by Jahid | Nov 25, 2020 | দর্শন, শিল্প ও সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি
অনেক আগে পড়া একটা সায়েন্স ফিকশন মাথায় ঘুরছে। A Sound of Thunder ( Ray Brudbury; 1952) উল্লেখ্য , একসময় আমি তিনবেলা খাওয়ার মতো প্রায় নিয়মিত বই পড়তাম। এখন তিনবেলার জায়গায় ছয় বেলা খাই, তবে বই পড়ি না। গুগোলকে জিজ্ঞাসা করতেই লিংক দিয়ে দিল। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।
http://teacherweb.com/ON/SacredHeartHighSchool/MrStriukas/A_Sound_of_Thunder.pdf
গল্পের দৃশ্যপট আমেরিকা । ১৯৫২ সালের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনের কয়েকদিন পর। মিঃ কিথ জিতেছেন। সবাই খুশী। বিরোধী দলের প্রার্থী মিঃ ডয়েসার মানবতাবিরোধী, প্রগতিবিরোধী। বলা হচ্ছিল, মিঃ ডয়েসার জিতলে আমেরিকাকে প্রাগৈতিহাসিক ১৪৯২ সালের দিকে নিয়ে যেতেন। ভাগ্যিস মিঃ ডয়েসার জেতেন নাই।
ঘটনার নায়ক এক্লিস একটা টাইম মেশিনের অফিসে বসে দেয়ালে ঝুলে থাকা নোটিশ দেখছেনঃ
TIME SAFARI, INC.
SAFARIS TO ANY YEAR IN THE PAST.
YOU NAME THE ANIMAL.
WE TAKE YOU THERE.
YOU SHOOT IT.
৬০ মিলিয়ন বছর আগে যেতে পারবেন, ডাইনোসর শিকার করতে পারবেন। ফিরেও আসতে পারবেন, কিন্ত কঠিন কয়েকটা শর্ত মেনে চলতে হবে। ভবিষ্যতের কোন কিছু আপনি দূর অতীতে ফেলে আসতে পারবেন না, কিছু নিয়েও আসতে পারবেন না। যে প্রানীটি কোন প্রাকৃতিক কারণে মিনিট দু’য়েকের মধ্যে মারা যাবে ( গাছের ডাল ভেঙ্গে বা অন্য কারণে) তাকেই গুলি করতে পারবেন, শিকার করতে পারবেন। বুলেটটাও ফেরত নিয়ে আসতে হবে। ছবি তুলতে পারবেন। নির্দিষ্ট ধাতব পথের বাইরে পা ফেলতে পারবেন না। সোজা কথা ট্যুর গাইডের কথার বাইরে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে কিছুই করা যাবে না।
নানা অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে এক্লিস সবকিছুই ঠিকমতো করে, শুধু অসাবধানে একটা প্রজাপতি তার পায়ের তলায় পড়ে মারা যায়। খুবই সামান্য,কিন্তু ৬০ মিলিয়ন বছরের ব্যবধানে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া টের পাওয়া যায়। অভিযানকারীরা ফিরে আসেন। কিন্তু কোথায় যেন একটু পরিবর্তন সূক্ষ্ণ একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে টের পান । বাতাসের গন্ধে , রিসেপশনে সেই একই লোক, ঘরের রং আসবাব সবই আগের মতোই, তবু কীরকম একটা অস্বস্তি।
প্রবেশমুখের সাইনবোর্ডের দিকে এক্লিসের নজর যায়।
TYME SEFARI INC.
SEFARIS TU ANY YEER EN THE PAST.
YU NAIM THE ANIMALL.
WEE TAEK YU THAIR.
YU SHOOT ITT.
ইংরেজী লেখাগুলোর ধরণ অন্যরকম।
জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে ভালো মানুষটিকে প্রেসিডেন্ট পদে আমেরিকায় নির্বাচিত হতে দেখে গিয়েছিলেন তাঁরা , তার যায়গায় সেই প্রগতিবিরোধী অপজিশন প্রার্থী এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
এক্লিস বুঝতে পারে, ৬০ মিলিয়ন বছর আগের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটা প্রজাপতির অবহেলার অসাবধান মৃত্যু তাকে অন্য এক পরিবর্তিত পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে।
এক্লিস হাঁটু গেড়ে বসে পায়ের তলার মৃত সোনালী প্রজাপতিটিকে আঁকড়ে ধরে গুঙিয়ে উঠে প্রার্থনা করে, আমরা কী আবার ফিরে যেতে পারিনা? আমরা কী এই প্রজাপতিটিকে জীবিত করতে পারিনা? আমরা কী আবার শুরু করতে পারিনা ?
ট্যুর গাইড ট্রাভিস এক্লিসের দিকে রাইফেল তাক করে, ঘরের মাঝে বজ্রপাতের মতো একটা গুলির শব্দ শোনা যায়। গল্পের শেষ এইখানেই।
কিন্তু এই থিমের উপরে হলিউডে অসংখ্য ছবি হয়েছে, এখনো হয়ে যাচ্ছে।
Back to The Future; It’s a Wonderful Life ; Frequency ; The Butterfly Effect; হাল আমলের Terminator ; Man In Black এই ধাঁচের ছবি।
পরবর্তীতে Butterfly Effectদারুণ জনপ্রিয় একটা শব্দে পরিণত হয়।
Chaos Theory তে Butterfly Effectকে বলা হয়েছে, প্রাথমিক অবস্থানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বৃহৎ কোন পরিবর্তন। আমাজানের জঙ্গলে প্রজাপতির ডানার ঝাপটানির দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া প্রভাব ফেলতে পারে প্রশান্ত মহাসাগরের টর্নেডোতে।
কয়েকসপ্তাহ আগে আগে হিন্দি একটা ছবি দেখছিলাম, মাদ্রাজ ক্যাফে( Madras Cafe )
পটভূমি ৮০ দশকে ভারতের শ্রীলংকার আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগ্রাসী হস্তক্ষেপ এবং LTTE (Tamil Tigers) এর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। একটা জনগোষ্ঠীর জাতিগত লড়াই। রক্তক্ষয়ী ২৭ বছরের যুদ্ধে ( ১৯৮২—২০০৯) প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু। উইকি অনুযায়ী, প্রায় ২৭,৬৩৯ জন তামিল টাইগার্স, ২৩,৭৯০ শ্রীলংকান সৈন্য ও পুলিশ, ১১৫৫ জন ভারতীয় সৈন্য, ১০ হাজারেরও বেশী সাধারণ জনগণ। জিঘাংসার রাজনীতির বলি ইন্দিরা পুত্র রাজীব গান্ধীর আত্মঘাতী বোমায় হত্যা। রাজীব গান্ধীর মৃত্যু তামিল টাইগার্সের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত করে ফেলে। ভারত হারায় তার প্রধানমন্ত্রীকে, তামিল টাইগার্স হারায় তার ভবিষ্যৎ । এঁরা যে সময়ের সাথে সাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সেটা সবাই বুঝে যায়। সন্ত্রাস দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে কেউ সহানুভূতি পায়নি আজ পর্যন্ত।
নায়কের কথাটা ভালো লাগে , “জো হাম দেখ্তে হ্যাঁয় শুন্তে হ্যাঁয়, সাচ স্রিফ উত্না নেহি হোতা।” আমরা যা দেখি , যা শুনি সত্য শুধু ওইটুকুই নয় ।
আমার মনে হয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা থাকে। ভারতের আছে। আমেরিকার আছে, চীনের আছে, সোভিয়েত রাশিয়ার আছে, জার্মানের আছে। পৃথিবী যেমন নিজের অক্ষের উপর ঘুরতে ঘুরতে ৩৬৫ দিনে সূর্য পরিক্রমা করে । প্রতিটি দেশের আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনাও বাস্তবতা। সেটা সে তার সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্যই করে থাকে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতায় রাষ্ট্র হওয়াতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ কি কি, সেইটা ব্যাখ্যা করতে আমার মতো নির্বোধকেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হয় না । বিশাল সেনা খরচ বাঁচিয়ে সামান্য কিছু বিএসএফ দিয়ে সীমান্ত রক্ষায় গত তেতাল্লিশ বছরে ভারতের কত হাজার বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে সেটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হতে পারে, আমার নয় ।
শোনা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধূলিসাৎ করতে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। গর্বাচেভদের একটা জেনারেশনকে পুঁজিবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত করে সময়মতো কাজে লাগানোর জন্য, আমেরিকাকে অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে।
আমাদের দেশের এতোবড় সেনাবাহিনীর দরকার কি ? খুব কমন প্রশ্ন।
আমার পরিচিত এক সেনাবিশেষজ্ঞের মতে, এই সেনাবাহিনী আছে বলে আমাদের সার্বভৌমত্ব টিকে আছে। মায়ানমার আমাদের আক্রমন করার আগে ম্যান অ্যাগেইন্সট ম্যান, বুলেট অ্যাগেইন্সট বুলেট হিসাব করবে। মানে আমাদের সীমান্ত দখল করতে হলে, আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনীকে নিঃশেষ করতে হবে, সেটা হবে উভমুখী। সমপরিমাণ সৈন্য তাদেরও ক্ষয় করতে হবে। সুতরাং মায়ানমার চৌদ্দবার ভাববে আমাদের সীমান্ত আক্রমন করার আগে।
এই যে আমাদের আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষানীতি পাশের আরেকটি দেশের স্বৈরশাসক সামরিকজান্তাকে তার নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করছে। এইটা আমাদের আমজনতার বোঝার কথা না। আপনি হয়তো টকশোর পেইড বক্তার কথা রেফারেন্স হিসাবে নিয়ে এসে তর্ক করা শুরু করবেন। তীব্র ভারতবিদ্বেষী হয়ে যাবেন। ঘটনাপ্রবাহ ঘেঁটে দেখার সময় আমাদের নাই। আমরা দুই মিনিটের ম্যাগী নুডলসে তৃপ্ত।
আরেকটা কল্পকাহিনী মনে পড়ছে। কল্পকাহিনীর লেখকের নাম মনে নাই। ধরেন পিঁপড়াদের অসংখ্য প্রজাতির মধ্যে একটা প্রজাতি জ্ঞানবিজ্ঞানে হঠাৎ অসম্ভব উন্নতি করে ফেললো। ধরেন তাদের বসবাস এক বিরাট মাঠের মধ্যে, তাঁরা তাদের চারপাশের এই বিশ্বের রহস্য, সৃষ্টিরহস্য উদঘাটন করতে চাইল। তাঁরা পারবে কি? রানী পিঁপড়া বছর ত্রিশেক বাঁচলেও কর্মী বাঁচে বছর তিনেক। সুতরাং তিন বছর ধরে পায়ে হেঁটে ওই সভ্য জ্ঞানী পিঁপড়ার দল এই মাঠের কতটুকু অতিক্রম করবে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কী কী বুঝতে পারবে, সৃষ্টি রহস্যের কী উদ্ধার করতে পারবে ?
আমাদের অবস্থা প্রায়শঃ ওই জ্ঞানী পিঁপড়ার মতোই । এই ক্ষুদ্র জীবনে অনেক রহস্যকে আমীমাংসিত রেখেই আমাদের চলে যেতে হবে।
প্রকাশকালঃ ১২ই জুন, ২০১৫
by Jahid | Nov 25, 2020 | শিল্প ও সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
(পুরনো ও প্রিয় একটি লেখা, যা এই অস্বস্তিকর বাংলাদেশের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক।)
আজ সকালে কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ভাঙ্গাগাড়ীতে পুরনো সিডি খুঁজছিলাম, কিশোর কুমারের একটা বাংলা সিডিও পেলাম, চালু করতেই সেই ঐশ্বরিক দরাজ গলা বেজে উঠলো।
“তারে আমি চোখে দেখিনি , তার অনেক গল্প শুনেছি,
গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি।।
আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন,
বইতে পারে না তারও বিবশ মন ;
ভালোবাসার ভালো কথা শুনে নাকি শিহরিয়া যায় শুনেছি।।
চোখেতে তার স্বপ্ন শুনি ভীড় করে থাকে,
মরণ শুনেছি হাতছানি দিয়া ডাকে,
বিষের আবার ভালোমন্দ কীরে যখন আমি মরতে বসেছি !!! ”
কিশোর কুমার , মান্না দে আমাদের দুই প্রজন্ম আগের হলেও এঁদের গান আমাদেরকেও মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলাব্যান্ডের উত্থানের সমসাময়িক সময়ে ফিতা ক্যাসেটের যুগে এঁরাই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের।
গানের লাইনটি আবার খেয়াল করুন , ‘আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন, বইতে পারে না তারও বিবশ মন !’
দৃশ্যকল্পটি কেমন? যৌবন ছল্কে পড়ছে, উদ্ভিন্ন বাঁকগুলো আপনাকে মুগ্ধ করছে।
যদিও আমি আমার কন্যাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষারত , তারপরেও ভণ্ডামি না করে বলতে পারি, আমার ‘পুরুষ-চোখ’ কিন্তু ঠিক ঠিকই অতিক্রম কারিণী সকলের , যাঁদের যৌবন ছল্কে যাচ্ছিল তাদের দেখছিল।
বর্তমানের একাধারে নারীদের উপর নিরবচ্ছিন্ন যৌন নিপীড়নের হেডলাইন দেখতে দেখতে আমি বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। পুরুষ হিসাবে আমি লজ্জিত। মনোবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানা কুইক রেন্টাল টোটকা দিয়ে এই ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে উঠে আসার পথ , উত্তরণের বাৎলাচ্ছেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, পুরোপুরি উৎপাটন করা সম্ভব না হলেও এই অসুস্থতার সার্বিক নিরাময় সম্ভব। এবং সেটা শুধুমাত্র শৈশবে সঠিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে।
বালককে বুঝতে হবে, সে শিশ্ন-ধারী মানুষ ঠিক আছে, কিন্তু বালিকা শিশ্ন-হীন দ্বিতীয় লিঙ্গের দুর্বল কেউ না। বালককে নারীর মাহাত্ম্য বোঝাতে, নারীর মর্যাদা শেখাতে খুব বেশী সময় লাগারতো কথা না। বালকের মা আছে, বোন আছে, অন্য শ্রদ্ধেয়া আত্মীয়ারা আছেন। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে তাকে নারীর মর্যাদা শেখাতে হবে।
রহস্যময় দৈহিক বাঁক নিয়ে যে নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে একজন মানুষ এবং তোমার চেয়েও অধিকতম মানুষ। বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরুৎপাদনের বিশাল শারীরিক যন্ত্রণার দায়িত্ব প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে। বালককে বুঝতে হবে , বোঝাতে হবে নারী শুধুমাত্র স্তন ও যোনীর সমষ্টি একটা ভোগের বস্তু নয় !
পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাটা পেলে ভাল। নইলে শিক্ষায়াতনে। পরিবারের একজন পুরুষকে দেখলে প্রথমেই আমরাতো তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি না !
পোশাক, জুতা, আর্থিক-সামাজিক অবস্থা হেন তেনর পরে তার বিশাল বপু বা স্থূলত্ব নিয়ে কথা হয়।
কিন্তু একজন নারীকে দেখলে কেন প্রথমেই তাঁর স্তন ও নিতম্বের দিকে জুলজুলে নজর যাচ্ছে ? সমস্যাটা কোথায় ? তাঁর অন্যসব বৈশিষ্ট্য কেন আলোচিত হয় না ? একজন কিশোরী , তরুণী আমার সামনে এসে প্রথমেই কেন তাঁর বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকাঢাকি করা শুরু করে দেয়। কী তাঁকে ভীত করে তোলে, যে সামনের পুরুষটির ( হোক সে কিশোর, তরুণ , মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ) সামনে সে ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ! কে তাঁর মনে এই অ-নিরাপত্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে?
বাদ দিই, তাত্ত্বিক আলোচনা। সাহস বা দুঃসাহস করে যদি আমার প্রজন্মের যৌন শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করি , তাহলেও কী কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে না !
অন্য সকলের মতোই আমারও কৈশোরের অসহনীয় বয়ঃসন্ধির একাকীত্ব, দেহের অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা ছিল। ছিল মন খারাপ করা বিকেলবেলা। নিজেকে অপাঙতেয় , তুচ্ছ , অবহেলিত ভাবার দুঃসহ দিনরাত্রি। আমি মোটামুটি নজরে পড়ার মতো ভালো ছাত্র ছিলাম। পরিবারের ও শিক্ষকদের আলাদা একটা এক্সপেকটেশনের ভার আমাকে বইতে হতো। কিন্তু আমিও তো একটা কিশোর। আমার যে ছেলে বন্ধুটি , মেয়েদের স্কুলের সামনে যেয়ে সদ্য কিশোরীদের উদ্ভাসিত চাহনি, রহস্যময় বাঁক দেখে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করতো ,তাতে আমার মনটাও তো হু হু করে উঠতো।
সে ছিল এক কল্পনার রাজ্য। যদিও আমার শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির সমানুপাত বৃদ্ধির পরিমাপ নিয়ে আমার পরিবারে দ্বিধা আছে।আমার মানসিক বৃদ্ধি শরীরের তুলনায় শ্লথ। আমি স্তন্যপায়ী ছিলাম ৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এবং কেন জানিনা , আম্মাও আমার অত্যাচারকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন অতোগুলো বছর। বছর পাঁচেক পর্যন্ত আমার বেড়ে ওঠা নানাবাড়ি কুষ্টিয়াতে। অস্পষ্ট আবছা মনে আছে, হয়তো স্মৃতিতেই পুনঃ-নির্মিত হয়ে আছে। গ্রামের বাচ্চারা ছিল যৌনতার ব্যাপারে অকালপক্ব । সহচর-সহচরী খেলার সাথীদের হঠাৎ বাল্যবিবাহ, তাঁদের যৌনতার অভিজ্ঞতার নিষিদ্ধ আলোচনা তাদেরকে পাকিয়ে দেয়। কোনটা শিশ্ন, যোনি, স্তন, কোনটার কী কাজ, সেটা আমাদের সময়ে আমাদের গ্রামের খেলার সাথীরা ভালোই বুঝতো। পুরোপুরি নাগরিক হতে হতে ৭৯ সাল। প্রতি ঈদে পার্বণে নানাবাড়ি যেতে হোত, যৌন জ্ঞানের পার্থক্যটা তখন চোখে পড়ার মতো ছিল । মোরগ-মুরগী বা কুকুরের সংগমে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও গ্রামের শিশুদের জন্য সেটা ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ।
বছর সাতেক থেকে তেরো চৌদ্দ পর্যন্ত সেই অর্থে আমার যৌন চেতনা ছিলনা। অন্তত: আমার কিছুই মনে নেই।ক্লাস ফাইভে আমার সহপাঠিনী মিতু প্রেম করা শুরু করলো বা অধুনা যেটাকে বলে ক্রাশ খেল অপু নামের জনৈক নবম শ্রেণীর উদীয়মান গায়কের সঙ্গে। ওইটা আমার মনে আছে।
ক্লাস সিক্সে স্কুলের পরিবর্তন। স্কুল পরিবর্তনের পরে , নতুন স্কুলের পোলাপানের সঙ্গে এলোমেলো সখ্যতা গড়ে উঠল। ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয় সবাই আমার বন্ধু ছিল। সবাই আমাকে আপন করে নিল।
বাসায় মামা চাচা ও গ্রামের আত্মীয়স্বজন অপর্যাপ্ত। দুই বেডরুম,ডাইনিং বাসাতে মাসের বেশীরভাগ দিন আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্লোরিং করতে হোত। দেশের বাড়ির কেউ না কেউ, হয় চিকিৎসা নয় এয়ারপোর্ট বা চিড়িয়াখানা দেখতে বাড়িতে জিইয়ে থাকত।
বাসায় মামা , চাচা কেউ না কেউ যাওয়া আসার মধ্যে থাকতোই। তাদের ফিসফিসে নারীদেহ নিয়ে কথাবার্তা কানে বাজতো। হ্যাঁ, নারীর নগ্নদেহের ছবি একটা শিরশিরে অনুভূতি এনে দিত। মামা-চাচাদের কারো না কারো অসাবধানে বিছানার তোষকের তলায় ফেলে রাখা নিউজপ্রিন্ট ছাপার পর্ণ পত্রিকা হাতে পড়লো। বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সম্ভবত: অর্ধ-নগ্ন ছবির একসেট প্লেয়িং কার্ডও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন দেখেছিলাম। তো, প নামের এক নতুন স্কুল-বন্ধু স্বমেহনের ব্যাপারটা কেমন করে যেন মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আমি জানি না, আমার সব বন্ধুদের সবাই, হয়তো নিজে নিজেই স্বমেহনের আনন্দ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এটা কেই আমরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। এর মাঝে কেউ কেউ স্বমেহন যে খারাপ তা বলে তীব্র অপরাধ-বোধ ঢুকিয়ে দিল। এটা খুব খারাপ, পাপ হবে, শরীর শুকিয়ে খারাপ হয়ে যাবে, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইট পর্যন্ত যৌনমিলনের ব্যাপারে আমার জ্ঞানের পরিধি ছিল এই যে, শারীরিক মিলনে পুরুষাঙ্গ ও নারীর পায়ুপথ ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এইটের শেষের দিকে ক্লাসের অভিজ্ঞ ডেঁপো ছেলেদের জ্ঞান বিতরণে মানব-মানবীর শারীরিক মিলনের সব কিছু সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !
কিন্তু পড়াশোনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা , কৈশোরের একাকীত্ব স্বমেহনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল আমাকে ও আমাদেরকে।
এসএসসি পরীক্ষার পরপরই আমরা ঘোষণা দিয়ে বড়ো হয়ে গেলাম। এখন আমরা সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা কলেজ ছাত্র। এবং ‘জ’ নামের এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের প্রথম দলবেঁধে পর্ণ-ছবি দেখা। ঢাকা কলেজে ভয়ঙ্কর মেধাবী মেধাতালিকার বন্ধুদের ছড়াছড়ি। আমরা মিরপুরের ছেলেপেলে ছিলাম নিতান্ত মফস্বলী মফু । গভর্নমেন্ট ল্যাব: বা ধানমণ্ডি বয়েজের পেন্টিয়াম ভার্সনের পোলাপানের কাছে আমরা ছিলাম ডজ মুডের কম্পিউটার। একদিন কেউ একজন আমাদের মিরপুরবাসীকে জিজ্ঞাস করলো আমরা বাংলা পর্ণ বা চটি পড়েছি কীনা। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সে বললো , তোরা তো এখনও শিক্ষিতই হস্ নাই, আয় তোদের শিক্ষিত করি। তো ওই চটি পড়ে আমরা অদ্ভুতুড়ে কিছু পশ্চিমবঙ্গীয় যৌনাঙ্গের ও মিলন পদ্ধতির নাম শিখলাম। বেশীরভাগ পুস্তিকা বটতলায় ছাপানো, নীলক্ষেত উত্তম ভাঁড়ারঘর ছিল সকল কলেজ-গামী ছাত্রদের কাছে।
আমার ধারনা, আমাদের মানসিক গঠনে, ওই সামান্য তথ্য বিকৃতি তেমন দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলতে পারে নাই। সমাজ ও পরিবারের এক্সপেকটেশনের চাপ আমাদেরকে অনেকটা একমুখী করে রেখেছিল( স্বমেহনের ব্যাপারটা ছাড়া। পরবর্তীতে আমি পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, স্বমেহন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাপ আর স্বাস্থ্যভঙ্গের ভুল বিকৃত তথ্য যদিও আমার কৈশোরের একটা অংশ বিষময় করে দিয়েছিল। )
বয়েজ স্কুলে পড়লেও নানা কারণে কোচিং ও মহল্লার ভালো ছাত্র হওয়ার বদৌলতে সতীর্থ সমবয়সী বান্ধবী ছিল। কিন্তু ওদের মানসিক পরিপক্বতা ছিল আমার বা আমদের চেয়ে বছর দশেক এগিয়ে। সম্পর্কটা ছিল নিতান্তই বড়বোন-ছোটভাই টাইপের। বিকৃতিহীন স্বাস্থ্যকর।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জীবনে নতুন করে কোন তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের সম্ভাবনা ছিল না।
যথারীতি কয়েকজন প্লেবয় বন্ধু ছিল, যাদের ব্যবহারিক জ্ঞান ওই পর্ণ-পত্রিকার গল্পের চেয়েও উত্তেজক ছিল। তারা তাদের যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলত। আমরা অবদমিত মন নিয়ে তাদের রোমাঞ্চের ও মৈথুনের শীৎকার শুনতাম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তারপরে তো বিবাহিত জীবন, ‘দারা পুত্র পরিবার , তুমি কার কে তোমার !’
স্কুলকলেজের ডেঁপো বন্ধুদের কেউ কেউ, ভিড়ের বাসে আরেকজনের সাথে ধাক্কা খেয়েছে বা ধাক্কা না খেয়েই কল্প গল্প বানিয়ে বলেছে এটা বোঝা মুশকিল ছিল । যৌনতার ব্যাপারে ওই বয়সটা ছিল, সবকিছু বিশ্বাস করার, হা করে শোনার।
আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা অ্যাভারেজ একটা ছেলের যৌন-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেকটা আমার মতোই। ছোটখাটো ভুল তথ্য ,স্বমেহন বা পর্ণ ছাড়া আমি কোন বিকৃতি দেখিনা।
কিন্তু এর মাঝে মধ্যবর্তী নতুন একটা বিকৃত প্রজন্ম এসেছে ; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, বা মাইক্রোবাসে তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করছে, তাদেরকে আমি চিনি না। দুর্ভাগ্য, এই বিকৃতদের সাথেই প্রতিমুহূর্ত বসবাস করতে হচ্ছে আমাকে আমাদেরকে !
[ প্রকাশকালঃ ১৪ই জুন,২০১৫ ]
by Jahid | Nov 25, 2020 | সাহিত্য
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী , অপু, দুর্গা, নিশ্চিন্দিপুর, হরিহর, সর্বজয়া, ইন্দির ঠাক্রুন , আম আঁটির ভেঁপু – আমার মনে হয়, আমরাই শেষ আলোড়িত প্রজন্ম । ১৯২৯ সালে লেখা এই উপন্যাস গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালির সারাজীবনের অংশ হয়ে গেছে । কৈশোরে আমরা প্রত্যেকেই অপু বা দুর্গা। আমাদের বাবাদের কেউ কেউ হরিহর , মায়েদের কেউ সর্বজয়া !
পথের পাঁচালীর শেষের কয়েক লাইন আমাদের বার বার পড়তে হয়।
“পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন – মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নিতোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতেরখেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে… দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সুর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়েরউদ্দেশ্যে…
দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মনন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়… তোমাদের মর্মর জীবন-সপ্ন শেওলা-ছাতারদলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না… চলে… চলে… চলে… এগিয়েই চলে…
অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…
সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!…
চল এগিয়ে যাই”
কয়েকটাদিন কবিতা নিয়ে মেতে ছিলাম। ‘দেশ ’ পত্রিকার কবিতা সংকলনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তারাপদ রায়ের কবিতাটা ভালো লেগে গেলো।
শতবার্ষিকীর ছায়াপদ্য
তারাপদ রায়
‘Ah , did you once see Shelley , plain….?’
সত্যি, আপনি বিভূতিভূষণকে মুখোমুখি দেখেছিলেন?
সাদামাটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়?
বনগ্রাম স্টেশনে একদিন দুপুর পার হয়ে প্রায় বিকেলে ,
প্রায় ফাঁকা যশোহর লোকালে উঠে আপনি দেখলেন
ওদিকের সীটে জানালার ধারে তিনি বসে আছেন ?
অল্পদিন আগে কোথায় এক সাহিত্যসভায় দেখেছিলেন,
তাই তাঁকে চিনতে আপনার অসুবিধা হল না।
সেই হালকা-নীল কলারফাটা হাফশার্ট ,
আধময়লা মিলের ধুতি ,তাপ্পি মারা ক্যাম্বিসের জুতো ।
অনেকদিন আগের কথা
তবু মনে আছে আপনার ?
যশোহর রোড কোনাকুনি ভাবে কাটিয়ে
শিয়ালদহ চলেছে দুপুরের নিঝুম রেলগাড়ি ।
জানালার পাশে বিভূতিভূষণ, আপনার মুখোমুখি ।
রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে ধলচিতের খেয়াঘাট ,
সোনাডাঙ্গার মাঠ, পদ্মফুলে ভঁরা মধুখালির বিল,
নীলকুঠির সাহেবের আমলের তুঁতগাছ পড়ে থাকছে পিছনে ।
বিভূতিভূষণের সঙ্গে আপনি কথা বলেছিলেন ?
আশ্চর্য ! কী বলেছিলেন আপনি , সেটা মনে নেই?
বিভূতিভূষণ আপনার কথার উত্তর দিয়েছিলেন ,
কী বলেছিলেন বিভূতিভূষণ – তাও আপনি ভুলে গেছেন ?
তা হলে আপনার শুধুই মনে আছে,
চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় জানালার পাশে,
পুরনো নীল জামা গায়ে বসে আছেন বিভূতিভূষণ ।
বিকেল গড়িয়ে পড়ছে রেলপথের পাশে
বন অপরাজিতার নীলফুলে ছাওয়া বনের মাথায় ,
পাখি ডাকছে শিরীষ-সোঁদালি বনে,
রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে সোনাডাঙ্গার মাঠ,
মধুখালির বিল, ধলচিতের খেয়াঘাট ।
অপরাহ্ণের রাঙা রোদ জানালা দিয়ে ঢুকেছে কামরায়
নীল নির্জন আকাশ পথে গাঙচিলের ডাক
বাঁশঝাড়ের মাথায় দিনের শেষ আলো
দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মৃত্যু পার হয়ে
মাস, বার, মন্বন্তর , মহাযুগ পার হয়ে,
ঝোঁপে ঝোঁপে নাটা-কাঁটা বনকলমির ফুল
যশোহর লোকালের ফাঁকা কামরায় কাঠের বেঞ্চিতে
বসে আছেন নিঃসঙ্গ ; নির্লিপ্ত বিভূতিভূষণ ।
সত্যি, আপনার মনে আছে ?
সত্যি, আপনি দেখেছিলেন বিভূতিভূষণকে ?
by Jahid | Nov 25, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
পুরনো প্রেক্ষাপটে লেখা, গত পরশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণে কিছু সংযুক্তি করে আবার লিখছি। প্রতিটি ধর্ষণ পুরুষ হিসাবে আমার মাথা নত করে দেয়। আমার বোন, আমার কন্যা ও আমার নারী সহকর্মীদের দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতে পারি না। প্রতিটি ধর্ষণ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি পুরুষ সমাজের প্রতিভূ , এবং আমি আরেকজন নারীর জন্য নিরাপদ নই।
ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকার ও রাষ্ট্র কি কি করতে পারে ও করা উচিৎ সেটা নিয়ে আমার আলোচ্য নয়। একদিকে বিলুপ্তপ্রায় প্রগতিশীল অংশ আরেকদিকে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য ও বিশাল ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মতোও আরেক জনগোষ্ঠীর মাঝে আমরা পড়েছি উভয়সংকটে।
সমাজের মল-মূত্র, স্যানিটারি ন্যাপকিন, উচ্ছিষ্টের জায়গা ডাস্টবিন। গলিত অর্ধগলিত আবর্জনা ফেলার ও পরিষ্কার করার নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যার প্রয়োজন সে ফেলবে, যাদের পরিষ্কার করার দরকার সে একটা সময়ে এসে পরিষ্কার করবে। যে বা যারা দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না, তাঁরা অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের জীবনের অতি অপরিহার্য এই নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা যেন নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে পুরো মহল্লায় ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে। নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে আপনার ব্যবহার করা কনডম ঝুলবে পাশের বাড়ির কার্নিশে । আপনার কাজের বুয়া সবজির উচ্ছিষ্ট ফেলবে আপনার সামনের সুন্দর সাজানো বাগানে !
ময়লা খারাপ , দুর্গন্ধ খারাপ এই অজুহাতে তো ডাস্টবিন তুলে দেওয়া যাবে না। নাকি, আমরা সবাই ইউটোপিয়া নামের কল্পরাজ্য বা পবিত্র গ্রন্থে বর্ণিত সেই স্বর্গরাজ্য চাই । খেলাম কিন্তু হাগুমুতু হবে না। মেশক-আম্বরের গন্ধে ভরে থাকবে সবার উজ্জ্বল দেহ !
কয়েক বছর আগে তখন বারাক ওবামা ক্ষমতায়, অফিসের ট্রাভেলে মাঝপথে দিন কয়েকের বিরতি নিয়েছি স্কুল-বন্ধুর বাসায় । ভার্জিনিয়া, আম্রিকায়। তো এক শুক্রবার সকালে বন্ধু কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার সময় বন্ধুর স্বগতোক্তি ,স্কুলের পতাকা নামানো ক্যান মামা? কেউ মারাটারা গেল নাকি! নিউজ চ্যানেল দ্যাখ তো কাহিনী কি। আমি হু হা করে ইউটিউবে গান শোনায় মনোযোগ দিই । গাড়ীতে ওয়াই ফাই লাগানো। আমেরিকার পতাকা অর্ধনমিত কেন, সেটা জানা আমার প্রায়োরিটি না !
আসার পথে গ্যাস স্টেশন, অফিস, মনোহারী দোকান সবখানেই পতাকা নামানো দেখে একবার ভাবলাম কাউকে জিজ্ঞাস করি। ভাগ্যিস করিনি ! বাসায় এসে দুপুরে খেতে খেতে বন্ধু-পত্নীর কথায় মনে পড়ে যায় আজ ১১ই সেপ্টেম্বর ( নাইন-ইলেভেন) ! দুজনেই বিব্রত বোধ করি।
কারো কোন তির্যক মন্তব্য বা মতামত পছন্দ হলে আমার দীর্ঘদিন মনে থাকে।
বছর পনেরো আগে মহল্লার পান-বিড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে এক বড়ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। সদ্যই টানবাজার ও কান্দুপট্টি সাফল্যের সঙ্গে উচ্ছেদ করা হয়েছে পবিত্রতার দোহাই দিয়ে ! মূলত: প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের জমি ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বের ফাঁকে পড়ে যায় যৌনকর্মীরা । আশির দশকের শুরুতে একবার উচ্ছেদ করা হয়েছিল, নানা কারণে ধুঁকে ধুঁকে চললেও ৯৯ সালে পুরোপুরি গৃহহারা হন যৌনকর্মীরা। এরপর একে একে, নিমতলি, ইংলিশ রোড, টাঙ্গাইল সব জায়গা থেকে পতিতা-পল্লী উচ্ছেদ করা হয়।
সামাজিক গবেষণার অনেকগুলো শব্দ আছে, পুনর্বাসন, পতিতাবৃত্তি, নিরাপত্তা হীনতা ,সামাজিক অব্যবস্থা, ইসলামী অনুশাসন , দারিদ্র্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যেহেতু গবেষক নই, আমার চিন্তা ক্ষুদ্র একটা জায়গায় এসে ঘুরপাক খায়। উল্লেখ্য, পৃথিবীর এই আদিমতম পেশার প্রতি আমার কোন সমর্থন নেই। নিজের দেহ বিক্রি করে ক্ষুন্নিবৃত্তির চেয়ে অসম্মানের কিছু নেই।
কিন্তু শেষ বিকেলের ওই আলোচনার বিষয় ছিল, উচ্ছেদ করলেই কি নির্মূল হবে। এঁরা তো ছড়িয়ে পড়বে ঢাকা শহরের সম্ভব অসম্ভব সমস্ত জায়গায়। পরবর্তী এক যুগ আমরা দেখেছি কীভাবে পতিতাবৃত্তি নানা চেহারায় পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে, ভদ্রপল্লিতে নানা ডাইমেনশনে ছড়িয়ে পড়েছিল ।
পুঁজিবাদের কথা , গণতন্ত্রের কথা বলবেন ; আর তার উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট নিয়ে নাক সিঁটকাবেন ; কেমন করে হবে! সামাজিক সুস্বাস্থ্যের জন্য, পুঁজিবাদের বাই প্রোডাক্ট হিসাবে যৌন-ব্যবসা টিকে থাকবেই। বড়োজোর প্রাতিষ্ঠানিক যৌনকর্মীদের কে আপনি ভাসমান পতিতাবৃত্তিতে ঠেলে দেবেন! এর পরে আপনি আশা করবেন আপনার ভাই-বন্ধু-পুত্ররা তাঁদের কখনই খুঁজে পাবে না ?
আপনি কথায় কথায় গণতন্ত্রের দোহাই দেবেন, আপনি আফগানিস্তানে হামলা করবেন, ইরাকে হামলা করবেন ; ফিলিস্তানিদের গৃহচ্যুতিতে ইজরাইলকে সমর্থন দেবেন। আবার আশা করবনে , আপনার নিরাপত্তা সবসময় অ-বিঘ্নিত থাকবে ! ভীমরুলের চাকে খোঁচা দেবেন, আর তারা আপনার পরিপার্শ্বের কাউকে কে হুল ফোটাবে না ? আপনি এটাকে কতোখানি গন্ডীবদ্ধ করে রাখতে পারছেন সেটা আলোচ্য ও বিবেচ্য হওয়া উচিৎ ছিল।
ধর্ম সন্ত্রাসতো হাজার বছরের পুরনো ! সভ্যতা-অসভ্যতা যতদিন থাকবে, ধর্মসন্ত্রাসও থাকবে। আমেরিকা ধর্মসন্ত্রাসীদের গন্ডীবদ্ধ না করে নিজেদেরকেই অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকা তার বাজেটের বড়ো একটা অংশ ধর্মসন্ত্রাসীদের পুনর্বাসনে খরচ করলে হয়তো, টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়তো না।
ইউরোপও দিনের পর দিন আমেরিকার অনৈতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসে সরবে ও নীরবে সমর্থন দিয়েছে। আজ তার উত্তাপ নিজের ঘরে টের পাচ্ছে তারা। শরণার্থীর ছদ্মবেশে হয়তোবা ‘আইএস’-কেও আশ্রয় দিতে হচ্ছে !
প্রতিটা এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা চেকিং পার হই আর মনে মনে বলি, আমার দেখা পৃথিবী দুই সময়ে বিভক্ত, নাইন- ইলেভেনের আগের পৃথিবী আর নাইন-ইলেভেনের পরের পৃথিবী !
অন্যদিকে, আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ পরিবার বিবর্জিত হয়ে ঢাকা নামের এক কুৎসিত শহরে দিনের পর দিন আর মাসের পর মাস পার করে। আমাদের বাড়ীর দারোয়ান, রিকশাচালক, প্রাইভেট ড্রাইভার, বাস-ট্রাক-থ্রি হুইলার চালক থেকে শুরু করে দোকানের কর্মচারী ও নানা প্রান্তিক জনসংখ্যা।
আপনার কি মনে হয়, এঁরা যৌন তাড়না বিবর্জিত প্রাণী ? এছাড়া রয়েছে, উঠতি তরুণ, বখে যাওয়া অ্যাডিক্ট যুব সমাজ। আচ্ছা বাদ দেন, এঁদের ব্যাপারে আপনার সহানুভূতি নাও থাকতে পারে। আপনি তো ফেসবুকে দেশ উদ্ধার করা আর বাইরে ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকা সমাজের প্রিভিলেজড একটা অংশ। কেউ আছে, শারীরিকভাবে পঙ্গু, অতি দরিদ্র নারী বিয়ে করে তারপর যৌন কামনা মেটানোর অর্থনৈতিক অবস্থা সহসাই আসার সম্ভাবনা কম যাঁদের। তাঁদের এই কামনা-বাসনা রিলিজের কোন ব্যবস্থা কি রেখেছে আমাদের অতি-ধার্মিক সমাজ ?
সমাজকে যথাসম্ভব দুর্গন্ধ মুক্ত রাখতে হলে নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছাড়া আমি তো কোন উপায় দেখি না।
প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর,২০১৫
by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র
অফিসে আসিবার সময় টুনি কহিল, টোনা আমাদের পার্টটাইম গৃহপরিচারিকাকে দেখিয়া হৃদয়ে মায়া অনুভব করি। সে অতি প্রত্যূষ ৫ ঘটিকার সময় গাত্রোত্থান করিয়া ৬টা-৮টা ; ৮টা-১০টা ; ১০টা-১ ঘটিকা গৃহে গৃহে দাসীগিরি করে। অতঃপর , আবারো অপরাহ্ণ ৪ ঘটিকা হইতে দ্বিতীয় শিফটে আরো দুই গৃহে রাত দশ ঘটিকাকাল দাসীগিরি করে।
আহারে !
আমি টুনির প্রত্যুত্তর না করিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িলাম ; আমাদের গৃহের পার্টটাইম গৃহপরিচারিকাটির জন্য নহে ; নিজের জন্য !
হায় টুনি ! গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্তে এই টোনাকে উদয়াস্ত কীরকম দাসত্ববৃত্তি করিতে হইতেছে তাহা তোমার চোখে পড়িল না !
সাম্প্রতিক মন্তব্য