by Jahid | Dec 1, 2020 | দর্শন
বহুবছর আগে পড়েছিলাম। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটা গল্প সংকলনের নাম ছিল ‘মাপা হাসি চাপা কান্না’।
আজ বিকালে বসে ভাবছিলাম– শিক্ষিত বাঙালি মেপে হাসে কেন ? হাসলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে বুদ্ধি বের হয়ে যাবে বলে কী কম হাসে অথবা হাসতেই চায় না। লক্ষণীয় যে, লেখক ও মানুষ হিসাবে যারা কৌতুকপ্রিয়, হাসিখুশি, সমাজে তাদেরকে খুব একটা উঁচু চোখে দেখা হয় না। এই যেমন আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য , সিনেমা ও নাটকের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় অনানুষাঙ্গিক চরিত্রটি হচ্ছেন তিনি, যিনি ফিলার হিসাবে গল্পে টিকে আছে আছেন কোনরকমে। তিনি – যিনি নাটক, সিনেমার মাঝেসাঁঝে কৌতুক করছেন, লোক হাসাতে চাচ্ছেন, বিনোদিত করতে চাচ্ছেন।
পাশ্চাত্যে চার্লি চ্যাপলিন একজনই ছিলেন।
আমাদেরকে খুঁজে পেতে একজনের কথাই মনে পড়বে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রয়াত খান জয়নুল, আশীষ কুমার লোহ, আনিস, হাসমত, টেলিসামাদ, দিলদার ও নাম না জানা অনেকেই সারাজীবন পার্শ্বচরিত্রেই ছিলেন। প্রোটাগনিস্ট বা মূল অভিনেতা হতে পারেননি কখনো, কোন পরিচালক সেই সুযোগ করে দেননি।
চলচ্চিত্রে কেউ চরিত্রাভিনেতা হতে না পারলেও, নাটকে আশির দশকে আমজাদ হোসেন সেটা করতে পেরেছিলেন। সেই সময়ের ঈদের নাটকে ‘জব্বর আলী’ ছিলেন একজন সামাজিক টাউট, আদম-ব্যবসায়ী, মজুতদার। তাঁর নানা কীর্তিকাণ্ড ও ধরা খাওয়ায় দেখে দর্শক হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ত। জব্বর আলী নতুন কী কাণ্ড করে জেলে গিয়ে ঈদের সেমাই খাবে, সেটা দেখার জন্য প্রতি ঈদে আমরা বিটিভির সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম।
হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও সিনেমায় তাঁর জাদুকরী গল্প আর মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনার কাব্যই ছিল মূল চরিত্র। একজন শান্তশিষ্ট বোকাবোকা বাবা, খুব কড়া মেজাজের মা ; তরল কথা বলা দেবর, অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথাবার্তায় পটু কাজের লোক ; ভীরু প্রেমিক ও সাহসী প্রেমিকা নিয়ে তাঁর ঈদের নাটকগুলো ছিল অসম্ভব স্বাদু। কিছু নাটক নিখাদ আনন্দের, কিছু নাটকে প্রচ্ছন্ন সমাজ সচেতনতার মেসেজ।
হুমায়ূন আহমেদ জীবিতাবস্থায় তাঁর লেখালেখি দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকের মন জয় করতে পারলেও, সমালোচক ও সাহিত্য-বোদ্ধারা তাঁর পুরো লেখালেখিকেই হালকা করে দেখেছেন। কেউ কেউ জিজ্ঞেসও করেছেন, কেন তিনি সিরিয়াস লেখা লেখেন না।
আমি আসলে বোঝার চেষ্টা করছি, সিরিয়াস লেখা কয়জন পাঠকের কাছে যায়। কমলকুমার মজুমদার কি অধিক পঠিত? বিষ্ণু দের কবিতা কয়জন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে? শরৎচন্দ্র , মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, শিবরাম চক্রবর্তী, সুনীল , সঞ্জীব, সমরেশ, শীর্ষেন্দু জনপ্রিয় বলে কি তাঁরা সিরিয়াস সাহিত্যিক নন ? দুই-বাংলা তন্নতন্ন করে আমাদের একজনই সৈয়দ মুজতবা আলী আছেন ; যার অসম্ভব উইট সমৃদ্ধ প্রবন্ধ, উপন্যাস, সবধরনের লেখালেখি এক ফরমেটে ‘রম্যরচনা’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরস, চটুল, হালকা ভঙ্গীর লেখালেখিকে , কথা বলাকে এতো তাচ্ছিল্য কেন বাঙালির ! নাকি , ছোটবেলা থেকে “ যত হাসি তত কান্না, বলে গেছেন রাম সন্না” শুনে শুনে বড় হওয়া বাঙালি অবচেতনে ধরেই নিয়েছে, হাসি ব্যাপারটা মোটেও ভালো কিছু না, হাসি হচ্ছে কান্নার প্রারম্ভিকতা। আর তাছাড়া আমরা শৈশবে দেখেছি, মন খুলে হো হো হাসির হুল্লোড় উঠলেই , চারপাশ থেকে বিশেষ একশ্রেণীর আত্মীয়, মুরব্বী হা রে রে করে ছুটে আসত, ‘এতো হাসি কীসের ! কপালে দুঃখ আছে !’
হ্যাঁ, রে ভাই, হাসির পরে দুঃখ আছে বলে কি আমাদের মেপে মেপেই হাসতে হবে। দুঃখ তো হাসলেও আসবে ; না হেসে সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানা হয়ে থাকলেও আসবে। জীবনযাপনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা, প্রিয়জন হারানোর শোক, দুঃখ, বেদনা, নানাবিধ ব্যর্থতা, চাওয়া না পাওয়ার টানাপড়েন, শারীরিক অসুস্থতা, বার্ধক্য আর অবশেষে অনিবার্য মৃত্যু তো আপনার হাসির তোয়াক্কা করে না। তবু, কেন এতো চাপা কান্না, বেদনার উদযাপন, শোকের উদযাপন ! বাঙালি মনুষ্যের আকাশে সারাক্ষণ চাপাকান্নার মেঘলা আবহাওয়াই থাকবে কেন ! গম্ভীর হয়ে, সিরিয়াস হয়েও নিয়তিকে কী কেউ এড়াতে পেরেছে ! পারেনি ; পারবেও না।
বাঙালির জীবনে হাসির সূর্যালোক দূর করুক সব অপ্রাপ্তির , বেদনার কালো মেঘ।
হে বাঙালি ! হাসতে হাসতেই না হয়, নিয়তির সঙ্গে লড়াই করা শিখুন !
প্রকাশকালঃ ২৮শে অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Dec 1, 2020 | দর্শন, সাম্প্রতিক
আরব্য রজনীর জেলে ও সুলাইমান বাদশাহের বোতলবন্দি জিনের গল্প সেই কবে শোনা।
ঘটনার বিশদ কিছুটা মনে ছিল। জেলের বিস্ময় ছিল, যে জিন দেড় হাজার বছর অভিশপ্ত নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে বন্দী ছিল তাকে উদ্ধার করার পর উদ্ধারকারীকেই সে কেন হত্যা করতে চাইল। অকৃতজ্ঞতারও তো একটা সীমা থাকে ! সত্যি বলতে কী, জিনের ক্ষোভ নিয়ে ছোটবেলায় আমার নিজেরও বিস্ময় ছিল।
কাহিনীতে জিন বলে, নবী সুলাইমানের বিরুদ্ধাচরণ করায় তাকে বোতলে বন্দী করে মাঝ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। উদ্ধাররহিত সেই দীর্ঘ একাকীত্বে জিন প্রতিজ্ঞা করে, যে তাকে মুক্ত করবে তাকে সে অগাধ সম্পদের মালিক করে দেবে। দিন যায় , মাস যায়, বছর যায় ; এভাবে একশ বছর চলে যায়, কেউ উদ্ধার করে না। সে আবার প্রতিজ্ঞা করে এবার যে তাকে উদ্ধার করবে, তাকে পৃথিবীর সমস্ত গুপ্তধনের সন্ধান দেবে। তবুও কেউ তাকে উদ্ধার করতে আসে না।
রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে অসহায় জিন বেচারা প্রতিজ্ঞা করে বসে যে, এইবার যে তাকে উদ্ধার করবে তাকে সে হত্যা করবে। অবশ্য , কীভাবে সেই উদ্ধারকারী মৃত্যুবরণ করতে চায় সেটা বিবেচনায় নেবে !
এর পরের কাহিনীও আমরা জানি, জেলে বুদ্ধি করে নবী সুলাইমানের কসম খেয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বিশাল দেহের জিন ঐ ছোট্ট বোতলে কীভাবে আঁটে ! বোকা জিন আবার সেই বোতলে ঢুকে দেখাতে গিয়ে চিরতরে আটকা পড়ে।
কেন জিন তাঁর চরম উপকারীকে হত্যা করার মতো এ রকম নির্দয় সিদ্ধান্ত নিতে পারল?
কারণ সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মানুষ অনেক ভাল প্রতিজ্ঞা করে। সমস্যা জটিলতর হলে, সে প্রতিজ্ঞায় আরো নানা প্রণোদনা যুক্ত হয়। কিন্তু যখন দেখে কোন উপায়েই উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই, তখন হতাশায় আর ক্ষোভে চরম অবিমৃষ্য ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
কোভিড ভাইরাসের প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল সবাই আগামীতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছে। আরো কিছুদিন যাওয়ার পরে মনে হচ্ছিল, সেই প্রতিজ্ঞায় আরো অনেককিছু যুক্ত হচ্ছে। নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। প্রকৃতির বিশ্রামে নিজেই আরোগ্যলাভের আশাবাদে আমরাও পাশে দাঁড়াবো ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু, এখন যতো দিন যাচ্ছে, সবাই সেই বোকা জিনের মতো ধৈর্যহারা, অবিবেচক, অসহনশীল আর নিষ্ঠুর হয়ে পড়ছি।
প্রকাশকালঃ ১লা জুলাই,২০২০
by Jahid | Nov 30, 2020 | দর্শন, সাহিত্য
“প্রতিটি সংস্কৃতি চায় ছেলেরা হবে সক্রিয় বা আক্রমণাত্মক , আর মেয়েরা হবে নিষ্ক্রিয়, অন্তর্মুখি বা আত্মসমর্পণাত্মক ; তাই ছেলেরা হয় মাস্তান আর মেয়েরা থাকে একটি রন্ধ্র নিয়ে বিব্রত। এটি যে সাংস্কৃতিক ব্যাপার, তা স্বীকার না ক’রে পিতৃতন্ত্র মনে করে পুরুষের পৌরুষ বাস করে তার একটি ঝুলন্ত নির্বোধ প্রত্যঙ্গে ও তার নিচের থলের ভেতরের একজোড়া অণ্ডকোষে। ”
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )
তাঁকে কেন বাংলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী লেখক বলা হয়—উপরের কয়েকটা লাইন সেটা জাস্টিফাই করার জন্য যথেষ্ট মনে হয় আমার কাছে। এই বলার ভঙ্গী এখনকার ফেসবুক সেলিব্রেটিদের কারো কারো আছে হয়তো। কিন্তু তাঁর সময়ে এটা ছিল কল্পনাতীত।
বাইবেলের হিতোপদেশ বলেছে, “ পরকীয়া স্ত্রীর ওষ্ঠ হইতে মধু ক্ষরে, তাহার তালু তৈল অপেক্ষাও স্নিগ্ধ” ; এঙ্গেলস (১৮৮৪, ২২৬) বলেছেন, “ মৃত্যুর মতোই ব্যাভিচারের কোন চিকিৎসা নেই।”
বিয়ের সুখ কেমন? এঙ্গেলস বলেছেন, “ একপতিপত্নী বিবাহের উত্তম দৃষ্টান্তগুলির গড়পড়তা ধরলেও তা পরিণত হয় এক নিরেট একঘেঁয়েমির দাম্পত্য-জীবনে, যাকে বলা হয় দাম্পত্য সুখ।” এ বিয়ে পরিণত হয় এঙ্গেলসের মতে, স্থূল বেশ্যাবৃত্তিতে, বিশেষ করে স্ত্রীর বেলা। স্ত্রী আর পতিতা কি এক? এঙ্গেলস বলেছেন, “স্ত্রীর সঙ্গে সাধারণ পতিতার পার্থক্য এইটুকু যে সে ফুরনের মজুরের মতো নিজের দেহ ভাড়া খাটায় না,পরন্তু সে দেহটা বিক্রি করে চিরকালের মতো দাসত্বে ।”
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )
আমি বিবাহ/বিয়ে নামের এই সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা রাখি। আমি হুমায়ুন আজাদের ও এঙ্গেলসের সাথে দ্বিমত পোষণ করি , কিন্তু এঁদের মতামতকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।
রবীন্দ্রনাথ , রুশো-রাসকিনদের মতোই, পুরুষতন্ত্রের মহাপুরুষ ; এবং প্রভাবিত ছিলেন ওই দুজন,ও আরো অনেককে দিয়ে। রোম্যানটিক ছিলেন তিনি, এবং ছিলেন ভিক্টোরীয়; নারী, প্রেম ,কবিতা,সমাজ, সংসার, রাজনীতি, জীবন এবং আর সমস্ত কিছু সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন তিনি পশ্চিমের রোম্যানটিকদের ও ভিক্টোরীয়দের কাছে; এবং সে-সবের সাথে মিশিয়ে চিয়েছিলেন তিনি ভারতীয় ভাববাদ বা ভেজাল। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মৌলিকতা খুবই কম; তাঁর সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক চিন্তার সবটাই বাতিল হওয়ার যোগ্য।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )
“ রবীন্দ্রনাথের সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক চিন্তার সবটাই বাতিল হওয়ার যোগ্য। ” এতো স্পর্ধিত উচ্চারণ আমি আর কারো মুখে শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। সত্যি বলতে কী , এখানে আমি হুমায়ুন আজাদের রবীন্দ্র বিদ্বেষে মর্মাহত ।
প্রেম ও কাম পরস্পরসম্পর্কিত, দুটিই নারীপুরুষের জীবনের বিশেষ পর্বে প্রবলভাবে দেখা দেয়, যদিও জীবনে দুটির গুরুত্ব সমান নয়। প্রেম স্বল্পায়ু, মানুষ প্রেমে বাঁচে না, জীবনে প্রেম অপরিহার্য নয় ; প্রেম বিশেষ বিশেষ সময়ে কোনো কোনো নরনারীর জীবনে জোয়ারের মতো দেখা দেয়, তাতে সব কিছু – অধিকাংশ সময় তারা নিজেরাই—ভেসে তলিয়ে যায়; তবে আজীবন মানুষ বাস করে নিষ্প্রেম ভাঁটার মধ্যে। প্রেম তীব্র আবেগ, তা ঝড় জোয়ার বন্যার স্রোত ঘুর্ণির মতোই ; ওগুলোর মতোই প্রেমও দীর্ঘস্থায়ী নয়, এবং বার বার দেখা দিতে পারে। ———-প্রেমের থেকে কামের আশ্লেষের আয়ু অনেক বেশী ; কাম দোলনা থেকে কবর চিতা পর্যন্ত বেঁচে থাকে। অপ্রেম জীবন দশকপরম্পরায় যাপন করে মানুষ, অধিকাংশের জীবনেই কখোনই প্রেমের ছোঁয়া লাগে না ; কিন্তু কামহীন জীবন অসম্ভব। যাদের কাম অচরিতার্থ, যারা সঙ্গী পায় না কামের, তারাও একান্ত কামযাপন করে। প্রেম বলতে গত আড়াইশো বছর ধরে পশ্চিমের পৃথিবী যা বোঝে , এবং পশ্চিম থেকে ঋণ করে আমরা যা বুঝি এক শতাব্দী ধরে, তা রোম্যানটিকদের আবিষ্কার।
পুরোনো পৃথিবীতে প্রেম ছিলোনা ; আজ আছে একটি বড়ো কিংবদন্তি হয়ে। যে- আবেগ প্রেম নামে নরনারীর মনে জেগে ওঠে বিপরীত লিঙ্গের কারো জন্যে, কিশোরতরুণের কাছে যা রক্তমাংসের অনেক ওপরের কোন স্বপ্ন বলে মনে হয়, তা আসলে মাংসের জন্য মাংসের সোনালী ক্ষুধা।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )
আমার জন্য বহুশ্রুত, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার প্রায়শঃ বলে থাকেন আমি বহুবার শুনেছি। ‘প্রেম এমনই এক তীব্র আবেগ যা এভারেস্টের চূড়ার মতো; সেখানে একই সময়ে একজনই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। একসঙ্গে দুজনের জায়গা হয়না সেখানে!’
বিয়ে ও সংসার আজো নারীর জন্য প্রধান পেশা হয়ে আছে, প্রতিক্রিয়াশীলতা যেভাবে প্রবল হচ্ছে তাতে অচিরেই তা আবার একমাত্র পেশা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। সমাজ নারীকে আজো হতে বলে সুগৃহিনী ও সুমাতা, তাঁর কাছে দাবী করে সতীত্ব ও পাতিব্রত্য। ————–নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভুমিকা? গর্ভবতী নারী দেখতে অনেকটা গর্ভবতী পশুর মতো, দৃশ্য হিসাবে গর্ভবতী নারী শোভন নয়, আর গর্ভধারণ নারীর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। একদিন হয়তো গর্ভধারণ গন্য হবে আদিম ব্যাপার বলে, মানুষ বেছে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প উপায় ; তখন গর্ভধারণই নারীত্ব বলে মনে হবে না। নারী গর্ভধারণে আনন্দ পায় না। পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারণেই তাঁর জীবনের সার্থকতা, কিন্তু এটা তা নয়। অধিকাংশ নারী এখনই গর্ভধারণপ্রক্রিয়া থেকে রক্ষা পেলে আনন্দে তা গ্রহণ করবে ; গর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনো সার্থকতা, মহত্ত্ব, পুণ্য নেই। একসময় নিয়ত গর্ভিনী থাকাই ছিল নারীর কাজ ; এখন গর্ভের সংখ্যা কমেছে, তাতে ক্ষতি হয়নি, বরং সমাজরাষ্ট্র এই চায়। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শো বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই।
——- নারীর ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে নিতে হবে নিজেকেই। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করবে না। নারীর ভবিষ্যৎ মানুষ হওয়া, নারী হওয়া নারী থাকা নয়।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )
হুমায়ুন আজাদের বিশাল ক্যানভাসের “ নারী ” গ্রন্থটি আমার মোটেও মৌলিক কিছু মনে হয় নি। এটি মূলতঃ নারীবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অসংখ্য গ্রন্থের একটি সম্মীলন । লেখক গ্রন্থপঞ্জীতে প্রায় আড়াইশো বিভিন্ন ভাষার বইয়ের তালিকা দিয়েছেন, যেগুলো তাঁকে পড়তে হয়েছে, গবেষণা করতে হয়েছে দিনের পর দিন ; এই ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
পুরো গ্রন্থের যে বিশেষ দিকগুলো আমাকে নাড়া দিয়েছে আমাকে আলোড়িত করেছে আমি তারই পুনরাবৃত্তি করলাম মাত্র।
প্রকাশকালঃ এপ্রিল, ২০১৫
by Jahid | Nov 30, 2020 | দর্শন, লাইফ স্টাইল
রাজকুমার হিরানি : জীবনে থামতে জানতে হয়
পিকে (২০১৪) ও থ্রি ইডিয়টস (২০০৯) ছবির জন্য আলোচিত রাজকুমার হিরানি। হিরানি পরিচালিত অন্য দুটি চলচ্চিত্র মুন্নাভাই এমবিবিএস (২০০৩) ও লাগে রাহো মুন্না ভাই (২০০৬)। তাঁর জন্ম ১৯৬২ সালের ২০ নভেম্বর ভারতের নাগপুরে। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে।
আপনার জীবনাদর্শ কী? জীবনে বহুবার আমি এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। কখনোই প্রকৃত উত্তর খুঁজে পাইনি। আমরা আসলে কেউই জানি না আমরা কেন এই ধরাধামে এসেছি। মানুষ বাঁচে কত দিন? বড়জোর ষাট, সত্তর কিংবা আশি বছর? প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি যদি মনে করেন জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত, তাহলে দেখবেন, জীবনটাকে আপনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা প্রায় সবাই মনে করি, আমাদের হাতে প্রচুর সময় রয়েছে, জীবনের আয়ু সংক্ষিপ্ত নয়।
তাই আমি মনে করি, আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করা উচিত, এ পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব, খুব সামান্য। আজ থেকে ৫০ অথবা ৭৫ বছর পর কেউ হয়তো আমাকে আর চিনবে না। তো এসব চিন্তা করে ঘুম নষ্ট করার দরকার কী! এসব নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না। আমাদের প্রয়োজন টাকা, আমাদের প্রয়োজন সম্পদ, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এসব অর্জনেরও একটা সীমা আছে। আমি মনে করি, মানুষের জীবনে সত্যিকার অর্থে দুটি সমস্যা আছে—এক. স্বাস্থ্য ও দুই. দারিদ্র্য।
আপনি দেখবেন, যারা জ্যোতিষীর কাছে যায়, তারা জানতে চায় তাদের টাকাপয়সা কিংবা সম্পদ হবে কি না, তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে কি না ইত্যাদি। কারণ জীবনের শেষ বেলায় এক সকালে উঠে আপনার মনে হবে, আপনার দেখভাল করার মতো কেউ আছে কি না। আর তখনই আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে।
আমি মনে করি, আমি সব সময় ও রকমটাই ভাবি। এটা কিছুটা বংশগত ব্যাপারও বটে। আমি সৌভাগ্যবশত এমন এক পরিবারে জন্মেছি যে পরিবারটা খুব একটা ধনী ছিল না। তবে বাবা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন যথেষ্ট আধুনিক।
একবার আমাকে খুব ভয় দেখানো হলো। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানলাম, শরীরের কোনো একটা অংশ ঠিকঠাকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসক বললেন, পরিবারের কাছে ফিরে যান, আপনি খুব শিগগিরই জটিল রোগে আক্রান্ত হবেন। চাপের মধ্যে ভালো কাজ করা মানে অনেকটা সংগ্রাম করার মতো। আমি সব সময় চেষ্টা করি এই ‘মানসিক চাপ’ বিষয়টাকে পাত্তা না দিতে।
বিলিয়ার্ড খেলোয়াড় গীত সিতাই একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি একবার থাইল্যান্ডে ফাইনাল খেলা খেলছিলেন। তাঁর প্রতিপক্ষের নাম ছিল সম্ভবত ওয়াত্তানা। এই খেলোয়াড় প্রচুর পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা খেলায় হেরে গেলেন এবং তারপর একের পর এক হারতে লাগলেন। স্বাভাবিকভাবেই গীত তখন খুব অবাক হয়েছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্যাপার কী? উত্তরে ওয়াত্তানা বলেছিলেন, আমি মনে করি, আমি সেই খেলায় অবশ্যই জিততাম। কিন্তু আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল পুরস্কারের টাকার দিকে। আমি ভাবছিলাম, পুরস্কারের টাকা পেলে আমার বাবার জন্য একটা বাড়ি কিনব। এই ভাবনা আমাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তখন কিছুটা নার্ভাস বোধ করছিলাম। কিছুতেই খেলায় মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না এবং যার ফলে আমার প্রতিপক্ষ খেলাটায় জিতেছিল।
গীতের এই গল্প থেকে আমি শিখেছিলাম, আপনি কী করছেন, তার লক্ষ্য ঠিক রাখা খুবই জরুরি।
আমি সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি কোনো মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। এমনকি তাঁর কোনো ই-মেইল আইডিও নেই। প্রতিদিন আপনি নাছোড় বান্দার মতো অন্তত ২০ হাজার মানুষের মনোযোগ চান। কিছু মানুষ এ বিষয়টিকে উপভোগ করতে পারে, তবে কিছু মানুষ মনে করে এটা এক ধরনের চিত্তবিনোদন। তো এ কথা বললাম এ জন্য যে আমাকে বিরক্ত করার কেউ নেই, না ফোন, না কোনো মানুষ। কিন্তু যখন আপনি একটু একটু করে পরিচিত হয়ে উঠবেন, তখন অনেক কিছুই আপনার পিছু লাগবে। জগতে চিত্তবিনোদনের অনেক উপাদান আছে। আপনাকে কর্মে সফল হতে হলে ওই সব থেকে অবশ্যই নিজেকে দূরে রাখতে হবে।
প্রত্যেকের বোঝা উচিত, ‘প্রয়োজন’ ও ‘লোভের’ মধ্যে পার্থক্য কী। আপনার জানা উচিত, ঠিক কোন জায়গাতে আপনাকে থামতে হবে এবং এটাও জানা উচিত, ‘আর নয়, বহুত হয়েছে’ কথাটা কখন বলতে হবে। অনিশ্চয়তা আপনাকে খতম করে দিচ্ছে? পৃথিবীর সবেচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির দিকে তাকান, তিনিও বলবেন, ভয় লাগে, কখন সব শেষ হয়ে যায়! আপনি যদি এই অনিশ্চয়তার ভয় কাটাতে পারেন, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
অনেকেই আপনাকে খারাপ মানুষ মনে করতে পারে। কিন্তু আপনি নিজেকে কখনোই খারাপ মনে করেন না। এটা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। এ বিষয়টি প্রথম মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল বোমান ইরানি, যখন আমরা একসঙ্গে মুন্না ভাই এমবিবিএস বানাচ্ছিলাম তখন। বিষয়টি নিয়ে বোমানের সঙ্গে অনেক বিতর্ক হয়েছে আমার। এরপর থেকে আমি যখন আমার ছবির কোনো চরিত্রের কথা ভাবি, তখন কখনোই সেই চরিত্রকে ‘ভিলেন’ হিসেবে ভাবি না। কারণ সে তাঁর জীবনে তো ‘হিরো’। নিজের জীবনে মানুষ কখনো নিজেকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে দেখে না। সে কখনোই ভাবে না যে সে একজন খারাপ মানুষ।
সুতরাং এখন আপনি বুঝতেই পারছেন, আমরা আমাদের মাথার ভেতর আসলে গল্প তৈরি করি, ভিলেন বানাই।
কিছুদিন আগে মুম্বাই ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের বাচ্চাদেরও হাতে পৌঁছে গেছে আইপ্যাড, আইফোন। এ যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।
থ্রি ইডিয়টস দেখার পর কত মানুষ আমার কাছে এসেছে, আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। তারা বলেছে, তাদের মধ্যে কত গলদ আছে! আমি আপনাকে বলতে পারব না যে কত প্রকৌশলী আমার কাছে এসেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা ভুল পেশায় আছি। আমরা এখন কী করব? আমরা এ পেশা ছাড়তেও পারি না। ভয় লাগে, কারণ এটাই যে আমাদের উপার্জনের পথ। কেউ কেউ অবশ্য ছেড়েও দিচ্ছেন। কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাঁরা তাঁদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।’
উপাচার্য মহাশয় সেদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। শিক্ষাব্যবস্থার বদল প্রয়োজন। কিন্তু এটা বদলাতে সবাই ভয় পায়। যেদিন আমরা এই ভয় থেকে মুক্ত হতে পারব, সেদিনই সত্যিকার পথ খুঁজে পাব।’
আমার মনে হয়, জীবনে সফল হওয়ার জন্য যেকোনো একটা বিষয় প্রয়োজন। কিন্তু মানব সম্প্রদায় হিসেবে আমরা বরাবরই আমাদের জীবন ও মনকে উদ্ভট পথে পরিচালিত করি। বেঁচে থাকার জন্য কিছু অর্থ উপার্জন করুন। দ্যাটস অ্যানাফ!
যাহোক, আমি শিক্ষা নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম যে আমরা আসলে বাস করি কয়েক হাত ঘুরে আসা জ্ঞানের মধ্যে। বিষয়টি আর একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। যখন একটি পশু মারা যায়, সে আসলে মারাই যায়। পশুদের এমন কোনো প্রজন্ম নেই যারা তাদের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সরবরাহ করতে পারে। কোনো পশুই বই লিখতে পারে না, যে বই বছরের পর বছর অন্য প্রাণীরা পড়তে পারে, কিন্তু মানুষ পারে। তাই মানুষের জ্ঞান আসলে ‘সেকেন্ডহ্যান্ড নলেজ!’
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে মারুফ ইসলাম। প্রথম আলো, ১৮ই জানুয়ারি, ২০১৫
by Jahid | Nov 30, 2020 | দর্শন, সাহিত্য
আহমাদ মোস্তফা কামালঃ —- কিন্তু একজন লেখক হিসাবে বা একজন মানুষ হিসাবে মানুষের জীবনটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শহীদুল জহিরঃ দার্শনিকভাবে আমি মনে করি, মানুষের জীবন হলো ফলের প্রত্যাশা না করে কাজ করে যাওয়া। কার একটা কাজের ফলাফল কী হবে আপনি তা জানেন না। এটা কোনো ঐশ্বরিক চিন্তা থেকে বলছি না, বলছি বাস্তব চিন্তা থেকেই। হ্যাঁ, নিশ্চিত ফল আপনি পেতে পারেন, যেমন ধরেন, একটা লোককে যদি একটা ঘরের মধ্যে আটকে আমি লাঠি দিয়ে পিটাই তাহলে সে নিশ্চিত মরে যাবে। সেটা আছে। কিন্তু এমনি সাধারণ জীবনে আপনি আসলে কোনো কাজ করে কী ফল লাভ করবেন, তার কিছুই বলা যায় না। ধরেন , আমি লেখাপড়া করছি, এইটা করে কী হবে আমি জানিনা। আমি চাকরি করছি কিন্তু সেটা নিয়ে আমি কত দূর যেতে পারব জানিনা। আমি এখন বেঁচে আছি, কতদিন বেঁচে থাকতে পারবো, জানি না। সর্বত্রই অনিশ্চয়তা। আসলে—আনসারটেইনিটি ইজ লাইফ। আমার এখন সেইরকমই মনে হয়, আগে অত হতো না, এখন মনে হয়। সাহিত্যের একটা ধারা ছিল, মার্ক্সিস্ট ধারা, সেটাতে অনেক ডেফিনিট ওয়েতে বলার ব্যাপার ছিল। জীবনকে জয়ী দেখানো, সমৃদ্ধ দেখানো , বা সম্ভাবনা আছে সেটা দেখানো ইত্যাদি। আমি যে সম্ভাবনা দেখাই না তা না, সঙ্গে ব্যর্থতাও দেখাই। কারণ জীবনের ব্যার্থতাগুলোর মধ্যে সম্ভাবনা থাকে। আমার তো মনে হয় যে , জীবনের ব্যর্থতাগুলোর একধরণের ঐশ্বর্য । এটা দারিদ্র্যকে মহান করার মতো কোনো ব্যাপার না। জয়ী হতে পারলে ভালো, না হতে পারলেও কিছু আসে যায় না। জীবনে কী হবে না হবে কিছুই যেহেতু পরিষ্কার করে বলা যায় না , যেহেতু এই অনিশ্চয়তা নিয়েই জীবন কাটাতে হয়, তাই এই জয়-পরাজয়, সাফল্য-ব্যর্থতার বিষয়গুলো আমার কাছে সমার্থক হয়ে ওঠে।
কামালঃ অনিশ্চয়তাই তাহলে জীবনের মূল কথা।
জহিরঃ হ্যাঁ । অনিশ্চয়তাই মূল ব্যাপার।
(শহীদুল জহিরের সাক্ষাৎকার ; ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০০৫)
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র, দর্শন, সাম্প্রতিক
যথারীতি আমাদের পূর্ববঙ্গের আশির দশকের রিয়েল লাইফ অভিজ্ঞতা। এলাকার সিনিয়রের কাছে শোনা।
তো হয়েছে কী, তাদের গ্রামে একজন মোটামুটি সম্পন্ন গৃহস্থ মারা গেলেন হুট করে ; উঠতি বয়সের সন্তানসন্ততিদের রেখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম লোকের অকালমৃত্যু হলে কী হয় সেটা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার আছে।
গ্রাম- মফস্বলে প্রথম কিছুদিন প্রতিবেশীদের আহা উঁহু থাকে। ধীরে ধীরে সবাই যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মৃতের পরিবারে কীভাবে চলছে, কী খেয়ে বেঁচে আছে সেটা দেখার সময় থাকে না সঙ্গত কারণেই।
চারিদিক আঁধার হয়ে এলে ভিটে-বাড়ি বাদে অন্যসব জমি বিক্রি করে পড়াশোনা আর জীবনধারণের প্রাণান্ত চলে।
যথারীতি ঐ পরিবারের বড়ছেলেটি যে কিনা আমার পরিচিতের প্রতিবেশী সেও বাধ্য হয়ে টুকটাক করে বাপের কষ্টের করা জমি বিক্রি করা শুরু করল। প্রতিবেশী মুরব্বীরা ব্যাপারটা তেমন পছন্দ করছিল না। এভাবে জমি বিক্রি করে খেলে আর কতদিন। এক সময় তো হাত পাততে হবে। আবার করারও কিছু ছিল না।
যাই হোক একদিন নদীর ঘাটে কয়েকজন মুরব্বী তাকে ধরল।
‘বাপু হে ! তুমি যেভাবে জমি বিক্রি করে খাতিছ, এভাবে চললি বুড়া হলি কী খায়া থাকবা ?’
সে উত্তর দিল, ‘ কাকা, এখুন আগে আমার খায়া জানে বাঁচতি হবি। খাতি পারলি না তবে বুড়া হতি পারব ; না খাতি পারে মরেই যদি গেলাম ; তালি পর আর বুড়া হব কেম্মা করে !’
প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য