কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( বস্ত্র-খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কিছু কথা)

Sustainability, Sustainable Growth Rate, Organic Growth টেকসই বৃদ্ধি, টেকসই প্রযুক্তি কথাগুলো শুনছি ২০০৭-৮ এর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে। তার আগে এই শব্দগুলো আমার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি । আমার প্রাথমিক শিক্ষা বিজ্ঞান বিভাগে । পদার্থ , রসায়ন, গণিতের চক্র পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং। তারপরে ঘুরে ফিরে দেশের বৃহত্তম রপ্তানীমুখি বস্ত্রশিল্পের কেরানী !

টেকসই বৃদ্ধি কি , কেন , কিভাবে– সেটা একজন অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে শোনার আকাঙ্ক্ষা আছে আমার। সে রকম কাউকে পাচ্ছি না আশে পাশে। কিন্তু আমি আমার অত্যল্প অভিজ্ঞতা দিয়ে , পরিপার্শ্ব দিয়ে, যেটুকু বুঝতে পারছি ,বোঝার চেষ্টা করছি– সেটা সবার সঙ্গে আলোচনা করতে দোষ কি !

আশা করছি এই আলোচনা চোখে পড়লে আমার বন্ধু তালিকার কেউ না কেউ বিষয়টিকে আরো জলবৎ তরল করে দিতে পারবেন।

ব্যবসায় টিকে থাকার অন্যতম প্রধানতম শর্ত হচ্ছে ব্যবসা-বৃদ্ধি। প্রতিবছর ব্যবসা বৃদ্ধির টার্গেট থাকতে হবে, সেটার অ্যাচিভমেন্ট থাকতে হবে। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবছর উৎপাদন বাড়তে হবে, কর্মচারীর বেতন সুবিধা বাড়াতে হবে ; পরিশেষে মালিকের মুনাফা বাড়তে হবে। এটি এতোই সহজবোধ্য একটা ব্যাপার, যে এই তত্ত্বের আর কোন বিকল্প থাকতে পারে, সেটা নিয়ে আমাদেরকে কেউ ভাবতে বলে নি। আমরা ভাবিও না ! শোনাকথা যেটুকু জানি, সাধারণত: ২০ থেকে ৩০ ভাগ ব্যবসা বৃদ্ধির টার্গেট থাকে মালিক-পক্ষের। তবে ১০ থেকে ১৫ ভাগ বৃদ্ধি হলেই বোঝা যায়, ব্যবসা লাভজনক রাস্তায় আছে। ব্যবসা বৃদ্ধির যথোপযুক্ত পন্থার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েকবছরে আরো কিছু শব্দের সঙ্গে আমি পরিচিতি হয়েছি। Breakeven , Depreciation Cost, Asset, Equity, Liability, Profit Margin, Business Expansion ইত্যাদি ইত্যাদি।

টেক্সটাইল ফ্যাক্টরী থেকে গার্মেন্টসে এসেছি প্রায় দেড়যুগ। গত আঠারো বছরে নানা মাপের গার্মেন্টস মালিকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। অনেকেই আমাকে তাঁদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অনেককে ছোট একটা কারখানা থেকে বৃহদায়তন কারখানায় উন্নীত হতে দেখেছি। গুটিকয়েক আছেন , যারা সুযোগ থাকা স্বত্বেও একটা নির্দিষ্ট আয়তনের বেশী উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ান নি।

দেড়যুগ আগেও গার্মেন্টস ব্যবসার লাভ চোখে পড়ার মতো ছিল। ১টি আমেরিকান ডলার বাংলাদেশের ব্যাংকে এসেই সেটা ৭০ গুন ৮০ গুণের টাকায় পরিণত হতে দেখে উদ্যোক্তার এগিয়ে এসেছেন। পর্যাপ্ত সস্তা শ্রম , গ্যাসের সাপ্লাই, জমি, পানির সহজলভ্যতা আমদের দেশে আছে বলেই নানাধরনের উদ্যোক্তারা তাঁদের পুঁজি ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই শিল্পে অংশ নিয়েছেন। বছর শেষের লাভের উদ্বৃত্ত টাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কারখানার মালিকরা তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছেন। বাড়াতে বাড়াতে কেউ কেউ এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন ; এখন তাঁরা না পারছেন সেটা গিলতে না পারছেন উগরাতে !

তাজরিন ফ্যাশানের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ও রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি আমাদের পুরো গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ছোট মাপের যে কারখানাগুলো বিভিন্ন মার্কেটের শেয়ার বিল্ডিং এ ছিল, তা বন্ধ হয়ে গেছে ACCORD , ALLIANCE –এর ধাক্কায়। মাঝারি মাপের ( ৬ থেকে ১২ লাইনের) কারখানাগুলোকে অগ্নি নির্বাপণ, বিল্ডিং স্ট্রাকচার ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হয়েছে। এতে করে ছোটদের যদি ৭০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাড়তি খরচ লেগে থাকে বড়দের লেগেছে আরো অনেক অনেক বেশী।

ট্রাজেডি হচ্ছে, এতো কিছু করার পরেও ক্রেতাদের মনরক্ষা করা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক চাহিদার পতন ( কয়েকবছরে বিশ্বজুড়ে টেক্সটাইল পণ্যের বিক্রয় প্রায় ৪% কমে গেছে) , ক্রেতাদের অন্তঃর্বতী প্রতিযোগিতা , বিশ্ব-মন্দা ; নানাবিধ কারণে ইউরোপ , আমেরিকায় গার্মেন্টস-এর খুচরা মূল্যের দরপতন হয়েছে। এবং সেটার মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে। জীবনযাত্রার মূল্য ও মান বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি আবশ্যকীয়। গার্মেন্টস-এর মূল উপাদান কাপড় ও অ্যাকসেসরিজ। বিশ্বব্যাপী গ্রিন আন্দোলনের ফলে চীন অনেক রঙ উৎপাদনের কারখানায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম গেছে বেড়ে। অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যেরও দাম বেড়েছে একই সঙ্গে। এর প্রভাবে উৎপাদিত কাপড় ও আমদানি করা কাপড়ের দাম ঊর্ধ্বমুখি । শেষের কয়েক সিজনে এতো মন্দ সংবাদের ভিতরে একমাত্র সুসংবাদ ছিল সুতার দামের স্থিতাবস্থা। সুতার সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা লম্ফঝম্প করতে পারছিলেন না ; কারণ বিশ্বব্যাপী তুলার দাম কমতির দিকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে হুট করে কটন সুতার দাম ১০~ ১৫% বেড়ে গেছে। যার যুক্তিসঙ্গত কারণ কি ,সেটা কেউ বলতে পারছেন না !

মোদ্দা কথা গার্মেন্টস শিল্প প্রাথমিক বছরগুলোতে যে পরিমাণ লাভ করতে পেরেছে এখন তা করতে পারছে না ! কিন্তু আমাদের মালিকেরা এমনভাবে তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন ও করে চলেছেন যে তাঁদের বিশাল কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে খুব সস্তা দরের কাজ হলেও করতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রয় মূল্যের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে , প্রাইস কোটেশন কোনভাবেই মিলাতে পারছেন না কেউ। এখন আমাদের সবাইকে নজর দিতে বলা হচ্ছে , অপচয়ের পরিমাণ কমিয়ে, কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে, প্রোডাক্টিভিটি বাড়িয়ে নিজেদেরকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করতে।

আগের কথায় আসি ; যেহেতু আমাদের বস্ত্র-খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি আজকের আলোচ্য । গত তিন দশকে আমাদের বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা Sustainable Growth Rate-এ হয়েছে নাকি সেটা বা Organic Growth ছিল? এটা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। ১৫ বছর আগে যে মালিককে বলতে শুনেছি যে , তিনি ১২ লাইনের বেশী কারখানা বাড়াবেন না– পরে সেই মালিককেই দেখেছি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১০০ লাইনের গার্মেন্টস করতে! আর উচ্চ-সুদে মুফতে পাওয়া মুদ্রার তারল্য নিয়ে বিপাকে পড়া ব্যাংকাররা আরো বেশী উচ্চ-সুদে মালিকদেরকে শিল্প ঋণ দিয়েছেন। মালিকরাও সহজলভ্য ঋণ পেয়ে নিজেদের Asset তো বাড়িয়েছেন, একই সঙ্গে বাড়িয়েছেন তাঁদের Liability !

২০১৪-১৫ সালে শীতবস্ত্রের বড় একটা পরিমাণ বাংলাদেশ থেকে চীনে সরে যায়। আমাদের সোয়েটার কারখানার মালিকরা হতবাক ! ম্যানুয়াল মেশিনের সোয়েটারে আমরা বিনা প্রতিযোগিতায় বেসিক অর্ডারগুলো করছিলাম। একই সঙ্গে প্রায় শতকরা আশি ভাগ মালিক জার্মান , জাপানি ও চীনের জ্যাকার্ড মেশিন নিয়ে এসে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। এতো কিছুর পরেও দেখা গেল, চীনের কিছু কারখানা আমাদের চেয়েও ৩০% বা ৫০% কম সিএম( Cutting & Making) দিয়ে অর্ডার নিয়ে গেছে। বাজারের খোঁজ (Market Information) থেকে দেখা গেল, চীনের কিছু এলাকার মালিকরা হয়তো নিজের পুঁজি ও ব্যাঙ্কের ঋণ নিয়ে কারখানা করেছেন। সেটা একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন ক্ষমতার । বছর তিনেকের ভিতরে তাঁদের নিজের পুঁজি ও ঋণ Breakeven-এ পৌঁছে গেছে। তাঁদের জ্যাকার্ড নিটিং মেশিনগুলোর Depreciation/ অবচয় এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সে যদি শুধুমাত্র শ্রমিকের খরচ ও বিদ্যুৎ খরচ হিসাব করে তাঁর সিএম মূল্য খুবই কম দাঁড়ায়। অন্যদিকে আমাদের মালিকের মাথার উপরে আছে ১২ থেকে ১৮% সুদের ব্যাংক ঋণ। আমাদের কস্টিং চীনের ওই সব কারখানার কাছে মার খাচ্ছে। এবং গত কয়েকবছরে আমাদের সোয়েটারের সিএম কস্টিং হু হু করে নীচে নামাতে বাধ্য হয়েছি আমরা।

ব্যাংকার বন্ধুর সাথে কথা বলে যা বোঝা গেল, তাঁরা উদ্যমী মালিকদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন, কারখানার ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করার জন্য। একই সঙ্গে মালিকদের ও ব্যবসার নিজস্ব কতগুলো সীমাবদ্ধতা আছে, যেখানে কারখানার ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করা ছাড়া উপায় থাকে না।

প্রথমত: মুনাফার টাকার সঙ্গে ঋণের সহজলভ্যতা যোগ করে আমাদের মালিকদের পক্ষে হুট করে কারখানার ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা তেমন দুঃসাধ্য কিছু নয়। তাই, কারখানা Breakeven মূল্যে পৌঁছানোর আগেই তাঁরা আরো বেশী ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বসেন। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা গার্মেন্টস। দ্বিতীয় কোন বিকল্প শিল্প নেই , যেখানে তাঁরা নিশ্চিন্তে ইনভেস্ট করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত: অনেক ক্রেতাই কারখানা মালিকদের আরো বেশী উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য যুক্তিসংগত ও অযৌক্তিক উৎসাহ দিয়ে থাকেন। কিছু ক্রেতা আছে, যারা বড় কারখানা ছাড়া কাজ দিতে চায় না। বেশী লাভের আশায় মালিকরা তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেন।

তৃতীয়ত: একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে, ম্যানেজমেন্টের Overhead Cost নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছে যায়। যে ধরণের মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট দিয়ে একটা ১২ লাইনের কারখানা চালানো যায় ; ঠিক সেই একই ম্যানেজমেন্ট দিয়ে ৩০ লাইনের কারখানা চালানো যায়। Overhead Cost একই রেখে শুধু মেশিন আর অপারেটর বাড়ালেই চলে। এই ব্যাপারটি অনেক মালিককে উদ্বুদ্ধ করে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে।

চতুর্থত: মালিক-পক্ষ চূড়ান্ত লাভক্ষতির হিসাব দূরে থাক ; নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে শুধুমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে একটা লোভ কাজ করে। সামাজিক অবস্থানের একটা ব্যাপার স্যাপারও আছে, কে কতো বড় কারখানার মালিক ইত্যাদি ! অনেকাংশে দেখা যায়, মালিক যে দক্ষতার সঙ্গে ২০ লাইনের কারখানা চালাচ্ছেন। উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে গেলে , তিনি তাঁর মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে সেটা ম্যানেজ করতে হিমসিম খান। ফলশ্রুতিতে কারখানা অলাভজনক হয়ে যায় এবং সস্তা দরের কাজ করতে বাধ্য হন তিনি। অথবা ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে নিতান্তই আইনি ঝামেলা এড়াতে কারখানা চালিয়ে যান।

আমাদের শিল্পমন্ত্রী স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি-মুখী করার ব্যাপারে। আমাদের নিজেদের দক্ষতা, চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, রাস্তা ঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাসের পর্যাপ্ততা আছে কিনা সেটা যাচাই-বাছাই করা জরুরী। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, যতোদিন যাবে আমরা বেশী মূল্যের গার্মেন্টস করব। আমাদের উচ্চমূল্যের / High End Garment Product তৈরি একটা বড় ভূমিকা রাখবে ৫০ বিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে। তাছাড়া, সকল বড় কারখানার মালিকরাই, এখন অত্যাধুনিক মেশিন নিয়ে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। সকলেই অপচয় কমানোর দিকে নজর দিয়েছেন। ERP, Lean Method, Industrial Engineering প্রয়োগ করে সবাই কর্মদক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সবকিছুর পরে, ২৭-২৮ বিলিয়নের রপ্তানি ১০~ ১৫% Organic Growth ধরে যদি ৪০ বিলিয়নেও পৌঁছায়, তাতেও আমাদের এই জনবহুল বাংলাদেশের আগামী কয়েক দশক বেশ ভালোই কাটবে।

শেষ করার আগে এই সেক্টরের এক বড়ভাইয়ের প্রয়োজনীয় রসিকতা মনে পড়ে গেল। সেই বড়ভাই আমাকে বলছিলেন, ‘শ্রমিকদের যে রকম নানা ধরণের ট্রেনিং দেওয়া হয়। সময় হয়েছে আমাদের কারখানার মালিকদেরকে বিশেষ ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা!’

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

তোতাকাহিনী।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, “এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।”
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, “পাখিটাকে শিক্ষা দাও।”

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি সে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, “শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।” কেহ বলে, “শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।”
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, “অল্প পুঁথির কর্ম নয়।”
ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, “সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।”
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, “উন্নতি হইতেছে।”
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, “খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।”
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।”
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্ফ। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!”
মহারাজ বলিলেন, “আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।”
ভাগিনা বলিল, “শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।”
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমনসময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, “মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।”
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, “ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।”
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, “পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।”
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, “এ কী বেয়াদবি।”
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, “এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।”
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, “পাখি মরিয়াছে।”
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।”
রাজা শুধাইলেন, “ও কি আর লাফায়।”
ভাগিনা বলিল, “আরে রাম!”
“আর কি ওড়ে।”
“না।”
“আর কি গান গায়।”
“না।”
“দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।”
“না।”
রাজা বলিলেন, “একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।”
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

আমাদের প্রেম, দাম্পত্য ও পরকীয়া !

ফরমায়েশি লেখায় আমার কিছুটা অবহেলা আছে। বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, ভ্যালেন্টাইন ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি আমি এড়িয়ে চলি। কীভাবে যেন আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে, এসবই পুঁজিবাদের পণ্য কেনাবেচার ধান্ধা। কেনাবেচা মন্দ কিছু নয় অবশ্যই ; তবে মানুষের আদিখ্যেতা এড়িয়ে চলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি আর কী !

জগতের নিয়মে নারীপুরুষের ভালোবাসাবাসি থাকবে। কৈশোরের বয়ঃসন্ধি পেরুলেই বিপরীত কাউকে দেখলে মন উদাস হবে, ‘কি জানি কিসেরি লাগি প্রাণ করে হায় হায়’ !—হবে। আমাদের এক বড়ভাই বলেছিল সেই ৯০-এর দশকে কয়েকমাস খানেক কিশোরীর পিছনে পিছনে হেঁটে একদিন সেই কিশোরী কী মনে করে যেন পিছন ফিরে দেখল, কে তাঁকে ফলো করছে। সেই বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল সেই কিশোরের বন্ধুরা, ‘তাকাইছে ! তাকাইছে ! দোস্ত ! ও আমার দিকে তাকাইছে !’ চিৎকারে।

কৈশোরের পরে কাঠখড় পুড়িয়ে গুচ্ছের কষ্ট করে ভালো কোথাও ভর্তি হও রে ! অনার্স কর রে, মাস্টার্স কর রে ! চাকরি খোঁজ রে, আরো কিছুদিন পরে সেই বহু আরাধ্য মধুর সমাপ্তি বিবাহ ! নিজের হাতের উপর সেই হাত। “ ‘আমি পাইলাম, ‘ আমি ইহাকে পাইলাম।’ কাহাকে পাইলাম । এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে। ” সেই অনুভূতি ! তীব্র রোমাঞ্চের পর নতুন প্রজন্মের আগমন। অতঃপর বহমান জীবন, সেই চাকরি, সেই ট্রাফিক, সেই গোমড়ামুখো বস আর পাশের টেবিলের উচ্চস্বরে কথা বলা সহকর্মীদের সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। আবার সেই ট্রাফিক ঠেলে বাসায় এসে, দুটো নাকে মুখে দিয়েই বিছানায়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ একই রুটিন। এর মাঝে একটা বয়সের পরে দৈহিকতা নিতান্তই অভ্যস্ততার ঘেরাটোপে আটকে যায়। এই চিত্র ঢাকার বা যে কোন ব্যস্ত মহানগরের সবখানে।

২০০১ এর দিকে এক জার্মান ক্রেতার কাজ করতাম। নারী পোশাকের জন্য, Blind Date Casual এবং Blind Date Women নামের দুইটা লেবেল ছিল তাঁদের ! তো সিনিয়র ক্রেতা আমাকে বোঝালেন Blind Date শব্দটির ভিতরে এক অদ্ভুত ধরণের রোমাঞ্চ আছে, যেটা নারী ক্রেতাকে উৎসাহিত করে সেই লেবেলের পোশাক কিনতে। তখন ইউরোপে Blind Dating হয়তো খুব প্রচলিত ও মাছ-ভাতের মতো কিছু একটা। কিন্তু এখন আমাদের দেশে ল্যান্ড ফোনের যুগ থেকেই শুরু হল প্রজন্মের রোমাঞ্চ। তাঁর আগে যে চিঠির যুগ ছিল, সেখানেও ধীরগতির কিছুটা রোমাঞ্চ ছিল। আমার এক বন্ধু তখন পত্র-মিতালীর পত্রিকাগুলোতে নিজেরটা সহ অন্য কয়েকজনের চাঁদা দিয়ে ছাপাতে দিত। সেই পত্রিকায় আমাদের মূল নামের সংগে কিছুটা ছদ্মনাম জড়িয়ে দেওয়া নাম। আমার নাম ছিল সম্ভবত: অমি জাহিদ। কেন সেই নাম, মনে নাই। তবে যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রাবাসের নাম দেওয়া থাকত, দেশের নানা প্রান্ত থেকে চিঠি আসত। কাঁচা হাতে বন্ধু হওয়ার নিবেদন। বেশির ভাগ স্কুলের সেভেন এইটের মেয়ে। কিছু আসতো কলেজ থেকে। আমাদের কেউ কেউ সুন্দর নাম দেখে মেয়েদের কাছে চিঠি পাঠাতো। কেউ উত্তর দিত, কেউ দিত না।

এই সব পত্র-মিতালী নিয়ে আমাদের মজার কিছু স্মৃতি আছে, কেউ কেউ সশরীরে চলে আসত, যেহেতু হলের রুম নাম্বার সহ ঠিকানা দেওয়া থাকত।

হলের একটা মাত্র ফোন, নীচের গেস্ট রুমে, লক করা থাকত। ফোন শুধু আসত, যাওয়ার নিয়ম ছিল না। তো সেই ফোনের তার ছিঁড়ে প্যারালাল লাইন করে আরেক ফোন সেটে কথা বলার অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হবু প্রকৌশলীদের পক্ষেই সম্ভব। আমার মনে হয়, ৯০ এর দশকের বেশিরভাগ ছাত্রাবাস হলগুলোর একই চিত্র। আমরা যখন হল জীবন শুরু করি তার কিছুদিন আগেই পঁচিশ কয়েন দিয়ে ফোন করার বক্সগুলো উঠে গেছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে।

ল্যান্ডফোনে অহরহ ক্রস কানেকশন হত। আমাদের বাসার ফোন নাম্বার ছিল, ৩৮৩৩৪১ ও পরে ৯০০৩৫৬৪ । কাছাকাছি নাম্বারে করেছে কেউ আর সেটা আমাদের ফোন লাইনে চলে এসেছে , সেটা প্রতিদিন তিন চারবার হতো। মাঝে-সাঁঝে ক্রস কানেকশন হতো। মানে আমি কোথাও ফোন করেছি ; হুট করে অন্য দুইজনের ব্যক্তিগত কথোপকথনের সঙ্গে আমার লাইন কানেক্টেড হয়ে যেত। হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা নবদম্পতি কথা বলছে। আমি আর টেলিফোন অপারেটর শুনছি সেই বিনা পয়সার বিনোদন।

এক বন্ধুর বাড়িতে ক্রস কানেকশনে কলেজ পড়ুয়া এক তরুণীর সঙ্গে কথাবার্তা, আমরা সবাই ফান হিসাবে নিলেও জনৈক বন্ধু সেই মেয়ের সঙ্গে সিরিয়াস প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গেল। বিয়ে হয় হয় অবস্থা ! শেষে পাত্রের বাবা-মার মত না থাকায় আর হয় নি।

মোবাইল আসার পর, ক্রস কানেকশনের বিনোদন শেষ। নতুন প্রযুক্তির খরচ বেশি। প্রিপেইড ফোন দিয়ে , প্রেম ও রোমান্স জমে না। ৬ টাকা পার মিনিট কল চার্জ। তো সেই দুর্মূল্যের বাজারেও আমার এক বন্ধু প্রেম করত। যেখানে আমাদের সারাদিন দেশে বিদেশে কথা বলে বিল আসে ৫ হাজার টাকা। তার মাসের মাঝখানে ১৮ হাজার টাকার বিলের জন্য লাইন কেটে দেয় ! বিল পরিশোধ করে লাইন রি-কানেক্ট করে আবার তার প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে। সেই যুগে সে কীভাবে মাসে ৩০ হাজার টাকার কথা বলতো সেটা এখনো একটা বিস্ময় বটে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে রমনা পার্ক বেশ জনপ্রিয় ও আপাত: নিরাপদ একটা ডেটিং প্লেস ছিল। কিছু অনিয়ম যে হোত না সেটা বলা যাবে না ! তবুও প্রেমিক-প্রেমিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কপোতকপোতি এসে সকালে ও বিকালে ভিড় করত রমনা পার্কে। টিএসসি-তে। আমাদের বন্ধুদের অনেকের তার হবু স্ত্রীদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে। বয়স হয়ে গেছে, বলতে দ্বিধা নেই ; আমার হবু স্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রিয় ডেটিং প্লেস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকা। এতো সাবধানে চলার পরও ডিএমসির (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ)-এর ব্যাচ মেটদের কাছে ধরা খেতে হয়েছে কয়েকবার। আর প্রিয় ছিল রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে ওকে ওঁর আগারগাঁও এর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দেওয়া।

ভুলে যাওয়ার আগে বলে ফেলি, রমনা পার্ক নিয়ে আমদের সেই ৯০ সালের দিকে রসিকতা প্রচলিত ছিল।
হয়েছে কী, নানা বয়সের প্রেমিক-প্রেমিকা ও কপোতকপোতির দেখা মিলত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
মাঝেমাঝেই অনেককে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া গেলে টহল পুলিশ হুমকিধামকি দিয়ে উঠিয়ে দিত।
তেমনই এক সন্ধ্যায় এক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে টহল পুলিশ কিছুটা অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল।তাদের কথোপকথন ছিল এইরকম:
: কি ব্যাপার , আপনারা এখানে কি করেন?
: না, মানে আমরা তো স্বামী-স্ত্রী।
: স্বামী-স্ত্রী তো বাসায় যান, এইখানে কি ?
: ইয়ে মানে, আমি একজনের স্বামী আর উনি আরেকজনের স্ত্রী !

আমার নিজের অভিজ্ঞতা না দিলে লেখাটা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। নামোল্লেখ না করে বন্ধুদের প্রেম ও বিরহের কথা যেহেতু বলে ফেলেছি কয়েকটি।তাঁদের সবাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আছে, এবং নাম উল্লেখ না করায় হাঁফ ছেড়ে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে !

২০০২/৩ হবে হয়তো। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে এবং একইসঙ্গে চাকরির সবচেয়ে বিপদসংকুল সময়ে এক তরুণী দুই-তিনদিন করে মোবাইলে ফোন দিল। মধুর ভাষিণী । সপ্তাহ খানেকের মাথায়, রমজানের সময় রিকশায় আমি আর আমার আরেক কলিগ অন্য এক অফিসের ইফতার পার্টিতে মুখরক্ষা করতে যাচ্ছি। এর মাঝে সেই তরুণীর ফোন। আগের কয়েকটা আলাপ দীর্ঘ ছিল, কেন জানি না –এই বারেরটা আর দীর্ঘ করতে ইচ্ছে করলো না।

কথা শুনে বুঝে ফেলেছিলাম যে, সে আমার অফিসের অন্য কোন তরুণী সহকর্মীর মাধ্যমে আমার ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিয়েছে ।
ফোনালাপের মাঝে আমি জানতে চাইলাম,আপনি আসলে কি চান ? ।
ন্যাকা গলায় উত্তর এলো ‘বন্ধু হতে চাই, আমরা কি বন্ধু হতে পারি না! ’
উল্লেখ্য, সেটা ছিল মোবাইল ফোনের যুগ, এইসব নানারকম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ফেটওয়ার্কিং ছিলনা। ছিলনা কোন ভার্চুয়াল জগত।
‘আপনি জানেন আমি বিবাহিত?’
‘জানি।’
‘তাহলে আপনার আর আমার বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বা সীমানাটা কোথায় ?’
আমি বললাম, ‘ ধরেন, আপনার সাথে আমি মাস তিন-চারেক গুচ্ছের টাকা খরচ করে ফোনাফুনি করলাম ( সেই সময় কলরেটের কথা চিন্তা করেন, ৬ টাকা/মিনিট!)
তারপর ? তারপর , কোন এক পবিত্র বিকালে আপনি আমার সঙ্গে বা আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করব।
তরুণী গলায় মধু ঢেলে বলল , ‘তাতো চাইতেই পারি ! পারি না ?’
‘ধরেন অফিসের এতো ঝামেলার মধ্যে সময় বের করে কয়েকদিন চাইনিজ টাইনিজ খেলাম!’
তরুণী নীরব সম্মতি জানালো , ‘হুম।’ ( মানে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেতে চায় ! )
‘তারপরে একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি হবে, তারপর আরো মাস ছয়েকের মাথায় মাথায় এই সম্পর্ক হয়তো বিছানা পর্যন্তও যেতে পারে !’
তরুণী এবার কিছুটা বিব্রত মনে হলো । বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলছেন কেন?’
সে তখনো বোঝেনি ,আলোচনা কোনদিকে যাচ্ছে।
বললাম ‘আমার মতো একজন ব্যস্ত কামলা টাইপের মানুষ ছয়মাস বা একবছর ধরে বিবাহিত জীবনের পাশাপাশি রোমাঞ্চের জন্য এতো সময় বা অর্থ নষ্ট কেন করবে বলেন ! সেটা না করে আমরা কি পুরো ব্যাপারটাকে সংক্ষিপ্ত করতে পারি না? আপনি ঠিকানা দেন ইফতার সেরে আপনার বিছানায় চলে আসি!’
তরুণী তোতলাতে শুরু করলো।

যাই হোক, ওই কাষ্ঠল ফোনালাপের পরে সে আর কখনো আমাকে ফোন দেয় নাই; ফোন দেওয়ার প্রশ্নও আসে না ! এবং আমার বিবাহবহির্ভূত রোমাঞ্চের ও সম্ভাব্য পরকীয়ার ওইখানেই অকাল প্রয়াণ ঘটলো !

এক পর্যায়ে আমাদের বন্ধুদের সবাই চাকরি বাকরিতে ঢুকে গেল। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বিদেশে আবাস গড়ল। বিয়ের দশ বারো বছর পরে অনেকের আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে তাঁদের সহধর্মিণীরা সংসারধর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পারস্পরিক সম্পর্কে একটা অভ্যস্ততা চলে আসল। একটা ছাড়া ছাড়া ভাব আর কী !
দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।

‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’

কোন ঘরোয়া আলোচনায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বলেছিলেন, মানুষ নাকি সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। সম্পর্কের নতুন করে ঝালাই মেরামতের দরকার হয়ে ওঠে এই সময়।
পুরুষেরা নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে খুঁজে ফেরে কিছুটা রিলিফ, স্বস্তি, রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চার, নতুনত্ব। আর বিবাহিতারা খুঁজে ফেরেন তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই প্রশংসিত চোখগুলোকে। বিয়ের পরে সন্তানাদি , স্থূলত্ব সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় সব রোমাঞ্চ। সংসার , সংসার, বাচ্চার স্কুল কোচিং রোজ সেই এক ঘেয়ে রুটিন। স্বামীরা ট্র্যাফিক ঠেলে এসে রাতের খাবার খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাসে ঘুমিয়ে পড়েন। কারো গায়ে কারো হাত পড়লে শুনতে হয়, বিরক্ত কোর না তো , ঘুমাও ! কাল সকালে অনেক কাজ জমে আছে।

ঠিক এই সময়ে মানব-মানবী জ্যোৎস্নায় ভূত দেখে।

আমার এক বন্ধুর শেয়ার করা লেখায় দেখেছিলাম , সে লিখেছে শুরুটা নাকি এভাবে হয়!

: ভাবী, আপনি দুই বাচ্চার মা! আপনাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। দেখে মনে হয়, মাত্র ইন্টার-পাশ করছেন! সিরিয়াসলি!
: মন খারাপ কেন ভাবী? ভাইয়া ঝগড়া টগড়া করলো নাকি?……. আপনার মতো এরকম একটা মানুষের সাথেও ঝগড়া করা যায়????? বিশ্বাসই হচ্ছে না!
: জন্মদিনে কি কি করলেন আপনারা? …….কি? ভাইয়ার অফিস?…..কি যে বলেন!…. আমি এরকম একটা বউ পেলে জন্মদিন উপলক্ষে এক সপ্তাহর ছুটি নিতাম!…. হাইসেন না, সিরিয়াসলি!
উল্টোদিকে ভাইদেরকেও ভাবীরা নানা প্রশংসা করে ফেলে।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য প্রতিষ্ঠিত চল্লিশোর্ধ বিবাহিত পুরুষেরা যেমন অনেক নিরাপদ, ঠিক তেমনি নিরাপদ ত্রিশোর্ধ এক বা দুই সন্তানের জননী বিবাহিতারা। এই উভয়পক্ষের মনের ভিতরে প্রশংসা পাওয়ার আগুন নিভে গেলেও ধোঁয়া থেকে যায়। এলাকার ডাকসাইটে সুন্দরী, কলেজ কাঁপানো, ভার্সিটির করিডোরে ভক্ত পরিবেষ্টিত সুন্দরীরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সচিব আমলার বউ হয়ে যায়, তাঁদের না থাকে কোন নিজস্ব পরিচয় , না থাকে আশে পাশে প্রশংসার চোখগুলো ! এইসব স্পর্শকাতর বিবাহিতারা লোল পুরুষের নিরাপদ আবাস। পরকীয়ায় জড়িয়ে তার প্রেমে এখনও পুরুষকুল হাবুডুবু খাচ্ছে এটা ভেবে ভেবে , এক গভীর পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে যায় ঐ সুন্দরীরা। সে যে বিদুষী, রূপবতী , গুণবতী –শুধুমাত্র সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে সে গৃহবন্দী হয়ে আছে , সেই ব্যাপারে সে নানা সমবেদনা আশা করে। চালাক পুরুষ মাত্রই সেই আকাঙ্ক্ষার চারাগাছে পানি দেওয়া শুরু করে। মুখোমুখি কথা বলার সক্ষমতা খুব কম লোকের থাকে, অথচ ফোনে সেটা আরেকটু সহজ। মনের অনেক কথা বলে ফেলে যায়। আর মোবাইলের যুগের পরে এখন ভার্চুয়াল অন্তর্জালের সময়ে সেই সুযোগ অনেক বেশি। মেসেঞ্জারে তো কথার ফুলঝুরি ছোটে।

একটা সময়ে ঘরের নারীরা স্বামীর ব্যাপারে আস্থাশীল হয়ে পড়ে, জানে কোথায় আর যাবে! বাচ্চা কাচ্চার টানে দিনের শেষে এই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হবে।

আমার এক বন্ধু বাচ্চাকে স্কুলে দিতে গিয়ে বহুদিন ধরে বাচ্চার বান্ধবীদের মায়েদের সান্নিধ্য পেয়েছিল। তার বউ জেনে যাওয়ার পরে যথারীতি নানা মানঅভিমানের পরে তাঁরা এখন প্রবাসে ঘাঁটি গেড়েছে।
আরেক বন্ধু ছিল টাইম-জোনের বিপরীতে ; তার পড়তো রাতের ডিউটি — তার রাত মানে তখন বাংলাদেশের দিন। কীভাবে কীভাবে সে নানা বিবাহিতার সঙ্গে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাতভর কথা বলে সম্পর্ক গড়ে তুলত। সেটা সে দেশে ফিরে এলে দৈহিকতায় শেষ হত। চোরের দশদিন , গৃহস্থের একদিন ! সেও বউয়ের কাছে ধরা খেয়ে এখন লাইনে চলে এসেছে।

বিয়ে করে একজন জীবনসঙ্গিনীকে পেতে আমাদের সমাজে পুরুষদের যে পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয় সারাজীবন ধরে। সেই জীবনসঙ্গিনী ও সংসারকে আরেক রোমাঞ্চের জন্য হারিয়ে ফেলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয় ,সেটাও বিশাল বেদনাদায়ক। আস্থার সংকট একবার হলে সেটা ফিরে আসতে সময় তো লাগেই।

বহুদিন আগে আমরা যখন একে একে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসাবে বিবেচিত হওয়া শুরু করলাম। আমার এক উচ্চপদস্থ বন্ধুর পশ্চিমা সিইও তাঁকে বলেছিল, সময় পেলেই যেন রিল্যাক্স করে ! সিইও-এর দৃষ্টিতে রিল্যাক্স মানে অনেক কিছু হতে পারে। হতে পারে সেটা জিম, ট্রাভেল, অ্যালকোহল,সেক্স, গ্যাম্বলিং, আড্ডা ইত্যাদি ইত্যাদি ! তাঁর মতে, যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা , যাদেরকে সারাক্ষণ অনেক প্রেশারের মধ্যে কাজ করতে হয় তাঁদের যে কোন একটা সিদ্ধান্তের উপর মুলতঃ প্রতিষ্ঠানের ও একই সঙ্গে অনেক মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত যারা নেয়, তাঁদের একটু রিল্যাক্স করার, ব্যাপারটা জায়েজ আছে। তবে, মানুষ সে উচ্চপদস্থ হোক বা নিম্ন তার একঘেয়ে জীবনের রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চার আবশ্যক। নিম্নবিত্তদের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমসিম খেতে হয়। Maslow’s hierarchy of needs হিসাব করলে নিম্নবিত্তদের সেকেন্ডারির চাহিদার দিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায় ?

পুরনো দিনে ফিরে যাই আবার ! ৯০ এর দশকের শেষের দিকে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাচের সবাই শিক্ষা সফরে ভারতে। এক পর্যায়ে কোলকাতায়। শেষ বিকেলে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে এতো ঘনিষ্ঠভাবে কপোত কপোতীদের কে দেখে গাইডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দাদা এ কী অবস্থা ! সে হাসি মুখে বলেছিল, কী করবে বলুন দাদা বলুন। সারা কোলকাতায় প্রেমিক প্রেমিকাদের বসার জায়গাই বা আছে কটা। বাদ দিন দাদা, ওদিকে তাকাবেন না !

অঞ্জন দত্তের বেলা বোসের গান তখন খুব জনপ্রিয়। এমন হয়েছে, আমি সেই ২৪৪১১৩৯ নাম্বারে ফোন দিয়ে বলেছি এটা কি বেলা বোসের নাম্বার। ওপাশ থেকে হেড়ে গলায় উত্তর এলো ওটা কী একটা দোকানের ফোন নাম্বার যারা কী সব সাপ্লাই টাপ্লাই দেয়। সেই সঙ্গে আরো বলল, যে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এরকম কল পেয়ে থাকেন। অঞ্জন দত্তের  আমাদের সময়তো তাই গেছে, সারা ঢাকা শহরে একটা ভাল পার্ক নেই, দুদণ্ড বসে কথা বলার জায়গা নাই। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চন্দ্রিমা উদ্যানে হকারদের অত্যাচার যারা আগের দশকে প্রেমিকাকে নিয়ে গেছেন তাঁরা জানেন। এখন সেটার কোন উন্নতি হয় নি বলেই আমি জানি। প্রেমিক প্রেমিকা দেখা করছে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে, বার্গার হাউজে, এটা কোন কথা হল !

আমার এক মামা ; সারা জীবন বয়েজ স্কুল , কলেজ, ইউনিভার্সিটি করে অবশেষে বিয়ের দেখা। তার জীবন এতোটাই নারী-বিবর্জিত ছিল যে, বিয়ে করার পর নতুন মামীর প্রতিটা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনতে পাওয়া যেত। তুমি এইটাও পার, তুমি এইটাও পার? মর জ্বালা, সে সম্ভবত: নতুন মামীর সকালের প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাকেও বিস্ময়ের সাথে নিয়েছিল। নারী বিবর্জিত শৈশব কৈশোরের পুরুষেরা অনেক বেশি বিপদসংকুল হয়। একই ভাবে পুরুষ-বর্জিত সমাজে যে নারী বেড়ে ওঠে।

এই মধ্যবয়সে আমাদের একই সালে এসএসসি পাশ করাদের একটা সারাদেশব্যপী একটা ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে মাস ছয়েক ধরে। আমাকে কেউ একজন অ্যাড করেছে গত ডিসেম্বরে। সিংহভাগ তরুণ-তরুণীদের বয়সটাই শুধু বেড়েছে। কৈশোরিক প্রগলভতা যায় নি। পুরনো বান্ধবীরা যারা ছিল সেই বয়সের আরাধ্য, তাঁদের অনেকেই এখন ফেসবুকের গ্রুপে। কৈশোরে যার সঙ্গে কথা বলাতো দূরে থাক, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। তাঁদের কে ভার্চুয়াল জগতে পেয়ে আমাদের ছেলে বন্ধুদের হ্যাংলামি চোখে বাঁধে । ঠিক তেমনি, মহল্লার একসময়ের ডাকসাইটে সুন্দরীরা যাঁদের মেদ জমেছে, চোখের নীচে কালি, ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁরাও তাঁদের রূপমুগ্ধদের এতোদিন পরে হাতের নাগালে পেয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত ! সেই স্কুলের দিনগুলোতে , আমাদের যখন মানসিক বয়স ১৩-১৪ তে আটকে ছিল, আমাদের বান্ধবীদের তখন প্রকৃতির নিয়মে দ্রুত বেড়ে উঠছিল হরিণীর শরীর । আমাদের বান্ধবীরা বুঝে গিয়েছিল, কী অমূল্য সম্পদের মালিক তাঁরা ! সারাক্ষণ নানা বয়সের যুবকদের আহাজারি তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছে ! বান্ধবীদের বড় একটা অংশ তড়িঘড়ি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত সফলদের বিয়ে-টিয়ে করে ঘরসংসারী হয়ে গেল।

আজ এতোগুলো বছর পরে , তাঁদের রূপমুগ্ধদের একসঙ্গে পেয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁদের নানা ভঙ্গীর ছবি লোডের বাহার আর লাইক গোনার হুল্লোড় শুরু হয়ে গেছে। শিকারি বিড়ালের মতো এরা ইঁদুরকে একবার ধরে আবার ছাড়ে। আবার ধরে, আবার ছাড়ে ! মারেও না , খায় ও না ! এটাই খেলার মজা । বয়স হয়েছে , কিন্তু সেই শিকারির ট্রেনিং তো আর ভুলে যায় নি সে। এর মাঝেই কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত সম্পর্ক দাঁড় করিয়ে ফেলে , সেটা কোথায় গিয়ে গড়ায় সে তারাই জানে।

ঠিক কেমন মেয়েদের সঙ্গে পরকীয়ার জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত পুরুষরা? স্ত্রীরা ভাবেন যে পরকীয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিনী হয়তো তাঁদের চেয়ে আকর্ষণীয় উদ্ভিন্ন যৌবনা , দুষ্টুমি আর গ্ল্যামারের একটা মিশ্রণ ! কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। পরকীয়া হয় অনেকাংশে সমবয়সী পুরুষ-নারীর অথবা তার বেশি বয়সী কারো সঙ্গে । এমনকি স্ত্রীয়ের চেয়ে অনেক কম সুন্দর ও শিক্ষিতাদের সঙ্গে । কীভাবে কীভাবে যেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিনী তার টার্গেট করা পুরুষটির মনের শূন্য জায়গাটি দখল করে নেয়। যে বিষয়গুলো নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন কথা বলেন না। তাঁদের পয়েন্ট অভ ইন্টারেস্ট না , সেইগুলোতেই আলোচনা এগুতে এগুতে পুরুষটি খুঁজে পায় তার মানসিক অবলম্বনকে । মানসিক শূন্যতা আর ফিল ইন দি গ্যাপ থেকেই সম্পর্ক বাড়তে বাড়তে অবধারিতভাবে দৈহিকতায় যেয়ে শেষ হয়। সেটা নিয়ে কোন জড়তা থাকে না উভয়পক্ষের কারো মাঝে ।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ভাল কী মন্দ কীএসব নিয়ে মন্তব্য করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি লেখার শুরুতেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, পরকীয়ার একপেশে মন্দ দিকের পাশাপাশি ভালো দিকও আছে। পরকীয়া নতুন করে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। সারাদিন ধরে একজন পুরুষ অফিসের কর্মকর্তা, বাসায় ফিরে কারো পুত্র, কারো পিতা, কারো কাকা-জ্যাঠা, কারো স্বামী ! ঠিক একই ভাবে নারীটির পরিচয় কারো মা, কারো কন্যা, কারো চাচী-ফুফু, কারো স্ত্রী ! সমাজের আরোপিত পরিচয়ের বাইরে আর কোন পরিচয় থাকা সম্ভব না। সেই নারী ও পুরুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে সব ব্যাপারে অনেক সচেতন ও সাবধানী হয়ে যায়, নিজেকে আরো বেশী করে গুছিয়ে তোলেন। দাম্পত্যের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি মেলে। আবার একটা অপরাধ বোধ থেকে নিজের জীবনসঙ্গী অথবা জীবনসঙ্গিনীর ব্যাপারে ভালোবাসা বেড়ে যায়, সম্পর্কের উন্নতি হয়। সবচেয়ে বড়কথা নিজেকে নতুন করে ভালোবাসা শুরু করে পুরুষ ও নারী !

বলাই বাহুল্য, পরকীয়ার সম্পর্ক ঠিক কতদূর যাবে, কোথায় থামতে হবে সেটা অংশগ্রহণকারীদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে ! একই কর্মকাণ্ডে একজন দিব্যি সংসার করে চলেছেন ; তো আরেক জনের সংসার ভেঙ্গে একাকার। একটা সম্পর্কের বিনিময় মূল্য কতোখানি দিতে হচ্ছে সেটাই তাঁদের আগামীর পথ নির্ধারণ করে দেয়। । সামান্য অথবা অসামান্য রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চারের বিনিময়ে আপনি কী কী পেতে পারেন অথবা কী কী হারাতে পারেন, সেই হিসাব আপনার নিজস্ব।

সবার জন্য ভালোবাসা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা !

প্রকাশকালঃ ৭ই ফেব্রুয়ারি,২০২০

দার্শনিক ডায়োজেনিসের গল্প

টু হুম ইট মে কনসার্ন !

” দার্শনিক ডায়োজেনিসের আমলে যিনি রাজা ছিলেন, তাঁর নাম ডেনিস। রাজাকে তোষামোদ করতেন না বলে ডায়োজেনিসের জীবন ছিল অত্যন্ত ভোগবিলাসহীন। জীবনযাপন করতেন একেবারে সাধারণ মানুষের মতো। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক অ্যারিস্টিপাস নামের আরেক দার্শনিক রাজাকে তোষামোদ করতেন বলে মালিক হয়েছিলেন প্রচুর বিত্তবৈভবের। একদিন খাওয়ার সময় ডায়োজেনিসকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে দেখে অ্যারিস্টিপাস ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘আপনি যদি রাজাকে তোষামোদ করে চলতেন, তাহলে আজ আর আপনাকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে হতো না।’
জবাবে ডায়োজেনিস হেসে বললেন, ‘আর আপনি যদি শাক দিয়ে রুটি খাওয়া শিখতেন, তাহলে আজ আর আপনার রাজাকে তোষামোদ করে চলতে হতো না।’

ছোটগল্পের চেষ্টা

মাথার কাছের জানালা , হাস্নুহেনা গাছ ছিল একটা । হাত দিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছোঁয়া যায়। ছোট খালা বললো, ‘ যে রকম গন্ধ, দেখিস সাপ আসবে!’ ঢাকার শহরে সাপ ? মানুষই টিকতে পারে না !

তবু মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে একবার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকাতাম যদি সাপ দেখা যায় ! মনটা হু হু করতো, কিংবা গভীর রাতে বিষণ্ণ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
আসলে, হাস্নুহেনা গাছ আর সাপ পর্যন্ত ঠিক আছে । পরের গুলো আমার লেখকস্বত্বার আরোপিত আবেগ ! এর পরে ধরেন, আমি আমার আশে পাশের সবার চরিত্র বিশ্লেষণ করে টক-ঝাল কিছু শুরু করলেই একটা ছোট গল্প হয়ে যেতে পারে!

মুশকিল হচ্ছে, আমি সেই ছোট্টবেলায় বিছানায় হিসু করতাম এবং গভীর রাতে আমার ঘুম আগেও ভাঙ্গে নাই, এখনো ভাঙ্গে না !ছোট গল্প? দিল্লি দূর অস্ত !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৭