আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ও জনগণ।

আমার গার্মেন্টস চাকরীর প্রথমদিকে। ক্লিনটন সাহেব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
মনিকা লিউন্সকির ওরালসেক্স নিয়া রীতিমত ইম্পিচমেন্টের অবস্থায় ক্লিনটন।
আমেরিকান এক ক্রেতা বন্ধুকে বললাম, ‘তোমাদের চেয়ে ভণ্ড জাতি দুনিয়াতে আরেকটা নাই।’
সে বলল, ‘কেন ?’
‘তোমরা ফ্রি সেক্সের দেশে গে ,লেসবিয়ান, অ্যানিম্যাল , ওরাল, অ্যানাল কিছুই বাদ দেও না। আর বেচারা ক্লিনটন সামান্য এক ওরালসেক্স কেসে চাকরিটা হারায় হারায় !’

উল্লেখ্য, তখন আমার এই ইয়ং ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্টকে বেশ ভালো লাগতো। যুদ্ধবাজ বুশের জায়গায় সে আসাতে আমাদের প্রজন্ম খুশিই ছিলাম।
আমেরিকান বন্ধু বলল, ‘ তোমাকে একটু বুঝিয়ে বলি। আমার ধারনা তুমি ব্যাপারটা বুঝবে।’
‘শোন জাহিদ, ধরো তুমি ব্যক্তিজীবনে উচ্ছৃঙ্খল, অনাচারী, বহুগামী, লম্পট , মাতাল অনেক কিছুই হতে পারো। তোমার পথের পথিক যারা, আশপাশের সবাইকে তুমি অবলীলায় মেনেও নিতে পারো।
কিন্তু, ধরো তোমার বাবা যিনি তোমার শ্রদ্ধার জায়গায়, তিনি যদি প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তোমার সামনে লম্পটগিরি করে, পারবে মেনে নিতে ? আমরা আমেরিকানরা নিজেরা যতোই ভণ্ডামি যতই করি না কেন , প্রেসিডেন্টকে আমরা পিতার মতো দেখি। তাঁর সামান্য স্খলনও আমরা মেনে নিতে পারি না। ’
আমি আমার উত্তর পেয়ে গেলাম।

প্রথম প্রকাশঃ ২রা এপ্রিল ২০১৩

ইশকুল স্মৃতি সমাজবিজ্ঞান সাধারণ বিজ্ঞান

ক্লাস সেভেন।

সমাজবিজ্ঞান আর সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষা পাশাপাশি দুই দিনে হয়। এটাই নিয়ম।বাংলা পরীক্ষার পর যেমন ইংরেজি। স্কুল ষাণ্মাসিক । যথারীতি রুটিন হাতে লিখে  কপি করে টেবিলের সামনে টাঙ্গানো থাকে। গ্যাঁ গ্যাঁ করে মাথা দুলিয়ে পড়াশুনা চলে ।

পরীক্ষার হলে গিয়ে দোয়া দরূদ পড়ে খাতা ভাঁজ করে, কোশ্চেন পেপারের জন্য অপেক্ষা। ভীষণ কড়া মেজাজের নুরুল ইসলাম স্যার প্রশ্নপত্র দিলেন।

দ্বিতীয় বেঞ্চে আমি আমার পরের বেঞ্চে ক্লাসের সেকেন্ড বয় তুহিন।কোশ্চেন পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম,  হাসি হাসি মুখ করে স্যারকে বললাম, ‘স্যার ভুল কোশ্চেন দিছেনতো । আজকে সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষা !’

স্যার এগিয়ে আসতে আসতেই , পিছন থেকে তুহিন মৃদুস্বরে খোঁচা দিলো, ‘গাধা বইস্যা পড়, কোশ্চেন ঠিকই আছে, আজকে সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা ! আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এই মুখস্থের সাবজেক্টে আমি অলওয়েজ ল্যাজেগোবরে ! আমিতো সাধারণ বিজ্ঞান পরীক্ষার সেই রকম প্রিপারেশন নিয়ে এসেছি।  সমাজ বিজ্ঞানে ঠনঠন !

তব্দা মেরে  বসে পড়ে ফিসফিস করে বললাম, ‘দোস্ত এই যাত্রা বাঁচা !’

মহানুভব তুহিন বলল, ‘ঠিক আছে, আমি খাতা বাঁকা করে লিখছি, তুই দেখে দেখে ল্যাখ !’

শুরু হল, কসরত করে ঘণ্টা তিনেক ধরে আড়চোখে ওর গোটাগোটা হরফের লেখা দেখা আর কপি করা। সবগুলো অ্যানসার দিয়ে  হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

তো কয়েকদিন পরে খাতা দিচ্ছেন স্যার। ততদিনে ক্লাসের সবাই আমার ঐ কুকীর্তির কথা জেনে গিয়েছিল।

তুহিনের রোল নাম্বার আমার আগে। ও পেয়েছে ৫৩ আউট অব ৭৫

আর আমি, পেয়েছি ৫৮ !

কাহিনী কি?

সঙ্গত কারণেই  তুহিনের মন খারাপ। একই সঙ্গে আশপাশে ফিসফাস। ক্যামনে কি?

ঘটনা হচ্ছে, তুহিনের গোটাগোটা হাতের লেখা আমার চেয়ে স্লো।

ওর দুই লাইন কপি করে বসে না থেকে, অবসর সময়ে আমি আবঝাঁপ আরো কয়েক লাইন লিখে ফেলেছিলাম ;  তারই ফলশ্রুতিতে আমার নাম্বার ওর চেয়ে বেশী !

মরাল অব দি স্টোরি ১: বিপদের বন্ধুই সবচেয়ে বড় বন্ধু।

মরাল অব দি স্টোরি ২: এই কাহিনীর পর থেকে রুটিন তোলার  ব্যাপারে আমি ব্যাপক সাবধান হয়েছিলাম। জীবনে এক ভুল দুইবার হয় নাই !

প্রথম প্রকাশঃ ১লা এপ্রিল ২০১৩

ঘুম

যেখানে সেখানে , যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ার অদ্ভুতুড়ে অভ্যাস বা ক্ষমতা ছিল আমার ! আমি ছিলাম অনেকের ঈর্ষার ! আমি এখন অন্যদের ঈর্ষা করি !
২০০৫ সালের ডিসেম্বরে অফিস পিকনিকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে বাস উল্টে কেলেঙ্কারি। কোমরের ফিমার ছুটে গেল পেলভিক থেকে। ছয় সপ্তাহ বিছানায়, ধীরে ধীরে ক্র্যাচ নিয়ে আবার হাঁটা শেখা। বড়কন্যা জেবা তখনও পৃথিবীর মুখ দেখেনি। আমার স্ত্রী ৭ মাসের সন্তানসম্ভবা। পুরো পরিবারের উপর দুর্যোগ।
দুর্ঘটনা যখন হয় , আমি তখন ১০৫ জ্বর নিয়ে বাসের জানালার পাশে তন্দ্রাচ্ছন্ন। মুহূর্তেই সব উলটপালট। যে আমি, ঢাকা কলেজে টেম্পোতে যাওয়ার সময় পাশের জনের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমাতাম ; বাসে সিট না পেলে হ্যান্ডেল ধরে ঘুমাতাম ; দুই ঘণ্টার বিমানযাত্রায়ও ঘাড় কাত করে ঘুমাতাম—ওই অ্যাকসিডেন্টের পরে কীরকম একটা আতঙ্ক গ্রাস করল আমাকে। যে কোন যানবাহনে আমি এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা অস্ফুট আতঙ্ক নিয়ে জেগে থাকি। দুই এক মিনিটের তন্দ্রা কেটে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই।
আমার হয়তো কোন সাইক্রিয়াটিস্ট সেশন দরকার ছিল– ওই আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার জন্য। নানা কারণে ভেবেছিলাম , এমনিতেই একদিন সেরে যাবে। আমি আবার বেঘোরে ঘুমাতে পারব। না ! হচ্ছে না ! কিছুতেই হচ্ছে না! যে কোন যানবাহনে, হোক সে প্রাইভেট কার, বাস, বিমান—আমি আর ঘুমাতে পারি না। একটা দুর্ঘটনা আমার জীবনের নিষ্পাপ, নিশ্চিন্ত ঘুম কেড়ে নিয়ে গেছে আজ এই ১৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও।
আমার টুনি আর দুই টুনটুনি আমার সেই বিখ্যাত অভ্যাস ধরে রেখেছে। যেখানে কাত, সেখানেই বেঘোরে ঘুম।
প্রকাশকালঃ ৭ই জানুয়ারি, ২০২০

প্রসঙ্গ: চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

প্রসঙ্গ: চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে জুন ও জুলাই মাসে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
সারাজীবনে ঈশপ সাহেবের কিছু গল্প বহুচর্চিত হতে হতে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে। কচ্ছপ ও খরগোশ ; রাখালবালক ও নেকড়েবাঘ, চালাক শেয়ালের গল্প ইত্যাদি।
সব গল্পের আদি ও অরিজিনাল একটা মোরাল থাকে।
যুগে যুগে সেই মোরাল আবার দার্শনিকেরা বদলে ফেলে। হাতির যেমন দুইটা দাঁত, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার। তেমনি , একটা মোরাল সবাই দেখতে পায়, আরেকটা বুজুর্গ লোকে বোঝে।
রাখাল ও নেকড়েবাঘের গল্পে পাহাড়ের পাদদেশে গভীর জঙ্গলের পাশে রাখালবালক ভেড়ার পাল চরাত। একাকীত্বের বোরিং জীবনে থ্রিল আনার জন্য সে একদিন চিৎকার করে ‘নেকড়ে বাঘ ! নেকড়েবাঘ !’
আশেপাশে ক্ষেতে খামারের কর্মরত গ্রামবাসীরা যে যার কাছে যা আছে নিয়ে ছুটে আসে। এসে দেখে রাখালবালক হাসছে। কিছুদিন পরে আবার চিৎকার ‘নেকড়েবাঘ, নেকড়েবাঘ !’ আবারো গ্রামবাসী ছুটে এলো সাহায্য করতে; সেই একই কাহিনী ।
শেষের বার কী হয় সবাই জানে।
সত্যি সত্যি বাঘ আসে, কিন্তু এইবার চিৎকার করেও লাভ হয় না ; কেউ রাখালবালককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনা। ভেড়ার পাল সমেত রাখালবালক বাঘের পেটে যায়।
ভাবলাম আমাদের দেশে বিদেশের নবীন দার্শনিকরা এই গল্পের নতুন কী কী মোরাল বের করেছে দেখি।
অরিজিনালের পাশাপাশি নবীন দার্শনিকদের মোরাল দেওয়া হল।
আপনার কোনটি যৌক্তিক মনে হয় জানান।
শুধু ইমো না দিয়ে কমেন্ট করলে নতুন কোন মোরাল আবিষ্কৃত হতে পারে !
অরিজিনাল মোরালঃ
সদা সত্য কথা বলিবে । মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না, এমন কি সে যখন সত্যি কথা বলে তখনও !
নতুন মোরাল ১: ধনী ও প্রভাবশালীদেরই ভেড়ার পাল থাকে। তারা একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুকে এরকম বিপদসংকুল কাজে পাঠিয়ে অন্যায় করেছেন। সে হয়তো ভয় কাটানোর জন্য, সঙ্গ পাওয়ার জন্য সবাইকে ডেকেছে। তার এই মজা করে মিথ্যা বলাটা দুর্বল শোষিতের আর্তনাদ , অন্যায়কারীদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপ।
নতুন মোরাল ২: রাখালবালক যে সমাজে বাস করে সেইটাই আমাদের সমাজ। নিপীড়িত জনগণ অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ও নেতারদের ক্রমাগত আশ্বাস ও সম্ভাব্য বিপদের কথা শুনতে শুনতে তাদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। যখন সত্যি বিপদ আসে, তখন সে বুঝতে পারে না কোনটা আসল বিপদ আর কোনটা নকল বিপদ ।
নতুন মোরাল ৩: অনভিজ্ঞ লোকের কাছে বিপজ্জনক দায়িত্ব দিয়ে বসে না থেকে সারাক্ষণ সেটা মনিটর করতে হয়। কারণ সত্যিকার কোন দুর্ঘটনা ঘটলে রাখালবালকের জীবনতো যাবেই ; কিন্তু প্রভাবশালীদের ভেড়ার পালও বাঘের পেটে যাবে।
নতুন মোরাল ৪: সত্য কথা বললে বাঘের পেটে যেতে হয়। রাখালবালক যতো বার মিথ্যা কথা বলেছিল, ততবার মানুষ তার ডাকে সাড়া দিয়েছে। সে মাত্র একদিন সত্য কথা বলেছিল। সেদিন কেউ তার বিপদে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কাজেই সত্য কথা বলতে হয় না। কৌশলী হতে হয়। মিথ্যা বলতে হয়।
প্রকাশকালঃ ৩০শে মে ২০২০

করপোরেট অবজারভেশন (টারজান ইংলিশ)

টারজান ইংলিশ 

আমাদের ট্রেডে বা করপোরেট জগতে অনেক লোককে স্মার্ট ভাবা হয় শুধুমাত্র পলিশড্ ইংরেজি বলার দক্ষতা দিয়ে। আমি এমন অনেককে  চিনি, যাঁদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা  অসাধারণ, আন্তর্জাতিক মানের , কিন্তু ট্রেডে তারা ব্রাত্য,  কারণ ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা নাই।

গার্মেন্টস ট্রেডের প্রথমদিকে একবার কোন এক ইস্যুতে ক্রেতাকে কড়া ভাষায় ই-মেইল দিয়েছিলাম। আমার ভাষাজ্ঞান ও টুইস্টেড ইংরেজি বলার দক্ষতার অভাব নিয়ে আমার সুপারভাইজার সোজা চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করে বসলেন। চেয়ারম্যান পুরো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখলেন। তিনি ছিলেন  ঠোঁটকাটা লোক।  সবার সামনেই বললেন, ‘জাহিদের এই ই-মেইলে কাজ হইছে কিনা সেটা বলেন!  ক্রেতারা আমাদের ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে বিচলিত নয়। আমেরিকা-ইংল্যান্ড ছাড়া বেশীরভাগ দেশের ক্রেতারা টারজান ইংলিশ দিয়েই ব্যবসা করে। আই টারজান, ইউ জেইন, উই লাভ। ঘটনাতো ক্লিয়ার। টারজান জেইনরে ভালোবাসে। এতে গ্রামার থাকলেই কি আর না থাকলেই কি!’

অনেককে দেখি, ইংরেজিতে লেজেগোবরে কিন্তু, নিজের কাজের কারিগরি দক্ষতায় অনন্য। বুঝি এঁদের যদি আরেকটু প্রকাশভঙ্গী ভালো থাকতো এঁরা অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারতেন।  চীন জাপানের উদাহরণ টেনে লাভ কী, ওরা এটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। কিন্তু আমাদের মানসিক দীনতা কোনদিন কাটবে বলে মনে হয় না !

এরকম কোন কিছু হলে, সহকর্মীদেরকে চেয়ারম্যান সাহেবের টারজান ইংলিশের গল্পটা শুনিয়ে দিই।

শুধু পলিশড্ ইংরেজি নয়, টেকনিক্যালি নিজেদের ঋদ্ধ করেন। বলছি না, ইংরেজিতে দক্ষতার দরকার নেই। তাই বলে সেটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। কর্মক্ষেত্রে যে কোন ইস্যুতে নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে প্রকাশ করুন।

প্রথম প্রকাশঃ ১৪ই জুন , ২০১৪