by Jahid | Nov 27, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন, সমাজ ও রাজনীতি
আমাদের কিংবদন্তী অর্থনীতিবিদদের কাছে ‘চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হও!’ ‘ সামাজিক ব্যবসা’ ইত্যাদি শুনে শুনে আমার মতো কুলি মজুরদেরও মাঝে সাঁঝে জানতে ইচ্ছে করে, এতো বড় একটা প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কি করছে ! তাঁদের মৌলিক বাধা কি কি ; নবীন উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? আমাদের নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা কি ?
সম্ভবত: ২০০৭/৮ এর পর থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অধুনা কয়েকবছর যাবত তা দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই গ্যাসের লাইন নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের কি পরিমাণ ‘ স্পিড মানি’ খরচ হচ্ছে ; সেটা শুনলে অনেকের চোখ কপালে উঠবে ! বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, আমাদের জ্বালানী সংকট, রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি আমাদের বস্ত্রশিল্পকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে অন্যতম রপ্তানীমুখি শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা আসার পরিমাণ গেছে কমে । নতুন টেক্সটাইলে নতুন উদ্যোক্তাদের পদচারণ নেই বললেই চলে । যা হচ্ছে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ! কারো ৬ লাখ গজ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, সে এক ধাক্কায় ১২ লাখ গজ করে ফেলছে। কারো ৩০ লাইনের কারখানা ছিল, সে কয়েকবছরে ৬০ লাইন করে ফেলছে। অসম মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসংখ্য ছোট মাপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝারি মাপের গার্মেন্টসগুলোর মালিকানা বড় গ্রুপগুলোর কাছে চলে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর আরও বৃহদায়তন হচ্ছে।
দেড় যুগ আগে আমার কর্মজীবনের শুরুতে দেখেছি , গার্মেন্টস-এর মালিকদের প্রধান উৎপাদন নির্ভরতা ছিল , কাপড় উৎপাদন করা ও সেলাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ বা অন্যান্য খুচরা পণ্যের সরবরাহ ছিল পুরোটাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে। বোতাম, টুইল টেপ, লেবেল, সুতা, কার্টন, পলি ব্যাগ, স্ক্রিন প্রিন্ট , এমব্রয়ডারি যাবতীয় সরবরাহ ছিল ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনেক লোকের কর্মসংস্থান হত।এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানায় সব ধরণের সার্ভিস ও ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ ইউনিট খুলে বসে আছেন।
তাহলে ঐ ক্ষুদ্র- মাঝারি উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, পুরনোরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন । এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের নৌকার পাল না তুলে ‘ আরামদায়ক’ চাকরির বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন।
টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টর ছেড়ে অন্যদিকে আসি। স্কয়ার বা প্রাণ-আরএফএল এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণের স্বার্থে উদাহরণ হিসাবে ধরছি। স্কয়ার-এর ফার্মাসিউটিক্যালস দিয়ে ব্যবসা শুরু। পরে টেক্সটাইল, তারপরে ফুড ও বেভারেজ, কসমেটিক্স, টয়লেট্রিজ, হাসপাতাল সব। দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠতায় তাঁদের সকল পণ্য একটা ব্র্যান্ড লেবেল পেয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্যতা এমন পর্যায়ে গেছে, তাঁদের পণ্য চোখ বুজে ভোক্তারা কিনে থাকে। কিন্তু এমন অনেক পণ্য ছিল, যেগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে বেঁচে থাকত। সেগুলোও ধীরে ধীরে স্কয়ার দখল করে নিয়েছে। সামান্য ঝাল মুড়ি বা চীনাবাদামও যদি স্কয়ারের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে, তাহলে সাধারণ ভোক্তাদের কেউ কি আর চলতি ঝাল মুড়িওয়ালার কাছ থেকে কিনবে ?
ঐদিকে প্রাণ-আরএফএল এর মূল পণ্য সম্ভবত: ছিল, একদিকে তরল পানীয় অন্যদিকে হেভি-লাইট মেশিনারিজ, নলকূপ ইত্যাদি। এখন তাঁরা সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে শুরু করে সামান্য বালতি,বদনা পর্যন্ত উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। হাস্যকর হলেও সত্য, প্লাস্টিকের বদনা খুবই ছোট মাপের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে থাকতেন। যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্লাস্টিকের বদনা, বালতি তৈরি করত তাঁর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া এখন গত্যন্তর নেই । ব্র্যান্ড ইমেজে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক পিছিয়ে আছে। পেপার ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা বিজ্ঞাপনে সবকিছুই ব্র্যান্ডিং ও বিক্রি করা সম্ভব।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রচলিত পণ্য ছাড়াও ছোটখাটো সবরকম পণ্যের বাজার যেভাবে দখল করা শুরু করেছে; দেখে শুনে মনে হচ্ছে , সেই দিন আর বেশি দুরে নেই, কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাংলাদেশের তাবৎ পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকবেন। পুঁজি বাজার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা পকেটে পুরে ফেলেছেন আমাদের বড় উদ্যোক্তারা।
আবার ফিরে আসি আমাদের টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতে। কেন নতুন উদ্যোক্তাদের দেখা নেই ?কেন এঁরা নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহী হচ্ছেন না ?
প্রথমত: বড় উদ্যোক্তারা ছোটদের ডি-মার্কেটিং করছেন। বড় মাছ, পুকুরের সব ছোটমাছকে খেয়ে ফেলছে।
দ্বিতীয়ত: ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাদের আগের মতো সহায়তা করছে না। ব্যাংক নিরাপদ বিনিয়োগে বড় ঋণ-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে আবার নতুন করে ঋণ দিচ্ছে। আর আমাদের অসংখ্য মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না , তাঁদের চাকরি বাজার ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আদৌ সম্ভব কীনা, হলেও সেটা কীভাবে ! তৃতীয়ত: (এটি আমার ব্যক্তিগত মতও বটে)—ব্রিটিশ কেরানি-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদের অগুনতি কেরানী তৈরি করছে। শত শত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আমাদের বেশি দরকার – হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষা নির্ভর শিক্ষালয়। যেখানে, একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ,আমাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী করে ফেলছে। একটা চেয়ার ও টেবিলের বসার সুযোগের জন্য আমাদের সকল সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত ।
বাংলাদেশ সরকারের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু মাস্টার প্ল্যান হয়তো আছে। আমি জানি না । নানা ধরনের ফান্ড থাকে , এসএমই ( Small Medium Entrepreneur) ঋণ থাকে। সেটা কতখানি সঠিক জায়গায় পৌঁছায় , সে ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ অমূলক নয়। এবং প্রতিবছরে ওই ফান্ডের যথোপযুক্ত ব্যবহার হয় কিনা , সেটার কোন তথ্য কারো জানা নেই।
কিছুদিন আগে , বিশাল শিল্পকারখানার মালিক এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজেও চাইতেন, ছোট ছোট স্ক্রিন প্রিন্টিং কারখানা , লেবেল, পলি , টুইল টেপ, বাটন , কার্টন ফ্যাক্টরি ফ্যাক্টরি চালু থাক। কিছু লোকজন উদ্যোক্তা হোক। মুশকিল হচ্ছে, তাঁর অভিজ্ঞতা এই ব্যাপারে খুবই তিক্ত ! তিনি হয়তো ভালো মানের সুতা দিয়েছেন তাঁর টুইল টেপ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু , ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অতি লোভে , মাঝপথেই গাড়ীসহ সেই ভালো মানের সুতা বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে, দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট খোলা বাজারের সুতা কিনে তাঁর টুইল টেপ বানিয়ে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় গুণগত মানে তাঁর গার্মেন্টস ফেল করেছে।
একই কথা অন্যসব বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য, এঁরা যে দামে কাজ ছোটদেরকে দেয়। তাঁরা যদি সঠিক উপাদান ব্যবহার করত তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু, কিছু অতিলোভী দ্রুত মুনাফা কামী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কৃতকর্মের দায় নিতে হচ্ছে অন্য সবাইকে। প্রায়শই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বড় প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলে দেয়। অনেকবার দেখেছি, সামান্য সুতা, বোতাম, কার্টন, টুইল টেপ, স্ক্রিন প্রিন্ট ফ্যাক্টরির গুণগত মানের সমস্যা অথবা সরবরাহে দেরী হওয়ার গার্মেন্টস মালিককে ডিসকাউন্ট ও এয়ার শিপমেন্টের জরিমানা গুনতে হয়েছে।
দ্রুত বড়লোক হওয়ার ও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পড়ে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় প্রতিষ্ঠানের ভরসা হারিয়েছেন। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানার অভ্যন্তরেই সব ছোট ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজ করে ফেলেছেন। কেননা, তাঁরা তাঁদের মিলিয়ন ডলারের শিপমেন্ট সামান্য কয়েক পয়সার অ্যাকসেসরিজের জন্য হুমকির মুখে ফেলতে চান না।
এই দুষ্টচক্র থেকে কীভাবে বের হওয়া সম্ভব , সেটা নিয়ে কী ধরণের গবেষণা হওয়া উচিৎ সেটা জানার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে আলোচনা।
প্রকাশকালঃ ১০ই মার্চ, ২০১৭
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার দুই কন্যা ( আট বছর আর দেড় বছর)।
বউ ক্ষান্তি দিছে ,আমিও দিছি, দ্বিতীয় সন্তানের জন্য বছর দুয়েক হাঁটুর চামড়া ছিইল্যা ধস্তাধস্তি করতে হইছে। আমি দুই কন্যারে নিয়া ব্যাপক খুশী। সুস্থ-সবল সন্তান আমার কাছে নিয়ামতের মতো। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।
আমার আম্মা মাঝে মাঝে তবু একটু গাঁইগুঁই করে, একটা ছেলে হইলে ভালো হয়। দুইডা মাইয়া, বিয়া হইয়া গেলে কি নিয়া থাকবি! মরলে খাটিয়া টানবো কেডা ?
বুঝি , কন্যা সন্তান, সে দারিদ্রসীমার নিচে হোক বা উচ্চবিত্তের ঘরে হোক, সে একটা বাড়তি দায়িত্ব বা বোঝার মতো আমাদের সমাজে বড় হইতে থাকে। সে সম্পদ না, সে দেনা– ঋণের বোঝা।
সেদিন, রবিবারে কাক-ডাকা ভোরে বউ কাঁচা বাজারে নিয়া গেল। পথে হাজারো বস্ত্রবালিকার টিফিন ক্যারিয়ার হাতে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কইলাম এরা আমার সতীর্থ, সহকর্মী। ( উল্লেখ্য, আমি গার্মেন্টসে কাজ করি।) কইলাম , চাইয়া দেখো , এঁরা এখন আর এদের পরিবারের বোঝা না। এঁরা ঋণাত্মক নয়, শূন্যও নয়, এঁরা আমাদের অর্থনীতির ধনাত্মক শক্তি। এঁরা এখন আয় করে,এঁরা পরিবারের ও দেশের সম্পদ।এঁরা মাথা উঁচু কইরা বাঁচা শিখছে; এঁরা বাংলাদেশটার চেহারা বদলাইয়া দিছে।
আমি নারীবাদ নারীদিবস বুঝি না, আমার পরিসংখ্যান জ্ঞান সেই রকম সীমিত। কিন্তু , আজ যে লাখো নারী ঘরের বাইরে এসে, ঘাম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে দেশটারে শত বৎসর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁদের স্যালুট।
প্রকাশকালঃ ৮ই মার্চ,২০১৩
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত।
নিতান্তই নিজের পরিবারের কারো গায়ে আঁচড় না লাগা পর্যন্ত আমি সবকিছু মেনে নিয়ে নিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। এবং আমার এই সুবিধাবাদী চরিত্র বদলাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
পরিবহন শ্রমিকদের অযৌক্তিক ধর্মঘটের ব্যাপারটা আমাকে বিপর্যস্ত করতে পারেনি। গতরাতে উত্তরা থেকে মিরপুরে পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে পৌঁছেছি। বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ; দেশোদ্ধার করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। যেহেতু , আমার একটা ভাঙ্গাচোরা গাড়ী আছে ; তাই সকালে উঠে ট্রেডিং অফিসের কেরানীগিরির জন্য মাথা নিচু করে চলে এসেছি।
পথে আসতে আসতে আমি আমার মতো আরও অনেক ছোটবড় মাপের সুবিধাবাদীদের অসহায়ত্ব দেখেছি। কোথাও কোন প্রতিবাদ নেই। আছে ক্ষোভ আর অর্থহীন আস্ফালন !
আমি ভয়ংকর ট্র্যাফিক জ্যামে বসেও মাথা ঠাণ্ডা রাখি, সবকিছু মেনে নিই ; কারণ আমার কিছু করার নেই; অন্যেরা কেন করছে না সেটা ভেবে আমি ক্ষুদ্ধ হই। গ্যাসের দাম বাড়ছে, এটা আমাকে স্পর্শ করে না। ‘ সবার চললে আমারও চলবে!’– এই রকমের মনোভাব নিয়ে চলি। কেউ আসার পথে মাইক্রোবাসে কিডন্যাপ হয়েছে, কারো ছিনতাই হয়েছে, কেউ দুর্ঘটনায় হত বা আহত হয়েছে, আমাকে তা ভাবায় না। আমি শুধু আমার দুই কন্যার কথা ভাবি। তাঁদের ভবিষ্যতের পাথেয় জোগাড় করার জন্য উদয়াস্ত প্রাণপাত করি।
আবার আমি আশাবাদের কথাও বলি, সবাইকে আশাবাদী হতে বলি। আমি সবকিছু মেনে নিই। আমার কোন প্রতিবাদ নেই। আমি একটা বিষণ্ণ তেলাপোকার জীবন যাপন করি। সারাদিনে অসংখ্য নানা বর্ণের তেলাপোকার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলি। আমি খাই এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেশের ব্যাপারে আহা উঁহু করি।
আচ্ছা , আমি কি সেই ফরাসি বিপ্লব বা মার্কসবাদের হিসাবে শতভাগ সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া হতে পেরেছি ?
প্রকাশকালঃ ১লা মার্চ,২০১৭
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র
প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন শহর ঢাকায় এতো দুর্বিষহ যানজট হইতেছে, আর কেনই বা আমি টোনার গৃহে প্রত্যাবর্তনে রাত্রি হইয়া যাইতেছে তাহা বোধগম্য নহে !
ইদানীং রাত্রির আহারের পরে কিঞ্চিৎ কাল বোকা-বাক্সের দিকে চাহিতে না চাহিতেই চক্ষু মুদিয়া আসে।
কয়েক দিবস পূর্বে, শ্রান্ত হইয়া গৃহদ্বারে করাঘাত করিতেই টুনি অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিল, আজও যদি জ্যেষ্ঠা টুনটুনিকে উহার বিদ্যালয়ের পাঠ না দেখাইয়া আকস্মিক নিদ্রা যাও ; তাহা হইলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! আহার সারিয়া টুনটুনির কাছে বসিয়া আবিষ্কার করিলাম, সে সবকিছুই অল্পবিস্তর পড়িয়াছে গভীরতায় যাইতে পারিতেছে না। উহাকে চুম্বক, চৌম্বকীয় শক্তি ও পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু বুঝাইতে বুঝাইতে আমি ক্রমশ: সম্মুখ-পানে ঢুলিতে লাগিলাম। আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম–আমার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিয়াছি , দেহ ক্ষীণকায় হইয়াছে। অধিক গতিতে হাঁটিতে হাঁটিতে বিমানের মতো আমি শূন্যে ভাসিয়া উড়িতে পারিতেছি। কিছুক্ষণ উড়িয়া আবার পদব্রজে চলিতেছি আবার উড়িতেছি! দূরত্ব অতিক্রম করা আমার কাছে সহজসাধ্য।
আহা ! মনে অসীম শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। ভাবিলাম , এক্ষণে মিরপুর হইতে উত্তরার কর্মস্থলে যাইবার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিতে হইবে না। টুনটুনিকে বাসায় আসিয়া শিক্ষাদান করিতে পারিব, টুনির অশ্রাব্য তিরস্কার শুনিতে হইবে না !
কিন্তু মুহূর্ত-মধ্যে জ্যেষ্ঠা টুনটুনির ধাক্কায় নিদ্রা টুটিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল ! সে স্মিতহাস্যে কহিল, নিজের শয্যায় গিয়া নিদ্রা যাও পিতা। তোমার এমত সঙ্গিন অবস্থা মাতা টুনির চোখে পড়িলে অনর্থক লঙ্কাকাণ্ড হইবে !
পুনরায় নিদ্রা যাইতে যাইতে পার্শ্ববর্তী টুনিকে বলিতে শুনিলাম , অধুনা ‘মুখ-পুস্তিকায়’ এতো পুনঃপ্রচার করিতেছ কেন ? আরো গভীর নিদ্রায় তলাইয়া যাইতে যাইতে কহিলাম, শহর ঢাকার এমত অবস্থার আশু পরিবর্তন না হইলে নতুন কিছু লিখিবার অবকাশ কোথায় ? যানজটও শেষ হইবে না ; আমারও ডানা গজাইবে না ; অবসন্ন দেহ ও মন লইয়া নতুন কিছু লেখালেখির অবসরও বোধ করি পাইব না !
সে কি বুঝিল কে জানে !
প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০১৭
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে হয়েছে। ঢাকার বিয়েতে বছর বিশেক আগে খাবার মেনু যা ছিল, এখনো তাই ; শুধু রোস্টের মুরগী দেশী থেকে ফার্মের হয়েছে, বাকী আগের মতোই।
নতুন যে ব্যাপারটি চোখে পড়ল বা আমাদের প্রজন্মের হিসাবে খানিকটা দৃষ্টিকটু লাগল, তা শেয়ার করতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রজন্মের বিয়েতে লাজুক অবনত নববধূ ছিল অনুষ্ঠানের একটা সৌন্দর্য। অধুনা, নববধূদের আগ্রাসী আচরণে আমি একবার খুশিও হলাম আবার পুরনো মূল্যবোধের মানুষ বলেই হয়তো কিছুটা মর্মাহতও হলাম। বিয়ের আসরে নববধূরা এতো স্বচ্ছন্দে তাঁদের সদ্য-প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বার্তা বলছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ; যেচে সবার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল – তা দেখে মনে হচ্ছিল এঁদের মনে হয় বছর দশেকের প্রেমের পরে বিয়ে। অথচ আমি খুব ভালোভাবে জানি, এঁদের পারস্পরিক পরিচয় দুই-তিনদিনেরও কম।পুরোটাই অ্যারেঞ্জড্ ম্যারেজ !
আমাদের সময়ে প্রেমের বিয়েগুলোতেও নববধূরা লোক দেখানোর জন্য হলেও হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে দামী মেকআপ নষ্ট করে ফেলত। সেই হিসেবে কান্নাকাটির পর্বের সমাপ্তি আমি অর্থনৈতিক হিসাবে সাশ্রয়ী বিবেচনা করছি। এখনকার বিয়ের আসরে বর-কনের মধ্যে বরটিকেই বড্ড চুপচাপ, মৃদু , ম্লান, ত্রস্ত ও বলির পাঁঠা মনে হয়েছে।
জীবনসঙ্গিনী প্রাপ্তির তীব্র ব্যাকুলতা আমার আগের প্রজন্মে কেমন ছিল সেটা আমার আম্মার মুখে শোনা একটা ‘রিয়েল লাইফ’ ঘটনা দিয়ে শেষ করি।
আম্মার গ্রামে বা আশে পাশে কোথাও এক দরিদ্র চাষির মেয়ের সঙ্গে আরেক কৃষিজীবী কামলা চাষির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে। হবু শ্বশুর আর হবু জামাতা দু’জনই সকালে চাষের কাজে যায়। মেয়ের বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হয়তো ফসল তোলা, বা আর্থিক অনটনের ব্যাপার ছিল। এখন ব্যাকুল হবু জামাতার তো আর তর সইছে না। প্রতি সকালে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের পরেই তার মৃদু ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়। তারিখ কবে ঠিক করছেন, দেরী হচ্ছে কেন , এইসব। এইরকম কয়েকদিন হওয়ার পরে শ্বশুর খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন,
” রাখো রে বাপু ! বল্লিই তো হয় না ; আমার তো একটা গোছগাছ আয়োজনের ব্যাপার আছে, নাকি ? তোমার আর কি ! তুমি তো বাপু নিবের পারলিই শুইবের পারো ! ( তুমি তো বাপু, নিয়ে যেতে পারলেই শুতে পার !) ”
পুরুষ-শাসিত সমাজে ব্যাকুলতা প্রকাশের ব্যক্তিটি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে ভালই লাগছে! আবার আধুনিক নববধূদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে , এঁদের সবার সেই চাষি হবু জামাতার চেয়েও অবস্থা শোচনীয় । কোনমতে বিয়েটা হলেই শুতে পারবে সেইটাই হয়তো সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখছে তাঁদের ; সৌজন্য-সামাজিকতার লেশমাত্রও চোখে পড়ছে না !
প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য