by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র
প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন শহর ঢাকায় এতো দুর্বিষহ যানজট হইতেছে, আর কেনই বা আমি টোনার গৃহে প্রত্যাবর্তনে রাত্রি হইয়া যাইতেছে তাহা বোধগম্য নহে !
ইদানীং রাত্রির আহারের পরে কিঞ্চিৎ কাল বোকা-বাক্সের দিকে চাহিতে না চাহিতেই চক্ষু মুদিয়া আসে।
কয়েক দিবস পূর্বে, শ্রান্ত হইয়া গৃহদ্বারে করাঘাত করিতেই টুনি অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিল, আজও যদি জ্যেষ্ঠা টুনটুনিকে উহার বিদ্যালয়ের পাঠ না দেখাইয়া আকস্মিক নিদ্রা যাও ; তাহা হইলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! আহার সারিয়া টুনটুনির কাছে বসিয়া আবিষ্কার করিলাম, সে সবকিছুই অল্পবিস্তর পড়িয়াছে গভীরতায় যাইতে পারিতেছে না। উহাকে চুম্বক, চৌম্বকীয় শক্তি ও পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু বুঝাইতে বুঝাইতে আমি ক্রমশ: সম্মুখ-পানে ঢুলিতে লাগিলাম। আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম–আমার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিয়াছি , দেহ ক্ষীণকায় হইয়াছে। অধিক গতিতে হাঁটিতে হাঁটিতে বিমানের মতো আমি শূন্যে ভাসিয়া উড়িতে পারিতেছি। কিছুক্ষণ উড়িয়া আবার পদব্রজে চলিতেছি আবার উড়িতেছি! দূরত্ব অতিক্রম করা আমার কাছে সহজসাধ্য।
আহা ! মনে অসীম শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। ভাবিলাম , এক্ষণে মিরপুর হইতে উত্তরার কর্মস্থলে যাইবার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিতে হইবে না। টুনটুনিকে বাসায় আসিয়া শিক্ষাদান করিতে পারিব, টুনির অশ্রাব্য তিরস্কার শুনিতে হইবে না !
কিন্তু মুহূর্ত-মধ্যে জ্যেষ্ঠা টুনটুনির ধাক্কায় নিদ্রা টুটিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল ! সে স্মিতহাস্যে কহিল, নিজের শয্যায় গিয়া নিদ্রা যাও পিতা। তোমার এমত সঙ্গিন অবস্থা মাতা টুনির চোখে পড়িলে অনর্থক লঙ্কাকাণ্ড হইবে !
পুনরায় নিদ্রা যাইতে যাইতে পার্শ্ববর্তী টুনিকে বলিতে শুনিলাম , অধুনা ‘মুখ-পুস্তিকায়’ এতো পুনঃপ্রচার করিতেছ কেন ? আরো গভীর নিদ্রায় তলাইয়া যাইতে যাইতে কহিলাম, শহর ঢাকার এমত অবস্থার আশু পরিবর্তন না হইলে নতুন কিছু লিখিবার অবকাশ কোথায় ? যানজটও শেষ হইবে না ; আমারও ডানা গজাইবে না ; অবসন্ন দেহ ও মন লইয়া নতুন কিছু লেখালেখির অবসরও বোধ করি পাইব না !
সে কি বুঝিল কে জানে !
প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০১৭
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে হয়েছে। ঢাকার বিয়েতে বছর বিশেক আগে খাবার মেনু যা ছিল, এখনো তাই ; শুধু রোস্টের মুরগী দেশী থেকে ফার্মের হয়েছে, বাকী আগের মতোই।
নতুন যে ব্যাপারটি চোখে পড়ল বা আমাদের প্রজন্মের হিসাবে খানিকটা দৃষ্টিকটু লাগল, তা শেয়ার করতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রজন্মের বিয়েতে লাজুক অবনত নববধূ ছিল অনুষ্ঠানের একটা সৌন্দর্য। অধুনা, নববধূদের আগ্রাসী আচরণে আমি একবার খুশিও হলাম আবার পুরনো মূল্যবোধের মানুষ বলেই হয়তো কিছুটা মর্মাহতও হলাম। বিয়ের আসরে নববধূরা এতো স্বচ্ছন্দে তাঁদের সদ্য-প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বার্তা বলছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ; যেচে সবার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল – তা দেখে মনে হচ্ছিল এঁদের মনে হয় বছর দশেকের প্রেমের পরে বিয়ে। অথচ আমি খুব ভালোভাবে জানি, এঁদের পারস্পরিক পরিচয় দুই-তিনদিনেরও কম।পুরোটাই অ্যারেঞ্জড্ ম্যারেজ !
আমাদের সময়ে প্রেমের বিয়েগুলোতেও নববধূরা লোক দেখানোর জন্য হলেও হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে দামী মেকআপ নষ্ট করে ফেলত। সেই হিসেবে কান্নাকাটির পর্বের সমাপ্তি আমি অর্থনৈতিক হিসাবে সাশ্রয়ী বিবেচনা করছি। এখনকার বিয়ের আসরে বর-কনের মধ্যে বরটিকেই বড্ড চুপচাপ, মৃদু , ম্লান, ত্রস্ত ও বলির পাঁঠা মনে হয়েছে।
জীবনসঙ্গিনী প্রাপ্তির তীব্র ব্যাকুলতা আমার আগের প্রজন্মে কেমন ছিল সেটা আমার আম্মার মুখে শোনা একটা ‘রিয়েল লাইফ’ ঘটনা দিয়ে শেষ করি।
আম্মার গ্রামে বা আশে পাশে কোথাও এক দরিদ্র চাষির মেয়ের সঙ্গে আরেক কৃষিজীবী কামলা চাষির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে। হবু শ্বশুর আর হবু জামাতা দু’জনই সকালে চাষের কাজে যায়। মেয়ের বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হয়তো ফসল তোলা, বা আর্থিক অনটনের ব্যাপার ছিল। এখন ব্যাকুল হবু জামাতার তো আর তর সইছে না। প্রতি সকালে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের পরেই তার মৃদু ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়। তারিখ কবে ঠিক করছেন, দেরী হচ্ছে কেন , এইসব। এইরকম কয়েকদিন হওয়ার পরে শ্বশুর খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন,
” রাখো রে বাপু ! বল্লিই তো হয় না ; আমার তো একটা গোছগাছ আয়োজনের ব্যাপার আছে, নাকি ? তোমার আর কি ! তুমি তো বাপু নিবের পারলিই শুইবের পারো ! ( তুমি তো বাপু, নিয়ে যেতে পারলেই শুতে পার !) ”
পুরুষ-শাসিত সমাজে ব্যাকুলতা প্রকাশের ব্যক্তিটি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে ভালই লাগছে! আবার আধুনিক নববধূদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে , এঁদের সবার সেই চাষি হবু জামাতার চেয়েও অবস্থা শোচনীয় । কোনমতে বিয়েটা হলেই শুতে পারবে সেইটাই হয়তো সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখছে তাঁদের ; সৌজন্য-সামাজিকতার লেশমাত্রও চোখে পড়ছে না !
প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬
by Jahid | Nov 26, 2020 | ছিন্নপত্র
ছোটবেলায় আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র মানেই রনি ভাইয়ের মতো বেশী পাওয়ারের চশমা পড়া ভালো ছাত্র কেউ একজন। ১৯৭৯-তে আমরা মিরপুর পাইকপাড়াতে ভাড়া থাকতাম। বাড়ীওয়ালার ছোট-ছেলে রনিভাই ঢাকা কলেজের ছাত্র আর বুয়েটের জন্য পড়াশুনা করতেন। রাজ্যের এলোমেলো বই , গ্লোব , খেলনা, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে রুম ভরা। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলেন। ভুলন ভাই আর রনিভাই ছিল পিঠাপিঠি এবং তাঁদের বালখিল্য সুপারম্যান ও টারজানের লড়াইয়ে আমি রেফারিং করতাম। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে যে, পেটে বিদ্যা লাগে এইটা বুঝতাম।
পরে বড়-ফুফুর বাড়ীতে অন্তর্বর্তীকালীন থাকা অবস্থায় তাঁর ননদ নন্দিনী আন্টির দেখা। সম্ভবত: ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তাঁর ভাইয়ের বাড়ীতে ছুটি কাটাচ্ছেন আর পাত্রস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। উনার বিয়ে হয়ে গেল আরেক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। আবারো বুঝলাম সুন্দরী পাত্রী পেতে হলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে ! জীবনের যে কোন হিসাব নিকাশ থেকে শুরু করে সবরকম অংকেই আমি কাঁচা , সরল অংকের ফল সামনের বেঞ্চের তুহিনের যদি আসে ১ আমার আসে ১৪৫৩/১৮৫৬; কী মুশকিল !
পরিবারের চাপে ও সামাজিক এক্সপেকটেশনে বিজ্ঞান বিভাগে। তাছাড়া আমাদের সময় স্যাররাই ঠিক করে দিতেন রোল ১ থেকে ৩০ সাইন্স বাকীগুলো আর্টস বা কমার্স। নীচের কেউ যদি সাইন্সে পড়তে চায়, আব্বা-আম্মা সহ যোগাযোগ করতে হবে। আমি আবার ক্লাসে অংক, বিজ্ঞানে মাঝারি নাম্বার পেলেও বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, ভূগোলে উপরের দিকে থাকতাম। দেখা যেতো ফার্স্ট বয়, সেকেন্ড বয় অংক বিজ্ঞানে আমার চেয়ে ১৫ নাম্বার বেশী পেয়েছে। আর আমি অন্য আবঝাঁপ সাবজেক্টে তাঁদের চেয়ে ১০/১২ নাম্বার বেশী পেয়েছি। গড়পড়তায় ক্লাসে আমি আমি থার্ড ফোর্থ কিছু একটা হতাম।
আমার মেধা হয়তো সামাজিক সাহিত্যিক সাবজেক্টে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল।হলে কী হবে, সামাজিক চাপেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়া ! যদিও একটা পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান আমি ভীষণ এনজয় করেছি এবং এখনো করে চলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ, বঙ্কিম, মধুসূদন পড়ার জন্য বাংলা বিভাগে ভর্তি না হলেও চলে। কিন্তু , আপেক্ষিকতার সূত্র বোঝার জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা ভালো। একজন সাহিত্যের ছাত্র বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে পড়াশুনা করার বা উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু, একজন বিজ্ঞানের ছাত্রের সাহিত্যে উৎসাহী হওয়ার সম্ভাবনা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী !
এমন হয়েছে, টিএসসিতে গণ আড্ডায় বসেছি, কলাভবনের ভাই-বেরাদররা এমনভাবে কথা বার্তা শুরু করলো যেন আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনি নাই। কেমন করে বোঝাই ওই ক্লাসিকগুলো আমরাও অনেক আগেই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু , আঁতলামি করতে মন চাইতো না । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি বলে যদি কেউ আমাকে সাহিত্যের মফিজ ভাবে, সেটা তাঁর সমস্যা, আমার না। আমি কি পড়েছি বা কি জানি সেটাতো প্রমাণ করার কিছু না। শেক্সপিয়ার, গ্যেটে , র্যাঁবো থেকে কোট করে কেউ যদি ভাবে সাহিত্যে তাঁদের একচ্ছত্র অধিকার, আমার কী করার আছে!
এইচএসসি দিয়েই আমি বুঝে গেছিলাম , বুয়েটে চান্স পাওয়ার চান্স কম! ৩/৪ মাসের সত্যিকারের পড়াশুনা করে এইচএসসি পাশ করা যায়। বুয়েটের জন্য আরও ঘাম ঝরাতে হয়। আমার টাইমিং ঠিক ছিল না। আই মিসড দ্য ট্রেন ! বুয়েটে ব্যর্থ হয়ে , অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ‘ক’ ইউনিটে ২৫০ এর পরের সিরিয়াল। কী মনে করে ‘ঘ’ ইউনিটেও পরীক্ষা দিলাম। যতদূর মনে আছে মেধাতালিকায় ২৯তম।মহল্লার বন্ধু বড়ভাইয়ের ব্যাপক উৎসাহ দিল- ‘আরে মিঞা , এইটাই তোমার লাইন, চোখকান বুইজা আই আর বা Economics এ পড়া শুরু করো এইগুলা খুব হট সাবজেক্ট। ভালোমতো রেজাল্ট করলে বিদেশী ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, মায় শিক্ষকতা কইরা বা , কনসালটেন্সি কইরাও হুলুস্থূল জীবন।’
সোজা ভাইবা বোর্ডে গেলাম। স্যারেরা জিজ্ঞাস করলেন , ‘তুমি ইকোনমিক্সে ভর্তি হলে থাকবে তো ? নাকি বিজ্ঞান অনুষদে চলে যাবে?’ আমি মুখ চোখ সেই রকম সিরিয়াস করে বললাম, ‘আমার অনেক দিনের স্বপ্ন স্যার অর্থনীতিতে পড়া!’ স্যারেরা একটা ভর্তি ফরমে অর্থনীতি বিভাগের স্ট্যাম্পিং দিয়ে বললেন , ‘যাও টাকা জমা দিয়া ভর্তি হও।’ ওইদিকে বিজ্ঞান অনুষদে প্রথমবারে পেলাম Statistics । বাসায় গিয়া ভয়ে ভয়ে আব্বাকে বললাম আমি Economics-এ পড়তে চাই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তোকে সাইন্স পড়েয়েছি কি Economics পড়ার জন্য ? আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা পড়ে এসেছি। Economics- আর্টসের সাবজেক্ট, এর সাথে সাইন্সের কী সম্পর্ক !’ আমি আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম বিজ্ঞান অনুষদের সাবজেক্ট ভালো পাই নাই, এর চেয়ে Economics ভালো । কিন্তু আমার তোতলামি ধোপে টিকলো না। তার পরেও অর্থনীতি বিভাগের ভর্তির ছাড়পত্র অনেকদিন আমি রেখে দিয়েছিলাম কাছে, মাঝে মাঝে খুলে দেখতাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম ! বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি হলাম পরিসংখ্যানে, অ্যানেক্স বিল্ডিং এ যাই মাঝে মাঝে। ক্লাস করি কী করি না , আর একই সাথে সম্ভবত: নজরুল ইসলাম হলের বুয়েটের এক বড়ভাইয়ের কাছে যাইয়া দ্বিতীয়বারের বুয়েট প্রিপারেশন নিই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহ তিনেক না যেতেই নোটিশ আসলো ,সামনের সীট ফাঁকা হয়েছে, আমি এখন ইচ্ছা করলে রসায়ন বিভাগে মাইগ্রেট করতে পারি। ভাবলাম, যাই, কেমিস্ট্রিই ভালো , সেই সঙ্গে কার্জন হলের আশে পাশে থাকতে পারা যাবে। কেমিস্ট্রিতে হুমায়ূন আহমেদ স্যার সম্ভবত: শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। ওইখানে কিছুদিন ক্লাস করতে করতে আবার নোটিশ সিরিয়াল এগিয়েছে ইচ্ছা করলে Applied Chemistry-তে মাইগ্রেট করতে পারব। ততদিনে এদিক সেদিক পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছি। ঢাকার বাইরে একটাও না। আমি ঢাকার বাইরে পড়তে যেতে কোনভাবেই রাজী ছিলাম না। ভাই-বেরাদারদের পরীক্ষায় সাহায্য করে বেড়াতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে জাহাঙ্গীর নগরে পরীক্ষা দিয়ে ইলেক্ট্রনিকস পেলাম। যাকে হেল্প করতে গিয়েছিলাম, তাঁর কিছুটা হেল্প করতে পেরেছিলাম ; আর সময় পেয়ে বসে না থেকে খাতা কমপ্লিট করেছিলাম।
তো, বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হয়ে সপ্তাহের একদিন দুইদিন কার্জন হলে যাই। ১২ টাকা দিয়া চিকেন বিরিয়ানি খাই, চৈতালিতে বাড়ী ফিরি। মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধবের সাথে ঢাকা মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে বা টিএসসিতে আড্ডা মারি। সপ্তাহে একদিন বুয়েটের নজরুল হলে যাই। সেই বড় ভাইয়ের কাছে কিছু মডেল টেস্ট দিই। আর বাকী চারদিন মহল্লার রেগুলার বছরে বুয়েটে চান্স পাওয়া আমাদের ব্যাচের সেশনজটের আটকা পোলাপানের সঙ্গে আড্ডা দিই।
এর মাঝখানে এক বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম তুইল্যা আনছি। তোমাগো হেল্প লাগবে, ৮/১০ জন একলগে ভর্তি ফর্ম জমা দিলে , আমি হেল্প পামু, য্যাম্নেই সীট পড়ুক না কেন !’ সেই ফ্রেন্ডই সবকিছু করলো। ভর্তি পরীক্ষার দিন ভুলে বসে আমি সকালে আরেক ফ্রেন্ডের বাসায় কার্ড পিটাচ্ছি। সে এসে ধরে নিয়ে গেল।যাতায়াতের ভাড়া, চা- সিগারেটের খরচ তার। তাঁকে কিছু হেল্প করতেও পারলাম। আমি নিজের খাতাও পূর্ণ করলাম। পরে দেখি, আমি মেরিট লিস্টে, কিন্তু বন্ধু ওয়েটিং লিস্টে !
ওই সময় আব্বাকে কেউ বোঝালো , টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই ভালো সাবজেক্ট । আমার জনৈক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আবার কোন টেক্সটাইলে যেন অনেক বেতনের চাকরি করেন। টেক্সটাইলে এক্সপার্ট লোকের অভাব আছে, চাহিদা অনেক। আমার ছোটমামারও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারে ভোট ছিল। আমি যতোই গাঁইগুঁই করি না কেন আব্বার ঝাড়ির চোটে তৎকালীন কলেজ অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি-তে ভর্তি হয়ে যেতে হল। ওইদিকে ওয়েটিং লিস্টের ফ্রেন্ডটাও জোরাজুরি করলো। তাছাড়া অনিশ্চয়তাও ভালো লাগছিল না। অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে গেলাম ভর্তি হয়ে টেক্সটাইলে। ওখানকার জীবন, হল লাইফ, সে আরেক কাহিনী।
আব্বা অনিয়মিতভাবে হিন্দি সিনেমা দেখতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই সময়ে যদি আমির খান থ্রি ইডিয়ট( 3 Idiots) ছবিটা বানাতো আর আমার আব্বা যদি কোনক্রমে সেটা দেখে ফেলতেন; তাহলে আজ হয়তো আমি একজন অর্থনীতিবিদ হতে পারতাম !
by Jahid | Nov 26, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার দুই টুনটুনির জ্যেষ্ঠাটির সহিত আমার আলাপচারিতা বা নৈকট্য খানিকটা বেশী। ছোট টুনটুনি কিঞ্চিৎ সেলিব্রেটি টাইপ হইয়াছে, যথোপযুক্ত বিষয় বা পরিবেশ-প্রতিবেশ না পাইলে, সে যাহার তাহার সহিত আড্ডার অর্গল না খুলিয়া বরং নীরব হইয়া থাকে। বিদ্যালয়ের পাঠাভ্যাসের খোঁজ লইতে গিয়া প্রসঙ্গান্তরে কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘পঞ্চম-শ্রেণী পড়ুয়ারা মধ্যবর্তী খাদ্যগ্রহণের সময় কি ধরণের আলাপ-আড্ডা করিয়া থাকে?’
টুনটুনি কহিল, গতকল্য তাহাদের আলোচ্য ছিল কাহার কাহার মাতার ফেসবুক আসক্তি আছে তাহা ! আমি ভিমড়ি খাইতে খাইতে নিজেকে সামলাইলাম ! টুনটুনি কহিল , বিস্ময়কর-ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বালকবালিকা নাকি হস্ত উত্তোলন করিয়া সায় দিয়াছে যে , তাহাদের মাতারা ফেসবুক আসক্ত ! আমার কন্যা টুনটুনি হস্ত উত্তোলন করে নাই! কেননা সে জানে তাহার মাতা, টুনির ওই আসক্তি নাই। কথা শেষ হইয়াও হইল না শেষ, কাঁধ ঝাঁকাইয়া স্মিতহাস্যে সে বলিল, ভাগ্যিস প্রশ্নটা মাতা লইয়া ছিল, পিতা ফেসবুক আসক্ত কিনা তাহা আলোচ্য হইলে, তাহাকে নাকি দুই হস্ত উত্তোলন করিতে হইত!
সন্ধ্যায় সে আমাকে আবার পাকড়াও করিল, ফেসবুকের ইতিহাস কি কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সংক্ষেপে যাহা বিশ্বাস করি তাহাই বলিলাম। বলিলাম, মূলত: নতুন প্রযুক্তি সর্বদাই আমাকে আকৃষ্ট করে এবং আমি তাহা সর্বদাই সাদরে বরণ করিয়া লইয়াছি। সমগ্র জনগোষ্ঠী সাদা আলোকোজ্জ্বল সরু ট্রাই-ফসফেট ফ্লুরোসেন্ট বাতি ব্যবহার করা শুরু করিলে আমি কেন হলদেটে টাংস্টেন ফিলামেন্টের বর্তুলাকার বাতি ব্যবহার করিব ? যুগের সাথে তাল মিলাইয়া চলিতে হইবে, ইহাই রীতি।
তবে, কথা থাকিয়া যায়। সকল যুগে সকল প্রযুক্তির শুভঅশুভ দুই দিকই ছিল ও থাকিবে। ব্যবহারকারীরা উহার শুভ-দিক বাছিয়া লইবে নাকি অশুভ-দিক লইয়া মাতামাতি করিবে, তাহা নিতান্তই তাহাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি ; ইহাতে প্রযুক্তির দায়ভার কোথায় ?
বুদ্ধিমতী টুনটুনি সহজেই আমি টোনার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিতে পারিল ও নিজের পড়ায় মনোনিবেশ করিল।
[ প্রকাশকালঃ ২২শে নভেম্বর, ২০১৬ ]
by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
গত অপরাহ্ণে কন্যা বড় টুনটুনি কহিল, ‘ পিতা তোমার বিরল কেশ দিনেদিনে আরও বিরল হইতেছে এবং একাধারে প্রবল ধবলবর্ণের প্রকোপে তোমাকে আরও অকালবৃদ্ধ দেখাইতেছে। আমার অন্য সকল সখীদের পিতা তোমার বয়স্য বা অগ্রজ হইলেও তোমার তুলনায় তাহারা অনেক তরুণতম। দয়া করিয়া অবশিষ্ঠ যাহা কেশ বর্তমান আছে তাহা কালো রঙে রঞ্জিত কর ; তোমার এহেন বার্ধক্যপীড়িত চেহারা পছন্দ হইতেছে না। তুমি কি দেখ নাই, জননী নিয়মিত কেশপরিচর্যা করে, সৌন্দর্যবর্ধনকারী দক্ষ দোকানসমূহে মাসিক বরাদ্দে যাতায়াত করে ; ফলশ্রুতিতে তাহার চুলের সঠিক বর্ণ ও তাহার নিজের বয়স আন্দাজ করা মুশকিল হইয়া পড়ে !’
একবার ভাবিলাম তাহাকে বুঝাইয়া বলি, ‘ইহাই নিয়তি ! কেশ পক্ক হইবে, চর্ম ঝুলিয়া যাইবে, গেঁটেবাত হইবে ; ইহার পরে একসময় মধুমেহ, হৃদরোগ একত্রে আসিয়া আমাকে অবসন্ন জীবনসায়হ্নে উপস্থিত করিবে।’ পরে ভাবিলাম, এই মুহূর্তে তাহার জন্য এই ব্যাখ্যা অধিকতর বেদনাদায়ক হইবে ; যাহা অপ্রয়োজনীয় , অনাবশ্যকও বটে ! অতিবাহিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সকল বাস্তবতা বুঝিতে সক্ষম হইবে।
অতঃপর আমার চিরাচরিত আশাবাদী মন লইয়া হাসিহাসি মুখশ্রী করিয়া কন্যাকে কহিলাম, ‘আমার যে এখনো কয়েকগুচ্ছ কেশ মস্তিষ্কের উপরিধারে বর্তমান আছে, আমি তাহাতেই অপরিসীম খুশী। চুলের ধবলবর্ণ লইয়া দুশ্চিন্তা করিবার অবকাশ কোথায়!’
প্রকাশকালঃ ১লা অক্টোবর,২০১৬
by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র, দর্শন
ছোট্ট দুইটা গল্প বছর ত্রিশেক আগে শোনা। স্মৃতি থেকে লিখছি। অনেকেরই মূল গল্পদু’টো হয়তো আরেকটু ভাল করে জানা আছে ।
গল্প ১ :
বহুদিন আগের কথা , সমাজে টোল ছিল , পাঠশালা ছিল, পণ্ডিতও ছিল। এবং নদী পার হওয়ার একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। এখন অনেক নদী ও খালই হেঁটে পার হওয়া যায় ।
তো একদিন এক পন্ডিত নৌকায় নদী পার হচ্ছিলেন । নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে অক্ষরজ্ঞানহীন মাঝিকে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন,
: মাঝি তুমি কি ত্রিকোণমিতি জানো?
: নাহ্।
:তবেতো তোমার জীবনের চার আনাই মিছে।
: তুমি মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলতে পারো?
: না তো।
: তবেতো তোমার জীবনের আট আনাই মিছে।
: তুমি কি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন সম্পর্কে ধারণা আছে ?
: এগুলো কি খায় নাকি গায়ে মাখে বাবু সাব?
: তোমারতো দেখি জীবনের বারো আনাই বৃথা !
এমন সময় নদীতে ঝড় উঠলো । বড় বড় ঢেউ এসে নৌকায় আঘাত করা শুরু করলো। পন্ডিতও ডুবে মরার শঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে লাগল।
দূরাবস্থা দেখে মাঝি বললো, বাবু সাব আপনি কি সাঁতার জানেন?
: না। সাঁতারতো জানিনা।
মাঝি হাসি দিয়ে বললেন, জনাব! আপনার দেখি জীবনের ষোল আনাই মিছে !
গল্প ২ :
খেয়া নৌকারও আগের কথা। নদী পার হওয়া নিশ্চয়ই আরো ঝক্কির ছিল। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া জনমনিষ্যিহীন শূন্য ঘাট পড়ে থাকতো । নদীর পাশে কোন এক জনপদে একদল সন্ন্যাসী বাস করত। একজন সদগুরুও ছিলেন। অনেক শিষ্যের মাঝে একনিষ্ঠ এক শিষ্য সাধনায় গুরুকেও প্রায় হার মানিয়ে দিল।
দীর্ঘ একযুগের সাধনার পরে শিষ্য এসে গুরুকে বললো, গুরু আমি এখন সাধনার বলে পানির উপরে হাঁটতে পারি, হেঁটে নদী পার হতে পারি।
শিষ্য পরিবেষ্টিত গুরু উল্টো প্রশ্ন করলেন , নদী পার হতে কয় আনা লাগে রে ?
: চার আনা।
: বারো বৎসরের সাধনায় তুই মাত্র চার আনার শিক্ষা অর্জন করলি !
ফুটনোট : গুরু সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন, হাতির দু’ই রকম দাঁত থাকে, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার ! অনেক গল্পের দ্বৈত অর্থ থাকে। উপরের গুলোরও হয়তো আছে, হয়তো নেই !
সাম্প্রতিক মন্তব্য