উপলব্ধি: ২৫

টানেলের দুইদিক থেকেই দেখার চেষ্টা করুন। আমাদের ধর্মে ও ইতিহাসে ঘুরে ফিরে এই কথা বহুবার বলা হয়েছে, ব্যক্তির আচরণ বুঝতে হলে, আপনি নিজে তাঁর অবস্থানে কী করতেন সেটা একবার হলেও উপলব্ধি করার।
কোন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি কী ধরণের আচরণ করতে পারে সেটা ঐ ব্যক্তির অবস্থানে নিজেকে চিন্তা না করতে পারলে বোঝা যায় না। কল্পনাশক্তির ব্যবহার করুন, নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বোঝার চেষ্টা করুন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি একটি পরিস্থিতিতে কেন ওইরকম আচরণ করল।

এই ব্যাপারটা চর্চা করতে পারলে, নিজেকে চরমভাবাপন্ন হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন। সত্যি কথা বলতে কী, এই চর্চা যদি শৈশব থেকে আমাদের প্রজন্মের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া যেতো, আমাদের সমাজ অনেক বেশি সহনীয় হত।

ঘুরে ফিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত দেখি। যদিও প্রথম বাক্যটি একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ‘গান্ধারীর আবেদন’ কবিতার , যাতে মাতৃ-স্বার্থের গন্ধ আছে। তারপরেও গান্ধারীর মুখনিঃসৃত এই চরণ গত শতাব্দীতে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় হয়েছে।
“…প্রভু, দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে-বিচার। যার তরে প্রাণ
কোনো ব্যথা নাহি পায় তারে দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার। ”
(গান্ধারীর আবেদন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।।)

আবার কিছুটা হলেও সংঘাত তৈরি করে তাঁর আরেকটি উক্তি। এই উক্তিও বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়। ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের নিখিলেশের স্বগতোক্তি। “ যে দুর্বল সে সুবিচার করতে সাহস করে না,— ন্যায়পরতার দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যায়ের দ্বারা সে তাড়াতাড়ি ফল পেতে চায়। ”

যতই বলি না কেন, জাজমেন্টাল না হওয়াই উত্তম। কিন্তু সেটা আর পারি কোথায় !
আপনি ক্ষমতাবান হন, দুর্বল হন, ক্ষমতালিপ্সু হন, ঊর্ধ্বতন হন—আপনাকে প্রতিদিন এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যেতেই হয়। তাই, বিচারের রায় বা সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলার আগে একটু সময় নিন।

উপলব্ধি: ২৪

কর্মজীবনে যদি ঊর্ধ্বতনের কাছে প্রয়োজনীয় কিছু চাইতে হলে, বলতে হলে — ভণিতা না করে , সরাসরি বলে ফেলার চেষ্টা করুন। আমি সেটা শিখেছি অনেক পরে। আমি মূলত অন্তর্মুখী। নিজের প্রয়োজনের কথা অনেক সময় বলে ফেলতে দেরি করেছি। অথবা এড়িয়ে গেছি। অনেক পরে এসে বুঝেছি, নিজের কথা অন্যকে দিয়ে বলানোর চেয়ে নিজে বলে ফেলাই ভাল। তবে, এই বলার ব্যাপারটাও সঠিক সময়ে হতে হবে। ভুল সময় হলে মুশকিল, হিতে বিপরীত হতে পারে।

 

উপলব্ধি: ২৩

যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, কর্মস্থলে, পরিবারে, বন্ধুমহলে– যতদূর পারেন ভণ্ডদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে আপনার একই সমান্তরালে ,কাছাকাছি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে যারা আছেন এবং আপনি মোটামুটিভাবে যাদের চিহ্নিত করতে পারেন তাদের কথা বলছি।

এর চেয়ে বরং সমাজের তথাকথিত চিহ্নিত শ্রেণির লোক, ছোটখাটো দোষত্রুটি আছে, দুর্নাম আছে কিন্তু ভণ্ড না, তাঁদের সঙ্গে অবলীলায় চলা সম্ভব। কারণ আপনি জানেন, সে খারাপ। ভণ্ড ব্যক্তিরা রঙ বদলানো গিরগিটির মতো। নিজের স্বার্থে যে কোন সময় ধর্ম দিয়ে বা নিজের অজ্ঞতা দিয়ে নিজের কৃত কুকর্মকে ঢাকতে চায়। যুক্তি দিয়ে চেপে ধরলে ভণ্ডলোকেরা শেষ আশ্রয় হিসাবে অজ্ঞতার ভাণ করেন, তবুও স্বীকার করেন না তাঁদের ভণ্ডামি।

উপলব্ধি: ২২

ঋতু-বৈচিত্র্য, বৈরী আবহাওয়া, ভূ-প্রাকৃতিক কারণে প্রকৃতির অসহনীয় আচরণ, অথবা নিয়ন্ত্রণের বাইরের উদ্ভূত কোন পরিস্থিতির টেনশন নিজের ঘাড়ে টেনে নেবেন না। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নানা ধরণের প্রতিকুল ঘটনাসমূহ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই ! ঢাকার ট্র্যাফিক, দেশের সরকার, রাষ্ট্রের
আচরণ, গ্রীষ্মের দুঃসহ গরম, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অন্যদেশের ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের দুরবস্থা, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি । এই রকম অসংখ্য ইস্যু আছে, যা ধীরে ধীরে সহনীয় হয়; ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যায়। এগুলো নিয়ে অবশ্যই চিন্তা করতে পারেন ; দুশ্চিন্তা না। গাড়ীতে বসে আছেন, চারপাশের বিশৃঙ্খলা দেখে লেগে গেলেন দেশের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে। রক্তচাপ বেড়ে গেল।

ছোটখাটো আরও কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো ইচ্ছে করলেই আপনি তাচ্ছিল্য করতে পারেন, এড়িয়ে যেতে পারেন। খাবার খেতে বসেছেন, বাথরুমে যাচ্ছেন, অসময়ে ফোন বাজছে তো বাজছেই। আপনার টেনশন বেড়ে গেল। এসব ক্ষেত্রে সময় নিন, ধীরেসুস্থে ফোন অ্যাটেন্ড করুন। যিনি আপনাকে খুঁজছেন তিনি বুঝমান হলে বুঝবেন আপনার ফোন দেরি করে ধরার কারণ। আর সেটা না বুঝেই কেউ যদি ফোন করতেই থাকেন, সেটা তাঁর সমস্যা।

আসলে, আমরা যারা ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হয়ে গেছি, তাঁদের ও যারা এখনো হননি, দয়া করে অনর্থক টেনশন করে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হবেন না।

উপলব্ধি: ২০

প্রযুক্তি!

যখন যে প্রযুক্তি এসেছে , তার ভালো দিক মন্দ-দিক বোঝার চেষ্টা করুন। প্রযুক্তির বৈভব , পরাভব মেনে নিতেই হবে। আজকের পৃথিবী এমনভাবে সংযুক্ত হয়ে আছে, এর বাইরে আপনি থাকতে চাইলে আপনাকে বনবাস নিতে হবে। আমার দুই কন্যাকে নানা প্রযুক্তির পাশাপাশি রেখেও বই পড়তে উৎসাহিত করেছি। বই এমন একটা মাধ্যম, যেখানে আপনার কল্পনাশক্তি কাজ করে, মাথা খাটাতে হয়। বই ইলেকট্রনিক অন্য সব মিডিয়ার মতো রেডিমেড ইনস্ট্যান্ট নুডলস নয়। বইকে আমি এখনো তুলনা করি, রান্না করে পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়ার মতো। জীবনের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে নিজে বেছে বাজার করতে হয়, সেগুলো নানা প্রক্রিয়ার পরে রান্না করে তারপরে সুস্বাদু খাদ্যে পরিণত করতে হয়। তাই, অন্য সকল ইনস্ট্যান্ট মিডিয়ার সঙ্গে বইয়ের তফাৎ আজন্ম থাকবে।

টিভি ও ইন্টারনেট আমাদের আসক্ত করে রাখে । কীভাবে রাখে সেটা নিয়ে একবার বড়কন্যার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বেশ কয়েকবছর আগে, বড়কন্যাকে বোঝালাম, ধরো তোমার আই-কিউ ৯০। কিন্তু টিভি, ভিডিও গেম, ইন্টারনেটের যে কোন প্রোগ্রাম একক কোন ব্যক্তির করা নয়। ধরো তাঁদের ভিতরে কয়েকজনের আই কিউ তোমার চেয়ে অনেক বেশি। তাঁদের সম্মিলিত আই কিউ দিয়ে সে অনেক সময় ব্যয় করে একটা অনুষ্ঠান করেছে, সেটা তোমাকে আটকে রাখার জন্য, আসক্ত করার জন্য। ছুটিতে , অলস সময়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে কিছুক্ষণ সময় দেওয়া যায়। কিন্তু সময় তো অফুরন্ত নয়। নানাবিধ কার্যকরী কাজে নিজেদেরকে নিযুক্ত করতে হয়। পড়াশোনা, কর্মজীবন, পরিবারকে সময় দিতে হয়। যা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ না, এড়িয়ে যান। নিজের প্রায়োরিটি দিয়ে প্রযুক্তিকে পরাভূত করা শিখতে হয়।