by Jahid | Nov 29, 2020 | দর্শন, সাম্প্রতিক
মাস্তানি সারা পৃথিবী জুড়ে খুব জনপ্রিয় আয়েশি একটা জীবিকা । ধীরে ধীরে কঠিন পরিশ্রমে করা কারো সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ কেড়ে নেওয়া দারুণ লাভজনক ব্যবসা। দুতিনদিন আগে অফিসে আসার সময় দেখলাম কালসি রোডের মাঝে অনেকগুলো মোটর বাইক আর অসংখ্য পাতি মাস্তানে রাস্তা ভরা।
বহুবছর আগে থেকে যে টাইপটা দেখে আসছি, সেটা এখনো আছে ! চ্যাংড়া টাইপ রংচঙে পোশাকের বেশকিছু ছেলেপেলের সঙ্গে গালের চামড়া পোড়া চল্লিশোর্ধ কয়েকজন মাঝারি নেতা। পুরো ব্যাপারটাতে একটা কদর্যতা আছে। আমার মতো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে ব্যাপারটা বিরক্তিকর ও অসহনীয়। আমি তো পৃথিবীর কাছ থেকে কিছুই কেড়ে নেওয়া শিখি নাই। আমাকে তো কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে সব কিছু করতে হয়েছে।
সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলোতে দেখা যায়, সুদূর ভবিষ্যতেও গ্যালাক্সিতে মাস্তান হিংস্র গোষ্ঠী থাকবে, যাদের কাজই হবে এর ওর স্পেস-শিপ থেকে শুরু করে যা পাওয়া যায় কেড়ে নেওয়া।
সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য এভাবে চিন্তা করা যায় যে, পৃথিবী আদিম কাল থেকে কিছু অনৈতিক নিয়মকানুনের ভিতর দিয়ে চলে এসেছে । এখনো চলছে, দূর ভবিষ্যতেও চলবে।
প্রকাশকালঃ ৯ই ডিসেম্বর,২০১৯
by Jahid | Nov 28, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
ওড়াউড়ির দিন [প্রথম খণ্ড: আমেরিকা] ।। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০১০
দেশের জন্যে এই ব্যাকুলতা প্রবাসীদের মধ্যে যে কতখানি প্রবল একটি গল্প শুনিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করি। আগেই বলেছি, বিদেশে বাস করা সম্পন্ন ও সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে এই ব্যাকুলতা যতখানি তার চেয়ে এ অনেক বেশি পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক শ্রেণীর গরিব অসহায় মানুষের মধ্যে । সচ্ছল মানুষদের মনকে জন্মভূমি যে কখনও সখনও উতলা করে না তা নয়। কিন্তু গাড়ি বাড়ি বিলাস বৈভবে ঝল-মল করা তাদের জীবনে সে পিছুটান বড় কিছু নয় । তাছাড়া ইচ্ছা করলেই তো তারা মাঝেমধ্যে দেশে এসে ঘুরে যেতে পারে। তারা তা যায়ও। তাই বিদেশে থাকলেও দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট তাদের প্রবল নয়। কিন্তু গরিব প্রবাসীদের ব্যাপারে ঘটনাটা আলাদা। আদম ব্যাপারিদের খপ্পরে পড়ে জমি-বাড়ি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে নামমাত্র রোজগারের আশায় অচেনা দূর বিদেশের পথে পাড়ি জমায় তারা। শুধু পায়ের তলায় একচিলতে মাটির জন্যে, ছোট্ট একটু নিরুদ্বেগ ভবিষ্যতের জন্যে এক নিষ্ঠুর আর বৈরী পৃথিবীর সঙ্গে উদয়াস্ত লড়াই করে বছরের পর বছর জীবনকে তারা নিঃশেষ করে। হয়তো এসবই তারা করে সন্তান, স্ত্রী, বাপ-মা ভাই বা বোনের মুখে সামান্য একটুকরো হাসি ফোটানোর জন্যে। দূরদেশের নির্মম আবহাওয়া বা ঝলসানো রোদের ভেতর শরীর আয়ু ক্ষয় করে আমনুষিক শ্রমে তাদের জন্য দূর প্রবাস থেকে এরা বছরের পর বছর টাকা পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে তার ভাইয়েরা বাজার থেকে চড়া দামে মাছ-মাংস কিনে নবাবী হালে দিন কাটায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ফুর্তিতে সময় গুজরান করে। ভাইয়ের পাঠানো টাকায় তার জন্যে জমি কেনার বদলে অনেক সময় গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। এমন খবর ও কম শোনা যায় না যে এদের অনুপস্থিতির সুযোগে এদের পাঠানো টাকায় দামি গয়না শাড়ি পড়ে এদের স্ত্রীদের কেউ কেউ পরপুরুষের সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি চালায়—তবু এই মানুষগুলো তাদের মুখ স্মরণ করেই হাজারো শৌখিন জিনিশে বড় বড় ব্যাগ-বস্তা ভর্তি করে বাড়ি ফেরে। প্রিয় পরিজনহীন নিঃসঙ্গ প্রবাসে তাদের ফেলে আসা দেশ, মানুষ, বন্ধু আর আত্মীয়ের মুখ তাদের কাছে স্বপ্নের তুলিতে আঁকা ছবির মতো রমণীয় লাগে। দেশের জন্য স্বপ্ন আর আকুলতা নিয়ে কেটে যায় তাদের হতচ্ছাড়া প্রবাসী জীবনের ভারাক্রান্ত মুহূর্ত।
এমনি একদল দুঃখী মানুষের সঙ্গে বছর তিনেক আগে দেখা হয়েছিল, দুবাই এয়ারপোর্টে। সেবারও আমেরিকা থেকে ফিরছিলাম। দুবাইয়ে প্লেন পাল্টে ঢাকার প্লেনে উঠছি। বোর্ডিং কাউন্টারে গিয়ে দেখি ফ্লাইটে বিদেশি নেই বললেই চলে। কাউন্টারজুড়ে গিজগিজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা-জায়গা থেকে জড়ো হওয়া ঘরমুখো বাঙালি শ্রমিকের দল। বুঝলাম, এদের নিয়মিত আনা-নেওয়ার জন্যেই এমিরেটস, ইতিহাদ, কাতার বা কুয়েত এয়ারলাইন্সের এত ঢাকা-মুখো ফ্লাইট। এদের কেউ তিন বছর, কেউ চার বছর , কেউ এমনকি পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে, সবার সঙ্গে বিরাট বিরাট বাক্স-পেটরার ভেতর কেনাকাটা করা সাধ্যমতো জিনিশপত্র। প্রিয়জনদের জন্যে কেনা এই জিনিশগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্নে তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। দেশের জন্যে কী ব্যাকুলতা আর স্বপ্ন তাদের চোখে। উদ্বেল হৃদয় দিয়ে ফ্লাইটের পাঁচ ঘণ্টা আকুতি সময়টুকু সহ্য করার শক্তিও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। যেন পারলে দুবাইয়ে প্লেনে উঠেই সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে যায়। কথা বলে বোঝা গেল এদের অধিকাংশই লিখতে পড়তে পর্যন্ত জানে না। আমার পাশেই বসেছিলেন থ্রি পিস স্যুট পরা ডাকসাইটে এক ভদ্রলোক। কিছুক্ষণ আলাপের পরে একগাল বিগলিত হাসির সঙ্গে হাতের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের কাগজদুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ভাবলাম , আমার ওগুলো দরকার ভেবেই হয়তো আমাকে দিচ্ছেন। বললাম, আমার আছে। লাগবে না।
‘একটু ফিলাপ কইরা দিবেন স্যার?’ মুখে দাঁত বের করা বিগলিত হাসি। কী আশ্চর্য ! এরকম একজন স্যুটপরা পুরোদস্তুর ডাঁটপাটওয়ালা ভদ্রলোক লিখতে পর্যন্ত জানেন না ? কিন্তু না, এমন বাঙালি একজন দুজন না, হাজারে হাজারে পাবেন মধ্যপ্রাচ্যের মতো পৃথিবীর নানা দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের ভিড়ে।
কথায় কথায় জানলাম তিনিও একজন শ্রমিক। বাড়ি সিলেট, রিয়াদে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রথমে এসেছিলেন বসরায়, ইরাকে। সেখানে যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
তার ফর্ম ফিলাপ শেষ হতেই, আরেকটা হাত এগিয়ে এলো সামনের দিক থেকে। তারটা শেষ হতেই দেখি চারপাশ থেকে ডজনখানেক হাত আমার দিকে এগিয়ে আছে। সব হাতেই একই ফর্ম। সবাই যে ভদ্রভাবে অনুরোধ করছে তা-ও না। অনুরোধ করার ভাষাও অনেকের জানা নেই। এ ধরণের দেহাতী মানুষের পক্ষে কী করেইবা তা সম্ভব?
‘এই যে , দেন তো, আমারডা ফিলাপ কইরা দেন।‘
মনে হয় হুকুম করছে।
দুঃখী এই লোকগুলোর জন্য মমতায় মনটা ভরে উঠল। প্লেনযাত্রার পুরো সময়টা এদের ফর্ম ফিলাপ করে চললাম। এদিকে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে। প্লেনভর্তি লোকগুলোর মধ্যে টানটান উত্তেজনা। কখন আসবে বাংলাদেশ। কেন আসছে না। চেহারায় তাদের আগ্নেয় উগ্রতা। সবার কথাবার্তার বিষয় একটাইঃ বাংলাদেশ। ঘরে ফেরার আগ্রহ আনন্দে উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছে সবাই।
সামনের টিভি পর্দায় প্লেনের ছুটে চলার ছবি চোখে পড়ছে। আরব সাগরের ধার দিয়ে করাচির পাশ কাটিয়ে দিল্লি কানপুর পেরিয়ে প্লেন এখন বিহারের ওপর। এখনও অন্তত ঘন্টাখানেক বাকি। যাত্রীরা অস্থির বেসামাল । উত্তেজনায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোথায় বাংলাদেশ। কোথায় তুমি? মাতৃভূমি, তুমি কতদূর! অধিকাংশ লোকই মানচিত্র চেনে না। বুঝতে পারছে না ঠিক কোনখানে আছে। হঠাৎ জানালার পাশ থেকে কে একজন চিৎকার করে উঠলঃ ঐ যে ! ঐ যে ।
তার ব্যগ্র চিৎকার সারা প্লেনে যেন কেঁপে কেঁপে বেড়াতে লাগল। সবাই যেন এই মুহূর্তটির জন্যেই অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ প্লেনের ভেতর ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্লেনভর্তি প্রায় সব লোক, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হুড়মুড় করে জানালার ওপর ঝুঁকে কী যেন আঁতিপাঁতি খুঁজছে। গলায় শুধু একটায় চিৎকার—কৈ? কৈ ? ( কোথায় আমার দেশ—ভাই, সন্তান, জীবনসঙ্গী , বাপ, মা, কোথায় তোমরা? ) প্লেনভর্তি এতগুলো লোক পাগলের মতো উঁকিঝুঁকি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ গোটা প্লেনভর্তি লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলে যে বিমানের বিপদ হতে পারে সে জ্ঞান নেই এই লোকগুলোর। বিমানবালা আর পুরুষ ক্রুরা ধমক দিয়ে চিৎকার করে পাগলের মতো দুই হাতে টেনে-হিঁচড়ে ঘাড় চেপে তাদের বসানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জানালা থেকে তাদের ফেরানো সোজা নয়।প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ এমনি এক জ্বলন্ত রূপসী। আমাদের কাছে এর কতটুকু ?
+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের এই ভ্রমণকাহিনীর সময়কাল সম্ভবত: ২০০০ সালের আশেপাশে। স্যারের অনেক বক্তৃতা তাঁর লেখায় আছে। অনেক ঘরোয়া আলোচনায় তা আবার নতুন করে তা উঠে আসে। পিনাকী ভট্টাচার্য্যের ( Pinaki.Bhattacharyya) ২০১৮ সালের শেয়ার করা একটা ভিডিও পোস্ট থেকে স্যারের ঘরোয়া বক্তৃতাটি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। সেজান মাহমুদ (Sezan Mahmud ) থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ফেসবুক সেলিব্রেটি এই প্রসঙ্গে আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়ে কুৎসিত অশ্রাব্য গালাগালির সুযোগ করে দিয়েছেন ফেসবুকের আমজনতাকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়ার কলেজ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ঢাকা কলেজে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার শিক্ষক ছিলেন। মূল লেখাটিতে প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে তাঁর গভীর মমতার প্রকাশ। কিন্তু ফেম-সিকার সেলিব্রেটিরা কোনভাবে গুণীজনকে তাচ্ছিল্য করার সামান্যতম সুযোগ হারান না।
আমি পুরো ব্যাপারটিতে মর্মাহত। মূল লেখাটি দাড়ি-কমাসহ পুনর্লিখন করেছি গভীর হতাশা থেকে। যদিও সেলিব্রেটিদের ক্ষমাপ্রার্থনা আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি আমার !
প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন, ২০১৯
by Jahid | Nov 28, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
কয়েক দশকে ঢাকা শহর অগুনতি বিল্ডিং, শপিং মল দিয়ে ভরে গেছে।
ইদানীং রাস্তায় বের হলেই শুধু চোখে পড়ে ঝকঝকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল আর ফার্মেসি ! ফার্মেসিগুলোতে সারি সারি র্যাক ভর্তি ঔষধের প্যাকেটে ; নানা বর্ণের, নানা মাপের, নানা কোম্পানির !
অথচ শহর খুঁজে শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য একখণ্ড সবুজ পার্ক চোখে পড়ে না। অথচ দু’দণ্ড বসে মনের অবসাদ দূর করার জন্য একটা পাঠাগার নেই। বিকলাঙ্গ শরীর ও মনের জন্য কিছু নেই বলেই আগামীর ঢাকা শহর শুধুমাত্র বিল্ডিং , হাসপাতাল আর ফার্মেসির শহর !
প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন,২০১৭
by Jahid | Nov 28, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
আমাদের স্কুলজীবনে আশির দশকেও ঠিক বর্ষাকালের আগেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ঘুমন্ত সংস্থাগুলোর মনে পড়ে যেত সারাবছরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো তাদের বাকী রয়ে গেছে ! তখন বিপুল উৎসাহে এরা ঢাকার রাস্তাগুলো খোঁড়াখুঁড়িতে মনোনিবেশ করত। আমারা দেখতাম, জুলাই, আগস্ট মাসের শেষের দিকেও কী গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সংস্থাগুলো ঝকঝকে রাস্তাগুলো এলোপাথাড়ি খুঁড়ে খুঁড়ে সবার জীবন কী পরিমাণ দুর্বিষহ করে রাখছে।
সেই সময়ে মহল্লার এক বড়ভাই রসিকতা করে বলছিলেন, যেভাবে এরা গভীর মনোযোগ দিয়ে রাস্তা খুঁড়ছে , মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি ‘তেল’ আবিষ্কার করে ফেলবে ! এই ‘তেল’ হচ্ছে তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলিয়াম তেল অর্থে। খোঁড়াখুঁড়ি শেষে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো দীর্ঘ শীত-নিদ্রায় চলে যেত। পুরো বর্ষাকাল থইথই পানিতে রাস্তার খানাখন্দ ভরে থাকতে থাকতে সেগুলো নদীমাতৃক পলিমাটিতে ভরে যেত। শীতের শুরুতে সেই ভাঙাচোরা রাস্তার উপরে দিয়ে গাড়িঘোড়া চলতে চলতে ধূলোয় ধোঁয়ায় নাগরিক জীবনে ব্রংকাইটিস-হাঁপানির আয়োজন হতো !
তিন দশক পরে এসেও এই সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা একইরকম রয়ে গেছে। অথর্ব এই সংস্থাগুলো সারা ঢাকার শহর খুঁড়তে খুঁড়তে পেট্রোলিয়াম তেল বের করতে না পারলেও, আমাদের মতো সাধারণ জনগণের তেল যে বের করতে পারছে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ !
প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন,২০১৭
by Jahid | Nov 28, 2020 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
খেয়াল করলাম আমার ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া জ্যেষ্ঠা কন্যার টিভি আসক্তি হয়েছে। বছর দুয়েক আগেও কার্টুন চ্যানেল প্রীতি ছিল। কারো বুদ্ধিতে কীভাবে যেন সবকটি কার্টুন চ্যানেল ব্লক করে দিয়েছিলাম দুই কন্যার মানসিক স্বাস্থ্যের স্বার্থে।
কৈশোরে পা দিয়ে ও স্কুলের বন্ধুদের প্রভাবে ,এখন নতুন আসক্তি ইংরেজি মুভি চ্যানেল ও ভারতীয় কয়েকটি চ্যানেলে। সপ্তাহ দুয়েক আগে বসলাম ওকে নিয়ে । বোঝানোর চেষ্টা করলাম কেন এই টিভি আসক্তি খারাপ।আমাদের টিভি আসক্তি জন্মানোর সুযোগ ছিল না। কারণ ৯০-৯১ সাল পর্যন্ত একমাত্র বিটিভি ও মাঝে সাঁঝে বাঁশের অ্যান্টেনায় সিলভারের হাঁড়িপাতিল লাগিয়ে দূরদর্শনের কয়েকটা চ্যানেলই ছিল সম্বল।
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পরে , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্ট দেখতে যাচ্ছিলাম দুই বন্ধু। রিকশাওয়ালা যথারীতি সদ্য পতিত এরশাদের পরিত্যক্ত বাসভবনে কত অগুনতি নগদ টাকা পাওয়া গেছে সেটার বর্ণনা দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে সে বলল, এরশাদের বাড়িতে নাকি কি এক অ্যান্টেনা আছে, যেটা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনুষ্ঠান দেখা যায়। এরশাদ ব্যাটা অনেক ধড়িবাজ ছিল– ইত্যাদি ইত্যাদি। বিষয়টি আমাদের কাছেও বিস্ময়কর ছিল।
সম্ভবত: মাস কয়েকের ভিতরেই বিটিভি আনুষ্ঠানিকভাবে সিএনএন ও বিবিসি চ্যানেলের ঘণ্টাখানেকের অনুষ্ঠান প্রচার করা শুরু করল। আমাদের অনেকে সেই ফালতু নিউজ চ্যানেলে ‘ল্যারি কিং শো’ ‘ফ্যাশন শো’ দেখে মুগ্ধ। তবে বিবিসি চ্যানেলের ডকুমেন্টারিগুলো আগেও যেমন টানত এখনো সেইরকম উপভোগ্য মনে হয়। এরপরে বানের জলের মতো মহল্লায় ঘরেঘরে চলে আসল স্যাটেলাইট আর ডিস অ্যান্টেনা। গুচ্ছের চ্যানেলের ছড়াছড়ি। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় !
আমি নিজে বছর দশেক আগেই বেডরুম থেকে টিভি বিদায় করেছি। পরিবারকে একান্ত কিছুটা কোয়ালিটি টাইম দিতে হলে টিভিকে বিদায় দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পরে এসে এই চ্যানেল সেই চ্যানেল করতে করতে খামোখাই রাত গভীর হয়ে যেত। পরেরদিন কাজ করার পুরো জীবনীশক্তি অবশিষ্ট থাকত না। এই এক চ্যানেলে কিছুক্ষণ, আরেক চ্যানেলে আরো কিছুক্ষণ লাফঝাঁপ করার প্রবণতা সময়ের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগ শক্তির একটা বড় ক্ষতি করে ফেলে। বাসার একটি মাত্র টিভি ডাইনিং –লিভিং রুমে ঝুলে আছে। আমি বাড়ি ফিরে খাওয়ার সময়েও টিভি বন্ধ রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করি। ২৪ ঘণ্টায় একবারই একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগ হয়। সারাদিনের জমে থাকা কথাবার্তা বলাটা প্রয়োজনীয়। টিভি চালু থাকলে খেতে খেতেও দেখা যায়, কারো মুখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলে, সবাই মাথা ঘুরিয়ে টিভির দিকে ফিরে ফিরে চাচ্ছে। ব্যাপারটা আমার কাছে অসহ্য লাগে।
মেয়েকে পুঁজিবাদ, ক্যাপিটালিজম না বুঝিয়ে সহজ করে বোঝালাম অসংখ্য অর্থহীন টিভি মিডিয়ার বিনোদনের মূল উদ্দেশ্য যতোখানি না মানুষকে বিনোদিত করা– তার চেয়েও বেশি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের। সেটা করতে গেলে দর্শককে টিভির সামনে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখতে হবে। মিডিয়ায় যারা আছেন, তাঁদের মেধা আমাদের সাধারণের চেয়ে অবশ্যই বেশি। বাংলাদেশের গড় আই কিউ ৮২ এর কাছাকাছি; ধরে নিচ্ছি আমার আই কিউ ১০০। এখন যারা অনুষ্ঠান বানাচ্ছেন তাঁদের গড় আই কিউ সাধারণের চেয়ে বেশি। নানাভাবে তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে, দর্শককে ধরে রাখার, আসক্ত করে ফেলার ; কেননা এই মিডিয়া মেধাবীদের জীবিকা নির্ভর করছে দর্শককে আসক্ত করে উপার্জনের উপরে।
সিংহভাগ চ্যানেলের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই আমি অবলীলায় বলতে পারি, টিভির এ পাশে বসে থাকা দর্শকের খুব সামান্যই অবকাশ থাকে নিজের চিন্তা ক্ষমতা প্রয়োগ করার। নির্জীব মাদকাসক্তের মতো পুষ্টিহীন, ঝকমকে অলীক জগতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমূল্য সময়ের অপচয়।
কন্যাকে বইয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য স্বপক্ষে কিছু যুক্তি দাঁড় করালাম। বোঝালাম, বই অনেক বেশি সজীব একটা ব্যাপার। একজন ভালো লেখকের যতো মেধাই থাকুক তাঁর মূল চেষ্টা থাকে প্রকাশিত , উদ্ভাসিত হওয়ার; তাঁর সামান্যই চেষ্টা থাকে আসক্ত করার। একটা ভালো বইয়ের সঙ্গে পাঠকের মিথষ্ক্রিয়া থাকে সরাসরি। লেখকের কল্পনার জগতের সঙ্গে পাঠকের নিজের কল্পনার জগতের সম্মীলন ঘটে। কন্যা কিছুটা বুঝলো মনে হয়। গত কয়েকমাসে কয়েকদিন কিছুক্ষণের জন্য শুধু ইংরেজি মুভি চ্যানেল দেখতে দেখেছি।
এখন টিভির সামনে ওকে দেখলেই আমি মনে করিয়ে দিই , অ্যাডিকশন না তো? সে মৃদু হেসে টিভি থেকে সরে যায়।
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ই এপ্রিল, ২০১৭
by Jahid | Nov 28, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
যাহা অবশিষ্ট ছিল ও যাহার আশংকা করিতেছিলাম তাহাই হইয়াছে ; কনিষ্ঠা টুনটুনি বিদ্যালয়ে তাহার সহপাঠিনীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করিয়াছে। শ্রেণি শিক্ষিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার জন্য টুনির ডাক পড়িয়াছে।
দুরালাপে কথা কহিবার সময় টুনি কনিষ্ঠা টুনটুনির বিদ্যালয়ে যাইবার প্রাক্বালে যথারীতি আমার চতুর্বিংশ পুরুষ তুলিয়া অশ্রাব্য গালি বর্ষণ করিতেছিল ! সেই প্রাচীনতম পদ্ধতিতে আমার সমগ্র গোষ্ঠিকুণ্ডলী ধৌত করিতেছিল, আমাদের বংশ খারাপ, সকলেই গোঁয়ারের মতো চলে ; ভদ্রবংশের কেহ হইলে এরূপ আচরণ কখনই করিত না , ইত্যাদি ইত্যাদি।
কনিষ্ঠার কাছ হইতে তাৎক্ষণিক যাহা উদ্ধৃত ও শ্রুত হইয়াছে ; তাহা হইতেছে এই বিশৃঙ্খলার দায়িত্ব অপরপক্ষের! কারণ অপরপক্ষই প্রাথমিকভাবে শুরু করিয়াছিল , কনিষ্ঠা শুধু তাল মিলাইয়া তাহাকে গুটি কয়েক প্রহার করিয়াছে।
আমার সমগ্র বিদ্যালয় জীবনে বোধকরি সপ্তম শ্রেণীতে পড়িবার সময়, অপাঠ্য পুস্তক( সেবা প্রকাশনী, হুমায়ূন আহমেদ ইত্যাদি) লুকাইয়া পড়িতে গিয়া শ্রেণীকক্ষে কয়েক সতীর্থ সমেত বমাল ধরা পড়িয়াছিলাম। প্রধান শিক্ষকের নিকট হইতে গৃহে লালবর্ণ পত্র গিয়াছিল। উহাই প্রথম ও উহাই শেষ।
কোন বিদ্যালয়ে , কোন শ্রেণীতে পড়িতাম , কাহাদের সহিত খেলিতাম, দলাদলি করিতাম, কাহাকে প্রহার করিতাম, প্রহৃত হইতাম; আমাদের জনক-জননী কদাপি তাহার খোঁজ রাখিতেন। জনক প্রায়শ: ভুলিয়া যাইতেন আমি বিদ্যালয়ে নাকি মহাবিদ্যালয়ে ; বিজ্ঞান না কলাবিভাগে অধ্যয়ন করিতেছি। একবারই তিনি আমার অধ্যয়ন লইয়া মাথা ঘামাইয়াছিলেন, অন্যের সু অথবা কুপরামর্শে আমাকে অর্থনীতি বিভাগ হইতে মূলোৎপাটন করিয়া বস্ত্র প্রকৌশলীতে ভর্তি হইতে বাধ্য করিয়াছিলেন। উহাই প্রথম উহাই শেষ।
স্বল্পসংখ্যক সন্তানাদি লইয়া হইয়াছে আমাদের সমস্যা, কী করিলে কী হইবে তাহা ভাবিতে ভাবিতে অভিভাবক-অভিভাবিকাদের রাত্রির সুখনিদ্রার তিরোধান ঘটিতেছে !
সাম্প্রতিক মন্তব্য