কর্পোরেট অবজার্ভেশন (জব ডেসক্রিপসন)

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে Job Description বা Job Responsibilities–ব্যাপারটি সূর্যালোকের মত স্পষ্ট ও আবশ্যকীয় হলেও সবচেয়ে অবহেলিত একটা বিষয়। নিয়োগ-দাতা ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেন না । BDJobs ঘেঁটে আরও কয়েকটি বিজ্ঞপ্তি থেকে Job Responsibilities কপি-পেস্ট করে দেন। আবার যিনি চাকুরিপ্রার্থী, কোন একটি নতুন পজিশনে যোগদান করতে যাচ্ছেন তারও বিষয়টি নিয়ে অনেকাংশে স্পষ্ট ধারণা থাকে না ।

বেশ কয়েকবছর টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির প্রোডাকশনে কাজ করে , নানা কারণে মার্চেন্ডাইজিং-এ চলে এসেছিলাম। কীভাবে কীভাবে BEXIMCO নামের সমুদ্র থেকে OPEX নামের মহাসমুদ্রে এসে পড়লাম, সে গল্প আরেকদিন ! ওখানে গিয়ে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, অসমবয়স্ক বন্ধু-স্থানীয় কলিগকে জিজ্ঞেস করলাম, কারখানার মার্চেন্ডাইজিং এর Job Responsibilities কী কী ! সে খুব গম্ভীর মুখ করে বলল , ‘ শোন্‌ ! মার্চেন্ডাইজারদের ক্ষেত্র-বিশেষে ডিমপাড়া ছাড়া সবকাজই করতে হতে পারে!’ আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ মানে কি ?’ সে তার পূর্বতন কারখানার নানা অম্লমধুর অভিজ্ঞতার কথা বলল। তার ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে প্রায়শ: কারখানার মালিকের বাসায় বাজারও পৌঁছে দিতে হয়েছে ! আমি যারপরনাই হতাশ হলেও ; সৌভাগ্যক্রমে OPEX গ্রুপের কাজের সময়টিতে আমাকে অতদূর নামতে হয়নি !

মূল প্রসঙ্গে আসি। কেন জানিনা, গালভারী কিছু টাইটেলের মাঝে আমাদের কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার “Job Description বা Job Responsibilities” আলোহীন ছায়ায় অপুষ্ট হয়ে থাকে। এবং বছর-শেষের দেনাপাওনা বা বেতনবৃদ্ধির ব্যাপারগুলো যখন মুখোমুখি চলে আসে, ভুল বোঝাবুঝির শুরু হয় তখনই । ‘ব্যবসা খারাপ’ এটা-তো প্রথম গৎবাঁধা বুলি। এরপর আসে আরও গভীর উচ্চমার্গের কথাবার্তা। মালিকপক্ষ কর্মচারীকে বোঝান, আসলে তাদের এক্সপেকটেশন ছিল ‘ওইটা’ ! ‘সেইটা’ আবার আলোচ্য কর্মচারীটি পূরণ করতে পারে নাই অথবা লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেননি। ‘আরও ভালো ব্যবসা হওয়া উচিৎ ছিল’ বা ‘Could have been better! ‘ – টাইপ কথাবার্তা ! ভালোর কী আর শেষ আছে ! ওইদিকে কর্মচারীও সারাবছর কী কী ধরণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন , কতখানি পরিশ্রম আর বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার স্মৃতি হাতড়ান। সারাবছরের পুণ্য ,ছোটখাটো দুয়েকটা Discount বা Claim-এর পাপে কাটাকাটি হয়ে যায় ! মালিক-পক্ষের সামনে হাস্যকর ভাবে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতে হয় যে, শুধুমাত্র বাজারে তার ইজ্জত রক্ষার জন্য হলেও কিছু বেতন বৃদ্ধি করা দরকার !

অধুনা Yearly Business Target, Business Growth, Target Achievement , Appraisal বহুবিধ গালভারী টার্মের প্রচলন হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ঐ পর্যন্তই ! বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মালিক-পক্ষকে কে কীভাবে তৈল-সিক্ত করবে এবং বোঝাতে পারবে , সে সারাবছর সে কী করেছে এবং আরও কী করা সম্ভব !আসলে এই তেল বা প্রেজেন্টেশনের অনেকাংশে নির্ভর করে বেতনবৃদ্ধি, গাড়ীবাড়ি ইত্যাদি । আর, কেউ যদি ভাবে, সে তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে এবং সেটার শতভাগ নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হয়ে বছর শেষে সঠিক বেতন বৃদ্ধি বা প্রণোদনা পাবেন ; তাহলে সে আমার মতোই নির্বোধ ! ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচরাচর সেটা হয় না। সম্ভবত: উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রীতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘ তৈল’ নামের প্রবন্ধটি পাঠ্য ছিল। তেল যে সমাজজীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তাঁর মতো এতো মধুর করে বাংলা সাহিত্যে কেউ প্রকাশ করতে পারেন নি । এক বন্ধুর কাছে শোনা। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বয়োবৃদ্ধ মালিককে তার এক কর্মচারী নাকি অভূতপূর্ব উপায়ে তৈল-সিক্ত করছিলেন । তো , বৃদ্ধ মালিক এক পর্যায়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন , ‘আঁরে তেল দিস্‌ না রে ; তেল আঁরে ও ধরে!’ ( আমাকে তেল দিস না, তেল আমাকেও ধরে !) সুতরাং আপনি যতো বড় মালিক বা কর্মকর্তা হন না কেন , তেল আপনাকে ধরবেই ! মনে রাখবেন, তেল কর্পোরেট জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ( সময় হলে , নেট ঘেঁটে ‘তৈল’ প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন। )

আমার কর্মজীবনে আমি হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে ! আমার পূর্বতন Boss -রা একে একে সবাই, আমার অযোগ্যতা হাতেকলমে ও অর্থনৈতিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন। এর উপরে আছে আমার বিখ্যাত আলস্য ! সুতরাং ঘনঘন প্রতিষ্ঠান বদলানোর সৌভাগ্য হয়নি আমার। কর্পোরেট অভিজ্ঞতা যাই বলিনা কেন,ঘুরেফিরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। আলতোভাবে বলতে হবে ; নতুবা কাছের বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীরা বা পাঠকেরা সহজেই বুঝে ফেলবেন ! কর্মজীবনে কোন এক প্রতিষ্ঠানের ক্রান্তিকালে, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে নতুন অবস্থানে ফিরে আসতে হয়েছিল আমাকে। ক্রান্তিকালীন সময়ে যা হয়, রীতিমত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা ; সহকর্মীদের মাঝে নানারকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব । তো মালিকের অনেক অপ্রিয় কাজ করার জন্য ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলোর’ মত কাউকে না কাউকে দরকার । চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে? মালিক বা নবীন অ্যাডমিন ভরসা পাচ্ছেনা সেটা হ্যান্ডেল করতে। নতুন লোক রিক্রুট করতে হবে ? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ কাউকে দরকার ছিল সেই মুহূর্তে! মাত্রই একটা স্বৈর যুগের অবসান হয়েছে। নতুন অনেক নিয়ম তৈরি করতে হচ্ছে। নানা ধরণের ম্যানুয়াল, ইন্সপেকশনের ফরম্যাট সংশোধন। সাপ্লায়ারদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কের ঝালাই ; সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। ঐ কাজ করতে গিয়ে আমার প্রায় আড়াই-তিন বছর চলে গিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের বিশাল জাহাজের পালে বাতাস লেগে সেটি বাজারে সুনামের সঙ্গে আবার চলা শুরু করল। আমি ধরে নিয়েছিলাম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আমি আমার সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেছি । প্রতিষ্ঠানকে একটা কিনারায় নিয়ে আসা এবং ঐ মুহূর্তে মালিক পক্ষের জন্য ও প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল আমার অবদান। মুশকিল হচ্ছে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে, সেই প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পড়ে গেলাম আমি । অতঃপর সবদিক সবার থেকে গেলাম পিছিয়ে। কেননা , দুটো সহজ ব্যাপার আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম , যেটি আমার এক সুহৃদ অগ্রজ ঝাঁকি দিয়ে মনে করিয়ে দিলেন।

প্রথমত: আমার মূল পরিচয় হচ্ছে –আমি মার্কেটিং বা সেলস্‌ এর লোক। দিনশেষে মালিক পক্ষ ব্যবসা চাইবে, মুনাফা খুঁজবে, বাকীসব অনাবশ্যক ! ব্যাপারটা অনেকটা এরকম –ধরুন আপনি সঙ্গীত বা চিত্রশিল্পী, যুদ্ধের সময়ে রাইফেল কাঁধে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দ্রুততার সাথে আবার আপনার নিজের জগতের ফিরে আসতে হবে। আপনি কৃষক হলে মাঠে, জেলে হলে নদীতে। তা না করে, আপনি যদি যুদ্ধস্মৃতি রোমন্থন করেন এবং আশা করেন যে, ক্রান্তিকালীন যোদ্ধার পরিচয়ে আপনার বাকী জীবন চলে যাবে—তাহলে তো হবে না ! যাই হোক! মূল পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি যখন দিনরাত এক করে ছুটছি ; সেই সময় আমার অন্য সহকর্মীরা যার যার ডিপার্টমেন্টের ব্যবসা বাড়িয়েছেন। এবং যথারীতি মালিকপক্ষের কাছ থেকে যাবতীয় সুযোগসুবিধা কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিয়েছেন। কর্পোরেট ভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে আমি গেলাম পিছিয়ে। আমার সহকর্মীরা নিজের পরিচয়ে, নিজের Job Responsibilities নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, ক্রেতাকে সময় দিয়েছেন, ট্রাভেল করেছেন , ব্যবসা বাড়িয়েছেন । তাদের এনে দেওয়া নগদ মুনাফায় মালিক খুশী হয়েছেন; তাদেরকেও সাধ্যাতীতভাবে অফিসিয়ালি ও আনঅফিসিয়ালি লভ্যাংশ দিয়ে খুশী রেখেছেন। ক্রান্তিকালীন সময়ে মার্কেটিং বা সেলস এর থেকেও অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ বা কোম্পানি রিকন্সট্রাকশনের কাজ যে অনেকবেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল ; মালিক পক্ষ তা দিব্যি ভুলে বসে আছেন এবং আমার মনে হয় কর্পোরেট জগতের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম!

দ্বিতীয়ত: সেই অগ্রজ বন্ধুটি আমাকে আরও মনে করিয়ে দিলেন–এমন কোন কাজে নিজেকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখবেন না যেটা মালিক যে কোনও সময় প্রতিস্থাপন করতে পারেন । যেমন অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ কাজ ! এডমিনের কাজ মালিক যে কোন সময় টেক-ওভার করতে পারেন। ইচ্ছে হলেই, একদিনেই তিনি নিজে অথবা তার বংশধর বা নিকটাত্মীয়কে দিয়ে পুরো কোম্পানির অ্যাডমিন ও ম্যানেজমেন্ট বুঝে নিতে পারেন। আপনি মুহূর্তেই গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু , আপনি যখন মার্কেটিং , সেলস অথবা টেকনিক্যাল কোন কাজে জড়িয়ে আছেন, আপনার নিজের আসল পরিচয়ে টিকে আছেন–আপনাকে এতো সহজে মালিক পক্ষ প্রতিস্থাপন করতে পারবেন না। সুতরাং অবস্থাভেদে সময়ের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের জন্য যে কাজই করেন না কেন, নিজের মূল পরিচয় ভুলে যাবেন না ।

প্রকাশকালঃ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( ব্যর্থতার আতঙ্ক )

একজন হতাশ, ব্যর্থ লোকের সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো আজকে। দুঃখিত পাঠক ও পাঠিকা, তিনি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন বলে উনাকে ব্যর্থ একজন বললাম। কারণ , আমি বা আপনি , আমাদের চারপাশের সবাই মানুষকে অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়েই মাপেন।

ভদ্রলোক বছরকয়েক আগে বড়ো কর্পোরেট চাকরি করতেন, বাইপাস সার্জারিতে সহায়-সম্বল শেষ। শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘবিরতিতে উনি উনার চাকরিজীবনের আগের পজিশন হারিয়েছেন। এইটা খুব স্বাভাবিক । তাঁর অধস্তনরা উনাকে ফেলে চলে গেছে সামনের দিকে , বয়স ও শারীরিক কারণে নতুন চাকরি পাওয়া অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। সবাই, তাঁকে এড়িয়ে চলেন ; হুম হাম করে পাশ কাটিয়ে যান।

ভেবেছিলেন ব্যবসা করবেন। ব্যবসা করার যোগ্যতা বা মূলধন কিছুই নাই। কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নাই। ত্রিশঙ্কু অবস্থা । আমি নিজেও , ব্যবসার ‘ব’ ও বুঝি না। উনাকে বললাম, ‘চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে হলেও পুরনো মালিকের ওখানে জয়েন করেন , যে পজিশনেই হোক না কেন, আপনাকে দিয়া ব্যবসা হবে না। কিছুদিন চাকরি করার পরে হয়তো কোন না কোন পথ পেয়ে যাবেন।’
আমাদের কর্পোরেট জগতের সবাই, খুব ভিতরে একজন আতংকিত ব্যর্থ মানুষকে বয়ে নিয়ে চলছি। আমরা কেউ জানি না, কখন কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যর্থ লোকটা বের হয়ে আসবে সামনে !

প্রকাশকালঃ ৭ই জুন,২০১৩

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( তোতা কাহিনী )

এক লোক তোতা পাখি কিনতে দোকানে গিয়েছে। অনেক ঘুরে এক দোকানে থিতু হলেন।
দোকানদার সারিবদ্ধ তিনটা তোতা পাখিকে দেখিয়ে বলল , একদম বাম দিকের তোতা পাখির দাম ৫ হাজার টাকা!
: এতো দাম ?
: শোনেন, এই তোতা পাখি বাংলা, ইংরেজি আর হিন্দি ৩টা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে!!

পরের তোতা পাখিটার দাম জিজ্ঞেস করল ভদ্রলোক।
সেটার দাম আরো বেশি ১০ হাজার টাকা !!!
: এর গুণাবলী কি ?
: এর দাম বেশি কারণ এই তোতা পাখিটি আগেরটি যা পারে তা তো পারেই ; সেই সংগে ঐ তিনটা ভাষায় লেখালেখিও করতে পারে !!

স্বভাবতই উৎসাহের চরমে পৌঁছে, বাকী থাকা শেষের তোতা পাখিটির দাম জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
: ২০ হাজার টাকা !!!
ভদ্রলোক উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এর বিশেষ গুণাবলী কি কি ?

দোকানদার বলল, ‘ সত্যি কথা বলতে কি , আমি এই তোতা পাখিকে কখনই কিছু করতে দেখি নি ! সারাদিন বসে বসেই থাকে ; কিন্তু অন্য সব তোতা পাখিরা একে BOSS বলে ডাকে !!!

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( শিল্পীজীবন )

অনেকদিন আগে ট্রেডের এক বড়ভাই কথাচ্ছলে আমাদের কর্পোরেট জীবন নিয়ে বলেছিলেন–‘ আমাদের জীবন অনেকটা সঙ্গীতশিল্পীদের মতো।

যতক্ষণ কণ্ঠে গান আছে,ধবধবে চাঁদোয়া, পরিষ্কার স্টেজ, যন্ত্রের টুং টাং , গুণমুগ্ধ শ্রোতা, হাততালি, কতকিছু! ‘কণ্ঠে গান নাই, কে শুনবে ওই মাধুর্যহীন, বেসুরো , রিক্ত শূন্য ঘর্ঘরে গলার আওয়াজ! যতক্ষণ কোম্পানির জন্য কাজ করতে পারছেন; সবই আছে !বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাজ বা যোগ্যতার কমতি হলে আপনার অবস্থা সেই রিক্ত কণ্ঠের সঙ্গীত শিল্পীর মতোই । সেইসব রাজসিক মুহূর্তগুলো তখন শুধুই স্মৃতি !

প্রকাশকালঃ ৪ঠা এপ্রিল,২০১৭

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( চাকরি ভালোবাসার সহজ পদ্ধতি )

আজ সকালে আমার প্রাক্তন বসের কাছ থেকে মেসেজ পেলাম।
উল্লেখ্য, তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দুর্দান্ত বন্ধুসুলভ। কিন্তু এতো কঠিন সত্য, নিদারুণ বাস্তবতা –কেউ এইভাবে বলতে পারে? এই অব্‌জার্ভেশনে আমি মুগ্ধ !

1. If you don’t love your job, take a home loan; you’ll start loving it.
2. Take another loan; you will start loving your boss as well.
3. Get Married… You will start loving your office too.

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ও বাঙালি চরিত্র

আমার বর্তমান কর্মস্থলের মালিক-পক্ষ ও প্রধান কার্যালয় সিংগাপুরে ।
বাংলাদেশীদের চরিত্রের একটা ব্যাপার নিয়ে প্রায়শ: আমার সাথে তাঁদের কথা হয়।

আমাদের সামাজিকতায় অধীনস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সরাসরি ঊর্ধ্বতনকে কোন কথা বলতে পারে না। রুমে ঢুকে নানা রকম খাজুরালাপ করেন ; ত্যানা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শেষে এসে আসল কথা বলেন।

আমাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের সমস্যাটা কি, সরাসরি কেন আসল কথা বলতে পার না ? কেন অযথা সময় নষ্ট কর?’

আমি তাঁদেরকে বললাম, কেন –এটা আমিও বুঝি না। তবে এই অভ্যাস আমাদের মজ্জাগত। খাজুর করা ও ত্যানা প্যাঁচানো আমাদের জাতিগত বদভ্যাস !

প্রাসঙ্গিক ,অনেক আগে শোনা আমাদের পূর্ববঙ্গের একটা গ্রাম্য কাহিনী মনে পড়ে গেল।
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে উঠানের দাওয়ায় বসে একলোক তামাক খাচ্ছে আর দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে বেড়া তৈরির কাজ করছে।
ওই সময় এক পথচারী এসে পাশে বসলেন।
লোকটার পাশের ছেলেটা বলল , ‘আব্বা তুমার জন্যি আবার তামাক সাজা নিয়ে আসি।’
লোকটা বলল ‘যা সাজায়ে নিয়ে আয়।’
তো পথচারী ও ঘর্মাক্ত লোকের কথোপকথন অনেকটা এই রকম ছিল। স্মৃতি থেকে লিখছি।
পথচারী, ‘ভাই কি করতেছেন?;
তিরিক্ষি মেজাজে লোকটা খেঁকে উঠলেন, ‘দেখতেইতো পারতেছেন কি করতিছি।’
‘ভাই ওই যে ছাওয়ালটা তামাক সাজাতি গেল, সিডা কি আপনার ছাওয়াল ?’
‘আরে মরণ ! আমাক বাপ ডাইকলো কেবল, ওই ছাওয়াল আমার না তো কি আপনার?’
‘ভাই, এই বাড়ীডাও কি আপনের ?’
‘না , এই বাড়ী আমার না আপনার ! কি কতি চাচ্ছেন সুজা করে কনতো।’
‘না, মানে হাঁইটে যাচ্ছিলাম তো, ভাবলাম আপনার কাছ থেকে দুইটান তামাক খায়া যাই, একটু খাজুর করতিছিলাম আর কি।’
‘তামাক খাবেন সিডা সরাসরি কলিই তো হয়।’

তো আমাদের সিংহভাগ জনতাই ওই পথচারীর মতো। তামাক খাওয়ার কথা সরাসরি না বলে খাজুর করি, ত্যানা প্যাঁচাই।
এর মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্যের বিষয় আছে নিশ্চয়ই । কিন্তু এই গ্রাম্য-কাহিনী দিয়ে আমাদের বাঙালী চরিত্র যতো সহজে আপনারা বুঝবেন, আমার বিদেশী সহকর্মীদের সেটা বোঝানো সম্ভব না !