অন্যের সাফল্য গাঁথা শোনা কীভাবে এড়াবেন।

কারো কারো সঙ্গে চললে তাঁদের সাফল্য গাঁথা আর অর্জিত সম্পত্তির হালকা উত্তাপে আপনি এই শীতেও ঘামা শুরু করবেন ; আমিও করতাম।

তবে ইদানীং ব্যাপারটা আমি অন্যভাবে অ্যাডজাস্ট করা শিখে ফেলেছি।
এই ধরণের লোককে সর্বাংশে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। এড়াতে না পারলে, ধারে কাছে কম ঘেঁষি। সেটাও যদি না হয়, তবে তার সাফল্যের কাহিনী ( যেটা শুনে আমার দুই পয়সার লাভ নাই ! ) শুরু হওয়ার পরে আমি প্রসঙ্গ চেঞ্জ করি। সেটা রাজনীতি, আবহাওয়া, দেশের অবস্থা ধুনুফুনু কিছু একটা দিয়ে । মানে , তিনি যে ফিল্ডে এক্সপার্ট সেই ফিল্ড থেকে সরিয়ে নিজের চেনাজানা মাঠের কাছাকাছি নিয়ে আসি। তখন আর আলোচনা বেশীক্ষণ চলে না, কারণ তিনি সেটাতে মজা পান না।

এদের জীবনের একটাই আনন্দ, আরেকজন বঞ্চিতকে নিজের প্রাপ্তির হিসেবের খাতা , শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাতার পর পাতা শুনিয়ে শুনিয়ে উপসংহার টানা যে, আসলে তিনি এই বাস্তব পৃথিবীর একজন বাস্তব মানুষ—আর আমি আমার যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও খাঁটি একটা বোকা োদা !

৯০ দশকের বন্ধুত্ব

আমাদের ছিল সীমাবদ্ধ বিনোদন। রেডিও ছাড়া সবেধন নীলমনি বিটিভি, সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্লাসিক, ওয়েস্টার্ন, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা আর সবশেষে আধা সের হূমায়ুন আহমেদ, এক চিমটি ইমদাদুল হক মিলনের সাথে এক টেবিল চামচ সমরেশ , সুনীল, শীর্ষেন্দুর ঘুঁটা দেওয়া সাহিত্য !

রসময় গুপ্ত সবে এলেন ! এলেন, দেখালেন, জয় করলেন আর সবচেয়ে জনপ্রিয় অবশ্যপাঠ্য সাহিত্যিক(!) হয়ে গেলেন। সেটা নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা আমাদের সবার। গ্রুপে আমার মতো ১৬ বছরের চ্যাংড়া ছাড়াও অনেক কাঁচাপাকা চুলের ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার আছেন। তাদের কথা কনসিডার করে, এটা শুধু একপেশে পোস্ট হিসাবেই থাকুক। সবার অভিজ্ঞতা কমেন্টসে আসলে, আমি জাহিদ প্রথমদিনেই এই গ্রুপ থেকে নির্বাসিত হব, লিশ্চিত !

তো, ঢাকা কলেজে যাই , একটা দুইটা ক্লাস করি কী করি না ! প্র্যাক্টিকাল ক্লাস থাকলে দুপুর পর্যন্ত থাকি , নইলে প্রাইভেট স্যার/ ম্যাডামদের কাছে টাকা নষ্ট করতে যাই !

সপ্তাহ খানিকের মাথায় আমাদের মিরপুরবাসী দুই মফিজ -ঝুলন আর আমাকে মণিশঙ্কর রায় নামের মেধা তালিকার এক ছেলে পাকড়ালো। ‘ এই তোরা চটি পড়েছিস ?’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি! পড়ি নি। ‘ বলিস কী ! তোরা তো অশিক্ষিত রে ! আয় , তোদের শিক্ষিত করি ! ‘
অত:পর তিন কিশোরের নীলক্ষেত ভ্রমণ। চটির মতো সাহিত্য(!) যে ভাড়া পাওয়া যায় , কে জানত ! এবং ঢাকা কলেজের কোন এক নির্জন গ্যালারিতে বসে দুই মফিজের শিক্ষিত (!) হওয়া ! কথ্য কোলকাতার অদ্ভুতুড়ে অশ্লীলতায় বিনোদন খুঁজে পাওয়া !

মণিশঙ্কর রায় ডিএমসি পাশ করে নাম করা ডাক্তার , আমেরিকা থাকে। গত ২৯ বছর কোন যোগাযোগ নেই ! শুনেছি ও কোন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না । কারো সংগে ওই দুর্দান্ত মেধাবী ছেলেটির যোগাযোগ থাকলে আমার ভালোবাসা পৌঁছে দিও। ওকে বোল, আই স্টিল রিমেম্বার হিম ! লাভ ইউ মণিশঙ্কর রায় !

আমদের ফেসবুকের মেসেন্জার ছিল না, রাতজাগা মোবাইল প্যাকেজ টকটাইম ছিল না ! ছিল এক ঘোড়ার ডিমের ল্যান্ড ফোন। কলরেট বেশি বলে থাকত আব্বা – আম্মার ঘরে তালাবদ্ধ ! ক্রস কানেকশনে কিছুটা ফান ছিল। কিন্তু নিজেদের নধ্যে আমাদের প্রকাশভঙ্গী ছিল অনাবিল, জড়তামুক্ত ! আমরা অবলীলায় একজন আরেকজনকে যা বলতে পারতাম, তা এখন চরম অভদ্রতা !
যেমন :
উহ্ হু ! দোস্ত সকালে দাঁত মাজ নাই!
উহ্ হু ! এই একই শার্ট কয়দিন ধইরা পড়তাছস? কাঁচতে পারস না!
অথবা নতুন কেনা জিনস পড়া কাউকে-
মাম্মা , প্যান্টটা তো দারুণ হইছে , ঢাকা কলেজের সামনে থিকা নাকি বঙ্গবাজার থিকা কিনলা ? কত পড়ছে ?

প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৯

গুগল বিস্ময় কেড়ে নিয়েছে

শৈশব ও কৈশোরে প্রিয় গানের সোর্স ছিল নিজের রেকর্ড প্লেয়ার অথবা শেষ দুপুরে রেডিওর অনুরোধের আসর। সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজী গান ও প্রায়শ: অন্যভাষার গানগুলো বাজাতেন এঁরা ।
কোন কোনদিন একটা প্রিয় গান সকালবেলায় মাথায় ঢুকে বসে থাকত। সারাদিন পড়ার টেবিল , স্কুল , কোচিং সেই গান মাথায় ঘুরঘুর করত! কিন্তু চলতি পথে কারো বাসার জানালা দিয়ে ঐ গান কানে ভেসে আসলে, এতোটাই বিস্মিত হতাম, সে আর বলার মতো না ! হঠাৎ করে প্রিয় গান শোনার আনন্দ কীরকম সেটা আমাদের প্রজন্ম জানে !
এখন অনলাইনের যুগে , মাথায় কোন কিছু আসার আগেই স্মার্ট ফোনে গুগল, ইউটিউবে আঙ্গুলের চাপ পড়ে যায় !

গুগল আমাদের সেই অবাক বিস্ময়ের আকস্মিক অকারণ ভালোলাগা কেড়ে নিয়েছে !

দর্শন ও চিন্তার জগতের বেসিক আগে জানতে হয়।

আমাদেরকে দর্শন ও চিন্তার জগতের বেসিক আগে জানতে হয় ; তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে আমরা চিন্তাকে আরো বিস্তৃত করতে পারি !

ধরুন , একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত মনোযোগ থাকে শুধুমাত্র মিষ্টান্নের প্রতি। খাওয়ার জন্য আরো যে হাজার বিকল্প স্বাদ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেটা বুঝতে বয়স ও অভিজ্ঞতা লাগে।

যখন আমাদের মানসিক বয়স বেসিক চাহিদা পূরণ করার পর পরিপার্শ্বের বৈচিত্রে মুগ্ধ হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে ; তখনই আমাদের জানার তৃষ্ণা মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের মুখোমুখি করে আমাদেরকে।

মিষ্টি ছাড়াও যে টক, ঝাল, তিতা ও স্বাদহীনতার স্বাদ অবারিত ছড়িয়ে আছে তা গ্রহনের জন্য আপনি ও আপনারা উন্মুখ হয়ে উঠুন। জ্ঞানের ভুরিভোজনে আমাদের সকলের শৈশব অতিক্রান্ত হোক! শুভকামনা !

প্রকাশকালঃ ২৫শে ডিসেম্বর,২০১৯

চল্লিশোর্ধদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা

কর্মক্ষেত্রের হে তরুণের দল!
আমাদের চল্লিশোর্ধদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা দেখে আমরা অমানবিক মেশিন হয়ে গেছি বলবেন না অথবা অযথা বিস্মিত হবেন না।
এই বিস্ময় আমাদেরও ছিল ! আমরাও উঁচু গলায় বলেছি -অমুক স্যার তো নিজের পরিবারের কাছে অপ্রয়োজনীয় —, আছে খালি অফিস আর কাজ !

তমুক স্যারের কি আর আড্ডা দেওয়ার কোন বন্ধু আছে ! নাকি বউ-বাচ্চাকে সময় দিতে হয় ! নাকি , রাত জেগে মুভিজ দেখতে হয় ! এই আবালে সকাল সকাল সময়মতো অফিসে আসবে না তো কী , আমি আসব ?

যে কথাটা, হে তরুণ, আপনি ভুলে যাচ্ছেন—আমাদের মূলত সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় আছে কষ্টেসৃষ্টে বছর পনের ! তারপরের বাকী বছরগুলো আধক্ষয়া শরীর টেনে টেনে পার করা! আসন্ন বার্ধক্যে আমাদের নিজেদের চিকিৎসার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলে হয়তো দম ফেলবার ফুরসত থাকত ! সে আর হচ্ছে কোথায় !

সামনের মাত্র অল্প কয়েকটি বছরের অনিশ্চয়তা আর পাহাড় সমান কাজের বীভৎস চেহারা— না দিচ্ছে আমাদেরকে জীবনকে উপভোগ করতে ; না দিচ্ছে আপনাদের মতো তারুণ্যের আলস্যে মেতে থাকতে !

আমাদের এই অতরুণসুলভ, মেপে চলা , তাড়াহুড়োর কর্মদক্ষতার পিছনের করুণ কাহিনী উপলব্ধি করতে হলে আপনার বয়স পন্চাশের কাছাকাছি আসতে হবে !

তার আগ পর্যন্ত, আমাদের তাচ্ছিল্য দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে সমবেদনা দেখাতে ভুলবেন না, এই কামনা করতেই পারি !

প্রকাশকালঃ ২৪শে ডিসেম্বর,২০১৯