by Jahid | Jan 18, 2023 | করপোরেট অবজারভেশন, দর্শন
কয়েকজন অগ্রজ, সহকর্মী বা অধীনস্থদের চলতি কোন আলোচনায় অংশ নেবেন কি নেবেন না, সেটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেছে নেওয়া ভাল। আমার করপোরেট জীবনে এমন অনেকবার হয়েছে, কয়েকজন সমবয়সী সহকর্মী একটা কিছু নিয়ে কথা বলছি, হাসাহাসি করছি, হুট করে আমার কোন ঊর্ধ্বতন এসে যে কোন একটা শব্দ ধরে আমাদের আলোচনায় ঢুকে গেলেন। অথবা জিজ্ঞেস করলেন , কি ব্যাপার কি নিয়ে আলোচনা করছেন ? মুশকিল হচ্ছে, যুবাবস্থায় ও করপোরেট চাকুরেরা চা-পানের বিরতিতে হয় চিরন্তন নারীদেহ , যৌনতা অথবা কোম্পানির কোন অনিয়মের ব্যাপারে কথা বলে। এখন ঊর্ধ্বতন কেউ জিজ্ঞেস করে ফেললে উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে ! সেই সময়ে, আমাদের মধ্যে হাজির জবাব দেওয়ার ক্ষমতা যার ভালো সে ধুনফুন কিছু একটা বলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেওয়াতো। বস-কে তো আর বলা যায় না, আমরা মাধুরী দীক্ষিতের দেহবল্লরী বা ‘বে ওয়াচ ’ নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় কয়েকজন বসের মধ্যে মাত্র একজনকে পেয়েছি, যার চলতি আলোচনায় অনাবশ্যক অনুপ্রবেশের পরিমিতি বোধ ছিল। আর বেশিরভাগ ঊর্ধ্বতনদের এই ব্যাপারে পরিমিতিবোধের অভাব আছে। পরিস্থিতি না বুঝে হুট করে আরেকটি আলোচনায় ঢুকে পড়তেই পারেন যে কোন ঊর্ধ্বতন। কিন্তু সেটা যে প্রায়শ: বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, সেটা তাঁরা ভুলে যান।
হ্যাঁ, উচ্চকিত কণ্ঠে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, ঢুকে পড়ুন, আপনার মতামত দিন। তামিম ইকবালের খেলার সমালোচনা করুন। কিন্তু মাঝারি বা নিচু কণ্ঠের আলোচনায় অনুপ্রবেশ করার আগে পরিমিতিবোধ দেখানো উত্তম।
প্রথম প্রকাশ: ১৮ই জানুয়ারি,২০১৭
by Jahid | Jan 18, 2023 | ছিন্নপত্র, দর্শন, লাইফ স্টাইল
ফেসবুককে আমার প্রথম থেকেই মনে হতো একটা ঘরোয়া আড্ডার মতো। একটা লিটল ম্যাগাজিন পড়ার অনুভূতি থাকত। লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে যেমন সারাক্ষণ তরতাজা মচমচে স্বাদু অনুভূতির ছাপানো হরফ থাকে , সেইরকম । এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। অসাধারণ কিছু মেধাবী লেখকের দৈনন্দিন দিনলিপি পড়ার সুযোগ ঘটেছে। আমি আরো বেশি রাজনীতি ও সমাজ সচেতন হয়েছি। নবীন প্রজন্মের কিছু চিন্তক , দার্শনিক , কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা প্রতিদিন পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে। এঁদের একজন সতীর্থ আহসান। গতকাল , কিছু কথোপকথনের পরে, তিনি আমার লেখালেখি সম্বন্ধে কিছু বললেন। আমার কাছে ,সেটা অসংখ্য লাইক , লাভ, ওয়াও ইমোজি চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অনুমতি নিয়েই নিজের ওয়ালে পোস্ট করলাম।
“ আপনার লেখাজোকা ফেসবুকে যা প্রকাশিত হতো, মাঝেমধ্যে পড়া হত। হয়তো রিএকশন দিতাম, কখনো কখনো দিতাম না। আপনি মূলত প্রবন্ধ ঘরানার লেখা লিখে থাকেন। মোটামুটি লম্বা লম্বা বাক্যে। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না। যেন শ্বাসরুদ্ধকর কোনো ফিকশন পড়ছি, এমন একটা অনুভূতি জাগে। সেই টানা টানা শ্বাসরুদ্ধকর বাক্যগুলোর মাধ্যমে যে চিন্তার প্রকাশ ঘটান সেটা সব সময়ই কোনো না কোনো ভাবে চিন্তা উদ্রেককারী হয়ে থাকে।
পরিচ্ছন্ন ভাষা আর গোছানো চিন্তা আপনার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বোঝা যায় আপনি দুনিয়াকে অবহেলিত শোষিত পীড়িত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। গণমানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়– এমন কোনো আচরণ আপনাকে ক্রুদ্ধ আর ব্যথিত করে। সেই মনোভাবকেই আপনি শৈল্পিক ভাষায় উপমায় প্রকাশ করেন। আমি শুধু অনুরোধ করব, এই ক্রোধ/দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি আরেকটা স্টেপ যোগ করুন। যেটা হচ্ছে, সেই বিপর্যয়টা কীভাবে কাটিয়ে উঠা যায় সেটার পরামর্শ দিতে পারেন। দেশি বিদেশি নানা উদাহরণ সহযোগে। এতে আমার মনে হয়, আপনার লেখাটার গুরুত্ব আরো বাড়বে। আপনি নিজে কী, নিজে ঠিক বুঝতে পারছেন না, এর কারণ আত্মবিশ্বাসহীনতা। এইটা একটা মারাত্মক ব্যাধি জাহিদ ভাই। এই রোগে যারে ধরে সে সাধারণত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
এবার আরেকটা কথা শুনেন। আপনি থাকেন ২ নাম্বার রোডে। আর আমি থাকতাম ৩ নাম্বার রোডে। আপনার ঠিক বিপরীত রোডেই। আপনি বেশ কয়েকবার আড্ডার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি প্রায়ই আপনার বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে আসতাম। কিন্তু আপনাকে জানিয়ে যাওয়া হতো না। কারণ, সেই তীব্র হীনমন্যতা। আমি ওখানে থাকতাম, একাই লাগত। আপনার সাথে প্রায়ই আড্ডা দিতে ইচ্ছা হতো। সাহিত্য আড্ডা আর কি। কিন্তু তখনই আমার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যেত। এই জন্য দুঃখিত। সামনে কখনো গেলে, এই নেকাব আর রাখব না। এই যে আমার আত্মবিশ্বাসহীনতা, এইটা অনেকগুলো সম্ভাবনাকে খুন করে থাকবে। হয়ত মনের সব বাঁধা পেরিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে পারলে আমাদের চমৎকার সব সাহিত্য-আড্ডার অভিজ্ঞতা ঘটতে পারত। আপনার পরামর্শ বা কথাবার্তা আমার লেখাকে সমৃদ্ধ করতে পারত। আমার কোনো পরামর্শ হয়ত আপনারও কাজে লাগত। কিন্তু আমার এই আত্মবিশ্বাসহীনতা সে সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিলো।
আপনার লেখার হাত যথেষ্ট ভাল। চিন্তা পরিষ্কার। বইয়ে স্থান দেবার মত লেখা। শুধু একটু মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাস বিনিয়োগের অভাব। মনে যা আসে, লিখতে থাকুন, তা যতই খারাপই হোক, এতে লেখার ফ্লো টা ঠিক থাকে। এই ফ্লো খুব ইম্পরট্যান্ট জিনিস। আর সময় পেলেই নানা বই পড়বেন। লেখার ফ্লো তৈরিতে বই পাঠের ভূমিকা অনেক। চিন্তাও সমৃদ্ধ হয়।
লেখা থেকে ধর্ম আর রাজনৈতিক বিষয়টা যেন সরাসরি না আসে তা খেয়াল রাখবেন। জানেনই তো এইদেশে মুক্তভাবে কথা বলার পরিবেশ নাই। একটা পদ্ধতি আছে, সেটার মাধ্যমে আপনি ধর্ম ও রাজনীতিকেও সমালোচনা করতে পারবেন। সেটা আপোষ পদ্ধতি বা ছলনা পদ্ধতি। এমনভাবে লিখতে হবে যাতে মনে হয় আপনি তাদের বিপক্ষের কেউ না। তাদেরই একজন। বন্ধ বান্ধব যেমন নিজেদের বন্ধু বান্ধবদের সমালোচনা করে। এই রকম আর কি। তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে এই দুইটা বিষয় এড়িয়ে চলাই অধিকতর ভালো। লেখার মত দুনিয়ায় কত বিষয় আছে ভাই। তবুও এই দুইটাই যদি আপনাকে বেশি পীড়িত করে, তাহলে অবশ্যই ডিরেক্ট ম্যাথডে লিখবেন না। নানা ছলনার আশ্রয় নিবেন। এতে মূল কাজটাও হয়ে গেল, আপনিও টার্গেট হলেন না।
যা করুন, আর নিজেকে অবহেলা করবেন না। আপনাকে ক্লাসিক লেখক হতে হবে এই দিব্বি কে দিছে। আপনি একজন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিশেবে আপনার মতামত প্রকাশ করবেন দুই মলাটের মধ্যে। এবং, সেটা খুব ভাল ভাবে সম্পন্ন করার যথেষ্ট যোগ্যতা আপনার রয়েছে। জাস্ট শুরু করে দিন।”
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Sep 29, 2022 | দর্শন, লাইফ স্টাইল
মারা খাওয়ার দর্শন:
এই যুগে সবাই কমবেশি চালাক ও স্বার্থপর। নিজেকে নিজে যতোই বলি না কেন , আমি সহজ সরল, কারো ক্ষতিবৃদ্ধি করি না ; কিন্তু একেবারে ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির তো আর কেউ নই। কেউ কেউ আছে যারা অতিচালাক ও অতিস্বার্থপর। তাদের নিয়েই কিছু কথা। আমরা যারা কম চালাক ও কম স্বার্থপর, তারা সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নানা রকম মারা খাই। মূলত: যারা বেশি চালাক ও অতিস্বার্থপর তাদের কাছ থেকেই খাই। খেয়েই ব্যথায় কাতরাই, সবাইকে দুঃখের কথা বলি, মনের দুঃখে বনে যাই অবস্থা।
কিন্তু যারা এক্সট্রিম শ্রেণির, তাদেরকে দেখে মনে হবে, কীভাবে কী দারুণভাবে তাদের জীবন ও সংসার চলে যাচ্ছে। একেবারে মসৃণভাবে। অথচ , আমরা প্রতিপদে হোঁচট খাচ্ছি, কেউ ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ সবার আগে কেড়ে নিচ্ছে, সবার আগে বিলাসব্যাসনে তৃপ্ত হচ্ছে, পৃথিবীর সামাজিক প্যারামিটারে যোগ্যতার অনেক বেশি অলৌকিকভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছে, এবং এদের ধাক্কার চোটে আর অতিস্বার্থপরতায় আমরা কতিপয় আমজনতা মুষড়ে পড়ছি।
প্রশ্ন হচ্ছে তারাও কি মারা খায় না।
খায়। অবশ্যই খায়।
তবে সেটা কোনভাবেই তারা প্রকাশ্যে আনে না। কিল খেয়ে কিল হজম করে। শুধু বিজয়ী চেহারাটা দেখায়।
জীবনের মারা আপনাকে খেতেই হবে, কম আর বেশি।
আপনি হা হুতাশ করলে লোকে জানবে। চেপে গেলে কেউ জানবে না।
আমি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে ধার্মিক ও দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা থেকে অতিস্বার্থপরদের মারা খাওয়া খুঁজে পাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা দেখেছি কম স্বার্থপরদের ভিতরে। এটা মূলত সান্ত্বনা পাওয়ার চরম প্রয়োজনেই। আপনি মারা খেলেন, আরেকজন আজীবন মারা দিয়ে গেল, কিন্তু কোনভাবেই খেল না, সেটা তো মেনে নেওয়া কঠিন। এতো মনকষ্টে তো হৃদরোগে ভুগে অকালমৃত্যু হবে। তাই, চালাক-স্বার্থপরদের মারা খাওয়া খুঁজে পাওয়ার আনন্দ অসীম ও বেদনার ক্ষতে প্রলেপের মতো।
সুতরাং আপনি চোখকান খোলা রাখেন বা নাই রাখেন, আপনার চোখে পড়ুক বা নাই পড়ুক- অতিচালাক ও অতিস্বার্থপররা নানাভাবে মারা খাচ্ছে। কিন্তু তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য সেটার কিয়দংশও প্রকাশ্যে আসছে না।
প্রকাশকালঃ ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২২
by Jahid | Apr 26, 2022 | দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি
আশির দশকের দৈনিক পত্রিকায় সরকারী-বেসরকারি নিউজের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহের লিড নিউজ কী হতো, কারো মনে আছে?
আমার মনে আছে। হয় আরিচা মহাসড়কের বা অন্যকোন মহাসড়কের দুর্ঘটনার ছবি, সারিবদ্ধ লাশ , নীচে ক্যাপশন “এভাবে আর কতোদিন?” অথবা, লঞ্চ দুর্ঘটনায় অর্ধশত নিহত, শতাধিক নিখোঁজ।
তো আমি তখন স্কুলের পোলাপান, থান্ডার ক্যাটস বা টম অ্যান্ড জেরি নিয়ে ব্যস্ত। কোথায় লঞ্চডুবি হইলো ,কতোজন মারা গেল আমাকে অতোখানি স্পর্শ করতো না। বড়োজোর ফেলে রাখা সারি সারি লাশের ছবি দেখে একটু মন খারাপ হতো।
৮৭ তে আমার বড়মামা আর নানী লঞ্চডুবিতে পড়লেন। দিনের বেলা হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা কম। মোবাইলের যুগও নয়। বড়মামা ও নানী সঙ্গের মালপত্তর হারিয়ে কীভাবে যেন জানে বেঁচে গেলেন। আশে পাশের অনেক মাছ ধরা নৌকা অনেক যাত্রীর জীবন বাঁচায় সেবার। বড়মামা কারো সাহায্য করা একটা পুরনো ছেঁড়া লুঙ্গি আর নানী এক-কাপড়ে যখন ঢাকায় এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তখন আমি বুঝলাম লঞ্চডুবির ভয়াবহতা। মামা ও নানীর মুখে শোনা, লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগের প্রত্যেকটা মুহূর্ত কী যে ভয়ংকর আতংকের ছিল, এখন মনে পড়ে যাচ্ছে।
ভারতের বদান্যতায় নদীতে নাব্যতার অভাবে লঞ্চ নির্ভরতা অনেক কমে গেছে মনে হয়। যা দেখছি, আগের মতো মাসে ৭/৮টা লঞ্চডুবির কথা শুনতে হয় না। লঞ্চ দুর্ঘটনা এখন আরে লিড নিউজে নাই।
আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটলো আমার নিজের জীবনে। ২০০৫ এ বাস অ্যাকসিডেন্টে বিছানায়, ফিমার ছুটে গেছে টিবিউলার থেকে, মানে হিপ বা কোমরের সাথে ডান পায়ের জয়েনিং ফর্দাফাঁই । ট্রাকশন নিয়ে চিৎ হয়ে তিনমাসের অসহনীয় দিনগুলো , মাঝে আবার কোরবানির ঈদ গেল, হাসপাতালের বেডে শুয়ে অকথ্য যন্ত্রণা , অসহায় আক্রোশের প্রতিটা মুহূর্ত। ওই সময় আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। বিছানায় শুয়ে শুয়েই প্রথম কন্যার জন্মসংবাদ শুনতে হলো। কী জানি কী মনে করে ,ঈদে গ্রামমুখী মানুষের সড়ক দুর্ঘটনার নিউজগুলো মন দিয়ে শুনতাম। শুয়ে শুয়ে একটা ডাটাও বের করলাম। ২০০৬ এর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শুধুমাত্র টিভি নিউজে মোটামুটি শ দেড়েক বড় সড়ক দুর্ঘটনার নিউজ শুনলাম। মোটামুটি ১৫০ জনের অকালপ্রয়াণ আর হাজার খানেকের পঙ্গুত্ব।
আমি নিজে পা ভেঙ্গে পড়েছিলাম বলেই হয়তো এইগুলো মন দিয়ে দেখতাম। আর কতিপয় অসাবধানী শুয়োরের বাচ্চা ড্রাইভারের জন্য পঙ্গুত্ব বরন করা লোকগুলোর কথা চিন্তা করতাম। আমার ডাক্তার ছিলেন ডাঃ রুহুল হক ( বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রী)। কিন্তু , কয় জনের সাধ্য আছে, তাঁকে দিয়ে চিকিৎসা করানোর? পঙ্গুত্বতো এক অর্থে মৃত্যুর চেয়ে অকল্পনীয় যন্ত্রণার !মনুষ্যজীবনে অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অসম্মানের আর কী থাকতে পারে ?
আমার আশে পাশের অনেককে দেখেছি হাজার তিনেক টাকা দিয়ে দু নাম্বার ড্রাইভিং লাইসেন্স জোগাড় করতে। কেন জানিনা আমার জিদ চেপে গিয়েছিল আমি দু নম্বরি কোনকিছু করবো না। সুস্থ হয়ে আমি নিজে ড্রাইভিং শিখলাম এবং মাত্র ১৮০০ টাকা কুল্লে খরচ করে পর্যায়ক্রমে ৪/৫ দিন বিআরটিসি তে লিখিত, মৌখিক, ব্যাবহারিক দিয়ে ওরিজিনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিলাম। এইটুকু বুঝলাম যে একজন অপ্রশিক্ষিত ড্রাইভার কতজনের সারাজীবনের দুর্দশার কারণ হতে পারে।
দুইটা ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা, আমাকে সচেতন করেছে মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্দশার কথা ভেবে দেখতে। আজ যারা রাজনীতিবিদ, দেশের মাথা , তাদের জন্য দোয়া করি তাঁদের নিকটাত্মীয় বা প্রিয়জনের এই অভিজ্ঞতা হোক। একজন প্রিয় মানুষের প্রস্থানে যদি ইলিয়াস কাঞ্চন, তারানা হালিমের মতো তারকা আজ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সোচ্চার হতে পারেন । আমি প্রার্থনা করি, মন্ত্রী বা রাজনীতিবিদদের প্রিয়জন অকালে বিল্ডিং চাপা পড়ুক, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাক, পুড়ে মরুক কোন বদ্ধ কারখানায়।
কয়েকজন মানুষের বিদায়ে যদি সারা বাংলাদেশে কিছু পজিটিভ পরিবর্তন হয়, আমি সেই প্রার্থনা করতেই পারি ! আপনারাও প্রার্থনা করেন , হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে করেন !
প্রথম প্রকাশঃ ২৬শে এপ্রিল ২০১৩
by Jahid | Apr 8, 2022 | ছিন্নপত্র, দর্শন
স্মৃতি ২০০৫ :
২০০৫-এর ডিসেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙ্গে হাসপাতালে। ডান হিপ জয়েন্টের ফিমার-অ্যাসিটাবুলাম গেছে ছুটে ! ভীষণ ব্যস্ত এই আমি আকস্মিক বিছানায়। দুর্বিষহ শারীরিক কষ্টের কথা বাদই দিলাম। বুড়ো হাড় ভাঙ্গলে জোড়া লাগানো যে কী কষ্টের, সে আর কহতব্য নহে !
কিন্তু, শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মানসিক যন্ত্রণাটা ছিল অসহনীয়।
প্রথম যে প্রশ্নটা মনে পীড়া দেওয়া শুরু করলো , ‘হোয়াই মি ? আমিই কেন? ’
প্রাথমিক এক সপ্তাহ ধর্মপ্রাণ আম্মাকে বলে চললাম , ‘এটা কেমন বিচার, আমার আশেপাশের কুৎসিত ও অর্থ-লোলুপ পশুসুলভ লোকগুলো দিব্যি হেঁটে চলে ফিরে খাচ্ছে আর আমি কোমর ভেঙ্গে হাসপাতালে? এটা কেমন বিচার?’
আম্মা নানারকম সান্ত্বনার কথা বলতেন। বলতেন, ‘আল্লাহ্ ভালো মানুষের পরীক্ষা নেয় দুনিয়াতে। পাপ কাটা যাচ্ছে।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু নিজেকে নিজে কোন সান্ত্বনা দিতে পারতাম না।
কেমন করে ভুলি, আমি ও আমার স্ত্রী তখন অপেক্ষা করছি আমাদের প্রথম আরধ্য সন্তানের জন্য! অনাগত সেই মুখ দেখবো, স্ত্রীর পাশে হাসপাতালে থাকবো ; সেই কবে থেকে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলাম। সেখানে আমি আমার অনাগত সন্তানের সেবা করবো কি, আমার সহধর্মিণীই তাঁর ওই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে আমার সেবা করে যাচ্ছেন। একটা কথা মাঝে মাঝে শুনতাম , সংসার এমন যে, প্রয়োজনে তোমাকে তোমার অর্ধাঙ্গী বা অর্ধাঙ্গিনীর মল-মূত্রও পরিষ্কার করতে হয়। এটা স্যাক্রিফাইস আর অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপার। সেটা যে, প্র্যাকটিকালি নিজের জীবনে দেখতে হবে, কে জানতো ! আমিতো আমার স্ত্রীর জন্য সামান্য হিন্দীকেশ ছিঁড়েও আঁটি বাঁধি নাই কোনদিন। আজ তাঁকেই কিনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে আমার মল-মূত্র ! দুর্বোধ্য , নিষ্ফল এক আক্রোশে ফুঁসতাম শুধু !
আমার চিকিৎসক বন্ধুরা, শুভানুধ্যায়ীরা একে একে সাহস দিতে লাগলেন। ডাক্তাররা বোঝালেন আমার ভগ্নদশা মেরামত ও নিরাময়যোগ্য এবং আমি আবার আগের মতো হাঁটতে চলতে পারবো। আমার অফিসও সেই সময় অসম্ভব সহানুভূতি দেখালো। বিছানার পাশে বসে সাহস দেয়া সেই সব মুহূর্তগুলোর কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না।
এক চিত হয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। পাশ ফিরতেও পারতাম না। ডান হাঁটুর নীচে হাড় ছিদ্র করে একটা লোহার রডে লাগানো হয়েছিল, সেই রডের সাথে ১৪ পাউন্ড লোহার ওজন ঝুলত। ওই বস্তুকে বলে ট্রাকশন ! দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ গোসল নাই, মল-মূত্র বিছানায়। কী যে অসহনীয় সেইদিনগুলো ; আমি এখনও ভাবলে শিউরে উঠি।
নানা ধরণের বই পড়তাম শুয়ে শুয়ে। সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাসমগ্র পড়ে ফেললাম। এবং তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তও হয়ে গেলাম। প্রায় ৭/৮ সপ্তাহ পরে ক্র্যাচে করে আবার নতুন করে হাঁটতে শেখা। এর মাঝে আমার মেয়ে জেবার জন্ম ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০০৬ । বুকের ওপর আম্মা ফুটফুটে একটা মনুষ্যশিশুকে শুইয়ে দিলেন। বসতেও পারিনা। ওভাবেই শুকনো চোখে আমার নীরব অশ্রুপাত।
আমেরিকান এক টেনিস খেলোয়াড় আর্থার অ্যাশ-এর একটা কথায় আমার প্রশ্নের আংশিক উত্তর পেয়েছিলাম। অন্তত আমাকে ওই বিশেষ কথাগুলো ‘হোয়াই মি? কেন আমিই ?’ এই প্রশ্নের ক্ষতে, তখনকার মতো কিছুটা হলেও একটা সান্ত্বনার প্রলেপ পড়েছিল।
আর্থার অ্যাশ ছিলেন আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম কালো খেলোয়াড় যিনি একাধারে ইউএস ওপেন, অস্ট্রেলিয়া ওপেন এবং উইম্বলডন জিতেছিলেন। আমেরিকার টেনিস ইতিহাসের কিংবদন্তি। ১৯৮৩ সালে তাঁর হৃদপিণ্ডে সার্জারি করার সময় রক্ত-বাহিত হয়ে এইডস (AIDS) আক্রান্ত হন তিনি। সারা আমেরিকা থেকে তাঁর ভক্তরা তাঁকে শুভেচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটিও ছুঁড়ে দিতেন, ‘আপনাকেই কেন এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হলো?’
তিনি বোধকরি নিজেকেও এই প্রশ্নই করেছিলেন, ‘হোয়াই মি? কেন আমিই ?’
এক পর্যায়ে এসে আর্থার অ্যাশ নিজেকে প্রবোধ দিলেন। উনি নিজেকে বোঝালেন ৩২ কোটি আমেরিকানদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া কয়েক কোটি কালোদের মধ্যে সৌভাগ্যবান তিনি একজন। ৫ লক্ষ প্রফেশনাল খেলোয়াড়দের তিনি একজন তিনি একজন। গ্র্যান্ড স্লামে পৌঁছানো শেষ পাঁচ হাজারের তিনি একজন। যে ৫০ জন উইম্বলডন পর্যন্ত গেছেন, তিনি তাদের একজন, সেমিফাইনালে শেষের চারজনের তিনি একজন এবং ফাইনাল খেলার দুইজনের একজন।
কাপ জেতার পরে বা জীবনের অন্যান্য অগুনিত সৌভাগ্যের ক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন একবারও ওঠেনি , ‘হোয়াই মি ? আমিই কেন?’
আর আজ যখন একটা অসুস্থতা তখন কেন এই প্রশ্ন?
আর্থার অ্যাশের এই অভিজ্ঞতা পড়ার পর আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পেরেছিলাম, কিছুটা হলেও !
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৩
by Jahid | Apr 2, 2022 | দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি
আমার গার্মেন্টস চাকরীর প্রথমদিকে। ক্লিনটন সাহেব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
মনিকা লিউন্সকির ওরালসেক্স নিয়া রীতিমত ইম্পিচমেন্টের অবস্থায় ক্লিনটন।
আমেরিকান এক ক্রেতা বন্ধুকে বললাম, ‘তোমাদের চেয়ে ভণ্ড জাতি দুনিয়াতে আরেকটা নাই।’
সে বলল, ‘কেন ?’
‘তোমরা ফ্রি সেক্সের দেশে গে ,লেসবিয়ান, অ্যানিম্যাল , ওরাল, অ্যানাল কিছুই বাদ দেও না। আর বেচারা ক্লিনটন সামান্য এক ওরালসেক্স কেসে চাকরিটা হারায় হারায় !’
উল্লেখ্য, তখন আমার এই ইয়ং ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্টকে বেশ ভালো লাগতো। যুদ্ধবাজ বুশের জায়গায় সে আসাতে আমাদের প্রজন্ম খুশিই ছিলাম।
আমেরিকান বন্ধু বলল, ‘ তোমাকে একটু বুঝিয়ে বলি। আমার ধারনা তুমি ব্যাপারটা বুঝবে।’
‘শোন জাহিদ, ধরো তুমি ব্যক্তিজীবনে উচ্ছৃঙ্খল, অনাচারী, বহুগামী, লম্পট , মাতাল অনেক কিছুই হতে পারো। তোমার পথের পথিক যারা, আশপাশের সবাইকে তুমি অবলীলায় মেনেও নিতে পারো।
কিন্তু, ধরো তোমার বাবা যিনি তোমার শ্রদ্ধার জায়গায়, তিনি যদি প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তোমার সামনে লম্পটগিরি করে, পারবে মেনে নিতে ? আমরা আমেরিকানরা নিজেরা যতোই ভণ্ডামি যতই করি না কেন , প্রেসিডেন্টকে আমরা পিতার মতো দেখি। তাঁর সামান্য স্খলনও আমরা মেনে নিতে পারি না। ’
আমি আমার উত্তর পেয়ে গেলাম।
প্রথম প্রকাশঃ ২রা এপ্রিল ২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য