পরিশ্রম, কাজের দক্ষতা, নিষ্ঠা, দায়িত্বজ্ঞান, দূরদর্শিতা, নিয়মানুবর্তিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি গুণাবলী কর্পোরেট ঊর্ধ্বতনদের প্রাথমিক যোগ্যতা। এই গুণাবলী না থাকলে একটা অবস্থানে কেউই পৌঁছুতে পারেন না ! এই আবশ্যকীয়র পাশাপাশি মানুষ হিসাবে একজন ঊর্ধ্বতন কিভাবে তাঁর পরিপার্শ্বে বিচরণ করেন ও তাঁর আচরণের স্বল্প দীর্ঘমেয়াদী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া কীভাবে অধস্তনদের উপরে পড়ে সেটা আজকের আলোচ্য।

মানবিক আবেগ আর কর্পোরেট আবেগের সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। মানবিক আবেগ নিজের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে দেখানো যায়। কিন্তু প্রায়শ: একটা নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলে সেই আবেগগুলো কর্পোরেট হয়ে যায়। কর্পোরেট আবেগ ও তার প্রকাশভঙ্গী যতোটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ ছিল , তা ততোখানি গুরুত্ব পায় নি । প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতনদের তাঁদের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ ও তার প্রকাশভঙ্গীর ভারসাম্যের ব্যাপারটা শিখে নেওয়া উচিৎ । একই পরিস্থিতিতে একজন ঊর্ধ্বতন ও একজন মধ্যম সারির কর্মচারীর প্রকাশভঙ্গী আলাদা হওয়া উচিৎ। সেটা না হলে প্রতিষ্ঠানে বড় ধরণের সমস্যা তৈরি হয়। একজন দক্ষ ঊর্ধ্বতনের যদি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর মতো সোজা বাংলায় ‘ ছোটলোক’- এর মতো আচরণ হয় তাহলে মুশকিল!

এই কর্পোরেট আবেগের বহিঃপ্রকাশকে অনেকেই অভিনয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। আমার নিজের কথা বলি। আমার কয়েকজন ঊর্ধ্বতন আমাকে সরাসরি পয়েন্ট-আউট করে বলেছেন, আমার কর্পোরেট অভিনয় দক্ষতা নাকি খুবই নিম্নশ্রেণীর। আমি কোন একটা ব্যাপারে অখুশি হলে, আমার চেহারায় মুহূর্তেই সেটা ফুটে ওঠে। আমার ঊর্ধ্বতনরা সহজেই আমাকে ‘পড়ে’ ফেলতে পারেন। They can easily read me ! অথচ আমার সতীর্থ অনেক কর্মকর্তাকে দক্ষ অভিনেতার মত দিনের পর দিন অভিনয় করে যেতে দেখেছি। সবচেয়ে ভণ্ড, দুশ্চরিত্র, অর্থ-লোলুপ, ক্ষমতা-লোভী, স্বার্থপর , হীন বসের সামনেও তাঁদেরকে দিনের পর দিন হাত কচলে নতজানু হতে দেখেছি। ঊর্ধ্বতনের খুব নিম্নশ্রেণীর রসিকতায় উচ্চকিত হাসিতে ফেটে পড়তে দেখেছি। বিনিময়ে আমার সতীর্থদের পদন্নোতি ও নগদ নারায়ণ সবই মিলেছে। আমি থেকে গেছি ওই সৌভাগ্য থেকে যোজন যোজন দূরত্বে ! ওই কর্পোরেট অভিনয় আমাকে দিয়ে কখনো হয়নি; এখন এই শেষ বয়েসে এসে নতুন করে অভিনয় দক্ষতা বাড়ানোয় সচেষ্ট হতে ইচ্ছেও করে না আর !

কর্পোরেট অভিনয় বলি বা আবেগের প্রকাশ বলি ; সেটা কিন্তু নানা শ্রেণীর হয়। আমি- আপনি সারাক্ষণ অভিনয় করে চলেছি, পাশের মানুষের সঙ্গে, বসের সঙ্গে, চাকরি-প্রার্থীর সঙ্গে, এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে, ভাইবোন বা বাবা-মার সঙ্গেও। কিন্তু মনে রাখতে হবে , দর্শক বুঝে আপনাকে অভিনয় ডেলিভারি করতে হবে ! তৃতীয় শ্রেণীর দর্শকের জন্য যেমন প্রথম শ্রেণীর অভিনেতা ও অভিনয় দক্ষতার প্রয়োজন নেই। এর বিপরীতে প্রথমশ্রেণীর দর্শকের সামনে তৃতীয় শ্রেণীর অভিনয় একেবারে অশ্লীল ও কদর্য হয়ে ওঠে !

আবেগ প্রকাশের যেহেতু কোন বাঁধাধরা নিয়ম বা ম্যানুয়াল নেই ; তাই আমরা ধরে নিই সেটা ব্যক্তি তাঁর পরিবার,পরিবেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করে আসবে। কেউ কেউ শিখে আসেন , অনেকে শেখেন না এবং শিখতেও চান না ; হয়তো তাঁদের শেখার দরকারও নাই ! সুযোগের সময়োচিত সদ্ব্যবহার করে অল্পসময়ে ক্ষমতার এমন একটা জায়গায় কেউ কেউ পৌঁছে গেছেন যে ; তাঁদের আচরণের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলার অবকাশ কম। আবার এটাও ঠিক , আবেগ সেটা মানবিক হোক আর কর্পোরেট হোক –মানুষ যেখানে আছে, সেখানেই রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ,তাচ্ছিল্য, অবহেলা, উচ্চম্মন্যতা, হীনমন্যতা, ভয়, লোভ, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা, অহংকার, আত্ম-প্রেম, ইত্যাদি থাকবেই। সেটা মাল্টিপারপাস কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে , পাইকার বাজার বা সেনাবাহিনী সবজায়গায় প্রায় একই রকমের ! আমার স্বল্পমেয়াদী জীবনে কেন জানি মনে হয়েছে , একজন মানুষ আসলে খুব কম সময়েই তাঁর মৌলিক অর্জিত চরিত্র থেকে বের হয়ে আসতে পারে। নানা চাপে তাপে তাঁর পারিবারিক অর্জিত চেহারা বের হয়ে আসে। সেটা প্রায়শ: মানবিক কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দৃষ্টিকটু-রকমের স্বার্থপরতায় আচ্ছন্ন।

আমি কয়েক রকম ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কাজ করেছি, এখনো করছি। তবে মোটা-দাগে যেটাকে আমরা বলি নিয়ন্ত্রিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ সেটা হাতে গোনা কয়েকজনের ছিল। অমায়িক, যুক্তিবাদী, পরিমিতি বোধসম্পন্ন , নিয়ন্ত্রিত আবেগী ছিলেন কয়েকজন। বদমেজাজি ছিলেন মাত্র একজন। তাঁর মধ্যে সেটারও পরিমিতিবোধ ছিল। ওই যে বললাম, এর মাঝখানে কয়েকজন ছিলেন, দুর্বোধ্য গিরগিটির মতো! ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানোর অলৌকিক গুণের শক্তিমত্তা ছিল এঁদের। কেউ কেউ ছিলেন জিঘাংসাপরায়ণ। কেউ কেউ ছিলেন গিরগিটি ও হিংস্রতার মিশেল।যতখানি বদমেজাজি হলে জিঘাংসাবৃত্তির সাময়িক প্রশমন ঘটতে পারত , তাঁরা সেই পরিমাণে মেজাজি ছিলেন না। মূলত: বদমেজাজি ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কাজ করার অসুবিধার পাশাপাশি প্রধান সুবিধা হচ্ছে, এঁদের তাৎক্ষণিক আবেগ প্রশমিত হলে ব্যাপারটা তাঁরা ভুলে যান। আপনি আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারবেন এঁদের সঙ্গে। কিন্তু মাঝামাঝি মিশ্রিত বিরল গোত্রটি ভয়ঙ্কর ! যাঁদের ক্রোধ কুটিলতাকে অতিক্রম করতে পারে না। আপনার বিশেষ কোন কাজ, প্রকাশভঙ্গী না প্রতিক্রিয়ার উপর উনি কতোখানি ক্রুদ্ধ, উনি সেটা আপনাকে তাৎক্ষণিক-ভাবে টের পেতে দেবেন না। এঁরা এঁদের জিঘাংসা পুষে রাখেন মনের গহীন কালোগহ্বরে ! সরীসৃপের মতো বেড়ে ওঠা সেই জিঘাংসার ছোবল দুর্বল অসতর্ক মুহূর্তে ছোবল দিয়ে বসে নিরীহ অধস্তনদের। সেই বিষে আমি অনেক কর্পোরেট কর্মকর্তাকে মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে থাকতে দেখেছি।

ওই বিশেষ শ্রেণীর সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আপনাকে তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করে চলা শিখতে হবে। নয়তো তাঁদের বিজয়-রথের চাকায় আপনার ছোট-প্রাণ কখন পিষ্ট হয়ে যাবে আপনি টেরই পাবেন না !
আমার এক ঊর্ধ্বতন পেয়েছিলাম ক্যারিয়ারের শুরুতে। তাঁর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বলতাম , ভদ্রলোক কেন যে চলচ্চিত্রে গেলেন না ! শুধুমাত্র কর্পোরেট অভিনয়ের যদি কোন অস্কার পুরষ্কার থাকত ; আমি নিজে অস্কার নমিনেশনের জুরি বোর্ডকে রিকমেন্ড করতাম তাঁকে অন্তত: একটা লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য ! তিনি যেমন মুহূর্তেই কাউকে দেখে হেসে গলে পড়তে পারতেন ; পর মুহূর্তেই আরেকজনের ব্যাপারে তাঁর ভয়ঙ্কর বীভৎস চেহারা দেখা যেত। আবার কিছুক্ষণ পড়ে তিনি যখন তাঁর ঊর্ধ্বতনের সামনে যেতেন ; তাঁর বিনয়ী আচরণ ও অভিনয় দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম !

সকল সতীর্থ ,অনুজ কর্পোরেট কর্মকর্তাদের আরও অভিনয় দক্ষতা বাড়ুক। যারা দর্শক-শ্রেণীতে আছেন, তাঁরা মঞ্চের আলোয় এসে অভিনয় করার সুযোগ পান, এই শুভকামনা।