আমার নৈরাশ্য , আমার আশাবাদ।

আশাবাদী হওয়ার জন্য, পড়াশোনায় সাফল্যের জন্য কীভাবে কীভাবে যেন সেই ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত নানা রকম ‘ডেল কার্নেগী’ টাইপ বই পুস্তক পড়েছি। আমাদের শৈশবের পুরো সময়টা স্বৈরাচার এরশাদের যুগ ছিল। ৯০ সালে আমরা যখন কলেজের প্রথম বর্ষের শেষদিকে , স্বৈরাচারের পতন ঘটলো ডিসেম্বরে। সারাক্ষণ একটা দমবন্ধ হওয়া পরিবেশে উপায়হীন, নির্জীব, হতাশ একটা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। ব্যক্তি পর্যায়ে মানবিক আশাবাদ অনেক বেশী অপ্রতুল ছিল।

মেধাবী ছোটমামা কিংবা আমাদের স্কুলের সেরা ছাত্রটিকে দেখে আমাদের আশায় বুক বাঁধতে হতো। ওই কারণেই হয়তো উজ্জীবিত হওয়ার মতো যে কোন প্রবন্ধ, যে কোন বই যেখানেই পেয়েছি – উল্টে পাল্টে দেখেছি। মনে হয়েছে , আসলে পশ্চিমা জীবনদর্শন আর প্রাচ্যের জীবনদর্শন অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। স্বামী বিবেকানন্দ বা ঠাকুর রামকৃষ্ণের মোটিভেশন আর ডেল কার্নেগীর মোটিভেশন দুই রকম পরিবেশ থেকে উদ্ভূত । পশ্চিমের মোটিভেশন পশ্চিমা জনগণের জন্য যতোখানি উপাদেয়; তা প্রাচ্যের জন্য সহজপাচ্য নাও হতে পারে !

নানা রকমের মোটিভেশনের বই, পজিটিভিজমের বই পড়েছি। কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝি নি। নিজের অবস্থান মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। নিজেকে নতুন করে খুঁজে ফিরেছি ; আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। এতো কিছুর পরও আমি নিত্য-নতুনভাবে ব্যর্থ হয়েছি । আবার উঠে দাঁড়িয়ে উপায় খুঁজেছি –কী করে আশাবাদী হওয়া যায় !
জীবনের এই পর্যায়ে এসেও আমি অবিরাম যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং আমি নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠি । একই সঙ্গে পরিপার্শ্বের সবাইকে আশাবাদী করে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা করি।

আমি জানি আমার চারপাশের সিংহভাগ সুস্থ মেধাবী মানুষ নৈরাশ্যের কথা বলার জন্য মুখিয়ে আছেন।‘ হচ্ছে না, হবে না, গেল গেল সব গেল, কী লাভ, ধ্যাত!’—ইত্যাদি বলার জন্য। আমি তাই সংখ্যালঘু হয়ে আশাবাদের কথা বলে যেতে চাই আজীবন।

এই জীবনে অপ্রত্যাশিত আঘাতে আমাকে অনেকবার পর্যদুস্ত হতে হয়েছে। কিন্তু আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেছি, মাটিতে মিশে যাই নি। আমি জানি, নিজের মূল্যবোধ নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গভীর আনন্দ আছে। সাময়িকভাবে হতাশ হয়েছি, মনে হয়েছে, পরাজিত হয়ে যাচ্ছি নাতো ? কিন্তু আবার আমি উঠে দাঁড়িয়েছি ! আমাকে যে দাঁড়াতেই হবে! কাছের কেউ চরম দুঃসময়েও যদি জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছেন?’ উত্তর দিই—‘ভালো আছি, ভালো থাকতেই হয়, ভালো থাকতে হচ্ছে। হ্যাঁ আমি ভালো থাকি। আমাকে ভালো থাকতে হয়, ভালো না থেকে লাভ কি?’ এই না চাইতেই পাওয়া অসাধারণ মানবজীবনের পুরোটাই তো লাভ, পুরোটাই প্রাপ্তি ! এখানে লস কোথায় ?

অনেকসময় বিভ্রান্ত বোধ করেছি– চারপাশের খুব আশাবাদী হাসি খুশী কেউ কেউ এতো ব্যর্থ কেন হচ্ছে তা ভেবে ! উল্টোটাও ঘটতে দেখেছি অহরহ ; আপাত: দৃষ্টিতে কাউকে কাউকে চরম নৈরাশ্যবাদী বলে মনে হয়েছে , কিন্তু বস্তুগত-ভাবে তাঁরা দারুণ সফল। কীভাবে এতো সাফল্য পাচ্ছেন সেটা বোঝা মুশকিল !

অবশ্য যদি সাফল্যে পরিমাপের মাপকাঠি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিবেচনায় হয়–তবে আমার চারপাশে অসংখ্য উদাহরণ আছে, যারা সামনা সামনি ভয়ংকর নৈরাশ্যবাদী, অথচ আর্থিকভাবে সফল। পরে মনে হয়েছে, আশাবাদের সাথে সাফল্যের একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে অবশ্যই ; তাই বলে আশাবাদী মনুষ্যমাত্রই আর্থিকভাবে সফল হবে সেটা বোধহয় অনেকাংশে সুনিশ্চিত বা আকাঙ্ক্ষিত নয়। আমি আশাবাদী মানুষ বলতে হাল ছেড়ে না দেওয়া, উন্নত , উদার, সৌরভময়, উচ্চকিত মানুষ বুঝি। ঘরোয়া আড্ডায় সায়ীদ স্যারের বলা একটা কথা বিশ্বাস করি, নৈরাশ্যের ইট দিয়ে দিয়ে বর্তমান সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। সভ্যতার ইমারত গড়ে উঠেছে আশাবাদে। কোটি কোটি নৈরাশ্যবাদী লোকের মাঝে গুটি কয়েক আশাবাদী মানুষ সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন।

অন্যদের কথা জানি না ; আমার ক্ষেত্রে , আশাবাদ আমাকে সুস্থ রাখে । নৈরাশ্য আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকল করে দেয় , আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমি আমার জীবনের গভীর গোপন অসুখে পতিত হতে চাই না। নৈরাশ্যে আমি নুইয়ে পড়ি, তলিয়ে যাই, জীবন অর্থহীন মনে হয়। আমাকে টেনে তোলে ওই আশাবাদই। আমি সবসময় চারপাশের আলোকোজ্জ্বল জীবনের স্পর্শ পেতে চাই। জানি ওইটাই বেঁচে থাকা। নুইয়ে পড়ে, তলিয়ে গিয়ে অর্ধমৃত হয়ে থাকা অর্থহীন ! আমি জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। তাই, আমাকে আশাবাদ বাঁচতে শেখায় ; আরো বেশী করে, আরো ব্যাপকভাবে।

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬

তথাগত, আপনাকে। সুবোধ সরকার।।

তোমাকে যদি কেউ আশ্বিনের সকালে জুতো মারে
তুমি কী করবে ,তথাগত?
তথাগত বললেন, অঘ্রাণের নিয়মে জুতোর ক্ষয় হবে
আমারও প্রতিহিংসার ইচ্ছা কমে আসবে ফাল্গুনে।
কিন্তু যে আমাকে জুতো মেরেছিল
সেই জুতোর পেরেক গত তিন হাজার বছর তাকে
খুঁচিয়ে চলেছে
‘ আবার আশ্বিন এসে গেল , জুতো ছুড়বে না ?’

কেউ যদি তোমার মুখ থেকে খাবার কেড়ে নেয়
তুমি কী করবে, তথাগত?
তথাগত বললেন,
যার খাবার আছে সে খাবার কেড়ে নিতে আসে না
যার নেই তাকে খেতে দাও ।
যদি খেতে না দাও
এরপর কিন্তু যাদের খাবার আছে তারা একটা দল হয়ে যাবে
যাদের খাবার নেই তারা একটা দল হবে
এদের একটা গৃহযুদ্ধ হবে।
তবে কী জানো , যাদের হাতে খাবার আছে তারাই জিতবে।

যদি কোন বেশ্যা এসে বলে, তুমি আমার শ্লীলতাহানি করেছ
তুমি কী করবে , তথাগত ?
তথাগত বললেন,
আমি বেশ্যার মাইনে বাড়িয়ে দিতে পারি ,
অট্টালিকা বানিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তাকে পিঠে লিখতে হবে
‘ আমি পৃথিবীর প্রথম জীবিকা
মানুষ, আমাকে ভয় করো, শ্রদ্ধা করো , বিনাশ করো।’
তথাগত বললেন
কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি।

তোমাকে যদি দুষ্কৃতীরা অপহরণ করে নিয়ে যায়
কথা বলতে না দেয়
তুমি কী করবে , তথাগত ?
তথাগত বললেন,
কথা বলতে না দিলে বেঁচে গেলাম, কথা বলব না
এতদিন কথা বলেই বা কী হল
কিন্তু কথা বলতে দিলে আমি বলব
আমাকে কথা বলতে দিন।

তোমার সামনে ওরা যদি কোন কিশোরকে
রাস্তায় ফেলে মারে
তুমি কী করবে , তথাগত ?
আমিও ওদের সঙ্গে হাত লাগাব , আমিও দু’-এক ঘা দেব
তারপর বলব , এবার ছেড়ে দাও , এবার
ছেলেটা বাঁচুক
তোমারও বাঁচো । যে মারছে আর যে মার খাচ্ছে
দু’জনকেই বাঁচতে হবে।

যদি ওরা এসে বলে, সুজাতাকে আপনি লুকিয়ে রেখেছেন
ওকে ছেড়ে দিন আমাদের হাতে
তুমি কী করবে , তথাগত ?
তথাগত বললেন, আমি মেয়েটিকে ভালবাসি
আমি ওকে পরমান্ন বলে ডাকি
আমি কী করে ওকে ঘর থেকে বের করে দেব ?
তাহলে আমার প্রশ্নের জবাব দাও
তোমাদের মধ্যে কেউ আছে যে মেয়েটিকে ভালোবাসে ?
গলাতে চোলাই ঢেলে একজন এগিয়ে এল,
আমি ওকে ভালবাসি
দ্বিতীয়জন এগিয়ে এল, আবে ফোট, আমি ওকে ভালবাসি ।
তথাগত বললেন,
তিন হাজার বছর ধরে দেখে আসছি
তোমারা লড়াই করতে জানো
ভালবাসতে জানো না ।

একটা মেয়ে কি দু’জন পুরুষকে একই সঙ্গে ভালবাসতে পারে
তোমার কী মত, তথাগত ?
তথাগত বললেন,
এতে ধাতু দুর্বল হয়, ধানের ক্ষতি হয়
কিন্তু একেই তো বলে দু’পায়ে দাঁড়ানো।

একজন পুরুষ কি পারে এক সঙ্গে দু’টি মেয়েকে ভালবাসতে ?
তোমার কী মত, তথাগত ?
তথাগত বললেন,
পুরুষ একসঙ্গে বহু মেয়েকে ভালবাসে
কিন্তু যাকে সত্যি সত্যি ভালবাসে,
যার জন্য ছটফট করে, ঘুমোতে পারে না
সেই মেয়ে তাকে ভালবাসে না ।

রাজা কি তার ক্ষমতার জোরে একজনকে ধাক্কা দিয়ে
ফেলে দিতে পারে ?
তথাগত , তোমার কী মত ?
তথাগত বললেন,
যে ধাক্কা মারে তার জোর আছে
যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় না তার জোর আরও বেশি,
দু’জনেই দু’টি জলবিন্দু কচুর পাতার ওপর
হাওয়া কোন দিক থেকে আসে তার উপর নির্ভর করছে কচুর পাতা,
ক্ষমতার বিন্যাস।
১০
যৌনসঙ্গম ছাড়া কি বড় কোন আনন্দ পৃথিবীতে নেই
তথাগত বললেন, নেই ।
যুদ্ধের মাঠে রাত্রিবেলা
সেনাপতি এবং সেনাপতির ছেলে
একই জিপসি মেয়ের ঘরে এলেন, আলাদা আলাদা ।
তথাগত বললেন,
কিন্তু একটা কথা আছে
ওই সেনাপতি যেদিন অন্ধ হয়ে হাতে লাঠি নিয়ে রাস্তা পার হবে
তাকে প্রশ্ন করুন, সে বলবে
রাস্তা পার হওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ পৃথিবীতে নেই।
১১
শত্রুকে সম্মান করা উচিত ?
তোমার কী মত , তথাগত ?
তথাগত বললেন,
যে তোমাকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছে
সে নিজে যতক্ষণ শেষ না হচ্ছে ততক্ষণ তাকে
সম্মান করো।
এমনকী শত্রুর ডেডবডি যদি পড়ে থাকে রাস্তায়
তাকে সম্মান করে তুলে আনো ছায়ায়
তাকে স্নান করাও।
পারলে লুকিয়ে চোখের জল ফেলে আসো বাথরুমে ।
তথাগত বললেন,
সে তোমার শত্রু হতে পারে
কিন্তু মানুষের কাছে তার একটা পাওনা ছিল ।
সেটা তুমি দেবে না ?

খিদে। সুবোধ সরকার।।

মানুষর পেটে দু’রকম খিদে থাকে
একটা দিনের বেলার, একটা রাতের বেলার
একটা পেটের একটু উপরে, একটা একটু নীচে
খিদে পেলে গোলাপ খাওয়া যায় না
এত দাঁত আমাদের, একটা শক্ত কিছু চাই।
দিনের বেলা খিদে যখন মাথায় ওঠে
তখন বাপ মা ঠিক থাকে না
যাদের কখনও খিদে পায় না তারা ঠিক বুঝতে পারবে না।
তিনদিন বাদে একটা লোক একথালা ভাত পেয়েছে , খেতে দিন।
আপনারা যারা খেতে পান
আপনারা যারা খেতে পান না , তাদের একটাই পার্থক্য
একজন দেয়াল টপকে গোলাপ বাগানে ঢোকে মেয়েলোকের জন্য
একজন দেয়াল ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে দুটো ভাতের জন্য
নক্ষত্রখচিত আকাশ গরিবের জন্য নয়, তার
দিনের বেলা খিদে রাতের বেলার খিদে একাকার হয়ে গেছে
তার একটাই চিন্তা পরের দিন ছেলেমেয়েদের সে কী খেতে দেবে?

ডিম। সুবোধ সরকার।।

প্রথম ডাক্তার বললেনঃ ‘ আপনার বেবি তা হলে ন’মাসে পড়ল
ডিম সেদ্ধ করে হলুদ কুসুম খেতে দেবেন।’
দ্বিতীয় ডাক্তার ভালো করে ওজন নিয়ে শান্ত স্বরে বললেনঃ
‘ডিমের যে অংশটা সাদা ,প্রতিদিন দু’চামচ করে খাওয়াবেন।’
প্রথম ডাক্তার বললেনঃ
‘ডিম সেদ্ধ করার নিয়ম আছে, গরম এক বাটি জলে
ডিমটা ছেড়ে দিয়ে তুলে নেবেন।’
দ্বিতীয় ডাক্তার বললেনঃ
‘ডিম সেদ্ধ করার নিয়ম আছে
দশ মিনিট ভাল করে ফোটাবেন।’
হামাগুড়ি দিয়ে উলটোদিক থেকে ছুটে আসা
আমার ন’মাসের পুত্রের দিকে
অসহায় তাকিয়েছিলাম,
সে আমাদের ভাষা বুঝতে শেখেনি, তবু বললামঃ
ডিম সম্পর্কে মানবসভ্যতায় এখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি
কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে হল বাক্যটা ভুল
ডিম নয়, ডাক্তার সম্পর্কে মানবসভ্যতায় এখনও সঠিক সিদ্ধান্ত
আমরা নিতে পারিনি।

স্বামীরা কীরকম হবে। সুবোধ সরকার।।

যেতে পারে
অন্য মেয়ের কাছে, তবে রাত আটটার মধ্যে
তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
খেতে পারে
তবে বেশী নয়, বড় জোর তিন পেগ, কিন্তু পা যেন
ঠিক থাকে টেবিলের তলায়।
দেবতা টেবতা নয়
স্বামী হবে পাইন গাছের মতো ঋজু , বলবান
অনেক অনেক টাকা, কিন্তু টাকার ওপর
কোন লোভ থাকবে না।
আমি ভাবছিলাম অন্য কথা
কেরোসিন লাইনে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
হাফপ্যান্ট পরা পুলিশের হাতে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
কাদাজল মেখে হাতে জুতো নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
তারা কীরকম হবে?
তারা কিন্তু রাত্রে নিদ্রিত স্ত্রীর পাশে শুয়ে
স্বপ্ন দেখে ডানা কাঁটা পরি
হারে-রেরে-রেরে
তারাভরা অঘ্রান নিশীথে
সিংহের পিঠে বসে তাঁরা শহরে ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে।