টুসু আমার চিন্তামণি।।উৎপলকুমার বসু

সে হয় না।

হয় পুরোটা পাগল হও, নয় তুমি মরে যাও।

এই মাঠ মানুষ বিক্রির মাঠ,

এইখানে তুলা ও রমণী একত্রে ওজনে ওঠে,

এইখানে সর্প ও বৃশ্চিক একত্রে অপেক্ষা করে খদ্দের আসার,

এই গৃহ জনহীন, এই দেহ ভাঙা হাট বটে—

মরে গেলে হবে? তারও পরে খরচাপাতি আছে।

উৎপলকুমার বসু।। টুসু আমার চিন্তামণি। প্রকাশ ১৯৯৯

তিল।। উৎপলকুমার বসু

ঐ যে ছেলেটা দেখছ, স্থিরচিত্রে, একটু বাঁ- দিক ঘেঁষে , থমকে
রয়েছে, আরো বহু মানুষজনের সঙ্গে , কিছুটা ত্যারচাভাবে,
অন্য কিছু দেখছে হয়ত, হাসছে, নাকি কিছু চিবিয়ে খাচ্ছিল,
হাতে তো ঠোঙাই দেখছি, মুঠো ভর্তি কাঁচা সূর্য, চাঁদ লঙ্কা,
নক্ষত্রের মশলা-মাখানো ঝালমুড়ি, খাচ্ছে কিন্তু যথেষ্ট ক্ষুধায়
নয়, অন্য কিছু ভাবছে যেন সে—ঐ আমি, আমিত্ববিহীন , ফটো-
সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরে-রাখা মহাজাগতিক এক সৌরচিত্র,
তখন সকাল এগারোটার হবে বুঝি, শীত শেষ হয়ে আসছে,
বসন্ত এসেছে—বহু, বহুদিন আগে , এই বাংলায়, হাওড়ায়,
রেলের ইয়ার্ডে, জোড়া লাইন হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে আরো
অনেকের সঙ্গে, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রেন, এই ফাঁকে
ওরা অন্যদিকে চলে যাবে মনে হচ্ছে।

উৎপলকুমার বসু।। শরীরচিহ্ন। প্রকাশ ২০০২।।

উৎপলকুমার বসু। অগ্রন্থিত কবিতা ৩৪ । প্রথম সংস্করণ ১৯৯৬

দিদি, ধন্যবাদ। আমি হলেবীদ্ মন্দিরের
স্ত্রী-যক্ষ মূর্তিটিকে হেসে বলি,
এসো , আমাদের সামান্য আশ্রয়ে একদিন
থাকো, আতিথ্য গ্রহণ করো, আমাদেরই সংসারের
উত্থানপতনে ভ্রষ্ট হও, জয়ী হও,
আমাদের আলনা শেয়ার করো, এই তাকে বই রাখো,
কার্তিক সন্ধ্যায় প্রথম শ্যামাপোকা দেখে বিষণ্ণ হও,
আমাদের সংসারের উপর চিরদিন কালো মেঘ, অনেক ঝড়, অনেক বজ্রপাত—
দ্যাখো, সে-সৌন্দর্য তোমার চেয়ে কিছু কম বিষাক্ত নয়।

উৎপলকুমার বসু। অগ্রন্থিত কবিতা ৩৪ । প্রথম সংস্করণ ১৯৯৬

উৎপলকুমার বসু। অগ্রন্থিত কবিতা ৫ । প্রথম সংস্করণ ১৯৯৬

তুমি তো বৈচিত্র্যে নও , একটি নির্দিষ্ট রঙে স্থির আছো
যার নাম ধূপছায়া । এ-রঙের প্রকৃতি কেমন
তা যদি জানতে চাও তবে একদিন প্রবল
বৃষ্টির শব্দে জেগে উঠতে হবে। দেখে নিয়ো
জানালা খোলা। হয়ত বা বন্ধ আছে, কোনোটারই
কাচ নেই। কাঠের চেয়ারটেবিল জলে ভাসছে।
আজ ছুটি। ছাত্ররা উধাও। তুমি একা বেকুব মাস্টার
ক্লাসরুমে ঘুমাচ্ছিলে। জেগে উঠলে এইমাত্র।

উৎপলকুমার বসু। অগ্রন্থিত কবিতা ৫ । প্রথম সংস্করণ ১৯৯৬

ঢাকার ট্রাফিক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সহজে বিশ্বাস করতে চাই না । মুসলমানদের সকল দুর্দশার জন্য দায়ী ইহুদি অথবা বাংলাদেশের সকল অস্থিরতা আর অরাজকতার জন্য দায়ী ভারত ; মৌলবাদীদের সকল উত্থানের পিছনে শুধুই পাকিস্তান—এই সব আমার কাছে বড্ডো ক্লিশে মনে হয় !
দিন কয়েক আগে এক সাংবাদিক বন্ধু তাঁর এক দেশি-বিদেশী নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডার কথা শেয়ার করছিল। তাঁদের আলোচনায় নাকি একটি প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী বাস করে বড় শহরগুলোতে। হোক সে দিল্লী, ঢাকা অথবা অন্যকোন মহানগরী ! রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুষঙ্গ যারা , তারা নাকি চায় , এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সকালের ট্রাফিকে ক্লান্ত হয়ে থাকুক সারাদিন ; আর সন্ধ্যার ট্রাফিকে আরো বেশি ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে নির্জীব হয়ে পড়ে থাক পরের দিনের ট্রাফিকের অপেক্ষায়।
তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোতে ট্রাফিক দূরীকরণ হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বনিম্ন প্রায়োরিটি।

রাষ্ট্রযন্ত্র চায় ট্রাফিক দীর্ঘমেয়াদে থাকুক ! অথবা তারা চায় ট্রাফিক এতো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হোক, যে তার সময়োপযোগী সুফল জনগণের কাছে থাকুক চির অধরা। শুনেছি ব্রিটিশ রাজের সময়ে জেলখানার কয়েদীদের খাবারে চুলকানির উপাদান মিশিয়ে দেওয়া হত। জেলের পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ আর অখাদ্য খেয়ে রাজবন্দী থেকে শুরু করে সকল কয়েদী অসুস্থ হয়ে থাকত, নির্জীব হয়ে পড়ে থাকত। নিজের শরীর যেখানে চলে না, সেখানে একজন কয়েদী আর স্বাধীন ভারতের জন্য কতোখানি চিন্তা করতে পারবে ! বিশ্বাস করতে চাই না, তবু ঐ যে বললাম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব– বন্ধুর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও বোধহয় ব্রিটিশ রাজের কয়েদীদের মতোই অবস্থা !

আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদদের নানা ধরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ফাইলবন্দী হয়ে উইপোকা খায় ! রাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে আছে স্বল্পমেয়াদের ফ্লাই ওভার নিয়ে। সমন্বয়হীনতা এমন পর্যায়ে যে, একটা রাস্তা দুই বছরের মধ্যে তিনবার পিচঢালাই আর ফুটপাত টাইলস দিয়ে সারা হয় তো আর চারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখা হয় জনগণের অসহায়ত্বকে একেবারে মাটিতে পিষে থেঁতলে ফেলা দেখার বীভৎস আনন্দে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে দীর্ঘমেয়াদের টেকসই ঢালাই রাস্তার কথা বলেছেন কয়েকবার ; অথচ সেই প্রকল্প ফেলে রেখে সবাই মিলে উঠেপড়ে লেগেছে এই বর্ষাপ্রবণ কাদামাটির দেশে পিচের রাস্তার বাইরে কোনকিছু না করতে !

মিরপুরের কালসি থেকে যে নতুন ফ্লাইওভারটি সরাসরি ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে যোগ দিয়ে হোটেল র‍্যাডিসনের সামনে গিয়ে অথবা কুড়িল ফ্লাইওভারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল — সেটা এখন হুট করে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে সড়কের জ্যাম চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে ! এবং এটা নাকি করা হয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে।

এভাবে সরকার প্রধানের সদিচ্ছাকে নিজেদের হীন স্বার্থে জলাঞ্জলি দিতে এতোটুকু দ্বিধা করছে না রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল নিয়ামকরা। যে দেশে নগর পরিকল্পনাবিদদেরই সামান্যতম মূল্যায়ন নেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ; সেই দেশে সাধারণ জনগণের আহাজারি কী করে পৌঁছাবে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে !

প্রকাশকালঃ ২রা মার্চ,২০২০