by Jahid | Nov 24, 2020 | সাম্প্রতিক
করোনাক্রান্তিতে আর সকলের মতোই টোনা ও টুনি তাহাদের সবেধননীলমণিদেরকে সহিত নানাবিধ কীর্তিকাহিনী লইয়া সময় অতিবাহিত করিতেছে। ইদানীং বৃহদাকার শিরঃপীড়া হইতেছে- দুই টুনটুনির অনলাইন ক্লাস। বাসায় একটা আদ্যিকালের ব্রডব্যান্ড লাইন রহিয়াছে ; রাউটার সহযোগে কয়েকজন ব্যবহার করিতাম । বড়টির জনৈক শিক্ষক আদেশ দিলেন, ভাগের ইন্টারনেটে চলিবে না ; একান্ত ব্যক্তিগত লাইন লাগিবে। ভাগের মা নাকি গঙ্গা পায় না ! ভাগের ইন্টারনেটে গতি কম । এই দুর্মূল্যের বাজারে গুচ্ছের টঙ্কা খরচ করিয়া আরেকটি সরবরাহ লাইন লইতে হইল। মাসের খরচে আরেকটি ওজন যুক্ত হইল। ছোটটির জন্য আগের লাইন।
হায় ! তাহাতেও কি সোয়াস্তি আছে ! ঝড়বৃষ্টি দূরে থাকুক, একটুখানি মেঘের গুড়গুড়ে আওয়াজে সেই ভাগের লাইন ও একান্ত ব্যক্তিগত লাইন যায় বিগড়াইয়া । সকাল আট ঘটিকায় ক্লাস। সাজিয়া গুজিয়া যন্ত্রের সম্মুখে বসিয়া দেখা গেল ইন্টারনেট লাইন বিকল। এক অনর্থক অস্বস্তিতে সরবরাহকারীদিগকে ফোন দাও রে, ডাকো রে চলিতে থাকে। এবং টুনির উত্তরোত্তর উত্তেজনা বৃদ্ধি হইতে থাকে।
অধুনা অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে অনলাইন পরীক্ষাও শুরু হইয়াছে । খরচ বৃদ্ধির আরেক প্রস্থ বুদ্ধি বাহির হইল; সরবরাহ লাইনে সমস্যা হইলে, মোবাইলের ডাটা ব্যাবহার করিয়া শিক্ষাদান সচল রাখিবার। সপ্তাহে সপ্তাহে নানা মোড়কে আবৃত ডাটা কিনিয়া তাহা ব্যাকআপ হিসাবে রাখা শুরু হইল। সেই ডাটার কিয়ৎ ব্যবহৃত হয় ; সিংহভাগ অপচিত হয় মেয়াদোত্তীর্ণ নামক ফাঁকিবাজির কারণে।
শিক্ষার খরচ ক্রমশ: বাড়িয়া যাইতে লাগিল।
দিনকয়েক আগে ছোটটির ক্লাস চলিতেছিল দিব্যি। কিয়ৎক্ষণ পার হইলে, তাহার আর্তচিৎকার ! জুম নামক বিশেষ শ্রেণীকক্ষে সে ঢুকিতে পারিতেছে না। কহিলাম, এই তো দেখিলাম কিছুক্ষণ আগেও আরেক শিক্ষিকার কক্ষে অবস্থান করিতেছিলে। অকস্মাৎ, কী হইল !
আবারও কী বালুকণা তুলিতে গিয়ে সাবমেরিন লাইন কর্তিত হইয়াছে !
আরেক কক্ষে বড়টির খবর লওয়া হইল। সে দিব্যি পাঠরত রহিয়াছে। কম্পিউটার নামক যন্ত্র বিগড়াইলে তাহাকে পুনশ্চালনা করিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয় ; ইহা টোনা সেই আশির দশকে শিখিয়াছে। সে তাহাই করিল, হা হতোস্মি !
উত্তেজিত টুনি, অবশেষে ছোটটির সতীর্থ আরেক শিক্ষার্থিনীর মাতাকে মোবাইল সহযোগে খোঁজ লইল। সকলেই নাকি দিব্যি শিক্ষালাভ করিতেছে। শুধু ছোটটির শিক্ষা বাধাগ্রস্ত। পাঠদানের একেবারে শেষে ছোটটির সহচরীর মাতা কর্তৃক শ্রেণিশিক্ষিকাকে ধরিয়া তাহাকে কক্ষে প্রবেশ করানো হইল। সেই শিক্ষিকা অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়া তিরস্কার শুরু করিয়া দিলেন। তিনি নাকি তাহার সভাকক্ষে নতুন নাম দেখিয়া প্রবেশ করিতে দেন নাই। কেননা, ছোটটি —যে কীনা সদ্য পরীক্ষাহীন শিক্ষাবর্ষ কাটাইয়া তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইয়া যারপরনাই উৎফুল্লিত ; যাহার পিতৃপ্রদত্ত নাম ‘শ্রেয়া নুসরাহ’, সেই নাম , কী কারণে যেন পরিবর্তিত করিয়া রাখিয়াছে ‘আই অ্যাম নো বডি’ ! সুতরাং শিক্ষিকার কোন কসুর নেই। তিনি সঠিক কাজটিই করিয়াছেন ; ‘আই অ্যাম নো বডি’ নামক ব্যক্তিকে শিক্ষাগৃহে অনুপ্রবেশ করিতে না দিয়া।
আমি ছোটটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম , নাম পরিবর্তনের হেতু কি ? ( উল্লেখ্য, নাম কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, তাহা টোনাই মাত্র দিন কয়েক আগে শিখিয়াছে। সম্ভবত: ছোটটি তাহা দেখিয়াছিল। ) সে ইংরেজদের মতো কাঁধ ঝাঁকাইল। ইহার অর্থ অনেক রকম হইতে পারে । ‘আমার ইচ্ছে !’ ‘তো ?’ ‘সমস্যাটা কি?’ ‘আশ্চর্য !’ অথবা ‘মুড়ি কিনিয়া খাও গিয়া !’
এবং যথারীতি টুনি আমার চতুর্দশ বংশলতিকা তুলিয়া শাপশাপান্ত করিতে থাকিল। কোন কুক্ষণে , এই বংশের পাল্লায় সে পড়িয়াছে ; কেন এই বংশের সন্তানেরা সহজ নিয়মে চলিতে চাহে না ; কেন এই বংশে তাহাকে শকুন্তলার ন্যায় পাঠাইয়া দিয়া তাহার হাড়মাস জ্বালানোর ব্যবস্থা করিয়াছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
উত্তরপ্রজন্মের কীর্তির জন্য আমার সকল প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা তিরস্কৃত হইতে থাকিল। এই তিরস্কার কতোকাল অবধি চলিবে সে সর্বময়ই জানে!
[ প্রকাশকালঃ ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি
দৃশ্যপট ১:
আশির দশকে ঢাকা থেকে পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোতে যাওয়ার সহজলভ্য রুট ছিল ঢাকা-আরিচা-গোয়ালন্দ হয়ে যাওয়া। আব্বা-আম্মার সাথে নানাবাড়ি যাচ্ছি–শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতির একটা। লঞ্চের ভেঁপু, ঘাটের হোটেলে আব্বার সাথে বড়মাছের পেটি দিয়ে ভাত খাওয়া। হোটেলের সামনে বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের থালায় রাখা টকটকে রঙের তরকারি। ঘাটের হোটেলের মেসিয়ারগুলোও কী যত্ন করে আমাদের বসতে দিত, প্লেট এগিয়ে দিত; শিশু হিসাবে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হত।
খাওয়া শেষে গোয়ালন্দ স্টেশনে কুষ্টিয়া-গামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। ট্রেন শুরু হলেই সেই আঞ্চলিক টানের হাতি-ঘোড়া মারা চিৎকার চেঁচামেচি। এখন চীনাবাদাম তো একটু পরেই ঝালমুড়ি, তারপরে সিদ্ধ ডিম। ‘এই চানাচ্চুর’ শুনে আবার খাওয়ায়। রাজ্যের হিজিবিজি খাওয়ার অবাধ স্বাধীনতা ঐ সময়টিতে।
দৃশ্যপট ২:
নদীর গতিপথের পরিবর্তনে ফেরিঘাট আরিচা থেকে সরতে সরতে পাটুরিয়াতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন হয়নি শুধু দরিদ্র চেহারার ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর ছেলেদের মসজিদ বা মাদ্রাসার জন্য চাঁদা তোলাটা। ঘাটের মোড়ের জ্যামে গাড়ী থামলেই , চাঁদার রশিদ বই হাতে এক বা অধিক দরিদ্র চেহারার মুসল্লি সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।
সম্ভবত: আরিচা ঘাটের একটা নির্দিষ্ট মোড়ে আমি বছর বিশেক ধরে ছোট একটা মাইক দিয়ে মসজিদের চাঁদা তুলতে দেখেছি। আদৌ মসজিদ হয়েছে কীনা জানিনা। হয়তো বাঁশের ছাপড়ার একটা মসজিদ হয়েছে , হয়তো হয়নি ; কিন্তু আমি জানি, চাঁদার বড় অংশটাই ব্যয়িত হয়েছে পার্থিব ক্ষুন্নিবৃত্তির কাজে।
দৃশ্যপট ৩:
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরের একপ্রান্তে , মিরপুরে । কালেভদ্রে গ্রামে নানার বাড়ী। ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর বা বড় দাঁড়ির যুবকদের প্রাদুর্ভাব গ্রামেই বেশী ছিল। নতুন যে হুজুরটি সম্মানের সাথে বৈঠকখানায় আপ্যায়িত হচ্ছেন , সে হয়তো বছর দশেক আগেও আমার ছোটমামার স্কুলের সতীর্থ ছিল। এখন সে সবার আখিরাতের হেফাজতের পরামর্শ দিয়ে থাকে। ঐ দিকে ঢাকায় আমাদের বাসার পাশেই ছিল মসজিদ ও লাগোয়া কওমি মাদ্রাসা। বেশ অনেকবছর ধরে মহল্লার বাসাগুলো থেকে রোস্টার পদ্ধতিতে সপ্তাহের একদিন করে করে মসজিদের ইমামকে খাবার দাবার পৌঁছে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। নিজেরা যাই খাই না কেন, ইমাম-সাহেবের জন্য ঠিকই আম্মা আঁচলের বাঁচিয়ে রাখা টাকা বের করে মুরগীর ঝোল করে খাওয়াতেন। ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’ আর ‘ধর্মভীরু মুসলমান’। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে বড় ধরণের তফাৎ আছে। আমাদের বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন ‘ধর্মভীরু মুসলমান’ !
পবিত্র আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য আমাকেও মহল্লার মাদ্রাসায় যেতে হয়েছে ! কিন্তু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আলিফ জবর আ, বে জবর বা করে করে আমপারা পর্যন্ত আসতে আসতেই বোর্ডের বৃত্তি পরীক্ষা চলে আসল। আমার পবিত্র ভাষা শিক্ষার ওইখানেই সমাপ্তি। পাশাপাশি বসে আরবী পড়ার সময় আমার মাথায় যখন টম অ্যান্ড জেরী, থান্ডার ক্যাটস ঘুরতো ; আমার পাশে বসা নিম্নবিত্ত অপুষ্ট ছেলেটার মাথায় হয়তো তখন ঘুরতো দুপুরের খাবারের চিন্তা ,মাদ্রাসার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরমমসলা তরকারির গন্ধ। একটা অনতিক্রম্য সামাজিক-আর্থিক-মানসিক দূরত্বে বেড়ে ওঠা আমাদের।
উচ্চ-মধ্যবিত্ত কাছের এক বন্ধুর দুইভাই-দুইবোনের সবচেয়ে ছোটভাইটিকে মাদ্রাসায় দেয়া হয়েছিল। যথারীতি ব্যবসায়ী বাপ-দাদার আখিরাতের সুরাহা করার আশায়। ঘরোয়া নানা উৎসবে ছোটভাইটি আমাদের সঙ্গে সব ব্যাপারে তাল মিলিয়ে চললেও ওর সেই সাদা জোব্বা আর দাঁড়ি নিয়ে কোথায় যেন একটা দূরত্ব থাকত ! দিনে দিনে সেটা বেড়েই গেছে আর কমেনি !
মূল প্রসঙ্গে আসি।
মাদ্রাসার ব্যাপারে আমার কোন বিদ্বেষ ছিলনা বা নেই। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘লালসালু’ র সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরে কেন জানি মনে হয়েছে বাংলাদেশে ধর্মের আধ্যাত্মিকতা বা স্পিরিচুয়ালিটির চেয়ে এর ভিক্ষাবৃত্তির ব্যবসাটা অনেক বেশী শক্তিশালী । গরীব ঘরের ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পেলে অন্তত তাঁর নিজের খাওয়া পড়ার চিন্তা থাকে না। এমনকি মধ্যবিত্তের যে ছেলেটি স্কুলের পড়াশোনায় একটু দুর্বল তাকেও আর আখিরাতের লোভে মাদ্রাসায় দিয়ে দেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল।
আমার কাছে মনে হয়েছে এই ফিনফিনে দাঁড়ির হুজুরদেরকে সামাজিকভাবে খাইয়ে দাইয়ে আমরা একটা ভিক্ষুকশ্রেণিই তৈরি করে চলেছি। কোনরকম কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শুধু ধর্মীয় অনুশাসন- আচারের চর্চা বজায় রাখার জন্য , সমাজের এতো বড় একটা কর্মক্ষম অংশকে আমরা অকর্মণ্য পঙ্গু করে চলেছি। এই ভিক্ষাবৃত্তি আমার ভালো লাগেনি কখনোই।
এই মধ্য যৌবনে এসে জঙ্গিবাদের উত্থান বা হেফাজতের উত্থানে আমি মর্মাহত হয়েছি। আমার ভিতরে কিছুটা বিতৃষ্ণা এসেছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই । বহুবছর ধরে আমাদের বাড়ির কোরবানির চামড়ার টাকা মহল্লার মাদ্রাসায় দেওয়া হত।গত বছর পাঁচেক আগে থেকে আব্বা-আম্মা বেঁচে থাকতেই তাঁদের অনুমতিক্রমে সেটা এখন দেওয়া হয় দরিদ্র আত্মীয়দের।
আমার সহকর্মীর সাথে বহুদিন আগে কথা হচ্ছিল আমাদের এই অনুৎপাদনশীল কওমি মাদ্রাসা-শিক্ষিতদের জনগোষ্ঠী নিয়ে। সহকর্মী তাঁর শিক্ষক পিতার প্রসঙ্গে কথা উঠলে চমৎকার কিছু কথা বলেছিলেন, মনে গেঁথে আছে। সহকর্মীর বাবা দীর্ঘদিনের মফঃস্বলের শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা-শিক্ষিত মৌলভিদের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলার দারুণ একটা সমাধান বলেছেন। আমার ভালো লেগেছে। আমি জানি তাঁর এই মতের সাথে অনেকে দ্বিমত পোষণ করবেন। কিন্তু এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বহুভাবে বলেও কওমি মাদ্রাসায় আধুনিক শিক্ষার কারিকুলাম কোন সরকার এস্টাব্লিশ করতে পারেন নাই। চারিদিকে যে ধর্মীয় আবহাওয়া বেড়ে উঠছে ভবিষ্যতেও সেটার কোন সম্ভাবনা দেখছিনা।
সহকর্মীর শিক্ষক বাবা একটু রিভার্স চিন্তা করেছেন ।
আসলে এই মাদ্রাসার হুজুর ও ইমামদের উপরে আমাদের সামাজিক ধর্মীয়-জীবন কতখানি নির্ভরশীল, কোথায় কোথায় তাঁদের ছাড়া চলেই না সেটা তিনি আগে চিহ্নিত করেছেন।
মৃতব্যক্তির দাফন ও জানাজা।
আপনি কম বা বেশী ধার্মিক যাই হোন না কেন , মৃত্যু আপনাকে বাধ্য করবে ধর্মের হেফাজতকারীদেরকে ডেকে আনতে। কারণ আপনি মুসলমান হলেও আপনার কোন ব্যবহারিক জ্ঞান নেই দাফন-কাফনের। সুতরাং মৃত্যুর এই বিষাদময় উৎসবে এঁদের বিকল্প নেই। পুরো প্রক্রিয়াটিতে, গোসল করানো, কাফন পড়ানো, কবরে নামানো, কুলখানির দিনের দাওয়াত। পরবর্তীতে কোরআন খতম, ফকির-মিসকিন আত্মীয়দের খাওয়ানো, দোয়া করা প্রতিটা ক্ষেত্রেই এঁদের সরব উপস্থিতি, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। আপনাকে নত হতে হয়, আপনার চিরপ্রস্থানকারী পিতা মাতার আখিরাতের সুরাহা করতে হয়।
কিন্তু আপনি যদি এই প্রক্রিয়াটি নামাজ শিক্ষার মতো স্কুলেই শিখে ফেলতেন?
আপনার জন্য ব্যাপারটা অনেক সহজ হত না ? আপনি তাসবীহ রুকু পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারছেন আর এইটা শিখতে সমস্যা কি? এটা তো আমাদের মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটা সমাপ্তি।
আর আছে, কোরবানি দেওয়া, নামাজের ইমামতি করা , মিলাদ পড়ানো, মৃতব্যক্তির আত্মার শান্তিতে মোনাজাত করা ইত্যাদি।
এখন , বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক ইসলাম ধর্ম শিক্ষা আছে দশম শ্রেণী পর্যন্ত।
সেখানে, ১০০ নাম্বারের পুরোটাই লিখিত না রেখে। ৫০ নম্বর ব্যবহারিক রাখা হোক।
কীভাবে মৃতব্যক্তিকে গোসল করাতে হবে, কীভাবে জানাজার নামাজ পড়াতে হবে, কোরবানি কীভাবে করতে হবে, নামাজের ইমামতি কীভাবে করতে হবে সবকিছুর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকুক।
সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন এই ধর্মের ব্যবহারিক অনুশাসন ও আচারগুলো ভালোমতো প্র্যাকটিস করবে, তখন এই অনুৎপাদনশীল মাদ্রাসা শিক্ষিতদের উপরে নির্ভরতা কমে যাবে। ভিক্ষাবৃত্তি ত্যাগ করে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হোক এই জাতি।
কেননা আমাদের যেতে হবে অনেকটা পথ !
[ প্রকাশকালঃ ৩১শে আগস্ট,২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | সাহিত্য
ছেলেটির বয়স যখন সাত-
চাঁদা দিতে না পারায় চোখের সামনে তাঁর বাবাকে
সপাটে চড় কষিয়েছিল পাড়ার এক নেতা ;
কেউ কোন প্রতিবাদ করেনি।
দু’বছর—
সরকারী জমিতে শনি-মন্দির তুলতে বাধা দেবার জন্য
‘প্রকাশ্য দিবালোকে’ তার দাদাকে ফেলে পিটিয়েছিল
যেসব ছেলেরা,
একদা তারা অন্য দলের হলেও, এখন ওই নেতারই
অনুগামী।
ছেলেটি এসব দেখেছিল।
সে দেখেছিল—
১)একটা লোকও বাধা দিতে আসেনি। ২) অজ্ঞান
দাদার মুখে জলের ঝাপটা দিতেও পারেনি কোন বন্ধু,
কারণ ‘পাঞ্জা’ কেটে নেওয়ার ভয় ছিল।৩) পাড়ার ডাক্তার
প্রাথমিক চিকিৎসাও করতে আসেনি। ৪) থানা কোন
এফ-আই-আর নেয় নি।৫)পুরপিতা তার কোঁচকানো মুখের
বাবাকে বলেছিলেন, ‘দোষ তো আপনার ছেলেরই , সে কেন
লাগতে যায়…!’
দেখতে-দেখতেই ছেলেটার ষোলো বছর বয়স হল।
তার গাল এখন কচি দুর্বাঘাসের গালচে, হাড় হয়ে উঠছে
চওড়া
নাইন-টেনের মেয়েরা এখন তার দিকে আড়চোখে তাকায়,
কিন্তু তারা জানে না,
ঘাসের ঐ গালিচার নীচে তার চোয়াল হয়ে উঠেছে কঠিন,
চোখের কোনায় জমেছে রক্ত,যা সাদা চোখে দেখা যায় না।
গল্পে বা সিনেমায় এসব ছেলেরাই এখন রুখে দাঁড়ায়,
শোধ নেয় বাপ-দাদার অপমানের,
হাতে তুলে নেয় বিচার-
অমিতাভ বচ্চন থেকে শাহ্রুখ খান
আমাদের এমনটাই দেখিয়ে আসছেন।
কিন্তু, শিল্প ও জীবনের মধ্যে, কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে
অহর্নিশ যে লুকোচুরি চলে,
তাতে মাঝে-মাঝেই আমাদের শিল্প ও কল্পনা যে
মারাত্মক হোঁচট খায়, তাতে আর সন্দেহ কী !
ষোলো বছরের ঐ ছেলে , একদিন সামান্য বিবাদের জন্য,
আর তিন বন্ধুর সঙ্গে নিজের বাবার পেটেই ঢুকিয়ে দিল
চাকু।
খুব স্বাভাবিক,
কারণ, ছোট থেকেই সে দেখেছে,
এই লোকটাকে মারা যায়—কেউ কোন প্রতিবাদ করে না।
বাধা দিতে এসেছিল তার দাদা—
ফালাফালা হয়ে গেল সেও।
কেননা, তাকেও তো মারা যায়,
মারলে কোন শাস্তি হয় না,
পুলিশ এফ-আই-আর-নেয় না,
পুরপিতা চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, ‘দোষ তো ওরই…।’
তারপর, অস্ত্রগুলো ধুয়েমুছে পরিপাটি করে টেবিলে সাজিয়ে
স্বাভাবিক মুখে বেরিয়ে পড়ল চারজন।
ভোরের আগেই তিনজন সীমান্ত পেরিয়ে গেল,
দূরে কোথাও বৃষ্টি হওয়ায় তারা ঠান্ডা বাতাসও পেয়েছিল।
আর, চতুর্থজন—আমাদের নায়ক—আশ্রয় নিল
সেই নেতার কাছে,
একদা যিনি চড় মেরে তার বাবাকে সহবৎ শিখিয়েছিলেন।
কোন প্রত্যক্ষদর্শী নেই—ছেলেটি জামিন পেল।
প্রত্যক্ষদর্শী নেই—বেকসুর খালাস পেল।
প্রত্যক্ষদর্শী নেই—পিতৃসম্পত্তি পেতেও অসুবিধা হল না।
পাড়ার মোড়েই এখন তার আড্ডা,
চোখের রক্ত আরো গাঢ় হয়েছে, সাদা চোখে
যা বোঝা যায় না।
নাইন-টেনের মেয়েরা এখন তাকে দেখলেই
ঘরে ঢুকে পড়ে,
আবার দমচাপা সেই ভয়ের মধ্যে আকর্ষণও যে কিছু নেই
জোর দিয়ে বলা যায় না কিছু।
এরকম কেন হয় !
হে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাগণ,
এরকম কেন হয়—
এটাই তো আপনাদের প্রশ্ন?
তবে শুনুন,
এই মহতী বাস্তবতার অনুপম ভিত্তিটি
অমর্ত্য উদাসীনতায়, কুটোটুকুও না নেড়ে
আপনারাই এতদিন ধরে তৈরী করেছেন।
এখন আপনাদের ভেড়ুয়া বললে…
মাইরি বলছি… ভেড়ুয়াদেরই খিস্তি করা হয়।
‘দেশ’ বর্ষ ৬৩ সংখ্যা ১৯। ২৯ আষাঢ় ১৪০৩। ১৩ জুলাই ১৯৯৬
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
কর্পোরেট জগতে চাকচিক্যময় আরেকজনকে দেখে অযথাই ঈর্ষান্বিত হবেন না। আপনি আসলেই জানেন না যে তিনি কীরকম নরকযন্ত্রণায় আছেন !
দেড়যুগ আগে OPEX GROUP- এ থাকতে আমার বসের কাছে শোনা। স্মৃতি থেকে লিখছি ; পশ্চিমা জোক, সামান্য অশ্লীলতা আছে।
দুইবন্ধুর একজন খুবই পাপী, বেঁচে থাকতে হেন পাপ নেই সে করে নাই। আরেকজন পুণ্যবান।
তো মৃত্যুর পরে স্বর্গে গেলেন যথারীতি সেই পুণ্যবান। স্বর্গের ব্যাপারে যা গল্পটল্প শুনে এসেছিলেন তার সঙ্গে মিলও ছিল । সারাদিন বেশুমার খাওয়া দাওয়া, চারিদিকে মধুর বিশুদ্ধ সঙ্গীত বেজে চলছে , শ্বেতশুভ্র পোষাকের দাস-দাসী তার সেবায় ব্যস্ত , আলোকোজ্জ্বল বাসস্থান ইত্যাদি। সবই ঠিক আছে , তবুও কিছুদিনের ভিতরে ব্যাপারগুলো একঘেঁয়েমি হয়ে গেল।
এক বিকেলে সেই পুণ্যবান তার নিজস্ব স্বর্গের জানালায় দাঁড়িয়ে আছেন ; হঠাৎ দেখেন তাঁর সেই পাপী বন্ধুটিকে! গোধূলিলগ্নের আকাশ দিয়ে উড়ে উড়ে যাওয়া আলাদীনের আশ্চর্য জাজিমের একপ্রান্তে বালিশের উপরে হেলান দিয়ে বসে আছে সে ! আরেকপ্রান্তে বসে আছে উদ্ভিন্নযৌবনের এক অপ্সরী ; ধীরে ধীরে একটা পানপাত্রে সুরা ঢেলে দিচ্ছে তাকে ।
পরের দিন ছিল স্বর্গের সাপ্তাহিক মিটিং ; পাপী সহকর্মীর সৌভাগ্যে বেচারা পুণ্যবান খুবই মর্মাহত হয়ে ছিলেন।
স্বর্গপ্রধান কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন, কিছু কথোপকথনের পরে আসল অভিযোগ বেরিয়ে এলো , ‘আমার স্বর্গ এতো বোরিং আর ওই পাপীকে এতো উত্তেজক যৌবনবতী অপ্সরাসহ স্বর্গ দিয়েছেন, এটা কী রকমের বিচার হল ? ’
স্বর্গপ্রধান মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ কী কারণে মনে হচ্ছে তোমার সেই সহকর্মী স্বর্গসুখে আছে? তাকে আমি নরকযন্ত্রণাতেই রেখেছি !
কীভাবে ?
শোন, যে পাত্রে সে সুরা পান করছে সেটার তলায় ছিদ্র আছে। সুতরাং সে শুধু সুরা পড়তেই দেখছে, একফোঁটাও চেখে দেখার সাধ্য নেই তার ! বোঝ কীরকম যন্ত্রণায় আছে সে। আর যে যৌবনবতী বসে আছে,তার কোথাও কোন ছিদ্র নাই!’
[ প্রকাশকালঃ ২৪শে আগস্ট,২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
‘ ঘোড়া ঘাস সে দোস্তি কারেগা , তো খায়েগা কেয়া ?’ – হিন্দিতে প্রচলিত জনপ্রিয় একটা বাগধারা। প্রথম শুনেছিলাম বহু আগে আমার এক কলিগের কাছে। আমার চাকরি পরিবর্তনের ক্রান্তিকালীন সময়ে সে আমাকে কথাচ্ছলে বলেছিল।
কর্পোরেট জগতে , মালিকের চেষ্টা থাকবে চাকুরীপ্রার্থীকে বোঝানো মাসিক বেতনের বাইরে সে তার নতুন কর্মস্থলে কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন সেটা বুঝিয়ে বেতন কম দেয়া। কারণ , যতদূর সম্ভব কম বাজেটে নিয়োগ দিতে পারলে কোম্পানির লাভ। নেগেটিভলিও অনেক মালিক বেতন কম অফার করেন– ব্যবসা ভাল না , চিন্তা করবেন না আপনি তো আমার ফ্যামিলি মেম্বার , আমিতো আছি ; এই বেতনেই জয়েন করেন, কয়েকমাস পরে অ্যাডজাস্ট করে দিচ্ছি, বছর শেষে দেখবেন অনেক কিছু পাচ্ছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
আপনি যখন কর্মচারী , আপনার সৎ উপার্জন কিন্তু ঐ মাস শেষের বেতনটাই। আপনি সৎ হলে আপনাকে ঐ বেতনেই চলতে হবে। এখন মালিকের কথায় কনভিন্সড হয়ে, আপনার যোগ্যতার চেয়ে কম বেতনে যোগদান করলেন। পরবর্তীতে হয় আপনাকে সারাক্ষণ মনঃকষ্টে থাকতে হবে, অথবা অসৎ উপার্জনের চিন্তা করতে হবে। দুটোর কোনটাই কাম্য নয় !
সে ক্ষেত্রে বেতন বা ঘাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করাই ভাল !
প্রকাশকালঃ ২২শে আগস্ট, ২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য