পাজেরো জিপ বনাম প্রাইভেট কার

বড়লোকের এলাকায় ভাড়া থাকার অনেক মুশকিল। কয়দিন আগে দুই কন্যা ও তাঁদের মাকে নিয়ে বিকালে হাঁটতে বের হয়েছি। বড় কন্যা পাড়ার কিন্ডারগার্টেনে পড়ে।
সে হঠাৎ বলল, ‘বাবা, তুমি কেন একটা পাজেরো জীপ কেনো না ? ’
‘উপ্‌স !’
উত্তর তো একটা দিতে হয়। বললাম ‘ কিন্তু, আমাদের তো একটা কার আছে। ’(উল্লেখ্য, আমার একটা পুরানা এক্স-করলা টয়োটা গাড়ী আছে।জীবনের আটত্রিশ বছর বাস টেম্পো ঠেলার পর ব্যাঙ্ক লোনে কিনেছি বছর তিনেক হলো। )’
‘আমি , তোমার আম্মু , তুমি শ্রেয়া, দাদা- দিদুতো এক গাড়ীতে হয়ে যায়। সমস্যা কোথায় বাবা ? ’
‘হ্যাঁ , কিন্তু উপরের তলার রশিদ আঙ্কেল আর উলফাৎ আন্টিরা মাত্র দুইজন । ওদের একটা বড় নীল পাজেরো আর একটা লাল রঙের কার আছে। আমারা তো ৬ জন! ’

প্রকাশকালঃ ১৪ই মার্চ,২০১৩

পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল উপকরণ

পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল উপকরণ আমাদের সমাজের জন্য , মনের জন্য কতোখানি ক্ষতিকর ? আমার ব্যক্তিগত মত– মনে হয় ক্ষতিকর। পর্নোগ্রাফির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে ওঠেনি। কিন্তু আধুনিক প্রজন্মের কাছে এটা এতটাই সহজলভ্য, যে দোকান পর্যন্ত গিয়ে পর্নোগ্রাফি খুঁজতে হয় না, হাতের মুঠোফোনেই যথেচ্ছ উপাদান থাকে। বেশী পর্নো দেখলে বা পড়লে ( পড়লে, এই কারণে , আমার প্রজন্ম —রসময় গুপ্তের প্রারম্ভিক বা সমকালীন সময়ের ) সারাক্ষণ মাথায় ওই জিনিষই ঘোরাফেরা করে। আমার যেমন, কৈশোরে প্রথম প্রথম নীল ছবি দেখার পর , সাদা চামড়ার সবাইকে মনে হতো নীলছবির নায়ক-নায়িকা ! ভালো কোন মুভি বা সিরিয়ালে দেখছি– মনে হতো, ভণ্ডগুলা আমার সামনে শুধু শুধু জামাকাপড় পড়ে ঘুরছে। কখন যে এইসব খুলে ফেলবে কে জানে ! এটা আমার প্রজন্মের সেই সময়ের মানসিক বৈকল্য । এটা এখনো আছে , ভয়াবহ বিকৃতি আনে চিন্তা চেতনায়। আশে পাশের সবাইকে মানুষ না ভেবে ভোগ্যপণ্য মনে হওয়া শুরু হয়। আপনি সুখ-কল্পনায় নানারকম ফ্যান্টাসিতে ভেসে বেড়াতে থাকবেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই মনো-বৈকল্য সম্পূর্ণই এক তরফা। আরেকজন টেরও পাচ্ছে না , তার সামনে বসে, আপনি তাঁকে নিয়া কী অশ্লীল চিন্তা করছেন। আমি নিজেকে নিজে ঝাঁকি দিয়া, বাস্তবে ফিরিয়ে এনেছি , আনতে পারি! ওই মানসিক সামর্থ্য আমার ছিল এবং আছে । কিন্তু একটা সদ্য কিশোর কি সেটা পারে ?

প্রকাশকালঃ মার্চ,২০১৩

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর বিবর্তনে আমি

ঘরকুনো হিসাবে আমার সুখ্যাতি আছে। অচেনা কারো সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলাপচারিতা করা আমার হয়ে ওঠে না। আমার অন্তর্মুখিতা নিয়ে আমার তেমন উদ্বেগ নেই। যেহেতু গার্মেন্টসের চাকরি করি , সবকিছুকে বয়স ভিত্তিক একটা সীমারেখায় ফেলে ফিরে দেখি আমার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর বিবর্তন কীভাবে হয়েছে। আধুনিক ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কেমন করে যে ঢুকে পড়লাম ! বাইরের অফিসিয়াল ট্রিপে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিবার ছেড়ে দুরে থাকলে এখনো হোম-সিক ও নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

তো রক্তের আত্মীয় পরিজনের বাইরে আমার অনেকবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর অভিজ্ঞতা আছে ! শেয়ার করে ফেলি। লেখাটা মনে হচ্ছে বড়ই হবে।

আমার বয়স যখন ০ থেকে ৫:
শত্রু সম্পত্তির তালিকাভুক্ত থাকায় আব্বাকে র‍্যাঙ্কিন ওয়ারীর বাড়ি ছেড়ে দিতে হলো। কিছুদিন নানাবাড়িতে বিরতি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে আম্মা ব্যস্ত আম্মাকে নিয়ে। নুরুন্নাহার খালা, যাকে আমি নুন্নী খালা বলতাম তাঁর সাথেই রক্তের সম্পর্কের বাইরে প্রথম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । খাওয়া দাওয়া , গোসল-ঘুম, সব নুন্নী খালা। আম্মাও বাঁচলেন দায়িত্ব থেকে।

গ্রামে কিছুদিন বিরতি নিয়ে আবার ঢাকার মিরপুরে চলে আসলাম আমরা। বাড়িভাড়া ঠিক হওয়ার আগের মধ্যবর্তী সময়ে বড়ফুপুর বাড়িতে । বড়ফুপুর ছোট ননদ , সম্ভবত: নন্দিনী আন্টি আমার দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । একরাশ চুল নিয়ে মিষ্টি চেহারার শ্যামলা নন্দিনী আন্টি। তাঁর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল । পাত্র প্রায় ঠিক, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আমি নন্দিনী আন্টির চারপাশে ঘুরঘুর করি। ওঁনার গল্প-আদরের ভক্ত। একদিন সাহস করে গম্ভীর মুখে যেয়ে বললাম, আন্টি আমি আপনাকে বিয়ে করব! নন্দিনী আন্টি ব্যাপারটা নিয়ে মোটেও হাসাহাসি করলেন না। ফুপুকে যেয়ে বললেন, ভাবী আমার পাত্র খোঁজার দরকার নাই ! পাত্র পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওইখানেই শেষ।

আমার বয়স যখন বয়স ৫ থেকে ১৪:
কিছু পত্র-মিতালী পত্রিকা ছিল, টাকা দিয়ে নাম-ঠিকানা ছাপানো যায়। বিয়ারিং ডাকযোগে অনেক নামের সাথে ছাপানো নিজের নামটাও আসে। টাকা দিয়ে বই ছাড়িয়ে নিতে হয়। তো, নীলফামারীর একমেয়ের নামের প্রেমে পড়ে গেলাম। বয়স সমান সমান । সাদিয়া আফরিন। সে কী গভীর উৎকণ্ঠা আর আবেগ নিয়ে হলুদ খামের চিঠি আর তার উত্তরের প্রতীক্ষা ! বেশ কয়েকমাস পরে সে জিজ্ঞাসিল আমি কোন ক্লাসে পড়ি। সরলমনে বললাম, ক্লাস সিক্সে। তার শেষ চিঠি আসলো হিন্দি সিনেমার ভাষার আবেগে ! নেহি ! কাভি নেহি ! ‘এ হয় না, এ হতে পারে না। তোমার আমার সম্পর্ক এইখানেই শেষ , তুমি আমাকে ভুলে যাও, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি!’ আমি তারপরে তাঁকে বহুবার চিঠি দিয়েছি, আর উত্তর আসে নি। সাদিয়া আফরিন, তুমি কোন ডাকাত ঘরের বউ হয়ে দিন কাটাচ্ছো, জানতে ইচ্ছে করে। পত্র-মিতালী দিয়া সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর প্রথম পর্ব ওইখানেই শেষ !

স্কুলের শেষ বেঞ্চের ছাত্র হলেও রেজাল্ট ভালো করতাম। তো বিশেষ দিনগুলোতে ( একুশে ফেব্রুয়ারি , বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা , বিজয় দিবস ইত্যাদি ) সম্মিলিত অনুষ্ঠান হতো বয়েজ ও গার্লস সেকশন মিলে। ওই এক দুই দিনের জন্য আমরা ছেলেরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম। অমরাবতী থেকে নেমে আসা, সাদা-ড্রেসের ফুটফুটে বালিকারা পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসতো ! আমরা কতিপয় ময়লা জামার , স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা খ্যাত জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম ওই বালিকাদের দিকে। প্রভাতফেরীর এক মুগ্ধ সকালে এক কন্যাকে দেখে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করতে ইচ্ছে হলও। এক সহপাঠীর সাথে শেয়ার ও করলাম। ও একটু খোঁজ-খবর নিয়া বললও, ওই কন্যা পাড়ার উঠতি মাস্তানের বোন এবং অন্য এক মাস্তানের বাগদত্তা। তৃতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং একবেলাতেই শেষ।
দূর থেকে যদি দেখি –নিজের পরিবারের বাইরে যে কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং দীর্ঘদিন ধরে রাখার তীব্র অক্ষমতা আছে আমার।

বয়স ১৪ থেকে ২১:
ঢাকা কলেজের দেড় বছর, দেড় মাসের মতো কোনদিক দিয়ে যে বেরিয়ে গেল। মাঝে মাঝে নিউমার্কেটে ইডেন সুন্দরীদের দিকে আড়চোখে তাকানো। চোখে তখন অন্য স্বপ্ন ! ‘ পড়ালেখা করে যেই গাড়ীঘোড়া চড়ে সেই ’ টাইপ আর কি। বালিকারা আমার মতো প্রেমিককে মিস করলো !
পত্র-মিতালীর দ্বিতীয় পর্ব। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় । রুমমেট ছদ্মনামে শহীদ আজিজ হলের ঠিকানা দিয়া নাম ছাপায়। প্রকৌশলের ছাত্র, হলের ঠিকানা দেখে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বালিকারা পত্র দেয়। বানানের বাহার আর চিঠির সৌকর্য দেখে আমরা ব্যাপক বিনোদন পাই। তো, লেজকাটা শিয়ালের মতো, রুমমেট ( সঙ্গত: কারণে নামোল্লেখ করছি না। ) তার পত্র-মিতার সাথে ফেউ হিসাবে আমাদের নামও দিত। এবং তার পত্র-মিতার অনুরোধে তার বান্ধবীদের সঙ্গে একসময় পরিচিত হলাম আমরা কয়েকজন। স্ট্রেন্থ অব ম্যাটেরিয়াল আর কার্ডিং মেশিনের ক্যাচালের মধ্যে থেকে যতদূর সম্ভব আর কী ! কোন এক পবিত্র সকালে বন্ধুর প্ররোচনায় গ্রুপ টু গ্রুপ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর জন্য রওয়ানা দিলাম মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সাজু-গুজু বালিকারা- নৌকা ভ্রমণের , খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। আপ্যায়ন ভালোই হলো। খটকা লাগলো অন্য জায়গায়, পত্র-মিতালী থেকে তাঁরা জীবন সঙ্গিনী হওয়ার সুখচিন্তায় মশগুল। ‘ছেড়ে দে মা , কেঁদে বাঁচি!’ পত্র-মিতালীর মাধ্যমে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর ওই পর্বের আকস্মিক সমাপ্তি !

এর পরে আসলো, ডায়াল আপ কানেকশন, ইন্টারনেটের দ্বিতীয় প্রজন্ম। শুনলাম মেসেঞ্জারে নাকি নানা দেশের তন্বী তরুণীদের সাথে কথা বলা যায়, চ্যাট করা যায়। ধৈর্য ধরে থাকলে আরো অনেক কিছু করা যায়। কীসের কি, বাসার ফোন লাইন নিয়া ডায়াল আপে গুচ্ছের টাকা খরচ করাই সার । রাতভর এই চ্যাটরুমে, সেই চ্যাটরুমে ঢুঁ মারা ; হা হতোস্মি ! সুন্দরীর নাম দেখে মেসেজ ইন বক্স করি asl? ( age, sex , location ?) হয় উত্তর আসে নামটা মেয়ের হলে কী হবে, সে আসলে ৪৫ বছরের এক বুড়া, মোটর মেকানিক্সের কাজ করে। আবারো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর চেষ্টা মাঠে মারা গেল।

চাকরির শুরুতে বন্ধু বান্ধব দূরে সরা শুরু করলো। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে ও কেউ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমালো নিশ্চিত জীবন, কালচে সবুজ, কালচে নীল-নোটের মোহে। আমি পড়ে থাকলাম নতুন কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর অপেক্ষায়। হট মেইলে (ইয়াহু, হট মেইলে ) নানা রকম ক্লিপ, ছবি আদান প্রদান জমে উঠলো একসময়। হট মেইলে, কে কত হট জিনিষ আদান প্রদান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। উৎসাহে ভাঁটা পড়তে সময় লাগে না আমাদের । মাঝে মাঝে ফোন আসে, ‘আরে দোস্ত তুমি তো আর জিনিষ পত্র কিছুই পাঠাও না।’ ওই পর্যন্তই। ওয়ান ওয়ে সার্ভিস, আমি দুনিয়ার নেট ঘেঁটে তোমাদের পাঠাব আর তোমরা আরো চৌদ্দ জনরে পাঠিয়ে মজা নাও ! ধ্যাত! এইটাও একসময়ে একঘেঁয়েমিতে পেয়ে বসলো। এর মাঝে Hi5, Badoo মায় twitter পর্যন্ত ট্রাই করলাম। মজা পাইনা!

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে বেশ কয়েক বছর ধরে, ‘ইয়েস, নো, ভেরি গুড’ টাইপ কথাবার্তা বাংলিশে লেখা বা কিছু ছবি আপলোড করা। কিন্তু অভ্র দিয়া বাংলা শিখলাম মাত্রই গত নভেম্বরে ২০১৩ তে । নিজের ভাষায় কথা বলার, ভাবপ্রকাশের চেয়ে মধুর কিছু আছে কিনা জানিনা। গত কয়েকমাসে ফেসবুকিং , মতের আদানপ্রদান। নাম না জানা তরুণ তরুণীদের সাথে মত বিনিময়। ঢাকা কলেজের শেষপ্রান্তে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কয়েকটা বছর ছিল তরতাজা কিছু সমমনার সাথে দুর্দান্ত সময়। কিন্তু, সপ্তাহে সপ্তাহে মিরপুর টু বাংলামোটর , আমার সুবিখ্যাত আলস্য নিয়া সম্ভব না। এরপরে দীর্ঘ সময় , নতুন কিছু শোনাতে পারে এই রকম কোন গোষ্ঠীর সাথে ইন্টার অ্যাক্ট হয়নি আমার। পেশাগত কারনেই সম্ভবও ছিল না। ফেসবুক সেই সুযোগ করে দিল।

মাঝে মাঝে ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ভার্চুয়াল সময়ক্ষেপণ ভালো লাগে না ! খুব কাছের কিছু মানুষ মতপার্থক্যের জন্য দূরে সরে যায় ! পরিবারের লোকজন বলে, দেশোদ্ধারের জন্য ছাপোষা এই আমিই কেন? আর কেউ নাই ? সে জন্য মাঝে মাঝে ডুব দিই সবরকম নেটওয়ার্কিং থেকে।নিজেকে কতটুকুই বা চিনি ? কিন্তু যেটুক চিনি , আন্দাজ করি, আমি ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং- এও বেশীদিন হয়তো নেই !

সিক্স সেভেনে পড়ার সময় সাদা ড্রেসের স্কুলবালিকা দেখলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে যেতো। পরিবারের এক্সপেকটেশন আর পড়াশুনার বেদম চাপে চ্যাপ্টা আমি– ওই বিষণ্ণ হওয়া পর্যন্তই ! বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ, বয়েজ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং( উল্লেখ্য, আমাদের ব্যাচে ৮০ জনের মধ্যে মেয়ে ছিল মাত্র দু’জন ; এঁরাও আমাদের সঙ্গে চলতে চলতে টমবয় টাইপ হয়ে গিয়েছিল– গালিগালাজ করতো, তুই তুকারি করতো ! ) নারী বিবর্জিত পরিপার্শ্বে জীবন হয়েছিল শুস্কং কাষ্ঠং । ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে , তেমন কারো সাথে প্রেম করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা চেপে যেতে হয়েছিল সঙ্গত কারণেই ! পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই , শুরু হলো চাকরি আর ক্যারিয়ারের চাপ। চাকরিজীবী ব্যাচেলর কলিগ-বন্ধুদের কাছে ভাবী-বিষয়ক পরকীয়ার রগরগে বর্ণনা শুনতাম। ইস্‌ ভাবী টাইপ বা আন্টি টাইপ কারো সাথে যদি পরকীয়া করা যেতো ! শুকাতে শুকাতে শুকাতে — অবশেষে সেই আরাধ্য প্রেম, দীর্ঘ(!) বছর দুয়েকের প্রেমের পর বিয়ে। ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েটি আমার জীবনে। ওই একটি মাত্র নারীর কাছ থেকে , তাঁর বয়স পরিবর্তনের সাথে সাথে ভার্সিটি পড়ুয়ার ভালোবাসার পরে এখন ভাবী টাইপ বিনোদন পাচ্ছি ! আন্টি টাইপ বিনোদনও পাবো আশা রাখি ! আর আমি — সেই ১৪ বছরেই থমকে আছি !

প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩

আশির দশকে নিম্নমধ্যবিত্তরা

দুই টাকা কেজি মূলা ; আঠারো -বিশ টাকায় মাঝারি সাইজের ইলিশ। বাসায় হঠাৎ মেহমান, কিন্তু আম্মার কাছে নগদ টাকা নাই।
পাড়ার দোকানের আবার বাকীর ব্যাপারে অলিখিত একটা সার্কিট ব্রেকার ছিল। পাঁচশ টাকার উপরে হলে নতুন বাকী বন্ধ। মহল্লাবাসী ঘনিষ্ঠ খালাম্মাদের আগের মাসের ধার শোধ করা হয়নি। আম্মা একটু দূরে কম পরিচিত খালাম্মার বাসায় পাঠালেন। ‘আম্মা একশ টাকা ধার চেয়ে পাঠিয়েছে, আগামী সপ্তাহে দিয়ে দেবে।’

বাসার গেটে মাথা নিচু করে পা দিয়ে মাটি খুঁটতে খুঁটতে অসীম অপেক্ষা। টাকা ধার চাওয়া যে একটা অসম্মানের ব্যাপার , ওই ছোট্ট বয়েসেও আমি বুঝতাম। মাঝে মাঝে ওই মিশনেও ব্যর্থ। আর , আব্বা আছেন আব্বার মতো। সকালের নাস্তা , রাতের রুটি-তরকারী কোথা থেকে আসবে, সেইটা তো আম্মার দায়িত্ব। রাশভারী বড়মামা ঢাকা আসলেই আম্মা পাকোয়ান ভাজা পরোটা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। উনিও ভালোমন্দ খেতে পছন্দ করতেন। দেশের কেউ আসলে, আম্মা যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতেন, আমরা অভাবে আছি বুঝতে দিতে চাইতেন না।
মাঝে মাঝে উপায়ন্তর না দেখে পুরানো খাতা,পেপার, ডানোর ডিব্বা ভাঙারীর দোকানে দেড়-দুই টাকা কেজিতে বিক্রি ; অতঃপর মেহমান ম্যানেজ।

এই যে , নিম্ন মধ্যবিত্তের টানাপড়েন আর প্রাত্যহিক সংগ্রাম—আমার দুই কন্যা কি কখনো বুঝবে ? নাকি, আমি ওদের কখনো বুঝতে দিতে চাই !

আমার ভালোবাসার কন্যারা তোমরা হয়তো অন্যরকম অন্যকোন টানাপড়েনে পার করবে জীবনের অন্যকোন অংশ ; আপাতত: সাইকেল বা ভিডিও গেমের অপর্যাপ্ততা নিয়ে আমার সাথে অনুরাগ দেখাতে থাকো !

প্রকাশকালঃ মার্চ,  ২০১৩

কর্পোরেট অবজার্ভেশন (বাংলাদেশের নবীন উদ্যোক্তাদের বর্তমান অবস্থা )

আমাদের কিংবদন্তী অর্থনীতিবিদদের কাছে ‘চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হও!’ ‘ সামাজিক ব্যবসা’ ইত্যাদি শুনে শুনে আমার মতো কুলি মজুরদেরও মাঝে সাঁঝে জানতে ইচ্ছে করে, এতো বড় একটা প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কি করছে ! তাঁদের মৌলিক বাধা কি কি ; নবীন উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? আমাদের নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা কি ?

সম্ভবত: ২০০৭/৮ এর পর থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অধুনা কয়েকবছর যাবত তা দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই গ্যাসের লাইন নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের কি পরিমাণ ‘ স্পিড মানি’ খরচ হচ্ছে ; সেটা শুনলে অনেকের চোখ কপালে উঠবে ! বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, আমাদের জ্বালানী সংকট, রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি আমাদের বস্ত্রশিল্পকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে অন্যতম রপ্তানীমুখি শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা আসার পরিমাণ গেছে কমে । নতুন টেক্সটাইলে নতুন উদ্যোক্তাদের পদচারণ নেই বললেই চলে । যা হচ্ছে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ! কারো ৬ লাখ গজ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, সে এক ধাক্কায় ১২ লাখ গজ করে ফেলছে। কারো ৩০ লাইনের কারখানা ছিল, সে কয়েকবছরে ৬০ লাইন করে ফেলছে। অসম মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসংখ্য ছোট মাপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝারি মাপের গার্মেন্টসগুলোর মালিকানা বড় গ্রুপগুলোর কাছে চলে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর আরও বৃহদায়তন হচ্ছে।

দেড় যুগ আগে আমার কর্মজীবনের শুরুতে দেখেছি , গার্মেন্টস-এর মালিকদের প্রধান উৎপাদন নির্ভরতা ছিল , কাপড় উৎপাদন করা ও সেলাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ বা অন্যান্য খুচরা পণ্যের সরবরাহ ছিল পুরোটাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে। বোতাম, টুইল টেপ, লেবেল, সুতা, কার্টন, পলি ব্যাগ, স্ক্রিন প্রিন্ট , এমব্রয়ডারি যাবতীয় সরবরাহ ছিল ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনেক লোকের কর্মসংস্থান হত।এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানায় সব ধরণের সার্ভিস ও ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ ইউনিট খুলে বসে আছেন।
তাহলে ঐ ক্ষুদ্র- মাঝারি উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, পুরনোরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন । এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের নৌকার পাল না তুলে ‘ আরামদায়ক’ চাকরির বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টর ছেড়ে অন্যদিকে আসি। স্কয়ার বা প্রাণ-আরএফএল এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণের স্বার্থে উদাহরণ হিসাবে ধরছি। স্কয়ার-এর ফার্মাসিউটিক্যালস দিয়ে ব্যবসা শুরু। পরে টেক্সটাইল, তারপরে ফুড ও বেভারেজ, কসমেটিক্স, টয়লেট্রিজ, হাসপাতাল সব। দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠতায় তাঁদের সকল পণ্য একটা ব্র্যান্ড লেবেল পেয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্যতা এমন পর্যায়ে গেছে, তাঁদের পণ্য চোখ বুজে ভোক্তারা কিনে থাকে। কিন্তু এমন অনেক পণ্য ছিল, যেগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে বেঁচে থাকত। সেগুলোও ধীরে ধীরে স্কয়ার দখল করে নিয়েছে। সামান্য ঝাল মুড়ি বা চীনাবাদামও যদি স্কয়ারের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে, তাহলে সাধারণ ভোক্তাদের কেউ কি আর চলতি ঝাল মুড়িওয়ালার কাছ থেকে কিনবে ?

ঐদিকে প্রাণ-আরএফএল এর মূল পণ্য সম্ভবত: ছিল, একদিকে তরল পানীয় অন্যদিকে হেভি-লাইট মেশিনারিজ, নলকূপ ইত্যাদি। এখন তাঁরা সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে শুরু করে সামান্য বালতি,বদনা পর্যন্ত উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। হাস্যকর হলেও সত্য, প্লাস্টিকের বদনা খুবই ছোট মাপের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে থাকতেন। যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্লাস্টিকের বদনা, বালতি তৈরি করত তাঁর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া এখন গত্যন্তর নেই । ব্র্যান্ড ইমেজে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক পিছিয়ে আছে। পেপার ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা বিজ্ঞাপনে সবকিছুই ব্র্যান্ডিং ও বিক্রি করা সম্ভব।

বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রচলিত পণ্য ছাড়াও ছোটখাটো সবরকম পণ্যের বাজার যেভাবে দখল করা শুরু করেছে; দেখে শুনে মনে হচ্ছে , সেই দিন আর বেশি দুরে নেই, কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাংলাদেশের তাবৎ পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকবেন। পুঁজি বাজার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা পকেটে পুরে ফেলেছেন আমাদের বড় উদ্যোক্তারা।

আবার ফিরে আসি আমাদের টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতে। কেন নতুন উদ্যোক্তাদের দেখা নেই ?কেন এঁরা নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহী হচ্ছেন না ?

প্রথমত: বড় উদ্যোক্তারা ছোটদের ডি-মার্কেটিং করছেন। বড় মাছ, পুকুরের সব ছোটমাছকে খেয়ে ফেলছে।

দ্বিতীয়ত: ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাদের আগের মতো সহায়তা করছে না। ব্যাংক নিরাপদ বিনিয়োগে বড় ঋণ-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে আবার নতুন করে ঋণ দিচ্ছে। আর আমাদের অসংখ্য মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না , তাঁদের চাকরি বাজার ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আদৌ সম্ভব কীনা, হলেও সেটা কীভাবে ! তৃতীয়ত: (এটি আমার ব্যক্তিগত মতও বটে)—ব্রিটিশ কেরানি-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদের অগুনতি কেরানী তৈরি করছে। শত শত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আমাদের বেশি দরকার – হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষা নির্ভর শিক্ষালয়। যেখানে, একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ,আমাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী করে ফেলছে। একটা চেয়ার ও টেবিলের বসার সুযোগের জন্য আমাদের সকল সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত ।

বাংলাদেশ সরকারের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু মাস্টার প্ল্যান হয়তো আছে। আমি জানি না । নানা ধরনের ফান্ড থাকে , এসএমই ( Small Medium Entrepreneur) ঋণ থাকে। সেটা কতখানি সঠিক জায়গায় পৌঁছায় , সে ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ অমূলক নয়। এবং প্রতিবছরে ওই ফান্ডের যথোপযুক্ত ব্যবহার হয় কিনা , সেটার কোন তথ্য কারো জানা নেই।

কিছুদিন আগে , বিশাল শিল্পকারখানার মালিক এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজেও চাইতেন, ছোট ছোট স্ক্রিন প্রিন্টিং কারখানা , লেবেল, পলি , টুইল টেপ, বাটন , কার্টন ফ্যাক্টরি ফ্যাক্টরি চালু থাক। কিছু লোকজন উদ্যোক্তা হোক। মুশকিল হচ্ছে, তাঁর অভিজ্ঞতা এই ব্যাপারে খুবই তিক্ত ! তিনি হয়তো ভালো মানের সুতা দিয়েছেন তাঁর টুইল টেপ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু , ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অতি লোভে , মাঝপথেই গাড়ীসহ সেই ভালো মানের সুতা বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে, দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট খোলা বাজারের সুতা কিনে তাঁর টুইল টেপ বানিয়ে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় গুণগত মানে তাঁর গার্মেন্টস ফেল করেছে।

একই কথা অন্যসব বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য, এঁরা যে দামে কাজ ছোটদেরকে দেয়। তাঁরা যদি সঠিক উপাদান ব্যবহার করত তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু, কিছু অতিলোভী দ্রুত মুনাফা কামী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কৃতকর্মের দায় নিতে হচ্ছে অন্য সবাইকে। প্রায়শই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বড় প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলে দেয়। অনেকবার দেখেছি, সামান্য সুতা, বোতাম, কার্টন, টুইল টেপ, স্ক্রিন প্রিন্ট ফ্যাক্টরির গুণগত মানের সমস্যা অথবা সরবরাহে দেরী হওয়ার গার্মেন্টস মালিককে ডিসকাউন্ট ও এয়ার শিপমেন্টের জরিমানা গুনতে হয়েছে।

দ্রুত বড়লোক হওয়ার ও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পড়ে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় প্রতিষ্ঠানের ভরসা হারিয়েছেন। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানার অভ্যন্তরেই সব ছোট ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজ করে ফেলেছেন। কেননা, তাঁরা তাঁদের মিলিয়ন ডলারের শিপমেন্ট সামান্য কয়েক পয়সার অ্যাকসেসরিজের জন্য হুমকির মুখে ফেলতে চান না।

এই দুষ্টচক্র থেকে কীভাবে বের হওয়া সম্ভব , সেটা নিয়ে কী ধরণের গবেষণা হওয়া উচিৎ সেটা জানার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে আলোচনা।

প্রকাশকালঃ ১০ই মার্চ, ২০১৭