গার্মেন্টস নিয়ে পুরনো কিন্তু প্রাসঙ্গিক লেখা

ওইদিকে আমেরিকা আর এইদিকে ইউরোপের মধ্যে জার্মানি আমাদের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক-ক্রেতা দেশ। এদের বেশ কিছু নাম করা ডিসকাউন্টার আছে যাদের দোকানের সংখ্যা দশ হাজার, বারো হাজার মায় কুড়ি-হাজার পর্যন্ত আছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে এদের দোকান। গত বছর কী মনে করে আমেরিকা ও জার্মানি দুই দেশেরই কয়েকটা ডিসকাউন্টারের বড়ো বড়ো দোকান ঘুরে দেখার সুযোগ মিললো।

প্রথমে আসি , ওয়ালমার্টের কথায়। এদের কিছু সুপার শপ আছে। এই পাশ থেকে ওই পাশ দেখা যায় না। টয়লেট পেপার থেকে শুরু করে গাড়ীর চাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। কতো সস্তায় এরা পণ্য বিক্রি করছে, উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বাইরে ৫০০ মিলির একই ব্রান্ডের এক বোতল পানি হয়তো দেড় দুই ডলার। কিন্তু , সুপারশপে আপনি যদি এক সঙ্গে ২৪ টার এক ক্রেট পানি কেনেন তবে ওইটার দাম ৫ ডলার মানে প্রতি পিস পড়ছে ২০ সেন্ট ! ক্যাম্নে কী !

এইবার আসেন জার্মানিতে, বাইরে এক বোতল ওয়াইনের দাম ১৫ ইউরো। কিন্তু, সুপার শপে ৬টা এক সাথে কিনলে, ৪০ ইউরো।

দেখলাম , একটা গ্যাস লাইটারের বাইরে দাম ১ বা দেড় ইউরো , কিন্তু এরা ১২ টা একসাথে বিক্রি করছে ১.৭৫ ইউরোতে মানে একটার দাম ১৫ সেন্টের কাছাকাছি !একটা গ্যাস লাইটারের উৎপাদন খরচ চীনে কতো হতে পারে, আর জার্মানি পর্যন্ত এনে কেমন করে এই দামে বিক্রি করছে, সেটা বড়ো কোন গবেষণার বিষয় না। আপনি নিজেই হিসাব করতে পারবেন। ধরেন ওই গ্যাস লাইটার চীন থেকে ৫০০০ পিস কিনলে আপনি যে দামে পেতেন, তার এক দশমাংশ দামে পাবেন , যদি আপনি পাঁচকোটি গ্যাস লাইটার কেনেন একসাথে । সেক্ষেত্রে একটি গ্যাস লাইটারের দাম ৩ বা ৪ সেন্ট করে পড়বে!
এই ডিসকাউন্টারগুলো, They are simply killing and spoiling the market !

মাঝে মাঝেই গার্মেন্টস মালিকদের সাথে কথা হয়। অনেকেই বিকল্প কোন সেক্টরের কথা চিন্তা করতে বলেন বা জিজ্ঞাসা করেন , অন্যকোন ব্যবসা ক্ষেত্র আছে কীনা । ৯০ এর দশকের কোটা(Quota) কেনাবেচার আমলে গার্মেন্টসের ব্যবসায় রমরমা লাভ ছিল, আজকের বড়ো বড়ো সব গ্রুপগুলো কোটার ব্যবসা করে শত শত লাইনের আর ডজন ডজন বিল্ডিং এর মালিক। দুই টাকা যদি সিএম( কাটিং মেকিং কস্ট ) থাকতো, কোটা থেকে পেতেন কুড়ি টাকা। যারা সেই আমলের গার্মেন্টস ব্যবসা করেছেন তারা জানেন কী পরিমাণ লাভ তারা করেছে। কিন্তু পরের যুগের গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা যে কত রকম সীমাবদ্ধতার মাঝখান দিয়ে এই সেক্টরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা আমরা কাছ থেকে অনেকেই দেখছি।

আমাদের আসলেই একটা বিকল্প ক্ষেত্র দরকার!

এই একরৈখিক একমাত্রিক পরনির্ভরতা আমাদেরকে নীচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা ক্রেতারা জানে, এই তৈরি পোশাক খাতে যারা বড়ো বড়ো বিনিয়োগ করে বসে আছেন তাঁদের অর্ডার দরকার। অনেকে শুধুমাত্র পেটেভাতে দাম মিললেও অর্ডার নিয়ে নেন। এইটাকে আমরা বলি ব্রেক ইভেন কস্ট-এ অর্ডার নেওয়া । ফ্লোর বসিয়ে রাখলে যে ক্ষতি , সস্তার অর্ডার নিয়ে ফ্লোর চালালে অন্তত আর্থিক ক্ষতিটা এড়ানো যায়। এ এক দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন তারা। আবার নতুন উদ্যোক্তারা। ১৮% সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে, সস্তার কাজ নিয়ে ন্যূনতম লাভ তুলতে পারছেন না।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, যারা ফ্যাশন ক্রেতা তারাও হুমকির মুখে আছে কিছু ডিসকাউন্টারের অতি মূল্যহ্রাসের দুষ্টচক্রে। যে ফ্যাশন ক্রেতা, সে হয়তো ৫০০০ টি-শার্ট নিবে। সে ২.৫০ বা ৩ ডলার FOB দিয়ে কিনে ৯ ইউরোতে বিক্রি করবে। তাঁদের প্রাথমিক লভ্যাংশ ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ থাকে। পরে সেল ও অফ সিজন ধরে দোকান খরচ দিয়ে পুষিয়ে যায় ।

কিন্তু, ডিসকাউন্টাররাও ওই একই টি- শার্ট ৫ লক্ষ পিস নিবে। সে কিনতে চাবে , ১.৫০ ডলারে। এখন সে যদি চায় কম লাভে ওই টি-শার্ট রিটেল মার্কেটে বিক্রি করবে, ইচ্ছা করলেই সে দেড় থেকে দুই ইউরোতে বিক্রি করতে পারবে ওইটা । সে কোন মার্ক-আপ রাখবে না। বড়ো বড়ো গ্রসারি ডিসকাউন্টার Wal-Mart, Primark, LIDL, TCHIBO, TESCO, ALDI এদের প্রধান পণ্য কিন্তু পোশাক নয়, এরা মূলত: গৃহস্থালি , শাক-সবজী, খাদ্যদ্রব্য, পানীয়ের ফাঁকে হাজার হাজার দোকানে সস্তার টি-শার্ট বা অন্য পোশাক বিক্রি করছে নামমাত্র মূল্যে। এদের সাথে তাল মিলিয়ে INDITEX, H&M এর মতো বড়ো চেইন রিটেইল গুলোও ক্রেতা আকর্ষণ করতে ডলারে কিনে সমমূল্যের ইউরোতে পোশাক বিক্রি করছে। মানে, ২ ডলারে টি-শার্ট কিনে , ২ ইউরোতে বিক্রি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করছে।

মাঝখানে বিপদে পড়ে গেছে ওই মাঝারি মাপের ফ্যাশন রিটেলগুলো, যারা অনেক ডিজাইনার রেখে , অনেক গবেষণা করে একটা টি শার্ট ৯ ইউরোতে বিক্রি করতে চায়। দরিদ্র হিস্পানিক ও এশিয়ান ইমিগ্রান্টরা হন্যে হয়ে Wal-Mart, K-Mart, TESCO, PRIMARK এ ছুটে যাচ্ছে। মাঝখানে Wal-Mart এর Everyday Low Price থিওরির চক্করে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারীদের।

আর সাদা চামড়ার ওই সব খুচরা ক্রেতাদের কথা বলছেন ? তারা সোফায় বসে টিভিতে বাংলাদেশের তাজরীন বা রানা প্লাজার কথা শুনে একটু হু হা করবে হয়তো। কিন্তু পরের দিন ভোরে উঠেই ছুটবে সেই সস্তার দোকানেই ! এদের ভণ্ডামির কথা না হয় আরেকদিন বলবো।

প্রকাশকালঃ ১লা মে,২০২০

করোনার দিনলিপি ২

গত কয়েক দশকের মহামারী- সার্স, বার্ড ফ্লু, মার্স, জিকা, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু সব ভাইরাসেই মৃত্যু আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এইবার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মৃত্যুশঙ্কার চেয়েও বড় আতঙ্ক বোধকরি সামাজিক সন্মান ।

ইংল্যান্ডের প্রিন্স চার্লসের হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের হয়েছে, হলিউডের অস্কার জয়ী টম হ্যাঙ্কসের হয়েছে। আমাদের মিডিয়া সেটা ফলাও করে প্রচারও করেছে। বাংলাদেশের কারো হলে তাঁর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে সেতো পাগলেও বোঝে। সেই অর্থে সে যে অচ্ছুৎ সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের এতো সামাজিক গোপনীয়তার কারণ কী হতে পারে ! কুশিক্ষা আর অমানবিকতা !

কোভিড ১৯ কারো হলে মনে হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি বোধহয় খুব জঘন্য কিছু করে এই রোগ বাঁধিয়েছে !
নব্বইয়ের দশকে আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজে সমকামী ও পতিতাগামী এইডস রোগীদের যেভাবে দেখা হতো , কোভিড ১৯ রোগীদের সেইভাবে দেখা হচ্ছে। এই সামাজিক অবমাননার কারণে অনেকে চেপে থাকতে চাচ্ছেন রোগটিকে । মহল্লায় মহল্লায় গুজব আর বাঁশ নামিয়ে লকডাউনের ছড়াছড়ি হচ্ছে।

ব্যতিক্রম যে নেই তা না ; উচ্চশিক্ষিত যাঁদের হয়েছে, সুস্থ হচ্ছেন, যেমন বিএসএমএমইউ এর সাবেক উপ-উপাচার্যের করোনা থেকে রোগমুক্তির কথা টিভিতে দেখলাম। এই ডাক্তার ভদ্রলোক ও তাঁর কন্যা জানেন, এটা তাঁদের সামাজিক সন্মানের সঙ্গে জড়িত কিছু নয় মোটেও।
অথচ এই অতিমিডিয়ার যুগে করোনা ভাইরাস একজন আক্রান্তের যা কিছু অর্জন সেটা ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে, । কেউ আক্রান্ত হয়েছেন এটা তার চেয়েও তার পরিবারের জন্য বেশি বিড়ম্বনার, আতঙ্কের ও যন্ত্রণার মনে হচ্ছে।

প্রকাশকালঃ ২৬শে এপ্রিল,২০২০

করোনার দিনলিপি ১

ফোন করে কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি।

কেমন আছি?

দিনগুলো কাটছে হাসপাতালের ডিউটির মতো।

জীবনে কয়েকবার প্রিয়জনের জন্য হাসপাতালে ডিউটি দিতে হয়েছে। মূলত: তেমন কিছু করার থাকে না ;ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরের বারান্দায়, বেঞ্চে, চেয়ারে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত গভীর হতে থাকে। মানুষের আনাগোনা কমে । সিনিয়র ডাক্তাররা চলে যায়, ডিউটি ডাক্তার যাওয়া আসা করে । হাসপাতালের ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধ নানা ওষুধের সঙ্গে মিশে কেমন দমবন্ধ একটা গন্ধ তৈরি করে। সেই গন্ধে আমি ঠিক বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না। দূরের আবছায়া আলো-অন্ধকারে গাছগুলো মাথা দুলিয়ে চলে। করিডোরের মৃদু আলো। হয়তো মশা থাকে , ভ্যাপসা গরম থাকে । সবকিছুর উপরে থাকে একটা অনিশ্চিত অস্বস্তি। যে অস্বস্তি আমাকে ভাবায় -আবার কী স্বাভাবিক দিন ফিরে আসবে! যে প্রিয়জন শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায় তাঁকে নিয়ে কবে ফিরতে পারব বাসায়। কবে?

সামান্য কিছুতেই বিরক্তি চলে আসে। দারোয়ান ব্যাটা ঝিমায় কেন, ওকে টাকা দিয়ে রেখেছেই বা কেন? অন্য রোগীর অ্যাটেন্ডেন্ট এতো উচ্চস্বরে কথা বলে কেন ? নার্সটা এতো বেঢপ কেন? কাউকে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে কাছে আসে না কেন? আমার প্রিয়জন কেমন আছে, জিজ্ঞেস করার কাউকে খুঁজে পাই না কেন? হাসপাতালে সামান্য নিয়ম কানুনও নেই কেন? কর্তৃপক্ষ এতো উদাসীন আর দায়িত্বজ্ঞানহীন ! নানা ধরণের অর্থহীন অভিযোগ আর অপ্রয়োজনীয়তায় খচখচ করে।

সারারাত হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা মানে তো জাগতিক সব প্রয়োজনীয়তার বাইরে কর্মহীন থাকা। কিন্তু সেই কর্মহীনতা আমাকে আরো বেশি করে শুষ্ক করে, ক্লান্ত করে, অবসন্ন করে। মনে হয় আমি একটা বিস্তৃত জীবনহীনতার ভেতরে আছি। জানি , আমার আরো অনেক প্রিয়মুখ আছে, কিন্তু আমার তো ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে। সময় বয়ে চলে, একেক মিনিট মনে হয় একেক দুঃসহ ঘণ্টার মতো। আমি না পারি কিছু খেতে , না পারি ঘুমাতে। একটা ক্ষীণ জৈবিক দুরাশা , হয়তো একসময় বাসায় যেতে পারব, গোসল করে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারব। কিন্তু আমার হৃদয়ের অংশ আমার সবচেয়ে প্রিয়জনদের কেউ শুয়ে আছে ঐ দূরের বিছানায় ; জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আর আমি কীনা ভাবছি দুটো ভালো খাওয়ার , একটু ঘুমের ! কেমন একটা অপরাধ বোধ আচ্ছন্ন করে আমাকে । তবুও নিজের বিছানার জন্য মনটা আকুল হয়।

ভোর হয় না। কিন্তু মনে হয় , অন্য আলোর আবছায়া দেখা যায় হাসপাতালের জানালায়। পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যায় কী ! আমি বসে থাকি একা ,নতুন ভোরের অপেক্ষায় !

প্রকাশকালঃ ১৯শে এপ্রিল,২০২০

কর্পোরেট ও করোনা সমাচার

আমাদের কর্পোরেট জগতে একটা অলিখিত নিয়ম আছে।
প্রতিষ্ঠানে কোন সুযোগ-সুবিধা চালু করার আগে অনেকবার চিন্তা করা হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়, কোন না কোনভাবে যদি সেই সুবিধা না দিয়েই চালিয়ে নেওয়ার।

আসলে কোন একটা বিশেষ সুবিধা না থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে হয়তো সমালোচনা করবে ; সেটা তেমন কোন ব্যাপার না। কিন্তু কোন সুবিধা যদি একবার পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করা হয় , তখন সেটা সবাই মৌলিক অধিকার ও চিরস্থায়ী ভেবে বসে থাকে। হোক সেটা প্রফিট বোনাস, ইনসেন্টিভ, অল্টারনেটিভ হলিডে বা অন্য যে কোন ধরণের প্রণোদনা। একবার চালু করা সুবিধা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করতে গেলে ব্যাপক মনমালিন্য ও হয়রানি হয়।

কয়েক শতক ধরে সারা পৃথিবীতে সকলেরই কমবেশি ছুটি ছিল। ছিল না শুধু পৃথিবীর নিজের ! গত কয়েকমাস কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী নিজেই যেন কিছুদিনের ছুটি পেয়েছে। একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে।

মুশকিল হচ্ছে, হঠাৎ পাওয়া এই ছুটির ব্যাপারটা পৃথিবী যদি নিজের মৌলিক অধিকার ও চিরস্থায়ী ভেবে বসে তাহলে তো প্রতিবছর বা কয়েকবছর পরপর এই ছুটি চলতেই থাকবে !

প্রকাশকালঃ ১৬ই এপ্রিল, ২০২০

কোভিড কিংবা ছিনতাইয়ের কাহিনী

টেক্সটাইলের চাকরি ছেড়ে সদ্য গার্মেন্টসের মার্চেন্ডাইজিং-এ ঢুকেছি। ওপেক্স গ্রুপে। মিরপুর ১১ নাম্বারের বাসা থেকে কোনভাবে ১০ নং গোলচত্বরে পৌঁছে সহজলভ্য যানবাহন ছিল শেয়ারের সিএনজিতে সৈনিক ক্লাবে নামা । পাশেই মহাখালী ডিওএইচএসের ২৮ নাম্বার রোডে ছিল ওপেক্স-এর হেড অফিস।

৯৯ সালের কথা বলছি ; সন্ধ্যা হোক, রাত হোক বাসায় ফিরে আসার সময়টাতেও সেই একই উপায়। মিরপুর ১৪ নাম্বার থেকে মিরপুর ১০নং গোলচত্বরের রাস্তা সারাটা দিন বেশ ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর ঐ রাস্তার স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে কেমন যেন থমথমে হয়ে যেত। কোন বড় বাস ঐ রাস্তায় চলত না। রিকশা, সিএনজি আর মাঝে মাঝে কিছু প্রাইভেট কার।

আমার জন্ম ঢাকায়, বেড়ে ওঠাও । মহল্লায় পাশের রোডে আওয়ামীলীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতা থাকে। দুই রোড পরে থাকে ঢাকার সেই সময়ের বিখ্যাত ছাত্রনেতা। বড়ভাইয়ের বন্ধুরা কেউ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা, তো কেউ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। অনেকের সঙ্গে চেহারায় পরিচয়। ‘এই তুমি সাজুর ভাই না ?’ ‘এই তুমি উকিল সাহেবের ছেলে না?’ ছোটখাটো মস্তানি, ছিনতাই এগুলোকে আমি ও আমাদের প্রজন্মের কেউ গোনায় ধরতাম না। আমাদের গায়ে ঢাকার শহরের কেউ টোকা দিয়ে পার পেয়ে যাবে, এটা ভাবতেই পারতাম না।তখন, সবে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়ে উঠছে। বেতন পেতাম ৮,৭০০ টাকা ; একমাসের বেতনের টাকা দিয়ে নকিয়া ৩১১০ সেট কিনলাম, সঙ্গে গ্রামীণ ফোনের প্রিপেইড কানেকশন। উফ ! সেই ৬ টাকা প্রতি মিনিট কলরেটের যুগ ; ভ্যাট সহ ৬টাকা ৯০ পয়সা ! ফোন হয়ে গেল জীবনের চেয়েও প্রিয়। বারবার প্যান্টের সঙ্গে মুছি, আর পকেটে ঢুকিয়ে রাখি। দিনে তিনবার করে রিং টোন চেঞ্জ করি। সারাদিনে পিএম, কিউসি আর কিউসি ম্যানেজারদের ফোন আসে । হবু স্ত্রীর সঙ্গে সপ্তাহে একবার কথা হয় কী হয় না।

তো ঐ সময়ে একদিন সন্ধ্যায় সৈনিক ক্লাবের কাছে এসে শেয়ারের সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছি। সন্ধ্যার কিছুটা সময় সুপার পিক আওয়ার থাকে। একসঙ্গে এতো লোক কোথা থেকে এসে যে হাজির হয় ! একটা বাহন মোড় ঘুরতে না ঘুরতেই সেকেন্ডের দশভাগের একভাগ সময়ে সেটা ভরে যায়। হুস করে সেটা চলে যাওয়ার পরে অপেক্ষা। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে হাঁটা ধরে, কচুক্ষেতের মোড় থেকে রিকশা নেওয়ার চিন্তা করে। ফিরতি যাত্রীরা কোনমতে একটা পা বাইরে রাখতে না রাখতেই, দুই পাশ দিয়ে অন্য যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়ছে।

আমি মিনিট দশেক অপেক্ষা করে একটা ফাঁকা সিএনজি আসতে না আসতেই দৌড় দিয়ে উঠে পড়লাম। দুইপাশ থেকে কাঁধে ব্যাগসহ আরো দুই অফিস যাত্রী উঠে পড়ল। ড্রাইভারের পাশে আরেকজন । ক্যান্টনমেন্ট পার হয়ে , ১৪ নম্বরের মোড় পার হতেই দুইপাশ থেকে দুই আরোহীর চাপ অনুভব করলাম। বাঁ পাশের জন আমার কোমরে লোহার রড বা পিস্তলের মতো কিছু একটা দিয়ে খোঁচা দিয়ে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কোথায় আছেন?’ এদিক সিএনজি চলছে এখনকার পুলিশ কোয়ার্টার, পার হয়ে সামনের ন্যাম বিল্ডিং এর পাশে এসে পৌঁছেছি। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বুঝে ফেলেছে আমি ছিনতাইকারীর পাল্লায় পড়েছি। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, আমাকে ! শেষ পর্যন্ত আমাকে ছিনতাইকারী ধরল ! তাও আমার নিজের এলাকা মিরপুরে, যেখানকার অলিগলি তস্যগলি আমার চেনা! আমি সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বললাম , ‘গার্মেন্টসে কাজ করি। ওপেক্স কারখানার ফ্লোরে।’

কথা বলতে বলতেই , ডানপাশের লোকটা একটা ক্ষুর বের করে আমার গলায় ধরল। ঐ রাস্তায় স্ট্রীটলাইট ছিল না। নির্মাণাধীন বিল্ডিংগুলোর ঝাপসা আলোতে ক্ষুরটা আরো চকচক করছিল। বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমরা কারা।’ পুরো সময়টাতে আমার দুই হাত তাঁদের পিঠ দিয়ে চেপে ধরে আমার মানিব্যাগ বের করে টাকা গুণে ফেলল । আর অন্য পকেট থেকে আমার সেই সখের নকিয়া মোবাইল বের করে জিজ্ঞেস করল, ‘মোবাইল কার ?’ আমি কী মনে করে বললাম ‘কারখানার মোবাইল, আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছে।’ আমি সবচেয়ে ভয় পাচ্ছিলাম যদি মোবাইলটা নিয়ে নেয়। এতো শখের মোবাইল আমার ! কিন্তু আশ্চর্য ! ছিনতাইকারীরা মোবাইলটা শার্টের বুক পকেটে ঢুকিয়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিল।

এবং ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার চোখে মলম বা জামবাক কিছু একটা ঘষে দিল। বলল ‘পিছনে তাকাবেন না।’ আমি নীচে হুমড়ি খেতে খেতে টাল সামলালাম কোনমতে। চোখে তীব্র জ্বালা-পোড়া । রাস্তা কোনদিকে, ফুটপাত কোনদিকে ঠাহর করতে পারছিলাম না। ভয়ংকর যন্ত্রণা । একটু দুরেই রাড্ডা বারনেন হাসপাতালের পাশের মুদিদোকান থেকে দুজন কাছে এসেই বুঝল কি হয়েছে। মনে হলো এরা প্রায়ই এসব দেখে অভ্যস্ত। একজন দয়া করে পানি এনে দিল, পানির ছিটা দিতে দিতে, কিছুটা চোখ খুলেই ভাইয়াকে ফোন দিলাম। বললাম ‘ছিনতাই হয়েছে । বেশী টাকা ছিল না , ৩১৫ টাকার মতো ছিল, ৭টাকা ফেরত দিয়ে রেখে বাকী টাকা নিয়ে গেছে।’ বাসায় গেলাম না, মহল্লার আড্ডায় গেলাম।

মহল্লার বন্ধুরা আমাকে শুকরিয়া করতে বলল। কারণ আমার যে গাঁট্টাগোট্টা স্বাস্থ্য, আমার মত লোকেরা নাকি প্রায়ই গাঁইগুঁই করে, প্রতিহত করতে যায় ছিনতাইকারীদের এবং ছিনতাইকারীরাও তাদেরকে ধাওয়া করতে যাতে না পারে সেজন্য এই টাইপের লোকেদের হালকা(!) পাঁড় মেরে যায়। গত কয়েক সপ্তাহে হাসপাতালে এরকম হালকা পাঁড় দেওয়া যাত্রীদের কয়েকজনের অকালপ্রয়াণও ঘটেছে। আমাকে যে শুধু মলম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে সে আমার কপাল। বড়ভাইদের দিয়ে থানা পুলিশ করলে কী কী হতে পারে সেটা বিবেচনা করা হল। কারণ, ওই সময়ে ঢাকার রাস্তা ভাসমান ছিনতাইকারী ভরে গিয়েছিল। শোনা গেল ঐ রুটের ছিনতাইকারীরা কোন নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের না। এদেরকে ধরার চেষ্টা করা প্রায় দুঃসাধ্য। একই রুটে কেউ দুই তিন মাসের ভিতরে আর ফিরে আসে না। আর টাকার পরিমাণ যেহেতু সামান্য এবং আমার সাধের মোবাইল ছিনতাই হয় নি ; তাই সবার উপদেশ ছিল ছিনতাই নিয়ে থানাপুলিশ আর কেন্দ্রীয় নেতাদের না জড়ানোই ভাল।
যথারীতি রাত করে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

সারাক্ষণ শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল, আমার ছিনতাই হয়ে গেল ! আমার !!!

পুরো ব্যাপারটায় একটা সূক্ষ্ণ অপমান ছিল, মনে হচ্ছিল কেউ আমাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে, যা আমি কোনভাবেই নিতে পারছিলাম না। রাতের খাবার ভালোমতো খেতে পারলাম না। কয়েকদিন কেমন যেন একটা অপমানের আবরণ আমাকে ছেয়ে থাকল। এর ফাঁকে আমি মনে মনে অনেক ধরণের চিন্তা করতাম ; সৈনিক ক্লাবে দাঁড়িয়ে ঐ দুই ছিনতাইকারীকে খুঁজতাম। ব্যাপারটা ভুলে যেতে প্রায় ছয়মাস লাগল।আমার সারাজীবনে ছিনতাই, হাইজ্যাক একবারই হয়েছে! ওই প্রথম, ওই শেষ !

প্রতিদিন করোনা ভাইরাসের ক্লিপ আর সাবধানবানী দেখতে দেখতে আজকে বহুবছর আগের ছিনতাইয়ের কথা কেন মনে পড়ল, বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

আসলে কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা নিজের জীবনেও যে ঘটতে পারে ; সেটা আমাদের কল্পনাতেও থাকে না। ঘটে গেলে, গভীর শোকে, দুঃখে, বেদনায় ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। মিডিয়াতে প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত আর মৃত্যু-সংখ্যা আমাদের অনিশ্চিত, আতঙ্কিত করছে ; কিন্তু মনের গভীরে একটা আশা — অন্যের হলে হবে , আমার কী আর হবে ! আমার প্রিয়জন আর আমি এ যাত্রায় সুস্থই থাকব। এই আশাবাদ একদিক দিয়ে মন্দ না ! আবার অন্যদিক দিয়ে এই অর্থহীন আশাবাদ , অসাবধানতাতে কেউ যদি জীবনে প্রথমবারের মতো কোভিড-19 আক্রান্ত হয়েই যায় ; সেটাও তো তার জন্য শেষবারের মতো হতে পারে ! ছিনতাইকারীর স্মৃতিচারণ করতে পারছি ; অবহেলা, অসাবধানতায় কোন কাহিনী হয়ে গেলে –ফিরে আসার সুযোগ নাও তো থাকতে পারে!

প্রকাশকালঃ ২রা এপ্রিল,২০২০

এখন বাঁচুন। পূর্ববঙ্গ

যথারীতি আমাদের পূর্ববঙ্গের আশির দশকের রিয়েল লাইফ অভিজ্ঞতা। এলাকার সিনিয়রের কাছে শোনা।
তো হয়েছে কী, তাদের গ্রামে একজন মোটামুটি সম্পন্ন গৃহস্থ মারা গেলেন হুট করে ; উঠতি বয়সের সন্তানসন্ততিদের রেখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম লোকের অকালমৃত্যু হলে কী হয় সেটা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার আছে।

গ্রাম- মফস্বলে প্রথম কিছুদিন প্রতিবেশীদের আহা উঁহু থাকে। ধীরে ধীরে সবাই যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মৃতের পরিবারে কীভাবে চলছে, কী খেয়ে বেঁচে আছে সেটা দেখার সময় থাকে না সঙ্গত কারণেই।
চারিদিক আঁধার হয়ে এলে ভিটে-বাড়ি বাদে অন্যসব জমি বিক্রি করে পড়াশোনা আর জীবনধারণের প্রাণান্ত চলে।

যথারীতি ঐ পরিবারের বড়ছেলেটি যে কিনা আমার পরিচিতের প্রতিবেশী সেও বাধ্য হয়ে টুকটাক করে বাপের কষ্টের করা জমি বিক্রি করা শুরু করল। প্রতিবেশী মুরব্বীরা ব্যাপারটা তেমন পছন্দ করছিল না। এভাবে জমি বিক্রি করে খেলে আর কতদিন। এক সময় তো হাত পাততে হবে। আবার করারও কিছু ছিল না।
যাই হোক একদিন নদীর ঘাটে কয়েকজন মুরব্বী তাকে ধরল।

‘বাপু হে ! তুমি যেভাবে জমি বিক্রি করে খাতিছ, এভাবে চললি বুড়া হলি কী খায়া থাকবা ?’
সে উত্তর দিল, ‘ কাকা, এখুন আগে আমার খায়া জানে বাঁচতি হবি। খাতি পারলি না তবে বুড়া হতি পারব ; না খাতি পারে মরেই যদি গেলাম ; তালি পর আর বুড়া হব কেম্মা করে !’

প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০২০