আমেরিকা ভ্রমণ

কাউন্টারের আমেরিকান ভদ্রমহিলা আমার পাসপোর্ট নিয়ে অনেকক্ষণ বোর্ডিং পাশ বের করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ! ফোন দিলেন অন্য কোথাও, ওপাশ থেকে কেউ আধাঘণ্টা ধরে একেকটা প্রশ্ন করে আর মহিলা আমাকে সেটা জিজ্ঞাস করেন, আমার আম্রিকান ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিলো কিনা ? থাকলে কোথাও কোন দুর্ঘটনা আছে কিনা। অথবা আগে আমি আমার বাংলাদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে আম্রিকায় গাড়ী চালিয়েছি কিনা ?

বুঝলাম আমেরিকার কোন এক চিপায়, কোন এক জাহিদে কোন এক সুদূরকালে কী এক কাহিনী করছে , সেইটা এখন দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া আমারে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।

এতো সিকিউরিটি দিয়ে এরা কি যে ফেলতে পারছে কে জানে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

 

নিয়ান্ডারথাল আদিম বুনো মানুষ

হঠাৎ হঠাৎ আদিম বুনো চেহারার কিছু লোকের দেখা পাই আমি।
ক্যামন ? ঠিক যেমনটি, ক্লাস সিক্স সেভেনের সমাজবিজ্ঞান বইয়ে দেখতাম।
আর ইদানীং দেখি ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে।

দাঁড়ি গোঁফের আড়ালে বা ক্লিনশেভের আড়ালে বন্য চোয়াড়ে চেহারাটা ঠিকই বোঝা যায়। মনে হয় আদিম কোন মানুষ জামাকাপড় টাইম মেশিনে করে চলে এসেছে এই সময়ে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

মূদ্রার অপর পিঠ, বৈপিরিত্য

হাসিখুশি চরিত্রের বা একটু হৈহৈ-রৈরৈ বলে সর্বশ্রেণীর বড়ভাইদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ যাতায়াত বা প্রশ্রয় আছে ! এবং আমি সেটা উপভোগও করি। কিছুদিন আগে আমার ট্রেডের কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বড়ভাইদের সাথে দেখা হলো একটা পারিবারিক ডিনারে। যথারীতি উত্তরা থেকে মিরপুরে এসে আবার উত্তরাতে বউকে নিয়ে যাওয়ার সুবিখ্যাত আলস্যে দাওয়াতে আমি একা। ভাবীদের সাথে এক বড়ভাই পরিচয় করিতে দিয়ে বললেন ‘ এরে চিনছো? এইটাই জাহিদ ! ওই যে ফেসবুকে লেখালেখি করে।’

সে খাইতে খাইতে আরো বললো, আমার লেখা তাঁরা পড়েন কারণ , তাঁদের মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার। কেন দরকার জানিনা, মনে হলো- সারাক্ষণ নানা ইসলামী অনুশাসন ও চিন্তার মাঝখানে,আমার কিছু পোস্টে হয়তো একটু খোলা-হাওয়া পান! নাকি অনৈসলামিক চিন্তাকারী কাউকে দেখে করুণা অনুভব করেন , কে জানে !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০২৩

উঁকি দেওয়া অনুভূতি

মাথার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ উঁকি দিয়ে যায় অনুভূতিগুলো ! ঠিক যেনো, কবিতার একটা লাইনের মতো, ভ্যাপসা গরমে হঠাৎ শীতল বাতাসের মতো! তারপর ,তারপর নিষ্কৃতিহীন নিরেট কাজের চাপে ওই সুন্দর অনুভূতি আর কবিতার লাইনটা কোথায় যে উবে যায় ! তারে যায় না ছোঁয়া আরেকবার !

প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে জুন,২০১৩

বাচাল লোকের উদাহরণ

বাচাল লোকের উদাহরণ দিই একটা।

আমার চাকরিজীবনের মধ্যবর্তী ব্রিটিশ কোম্পানির এক মিটিং এ গেছি ব্যাঙ্গালোর। মাঝখানে পড়ছে রবিবার উইক-এন্ড। মাঝবয়েসী ব্রিটিশ মহিলা বস বললেন , আমি মহীশুরে যেতে চাই কীনা। খুব ভোরে অফিসের গাড়ীতে রওয়ানা দিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসা যাবে। হোটেলরুমে ফালতু সময় নষ্ট না করে ফ্রি ঘুরে আসার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? মহীশুরের রাজপ্রাসাদে যাওয়ার পথে আমরা টিপু সুলতানের দরগা হয়ে গেলাম। সারি বাঁধানো কবর। ভীষণ বিষণ্ণ হলাম বড়দের কবরের পাশাপাশি ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা কবর দেখে।অশ্লীল যুদ্ধের দামামায় কে শিশু আর কে কিশোর !

ওই বিষণ্ণতা মহীশুরের বিশাল রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত ।কোথা-থেকে এক চ্যাংড়া গাইডও জুটে গেল। আমি , ব্রিটিশ বস, দক্ষিণভারতীয় ড্রাইভার( যে ইংরেজি খুব একটা পারে না) ঘুরে ঘুরে মানুষের সম্পদের বাহুল্য দেখছি। চ্যাংড়া গাইডটা চোস্ত ইংরেজিতে বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে । আমার মনে পড়ছে পুরনো ইতিহাস। ব্রিটিশ বস মাঝে সাঁঝে হু হা করছে। কিছুক্ষণ আগের ওই দরগার স্মৃতি হয়তো তাঁকেও কিছুটা উদাসীন করে রেখেছে । প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার আগে বাচাল গাইড জিজ্ঞাস করলো আমি কোন প্রদেশ থেকে এসেছি। সে ভেবেছিল আমি বোধহয় ভারতীয় কেউ।বাংলাদেশের নাম বললাম। পরে ব্রিটিশ বসকে জিজ্ঞাস করলো তাঁর দেশ কোথায়। সে বললো, ইংল্যান্ড! বাচাল গাইড বলে উঠলো,’ You mean Great Britain, that’s why you are so fluent in English !’

আমার বিষণ্ণ বস, এতক্ষণে হো হো করে হেসে উঠলেন !

প্রথম প্রকাশ: ২৫শে জুন ২০১৩

দুটি দুই দশকের আলাদা গল্প।

দুটি দুই দশকের আলাদা গল্প।
শৈশব-কৈশোরের কাহিনী আরেক দশকে এসে কীভাবে মনে প্রশ্ন তোলে, সেটা পড়ার পরেই জানা যাবে।
আশির দশকে মহল্লার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বড়ভাইদের প্রবাসে উপার্জনের জনপ্রিয় একটা গন্তব্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান।
পকেটভর্তি টাকা নিয়ে ফিরে এসে মহল্লার সুন্দরীদের বিয়ে-টিয়ে করে থিতু হতেন।
‘জাপান এই , জাপান সেই’ বলে মুখে ফেনা তুলতেন তারা। জাপানি লোকের সময় সচেতনতা, নিয়মানুবর্তিতা আর মহানুভবতার একই গল্প বারবার শুনতে হতো।
একবার এক বড়ভাই বলেছিলেন, যে এলাকায় তিনি থাকতেন, সেখানকার বেকারির বৃদ্ধা মহিলা মালিকটি সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বেকারিগুলো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফেলে দিতো। বেকারি জাতীয় খাবারের মেয়াদ থাকে ৩/৪ দিন। কিন্তু শীতের সময় ৫/৬ দিনেও তেমন কিছু হয় না। তো সেই বড়ভাইয়ের সঙ্গে বেকারির মহিলার খাতির ছিল, সেগুলো রাতে ফেলে দেওয়ার আগেই তিনি তাকে কিছু নিয়ে নিতে দিতেন।
দুই দশক পরে উত্তরাতে।
সম্ভবত: ২০০৪ সালের দিকেই সুবিখ্যাত একটা মিষ্টির দোকানের শাখা খোলা হলো। আমার তৎকালীন বস রাকিব ভাই, সচরাচর একা চলতে পছন্দ করতেন না। সারাক্ষণ কলিগ ও বন্ধু পরিবেষ্টিত থেকে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে। তো অফিসে নিচে কিছু একটা কিনতে যাচ্ছেন বা আশে পাশে কোথাও যাচ্ছেন। ডেস্কের পাশে এসে বলতেন, ‘ওই মিঞা! চলেন তো একটু নিচে।’ আমার কাজের চাপ কেমন, ব্যস্ত আছি কীনা , সেসবের ধার ধারতেন না।
তো সেই রকম এক বিকেলে তার সঙ্গে নিচে গেছি। আমাদের বিল্ডিং এর পাশের সেই সুবিখ্যাত মিষ্টির দোকান। রাকিব ভাই কারো বাসায় যাবেন সেই উপলক্ষেই।
জীবনে প্রথম ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ টাইপ দোকানের বাইরে করপোরেট একটা দোকানে আমার পদার্পণ।
সুসজ্জিত দোকান, নিয়ন আলোর নিচে প্রাইস ট্যাগে দাম লিখে রাখা মিষ্টি। বসার জন্যে সোফা, হালকা খাবারের জন্যে টেবিল, স্মার্ট সেলসম্যান দেখে আমি তব্দা মেরে গেলাম।
আরো তব্দা খেলাম, যখন মিষ্টির দাম দেখলাম। সব পরিচিত মিষ্টিই। কিন্তু দাম আকাশচুম্বী।
ঐ সময়, মিরপুর ও উত্তরার ভালো মিষ্টির দোকানের দামী মিষ্টির দামও ২০০ টাকা কেজি পার হতো না। মেহমান বুঝে আমরা ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ১৮০ বা ২০০ টাকা কেজির মিষ্টি নিতাম।
সেই চেইনশপে মিষ্টির দামই শুরু হয়েছে ৪০০ টাকা থেকে আর শেষ হয়েছে ৮০০+ টাকায়।
স্মৃতি থেকে লিখছি, দুধের লিটার ১৬ টাকা থেকে ২০ টাকা। চিনির দামও তাই।
মার্চেন্ডাইজার মন আমার মনে-মনে ‘কস্ট প্রাইস’ আর ‘রিটেইল প্রাইসের’ তুলনা করছি।
এক কেজি মিষ্টির দাম কীভাবে ৮০০ টাকা হয় ! আমি মেলাতেই পারছিলাম না।
পাশের সেলস ম্যানেজারকে বললাম, ‘ভাই আপনাদের দোকানের মিষ্টির বিশেষত্ব কি?
উনি একাধারে ব্র্যান্ডিং করা শুরু করলেন,এই অভিজাত মিষ্টির দোকানের হেড অফিস কানাডায়, শাখা আছে সেখানেও। সবচেয়ে ভালো পরীক্ষিত দুধ, উন্নত চিনি ব্যবহার করা হয়, কর্ম-পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট, ইত্যাদি ইত্যাদি।’
আমি মিনমিন করে বললাম, ‘তারপরেও ভাই এতো দাম কেমন করে হয়?’
উনি আমাকে শেষ তথ্যটি দিয়ে কুপোকাত করে দিলেন। বললেন, ‘আমাদের মিষ্টির এক্সপায়ার ডেট আছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হলে আমার সেই মিষ্টি ফেলে দিই।’
আমি তার এই তথ্যে কুপোকাত না হয়ে উল্টো প্রশ্ন করলাম, ‘ভাই, মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি কোথায় ফেলেন?’
পাশ থেকে রাকিব ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরেহ মিঞা, আপনি সারাজীবন বাঁইক্যাই থাইকা গেলেন!’
প্রথম প্রকাশঃ ২০শে ফেব্রুয়ারি ,২০২৬