বড়ভাইদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁরা বাংলাদেশের চিরাচরিত নির্বাচন পরবর্তী নিয়ম মেনে চলেছেন !
প্রথমত: নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পরে আমাদের গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানাগুলোর নিজস্ব র্যাঙ্কিং থাকা উচিৎ ছিল ! বছর বিশেক আগেই আমার মতো শিক্ষানবিশের কাছেও মনে হয়েছিল– কারখানার রেটিং অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। রেটিং নেই বলেই আমাদের মধ্যে সুষম ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। এবং তার পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন নানা প্রান্তের নানা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা। BGMEA নিজেই র্যাঙ্কিং করতে পারত। কারখানার এই রেটিং আমাদের দেশের নিরপেক্ষ কারো মাধ্যমেই হতে পারত। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে।
আফসোস! সেই র্যাঙ্কিং অবশেষে হল, তবে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার পরে। ACCORD ও ALLIANCE নামের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ঘাড় ধরিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করিয়ে নিল। নিজেদের মতো করে তাঁরা রেটিং করে দিল। ফাঁকতালে ফায়ার-ডোর থেকে শুরু করে আরো কিছু পণ্যের মধ্যসত্ত্বভোগী কোম্পানিগুলো নমিনেশন নিয়ে দু’ পয়সা কামিয়ে নিল।
বছর দশেক আগেও দেখেছি গাজীপুরের কোন কারখানা যখন সবরকম নিয়মকানুন ও কমপ্লায়েন্স মেনে একটা প্রিন্টেড কটন টি-শার্টের দাম দিয়েছে $ ২.০০~ $ ৩.০০ সেখানে রামপুরা , বাড্ডা, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ বা অন্যকোন দুর্গম এলাকার ২/৩ লাইনের একটা কারখানা অথবা ‘হল-মার্কস’-এর মতো লুটের টাকার কারখানা দাম দিয়েছে $ ১.৫০ বা আরো কম। সাদা চামড়ার ক্রেতাদের এর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই কুখ্যাত ‘টেন্ডারবাজি’ । ও এতো দিয়েছে , তোমাকেও এতো দিতে হবে ! সবচেয়ে ভালো নামকরা ট্রেডিং এজেন্ট ও ভালো কারখানাগুলোকে এরা অসহনীয় টার্গেট মূল্য মেলাতে ও গেলাতে বাধ্য করত। এখনো করছে , এবং সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই আমাদের পথচলা।
আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভারত, চীনে এলাকাভিত্তিক পণ্য তৈরির সর্বনিম্ন মূল্য-তালিকা আছে। কারখানার ও এলাকাভিত্তিক রেটিং আছে বহু আগে থেকেই। ক্রেতা যে কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে কোন একটা দাম কোন একটা দাম চেয়ে বসলেন সেই সম্ভাবনা কম। আমাদেরও কারখানার রেটিং হল অবশেষে তবে অন্যের হাত দিয়ে। নিজের রান্নাঘর আর বাসস্থানকে বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট নিতে হল যে, আমাদের রান্নাঘরও ঠিক আছে, আমাদের বসবাসের জায়গাও ঠিক আছে !
দ্বিতীয়ত: BGMEA নেতাদের কাউকে কাউকে ফাঁকে ফোকরে বলার চেষ্টা করেছি, এতো কিছু করছেন, শ্রমিকদের ডাটাবেজ করছেন না কেন? আজকে একজন দাগী আসামী কোন একটা কারখানার সর্বনাশ করে আরেক এলাকার আরেক কারখানায় যোগ দিচ্ছে। কোনভাবেই তাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। সে গিয়ে অন্য এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। ডাটাবেজ থাকলে, নির্দিষ্ট শ্রমিক কত বেতনে শেষ চাকরিটি করেছে, ও কোন স্কেলের ও দক্ষতার সেটার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ডিজিটাল ডাটাবেজ অবশেষে শুরু হয়েছে বছর দুয়েক আগে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেটা থমকে আছে।
উপরের দুইটি বিষয় কেন হচ্ছে না– সেই ব্যাপারে আমার নিজের মত করে নিজস্ব মতামত আছে। আমরা নিজেরা নিজেদের কারখানাগুলোর রেটিং করিনি এতোদিন– সেটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আলস্য, দুর্নীতি , অতিলোভী, মুনাফাখোর মানসিকতা আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে নিজেদের মূল্যায়ন করতে দেয় নি।
আর শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি কারণ, কোন কোন মালিকেরা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি প্রতিবছরে এমন জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছেন, তাঁদের দরকার ছিল ‘তৈরি শ্রমিক’। সেটা একভাবেই সম্ভব ! পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে তৈরি শ্রমিককে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। দেড়গুণ বা দ্বিগুণ বেতন দিয়েও অনেক কারখানা অন্যদের শ্রমিক সরিয়েছেন। এখন সঠিক ডাটাবেজ হলে এটা ঠিক এইভাবে সম্ভব হতো না। নিজেদের স্বার্থেই হয়তো শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি এতোদিন।
তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পণ্যকে , বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য সরকারি লোকের উপরে ভরসা করে থাকলে, ‘সে গুড়ে বালি’। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে, লবি দিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় কিছু এক্সপোজিশন হয়, যেটাকে মেলা বলা যেতে পারে; ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা। ওইরকম কয়েকটি মেলায় যেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বুথ বা সেবা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যে মেধার লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছি ; মনে হয়েছে তার চেয়ে এঁদের না আসাই ভালো ছিল। স্বজনপ্রীতি দিয়ে গুচ্ছের সরকারি লোককে এই সব সফরে পাঠিয়ে কাজের চেয়ে দুর্নামই বেশি হয়েছে । অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্যতিক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার এখনো হয় নি।
চারিদিকে হতাশার কথা বলার মানুষের অভাব নেই ; আশাবাদের কথা বলার লোকের বড্ডো অভাব।নিজেদের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে, অন্য কেউ বাজিয়ে দেবে না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মালিকপক্ষ বুঝবেন ততই আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রেডের জন্য ভালো।
প্রথম প্রকাশ: ১৮ই মে, ২০১৭
[ উল্লেখ্য, এই লেখা যখন লিখেছি, তখনও বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি সেভাবে শুরু হয়নি, এখন আমাদের ৩০০ এর অধিক পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানা আছে। ]
by Jahid | Jul 26, 2025 | করপোরেট অবজারভেশন
আমার নিজের কিছু কথাঃ
‘করপোরেট অবজারভেশন’ বইটির লেখাগুলোর বেশিরভাগ ফেসবুকে ২০১৪ থেকে ১৭ সালের ভিতরে প্রকাশিত। বড়ো কিছু প্রবন্ধ, ব্লগে প্রকাশিত। আমার লেখা মলাটবদ্ধ হবে সেই দুরাশা আমার কখনই ছিলনা। পাকেচক্রে পড়ে আমার এক প্রকাশক বন্ধু মাহমুদুজ্জামান আমাকে বোঝাল যে ঠিক এই জনরার লেখা বাজারে নেই।
করপোরেট লাইফের নানাধরনের মোটিভেশন আর কোক-কম্পিউটার বিক্রির বই আছে এন্তার। সেগুলো অনেক জনপ্রিয়ও বটে। আমাদের নবীন প্রজন্মের কাছে মোটিভেশনাল বই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, সে বড়ো আনন্দের বৈকি।
তবে আমার যা স্বভাব, বইয়ের লেখা গোছানো শুরু করতে না করতেই আলস্য করতে করতে কোভিড চলে আসল। যাই হোক অবশেষে বইটি একুশে বইমেলার শেষাংশে গিয়ে প্রকাশিত হল।
আমার নিজের লেখার বা বইয়ে সংকলিত লেখাগুলোর যে সীমাবদ্ধতা আমার নিজের চোখে ধরা পড়েছে সেটা শেয়ার করি:
১। আমার লেখার পুরোটাই গার্মেন্টস-টেক্সটাইলের প্রোডাকশন, কারখানার হেড অফিস , বায়িং হাউজ-ভিত্তিক করপোরেট অফিস কেন্দ্রিক। মূলত আমি আমার যাপিত জীবনের বাইরের কিছু লিখিনি বা অন্যকোন বিদেশি করপোরেট বইয়ের বা প্রবন্ধের সাহায্য নিইনি। কিন্তু এটাও তো ঠিক টেক্সটাইল-গার্মেন্টস ছাড়াও অধুনা বাংলাদেশের মোবাইল কোম্পানি, ব্যাংক বা এনজিও গুলো এখন বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। সেখানে কী কী ধরণের জীবন যাপিত হচ্ছে, সেটা আমি জানি না বলেই সেই সেক্টরের পর্যবেক্ষণ আমার লেখায় নেই। আমার ধারণা, আমার বইয়ের এইটি সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। আমাদের সেক্টরের বাইরের কোন পাঠক নিজেকে রিলেট করতে নাও পারেন।
২। সরকারী কর্মচারীদের দুর্নীতির কথা হরহামেশাই আমরা বলি। কিন্তু আমাদের সেক্টরেও ব্যক্তি পর্যায়ের ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নানাবিধ দুর্নীতি আছে। আমাদের সেক্টরের ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্নীতি নিয়ে সামান্য কথা আছে। আরো কিছু বলা যেতো।
৩। করপোরেট অফিসগুলোতে অনেক নারী কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে, তাঁদের নানাধরনের হয়রানি( ক্ষেত্র-বিশেষে যৌন হয়রানি) ও অপ্রাপ্তি নিয়ে তেমন কিছু বলা হয়নি।
৪। ভাষা-শৈলী নিয়ে পাঠক মন্তব্য করবেন। তবে, আমার কাছে মনে হয়েছে,যেহেতু লেখাগুলোর বেশিরভাগ ফেসবুক ও ব্লগভিত্তিক ; কিছুটা চটক ও তাৎক্ষণিক দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটা অনাবশ্যক চেষ্টা আছে।
বই তো সকল শ্রেণির পাঠকের জন্য। কিন্তু যেহেতু আমার লেখালেখিগুলো ঠিক বই আকারে বের হবে সেইটি মাথায় নিয়ে লেখা হয়নি। আরো কিছু দুর্বলতা চোখে পড়তে পারে।
প্রথম প্রকাশঃ ১২ই নভেম্বর ২০২২
by Jahid | Feb 18, 2023 | করপোরেট অবজারভেশন
আমি যখন করপোরেট দুনিয়ায় ম্যানেজার বা সোজা-বাংলায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলাম ; যখন আমার দৈনন্দিন দায়িত্বের বাইরে অফিস ম্যানেজমেন্ট ও পিপল ম্যানেজমেন্টের স্পর্শকাতর হিসাবনিকাশ শুরু হলো– তখনকার কিছু কথা। এই লেখার কয়েকটি পর্ব হতেও পারে, নাও পারে। পুরোটাই নির্ভর করছে আমার সুবিখ্যাত আলস্যের মেজাজ মর্জির উপর।
বাংলাদেশের সব করপোরেট অফিসে মালিকের একটা অলিখিত নিজস্ব সিস্টেম থাকেই, তবুও মোটা দাগে ম্যানেজারদের কাজ হয়, গুচ্ছের লোকজনদেরকে ক্রমাগত বিক্রয় ও উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ দেওয়া। বেশিরভাগ অফিসের চলনসই হিউম্যান রিসোর্স ( এইচআর) বিভাগও থাকে না। এমনকি বিদেশি যে সব এমএনসি ( মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি) আমাদের এখানে ব্যবসা করতে এসেছে, তাঁরাও এই দেশে এসে, কীভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দিতে হবে, কীভাবে কর্মচারীদের কম তেলে মুচমুচে ভাজতে হবে শিখে ফেলে। এবং এই শিক্ষণ পদ্ধতিতে সাহায্য আমাদের দক্ষ ম্যানেজাররাই করে। সার্বিকভাবে সকল কর্মচারীদের সুবিধা না দেখে, নিজের ব্যক্তিগত সুবিধাটি বুঝে নেওয়ার মতো বুদ্ধি বাঙালের সবসময়ই ছিল। তাই, নিজের গাড়ির মডেল বছর বছর বদলালেও ঐ বুদ্ধিমান ম্যানেজারদের অধীনস্থ কর্মচারীদের সুযোগসুবিধার কোন হিল্লে হয় না। নেগোশিয়েশনের মূল অংশটি বুদ্ধিমান ম্যানেজার করে ফেলেন।
বিদেশী মালিকদের দেখান, যে তিনি এই কোম্পানির কতো কতো টাকা বাঁচিয়ে দিলেন। এবং এই খরচ সাশ্রয়ের ভিতর দিয়ে তিনি মূলত নিজেকে কোম্পানির কাছে অপরিহার্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বিদেশী কোম্পানিগুলোও দেখে, বাঙালকে দিয়েই যখন বাঙাল ম্যানেজ করা যাচ্ছে, তখন শুধু মিছে নিজেদের কাপড়ে নোংরা লাগানোর দরকার কী !
ম্যানেজমেন্টের যেহেতু কোন ট্রেনিং নেই আমাদের সিংহভাগ অফিসে। নবীন ম্যানেজারকে মালিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সে কী চায় বোঝার জন্য। আর বিখ্যাত ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতি তো আছেই। কর্পোরেট অফিসের ম্যানেজারদেরকে চায়ের কাপের মডেল সিলেকশন থেকে শুরু করে, কোন কর্মচারী দ্বিতীয় বিয়ে করে পুলিশী মামলা খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে–সবই ম্যানেজ করতে হয়।
ব্যবসাবৃদ্ধির অপরিহার্য দায়িত্বের পাশাপাশি প্রথমদিকে পাবলিক রিলেশন মেইন্টেইন করা ছিল আমার জন্য নতুন কাজ । নতুন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানেই, সাপ্লাই/ভেন্ডর-বেইজের অনেক রথীমহারথীরা পদধূলি দিতেন। অনেকেই বিশুদ্ধ খাজুর আলাপ করতে আসতেন। নিজের কাজের ফাঁকে এই মালিক পক্ষ ও শিল্পকারখানার টপ ম্যানেজমেন্টকে আলাদা করে সময় দিতে হতো। জরুরী কাজ ফেলে রেখে ঘণ্টা ধরে তাঁদের জীবনের সাফল্য , বিত্তশালী হয়ে ওঠার গল্প মন দিয়ে শুনতাম। গল্প শোনার ফাঁকে অনেকেই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতেন, আমি এতোগুলো বছর ধরে এই সেক্টরে কাজ করে মূলত তেমন কিছুই ‘ফালাইতে’ পারি নাই । আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে করতে তাঁদের আগামী ভবিষ্যতের বহুবিধ গল্প আরো বেশি করে মন দিয়ে শুনতাম।
তো তখন, অনেকে আলাপের ফাঁকে এই কথা সেই কথা বলার পর, আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন, ভাই সন্ধ্যার পর কি করেন? আমি হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলতাম, ঢাকা শহরে অফিস থেকে বের হয়ে, কতক্ষণে আমি বাসায় পৌঁছবো সেই চিন্তায় থাকি রে ভাই। উল্লেখ্য, আমার দুই কন্যা তখন বেড়ে উঠছে। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে থাকত ওদের চিন্তা। কখন বাসায় পৌঁছব, একটা শাওয়ার দিয়ে, সাময়িক ক্লান্তি মুছে ফেলে, খাওয়া দাওয়া সেরে ওদের সঙ্গে খুনসুটি করব সেই চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকতাম। সুতরাং অফিস থেকে বাসায় পৌঁছানোই আমার মোক্ষ ছিল। কালেভদ্রে যদি আমার অদ্ভুতুড়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতে ( রবিবার) যদি কোন আড্ডা বা অনুষ্ঠান ভাগ্যক্রমে সাংঘর্ষিক হয়ে যেতো, তবে সেটাতে হাজির হতাম। এমনও হয়েছে, মাসের পর মাস আমি কোন আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াতে ( যেটা এখনো জনস্বার্থে মূলত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা বা শুক্রবার হয়ে থাকে) উপস্থিত হতে পারিনি। এক পর্যায়ে দেখা গেল, সবাই আমাকে হিসাবের খাতা থেকে বাদ দিয়েই তাঁদের বিয়ে, জন্মদিন আর অন্যান্য অনুষ্ঠানের শিডিউল নির্ধারণ করছে।
আমি সন্ধ্যারাতে তেমন কিছুই করি না, সেটা শুনে অনেক উৎসাহী শুভাকাঙ্ক্ষী বিস্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করতেন। সন্ধ্যার পর আমি কোন তরল পানীয়ের টানে, কোন বিনোদনের টানে, ক্লান্তি-হরণকারী কোনকিছুতে অংশগ্রহণ না করে বাসায় চলে যাই, সেটি সম্ভবত তাঁরা মেনে নিতে পারতেন না বা অন্য অনেকের সঙ্গে মেলাতে পারতেন না। একদিন একজন বলেই বসলেন, ‘আপনি এরকম বলেই, আপনার কিছুই হবে না ভাই !’ আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম যে, আমার এই সীমাবদ্ধতার কথা আমি বিলক্ষণ জানি। করপোরেট পৃথিবীতে আমার কয়েকটি পদন্নোতি আর মানুষের মুখে ‘ উনি ভাল মানুষ’ এর বাইরে আমার কিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে না, সেও আমি বহু আগেই বুঝে ফেলেছি।
এ তো গেল গত ১৪/১৫ বছর আগের কথা। তারপরে কতদিন, মাস, বছর চলে গেল। ঢাকা মেগা-সিটি হলো, রাস্তায় যানবাহনের গতি মানুষের হাঁটার গতি বা ৪ কি:মি: / ঘণ্টা হলো। মেট্রো-রেলের হুলুস্থুল শুরু হলো, ফ্লাইওভারে ঢাকা শহর ছেয়ে গেল। এখন গত কয়েকবছর ধরে আরেক ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে। সফল উদ্যোক্তারা, শিল্পপতিরা নিজের সাফল্যের কথা বলতে বলতে আমাকে অনেকখানি করুণা করেই বলেন, ভাই আপনি আর কতদিন এই চাকরি-বাকরি, অন্যের দাস হয়ে থাকবেন? আপনার এতো অভিজ্ঞতা, একটা শিল্প-কারখানা নিদেন একটা অফিস দিয়ে বসেন। আমরা তো আছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সঙ্গে আমার পরিচিত, স্বল্পপরিচিত , গণ্ডীর ভিতরের বাইরের কে বা কাহারা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হয়ে বনানী, গুলশানে ফ্ল্যাট করে ফেলেছে এবং সমস্ত পরিবারকে কানাডা, আমেরিকায় স্থানান্তর করে নিজে এখন বিজনেস ক্লাসে আসা যাওয়ার ভিতরে আছে, সেই বিশাল লিস্ট শুনিয়ে দেন। আমি একে ভয়ঙ্কর অলস , যার ফলশ্রুতিতে প্রতিভার অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সামাজিক দৃষ্টিতে ব্যর্থ মানুষ। নিজের ব্যর্থতা আর সম্পত্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে এমনিতেই নিজের কাছেই নিজে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকি। এখন সেই কথা যদি সকাল বিকাল অন্য লোকেও বলা শুরু করে তাহলে আর যাই কোথায় ?
এখন, কেন সবাই উদ্যোক্তা হতে পারেন না, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হতে পারেন না। কেন সেনাবাহিনীতে অনেককেই মেজর পদমর্যাদা থেকেই অবসরে চলে যেতে হয়, অথবা কেন সারাজীবন একটা অকিঞ্চিৎকর জীবন যাপন করে যেতে হয়—সেসব তো আর একটা নির্দিষ্ট কারণে হয় না। অনেককিছু মিলিয়েই সেটা হয়ে থাকে। পৃথিবী এভাবেই চলে আসছে। তীব্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা , পারিবারিক চাপ, সামাজিক বলয়, কর্মস্পৃহা, জীবনে কিছু একটা হয়ে ওঠার সেই তীব্রতম উত্তেজনা তো সবাই বহন করতে পারেন না। যার হয় তার ৯ বছরেই হয় ; যার হয় না , তার ৯০ বছরেও হয় না। এখন এই না হওয়াটাকে মেনে নেওয়া যায়। অথবা মেনে না নিয়ে জীবনপাত করে সমাজের উচ্চতম জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা যায়।
আমি আজন্ম অলস, আমি আমার নিজের কমফোর্ট জোন থেকে সেই দুগ্ধপোষ্য বয়স থেকেই বের হতে পারি নাই। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বোধকরি আমার মাতৃদুগ্ধ পানের ইতিহাস। আমি প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত স্তন্যপায়ী ছিলাম। আমার অন্য দুই সহোদর ছয়মাস একবছরে স্তন্যপায়ী থেকে সাবালক হয়েছেন। অথচ , আমি কেমন করে যেন বছর ছয়েক পর্যন্ত স্তন্যপায়ী ছিলাম। অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, নানাজনের নানা উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে আমাকে মাতৃস্তন থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনভাবেই কেউ সফল হয়নি। আম্মা মুরব্বীদের কথা শুনে বুকে নিমপাতা থেকে শুরু করে আরো অনেককিছুর প্রলেপ দিয়ে দেখেছেন। কিন্তু আমি সেইসব তুচ্ছ করে আমার অধিকার আদায় করে নিতাম। পুরোদমে ইশকুলগামী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি যতদিন স্তন্যপায়ী ছিলাম, আম্মার সেই অমৃতধারাও বাধাহীন, অবিরত ছিল। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত, কেন রে দুষ্টু, তুই এখনো মাতৃস্তন নিয়ে জোরাজুরি করছিস, কিছুই তো পাওয়ার কথা না। আমি হা করে গালভর্তি দুগ্ধধারা তাঁকে দেখিয়ে দিয়ে বোঝাতাম আমার বরাদ্দ তো থেমে যায়নি !
যাই হোক, কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম !
ওই যে বলছিলাম, সামান্য ও সাধারণ প্রাপ্তিতেই আমি ডুবে থাকি বা থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। কুয়োর ব্যাঙের মতো, বাইরের আলোকিত পৃথিবী, সুবিশাল খাদ্য বৈচিত্র্যে লুব্ধ হওয়ার চেয়ে নিজেকে নিয়ে নিজের মতো থাকার কুঅভ্যাস আছে আমার। এখন এই পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে, জীবনানন্দের কাব্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করি, সেলফ প্রোটেকশন নিই, নিজেকে শোনাই:
‘আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।’
আমি জানি , আমাকে সবাই মনে করিয়ে দেয় ; একটু ইচ্ছে করলেই আমি ‘জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতা’ পেতে পারতাম, এখনো চাইলেই পারি। কিন্তু কী যে করি, এই আজন্ম আলস্যের জন্যই সেই সাফল্য আমার চার-দেয়ালের বাইরে মাথা কুটে মরে গেল,আর আমি রইলাম আমার কমফোর্ট জোনে। নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে না যাওয়ার এই সাফল্য-বিধ্বংসী চারিত্রিক কুঅভ্যাসের পাশাপাশি নিজেকে অন্যভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি। আজ এই দুই-যুগের কর্পোরেট জীবনে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, পরিশ্রমী, বুদ্ধিমান অসংখ্য উদ্যোক্তাদের আমি কুটিরশিল্প থেকে বৃহদায়তন শিল্পকারখানার মালিক হতে দেখেছি। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় , সমবয়সী অথবা আমার অনেক কম বয়েসের উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের দেখেছি, তাঁরা জানেন কীভাবে দুইহাতে বুনো মোষের শিং ধরে নিজের পায়ের তলায় আনতে হয়। দেখেছি, কী অপরিসীম পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে সমাজের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত শক্তিমত্ত মানুষে পরিণত হতে হয়।
আমি যেখানে ছিলাম, মোটের উপর কিছু বেতন ও পদবী-বৃদ্ধিসহ সেখানেই পড়ে আছি। আমার অবস্থা হয়েছে, গ্রামের প্রাইমারী ইশকুলের সেই শিক্ষকদের মতো। বছরের পর বছর , যুগের পর যুগ অসংখ্য কচিকাঁচা তাঁদের চারপাশ দিয়ে হাইস্কুল, কলেজ, বিসিএস দিয়ে কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ পুলিশ, কেউ আমলা, কেউ মন্ত্রী হয়ে যান। কিন্তু প্রাইমারী ইশকুলের শিক্ষককে সেই সীমাবদ্ধ জীবন ও জগত নিয়ে পড়ে থাকতে হয়। এখন বোধকরি নতুন করে জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা বহন করবার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। বাকীজীবন শিক্ষকসুলভ ঔদার্যে অন্যের সাফল্যে আনন্দ লাভ করাই শ্রেয় মনে করছি।
প্রথম প্রকাশ: ২৬শে মার্চ, ২০২২
by Jahid | Jan 18, 2023 | করপোরেট অবজারভেশন, দর্শন
কয়েকজন অগ্রজ, সহকর্মী বা অধীনস্থদের চলতি কোন আলোচনায় অংশ নেবেন কি নেবেন না, সেটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেছে নেওয়া ভাল। আমার করপোরেট জীবনে এমন অনেকবার হয়েছে, কয়েকজন সমবয়সী সহকর্মী একটা কিছু নিয়ে কথা বলছি, হাসাহাসি করছি, হুট করে আমার কোন ঊর্ধ্বতন এসে যে কোন একটা শব্দ ধরে আমাদের আলোচনায় ঢুকে গেলেন। অথবা জিজ্ঞেস করলেন , কি ব্যাপার কি নিয়ে আলোচনা করছেন ? মুশকিল হচ্ছে, যুবাবস্থায় ও করপোরেট চাকুরেরা চা-পানের বিরতিতে হয় চিরন্তন নারীদেহ , যৌনতা অথবা কোম্পানির কোন অনিয়মের ব্যাপারে কথা বলে। এখন ঊর্ধ্বতন কেউ জিজ্ঞেস করে ফেললে উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে ! সেই সময়ে, আমাদের মধ্যে হাজির জবাব দেওয়ার ক্ষমতা যার ভালো সে ধুনফুন কিছু একটা বলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেওয়াতো। বস-কে তো আর বলা যায় না, আমরা মাধুরী দীক্ষিতের দেহবল্লরী বা ‘বে ওয়াচ ’ নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় কয়েকজন বসের মধ্যে মাত্র একজনকে পেয়েছি, যার চলতি আলোচনায় অনাবশ্যক অনুপ্রবেশের পরিমিতি বোধ ছিল। আর বেশিরভাগ ঊর্ধ্বতনদের এই ব্যাপারে পরিমিতিবোধের অভাব আছে। পরিস্থিতি না বুঝে হুট করে আরেকটি আলোচনায় ঢুকে পড়তেই পারেন যে কোন ঊর্ধ্বতন। কিন্তু সেটা যে প্রায়শ: বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, সেটা তাঁরা ভুলে যান।
হ্যাঁ, উচ্চকিত কণ্ঠে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, ঢুকে পড়ুন, আপনার মতামত দিন। তামিম ইকবালের খেলার সমালোচনা করুন। কিন্তু মাঝারি বা নিচু কণ্ঠের আলোচনায় অনুপ্রবেশ করার আগে পরিমিতিবোধ দেখানো উত্তম।
প্রথম প্রকাশ: ১৮ই জানুয়ারি,২০১৭
by Jahid | Jan 28, 2022 | করপোরেট অবজারভেশন
টারজান ইংলিশ
আমাদের ট্রেডে বা করপোরেট জগতে অনেক লোককে স্মার্ট ভাবা হয় শুধুমাত্র পলিশড্ ইংরেজি বলার দক্ষতা দিয়ে। আমি এমন অনেককে চিনি, যাঁদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা অসাধারণ, আন্তর্জাতিক মানের , কিন্তু ট্রেডে তারা ব্রাত্য, কারণ ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা নাই।
গার্মেন্টস ট্রেডের প্রথমদিকে একবার কোন এক ইস্যুতে ক্রেতাকে কড়া ভাষায় ই-মেইল দিয়েছিলাম। আমার ভাষাজ্ঞান ও টুইস্টেড ইংরেজি বলার দক্ষতার অভাব নিয়ে আমার সুপারভাইজার সোজা চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করে বসলেন। চেয়ারম্যান পুরো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখলেন। তিনি ছিলেন ঠোঁটকাটা লোক। সবার সামনেই বললেন, ‘জাহিদের এই ই-মেইলে কাজ হইছে কিনা সেটা বলেন! ক্রেতারা আমাদের ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে বিচলিত নয়। আমেরিকা-ইংল্যান্ড ছাড়া বেশীরভাগ দেশের ক্রেতারা টারজান ইংলিশ দিয়েই ব্যবসা করে। আই টারজান, ইউ জেইন, উই লাভ। ঘটনাতো ক্লিয়ার। টারজান জেইনরে ভালোবাসে। এতে গ্রামার থাকলেই কি আর না থাকলেই কি!’
অনেককে দেখি, ইংরেজিতে লেজেগোবরে কিন্তু, নিজের কাজের কারিগরি দক্ষতায় অনন্য। বুঝি এঁদের যদি আরেকটু প্রকাশভঙ্গী ভালো থাকতো এঁরা অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারতেন। চীন জাপানের উদাহরণ টেনে লাভ কী, ওরা এটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। কিন্তু আমাদের মানসিক দীনতা কোনদিন কাটবে বলে মনে হয় না !
এরকম কোন কিছু হলে, সহকর্মীদেরকে চেয়ারম্যান সাহেবের টারজান ইংলিশের গল্পটা শুনিয়ে দিই।
শুধু পলিশড্ ইংরেজি নয়, টেকনিক্যালি নিজেদের ঋদ্ধ করেন। বলছি না, ইংরেজিতে দক্ষতার দরকার নেই। তাই বলে সেটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। কর্মক্ষেত্রে যে কোন ইস্যুতে নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে প্রকাশ করুন।
প্রথম প্রকাশঃ ১৪ই জুন , ২০১৪
সাম্প্রতিক মন্তব্য