তৃতীয় বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। গত বিশ বছর ধরে BGMEA-এর চলতি ও হবু নেতাদের সঙ্গে আমার যখনই দেখা হয়েছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটা এখানে বলে ফেলাটা মন্দ হবে না। তাঁদেরকে ‘হবু নেতা’ বলছি এই কারণে ; নির্বাচনের আগে অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও নির্বাচনের পরে সেই সব শিল্পপতি উদ্যোক্তা বড়ভাইদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁরা বাংলাদেশের চিরাচরিত নির্বাচন পরবর্তী নিয়ম মেনে চলেছেন !

প্রথমত: নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পরে আমাদের গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানাগুলোর নিজস্ব র‍্যাঙ্কিং থাকা উচিৎ ছিল ! বছর বিশেক আগেই আমার মতো শিক্ষানবিশের কাছেও মনে হয়েছিল– কারখানার রেটিং অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। রেটিং নেই বলেই আমাদের মধ্যে সুষম ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নেই। এবং তার পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন নানা প্রান্তের নানা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা। BGMEA নিজেই র‍্যাঙ্কিং করতে পারত। কারখানার এই রেটিং আমাদের দেশের নিরপেক্ষ কারো মাধ্যমেই হতে পারত। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে।

আফসোস! সেই র‍্যাঙ্কিং অবশেষে হল, তবে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার পরে। ACCORD ও ALLIANCE নামের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ঘাড় ধরিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করিয়ে নিল। নিজেদের মতো করে তাঁরা রেটিং করে দিল। ফাঁকতালে ফায়ার-ডোর থেকে শুরু করে আরো কিছু পণ্যের মধ্যসত্ত্বভোগী কোম্পানিগুলো নমিনেশন নিয়ে দু’ পয়সা কামিয়ে নিল।

বছর দশেক আগেও দেখেছি গাজীপুরের কোন কারখানা যখন সবরকম নিয়মকানুন ও কমপ্লায়েন্স মেনে একটা প্রিন্টেড কটন টি-শার্টের দাম দিয়েছে $ ২.০০~ $ ৩.০০ সেখানে রামপুরা , বাড্ডা, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ বা অন্যকোন দুর্গম এলাকার ২/৩ লাইনের একটা কারখানা অথবা ‘হল-মার্কস’-এর মতো লুটের টাকার কারখানা দাম দিয়েছে $ ১.৫০ বা আরো কম। সাদা চামড়ার ক্রেতাদের এর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই কুখ্যাত ‘টেন্ডারবাজি’ । ও এতো দিয়েছে , তোমাকেও এতো দিতে হবে ! সবচেয়ে ভালো নামকরা ট্রেডিং এজেন্ট ও ভালো কারখানাগুলোকে এরা অসহনীয় টার্গেট মূল্য মেলাতে ও গেলাতে বাধ্য করত। এখনো করছে , এবং সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই আমাদের পথচলা।

আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভারত, চীনে এলাকাভিত্তিক পণ্য তৈরির সর্বনিম্ন মূল্য-তালিকা আছে। কারখানার ও এলাকাভিত্তিক রেটিং আছে বহু আগে থেকেই। ক্রেতা যে কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে কোন একটা দাম কোন একটা দাম চেয়ে বসলেন সেই সম্ভাবনা কম। আমাদেরও কারখানার রেটিং হল অবশেষে তবে অন্যের হাত দিয়ে। নিজের রান্নাঘর আর বাসস্থানকে বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট নিতে হল যে, আমাদের রান্নাঘরও ঠিক আছে, আমাদের বসবাসের জায়গাও ঠিক আছে !

দ্বিতীয়ত: BGMEA নেতাদের কাউকে কাউকে ফাঁকে ফোকরে বলার চেষ্টা করেছি, এতো কিছু করছেন, শ্রমিকদের ডাটাবেজ করছেন না কেন? আজকে একজন দাগী আসামী কোন একটা কারখানার সর্বনাশ করে আরেক এলাকার আরেক কারখানায় যোগ দিচ্ছে। কোনভাবেই তাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। সে গিয়ে অন্য এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। ডাটাবেজ থাকলে, নির্দিষ্ট শ্রমিক কত বেতনে শেষ চাকরিটি করেছে, ও কোন স্কেলের ও দক্ষতার সেটার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ডিজিটাল ডাটাবেজ অবশেষে শুরু হয়েছে বছর দুয়েক আগে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেটা থমকে আছে।

উপরের দুইটি বিষয় কেন হচ্ছে না– সেই ব্যাপারে আমার নিজের মত করে নিজস্ব মতামত আছে। আমরা নিজেরা নিজেদের কারখানাগুলোর রেটিং করিনি এতোদিন– সেটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আলস্য, দুর্নীতি , অতিলোভী, মুনাফাখোর মানসিকতা আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে নিজেদের মূল্যায়ন করতে দেয় নি।

আর শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি কারণ, কোন কোন মালিকেরা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি প্রতিবছরে এমন জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছেন, তাঁদের দরকার ছিল ‘তৈরি শ্রমিক’। সেটা একভাবেই সম্ভব ! পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে তৈরি শ্রমিককে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। দেড়গুণ বা দ্বিগুণ বেতন দিয়েও অনেক কারখানা অন্যদের শ্রমিক সরিয়েছেন। এখন সঠিক ডাটাবেজ হলে এটা ঠিক এইভাবে সম্ভব হতো না। নিজেদের স্বার্থেই হয়তো শ্রমিকদের ডাটাবেজ হয়নি এতোদিন।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পণ্যকে , বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য সরকারি লোকের উপরে ভরসা করে থাকলে, ‘সে গুড়ে বালি’। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে, লবি দিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় কিছু এক্সপোজিশন হয়, যেটাকে মেলা বলা যেতে পারে; ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা। ওইরকম কয়েকটি মেলায় যেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বুথ বা সেবা ও তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যে মেধার লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছি ; মনে হয়েছে তার চেয়ে এঁদের না আসাই ভালো ছিল। স্বজনপ্রীতি দিয়ে গুচ্ছের সরকারি লোককে এই সব সফরে পাঠিয়ে কাজের চেয়ে দুর্নামই বেশি হয়েছে । অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্যতিক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার এখনো হয় নি।

চারিদিকে হতাশার কথা বলার মানুষের অভাব নেই ; আশাবাদের কথা বলার লোকের বড্ডো অভাব।নিজেদের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে, অন্য কেউ বাজিয়ে দেবে না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মালিকপক্ষ বুঝবেন ততই আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রেডের জন্য ভালো।

প্রথম প্রকাশ: ১৮ই মে, ২০১৭
[ উল্লেখ্য, এই লেখা যখন লিখেছি, তখনও বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি সেভাবে শুরু হয়নি, এখন আমাদের ৩০০ এর অধিক পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানা আছে। ]