উপলব্ধি: ৪০

যাপিত জীবন ও যৎসামান্য পড়াশোনায় আমার একটা উপলব্ধি হয়েছে: প্রকৃতি ধনী-গরীব নির্বিশেষে দুইটি জায়গায় কাউকেই বঞ্চিত করে নাই। একটা অসাধারণ সাম্যাবস্থা আছে সেই প্রকৃতির সেই দানে , সবাই সেখানে সমান । দুইটি প্রকৃতি-প্রদত্ত দান হচ্ছে খাদ্যগ্রহণ ও যৌনতা। খাদ্য গ্রহণ ও যৌনতায় সকলের জন্যে পরিপূর্ণ তৃপ্তি আছে। অন্য কোন ইন্দ্রিয় দিয়ে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাওয়ার সুযোগ সবার জন্য প্রকৃতি রাখেনি। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি , খাদ্য, পানীয় নিয়ে অবলীলায় আমরা কথা বলি। ভোগ উপভোগের তুলনা করি। কী খাওয়া উচিৎ, কেন খাওয়া উচিৎ, কীভাবে খাওয়া উচিৎ, তা নিয়ে আমাদের বহু কথা হয়। অথচ সেই প্রেক্ষিতে যৌনতা নিয়ে আমাদের কোন কথা হয় না । যৌনতাকে নিষিদ্ধ, ট্যাবু ভেবে নানা ভুল ধারণা নিয়ে না থেকে সেটা নিয়ে আলোচনা করা উচিৎ । আমি ব্যক্তিগতভাবে তাই মনে করি। কেউ ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা তুলতে পারেন। তবুও আমি বিশ্বাস করি, খোলামেলা আলোচনা ভাল।

উপলব্ধি: ৩৯

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার প্রায়শ: একটা কথা বলতেন, ‘অর্থহীন বেদনার কোন অর্থ নাই!’ আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বিষাদ আসে জীবনে। বিষণ্ণতা আছে, আছে হতাশার কাল। জীবনযাপনের ক্লান্তি আছে! জীবনের ক্ষয় আছে, গতিহীনতা আছে, বাঁধা আছে, ক্লেদ আছে। ওই যে হয় না, মেশিন চললে শুধু প্রোডাক্টই হয় না, তাতে অবধারিতভাবে ধুলো জমে, জং ধরে, গতি কমে যায় আর সাথে সাথে কিছু উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট তৈরি হয়। উপভোগ্য জীবনে সারাক্ষণ প্রাপ্তির পাশে দুই একটা অপ্রাপ্তি সবারই আছে । সকাল থেকে রাত্রি, প্রাতঃকৃত্য, খাওয়া, হেঁটে চলে কর্মস্থলে আসা– গোটা তিরিশেক কাজতো ঠিকমতোই হচ্ছে ; এর মাঝে ছোটবড় কোন কাজে বাধা আসতে পারে, আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা থাকতেই পারে, সেটাকে বড়ো করে না দেখলেই হয় !
বহু বছর আগে এক দক্ষিণভারতীয় সহকর্মীর নোটবুকে লেখা ছিল, It doesn’t matter how many times you fall down, all that matters how quickly you are bounced back. মূলত: বিষণ্ণতা ও ক্লান্তি জীবনে অবধারিত। কিন্তু আমাদের চেষ্টা থাকা উচিৎ কতো দ্রুত সেটা থেকে আমরা বের হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনের ফিরে আসতে পারি।

কেন ডিপ্রেশন?
কারণ আপনি একটা কিছু হোক চেয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে না বা করতে পারছেন না। একটা বাঁধা , একটা অবস্টাকল আপনাকে বিষণ্ণ করবে। হতাশ করবে।
কিন্তু এটাও তো সত্যি, যে অনেক কিছু হচ্ছে। সারাদিন এই অফিস, গাড়ীতে চলা, খাওয়া, বাচ্চাদের চেহারার আনন্দ, ভালোবাসা, সব তো হচ্ছে। এই নিঃশ্বাস এই বেঁচে থাকা আশ্চর্য নয়, এখানে হতাশা কোথায়? বিষণ্ণতা কোথায়?
স্যার কথাগুলো ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন।
এই যে, সারাদিন আমাদের ২০টা কাজ হচ্ছে, তার ১৯টা কাজই তো সাফল্য। সকালে ওঠা, নাস্তা করা, অফিসে আসা, সমস্ত দায়িত্ব পালন করা, সব। হ্যাঁ, সারাদিনে একটা কাজে হয়তো আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। তাই বলে সমস্ত দিনটা তো আর ব্যর্থ নয়! জীবনের বেশিরভাগ তাই সাফল্যের, আশাবাদের, ভালোবাসার, আনন্দের।

উপলব্ধি: ৩৮

ঔদ্ধত্য যদি এক্সট্রিম একটা আচরণ হয়ে থাকে, বিনয়ও এক্সট্রিম একটা আচরণ । বিনয়ী লোকজনকে আধুনিক যুগের লোক পাপোষের মতো মাড়িয়ে চলে । পিষে ফেলতে চায়। এর চেয়ে মধ্যমপন্থা উত্তম । কিছুটা রহস্য থাকা ভালো। নিজেকে সহজেই পড়ে ফেলতে দেওয়া অনুচিত ( ক্ষেত্র-বিশেষে প্রিয়জন ছাড়া)। একটা মানুষের একটা আবরণ, আস্তরণ, দুর্ভেদ্যতা কিংবা রহস্য থাকা ভালো। অনেকের রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, ভয় , ভালোবাসা ইত্যাকার আবেগ মুহূর্তেই অনেকের চেহারায় ও চোখে ভেসে ওঠে। তাঁর আবেগ ও অনুভূতি নিকটবর্তী কেউ সহজেই পড়ে ফেলতে পারে।

আপনি ব্যবসায়ী হন, মালিক হন, সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট হন, ক্রেতা হন, বিক্রেতা হন, আপনার কাউন্টার পার্ট আপনার আবেগের ব্যাপারটা সহজে পড়ে ফেলতে পারলে তো মুশকিল। আপনি পদে পদে বিব্রত ও ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

নিজের আবেগ প্রচ্ছন্ন বা ধোঁয়াশা করে রাখতে পারার সক্ষমতা একটা বিশাল গুণ।

উপলব্ধি: ৩৭

‘Every Unspoken word get’s poisonous!’
মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্যে এটা মেনে চলতে পারেন।
মনের খুব গহীনে কোন কথা কেউ চেপে রাখতে চাইলে বলি , বলে ফেল ভায়া। বলে হালকা হয়ে যাও।
কিছু মানুষ আছে , যারা কথা পুষে রাখে, সাপের মতো বিষাক্ত হয়ে সেই কথা কবে কখন নিজেকেই অথবা অন্য কাউকে ছোবল মারবে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না !

উপলব্ধি: ৩৬

আমাদের কয়েক গ্রাম পরেই সাঁইজি লালন ফকিরের ছেউড়িয়া আখড়া। কিছুটা বাউলিয়ানা আমাদের পরিবারের সকলের মাঝেই ছিল। আব্বা সেই অর্থে প্রথম জীবনে খুব ধর্মপরায়ণ ছিলেন না। শেষ বয়সে এসে যতোটুকু করতে হয় করেছেন। উপলব্ধিটা সেই অর্থে আমার পিতার কাছ থেকে আমার ভিতরে প্রবাহিত হয়েছে।

তিনি বলতেন , মানুষে মানুষে ও জীবজগতের ভেদাভেদ ও বৈষম্য স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা করেছেন। এমনকি শেষ বিচারের দিন ৭০ কাতার করেছেন। সাত দোজখ আর আট বেহেশত করেছেন। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু মানুষের বঞ্চনায়, দুর্ভাগ্যে, তাঁদের অসাম্যে, অপ্রাপ্তিতে মন খারাপ করতে মানা করতেন। সুতরাং জগতের সকল অসাম্য দূর করার ভার আমাকে না নিলেও চলবে।

উপলব্ধি: ৩৫

কোনকিছুতে হুট করে কনভিন্সড হবেন না।
কারো কথা শুনে বা কোন গ্রন্থ পড়ে, কোন ডকুমেন্টারি দেখে, ইন্টারনেটে অথবা টিভিতে। কোনকিছুতে প্রথমেই কনভিন্সড হয়ে গেলে আপনার নিজের চিন্তা করার জায়গাটা থাকেনা। কর্মজীবনেও আপনার কাছে নানা শ্রেণির ও সংস্থার লোকজনের আনাগোনা থাকে। সহকর্মী থেকে শুরু করে সেলসম্যান , মার্কেটিং এর লোক, সবাই আপনাকে কনভিন্সড করতেই চায়। সবার কথা শুনে নিজের সিদ্ধান্ত নিজের নিতে হয়।