বাংলা প্রবাদ ও প্রবচন সম্পাদনাঃ সুবলচন্দ্র মিত্র

আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর কেন ।

আদা জাহাজে করিয়া বিদেশে রপ্তানী হয় না; স্থানীয় হাটে বাজারেই খরিদ বিক্রয় হয়। সেইজন্য আদা ব্যবসায়ীর জাহাজের খবর জানিবার কোন প্রয়োজন নাই। অনধিকারচর্চাস্থলে এই প্রবাদ প্রযুক্ত হয়। “ The Cobbler must stick to his last.” Or “ Let the Cobbler(মুচি) stick to his last.”

আহার নিদ্রা ভয়, যত বাড়াও তত হয়।

আহার , নিদ্রা ও ভয় ইহাদিগকে যত বাড়াইবে ততই বাড়িবে।

উড়ো খৈ গোবিন্দায় নমঃ ।

বাতাসে খৈ উড়িয়ে নিয়ে যাইতেছে, তাহা আর সংগ্রহ করিবার উপায় নাই দেখিয়া সেইগুলি গোবিন্দায় নমঃ বলিয়া দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করিয়া দিল। প্রতিকূল অবস্থায় পড়িইয়া বাধ্য হইয়া কোন সৎ কার্য করা। “ Making a virtue of necessity ”

উসকো মাটিতে বিড়াল হাগে।

নরম লোক পাইলে সকলেই তাহার উপর আধিপত্য প্রকাশ করে।

হিন্দিতে আছে, বিল্লি শাক্‌তি পার নেহি হাগ্‌তি।

এক যাত্রার পৃথক ফল।

একসঙ্গে একই কার্য আরম্ভ করিয়া একজনকে যদি পুরস্কৃত এবং অপরজন যদি তিরস্কৃত হয়, তাহা হইলে তাহাদের এক যাত্রায় পৃথক ফল বলা হয়।

এঙ যায়, ব্যাঙ যায়,

খোল্‌সে বলে আমিও যাই।

চ্যাং মাছ ও ব্যাঙকে লাফাইতে দেখিয়া খোল্‌সে মাছও সেইরূপ লাফ দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু কৃতকার্য হইল না। যে যে কাজ করিতে অক্ষম, সমর্থ অপরের অনুকরণ করিতে গিয়া সে সকলের হাস্যভাজন হয়।

 

[ প্রকাশকালঃ ৫ই জুন, ২০১৫ ]

ভার্চুয়াল জীবন ও চার আনার শিক্ষা

ছোট্ট দুইটা গল্প বছর ত্রিশেক আগে শোনা। স্মৃতি থেকে লিখছি। অনেকেরই মূল গল্পদু’টো হয়তো আরেকটু ভাল করে জানা আছে ।

গল্প ১ :

বহুদিন আগের কথা , সমাজে টোল ছিল , পাঠশালা ছিল, পণ্ডিতও ছিল। এবং নদী পার হওয়ার একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। এখন অনেক নদী ও খালই হেঁটে পার হওয়া যায় ।

তো একদিন এক পন্ডিত নৌকায় নদী পার হচ্ছিলেন । নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে অক্ষরজ্ঞানহীন মাঝিকে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন,

: মাঝি তুমি কি ত্রিকোণমিতি জানো?

: নাহ্‌।

:তবেতো তোমার জীবনের চার আনাই মিছে।

: তুমি মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলতে পারো?

: না তো।

: তবেতো তোমার জীবনের আট আনাই মিছে।

: তুমি কি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন সম্পর্কে ধারণা আছে ?

: এগুলো কি খায় নাকি গায়ে মাখে বাবু সাব?

: তোমারতো দেখি জীবনের বারো আনাই বৃথা !

এমন সময় নদীতে ঝড় উঠলো । বড় বড় ঢেউ এসে নৌকায় আঘাত করা শুরু করলো। পন্ডিতও ডুবে মরার শঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে লাগল।

দূরাবস্থা দেখে মাঝি বললো, বাবু সাব আপনি কি সাঁতার জানেন?

: না। সাঁতারতো জানিনা।

মাঝি হাসি দিয়ে বললেন, জনাব! আপনার দেখি জীবনের ষোল আনাই মিছে !

গল্প ২ :

খেয়া নৌকারও আগের কথা। নদী পার হওয়া নিশ্চয়ই আরো ঝক্কির ছিল। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া জনমনিষ্যিহীন শূন্য ঘাট পড়ে থাকতো । নদীর পাশে কোন এক জনপদে একদল সন্ন্যাসী বাস করত। একজন সদগুরুও ছিলেন। অনেক শিষ্যের মাঝে একনিষ্ঠ এক শিষ্য সাধনায় গুরুকেও প্রায় হার মানিয়ে দিল।

দীর্ঘ একযুগের সাধনার পরে শিষ্য এসে গুরুকে বললো, গুরু আমি এখন সাধনার বলে পানির উপরে হাঁটতে পারি, হেঁটে নদী পার হতে পারি।

শিষ্য পরিবেষ্টিত গুরু উল্টো প্রশ্ন করলেন , নদী পার হতে কয় আনা লাগে রে ?

: চার আনা।

: বারো বৎসরের সাধনায় তুই মাত্র চার আনার শিক্ষা অর্জন করলি !

ফুটনোট : গুরু সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন, হাতির দু’ই রকম দাঁত থাকে, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার ! অনেক গল্পের দ্বৈত অর্থ থাকে। উপরের গুলোরও হয়তো আছে, হয়তো নেই !

চর্যাপদ, নেপাল , বাংলাভাষা ও আমরা:

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রয়েল লাইব্রেরী থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায়।

এর রচনাকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০ খ্রীস্টাব্দে আর ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর পদগুলো রচিত হয়। সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পন্ডিতই ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন করেন।

অনেকে বলেন , চর্যাপদের রচনাকাল সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী।তা না থাকলে দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে চর্যাপদের ভাষার নাম – সন্ধ্যা ভাষা বা আলো- আঁধারি ভাষা।

যেহেতু , চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। সেই কারণে চর্যায় ব্যবহৃত ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন ‘সন্ধ্যাভাষা ’। তাঁর মতে, “সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই। ”

সুনীতিকুমার ১৯২৬ সালে ‘Origin and Development of the Bengali Language'(ODBL) গ্রন্থ রচনা করে চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের বলে প্রমাণ করেন।

৩৩ নং পদে আবহমান বাঙালির চিরায়ত দারিদ্র্যের ছবি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমনঃ

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী

হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।।

আধুনিক বাংলায় : “লোক শূণ্য স্থানে প্রতিবেশীহীন আমার বাড়ি / হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রেমিক এসে ভিড় করে।”

চর্যার (তেত্রিশ নং) পদটির চরয়িতা মতভেদে ‘ঢেণ্ডণপা’ অথবা ‘ভুসুকুপা’ । ঢেণ্ডণপার জন্মস্থান অবন্তিনগরের উজ্জয়িনীতে। তার জীবৎকাল ৮৪৫ সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার আসল নাম হল ঢেণ্ঢস। খ্রিষ্ট্রীয় নবম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন। এক্ষেত্রে বলা যায় তিনি দেবপাল-বিগ্রহপালের সমকালে ছিলেন। ঢেণ্ডণপা মূলত তাঁতি এবং সিদ্ধা ছিলেন। তার পদে বাঙালি জীবনের চিরায়ত দারিদ্রের চিত্র পাওয়া যায়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে উপরের পদটির রচয়িতা ছিলেন ‘ভুসুকপা’ । ভুসুকপা ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। তাঁর রচিত ৪৯ নং পদে পদ্মা (পঁউআ) খালের নাম আছে, ‘বাঙ্গাল দেশ’ ও ‘বাঙ্গালী’র কথা আছে। তাঁর রচিত পদসমুহের মাঝে বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ভুসুকপা রচিত অতিপরিচিত একটি পদঃ অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।।

[ প্রকাশকালঃ ১২ই মে, ২০১৫ ]

পুনশ্চঃ বস্ত্রকথা ( জুন,২০১৫)

বছর দশেক আগে ট্রেডের এক বড়োভাইয়ের সাথে তৈরী পোশাকশিল্পের আশা নিরাশা ও বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছিল। উনি আমার মতোই সাংঘাতিক আশাবাদী মানুষ। বললেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে জাহিদ।একটা উদাহরণ দিয়ে উনি বোঝালেন, ‘আশির দশকে আমরাতো সবাই ছাত্র ছিলাম। চিন্তা করেনতো , সেই সময় রাত দশটা-এগারোটার পরে ঢাকার রাস্তার চেহারা কেমন ছিল?’

আমি বললাম, ‘কেমন আর ছিল, অনেকটা মফঃস্বলের মতো বারোটা না বাজতেই সুনসান ঢাকার রাস্তা!’ উনি জিজ্ঞাস করলেন, ‘এখন কী রকম? অনেক পরিবর্তিত না ? আজ আপনি গভীর রাতে ঢাকার রাস্তায় বের হন, বাসে , ট্রাকে টেম্পোতে অনেক লোকের আনাগোনা দেখবেন। এবং এঁরা কোন না কোনভাবে তৈরী পোশাকশিল্পের সাথে জড়িত। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে ২৪ ঘণ্টা অনেক লোকের হাড় ভাঙা খাটুনি ! এই দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা করে পোশাকশিল্পকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে ! যে দেশের লোকজন এইরকম পরিশ্রম করছে, সেই দেশ এগিয়ে যাবেই যাবে, দেইখেন আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

মাঝে মাঝে গার্মেন্টস মালিকদের সাথে কথা হয়। অনেকেই বিকল্প কোন সেক্টরের কথা চিন্তা করতে বলেন বা জিজ্ঞাসা করেন , অন্যকোন ব্যবসা ক্ষেত্র আছে কীনা । ৯০ এর দশকের কোটা কেনাবেচার আমলে গার্মেন্টসের ব্যবসায় রমরমা লাভ ছিল, আজ বড়ো বড়ো সব গ্রুপগুলো কোটার ব্যবসা করে শত শত লাইনের আর ডজন ডজন বিল্ডিং এর মালিক। দুই ডলার যদি সিএম( কাটিং মেকিং কস্ট ) থাকতো, কোটা থেকে পেতেন কুড়ি ডলার । যারা সেই আমলের গার্মেন্টস ব্যবসা করেছেন তারা জানেন কী পরিমাণ লাভ তারা করেছে ! কিন্তু পরের যুগের গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা যে কত রকম সীমাবদ্ধতার মাঝখান দিয়ে এই সেক্টরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা আমরা কাছ থেকে অনেকেই দেখছি।

আমাদের আসলেই একটা বিকল্প ক্ষেত্র দরকার! এই একরৈখিক একমাত্রিক পরনির্ভরতা আমাদেরকে নীদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা ক্রেতারা জানে, এই তৈরী পোশাক খাতে যারা বড়ো বড়ো বিনিয়োগ করে বসে আছেন তাঁদের অর্ডার দরকার। অনেকে শুধুমাত্র পেটেভাতে দাম মিললেও অর্ডার নিয়ে নেন। এইটাকে আমরা বলি ব্রেক ইভেন কস্ট( Break Even Cost) -এ অর্ডার নেওয়া । ফ্লোর বসিয়ে রাখলে যে ক্ষতি , সস্তার অর্ডার নিয়ে ফ্লোর চালালে অন্তঃত আর্থিক ক্ষতিটা কম । এ এক দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন তারা। আবার নতুন উদ্যোক্তারা। ১৮% সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে, সস্তার কাজ নিয়ে ন্যূনতম লাভ তুলতে পারছেন না।

অঙ্কের হিসাব-নিকাশের বাইরে ক্রেতাদের সাথেও ক্যাজুয়াল কথা বার্তা হয় মাঝে সাঝে। যারা ফ্যাশন ক্রেতা(Fashion Retail) তারাও হুমকির মুখে আছে কিছু ডিসকাউন্টারের অতি মূল্যহ্রাসের দুষ্টচক্রে। যে ফ্যাশন ক্রেতা, সে হয়তো ৫০০০ টি-শার্ট নিবে। সে ২.৫ বা ৩ ইউএস ডলার এফওবি(FOB) দিয়ে কিনে ৯ বা দোকানভেদে ১৫ ইউরোতে বিক্রি করবে। তাঁদের প্রাথমিক লভ্যাংশ ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ থাকে। পরে সেল ও অফ সিজন ধরে দোকান খরচ দিয়ে পুষিয়ে যায় । কিন্তু, ডিসকাউন্টাররা ওই একই টি- শার্ট ৫ লক্ষ পিস নিবে। সে কিনতে চাবে , ১.৫০ ডলারে, এখন সে যদি চায় কম লাভ , তবে ওই একই টি-শার্ট রিটেল মার্কেটে সে ইচ্ছা করলেই দেড় থেকে দুই ইউরোতে বিক্রি করতে পারবে। সে কোন মার্কআপ রাখবে না। বড়ো বড়ো গ্রসারি ডিসকাউন্টার Wal-Mart, Primark, LIDL, TCHIBO, TESCO, ALDI এদের প্রধান পন্য কিন্তু পোশাক নয়, এরা মূলতঃ গৃহস্থালি পণ্য, শাক-সবজী, খাদ্যদ্রব্য, পানীয়ের ফাঁকে হাজারহাজার দোকানে সস্তার টি-শার্ট বিক্রি করছে নামমাত্র মূল্যে। এদের সাথে তাল মিলিয়ে INDITEX, H&M ক্রেতা আকর্ষন করতে ডলারে কিনে সমমূল্যের ইউরোতে পোশাক বিক্রি করছে। মানে, ২ ডলারে টি-শার্ট কিনে , ২ ইউরোতে বিক্রি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করছে। মাঝখানে বিপদে পড়ে গেছে ওই মাঝারি মাপের ফ্যাশন রিটেলগুলো, যারা অনেক ডিজাইনার রেখে অনেক গবেষণা করে একটা টি শার্ট ৯ বা ১৫ ইউরোতে বিক্রি করতে চায়। দরিদ্র হিস্পানিক ও এশিয়ান ইমিগ্রান্টরা হন্যে হয়ে Wal-Mart, K-Mart, TESCO, PRIMARK এ ছুটে যাচ্ছে। Wal-Mart এরEveryday Low Price থিওরীর চক্করে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারীদের।

ওইদিকে আমেরিকা আর এইদিকে ইউরোপের মধ্যে জার্মানী আমাদের অন্যতম বৃহৎ তৈরী পোশাকক্রেতা দেশ। এদের বেশ কিছু নাম করা ডিসকাউন্টার আছে যাদের দোকানের সংখ্যা দশ হাজার, বারো হাজার মায় কুড়িহাজারপর্যন্ত আছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে এদের দোকান। বছরখানেক আগে , কী মনে করে আমেরিকা ও জার্মানী দুই দেশেরই কয়েকটা ডিসকাউন্টারের বড়ো বড়ো দোকান ঘুরে দেখার সুযোগ মিললো।

প্রথমে আসি , ওয়ালমার্টের কথায়। এদের কিছু সুপার শপ আছে। এইপাশ থেকে ওইপাশ দেখা যায় না। টয়লেট পেপার থেকে শুরু করে গাড়ীর চাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। কতো সস্তায় এরা পণ্য বিক্রি করছে, উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বাইরে ৫০০ মিলির একই ব্রান্ডের এক বোতল পানি হয়তো দেড় দুই ডলার। কিন্তু , সুপারশপে আপনি যদি এক সঙ্গে ২৪ টার এক ক্রেট পানি কেনেন তবে ক্রেটের দাম ৫ ডলার মানে প্রতি পিস পড়ছে ২০ সেন্ট ! ক্যাম্নে কী !

এইবার আসেন জার্মানীতে, বাইরে এক বোতল ওয়াইনের দাম ১৫ ইউরো। কিন্তু, সুপার শপে ৬টা এক সাথে কিনলে, ৪০ ইউরো। দেখলাম , একটা গ্যাস লাইটারের বাইরে দাম ১ বা দেড় ইউরো , কিন্তু এরা ১২ টা একসাথে বিক্রি করছে ১.৭৫ ইউরোতে মানে একটার দাম ১৫ সেন্টের কাছাকাছি !

একটা গ্যাস লাইটারের উৎপাদন খরচ চীনে কতো হতে পারে, আর জার্মানী পর্যন্ত এনে কেমন করে এই দামে বিক্রি করছে, সেটা বড়ো কোন গবেষণার বিষয় না। আপনি নিজেই হিসাব করতে পারবেন। ধরেন ওই গ্যাস লাইটার চীন থেকে ৫০০০ পিস কিনলে আপনি যে দামে পেতেন, তার এক দশমাংশ দামে পাবেন , যদি আপনি পঞ্চাশ লক্ষ গ্যাস লাইটার কেনেন একসাথে । সেক্ষেত্রে একটি গ্যাস লাইটারের দাম ৩ বা ৪ সেন্ট করে পড়বে! সস্তায় ভোগপণ্য দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এই ডিসকাউন্টারগুলো যে ভয়ংকর দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্র তৈরি করেছে , সেটা ভাঙ্গার কোন লক্ষণ দেখছি না।

আর সাদা চামড়ার ওই সব খুচরা ক্রেতাদের কথা বলছেন, তারা সোফায় বসে টিভিতে বাংলাদেশের তাজরীন বা রানা প্লাজার কথা শুনে একটু উহু আহা করবে হয়তো। কিন্তু পরের দিন ভোরে উঠেই ছুটবে সেই সস্তার দোকানেই !

বস্ত্রকথা ( জুন ২০১৩) :

গার্মেন্টস নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কয়েকজন ক্রেতা ও মালিকপক্ষের বিচ্ছিন্ন মন্তব্য ও মতামতের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরছি। আমি এইখানে কোন পক্ষ অবলম্বন করছি না। আমি চাই, গার্মেন্টস ট্রেড থাকুক, প্রফেশনাল মালিক , শ্রমিক ও কর্মচারীরা কাজ করুক। কতিপয় অর্থগৃধ্নু মালিকের ও ক্রেতার জন্য সবাইকে দোষারোপের চলতি হাওয়া থেকে বের হয়ে আসুক মিডিয়া। যে কয় ডলারের ব্যবসাই করেন না কেন, ভালো পরিবেশে উন্নত শ্রমিকবান্ধব কারখানায় করেন।

ভাইরে, আমার আকাংখা দিয়ে তো আর বাংলাদেশ চলে না, তাই অন্যদের কিছু মন্তব্য শুনিঃ

ক্রেতাদের কিছু মন্তব্যঃ

১। বাংলাদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকের মতামত– আমারাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সস্তা শ্রমের দেশ । আমরা অপরিহার্য, চীনে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আমরা ছাড়া পশ্চিমা ক্রেতাদের যাওয়ার কোন জায়গা নাই। ক্রেতাদের কথা –কিন্তু, একটা কথা সবাই ভুলে যাচ্ছো, পৃথিবীর মোট বস্ত্রচাহিদার ৪ থেকে ৫ শতাংশ মাত্র বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ২১/২২ বিলিয়ন ডলারের বাজার।

কথা সত্য , একক দেশ হিসাবে তোমরা চীনের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম। কিন্তু , ঐ যে বলেনা, বিশাল ব্যবধানে দ্বিতীয়, তোমরা তাই।

তো, কিছু বড়ো ক্রেতার অবস্থান অনেকটা এইরকম, ‘ বাংলাদেশ নিজেরে অপরিহার্য ভাইবো না। আমরা যদি ৯৫% বস্ত্র অন্য দেশ থেকে সোর্সিং করতে পারি। তোমাদের ৫% অন্য কোথাও থেকে ঠিকই আমরা ম্যানেজ করে নিব।’

ডাটা স্ট্যাটিস্টিক্স দিয়ে পোস্ট ভারি করবো না, কেউ উৎসাহী হলে, গুগলে যাইয়া দেখেন।

২। প্রতি পিস টি-শার্টে তোমাগো আরো দশ সেন্ট দিলে নাকি তোমরা শ্রমিক কল্যানের সব কিছু কইর‍্যা ফালাইব্যা । তোমাদের মতো দুর্নীতিবাজ জাতির পক্ষ থেকে কে গ্যারান্টি দেবে যে, ঐ অতিরিক্ত ১০ সেন্ট শ্রমিকের কল্যানেই লাগাইবা, নাকি হুদা মিছা মালিক ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের লাভের পরিমাণ খামোখা বাড়াইবা। শ্রমিক যেইখানে ছিল সেইখানেই থাকবে।

৩। যেকোন বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশেই বছর তিরিশেক পরে শ্রমঘন ভারী বা লোটেক শিল্প থেকে হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে গেছে। তোমাগো অবস্থা যা, তোমরা আরো তিরিশ বছরেও হাইটেকে যাইতে পারবা না ! তাইওয়ান, কোরিয়া, চায়না, শ্রীলংকা , মেক্সিকো যে দেশেই এই গার্মেন্টস শিল্প ছিল তারা তাঁদের প্রথম ৩০ বছর পরে কোথায় আর তোমরা কোথায় !

৪।মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ক্রেতা হিসাবে আমি আমার সর্বোচ্চ গুণগতমান সর্বনিম্ন খরচে চাইব। তোমার এখানে না পেলে অন্য জায়গায় যাবো। এখন তোমার দ্বায়িত্বই বেশী নিজস্ব ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও কমপ্লায়েন্স করার জন্য তোমাদেরকেই ঠিক করতে হবে কীভাবে শ্রমবান্ধব পরিবেশে গার্মেন্টস উৎপাদন করবা।

আমার নিজের কথা, নতুন পে স্কেলে শ্রমিকের বেতন ৫০% বাড়লেও আমি মনে করি, তারপরেও বাংলাদেশ গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।

মালিকপক্ষের বিচ্ছিন্ন কিছুকথা:

১।ভাই, গত তিরিশ বছরে সড়ক ও লঞ্চ দুর্ঘটনায় কতোজন মারা গেছে আর এতোবড় একটা গার্মেন্টস শিল্পে কতজন মারা গেছে, একটু কাইন্ডলি কম্পেয়ার করেন। একতরফা একটা দুইটা দুর্ঘটনা দিয়ে পুরো ট্রেডটারে কালপ্রিট বানাইয়েন না।

২।গাঁটের টাকা খরচ করে, বউয়ের গহনা বিক্রি করে, বাড়ি জমি বন্ধক রেখে ১৮ থেকে ২০% ব্যাংক ইন্টারেস্টে ব্যবসা করতে আসছেন। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কথা যদি বলেন– ব্যবসার অন্যতম উদ্দেশ্যতো মুনাফা , নাকি ? ব্যবসায় যদি মুনাফা না থাকে শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলেন, তাইলে আপনারাই ব্যবসায় নামেন। সামাজিকতা করেন , চ্যারিটি করেন। বছর শেষে ব্যাংক লোন শোধ করতে হবে , মুনাফা করতে হবে আবার অদক্ষ শ্রমিকের জন্য সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক দিতে হবে। ভালো , ভালো না !

৩।গ্রামের একটা অশিক্ষিত, বা স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক কোন প্রাথমিক ট্রেনিং ছাড়া এসে বসে যে পারিশ্রমিক পাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্য কোন সেক্টরে মনে করেন, চিংড়ী ঘেরে, কৃষিকাজে, দিনমজুরী করে, ঘরামী করে, যদি এর চেয়ে বেশী পাইতো, তাইলে কি তারা গার্মেন্টসে কাজ করতে আসতো ? সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাচ্ছে বলেইতো তারা এই সেক্টরে !

আবার ডিমান্ড সাপ্লাই চেইন মেনে, শ্রমিকের প্রতুলতা ও অপ্রতুলতাই তাঁদের মজুরী কতো হবে ঠিক করে। আমরাতো শিকল দিয়ে বাইন্ধা রাখি নাই, পোপের মতো কথা বললেতো হবে না। ৫শ টাকা বেশী পাইলে, মালিকের কোন হ্যাডাটা ঠিক রাখতেছে শ্রমিকেরা। ঠিকইতো অন্য আরেক জায়গায় চলে যাচ্ছে।

দক্ষতার কথা বলেন, চীনা একটা শ্রমিক যে দক্ষতা নিয়ে কাজ করে , তার ৩০% দক্ষতাও আমাদের বেশীরভাগ শ্রমিকের নাই। ওদের বেতন বেশী হবে নাতো কী আমাদের রোকেয়া কুলসুমের বেতন বেশী হবে !

৪। সরকার , মিডিয়া সবাই বাংলাদেশের আর কোন শ্রমিকদের জন্য বছরে বছরে আপনারা বেতন বাড়াচ্ছেন বা বেতন বাড়ানোর জন্য প্রেসার দিচ্ছেন ? অন্যরা কী কি দোষ করছে। বৈষম্যতো আপনারাও করছেন। এখন গার্মেন্টসের শ্রমিকের বেতন ৮০০০ টাকা দিলে অন্য সব সরকারী বেসরকারী শ্রমিকেরা কী দোষ করলো। অন্য সব সেক্টরের শ্রমিকের বেতনও বাড়াতে হবে।

শ্রমিকের বেতন ৫০% বাড়াইলেন। সঙ্গে সঙ্গে কী হবে জানেন। বাড়ীভাড়া বাড়বে, খাদ্যের দাম বাড়বে, বাসভাড়া বাড়বে , বেকারীর দাম বাড়বে, ডিমের দাম বাড়বে। বাড়তি টাকার পুরোটাই অন্যের পকেটে যাবে। মুদ্রাস্ফীতির দায় শুধু মালিকদের উপর চাপাচ্ছেন কেনো?

সুশীল সমাজের একজন বললেন, তিরিশ বছরে গার্মেন্টস মালিকেরা সরকারকে কি দিয়েছেন। ২৫% ইনসেন্টিভ নিছেন। সারাক্ষণ গ্যাস বিদ্যুৎ নিয়ে চাপাচাপি করছেন। ট্যাক্স দিছেন কতো? কিছু কইলেই, কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে আরো সহযোগিতা করতে বলেছেন। যে পরিমাণ ট্যাক্স ফাঁকি দিছেন, ওইটা দিয়া আরো হাজার খানেক ইপিজেড তৈরী করা যাইতো। কর্মচারী আমরা যারা, কয়জন ঠিকমতো ট্যাক্স দিই। বছরের মে-জুন মাস থেকে দৌড়াদৌড়ি ক্যামনে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়।

তবে, উপরের সবকটা মন্তব্যেই আমার পরিচিত কোন না কোন ক্রেতা বা মালিক করছেন।আমি মনে করি , শ্রমিক, মালিক,ক্রেতা , সরকার ও বিরোধীদলের একটা সমন্বিত প্রক্রিয়া দরকার। সমন্ব্যহীনভাবে একেক জন একেকভাবে কি কি করতে চাচ্ছেন, বোঝা মুশকিল।উল্লেখ্য, শ্রমিক পক্ষের কারো সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয় নাই, কিন্তু টিভি মিডিয়াতে তাঁদের দাবী দাওয়া অত্যন্ত স্পষ্ট। সেইটা আমরা কমবেশী সবাই জানি।