স্বগতোক্তিঃ নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি!

নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি বারবার ঘুরে ফিরে আসে ! নিজের তুচ্ছতার কথা ভাবি ; এই চিন্তারাশিকে লিপিবদ্ধ করে কী লাভ ! হ্যাঁ প্রকাশিত হওয়ার আনন্দ আছে বৈকি ! আবার ভাবি, মহাকালের কাছে আমি যতো অকিঞ্চিৎই হই না কেন, আমার সময়টুকুতে আমার এই যে বেঁচে থাকা, চারপাশের প্রবাহিত , যাপিত জীবন আমার কাছে কোনভাবেই তুচ্ছ হতে পারে না। আমার কাছে তার মূল্য আছে বলেই জীবন নিরর্থক নয় ; বেঁচে থাকাকে এখনো এতো ভালবাসি !

স্বগতোক্তিঃ দান, অনুদান

আমি বিশ্বাস করি  মানবিক কিছু গুণাবলী যেমন  দান, ক্ষমা ও পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য পরিমাণ নয় , মূলতঃ মানসিক যোগ্যতাই সবচেয়ে বড়ো ফ্যাক্টর ! নিকট অতীতে  নিতান্তই  পারিবারিক কিছু অম্লমধুর  অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার  । সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেওয়ার পিছনে , খুব সহজ একটা  ব্যাখ্যা ছিল প্রত্যেকের । সহানুভূতির কয়েকটা কথার পরে, তাদের মূলকথা হতো —আমার  যদি অমুকের মতো টাকা থাকতো,  তাহলে আমি নিশ্চয়ই কিছু দান বা সহযোগিতা করতাম ! কিন্তু , যে দুর্মূল্যের বাজার, ইত্যাদি ইত্যাদি  ইত্যাদি!

 

 

আবার  এমন কিছু হৃদয়বান  দেখেছি যিনি  তাঁর সঞ্চিত অর্থের  পরিমাণের তোয়াক্কা করেননি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন  । গাণিতিক অনুপাতে  উদাহরণ দিই ।   ধরুন, আমার  যদি পকেটের  ১০০ টাকা থেকে  ১০ টাকা সহযোগিতা করার মানসিকতা না থাকে;  তাহলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা থাকলেও আমি  কাউকে  ১০ হাজার টাকা সহযোগিতার চিন্তা করবো না !   যে হৃদয়বান   মাত্র ১০ হাজার  টাকার ১০% অবলীলায় দান করতে পারছেন ও করছেন  ; মূলতঃ  তাঁর মানসিকতা আছে বলেই করতে পারছেন ! আর ‘ দুর্মূল্যের বাজার’-এর  আমি , একই সমানুপাতে  ১০ লাখ টাকার ১০% , মানে  ১ লাখ টাকাতো  দূরে থাক,  ন্যূনতম  ১% হিসাবে ১০ হাজার টাকার চিন্তাও করতে পারছি না !

 

বহুদিন আগে, এক নেপালি সহপাঠী বলেছিল , আদমি রহিস (ধনী) রুপিয়াসে নেহি হোতি ; দিল্‌ সে হোতি  হ্যায় ! সহযোগিতার  জন্য  সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ নয় ;  হৃদয়ের আয়তন এবং  মানসিক যোগ্যতাই বড় ফ্যাক্টর !

 

 

[ প্রথম প্রকাশঃ ১০ই নভেম্বর, ২০১৫ ]

ধূম্রস্মৃতি (চল্লিশোর্ধ বয়সে এসে, আমি যে একসময় ধূমপায়ী ছিলাম তা লুকিয়ে কী লাভ!)

১।                বছর দশেক আগে ( ২০০৫ সালে)  ইউরোপের কোথাও এক প্যাকেট মার্লবোরো কিনেছি, দাম গায়ে লাগার মতো, প্রায় ৫ ইউরো ! সেই মহার্ঘ  সিগারেট আবার দেখি ড্যাম্প ! মানে শুকনো তরতাজা না, টানছি কিন্তু মজা পাচ্ছি না। ধূমপায়ীদের কাছে ড্যাম্প সিগারেটের চেয়ে অসহ্য কিছু হতে পারে না।

নিজেকে বড্ডো বঞ্চিত ও প্রতারিত মনে হচ্ছিল।  পশ্চিমাদের সমস্ত প্রোডাক্টে ম্যানুফ্যাকচারিং ও এক্সপাইরি ডেট অত্যাবশ্যকীয়। এপাশ-ওপাশ করেও প্যাকেটের গায়ে কিছুই  পেলাম না ;  ঠাট্টার ছলে সঙ্গে থাকা ক্রেতা-বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম ,ব্যাপার কী ,ম্যানুফাকচারিং এক্সপাইরি ডেট নেই যে !  সে দারুণ একটা উত্তর দিল, ‘ শোন জাহিদ, সিগারেট, লিকার বা সকল-প্রকার মাদক যেহেতু বিষতূল্য, সেটার উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ  আবশ্যকীয় নয় !’

তখন মেজাজ খারাপ করলেও , এখন বুঝি ঘটনা সত্য।

২।                বড়ভাইয়া ধূমপায়ী ছিলেন। পাড়ার মোড়ের বাকীর খাতায় তাঁর নামে একপৃষ্ঠা, শেষের দিকে আমার নামে আরেক পৃষ্ঠা বরাদ্দ থাকতো । তারপরেও ক্রসফায়ার যাতে না হয়, দোকানীকে বলা ছিল, আমার পিতৃদত্ত নামের পরিবর্তে অন্য কোন নাম ব্যবহার করার!

৩।                টেক্সটাইলের ফার্স্ট ইয়ার। ডাইনিং-এর পাশে ছোট্ট ক্যান্টিন। নাস্তা শেষে চা । ১৬তম ব্যাচের মুরব্বী এক ভাইও এক টেবিলে। কোন কলেজে ছিলাম, রেজাল্ট কী এইসব জিজ্ঞাসার মাঝে চা শেষ। আমি উশখুশ করছি, কখন ছাড়া পাবো ;  উঠি উঠি করছি। উনি আমার অবস্থা  বুঝতে পেরে  বললেন, ‘জাহিদ সিগারেট খাইবা নাকি। খাও! এইখানে সমস্যা নাই। আরে মিয়া, তুমি আমারে দেইখ্যা সিগারেট লুকাইয়া সম্মান দেখাইলা; পরে পিছনে গিয়া গালি দিলা। তার চে, সামনা-সামনি সিগারেট খাও !  ‘সিগারেট লুকানো’ সম্মানের দরকার নাই!’

আমি হাঁফ ছেড়ে ভাবলাম, যাক ! জায়গামতো আসছি। আমাদের টেক্সটাইল কম্যুনিটিতে এই ব্যাপারটা এখনো আছে ;  খুব মুরব্বী -ফার্স্ট থেকে ফিফথ ব্যাচের আগের কয়েকজনের সামনে ছাড়া আমাদের সিনিয়রদের সবার সঙ্গেই  অনুমতি নিয়ে আমি ও আমরা ধূমপান করি ।পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বা  সন্মানের এতোটুকু হানি ঘটেনি এখন পর্যন্ত !

৪।                 আব্বা আইনজীবী ছিলেন। কথার মার প্যাঁচতো কিছু জানতেনই।  বড়ভাইয়া সিগারেট খান সেটা উনি  জানতেন। কিন্তু আমার মতো ভালোছেলেও (!) ধূমপায়ী হতে পারে, কস্মিনকালেও তার কল্পনায় ছিল না !  তবুও কোন কারণে তাঁর সন্দেহ হয়েছিল। সর্বকনিষ্ঠ ভাইটি, আমার বছর আটেকের ছোট। নানা উপঢৌকন ও ভয়ভীতি ছিল  আমার ধূমপানের ব্যাপারটা চেপে যাওয়ার জন্য। সেটা সে মেইন্টেইনও করতো।

তবুও আব্বার সাথে একদিন ওকে জেরা করার কথোপকথন ছিল অনেকটা এইরকম:

: সাজু (আমার অগ্রজ) কি সিগারেট খায়?

: জ্বী , মনে হয় খায়।

: জাহিদ খায়?

: না! মেজভাইয়া খায় না।

: সত্যি !

: হ্যাঁ, সত্যি মেজভাইয়া সিগারেট খায় না !

: আচ্ছা ! ওরা দুইজন কি একসাথে সিগারেট খায়?

: না, না, বড়ভাইয়া আলাদা খায়, মেজভাইয়া আলাদা খায় !

৫।      ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টার একপর্যায়ে, ক্রস-আটলান্টিক এক ফ্লাইটে একটা প্রেরণামূলক বাক্য আমাকে মুগ্ধ ও কনভিন্স করলো। বাক্যটি অনেকটা এরকম ছিল  “If you are able to  avoid smoking in this long flight ;  you will be able to avoid it  for the rest of  your life !

ধূমপায়ী ও অধূমপায়ী সকলকে  শুভেচ্ছা।

[ প্রথম প্রকাশ ২৪শে অক্টোবর ২০১৫ ]