নারী দিবস

আমার দুই কন্যা ( আট বছর আর দেড় বছর)।

বউ ক্ষান্তি দিছে ,আমিও দিছি, দ্বিতীয় সন্তানের জন্য বছর দুয়েক হাঁটুর চামড়া ছিইল্যা ধস্তাধস্তি করতে হইছে। আমি দুই কন্যারে নিয়া ব্যাপক খুশী। সুস্থ-সবল সন্তান আমার কাছে নিয়ামতের মতো। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।

আমার আম্মা মাঝে মাঝে তবু একটু গাঁইগুঁই করে, একটা ছেলে হইলে ভালো হয়। দুইডা মাইয়া, বিয়া হইয়া গেলে কি নিয়া থাকবি! মরলে খাটিয়া টানবো কেডা ?

বুঝি , কন্যা সন্তান, সে দারিদ্রসীমার নিচে হোক বা উচ্চবিত্তের ঘরে হোক, সে একটা বাড়তি দায়িত্ব বা বোঝার মতো আমাদের সমাজে বড় হইতে থাকে। সে সম্পদ না, সে দেনা– ঋণের বোঝা।

সেদিন, রবিবারে কাক-ডাকা ভোরে বউ কাঁচা বাজারে নিয়া গেল। পথে হাজারো বস্ত্রবালিকার টিফিন ক্যারিয়ার হাতে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কইলাম এরা আমার সতীর্থ, সহকর্মী। ( উল্লেখ্য, আমি গার্মেন্টসে কাজ করি।) কইলাম , চাইয়া দেখো , এঁরা এখন আর এদের পরিবারের বোঝা না। এঁরা ঋণাত্মক নয়, শূন্যও নয়, এঁরা আমাদের অর্থনীতির ধনাত্মক শক্তি। এঁরা এখন আয় করে,এঁরা পরিবারের ও দেশের সম্পদ।এঁরা মাথা উঁচু কইরা বাঁচা শিখছে; এঁরা বাংলাদেশটার চেহারা বদলাইয়া দিছে।

আমি নারীবাদ নারীদিবস বুঝি না, আমার পরিসংখ্যান জ্ঞান সেই রকম সীমিত। কিন্তু , আজ যে লাখো নারী ঘরের বাইরে এসে, ঘাম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে দেশটারে শত বৎসর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁদের স্যালুট।

প্রকাশকালঃ ৮ই মার্চ,২০১৩

আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত

আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত।

নিতান্তই নিজের পরিবারের কারো গায়ে আঁচড় না লাগা পর্যন্ত আমি সবকিছু মেনে নিয়ে নিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। এবং আমার এই সুবিধাবাদী চরিত্র বদলাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

পরিবহন শ্রমিকদের অযৌক্তিক ধর্মঘটের ব্যাপারটা আমাকে বিপর্যস্ত করতে পারেনি। গতরাতে উত্তরা থেকে মিরপুরে পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে পৌঁছেছি। বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ; দেশোদ্ধার করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। যেহেতু , আমার একটা ভাঙ্গাচোরা গাড়ী আছে ; তাই সকালে উঠে ট্রেডিং অফিসের কেরানীগিরির জন্য মাথা নিচু করে চলে এসেছি।

পথে আসতে আসতে আমি আমার মতো আরও অনেক ছোটবড় মাপের সুবিধাবাদীদের অসহায়ত্ব দেখেছি। কোথাও কোন প্রতিবাদ নেই। আছে ক্ষোভ আর অর্থহীন আস্ফালন !

আমি ভয়ংকর ট্র্যাফিক জ্যামে বসেও মাথা ঠাণ্ডা রাখি, সবকিছু মেনে নিই ; কারণ আমার কিছু করার নেই; অন্যেরা কেন করছে না সেটা ভেবে আমি ক্ষুদ্ধ হই। গ্যাসের দাম বাড়ছে, এটা আমাকে স্পর্শ করে না। ‘ সবার চললে আমারও চলবে!’– এই রকমের মনোভাব নিয়ে চলি। কেউ আসার পথে মাইক্রোবাসে কিডন্যাপ হয়েছে, কারো ছিনতাই হয়েছে, কেউ দুর্ঘটনায় হত বা আহত হয়েছে, আমাকে তা ভাবায় না। আমি শুধু আমার দুই কন্যার কথা ভাবি। তাঁদের ভবিষ্যতের পাথেয় জোগাড় করার জন্য উদয়াস্ত প্রাণপাত করি।

আবার আমি আশাবাদের কথাও বলি, সবাইকে আশাবাদী হতে বলি। আমি সবকিছু মেনে নিই। আমার কোন প্রতিবাদ নেই। আমি একটা বিষণ্ণ তেলাপোকার জীবন যাপন করি। সারাদিনে অসংখ্য নানা বর্ণের তেলাপোকার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলি। আমি খাই এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেশের ব্যাপারে আহা উঁহু করি।

আচ্ছা , আমি কি সেই ফরাসি বিপ্লব বা মার্কসবাদের হিসাবে শতভাগ সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া হতে পেরেছি ?

প্রকাশকালঃ ১লা মার্চ,২০১৭

টোনা কাহিনী। ঢাকার ট্র্যাফিক

প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন শহর ঢাকায় এতো দুর্বিষহ যানজট হইতেছে, আর কেনই বা আমি টোনার গৃহে প্রত্যাবর্তনে রাত্রি হইয়া যাইতেছে তাহা বোধগম্য নহে !

ইদানীং রাত্রির আহারের পরে কিঞ্চিৎ কাল বোকা-বাক্সের দিকে চাহিতে না চাহিতেই চক্ষু মুদিয়া আসে।

কয়েক দিবস পূর্বে, শ্রান্ত হইয়া গৃহদ্বারে করাঘাত করিতেই টুনি অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিল, আজও যদি জ্যেষ্ঠা টুনটুনিকে উহার বিদ্যালয়ের পাঠ না দেখাইয়া আকস্মিক নিদ্রা যাও ; তাহা হইলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! আহার সারিয়া টুনটুনির কাছে বসিয়া আবিষ্কার করিলাম, সে সবকিছুই অল্পবিস্তর পড়িয়াছে গভীরতায় যাইতে পারিতেছে না। উহাকে চুম্বক, চৌম্বকীয় শক্তি ও পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু বুঝাইতে বুঝাইতে আমি ক্রমশ: সম্মুখ-পানে ঢুলিতে লাগিলাম। আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম–আমার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিয়াছি , দেহ ক্ষীণকায় হইয়াছে। অধিক গতিতে হাঁটিতে হাঁটিতে বিমানের মতো আমি শূন্যে ভাসিয়া উড়িতে পারিতেছি। কিছুক্ষণ উড়িয়া আবার পদব্রজে চলিতেছি আবার উড়িতেছি! দূরত্ব অতিক্রম করা আমার কাছে সহজসাধ্য।

আহা ! মনে অসীম শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। ভাবিলাম , এক্ষণে মিরপুর হইতে উত্তরার কর্মস্থলে যাইবার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিতে হইবে না। টুনটুনিকে বাসায় আসিয়া শিক্ষাদান করিতে পারিব, টুনির অশ্রাব্য তিরস্কার শুনিতে হইবে না !
কিন্তু মুহূর্ত-মধ্যে জ্যেষ্ঠা টুনটুনির ধাক্কায় নিদ্রা টুটিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল ! সে স্মিতহাস্যে কহিল, নিজের শয্যায় গিয়া নিদ্রা যাও পিতা। তোমার এমত সঙ্গিন অবস্থা মাতা টুনির চোখে পড়িলে অনর্থক লঙ্কাকাণ্ড হইবে !

পুনরায় নিদ্রা যাইতে যাইতে পার্শ্ববর্তী টুনিকে বলিতে শুনিলাম , অধুনা ‘মুখ-পুস্তিকায়’ এতো পুনঃপ্রচার করিতেছ কেন ? আরো গভীর নিদ্রায় তলাইয়া যাইতে যাইতে কহিলাম, শহর ঢাকার এমত অবস্থার আশু পরিবর্তন না হইলে নতুন কিছু লিখিবার অবকাশ কোথায় ? যানজটও শেষ হইবে না ; আমারও ডানা গজাইবে না ; অবসন্ন দেহ ও মন লইয়া নতুন কিছু লেখালেখির অবসরও বোধ করি পাইব না !
সে কি বুঝিল কে জানে !

প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০১৭

আধুনিক বিয়ে

গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে হয়েছে। ঢাকার বিয়েতে বছর বিশেক আগে খাবার মেনু যা ছিল, এখনো তাই ; শুধু রোস্টের মুরগী দেশী থেকে ফার্মের হয়েছে, বাকী আগের মতোই।

নতুন যে ব্যাপারটি চোখে পড়ল বা আমাদের প্রজন্মের হিসাবে খানিকটা দৃষ্টিকটু লাগল, তা শেয়ার করতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রজন্মের বিয়েতে লাজুক অবনত নববধূ ছিল অনুষ্ঠানের একটা সৌন্দর্য। অধুনা, নববধূদের আগ্রাসী আচরণে আমি একবার খুশিও হলাম আবার পুরনো মূল্যবোধের মানুষ বলেই হয়তো কিছুটা মর্মাহতও হলাম। বিয়ের আসরে নববধূরা এতো স্বচ্ছন্দে তাঁদের সদ্য-প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বার্তা বলছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ; যেচে সবার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল – তা দেখে মনে হচ্ছিল এঁদের মনে হয় বছর দশেকের প্রেমের পরে বিয়ে। অথচ আমি খুব ভালোভাবে জানি, এঁদের পারস্পরিক পরিচয় দুই-তিনদিনেরও কম।পুরোটাই অ্যারেঞ্জড্‌ ম্যারেজ !
আমাদের সময়ে প্রেমের বিয়েগুলোতেও নববধূরা লোক দেখানোর জন্য হলেও হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে দামী মেকআপ নষ্ট করে ফেলত। সেই হিসেবে কান্নাকাটির পর্বের সমাপ্তি আমি অর্থনৈতিক হিসাবে সাশ্রয়ী বিবেচনা করছি। এখনকার বিয়ের আসরে বর-কনের মধ্যে বরটিকেই বড্ড চুপচাপ, মৃদু , ম্লান, ত্রস্ত ও বলির পাঁঠা মনে হয়েছে।

জীবনসঙ্গিনী প্রাপ্তির তীব্র ব্যাকুলতা আমার আগের প্রজন্মে কেমন ছিল সেটা আমার আম্মার মুখে শোনা একটা ‘রিয়েল লাইফ’ ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

আম্মার গ্রামে বা আশে পাশে কোথাও এক দরিদ্র চাষির মেয়ের সঙ্গে আরেক কৃষিজীবী কামলা চাষির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে। হবু শ্বশুর আর হবু জামাতা দু’জনই সকালে চাষের কাজে যায়। মেয়ের বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হয়তো ফসল তোলা, বা আর্থিক অনটনের ব্যাপার ছিল। এখন ব্যাকুল হবু জামাতার তো আর তর সইছে না। প্রতি সকালে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের পরেই তার মৃদু ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়। তারিখ কবে ঠিক করছেন, দেরী হচ্ছে কেন , এইসব। এইরকম কয়েকদিন হওয়ার পরে শ্বশুর খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন,
” রাখো রে বাপু ! বল্‌লিই তো হয় না ; আমার তো একটা গোছগাছ আয়োজনের ব্যাপার আছে, নাকি ? তোমার আর কি ! তুমি তো বাপু নিবের পারলিই শুইবের পারো ! ( তুমি তো বাপু, নিয়ে যেতে পারলেই শুতে পার !) ”

পুরুষ-শাসিত সমাজে ব্যাকুলতা প্রকাশের ব্যক্তিটি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে ভালই লাগছে! আবার আধুনিক নববধূদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে , এঁদের সবার সেই চাষি হবু জামাতার চেয়েও অবস্থা শোচনীয় । কোনমতে বিয়েটা হলেই শুতে পারবে সেইটাই হয়তো সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখছে তাঁদের ; সৌজন্য-সামাজিকতার লেশমাত্রও চোখে পড়ছে না !

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬

আমার নৈরাশ্য , আমার আশাবাদ।

আশাবাদী হওয়ার জন্য, পড়াশোনায় সাফল্যের জন্য কীভাবে কীভাবে যেন সেই ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত নানা রকম ‘ডেল কার্নেগী’ টাইপ বই পুস্তক পড়েছি। আমাদের শৈশবের পুরো সময়টা স্বৈরাচার এরশাদের যুগ ছিল। ৯০ সালে আমরা যখন কলেজের প্রথম বর্ষের শেষদিকে , স্বৈরাচারের পতন ঘটলো ডিসেম্বরে। সারাক্ষণ একটা দমবন্ধ হওয়া পরিবেশে উপায়হীন, নির্জীব, হতাশ একটা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। ব্যক্তি পর্যায়ে মানবিক আশাবাদ অনেক বেশী অপ্রতুল ছিল।

মেধাবী ছোটমামা কিংবা আমাদের স্কুলের সেরা ছাত্রটিকে দেখে আমাদের আশায় বুক বাঁধতে হতো। ওই কারণেই হয়তো উজ্জীবিত হওয়ার মতো যে কোন প্রবন্ধ, যে কোন বই যেখানেই পেয়েছি – উল্টে পাল্টে দেখেছি। মনে হয়েছে , আসলে পশ্চিমা জীবনদর্শন আর প্রাচ্যের জীবনদর্শন অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। স্বামী বিবেকানন্দ বা ঠাকুর রামকৃষ্ণের মোটিভেশন আর ডেল কার্নেগীর মোটিভেশন দুই রকম পরিবেশ থেকে উদ্ভূত । পশ্চিমের মোটিভেশন পশ্চিমা জনগণের জন্য যতোখানি উপাদেয়; তা প্রাচ্যের জন্য সহজপাচ্য নাও হতে পারে !

নানা রকমের মোটিভেশনের বই, পজিটিভিজমের বই পড়েছি। কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝি নি। নিজের অবস্থান মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। নিজেকে নতুন করে খুঁজে ফিরেছি ; আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। এতো কিছুর পরও আমি নিত্য-নতুনভাবে ব্যর্থ হয়েছি । আবার উঠে দাঁড়িয়ে উপায় খুঁজেছি –কী করে আশাবাদী হওয়া যায় !
জীবনের এই পর্যায়ে এসেও আমি অবিরাম যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং আমি নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠি । একই সঙ্গে পরিপার্শ্বের সবাইকে আশাবাদী করে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা করি।

আমি জানি আমার চারপাশের সিংহভাগ সুস্থ মেধাবী মানুষ নৈরাশ্যের কথা বলার জন্য মুখিয়ে আছেন।‘ হচ্ছে না, হবে না, গেল গেল সব গেল, কী লাভ, ধ্যাত!’—ইত্যাদি বলার জন্য। আমি তাই সংখ্যালঘু হয়ে আশাবাদের কথা বলে যেতে চাই আজীবন।

এই জীবনে অপ্রত্যাশিত আঘাতে আমাকে অনেকবার পর্যদুস্ত হতে হয়েছে। কিন্তু আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেছি, মাটিতে মিশে যাই নি। আমি জানি, নিজের মূল্যবোধ নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গভীর আনন্দ আছে। সাময়িকভাবে হতাশ হয়েছি, মনে হয়েছে, পরাজিত হয়ে যাচ্ছি নাতো ? কিন্তু আবার আমি উঠে দাঁড়িয়েছি ! আমাকে যে দাঁড়াতেই হবে! কাছের কেউ চরম দুঃসময়েও যদি জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছেন?’ উত্তর দিই—‘ভালো আছি, ভালো থাকতেই হয়, ভালো থাকতে হচ্ছে। হ্যাঁ আমি ভালো থাকি। আমাকে ভালো থাকতে হয়, ভালো না থেকে লাভ কি?’ এই না চাইতেই পাওয়া অসাধারণ মানবজীবনের পুরোটাই তো লাভ, পুরোটাই প্রাপ্তি ! এখানে লস কোথায় ?

অনেকসময় বিভ্রান্ত বোধ করেছি– চারপাশের খুব আশাবাদী হাসি খুশী কেউ কেউ এতো ব্যর্থ কেন হচ্ছে তা ভেবে ! উল্টোটাও ঘটতে দেখেছি অহরহ ; আপাত: দৃষ্টিতে কাউকে কাউকে চরম নৈরাশ্যবাদী বলে মনে হয়েছে , কিন্তু বস্তুগত-ভাবে তাঁরা দারুণ সফল। কীভাবে এতো সাফল্য পাচ্ছেন সেটা বোঝা মুশকিল !

অবশ্য যদি সাফল্যে পরিমাপের মাপকাঠি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিবেচনায় হয়–তবে আমার চারপাশে অসংখ্য উদাহরণ আছে, যারা সামনা সামনি ভয়ংকর নৈরাশ্যবাদী, অথচ আর্থিকভাবে সফল। পরে মনে হয়েছে, আশাবাদের সাথে সাফল্যের একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে অবশ্যই ; তাই বলে আশাবাদী মনুষ্যমাত্রই আর্থিকভাবে সফল হবে সেটা বোধহয় অনেকাংশে সুনিশ্চিত বা আকাঙ্ক্ষিত নয়। আমি আশাবাদী মানুষ বলতে হাল ছেড়ে না দেওয়া, উন্নত , উদার, সৌরভময়, উচ্চকিত মানুষ বুঝি। ঘরোয়া আড্ডায় সায়ীদ স্যারের বলা একটা কথা বিশ্বাস করি, নৈরাশ্যের ইট দিয়ে দিয়ে বর্তমান সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। সভ্যতার ইমারত গড়ে উঠেছে আশাবাদে। কোটি কোটি নৈরাশ্যবাদী লোকের মাঝে গুটি কয়েক আশাবাদী মানুষ সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন।

অন্যদের কথা জানি না ; আমার ক্ষেত্রে , আশাবাদ আমাকে সুস্থ রাখে । নৈরাশ্য আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকল করে দেয় , আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমি আমার জীবনের গভীর গোপন অসুখে পতিত হতে চাই না। নৈরাশ্যে আমি নুইয়ে পড়ি, তলিয়ে যাই, জীবন অর্থহীন মনে হয়। আমাকে টেনে তোলে ওই আশাবাদই। আমি সবসময় চারপাশের আলোকোজ্জ্বল জীবনের স্পর্শ পেতে চাই। জানি ওইটাই বেঁচে থাকা। নুইয়ে পড়ে, তলিয়ে গিয়ে অর্ধমৃত হয়ে থাকা অর্থহীন ! আমি জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। তাই, আমাকে আশাবাদ বাঁচতে শেখায় ; আরো বেশী করে, আরো ব্যাপকভাবে।

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬