by Jahid | Nov 29, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সহজে বিশ্বাস করতে চাই না । মুসলমানদের সকল দুর্দশার জন্য দায়ী ইহুদি অথবা বাংলাদেশের সকল অস্থিরতা আর অরাজকতার জন্য দায়ী ভারত ; মৌলবাদীদের সকল উত্থানের পিছনে শুধুই পাকিস্তান—এই সব আমার কাছে বড্ডো ক্লিশে মনে হয় !
দিন কয়েক আগে এক সাংবাদিক বন্ধু তাঁর এক দেশি-বিদেশী নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডার কথা শেয়ার করছিল। তাঁদের আলোচনায় নাকি একটি প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী বাস করে বড় শহরগুলোতে। হোক সে দিল্লী, ঢাকা অথবা অন্যকোন মহানগরী ! রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুষঙ্গ যারা , তারা নাকি চায় , এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সকালের ট্রাফিকে ক্লান্ত হয়ে থাকুক সারাদিন ; আর সন্ধ্যার ট্রাফিকে আরো বেশি ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে নির্জীব হয়ে পড়ে থাক পরের দিনের ট্রাফিকের অপেক্ষায়।
তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোতে ট্রাফিক দূরীকরণ হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বনিম্ন প্রায়োরিটি।
রাষ্ট্রযন্ত্র চায় ট্রাফিক দীর্ঘমেয়াদে থাকুক ! অথবা তারা চায় ট্রাফিক এতো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হোক, যে তার সময়োপযোগী সুফল জনগণের কাছে থাকুক চির অধরা। শুনেছি ব্রিটিশ রাজের সময়ে জেলখানার কয়েদীদের খাবারে চুলকানির উপাদান মিশিয়ে দেওয়া হত। জেলের পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ আর অখাদ্য খেয়ে রাজবন্দী থেকে শুরু করে সকল কয়েদী অসুস্থ হয়ে থাকত, নির্জীব হয়ে পড়ে থাকত। নিজের শরীর যেখানে চলে না, সেখানে একজন কয়েদী আর স্বাধীন ভারতের জন্য কতোখানি চিন্তা করতে পারবে ! বিশ্বাস করতে চাই না, তবু ঐ যে বললাম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব– বন্ধুর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও বোধহয় ব্রিটিশ রাজের কয়েদীদের মতোই অবস্থা !
আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদদের নানা ধরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ফাইলবন্দী হয়ে উইপোকা খায় ! রাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে আছে স্বল্পমেয়াদের ফ্লাই ওভার নিয়ে। সমন্বয়হীনতা এমন পর্যায়ে যে, একটা রাস্তা দুই বছরের মধ্যে তিনবার পিচঢালাই আর ফুটপাত টাইলস দিয়ে সারা হয় তো আর চারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখা হয় জনগণের অসহায়ত্বকে একেবারে মাটিতে পিষে থেঁতলে ফেলা দেখার বীভৎস আনন্দে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে দীর্ঘমেয়াদের টেকসই ঢালাই রাস্তার কথা বলেছেন কয়েকবার ; অথচ সেই প্রকল্প ফেলে রেখে সবাই মিলে উঠেপড়ে লেগেছে এই বর্ষাপ্রবণ কাদামাটির দেশে পিচের রাস্তার বাইরে কোনকিছু না করতে !
মিরপুরের কালসি থেকে যে নতুন ফ্লাইওভারটি সরাসরি ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে যোগ দিয়ে হোটেল র্যাডিসনের সামনে গিয়ে অথবা কুড়িল ফ্লাইওভারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল — সেটা এখন হুট করে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে সড়কের জ্যাম চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে ! এবং এটা নাকি করা হয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে।
এভাবে সরকার প্রধানের সদিচ্ছাকে নিজেদের হীন স্বার্থে জলাঞ্জলি দিতে এতোটুকু দ্বিধা করছে না রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল নিয়ামকরা। যে দেশে নগর পরিকল্পনাবিদদেরই সামান্যতম মূল্যায়ন নেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ; সেই দেশে সাধারণ জনগণের আহাজারি কী করে পৌঁছাবে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে !
প্রকাশকালঃ ২রা মার্চ,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
গতকাল বিকেলে, প্রায় গোধূলি লগ্নে কিছুক্ষণের জন্য মহল্লার খোলা রাস্তায় হাঁটছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের দেখা ; দুই লাজুক কিশোর কিশোরী আমার ঠিক বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছিল। চারিদিকে চাইতে চাইতে ; সবার নজর বাঁচিয়ে একজনের কাঁধের সঙ্গে আরেকজনের কাঁধের মৃদু স্পর্শ হচ্ছিল। প্রতিটি অলৌকিক স্পর্শেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল দুজনেই। অনুভূতির স্পর্শকাতরতা কতখানি বিস্ফোরক হলে ঐ কেঁপে ওঠা থাকে, তা আমি জানি। ঐ বয়স যে আমিও পার করে এসেছি !
‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।’
আহা জীবন ! আহারে জীবন !!
প্রকাশকালঃ ১৪ই ফেব্রুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | সাম্প্রতিক
প্রমিত বাংলায় ‘ লেবু বেশি কচলালে তিতা হয় ’- এর পূর্ববঙ্গীয় ভার্সন আছে ! আমাদের পদ্মাপারের কুষ্টিয়া , যশোর অঞ্চলে আমরা সেটাকে বলি ‘তেশ মারা’ ! ঢাকাইয়া ভাষায় ‘সোগা মারা খাওয়া’ এর কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করে !
কোন একটা সর্ব গ্রহণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে যখন অধিক কচলাকচলিতে একেবারে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয় ; তখন আফসোসের সুরে বলা হয়, ‘অমুক’ জিনিষের তেশ মারা সারা !
গত কয়েক বছরে দেশের রাজনীতিবিদরা ‘হরতাল-আন্দোলন’ এবং ‘নির্বাচন’ নামের জন-গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বিষয়ের তেশ মেরে দিয়েছেন !
প্রকাশকালঃ ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | সাম্প্রতিক
আমি ছাপোষা চাকরিজীবী। টেক্সটাইল-গার্মেন্টস ট্রেডে আছি দুইযুগ ধরে।
ইদানীং কিছু প্রশ্ন টেবিলে মুখোমুখি বসলেই চলে আসছে। নিজের দুঃখ শেয়ার করতে গিয়ে, অনেকেই এই প্রশ্নগুলো করছেন। নানা প্রশ্ন –ভাই গার্মেন্টসের এ কী অবস্থা ! আপনার মতামত কি , অর্ডার ফ্লো আসবে কবে, আদৌ কি আসবে ? এই সেক্টরের হচ্ছেটা কি ! সরকার কি করছে ? বিজিএমইএ কি করছে? মালিকপক্ষ কি করছে?
এই সেক্টরে বহু রথীমহারথী ছাড়াও শ্রমিক পর্যায়ে সরাসরি জড়িত ৪০ লক্ষ লোক। রপ্তানির ৮১ ভাগ এই গার্মেন্টস দিয়ে আর জিডিপির ২০ ভাগ এখান থেকে। এখন পর্যন্ত আর কোন বিকল্প ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি বা ওঠার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আমি আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ নেওয়া অনুচিত হলেও কিছু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতেই পারি। সেটা কারো পছন্দ হবে, কারো হবে না। আমার কাজ আমি করি।
প্রথমত: বাংলাদেশ বিশ্বের গার্মেন্টসের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ উৎপাদন করে। এর মানে, আমরা মেধাতালিকায় চীনের পরে দ্বিতীয় হলেও সেটা অনেক নাম্বারের ব্যবধানে ! চায়না যদি করে ৩০০ বিলিয়ন ডলার, আমাদের ৩২ বিলিয়ন করতে হিমসিম। এর মানে, বিশ্ববাজারে আমাদের ইমপ্যাক্ট এমন কিছু নয় যে, আমাদের গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে পশ্চিমের লোকজন কাপড়চোপড় ছাড়া অর্ধ-নগ্ন হয়ে চলবে! অন্য দেশগুলোর সক্ষমতা দিয়ে তাঁদের দিব্যি চলে যাবে।
আর, আমাদের বাংলাদেশ যে ধরণের বেসিক গার্মেন্টসগুলো করে ; সেগুলো এখন অবলীলায় পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ভারত, চায়না, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া মায় শ্রীলংকাও করতে পারে। অধুনা আফ্রিকার কিছু দেশও আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা লিখিয়েছে। বছর দশেকের ভিতরে তাদের প্রোডাক্টের গুণগত মান আমাদের কাছাকাছি চলে যাবে বলে আশংকা করছেন সবাই।
প্রথমতঃ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি, আমাদের আভ্যন্তরীণ দুটি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংস্থা তাঁদের সোর্সিং এর ব্যাপারে ব্যাক-আপ নিয়েছিল। প্রথমটি ২০১৮ সালের গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি। অনেক কাহিনীর পরে সেটা যখন ২০১৮ সালের শেষভাগে কার্যকরী হওয়ার কথা ; তার বহু আগে থেকেই আমাদের সেক্টরের সবাই ক্রেতা-সংস্থাকে ক্রমাগত চাপ দিয়েছেন খুচরা মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য। ক্রেতা যে আইটেম ২ ডলারে কিনেছেন ২০১৮ সালে আমরা তাঁদেরকে আওয়াজ দিয়েছি, সেটা বেতন বৃদ্ধির পরে ন্যূনতম ২.৪০ ডলারে কিনতে হবে। আতংকিত ক্রেতা সংস্থা তাঁদের সোর্সিংকে বিভিন্ন দেশে ডিস্ট্রিবিউট করে ব্যাল্যান্স করেছেন। তাঁরা আমাদের উপর ঠিক সেইভাবে ভরসা করতে পারেন নি।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমাদের জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগের তথ্য উপাত্ত বলে –প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের পরে মাস ছয়েক বা বছর খানেক ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে। এই আশংকা থেকেও তাঁরা কিছু অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছেন।
এই দুই ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়াতে দেখা গেল, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে অর্ডারের জন্য হাহাকার।
বিশাল বিশাল গার্মেন্টস ! একেকটা ফ্লোর এতো বড় যে এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যায় না ! সেই সব ইন্ডাস্ট্রির ৪০ ভাগ থেকে শুরু করে ৫০ ভাগ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি ফাঁকা থাকা শুরু করল। যে গার্মেন্টস ২ ডলারে করেছেন মালিক, সেটা পারলে তিনি দেড় ডলারে করার জন্য প্রস্তুত। পুরো সেক্টরে একটা অরাজকতা শুরু হল।
এর বাইরে প্রথমেই যে কারণ নিয়ে কথা হচ্ছিল যে , আন্তর্জাতিক মার্কেটে আমাদের তেমন কোন ইমপ্যাক্ট নেই প্রথম থেকেই। না আছে কোন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, না আছে কোন ব্র্যান্ডিং।
‘পুকুর কাটা’ শেখার জন্য আমাদের সরকারী কর্মকর্তারা দল বেঁধে বিদেশ যাচ্ছেন, অথচ এই সেক্টরের অ্যাডভারটাইজমেনটের বা ব্রান্ডিং এর জন কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। আমি কয়েকবার আমেরিকার বিখ্যাত সোর্সিং ফেয়ার বা মেলা ( ম্যাজিক লাস ভেগাস)- এ গেছি কোম্পানির পক্ষ থেকে। আমাদের বিভিন্ন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ও ট্রেডিং অফিসের আয়োজকদের সঙ্গে ইপিবি , পাট ও টেক্সটাইল মন্ত্রণালয়, সংসদ সদস্য আরো নানা শ্রেণির লোক গেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে।
প্রথম মেলায় যাওয়ার আগে। সম্ভবত: ২০১৩ সালে – অংশগ্রহণকারী সবাইকে ডাকা হল, জাতীয় সংসদ ভবনে। মাননীয় সংসদ সদস্য তাঁর নানা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদের কোন সমস্যায় তিনি নিজেও আমেরিকাতে থাকবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেন।
তো, আমদের আমেরিকা ভ্রমণের শুরু। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের হুজ্জত পেরিয়ে, গুচ্ছের লটবহর আর গার্মেন্টসের স্যাম্পল নিয়ে আমরা মেলার দুইদিন আগে পৌঁছলাম। জেট ল্যাগ না কাটতেই দেড় দিন ধরে নিজেদের স্টলগুলো সাজালাম সাধ্যমত। একদম প্রথম সারিতেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্টল।
৫ দিনের মেলার প্রথম দিন একজন পূর্বপরিচিত সরকারী কর্মকর্তাকে দেখলাম, বিশাল সেই প্যাভিলিয়নে একটা টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। সামনে একটা কাঁচের জারে কিছু চকলেট আর কিছু লিফলেট। হাই , হ্যালো হল। পরেরদিন দেখি তিনি নাই। আমেরিকার স্থানীয় দূতাবাসের একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা বসে আছেন। এদিকে মেলা চলছে, আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নানাভাবে নানা ক্রেতাকে আমাদের বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনার জন্য , আমাদের কারখানাগুলো দেখে আসার জন্য অনুপ্রেরণা দিচ্ছি। দুপুরে খাই কি খাই না। অনেক রাতে ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরে স্বপ্ন দেখি নতুন ক্রেতার অর্ডারের।
দুইদিন পরে দেখি বাংলাদেশ অ্যাম্বেসির সেই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাও নাই। ঢুঁ ঢুঁ !
এক চ্যাংড়া বয়সের ছেলে বসে আছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কে তিনি, কেন তিনি। যা উত্তর পেলাম, উনি সেই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তার দুঃসম্পর্কের ভাই, আমেরিকা থাকেন, ভাই বলেছে, তাই বসে আছেন ! তো , এই হচ্ছে আমাদের সরকারী সফরের নমুনা।
আগের প্রসঙ্গে আসি। কেন এই অর্ডারের জন্য হাহাকার আমাদের এই সময়ে।
তৃতীয়ত: বিশ্ব মন্দার ধাক্কা অস্বীকার করার কিছু নাই। এটা যে কখন কোন দেশ থেকে শুরু হয়, আর কোথায় যেয়ে শেষ হয়, সেটা আমি অর্থনীতিবিদদের উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।
আরেকটা বড় ব্যাপার বিশ্বজুড়ে নীরবে গত দুই দশকে ঘটে গেছে । সেটা হচ্ছে বিনোদনের জগতে ইন্টারনেট, স্মার্ট ফোন ও ভার্চুয়াল সেবা সারা বিশ্বকে গ্রাস করে নিয়েছে। এখন, আমাদের দেশে প্রতি বছর সরকারী হিসাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে ৭ থেকে শুরু করে ১৫ শতাংশ হারে। আর মধ্য-স্বত্বভোগী ও অতি মুনাফাখোরদের লোভে বাড়ে আরো ১০ ভাগ বা আরো বেশি। যে পণ্য আপনি ২০১৮ সালে কিনতে পারবেন ১০০ টাকায়, সেটা ২০২০ সালে এসে হয়ে যায় ১৩০ টাকা বা আরো বেশি।
হ্যাঁ, দফায় দফায় সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন সুবিধা বাড়িয়েছে সরকার বাহাদুর। সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে । বেড়েছে, প্রশাসন ও পুলিশের ক্ষমতা। থানা বেড়েছে, রাজনৈতিক চামচা বেড়েছে, স্যারের সংখ্যা বেড়েছে। শুধু বাড়েনি আমাদের আমজনতার বেতন-ভাতা ও নাগরিক সুবিধা।
ও হ্যাঁ বেড়েছে !
আমাদেরও বেড়েছে ! আমাদের ট্যাক্সের পরিমাণ বেড়েছে, আমাদের যেসব নিত্য-পণ্য ছাড়া চলেনা, সেগুলোর রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি বেড়েছে। ঢাকার মতো একটা ইতরের শহরে ট্রাফিক জ্যাম বেড়েছে।
পশ্চিমা দেশে এতোটা জুলুমবাজি নেই। আমি যে ক্রেতাকে ১০ বছর আগে হাজার চারেক ইউরোর বেতন পেতে দেখেছি, সে আজও ঐ বেতনের আশেপাশে। ১০/১৫ বছর আগে, পশ্চিমাদের বিনোদন ছিল খাওয়া দাওয়া, ঘোরাফেরা আর শপিং।
অধুনা , তাঁদের বাজেটে যোগ হয়েছে, আইফোন, স্যামসাং, আইপ্যাড, নেটফ্লিক্স, আমাজন ইত্যাদি। সুতরাং যে ক্রেতা আগে বছরে ২০টি পোশাক কিনত। সে বাজেট কমিয়ে কিনছে ১০/১২টা বা আরো কম। সে এখন চাইছে, কম দামে টেকসই পোশাক, ইদানীং যার নাম হয়েছে সাসটেইনেবল প্রোডাক্ট, গ্রীন প্রোডাক্ট ইত্যাদি । এই যে বিশ্বব্যাপী পোশাকের চাহিদা কিছুটা হলেও কমেছে, সেটার চাপ পড়েছে বাংলাদেশের মতো দেশের উপরে — যারা খুব লো কস্টে বেসিক গার্মেন্টস বানাতে পারে।
আফসোস ! বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য , নিজেদেরকে কম্পিটিটিভ করার জন্য , সম্মিলিতভাবে আমাদের আরএমজি ( রেডি মেইড গার্মেন্টস) সেক্টরের সঙ্গে জড়িত, মালিক, শ্রমিক, এজেন্ট, বিজিএমইএ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গত তিন দশকে তেমন কিছুই করেনি। চট্টগ্রাম পোর্ট, হাইওয়ে এইসবের কথা বাদই দিলাম ।
এদিকে মালিকদের এক শ্রেণি বুঝে না বুঝে তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছেন। সেই বাড়তি ক্যাপাসিটি এখন তাঁদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধছে। আরেক শ্রেণি ব্যাংকের টাকা হাপিশ করে কানাডা আমেরিকায় কেটে পড়েছে। ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার কোটি ঋণ অনাদায়ী। আর অনাদায়ী ঋণের মধ্যে শুধু টেক্সটাইল-গার্মেন্টস সেক্টরে অনাদায়ী আছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বোঝেন অবস্থা !
সম্ভবত: ৮৪/৮৫ সালে শোনা। জনৈক ঈশ্বর অবিশ্বাসী নাস্তিক পশ্চিমা ভদ্রলোক ঢাকায় এসেছেন । মাস খানেক থেকে তিনি নাকি বিশ্বাসী হয়ে গেলেন। ‘কেন ভাই? কেন ভাই ?’ তো তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বললেন, ঢাকায় একমাস কাটানোর সময় তিনি বিভ্রান্তিতে ছিলেন, কীভাবে এই ঢাকার শহর চলছে, মানে কে চালাচ্ছে ! কোন নিয়মনীতি নাই। না আছে সরকার , না আছে অন্য কিছু ! তাই তিনি অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে , অবশ্যই ঈশ্বর আছেন। একমাত্র ঈশ্বরই এই দেশকে চালাচ্ছেন। সুতরাং তিনি নাস্তিকতা ত্যাগ করে ধর্মের পথে চলে এসেছিলেন। তো ৮৫ সাল থেকে ২০২০ , ৩৫ বছরে তেমন কিছুর পরিবর্তন হয় নাই। গতকাল, অফিসের হ্যাপা সামলে, সন্ধ্যা ছয়টায় উত্তরা থেকে মিরপুরের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বিশ্বরোডে এসে দেড় ঘণ্টা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে বসে থেকে, সোয়া আটটায় বাসায় ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ঢুকলাম।
এমন একটা দেশে থাকি, যেখানে বেশিরভাগ কাজ হয় আল্লাহর ওয়াস্তে।
আপনার যদি পশ্চিমাদেশে ঈশ্বর অবিশ্বাসী কোন বন্ধুবান্ধব থাকে , তাঁকে ঢাকা শহরে মাস-খানেক থাকতে বলেন। সর্বময় ঈশ্বরের উপরে তাঁর ভরসা না এসে উপায় থাকবে না।
প্রকাশকালঃ ১৫ই জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
আপনি থেকে তুমি আর তুমি থেকে তুই সম্বোধনে আসতে কিছুটা সময় লাগে আমার।
আমাদের মিরপুরের মহল্লায় ৮৬ ব্যাচের সবাইকে ভাই বলতাম। ৮৭ ব্যাচের একজন ছিল, সে আমাদের সঙ্গেই চলত, সুতরাং তুমি। আর ৮৮, ৮৯, ৯০ আর ৯১ ব্যাচে আপনি সম্বোধনের বালাই ছিল না। কেউ কাউকে তুমি বলেছে তো আরেকজন বলেছে তুই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রেগুলার ব্যাচে কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হয়ে দেখলাম, ৮৯ ব্যাচের অনেকে আছে। সেটা তাঁদের সমস্যা, ইয়ার লস তো আমি দিই নাই। তাই রেগুলার ব্যাচের সঙ্গে সঙ্গে ৮৯ ব্যাচের সবাইকে তুমি, তুই বলে চালিয়েছি।
একই সমস্যায় পড়লাম আমি যখন ইয়ার লস দিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলাম ৯১ ব্যাচের সঙ্গে !এক ব্যাচ জুনিয়র ছেলেরা তুই তোকারি করত ! হা হা হা ! অবশ্য, আশার কথা ক্লাস শুরু হওয়ার পরে দেখা গেল আমাদের সঙ্গে রেগুলার ব্যাচের ছেলেদের চেয়ে ‘ধরা খাওয়া’ ব্যাচ বেশি। সুতরাং আমাদের তুই তোকারি নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হল না।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে, দুই কিশোরীকে পেলাম , ওদেরকে তুমি থেকে তুই বলতে বছর-খানেক লাগল।
এই যে জড়তা সেটা কিন্তু অনেকের নাই। শুধুমাত্র প্রথম পরিচয়ে আরেক ব্যাচ মেটকে তুই বলার মতো স্মার্টনেস আমার নেই। মাস খানেক আগেও ৯০ ব্যাচের এক সেনাকর্মকর্তা বন্ধুর বাসায় ঘরোয়া আড্ডা। সে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর লং কোর্সের আরেক উচ্চপদস্থ বন্ধুর সঙ্গে।এদের একজন ৯০ ব্যাচের আরেকজন ৮৯ ব্যাচের। দুইজনকেই আপনি বলে শুরু করে শেষে তুমি বলে বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম। হুট করে তুই-তে নেমে আসতে হলে আরও কয়েকটা আড্ডা দরকার।
কর্পোরেট চাকরিতে আছি প্রায় ২১ বছর ধরে। এমন অনেক মালিকের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে, যারা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু স্যার বা বস বলা ছাড়া তো উপায় নেই ! যদিও তিনিও ভদ্রতা রেখে জাহিদ ভাই বা আপনি করেই বলেছে।
আবার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করছি, স্বভাবতই আপনি সম্পর্ক। কিন্তু , বছর দুয়েকের মাথায় জানা গেল, সে আমার ৯০ ব্যাচেরই। কিন্তু তখন সম্বোধনের যে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, তা আর ভাঙ্গা হয়ে ওঠেনি।
উল্টোটাও হয়েছে অনেকবার। ওপেক্স গ্রুপে কাজ করার সময়, আমাদের সহকর্মী ছিল ৮৪,৮৫,৮৬ ব্যাচের কয়েকজন। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা এমন পর্যায়ের ছিল, একে অপরকে তুই বলে চালিয়েছি। অফিসের চিপায় এক সিগারেট ভাগ করে খেয়েছি, আর দুইজনের দুই বস যে আসলেই খাঁটি বাঞ্চোত ও চুতিয়া সে ব্যাপারে একমত হয়েছি।
আমি বিয়ে করলাম ২৮ বছর বয়সে ২০০১ সালে। আমার পাশের ডিপার্টমেন্টে সঙ্গে জাহাঙ্গীর নগরের গণিত বিভাগের এক আদম কাজ করত। সম্ভবত: ও ৮৫/৮৬ ব্যাচের। ওর সঙ্গে আমার কাকা-কাকা সম্পর্ক কেন যে হয়েছিল জানি না। ও আমাকে কাকা বলত, আমিও তাই।
তো, আমার বিয়ের কথা শুনে সে বলল, খালাম্মাকে বল আমার জন্যেও একটা মেয়ে দেখতে। আমি বললাম, তুই তো বুইড়ারে। তোরে মেয়ে দেবে কে, বয়স তো ৩৬ পার হয়ে গেছে তোর ! আম্মা মেয়ে দেখতে গেলে প্রথমেই তো পাত্রের বয়স জিজ্ঞেস করবে।
সে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, খালাম্মাকে বলিস আমার ৩২ বছর চলছে !
আমি বললাম, সেটা কী করে হয় !
সে আরো সিরিয়াস ভঙ্গীতে জবাব দিল, শোন্ জাহিদ বিয়ের বাজারে পাত্রের বয়স কখনোই ৩২ পার হয় না !
টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি আর গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজে আমার সঙ্গে কাজ করেছে, আমার চেয়ে জুনিয়র কিন্তু অসাধারণ মেধাবী কয়েকজন। তাঁদের অনেকেই সত্যিকারের এন্ট্রাপ্রেনার। অনেকে সঠিক সময়ে চাকরি ছেড়ে বিশাল কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। চাকরি করার সময় তাঁদের সাথে আপনি আপনি সম্পর্ক ছিল। এখনো আছে। শুধুমাত্র আমার এসএসসি পাশের সাল তাঁর চেয়ে এগিয়ে আছে– সেই অনধিকার চর্চায় তাঁকে আমি কখনোই তুমি বলতে পারি নি। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা আপনিতেই আটকে আছে।
আবার ট্রেডিং অফিসে এখনো আমার কয়েকজন সহকর্মী আছেন, যারা ৮২ থেকে ৮৬ ব্যাচের। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠিতে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে নানা কারণে আমি তাঁদের উপরে চলে এসেছি। আমি ‘ অমুক সাহেব’ বা শুধু ‘অমুক’ বলে ডাকলেও –তাঁরা দূরত্ব বজায় রেখে আমাকে ‘জাহিদ ভাই’ বলেছে এবং বলছে। আমি এভাবেই অভ্যস্ত। হুট করে শুধু বয়স বা ব্যাচের অজুহাতে কাউকে তুমি বলা আমার হয়ে ওঠেনি। হোক সে আমার ব্যাচের অথবা নিচের।
উল্লেখ্য, একবছর জলাঞ্জলি দিয়ে যখন ৯১ ব্যাচের সঙ্গে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, আমার নিজের ব্যাচের ঢাকা কলেজের অথবা পূর্ব পরিচিত ৯০ ব্যাচের সবাইকে তুই তোকারি করেছি ঠিকই । কিন্তু রেগুলার ব্যাচের কারো কারো সঙ্গে তো দূরত্ব ছিলই; তাঁদেরকে ভাই , আপনি বলে চালাতে হয়েছে। যদিও রেগুলার ব্যাচের একজন এই গ্রুপে আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, জাহিদ আর আপনি বলতে হবে না, তুমি বইল !
এতো গেল পুরুষ মহলের কাহিনী। নারীমহলে আমার অবস্থা আরো শোচনীয়!
আমার দশ বছরের জুনিয়র যে ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় আছে, তাঁকে আপনি বলতে আমার কখনোই বাঁধেনি। কয়েকজন লেখক লেখিকা আছেন, দারুণ তাঁদের লেখা। জানি তাঁরা বয়সে আমার ছোট বা সমবয়সী। কিন্তু সেই অজুহাতে আমি তাঁদেরকে কখনোই তুই দূরে থাক, তুমিও বলিনি।
অন্যদিকে অনেক ধনকুবের বয়স্ক গার্মেন্টস মালিক আছেন যারা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর, জিএম সবাইকে তুমি বলে অভ্যস্ত ; তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ইচ্ছে করেই অন্য অফিসের কর্মকর্তাদের তুমি বলে একটা ডমিনেটিং অ্যাডভান্টেজ নিতে চান। আমি তাঁদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে চলেছি। আমার চেয়ে বয়সে ও পজিশনে বড় কেউ যদি আমাকে তুমি বলে ভাল বোধ করেন, করুক না , আমি সমস্যা দেখি না। বরং তাঁদের এই তুমি বলার অ্যাডভান্টেজ আমিও নিয়েছি। বড় কোন সমস্যায় সিনিয়র ভাইয়ের কাছে যেমন করে আবদার করা যায়, আমিও আবদার করে আমার কাজ উদ্ধার করেছি। তবে, আমার চেয়ে বয়সে ছোট কেউ এখন পর্যন্ত আমাকে হুট করে তুমি বা তুই তোকারি করেনি এই যা রক্ষে !
৯০ ব্যাচের একটা ‘সমগ্র বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে। আমাকেও কেউ সংযুক্ত করেছে । আগের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সাথে নানা জেলার অনেক বন্ধু-বান্ধবীর সম্মিলন। সদ্য পাওয়া বন্ধু ও বান্ধবীদের কাছে আমার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করলাম।
এই আপনি , তুমি , তুই ব্যালেন্স করে করেই পেশাগত ও সামাজিক জীবনে আমার তিন দশক চলে গেছে । আমার মতো কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে, যে হুট করে তুমি বা তুইতে নামতে পারে না। কিছুটা প্রাচীনপন্থী । আবার আধুনিক ও আধুনিকারাও আছে, যারা অনেক স্বচ্ছন্দ– সম্পর্কের এই গভীরতা বৃদ্ধিতে। যাই হোক, আমার মতের সঙ্গে হয়তো কেউ একমত পোষণ করবে, অনেকেই করবে না ; সেটাও আমি জানি।
সবার জন্য শুভকামনা !
প্রকাশকালঃ ৩রা জানুয়ারি, ২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য