by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
কীভাবে প্রথম কথা , কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব আজ তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, মনেও নেই আমার । আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে টেক্সটাইলে প্রথমবারের মতো সেকেন্ড শিফট শুরু, প্রশাসনিক জটিলতায় প্রথমদিকে নতুনদের সাথে একটু ব্রাত্য বা হালকা দূরত্ব থাকলেও ঠিক মাস দুয়েকের মধ্যে সবাই সবার অসম্ভব কাছের হয়ে গেলাম।ছোট্ট শহীদ আজিজ হলের আবহাওয়াই বদলে গেল ; অনেকদিন পরে একবারে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রের পদচারনায়।
যদিও আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার তেমন কেউ ছিল না, ; তবে অন্য বোর্ডের কয়েকজন ছিল। সবচেয়ে বেশী মানসিক সাদৃশ্য যেটা ছিল সবার মধ্যে, সেটা হচ্ছে একধরনের মনক্ষুন্নতা—প্রকৌশলের সবচেয়ে অভিজাত প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ভর্তি ব্যর্থতার। হ্যাঁ, আমাদের সবাই হয়তো তথাকথিত সর্বোচ্চ মেধাবী ছিলাম না ; কিন্তু আমাদের মেধা ঠিক ফেলে দেওয়ার মতোও ছিল না। ঢাকা ও বাংলাদেশের জেলাশহরের নানাপ্রান্তের দূর্দান্ত ডাকসাইটে কয়েকজন ছাত্রের দেখা হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো মেধাবী ছিল সুমন। টেক্সটাইলের স্পিনিং ,ডাইং- ফিনিশিং এর চাপ এড়িয়ে ওঁর গন্তব্য যে শিক্ষকতা সেটা আমাদের মনে হয়নি কখনো।
পরীক্ষা এগিয়ে এলেই খুঁজে পেলাম আমাদের ২০তম ব্যাচের সবচেয়ে আস্থাবান বন্ধুকে আতিকুজ্জামান সুমনকে। আগের ব্যাচের সেলিম ভাইয়ের নোট বেশ পপুলার ছিল, তবে তাঁর হাতের লেখা ছিল একটু বড়ো টাইপের।সেই তুলনার সুমনের হাতের লেখা ছিল শাব্দিক অর্থেই মুক্তার মতো। সুমনের নোট ছাড়া কোন পরীক্ষা উৎরানো যাবে কল্পনাই করতে পারতাম না। PL( Preparatory Leave) শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দলবেঁধে ওঁকে তাগিদ দিতাম, দোস্ত ওই চ্যাপ্টারের নোটটা কবে শেষ করবি?
সম্ভবতঃ থার্ড ইয়ারে আমি একবার জিজ্ঞাস করলাম, সেলিম ভাইয়ের তো এই টপিক্সে একটা ভালো নোটই ছিল, তুই আবার নিজে বানাতে গেলি ক্যান। ওর উত্তর ছিল মনে রাখার মতো , পুরনো নোট আর পাঠ্যবই মিলিয়ে নিজের নোট করতে গেলে পড়া হয়ে যায়, আর নিজের লেখা নোট পড়তে বেশী ভালো লাগে,সেই সঙ্গে তোদেরও কাজে লাগে। মানুষ এতো নিঃস্বার্থ হয় কীভাবে !
ওর নোটই যে আমাদের একমাত্র পাথেয় পরীক্ষার পুলসিরাত পার হওয়ার সেটা ও ভালোভাবেই জানতো। নরমাল সাদা কাগজের ফটোকপি ভালো হয় না, তাই গুচ্ছের টাকা খরচ করে ওঁ সাদা অফসেটে পেলিক্যান কালির ইয়ুথ কলমের ঝকঝকে দূর্দান্ত লেখনীতে নোট করতো। সাদা লুঙ্গি পড়ে তকতকে টেবিলে উবু হয়ে নোট করছে সুমন, একটা চিরচেনাভঙ্গী ! বেশ ক্ষীণতনু ছিল , হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে ঈর্ষাও ছিল আবার ঠাট্টাও করতাম সবাই। জেনেটিক্যালি ও একটু হালকা স্বাস্থ্যের ছিল। শেষ দেখায়ও ওঁকে ওই ভাবেই পেয়েছি। মনে পড়ে, আমাদের ফটোকপি করতে সুবিধা হবে বলে ও মেশিনের ডায়াগ্রামগুলোও মাঝে মাঝেই কালো কালির কলমে করতো। ওঁর নোট হাতে পাওয়া মানে ছিল ওই সেমিস্টারের অর্ধেক পড়া হয়ে যাওয়া।
সারা ছাত্রজীবনে ওঁর চাপে পড়েই আমি নিজের হাতে শুধুমাত্র Viscose Fiber ও Fabric Designing চাপ্টারের নোট করেছিলাম। ওঁর অনুরোধ ছিল, মামা, তুই ওই চ্যাপ্টারে নোট করে ফ্যাল, আমি ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং গুলো করেই সময় করতে পারছি না। ওঁর ব্যস্ততার দিকে চেয়েই ওই নোট করা এবং সারা ছাত্রজীবনে ওই প্রথম এবং ওই শেষ। কিন্তু সুমনের হাতের লেখার পাশে আমার লেখা একেবারেই মানাচ্ছিল না। পরবর্তীতে আমি আর কোন নোট তৈরীও করিনি। একটু ভালোও লাগছিল, সারাবছর আমিই শুধু সুমনের নোট পড়ি, এই প্রথম ওঁ আমার নোট ফটোকপি করছে !
গত ডিসেম্বরে ছুটি রিসোর্টে সপরিবারে দেখা ! এর পরের গেট টুগেদারগুলোতে নানা কারণে ওঁর সাথে আমার দেখা হয়নি, বা হলেও ঠিক অনেকক্ষণ কথা হয়নি। রাত্রিযাপনের ওই ছুটিতে আমার স্ত্রীর সাথে ওঁর স্ত্রীর, ওঁর কন্যাদের বাচ্চাগুলোর ও আমার বাচ্চাদের মিথষ্ক্রিয়া। মিনা( আমার সহধর্মিনী) গত দুইদিন ধরে বারবার আফসোস করছে থেকে থেকে।
হল জীবনের অফুরান অসংখ্য স্মৃতি আছে। কিন্তু ওঁর মাঝে যে সদাহাস্যময় পরোপকারী মানুষটিকে আমরা দেখেছি, পেয়েছি– নিজেরা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। হুট করে জার্মানিতে পড়তে চলে গেলে সম্পর্কে একটু বিচ্ছিনতা এসেছিল , পরের বছরগুলোতে সেটা আর আমি আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
আজ বেশী করে মনে পড়ছে বিশেষ একটা দিনের কথা !
চাকরি শুরু করার পরে আমরা যে যার কর্মক্ষেত্রে, ভীষণ ব্যস্ত। মোবাইলের যুগও তেমন করে শুরু হয়নি। ১৯৯৯ সালে ল্যান্ডফোনেই ওঁ জানালো, বহুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আমরা যেন অ্যাটেন্ড করি।৪০তম সমাবর্তন, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন আসবেন !আমার চরিত্রানুযায়ী যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইলেও ওঁ আমাকে বোঝাল এটা বিরাট সৌভাগ্যের সুযোগ । গ্রাজুয়েশেনের গাউন পরে সবার ছবি থাকে, আমাদেরও থাকবে। অনেকখানি ওঁর চাপে পড়েই সমাবর্তনে যাওয়া।
রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! “ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !” তাইতো, আমরা কথা কইছি, তুই নিরুত্তর। তোর অন্যলোকের যাত্রা শুভ হোক বন্ধু !
সমাবর্তনের দিনে আমার নিজের কোন ক্যামেরা ছিল না, ওঁর ক্যামেরায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললো ওঁ !অনেকবার অনেকবছর ধরে ভেবেছি ওঁর কাছ থেকে ছবির কপিগুলো চেয়ে নেব। এই ১৬ বছরে আর হল কই ! থাক্ তোর ক্যামেরায় তোলা ছবি আমার আর লাগবে না ! তুই নিজেইতো একটা ছবি হয়ে গেলি !
প্রকাশকালঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫
by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
সুস্বাস্থ্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারকে কখনো ভোজন রসিক মনে হয় নি । আড্ডা চলতে চলতেই বললেন, আমি একটু খেয়ে নিই। আমরা চিপস, বিস্কুট চা খেতে খেতে স্যারের কথায় সায় দিলাম। ছোট্ট টিফিন বাটি থেকে, সামান্য একটু সবজি আর কয়েক চামচ ভাত- এই ছিল তাঁর রাতের খাবার। অম্লতার কথা , বুকজ্বালার কথা বললেন। প্রবাসী কয়েকজনকে একটা বিশেষ অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের কথাও বললেন।স্যার নিয়মিত হাঁটাহাটি করেন পার্কে। শুনে ভালো লাগল। পার্কের এক মুশকো জোয়ানপ্রায় ভদ্রলোক যার বয়স আন্দাজ ৬০-৬৫ তার প্রসঙ্গ ওঠালেন। ওই লোকের শারীরিক গঠন দেখে স্যারদের কয়েকজন বেশ ঈর্ষান্বিত । তো একদিন , তাকে কাছে ডেকে বলা হল, ভাই আপনি তো ভালোই শরীরখানি ধরে রেখেছেন। তো গর্বিত লোকটি , হু হা করে একটু দাঁড়িয়ে বুক টান করে মাসল টাসল দেখাতে গেলো। স্যার , চেয়ার থেকে উঠে অভিনয় করে দেখালেন। যেই না , ওই স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক বুকটান করতে গেলেন , লাগলো কোমরে টান, ইঁ-ইঁ-ইঁ করে কোঁকাতে লাগলেন তিনি। স্যারের দাঁড়িয়ে দেখানো অভিনয় প্রতিভায় আমরা বরাবরের মতই মুগ্ধ হ’লাম। সোজা কথা দেখতে স্বাস্থ্যবান হলেই হবে না হে, সুস্বাস্থ্য থাকতে হবে !
ক্যাডেটের এক বন্ধু ছিল সঙ্গে। কী কারণে ক্যাডেটের কথা প্রসঙ্গ আসলে, স্যার ক্যাডেটের সমালোচনা করেছিলেন কোন একটা অনুষ্ঠানে । ক্যাডেট হচ্ছে দাস তৈরীর কারখানা বা এই রকম কিছু। পরে কোন এক প্রিন্সিপালের সাক্ষাতে স্যারকে তিনি উত্তেজিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলেন। স্যার বলেছিলেন, আপনারা তো কোরআন শরীফ না, যে সমালোচনা করা যাবে না ! ক্যাডেট কলেজ, সরকার , সংসদ কোনকিছুই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সেনাবাহিনীর এই উচ্চম্মন্যতা দীর্ঘদিনের লালিত, একাডেমী থেকে মগজের মধ্যে প্রোথিত । এরা সবসময় একটা অযোগ্য অহমিকায় ভোগে।
প্রথম আলোর মতিউর রহমান সাহেবের কথা উঠলো। এইলোক যতোগুলো পত্রিকায় ছিলেন সবগুলোই দারুণ সফল। স্যার মতিউর সাহেবের পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ভদ্রলোকের কতখানি মেধাবী । সেটা আলোচনাসাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু কাজের প্রতি তার ডেডিকেশন ও মনে রাখার ক্ষমতা অতুলনীয়।
তথাকথিত অর্থশালী, বিত্তবানদের কথা হচ্ছিল। স্যার একদিন তাঁর কোন এক সচিব বন্ধুর গাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সচিবালয়ের গেটে বিশাল স্যালুট। তো স্যারের বন্ধু, স্যারকে খানিকটা প্রচ্ছন্ন অহংকারের সাথেই বললেন, দেখলি, কত্তোবড় সালাম। স্যার, মৃদু হেসে বললেন, সালাম তোকে নয়রে , তোর গাড়ীকে দিচ্ছে।
পৃথিবীতে কত হাজার পিয়নের চাকরি চলে গেছে, শুধুমাত্র ঠিক সময়ে সালাম দিতে না পারায়!
আরে, তুই এতো বড়লোক ধনী, অর্থশালী, ক্ষমতাবান, — তুচ্ছ একটা পিয়নের সালাম না দেওয়াতে তোর এতো ক্ষোভ ! স্যারে কথা আমার মনে গেঁথে গেল, আসলেই আমরা যারা বেসরকারী চাকরিতে আছি। কলে কারখানায় অনেক গার্ড বা পিয়নের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে। সালাম দিলে ভালোই লাগে। না দিলে সমস্যা নাই। কিন্তু সত্যিকারে বিত্তশালীরা কেউ স্যালুট মিস করলে ওই তুচ্ছ পিয়নের চাকরি থাকে না , সে আমি জানি ।
কেন বিত্তশালীরা আরো, আরো আরো টাকা কামাতে চায় ? আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললাম, নিরাপত্তার জন্য, ভোগের জন্য, পরবর্তী বংশধরদের জীবন আরো নিশ্চিত করার জন্য। স্যার অসম্মতি প্রকাশ না করেই, একটু অন্যভাবে উত্তর দিলেন, আসলে সব ধনীরাই নিজেদের আরো বড় করে দেখতে চায়। মনুষ্য চরিত্র, নিজেকে বড়ো দেখানো। তো বিত্তবানেরা পারেই ওইটা, তাই বেশী বেশী কামিয়ে যতো বড়ো হওয়া যায় আর কী !
বামুনের বাড়ীর কাকাতুয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যারের পুরোন গল্প। “ গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” নামের খুব কম প্রচলিত একটা বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। বইটা পড়া ছিল, বলাতে স্যার বেশ খুশী হলেন। এইরে একটা ভালো পাঠক আছে আমার , বলে রসিকতাও করলেন আমার সাথে । স্যারের , খুব প্রিয় একটা বই “ বিস্রস্ত জর্নাল ”। কয়েকবছর পরপরই বইমেলায় নতুন করে সংস্করণ বের করেন। কিছু লেখা নতুন করে লেখেন, সংশোধন , পরিমার্জন আবার কিছু যোগ করেন। ‘ কণ্ঠস্বর’ এর সম্পাদক কিছুটা পারফেকশনিস্ট হবেন, সে আর নতুন কী ! আমি বললাম, কতোবার পরিমার্জন করবেন বিস্রস্ত জর্নাল-কে। মনে হল, আরো কয়েকবার করার ইচ্ছা আছে স্যারের।
এখন কি পড়ছেন , বলতেই বললেন, এক সঙ্গে ১৪টা বই শুরু করেছেন। জীবন ছোট, তাই বোধহয় এতো তাড়া স্যারের। হয়তো অস্থিরতা থেকেই , একসঙ্গে এতোগুলো বই শুরু করেছেন।
প্রবাসজীবন নিয়ে কথা উঠতেই বললেন। ১৮ বছর পর্যন্ত যে ভূমিতে মানুষের বসবাস। যে আলোহাওয়া, ভাষা, শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি পরিপার্শ্ব নিয়ে বেড়ে ওঠে মানুষ আঠারো বছর পর্যন্ত ; ওইখানেই শিকড় বসে যায় তার! ১৮ বছরেই একজন মানুষের চিন্তাচেতনার অনেকখানিই গড়ে ওঠে । তারপরে তাকে পৃথিবীর যে প্রান্তেই নিয়ে যাওয়া যাক না কেন ; শিকড়কে ভুলতে পারে না, বারে বারে ওই খানেই ফিরে আসে, ফিরে আসতে চায় ! কাউকে যদি, আরেকটু আগেভাগেই বছরের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে সে নতুন করে শিকড় গজাতে পারে।
চিন্তা করে দেখলাম , আমাদের বন্ধুদের যারাই একটু কম বয়েসে বিদেশ পাড়ি দিয়েছ, তাদের জীবন ও পিছুটান যতোখানি কম, অন্যরা যারা দেরি করে পাড়ি দিয়েছে তাদের ততোখানিই বেশী। কী বিপুল বেদনা নিয়েই না তারা দেশের মাটিতে ফিরে আসে বার বার। মাতৃভূমির সবকিছু নিয়েই তাদের ক্ষোভ, কিন্তু কোনভাবেই ভুলতে পারে না মাতৃভূমিকে !
মানব জীবনের ঐশ্বর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। মানুষ শীর্ষ দেখতে চায়, পূজা করে। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে হিমালয়। কিন্তু যতো আলোচনা মাত্র ২৯,০০০ ফিটের এভারেস্ট নিয়েই ! তোমার ঐশ্বর্য থাকলে তা মানুষের কাছে ধরা পড়বেই । স্যারের আগের একদিনের আলোচনার কথা মনে পড়ে গেল। হাজী মুহম্মাদ মহসীনের সময় এই ভারতবর্ষে কয়েক লক্ষ লোকের তাঁর সমপরিমাণ টাকা ছিল । কেউ তাদের কথা মনে রাখেনি। কিন্তু তাঁর সর্বস্ব ( তৎকালীন দেড় লক্ষ টাকা ) মানুষের কল্যাণে দান করেছিলেন। তাঁকে সারাজীবন মনে রেখেছে মানুষ । আসলেইতো মানুষ অকৃতজ্ঞ নয় । মানুষ ওই অসংখ্য ভোগী জমিদার ও রাজা-মহারাজাদেরকে মনে রাখে না, রাখে হাজী মুহম্মাদ মহসীনকে!
স্যারের বক্তৃতামালা নিয়ে কয়েকটা বই বের হয়েছে গত বইমেলায়, অনেকদিন পরে। স্যার একটু আফসোস করছিলেন, কতো প্রজ্জ্বলিত অনুভূতি কথামালা উনি জ্বালিয়ে গেছেন, কেউ মনে রাখেনি। কেন্দ্রের অনেককে অনেক বার বলেছেন, কোন আলোচনা হলে একটা ক্যাসেট রেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতে। হা হতিশ্যি ! চলে গেলে আর কোথায় পাবে বাছা !
স্যারের একটা প্রিয় তর্কের বিষয় হয়তো বার্ধক্য। বার্ধক্য নিয়ে স্যারের কখনোই হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। বছর কুড়ি আগেও কলেজ কর্মসূচির আলোচনায় , তাঁর বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্যার বার্ধক্যের জয়গান করতেন। স্যারের কথায়, বার্ধক্যতো একটা যোগ্যতা। আমার এই পরিপক্কতায় আসতে কতোখানি কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে !সবাইতো বৃদ্ধ হতে পারেনা। অনেকেই তার আগেই হারিয়ে যায়। ফুল হচ্ছে ফলের অন্তিম পরিণতির আগের মুহূর্ত। শেষের শুরু। মৃত্যু যদি হয় শেষ কথা তবে তাঁর দেদীপ্যমান শেষ প্রজ্বলনতো বার্ধ্যক্যেই !
আমাদের সবাইকে শরীরের যত্ন নিতে বললেন, কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন। ছেলেমেয়েদেরকে লাইব্রেরীতে যাওয়া আসা করাতে বললেন। স্যারের কাছে আমি মোটামুটি একটা প্রতিজ্ঞা করে আসলাম- বড়োকন্যাকে লাইব্রেরির সদস্য করে দেব। একটা ফর্মও তুলে এনেছি।
২০ বছরের দীর্ঘ বিরতিতে স্যারের সাথে অন্তরঙ্গ কয়েকঘন্টার আড্ডা কীভাবে যে কেটে গেল ! রাত আটটায় শুরু হয়ে কখন সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে! সবাই কেন্দ্র থেকে বের হলাম একরাশ স্মৃতিকাতরতা নিয়ে, ফেলে আসা ঐশ্বর্যময় দিনগুলোর কথা মনে করে। আবারো হয়তো দেখা হবে , এই ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে। স্যার সাদারঙের গাড়ীটি নিজে চালিয়ে বের হয়ে গেলেন । আমরাও বিদায় নিলাম , আবেশিত মনে, স্বপ্নতাড়িত হয়ে রওয়ানা দিলাম যার যার পথে !
প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর, ২০১৫
by Jahid | Nov 25, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গেলাম বছর বিশেক পরে গত ২৪শে আগস্টে। কেন্দ্রের ৯০ ব্যাচের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতীর্থ কয়েকজনের সাথে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে স্যারের ছোট্টরুমে মুখোমুখি । মূলতঃ প্রবাসী সতীর্থ খাদিজা ও শাহনীলাই আড্ডার উদ্যোক্তা। স্যারের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।
আমার কাছে কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সমার্থক। ফোনে ফোনে ও কেন্দ্রের নতুন ছাদে চা-পুরি খেতে খেতে সতীর্থদের করজোড়ে অনুরোধও করলাম , আমার এই দীর্ঘ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের ব্যাপারটা স্যারের সামনে চেপে যেতে ; বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে । ভয় ছিল , স্যার যদি আমার আলস্য দেখে বিরক্ত হয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ ধ্যাত !’ বলে বসেন , তবে লজ্জার শেষ থাকবে না ! আসলে পড়াশুনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে কখন যে কলেজ কর্মসূচী , প্রাক-মৌলিক , মৌলিক ছেড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে গেলাম মনেই নেই ! একবার তার ছিঁড়ে গেলে যা হয়, সে আর লাগে না জোড়া।
এতো অনুরোধের পরেও , কয়েকটি বাক্যের কথপোকথনের পরেই , একজন মনে করিয়ে দিল, স্যার , জাহিদ বিশ বছর পরে কেন্দ্রে এসেছে ! স্যারের চিরকালীন প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখের অভ্যর্থনাই পেলাম মনে হল। হাঁফ, ছাড়লাম, পুরনোদের মাঝে মিশে যেতে পেরে। এতোদিন পরেও আমার মতো অভাগার ব্যাপারে স্যারের সহানুভূতিতে মুগ্ধ ! আসলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালীন।অনেক দূর থেকেও শিক্ষক যেমন টের পেয়ে যান জনারণ্যে কে তাঁর ছাত্র ; ঠিক তেমনি করেই ছাত্রটিও মুহুর্তেই পুনঃআবিষ্কার করে শিক্ষকের প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধার সম্পর্কটিকে । তবে, তাঁকে ( মানে ওই শিক্ষককে হতে হয় , মানবিক ও উদ্বুদ্ধকারী)। যে শিক্ষক ছাত্রের গায়ে বেতের বাড়ি, অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া কিছু করেন নাই ; মস্তিষ্কের উপরে , হৃদয়ের উপরে দাগ ফেলতে পারেন নাই, তাদের কথা আলাদা। কোন ছাত্রই তাদের দীর্ঘদিন মনে রাখনি। শিক্ষকতা তাদের কাছে ক্ষুন্নিবৃত্তির একটা উপায় মাত্র ছিল। আমার স্কুল জীবনে ও কলেজ জীবনে এরকম দায়সারা গোছের শিক্ষক নিতান্ত কম ছিল না। এখন আরো বেড়েছে।
প্রবাসী বন্ধুদের (খাদিজা,শাহনীলা) সাথে স্যারের আন্তরিক সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিতই হলাম ! এঁরা দূর লন্ডন ও কুয়েতে থেকেও কী গভীর মমতায় , কী শুদ্ধ শ্রদ্ধায় স্যারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। আর আমি বাংলামোটর থেকে মাইল দশেক দূরে মিরপুরে থেকেও কেন্দ্র , স্যার সবকিছু থেকে থেকে সহস্র মাইল দূরে !
৯০ সালে ঢাকা কলেজে স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। বিলাসী পড়াতেন মনে আছে! আমাদের উন্মুখ হৃদয়ে স্যারে একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট ছিল চিরকালীন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
এতোদিন পরে, কেন্দ্রে যাচ্ছি, রাস্তা একটাই জানি। এও শুনেছি, কেন্দ্র নাকি অনেক উঁচু ইমারতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সেই ছিমছাম সুরঞ্জনা , সামনে ঘাসের লন, লনের শেষে বৃদ্ধ আম গাছ, কিছুই নাকি নেই। কেন্দ্রের নতুন বিল্ডিং এর ব্যাপারে আমি আরেক সতীর্থ ডন আজাদের সাথে একমত পোষণ করলাম!কেন্দ্র তার রোম্যান্টিক মৃদুমন্দ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। ওঁর ভাষায় কেন্দ্রের চেহারা বৈপ্লবিক ও আগ্রাসী হয়েছে (Revolutionary and Aggressive ) ! এইটার দরকার ছিল।
সায়ীদ স্যার কিন্তু আগের মতোই আছেন।
কলেজ কর্মসূচীর মাধ্যমে ১৯৯০ বা ৯১ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাথে আমাদের পরিচয়। কারো কারো স্কুল থেকেই হয়তোবা। স্যারের আলোকচ্ছটায় মুগ্ধ কৈশোরের অনেকেই এখন চল্লিশোর্ধ। যদিও পেশা ও জীবিকার বৈচিত্র্যে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কেন্দ্রমুখী প্রাণের টান রয়ে গেছে সবার । এমন একটা উন্মুখ সময়ে স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় ! তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য । ঘন্টা খানেকের আড্ডায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল! আড্ডার শুরুতেই মনে হয়নি, এতোটা স্মৃতিমেদুরতা থাকবে, এইভাবে আমরা কয়েকজন ফিরে যাবো আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে। স্যার কলেজ কর্মসূচির সময়েও অনভিজ্ঞ তারুণ্যের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া, জ্ঞানবিজ্ঞানের যে কোন আলোচনায় আমরা স্যারের বয়স্য বিবেচিত হতাম বলে মনে আছে।
স্যারের সাথে একদিনের আড্ডা মানেতো এক দশকের ইন্সপিরেশন !স্মৃতিতে ধুলো পড়ার আগেই , আড্ডাটাকে দিনলিপির মতো করে লিখে রাখলাম। পরে এই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে ভালোই লাগবে!
দীর্ঘ বিরতিতে আলোচনার নতুন বিষয় ছিল আমাদের সন্তানদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা। আমরাও কয়েকজন জয়া আপা( স্যারে কনিষ্ঠা) ও লুনা আপার( জ্যৈষ্ঠা ) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কথার মাঝেই , আলোচনা শুরু হল
বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুর মতো একটা ভয়ংকর বিভীষিকা দানবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কলকাকলিমুখর জীবনের সামনে, এইটুকুই ! মৃত্যু নিয়ে স্যারের আর কোন কথা ছিল না।
মৃত্যু থেকে লাফ দিয়ে চলে গেলেন রোমান্টিসিজমে। কয়েক শতক আগেও আমদের সাহিত্যে, জীবনে কোথাও রোমান্টিকতা ছিলনা। এই উপমহাদেশের জীবন ছিল নিতান্তই জৈবিক , অন্নবস্ত্র বাসস্থান , যুদ্ধ, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন এইতো ! ষষ্ট শতকের কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কথা ওঠালেন স্যার। নির্বাসিত বিরহী যক্ষে তাঁর ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চায় মেঘের মাধ্যমে। এইটুকু ছাড়া পুরো বর্ণনায় প্রিয়ার দেহের বাঁক , কামনা আর হুতাশন। শারীরিকতা বা দৈহিকতাই প্রধান। রোমান্টিকতা নেই । সেই আমরাই একসময় , সংস্কৃত ইতিহাস থেকে উঠে এসে রোমান্টিকতায় ভেসে যাচ্ছি।
স্যারের পর্যবেক্ষনে মানুষ সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। আমরা সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমাদের সবার বিয়ের মোটামুটি কমবেশী বারো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে !
এক বন্ধুতো মন্তব্য করেই ফেলল, স্যার এইজন্যই সব কিছু পানসে পানসে লাগছে। রোমাঞ্চ নেই, বড্ডো একঘেয়েঁমি ! হাসির একটা হুল্লোর উঠলো ছোট্ট রুমটাতে।
ইংল্যান্ডে কোন একটা প্রাচীন স্থাপনা দেখার প্রসঙ্গ আসতেই , আলোচনা অজন্তা, ইলোরাতে চলে গেল। স্যারের মুখের সৌকর্যময় বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার নিজেরই ইচ্ছা করছিল, অজন্তা ও ইলোরা দেখতে।
কেন্দ্রের পুরোনোদের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা উঠলো, ডাঃ আব্দুন নুর তুষার ভাইয়ের ব্যাপারে স্যার বললেন, ছেলেটা মেধাবী, কেন আরো উপরে যেতে পারছে না বলতো ? নিজেই উত্তর দিলেন, কারণ ও অলস ! আরো পরিশ্রমী হলে ও অনেকদূর যেতে পারত।
নতুন সরকারের নানামুখী কাজের পাশাপাশি পুরনো আমলের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রসঙ্গ উঠল। সম্ভবতঃ নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মতো সরে জমিনে ফিল্ড ট্রিপের অভ্যাস থেকেই নাজমুল হুদার কথা উঠেছিল। তারও অভ্যাস ছিল হুট করে পথে নেমে নিজে নিজেই সরেজমিনে শো অফ করা ; বাহাদুরি দেখানো। তো স্যার একদিন নাজমুল হুদাকে বললেন, এইটা তার করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ নেতা কেন সম্মুখসমরে যাবে? নেতার হাতে কেন তরবারী থাকবে? কোন কারণে একজন সাধারণ জনগণ যদি নেতাকে বা মন্ত্রীকে একটা চড়ও মেরে বসে, মানসম্মান কী আর উঠে আসবে ?
ব্রাহ্মণ্য নিয়ে , কৌলিন্য বা এলিটিজম নিয়ে, যতোই দ্বেষ থাকুক না কেন, স্যার নিজেকে, শিক্ষকদেরকে সমাজের ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন । সেদিনও দিলেন। জাতভেদে যারা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, সমাজের মাথা তারাতো ব্রাহ্মণই । ব্রাহ্মণ মাথা চালাবে। যুদ্ধ করবে ক্ষত্রিয় । বৈশ্য করবে ব্যবসা। শূদ্র বাকী তুচ্ছ কাজগুলো। দাবার বোর্ডে রাজা স্বয়ং যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধ করে অন্যরা। তরবারীর এক খোঁচায় রাজা ঠুস্ করলেতো যুদ্ধই শেষ !
সরকার থেকে কেন্দ্র ডেমরা বা গেণ্ডারিয়াতে একটা জমি পেয়েছে। ঐখানে স্থাপনার জন্য দশ কোটি টাকার একটা আবেদন করে বসে আছেন কবে থেকে। স্যারের ইচ্ছা একটা মিলনায়তন বা প্লাজা টাইপকরে কেন্দ্রের কিছু অর্থসংস্থান করা। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীগুলোর খরচ, স্কুল কর্মসূচির খরচ, প্রকাশনা ইত্যাদি দিনে দিনে বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে ! ঘুরে ফিরে আত্মীয়তন্ত্রের কথা চলে আসলো, শত শত কোটি টাকা হাপিস হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু শিক্ষার জন্য দশকোটি মানেই দ্বারে দ্বারে ঘোরা।
(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য )
প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর ২০১৫
by Jahid | Nov 25, 2020 | সাহিত্য
এ পৃথিবী বড়ো , তবু তার চেয়ে ঢের বেশি এই
সময়ের ঢেউগুলো- অনিঃশেষ সমুদ্রের থেকে
অন্তহীন সাগরের অভিমুখে কোথায় চলেছে ।
রাত্রি আসে –রাত্রি শেষ হয়ে গেলে আলো;
আলো আরো মৃদু হ’লে তার চেয়ে বেশি
স্নিগ্ধ অন্ধকার সব—আকাঙ্ক্ষিত মেয়েটির হাতের মতন
কাছে এসে ,সংবরণ ক’রে তবু, যেন নেপথ্যের
ওপারের থেকে তার কথা বলে ।
অগাধ আয়ুর শিশু এরা সব ঃ এই দিন, এই রাত্রি ,
বাতাসের আসা-যাওয়া , নীল নক্ষত্রের ফুটে ওঠা,
শিশির ঝরার শব্দ , আশ্চর্য পাখির
ডিম প্রসবের সাড়া ; আবার রোদের দিন মাঘ ফাল্গুনের ;
সহসা বৃষ্টির রাত্রি,– হেমন্তের ঠান্ডা নিঃশব্দতা
কবের আয়ুর শিশু এরা সব ;– ম্যামথ দেখেছে।
শতাব্দীর সন্ধিপথে আজ মানুষের
আধো-আলো আধো- আশা অপরূপ অধঃপতনের
অন্ধকারে অবহিত অন্তর্যামীদের মতন ভোরের সূর্য ;
দূরতম সমুদ্রের হাওয়া এসে ছুঁয়ে কিছু ভালো ব’লে যেতে চায় ;
নগরীর বিদগ্ধ লোকেরা কথা ভেবে—ব’লে
প্রেরণা জাগাতে চায় ;
সহজ ত্যাগীরা কাজ করে ;
রক্তে দেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে ;
কথা ভাষা স্বপ্ন সাধ সংকল্পের ব্যবহারে
মানুষেরা মানুষের প্রিয়তর না হ’য়ে শুধু দূরতর হয় ;
হৃদয় মলিন হ’য়ে যেতে থাকে ;
নিয়ন্ত্রিত জ্ঞানেরো আকাশ ঢেকে কুয়াশা বাড়ছে;
মুক্ত হতে গিয়ে সুধী কেবলি রোমাঞ্চকর রূঢ় সায়েন্সের
জন্ম দেয় ; চারিদিকে অগণন মানুষের মৃত্যু তার বড়ো কাহিনীর
যবনিকাপাতের প্রাক্কালে ক্লান্তির মতো ;
তখন শতাব্দী অন্ধ—অবসন্ন—ব্যর্থ ।–
হয়তো এ পৃথিবীতে মানবের অনন্ত চারণ,
লোভ থেকে লোভে শুধু –ব্যাথা থেকে ব্যাথার ভিতরে,
ভুল থেকে উল্লোল ক্ষমতাময় ভুলের গহ্বরে;
চাঁদের কুয়াশা থেকে অঘ্রাণ রাতের
নক্ষত্রের অন্ধকারে ;-
তারপর নক্ষত্রেরা নেই।
নবীন প্রয়াণে স্পর্শে মানুষেরা একদিন চীন পিরামিড
গড়েছিল ; সূর্যঘড়ি চিনেছিল ; প্রিয়তর উজ্জ্বল সূর্যকে
দিব্য দিয়ে নগরীর ভাঙ্গা হাড়ে কেবলি গড়েছে
নতুন খিলান স্তম্ভ ফ্যাক্টরি এঞ্জিন ক্রেনঃ
এ সব বিচিত্র নীড় কুশলতা কল
সময়ের থেকে দূর বড় সময়ের কাছে
মানুষের যেই পরিচয় রেখে যায়
তা তার আবেগ বুদ্ধি উৎকণ্ঠার;-
যেন তা কল্যাণ সত্য চায় –তবু অগাধ হিংসার—
রিরংসার পাকে ঘুরে –ঘুরে ঘুরে শূন্য হয়ে যায় ;
অন্ধকার থেকে মৃদু আলোর ভিতরে
আলোর ভিতর থেকে আঁধারের দিকে
জ্ঞানের ভিতর থেকে শোকাবহ আশ্চর্য অজ্ঞানে
বারে- বারে আসা- যাওয়া শেষ ক’রে ।
চিরকাল ইতিহাসবহনের পথে
রক্ত ক্ষয় নাশ ক’রে সে এক জগতে
মানুষের দিকচিহ্ন মাঝে মাঝে মুক্ত হ’য়ে পড়ে ;
তা কোন প্রশান্তি নয় , মৃত্যু নয়, অপ্রেমের মতো নয়,
কোনো হেঁয়ালির শেষ মীমাংসার বার্তা নয়,
অচিহ্নিত সাগরের মতন তা , দূরতম আকাশের মতো ;
পেছনের পার্শ্বের দ্রুতগতি চিহ্ন ও বলয়
অন্তর্হিত হ’য়ে গেলে কূলহীন পটভূমি জেগে ওঠে
ব্যক্তি ও জাতির নাম সময়ের দিগন্তরে শেষ হ’লে
শূন্য নীল আকাশের – মহাসাগরের শূন্যে মেশে ;
চিনে নিতে পারে তার হৃদয়ের অসীম ভূগোলে
আরো শুদ্ধ আরো গাঢ় অনির্বচনীয় সম্মিলন
মানুষ ও মানুষেরঃ চারিদিকে গ্লোবমাস্টারের শব্দে
অন্তহীন অন্ধকারে হাঙর মকর মৃত্যু কুজ্ঝটিকায়
মৃত মূঢ় এরিয়েল ও বেতারের ব্যর্থতায়
যদিও প্রত্যাশা সব সর্বশান্ত ব’লে মনে হয়—
আশার আস্থার আধার তবু নিজেই মানুষ
মহাকাশ কিংবা মহাসাগরের চিহ্নগুলো নয়।
by Jahid | Nov 25, 2020 | দর্শন, শিল্প ও সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি
অন্যদের সমস্ত কিছুতে নাক গলাতে বাঙালি শুধু পছন্দই করে না, এটা কর্তব্য ব’লে গণ্য করে। বাঙালি তার এলাকার সকলের সমস্ত খবর রাখে, খারাপ খবরগুলো মুখস্ত রাখে; এবং যদি কারো কোনো খারাপ খবর না থাকে, তবে বাঙালি তার একটা খারাপ খবর তৈরি করে। বাঙালি অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বাস করে না। বাঙালি অন্যের একান্ত বা ব্যক্তিগত কিছু সহ্য করে না। তাই বাঙালির কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই। বাঙালি প্রতিবেশীর ঘরবাড়ির ওপর বিনিদ্র চোখ রাখে, ওই বাড়িতে কে বা কারা আসে, কখন আসে ও যায়, সব সংবাদ রাখে, এবং সংবাদ বানায়। বাঙালির ঘরবাড়িতে যে দরোজাজানালা লাগানোর ব্যবস্থা আছে, এটা আপত্তিকর ব্যাপার প্রতিবেশীর চোখে। বাঙালি কারো সাথে দেখা করতে এলে দরোজায় কড়া নাড়ে, ডাকে; সাড়া না পেলে পাড়া মাতিয়ে তোলে, এমনকি দরোজা ভেঙে ঘরে ঢোকার উপক্রম করে। বাঙালির চোখে ব্যক্তিগত জীবন পাপ; বাঙালি মনে করে দরোজা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পাপকর্মে লিপ্ত হয়; তাই তার দায়িত্ব অন্যের দরোজা ভেঙে ঢুকে তাকে পাপ থেকে উদ্ধার করা। তবে বাঙালি উদ্ধার করে না, অন্যকে বিপদে ফেলাই তার সমস্ত উদ্বেগের উদ্দেশ্য। বাঙালি অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর আরেকটি দিক হচ্ছে কুৎসা রটনা। বাঙালি কুৎসা রটিয়ে সুখ পায়; আর এ-কুৎসা যদি যৌন হয়, তাহলে তা সর্বশ্রেষ্ঠ। বাঙালি একটি নিন্দাকেই বড়ো নিন্দা মনে করে, তা হচ্ছে লাম্পট্য নিন্দা। কোনো পুরুষকে লম্পট অথবা কোনো নারীকে ভ্রষ্টা হিশেবে চিহ্নিত করে দিতে পারলে বাঙালি জীবন সার্থক হয়েছে ব’লে মনে করে।
বাঙালির যৌনজীবন একটি ভয়ংকর ট্যাবো। ওই জীবন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না; কিছু লেখা হয় না। ওটাকে নিষিদ্ধ জীবনও বলা যায়। এক আশ্চর্য সন্দেহজনক গোপনীয়তায় ঢাকা ওই জীবন, যেনো তার আলোচনা পাপ। এ থেকেই বোঝা যায় তার ওই জীবনটি পঙ্কিল, দূষিত, অপরাধপূর্ণ, অস্বাভাবিক ও সুখশূণ্য। বাঙালি যৌন ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী; প্রতিটি পুরুষ একেকটি ক্যাসানোভা, কিন্তু তাদের কামনা সাধারণত অচরিতার্থই থাকে, তাই ভরা থাকে নানা বিকৃতিতে। কিশোরেরা বাঙলায় জড়িত যৌনবিকৃতিতে, যুবকেরা সময় কাটায় যৌনক্ষুধায়, বয়স্ক ও বৃদ্ধরাও তাই। অধিকাংশ বাঙালিই যৌনআলোচনায় সুখ পায়, অন্যের যৌনজীবন নিয়ে কুৎসা রটায়; বড়োদের আলোচনার বড়ো অংশ যৌনতাবিষয়ক। কিন্তু পরিচ্ছন্ন ভন্ড তারা; তাদের কাছে এ-সম্পর্কিত কিছু জানতে গেলে তারা এমন ভাব করে যেনো তারা যৌনতার কথা কখনো শোনে নি; কাম কী তারা জানে না। বাঙালির জীবনের এ-অংশটি বিকৃত। বাঙালিসন্তান এ-বিষয়ে কোনো শিক্ষা পায় না; নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে জানে না; তাদের আচরণ ও ব্যবহার জানে না। পরোক্ষভাবে তারা কতোগুলো সামাজিক ও ধর্মীয় নিষেধের মুখোমুখি হয়। ওই নিষেধগুলো পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক। বাঙালির যৌনজীবনে বিজ্ঞান নেই, কলাও নেই; রয়েছে পাশবিকতা। বাঙালির যৌবন অতিবাহিত হয় অবদমিত যৌন কামনাবাসনায়, যার ফল বিকৃতি। ধর্ষণ বাঙলায় প্রাত্যহিক ঘটনা, বাঙালিকে ধর্ষণকারী জাতিও বলা যায়। এর মূলে রয়েছে সুস্থ যৌনজীবনের অভাব। পশ্চিমে যে-বয়সে তরুণতরুণীরা ঘনিষ্ট হয়, সুখ আহরণ করে, সে-বয়সটা বাঙালির কাটে প্রচন্ড যন্ত্রণায়। বাঙালির যৌবনমাত্রই ব্যর্থ, ও যন্ত্রণাপীড়িত। সুস্থ মানুষ ধর্ষণ করে না; অসুস্থরা ধর্ষণ না করে পারে না। বাঙালির বিবাহবহির্ভূত যৌনজীবন ছোটো নয়, তারা খোঁজে থাকে এ-সুযুগের; কিন্তু বিবাহিত যৌনজীবনই তার শরীর কামনা পরিতৃপ্তির প্রধান স্থল। এ-ক্ষেত্রে বাঙালি কি তৃপ্ত? এ-সম্পর্কে কোনো সমীক্ষা পাওয়া যায় না; আলোচনা পাওয়া যায় না কোনো। বাঙালি এ-ক্ষেত্রে পরিতৃপ্ত নয়; শুধু অপরিতৃপ্তই নয়, প্রচন্ড অসুখী। বাঙালির যৌনক্ষেত্রে পুরুষ সক্রিয় কর্মী; নারী নিষ্ক্রিয় শয্যামাত্র। পুরুষ নিজের সাময়িক সুখ ছাড়া আর কিছু ভাবে না, সঙ্গিনীও যে সুখী হ’তে চায়, তা জানে না; কখনো জানার কথা ভাবে না। বাঙালি নারীপুরুষ পরিতৃপ্তির সাথে পরস্পরকে উপভোগ করে না। উপভোগের ধারণাও তাদের নেই। যে-প্রশান্তি, স্বাস্থ্য ও নিরুদ্বেগ পরিবেশ প্রয়োজন পরিতৃপ্তির জন্যে, তা নেই অধিকাংশ বাঙালির। তাই বাঙালি অনুপ্রাণিত হওয়ার সাথে সাথেই উপসংহারে পৌছে; এটা তার জীবনের সংক্ষিপ্ততম কাজ; যদিও এটা বৃহত্তম কাজ জীবনে। এখানে যে-অপরিতৃপ্তি, তা ঘিরে থাকে বাঙালি সমগ্র জীবন; তাকে রুগ্ন ক’রে রাখে। এ-রুগ্নতার ফল বাঙালির হঠাৎ-জাগা কামনা। বাঙালি নারী দেখলেই তাকে কাম্য বস্তু মনে করে, মনে মনে রমণ করে। এমন যৌনঅসুস্থ জাতি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্থ হ’তে পারে না।
একটা রোগ আগে বাঙালির ছিলো না; কিন্তু গত দু-দশকে উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে ওই রোগটির, যার নাম ‘স্থানচ্যুতির অস্থিরতা বা বৈকাল্য’। বৃটিশ পর্বে বাঙালি জানতো সমাজে তার স্থান কোথায়, যে চাষী হবে, না হবে দারোগা, না কেরানি, না মেজিস্ট্রেট? পাকিস্থাপর্বেও জানতো কী হ’তে পারে সে; তার স্বপ্নের একটি নির্দিষ্ট সীমা ছিলো। দু-দশকে ওই সীমাটি ভেঙ্গে গেছে; বাঙালি এখন যা কিছু হতে পারে। যার স্বপ্ন সে দেখে নি, তা সে পেতে পারে; যার যোগ্যতা সে অর্জন করে নি, সে তার প্রভু হ’তে পারে। যার হওয়ার কথা ছিল বা যে সুখী বোধ করত নিম্নপদস্থ হয়ে, সে হঠাৎ একদিন নিজেকে দেখতে পাচ্ছে উচ্চপদে; যে-কেরানিও হতে পারতো না, সে মন্ত্রনালয়ের প্রভু হচ্ছে; যার কথা ছিলো অসরকারি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো অধ্যাপক হচ্ছে। যার বাসে ঝোলার কথা ছিলো, সে হঠাৎ হয়ে উঠছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। ফলে চারিদিকে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। পদ আর ব্যক্তিটির মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি হচ্ছে না, পদটিকে মনে হচ্ছে ব্যক্তিটির ওপরে, বা ব্যক্তিটির মাথার ওপর চেপে আছে পদটি। চারপাশে এখন দেখা যাচ্ছে স্থানচ্যুতি রোগটি। তাই কোথাও কিছু চলছে না ঠিক মতো। চারিদিকে বিকলন।
পশ্রীকাতরতা, বলা যাক পরোন্নতিকাতরতা- কারণ কারোই শ্রী নেই এখন, বাঙালির একটি স্থায়ী রোগ। পিতামাতার জিনক্রোমোসোমের সাথে, ছেচল্লিশের দ্বিগুণ হয়ে, এটি সংক্রমিত হয় বাঙালির সত্তায়। কারো ভালো দেখতে নেই, এমন একটি জন্মলব্ধ জ্ঞান নিয়ে আসে বাঙালি; আর চারপাশে যা দেখে, তাতে উত্তেজিত থাকে সবসময়। তবে বাঙালি শত্রুর উন্নতিতে যতটা কাতর হয়, তারচেয়ে বেশি কাতর হয় বন্ধুর উন্নতিতে। উন্নতির ক্ষেত্রে বন্ধুই বাঙালির শত্রু। শত্রুর উন্নতি ঘটলে যে-বিষ ঢোকে বাঙালির শরীরে, তা মধুর করা যায় নিন্দা ক’রে; কিন্তু বন্ধুর উন্নতিতে রক্তনালি দিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিষকে কিছুতেই মধুর করা যায় না। একটিই উপায় আছে , সেটি বন্ধুবিচ্ছেদ। উন্নতিকাতরতা রোগটি হয়তো জন্মসূত্রে পাওয়া নয় বাঙালির, পাওয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূত্রে, যে-সূত্র কোনো নিয়ম মানে না। যোগ্যের উন্নতি হয় না বাঙালি সমাজে, উন্নতি ঘটে অযোগ্যের; অযোগ্যরাই তাদের অসাধারণ যোগ্যতা দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে যায়, যোগ্যরা নিচে প’ড়ে থাকে। উন্নতির সুযোগ এত সীমিত যে তা’কে ভাগ্য না বলে উপায় নেই, কে যে ভাগ্যবান হবে তা আগে থেকে বলা যায় না। কিছুই সুনিশ্চিত না বাঙালি সমাজে, সুনিশ্চিত শুধু অসংখ্য বাঙালির উন্নতিকাতরতা রোগে আক্রান্ত হওয়া। উন্নতির একটি উপায় এখানে দাসত্ব বা দালালি। বাঙালিসমাজ প্রধানত দালালসমাজ। পরোন্নিতিকাতরতা থেকে মুক্তির একটি উপায়ও বের করেছে বাঙালি, চমৎকার উপায়, তা হচ্ছে পরনিন্দা। বাঙালি পরনিন্দায় সুস্থবোধ করে। পরনিন্দা শুধু ছিদ্রান্বেষণ নয়, যার যে ছিদ্র নেই তার সে-ছিদ্র আবিষ্কারই পরনিন্দা। বাঙালি উপকারীর নিন্দার জন্যে খ্যাত। নিন্দিতরাও এর চমৎকার উত্তর বের করেছে, তারা যে-কোনো সমালোচনাকেই নিন্দা ব’লে গণ্য করে। বাঙালির দোষের শেষ নেই; তাই তার আচরণের বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ বর্ণনাকেও নিন্দা ব’লে মনে হয়। বাঙালি সমালোচনা সহ্য করে না, নিজেকে কখনো সংশোধন করে না; নিজের দোষত্রুটি সংশোধন না ক’রে সেগুলোকে বাড়ানোকেই বাঙালি মনে করে সমালোচনার যথাযথ উত্তর। বাঙালি যখন নিজের সম্পর্কে অন্য কারো মত চায়, তখন সে প্রশংসাই আশা করে; আর প্রশংসা না পেলে ক্ষুব্ধ হয়। বাঙালি নিজের সব কিছুকেই মনে করে প্রশংসনীয়; কিন্তু বাঙালি কখনো অন্যের প্রশংসা করে না। বাঙালি শক্তিমানের মিথ্যা প্রশংসা করে, যা স্তাবকতা মাত্র; কিন্তু প্রকৃতই প্রশংসা যার প্রাপ্য, তার কখনো প্রশংসা করে না। যার প্রশংসা প্রাপ্য, তার প্রশংসা করাকে বাঙালি গণ্য করে নিজের অপূরণীয় ক্ষতি ব’লে।
বাঙালি দায়িত্বহীন, কোনো দায়িত্বই বাঙালি ঠিকমতো পালন করে না। তবে বাঙালি দায়িত্ব পালন সম্পর্কে অন্যকে হিতোপদেশ দিতে ব্যগ্র থাকে। কোনো কাজের সাথে যদি নিজের স্বার্থ জড়িত না থাকে, তাহলে বাঙালি সেটি দিনের পর দিন ফেলে রাখে, এবং চাপ ছাড়া কোনো কাজ করে না। বাঙালির প্রতিটি কর্মস্থল অকর্মস্থল, দায়িত্ব-পালন-না করার কেন্দ্র। বাঙালি কর্মস্থলে ঠিকমতো যায় না, গেলেও কোনো কর্ম করে না; যা করে, তার অধিকাংশই অকর্ম। বাঙালির জীবনের অর্ধেকেরও বেশী ব্যয় হয় অকর্মে। বাঙালি সততার ভান করে, কিন্তু খুবই অসৎ। প্রতিটি কর্মক্ষেত্র অসৎ মানুষের লীলাভূমি। ঘুষ খাওয়া বাঙালির প্রিয়। বাঙালি সবসময়ই সুযোগে থাকে কীভাবে অন্যকে ফেলা যাবে অসুবিধায়, এবং ঘুষ খাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। বাঙালির রাষ্ট্রব্যবস্থাই ঘুষ খাওয়ার যন্ত্র। ঘুষ খাওয়াকে বাঙালি গৌরব মনে করে। বাঙালি নীতির কথা বলে সব সময়, কিন্তু নীতি রক্ষা করে না। বাঙালি মনে করে নীতি রক্ষা করবে অন্যে, তার নিজের কাজ হচ্ছে নীতির কথা বলা। সামান্য অসুবিধার জন্যে বাঙালি প্রতিমার মতো নীতি বিসর্জন দেয়; কোনো অনুতাপ বোধ করে না।
বাঙালি ইন্দ্রিয়পরায়ণ, সব ধরণের নেশার প্রতি আসক্ত; কিন্তু প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে না। সুযোগে সব বাঙালিই মদ্যপান করে, কিন্তু স্বীকার করে না। ধুমপান বাঙালির প্রিয় নেশা। অন্যান্য নেশা যেহেতু নিষিদ্ধ বাঙালি সমাজে, তাই ধুমপানকেই তারা নিজেদের সমস্ত উদ্বগ থেকে মুক্তির উপায়রূপে গণ্য করে। বাঙালির ধারণা মদ্যপান করলেই মাতাল হ’তে হয়, বা মাতাল হয়; তাই বাঙালি সামান্য পানের পরেই মাতলামো করে। বাঙালির জীবনে আনন্দ নেই, আনন্দ পাওয়াকে বাঙালি গর্হিত ব্যাপার মনে করে। আনন্দ পাওয়ার জন্যে দরকার উৎসব; কিন্তু বাঙালির উৎসবগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাঙালি সেগুলোতে অংশ নেয় না, থাকে দর্শকরূপে। আনন্দ পাওয়ার জন্যে নিজেকে ভুলে যাওয়াও দরকার, কিন্তু বাঙালি ভোলে না সে কে। বড়োই আত্মসচেতন বাঙালি। বাঙালি আত্মসচেতন, অর্থাৎ শ্রেনীসচেতন, পদসচেতন, অর্থসচেতন। বাঙালি সব সময় নিজের সঙ্গে অপরের তুলনামুলক মূল্যায়নে ব্যস্ত থাকে, নিজেকে ওপরে দেখে, এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। বিচ্ছিন্নতা আনন্দ বা সুখের বিরোধী। প্রতিটি বাঙালি কোনো ব্যক্তি নয়, সে একটি শ্রেণী, বা পদ বা টাকার বাক্স। বাঙালি বাহ্যিকভাবে চালাকচতুর, অনেক কিছু বোঝেও তাড়াতাড়ি, কিন্তু বেশি কিছু বোঝে না। একজন জাপানি বা চীনার পাশে বাঙালিকে মনে হবে অনেক বেশি চৌকশ, চীনা-জাপানিকে মনে হবে বোকা; তবে ঈশপের খরগোশের মতো বাঙালি মাঝপথে ঘুমিয়ে পড়বে; অন্যরা এগিয়ে যাবে কিংবদন্তির কাছিমের মতো। বাঙালি ‘মোটামুটি’তেই সন্তুষ্ট, তারা কখনো চরম উৎকর্ষের অভিলাষী নয়।
বাঙালি না ভেবে লাফ দেয়, এবং লাফ দেয়ার পর বার বার ভাবে, অর্থাৎ অনুশোচনা করে। প্রতিটি বাঙালির জীবন অসংখ্য অনুশোচনার ভান্ডার। বাঙালি যা হ’তে চায়, সাধারণত তা হয় না; এবং যা হয়, তা সাধারণত হ’তে চায় নি। তাই জীবন কাটে অনুশোচনায়। ধারাবাহিক অনুশোচনার শ্লথ স্রোত বাঙালির জীবন। বাঙালি নিজেদের মনে করে অন্য জাতিদের থেকে উৎকৃষ্ট;- অন্য সমস্ত জাতিকেই দেখে পরিহাসের চোখে, এবং নিজেদের সব কিছুকে মনে করে অন্যদের সবকিছুর চেয়ে ভালো। তাই বাঙালি জাতিগর্বী। তার চোখে চীনা-জাপানি হাস্যকর, পাঠানপাঞ্জাবি উপহাস্যকর; পশ্চিমের মানুষেরা প্রায় অমানুষ। তবে এদের মুখোমুখি বাঙালি অসহায় বোধ করে, ভোগে হীনমন্যতায়। বাঙালি ভিক্ষা করতে লজ্জা বোধ করে না। দরিদ্রদেরই শুধু নয়, বাঙালি ধনীস্বভাবের মধ্যেও রয়েছে ভিখিরির স্বভাব। বাঙালির স্বভাবের কোনো দৃঢ়তা নেই; তাই বাঙালির পতনও ট্র্যাজিক মহিমামন্ডিত হয় না, পরিণত হয় প্রহসনে। বাঙালি ভাঙে না, লতিয়ে পড়ে। বাঙালির প্রিয় দর্শন হচ্ছে বেশি বড়ো হোয়ো না ঝড়ে ভেঙে পড়বে, বেশি ছোটো হোয়ো না ছাগলে খেয়ে ফেলবে;- তাই বাঙালি হ’তে চায় ছাগলের সীমার থেকে একটু উচ্চ,- নিম্নমাঝারি। বাঙালির এ-প্রবচনটিতে তার জীবনদর্শন বিশুদ্ধরূপে ধরা পড়ে। এতে নিষেধ করা হয়েছে অতি-বড়ো হওয়াকে, কেননা তাতে ঝড়ে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা; আর নিষেধ করা হয়েছে খুব ছোটো হওয়াকে, কেননা তাতে সহজেই বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা। তাই মাঝারি হ’তে চায় বাঙালি; বাঙালি মাঝারি হওয়ার সাধক। মাঝারি হতে চাইলে হওয়া সম্ভব নিম্নমাঝারি; এবং বাঙালির সব কিছুতেই পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নমাঝারিত্বের।
বাঙালি উদ্ভাবক নয়, তাত্ত্বিকও নয়। সম্ভবত কোন কিছুই উদ্ভাবন করে নি বাঙালি, এবং বিশ্বের আধূনিক উদ্ভাবনগুলোতে বাঙালির কোনো ভূমিকা নেই। কোনো তত্ত্ব ও চিন্তার জনক নয় বাঙালি; বাঙালির সমস্ত তত্ত্বই ঋণ করা। আধূনিক বাঙালির জীবনে যে-সমস্ত তত্ত্ব কাজ করে, তার একশোভাগই ঋণ করা। বাঙালি সাধারণ সূত্র রচনা করতে পারে না, আন্তর শৃঙ্খলা উদ্ঘাটন করতে পারে না; পারে শুধু বর্ণনা করতে। বাঙালি সংঘ গরে তুলতে পারে না, তবে ভাঙতে পারে; এক সংঘকে অল্প সময়ের মধ্যে বহু সংঘে বিশ্লিষ্ট করার প্রতিভা রয়েছে বাঙালির। বাঙালি একদিন যা গ’ড়ে তোলে কিছুদিন পর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তাতেই। বাঙালি যে-সংঘের প্রধান হ’তে পারে না, সে-সংঘ তার নিজের গড়া হ’লেও তাকে সে আর প্রয়োজনীয় মনে করে না। বাঙালি আমরণপ্রাধান্যে বিশ্বাস করে। তাই বাঙালি গণতান্ত্রিক নয়, যদিও গণতন্ত্রের জন্যে প্রাণ দেয়। বাঙালি সুবিধাবাদী; সুবিধার জন্যে সব করতে পারে। বাঙালি পুজো করতে পছন্দ করে; প্রতিমা বা লাশ পুজোতেই বাঙালির সুখ। বাঙালি লাশের গলায় মালা দেয়, তবে জীবিতকে লাশে পরিণত করে। বাঙালি মূল্যায়ন করতে পারে না; কারো বা কোনো বস্তুর আন্তর মূল্য কতোটা, তা স্থির করতে পারে না বাঙালি; একবার কারো বা কিছুর ভুল মূল্য স্থির হয়ে গেলে, তার পুনর্মূল্যায়নে বাঙালি রাজি হয় না।
এমন একটি জনগোষ্ঠিকে কি রুগ্ন বলে শনাক্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ আছে? এ-রুগ্নতা সাময়িক নয়, কয়েক দশকের নয়, বহু শতকের; সম্ভবত শুরু থেকেই বাঙালি ভুগছে এ-সমস্ত রোগে; এবং দশকে দশকে দেখা দিচ্ছে নানা অভিনব ব্যাধি। তার শরীর রুগ্ন, রুগ্ন তার মন; তার আচরণ রুগ্ন, রুগ্ন তার স্বপ্ন। তার সমাজ রুগ্ন, সামাজিক রীতি রুগ্ন; তার রাজনীতি রুগ্ন, রুগ্ন তার রাষ্ট্র। কোথাও তার স্বাস্থ্য নেই, সুস্থতা নেই। এতো রোগের সমষ্টি যে-জনগোষ্ঠি, তার বর্তমান অবশ্যই শুয়ে আছে রোগশয্যায়; তার ভবিষ্যত শুধু শ্মশান বা কবরস্থান। বাঙালি ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কিনা, সন্দেহ করা চলে। মালার্মে অনেক আগেই মুমূর্ষ বা অবলুপ্তির কাছাকাছি পৌছে যাওয়া একটি পাখির সাথে তুলনা করেছিলেন বাঙালিকে; ফরাশি প্রতীকী কবির এ তুলনাটি যদি সত্যে পরিণত হয়, তাহলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। বাঙালি চিকিৎসায় বিশ্বাসী নয়। কোনো দিকেই বাঙালির রোগের চিকিৎসা চলছে না। জাতির চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু রাষ্ট্র চিকিৎসার বদলে রোগ বাড়াতেই বেশি আগ্রহী। রাষ্ট্র এখন রুগ্ন ক’রে চলেছে বাঙালির শরীর ও মন, তার কাঠামো ও মনোজগত; রুগ্ন করে চলেছে তার সমাজ, রাজিনীতি, রাষ্ট্র। রুগ্ন রাজনীতি বিনাশ ঘটায় সব কিছুর; এখন বিনাশ ঘটছে বাঙালির সব কিছু। বাঙালি হয়ে উঠছে আরো প্রতারক, ভন্ড; হয়ে উঠছে আরো অসৎ, নীতিশূণ্য, আদর্শহীন; বাঙালি হয়ে উঠছে আরো খল, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী। নিয়ন্ত্রণের ফলে বিকৃত হচ্ছে বাঙালির শরীর, ও কামনাবাসনা। যতোই ধর্মের কথা বলা হচ্ছে অজস্র মাইক্রোফোনে, ততোই বাড়ছে অনৈতিকতা; যতোই শোনানো হচ্ছে সংযমের কথা, ততোই বাড়ছে অসংযম ও বিকৃত কাম; পান যতোই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, শক্তিমান মাতালের সংখ্যা ততোই বাড়ছে। বাঙালি হয়ে উঠছে একটি বিকৃত জনগোষ্ঠি। মনোবিজ্ঞানীর চোখ দেয়া দরকার এদিকে, যেমন চোখ দেয়া দরকার সমাজবিজ্ঞানীর। বাঙালির রুগ্নতা আর লুকিয়ে রাখা চলে না, ক্ষতস্থলকে ময়লা কাপড়ে মুড়ে রাখলে ক্ষত শুকোয় না, তাতে পচন ধরে। পচন ধরেছে এর মাঝেই। বাঙালির চিকিৎসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না;- একটি জনগোষ্ঠি কি রুগ্ন থেকে রুগ্নতর হ’তে হ’তে লুপ্ত হয়ে যাবে?
সাম্প্রতিক মন্তব্য